📄 ইরাকে খালিদের যুদ্ধ
খালিদ রা. মুরতাদদের সঙ্গে যুদ্ধাভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মাত্র ২ হাজার সেনার ছোট এক বাহিনী নিয়ে ইরাকে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে রাবিআ গোত্র থেকে ৮ হাজার সেনা সংগ্রহ করেন। এরপর ইরাকে অবস্থানরত তিনজন আমিরের কাছে চিঠি লেখেন, যাঁদের কাছে যুদ্ধ করার মতো যথেষ্ট সেনা ছিল। তাঁরা ছিলেন মাজউর ইবনু আদি আজালি, সুলমা ইবনুল কাইন তামিমি এবং হারমালা ইবনু মুরাইত তামিমি। তাঁরা খালিদের নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ সেনাসহ তাঁর বাহিনীতে যোগ দেন। তাঁদের ও মুসান্নার সেনাসংখ্যা মিলে এ বাহিনীর সংখ্যা ৮ হাজারে পৌঁছায়। এভাবে মুসলিমবাহিনীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮ হাজার। এরপর তাঁরা এই সিদ্ধান্তে যান যে, সবাই 'আবলা' প্রান্তরে সমবেত হবেন。
ইরাকের দিকে রওনা হওয়ার আগে খালিদ হুরমুজকে সতর্ক করে বার্তা পাঠান,
হমদ ও সালাতের পর, ইসলামগ্রহণ করে নাও, নিরাপদ থাকবে। অথবা নিজের ও জাতির নিরাপত্তাপ্রত্যাশায় সন্ধি করে জিজয়া প্রদানে সম্মত হয়ে যাও। অন্যথায় পরিণতির জন্য নিজেকে ছাড়া কাউকে দায়ী করো না। আমি এমন লোকদের নিয়ে এগিয়ে আসছি, যাদের কাছে মৃত্যু এতটাই লোভনীয়, যেমন লোভনীয় তোমাদের কাছে তোমাদের জীবন。
এই সতর্ক-সংকেত ছিল মূলত মনস্তাত্ত্বিক একটা যুদ্ধ, যাতে হুরমুজ ও তার বাহিনীর মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। শত্রুর কাছাকাছি পৌঁছেই খালিদ রা. সেনাবাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করেন। দলপ্রধানদের নির্দেশ দেন, 'প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে এগিয়ে যাও।' তিনি সবাইকে একপথে রাখেননি, যাতে যুদ্ধের প্রাথমিক মূলনীতি তথা 'নিজ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা' বিঘ্নিত না হয়। প্রথম বাহিনীর নেতা ছিলেন মুসান্না ইবনুল হারিসা, দ্বিতীয় বাহিনীর আদি ইবনু হাতিম তাই। তাঁদের পরে ছিলেন খোদ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.। তিনি হাজিরে উভয়ের সঙ্গে মিলিত হওয়ার অঙ্গীকার করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, সেখানে গিয়েই শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন。
টিকাঃ
২৯১ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৩।
২৯২ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, খালিদ আল জুনাবি, নাজার আল হাদিসি: ৪৬।
২৯৩ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৪।
📄 জাতুস সালাসিলযুদ্ধ ও হুরমুজকে হত্যা
এদিকে হুরমুজ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের রওনা এবং মুসলিমদের হাজিরে জমায়েত হওয়ার পরিকল্পনা-সংবাদ জেনে যায়। বিষয়গুলো জানার পর সে তাদের আগেই সেখানে পৌঁছে যায় এবং তার অগ্রবাহিনীতে কাবাজ ও আনুশজান নামের দুই সেনাপতিকে নিযুক্ত করে। খালিদ শত্রুবাহিনী হাজির পৌঁছার সংবাদ জানতে পেরে হাজিরের পরিবর্তে কাজিমার দিকে মোড় ঘুরিয়ে নেন; কিন্তু হুরমুজ সেখানেও তাঁর আগে পৌঁছে যায়। সেখানে পৌঁছেই সে পানির দখল নিয়ে নেয় এবং তার বাহিনীকে সুবিধাজনক জায়গায় মোতায়েন করে রাখে। খালিদ সেখানে পৌঁছলে তাঁকে এমন জায়গায় শিবির স্থাপন করতে হয়, যেখানে পানি ছিল না। তিনি তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দেন, 'নিজেদের মালসামানা নামিয়ে নাও। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই পানির ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করতে হবে তোমাদের। আল্লাহর শপথ, পানি তারাই পাবে, যারা বেশি ধৈর্যধারণকারী এবং আল্লাহর কাছে সম্মানিত বিবেচিত。
এরপর মুসলিমবাহিনী বাহন থেকে তাদের মালসামানা নামিয়ে রাখে। অশ্বারোহীরা নিজ নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকেন আর পদাতিকরা শত্রুর দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝটিকা হামলা চালান। আল্লাহ তাঁর অসীম অনুগ্রহে মুসলিমবাহিনীর ওপর দয়া করেন। এর মধ্যে আকাশ বাদলে ছেয়ে যায় এবং একসময় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। মুসলিমবাহিনী তৃপ্ত হয়ে পানি পান করে। তাঁদের শক্তি ফিরে আসে। আল্লাহ কর্তৃক তাঁর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে এমন দয়ার আচরণের অসংখ্য নজির বিদ্যমান।
মুসলিমরা হুরমুজের মোকাবিলা করেন। হুরমুজের জঘন্য আচরণ ছিল প্রবাদপ্রতিম। সে খালিদের জন্য চক্রান্তের একটা ফাঁদ পাতে। তার প্রতিরক্ষাবাহিনীকে বলে, 'আমি খালিদকে দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানাচ্ছি। সে মাঠে বেরিয়ে এলে তোমরা আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করে ফেলবে।' এই পরিকল্পনা সাজিয়ে হুরমুজ সেনাদল থেকে বেরিয়ে এসে খালিদকে দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানায়। খালিদ বেরিয়ে এসেই তাকে কাবু করে ফেলেন। ইতিমধ্যে হুরমুজের প্রতিরক্ষাদল আচমকা হামলে পড়ে তাঁকে তাদের ঘেরাওয়ে নিয়ে নেয়; কিন্তু এমতাবস্থায়ও খালিদ হুরমুজকে হত্যা করে ফেলেন।
এদিকে কা'কা রা. পুরো দৃশ্যপটের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন। যখনই হুরমুজের বিশ্বাসঘাতকতা দেখতে পান, তখনই অশ্বারোহী একটা বাহিনী নিয়ে তার প্রতিরক্ষাবাহিনীর ওপর ক্ষুব্ধ আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর প্রচণ্ড হামলা ওদের চিরদিনের মতো শুইয়ে রাখে। এরপর পুরো মুসলিমবাহিনী কা'কার পেছনে পেছনে ঝড়ের বেগে শত্রুদের ওপর চড়াও হয়। পারস্যবাহিনী তখন পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। এ ছিল প্রথম সেই যুদ্ধ, যেখানে কা'কা সম্পর্কে আবু বকরের অন্তর্দৃষ্টি সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। এই কা'কা সম্পর্কেই তিনি বলেছিলেন, 'সে বাহিনী পরাজিত হতে পারে না, যে বাহিনীতে ওর মতো লোক রয়েছে。
এ যুদ্ধে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. তাঁর বীরত্ব ও দুঃসাহসের মহাকাব্য রচনা করেন। তিনি নিজ হাতে পারস্য-অধিপতির ভবলীলা সাঙ্গ করেন। যে বাহিনী তাঁকে হত্যা করতে এসেছিল, তারা তাদের অধিপতিকে বাঁচাবে দূরে থাক, নিজেরাও বাঁচতে পারেনি। খালিদ তাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত থাকতেই কা'কা সেখানে পৌঁছে যান এবং মুহূর্তেই তাদের মৃত্যুমুখে পৌঁছে দেন। পারসিকরা মাঠ থেকে পালিয়ে না যাওয়ার সংকল্পে একে অপরকে শিকলে জড়িয়ে নিয়েছিল; কিন্তু বাহাদুর সিংহগুলোর সামনে কোনো সংকল্পই হালে পানি পায়নি। তারা নিজেদের শিকলে বেঁধে নিয়েছিল বলেই যুদ্ধটি 'জাতুস সালাসিল' নামে প্রসিদ্ধি পায়。
এ যুদ্ধে মুসলিমবাহিনী ১ হাজার উট-বোঝাই পরিমাণ গনিমত পায়। এরপর খালিদ রা. হিরার আশপাশের কেল্লাগুলো জয় করতে ছোট ছোট দল পাঠান। এভাবে মুসলিমবাহিনী গনিমত হিসেবে বিপুল সম্পদ অর্জন করে। খালিদ রা. যুদ্ধ থেকে দূরে থাকা কৃষকদের সঙ্গে কোনো প্রকার দুর্ব্যবহার করেননি; বরং সিদ্দিকে আকবরের নির্দেশমতো তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেন। তাদেরকে তাদের ভূখণ্ডে জমির মালিকানাসহ থাকতে দেন, যাতে তাদের কোনো কষ্টের মুখোমুখি হতে না হয়। যারা ইসলামগ্রহণ করেছিল, তাদের জন্য জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করেন; আর যারা নিজেদের ধর্মে অটল ছিল, তাদের ওপর জিজয়া-কর আরোপ করেন। তবে সে জিজয়া ছিল পরিমাণে এতটাই অল্প, যা তাদের স্বজাতির ভূপতি কর্তৃক আদায়কৃত খাজনা থেকেও কম ছিল।
যারা পারস্যের জমিদার ছিল, তাদের জমি ছিনিয়ে নেওয়া হয়নি। তবে সেসব জমিতে কর্মরত মজুরদের সঙ্গে ইনসাফপূর্ণ ব্যবহারের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে মানুষের মধ্যে এই বোধ জাগে যে, এই বিজয়ের কারণে সাম্য ও মানবিক ভ্রাতৃত্বের এক বদ্ধ অর্গল তাদের সামনে উন্মুক্ত হয়েছে। খালিদ রা. গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ খলিফা আবু বকরের কাছে পাঠিয়ে বাকিটা মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। আবু বকরের কাছে যা পাঠানো হয়েছিল, তার মধ্যে হুরমুজের একটা টুপিও ছিল। তবে আবু বকর খালিদের উত্তম কৃতিত্বের পুরস্কারস্বরূপ টুপিটা তাঁকে উপহার হিসেবে ফেরত পাঠিয়ে দেন。
হুরমুজের সেই টুপির মূল্য ছিল ১ লাখ মুদ্রা। এটা ছিল মূল্যবান পাথরখচিত টুপি। পারসিকদের টুপিগুলো হতো তাদের বংশীয় মর্যাদার প্রতীক। যে বংশ মর্যাদার উচ্চাসনে থাকত, তাদের টুপির মূল্য হতো ১ লাখ। হুরমুজ ছিল সেই শ্রেণির একজন, যে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বে শীর্ষস্থানে অবস্থান করত。
টিকাঃ
২৯৪ 'হাজির' বসরা থেকে চার মাইল দূরের একটি পানির ঝরনা। আল-মুজাম, ইয়াকুত: ২/২৭৭।
২৯৫ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, খালিদ আল জুনাবি: ৪৬।
২৯৬ আল-কামিল, ইবনু আসির: ২/৫১; তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৫।
২৯৭ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৫।
২৯৮ প্রাগুক্ত: ৪/১৬৩।
২৯৯ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩৩; তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৫।
৩০০ আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা: ১৩১।
৩০১ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৬।
📄 মাজার (সানি) যুদ্ধ
হুরমুজ খালিদের চিঠিটা কিসরার দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে কিসরা হুরমুজের সাহায্যে 'কারিনে'র নেতৃত্বে একটা বাহিনী পাঠিয়ে দেয়; কিন্তু হুরমুজ মুসলিমবাহিনীকে সাধারণ একটা বাহিনী মনে করে কারিন আসার আগেই আক্রমণ চালিয়ে বসে। ফলে বিপর্যয় ও ধ্বংসই হয় তার ললাটলিখন। তার পরাজিত বাহিনী পালিয়ে কারিনের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। তারা একত্রিত হয়ে একে অপরকে উসকানি দিতে থাকে। একপর্যায়ে সবাই মিলে মাজারে মুসলিমদের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করতে সংকল্পবদ্ধ হয়। এদিকে খালিদ রা. মুসান্না ইবনুল হারিসা ও তাঁর ভাই মুআন্নাকে তাদের পেছনে লাগিয়ে রেখেছিলেন। তাঁরা উভয়ে বেশ কয়েকটা দুর্গ করায়ত্ত করে নিয়েছিলেন। ভ্রাতৃদ্বয় পারসিক বাহিনীর আগমন-সংবাদ জানার পরপরই খালিদকে এ ব্যাপারে অবহিত করেন। খালিদও বিষয়টা আবু বকরকে জানান। তারা যাতে আচমকা হামলা করতে না পারে, এ জন্য যুদ্ধপ্রস্তুতিও শুরু করেন।
মাজার নামক স্থানে শত্রুবাহিনীর সঙ্গে মুসলিমদের সংঘাত বাঁধে। জাতুস সালাসিলে পরাজয়ের কারণে তারা এমনিতেই ছিল উত্তপ্ত। তাদের নেতা কারিন ময়দানে নেমে খালিদকে দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানায়। খালিদ ময়দানে বেরিয়ে আসেন; কিন্তু তাঁর আগেই মাকিল ইবনু আমাশ ইবনু নাব্বাশ কারিনকে হত্যা করে ফেলেন। কারিন তার ডান বাহুতে কাবাজ; আর বাম বাহুতে আনুশজানকে অধিনায়ক নিযুক্ত করে রেখেছিল।
এরা জাতুস সালাসিলযুদ্ধেও অগ্রবাহিনীর নেতৃত্বে ছিল। সেই যুদ্ধে পরাজয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল তাদের। তাদের মোকাবিলায় দুই মুসলিম বাহাদুর দাঁড়িয়ে যান। কাবাজকে হত্যা করেন আদি ইবনু হাতিম তাই; আর আনুশজানকে আসিম ইবনু আমর তামিমি।
উভয় নেতা নিহত হওয়ার পরপরই শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। পরপর তিন নেতার মৃত্যুতে পারসিক বাহিনী এমনিতেই নেতৃত্বহারা হয়ে পড়েছিল। ফলে মূল যুদ্ধ শুরু হলে তারা নিজেদের সামনে কেবল অন্ধকারই দেখতে পাচ্ছিল। এই যুদ্ধে তাদের ৩০ হাজার সেনা মারা যায়। বাকিরা কোনোমতে নৌকায় চড়ে পালাতে সক্ষম হয়। পানিতে মুসলিমরা তাদের ধাওয়া করতে পারেননি। খালিদ রা. মাজারে অবস্থান করে পারস্যবাহিনীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া গনিমত মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। তা ছাড়া যুদ্ধে যারা গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছিল, গণিমতের এক-পঞ্চমাংশ থেকে তাদের বিশেষ সম্মাননাপুরস্কারও দান করেন। আর বাকি খুমুস (গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ) মদিনায় পাঠিয়ে দেন。
টিকাঃ
৩০২ প্রাগুক্ত: ৪/১৬৮; আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩৪।
📄 ওয়ালাজার যুদ্ধ
১. যুদ্ধপরিকল্পনা ও আক্রমণ
মাজারে পারস্যবাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ শুনে কিসরা 'আন্দারজাগার'-এর নেতৃত্বে এক সুবিশাল বাহিনী এবং তার পেছনে পেছনে বাহমান জাদবিয়ার নেতৃত্বে আরেকটা বড় বাহিনীও পাঠায়। আন্দারজাগার মাদায়েন থেকে বেরিয়ে প্রথমে কাসকারে আসে, এরপর সেখান থেকে ওয়ালজায় পৌঁছায়। এদিকে বাহমান জাদবিয়া সাওয়াদের মধ্যাঞ্চল থেকে বেরিয়ে পড়ে। জাদবিয়ার উদ্দেশ্য ছিল, সে মুসলিমবাহিনীকে তার ও আন্দারজাগারের বাহিনীর মধ্যখানে ঘেরাও করে ফেলবে। সে রাস্তা থেকে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবক এবং ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিদের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে সমর্থ হয়। এভাবে পারসিকরা ওয়ালজায় একত্রিত হয়। আন্দারজাগার তার বাহিনীর বিশালতার অহমিকায় আক্রান্ত হয়ে খালিদের মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে খালিদ রা. যখন পারসিকদের ওয়ালজায় এসে সমবেত হওয়ার সংবাদ পান, তখন তিনি বসরার পাশে সানি অঞ্চলে ছিলেন। তিনি তখন তিন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়াটাই উপযুক্ত মনে করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এভাবে আকস্মিক হামলার মাধ্যমে তাদের দিশেহারা করে তুলতে পারবেন।
সুতরাং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পেছনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে সুওয়াইদ ইবনু মুকাররিনকে নিযুক্ত করেন। তাঁকে খণ্ডবাহিনী নিয়ে হাফিরে অবস্থানের নির্দেশ দেন। এর পর নিজের বাহিনীকে নিয়ে ওয়ালজার দিকে এগিয়ে যান। সেখানে পৌঁছে পুরো অঞ্চলের অবস্থানগত বিষয়ের ওপর একটা পর্যালোচনা চালান। তিনি জানতে পারেন, যুদ্ধের জায়গাটা সমতল এবং যুদ্ধের জন্য উপযোগীও বটে। সেখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা সম্ভব। তাই ইতিপূর্বে তিন দিক থেকে আক্রমণ চালানোর যে পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করেন। দুটি খণ্ডবাহিনীর একটিকে পারস্যবাহিনীর একপ্রান্ত এবং আরেকটিকে পেছন দিক থেকে হামলার জন্য পাঠিয়ে দেন। একসময় যুদ্ধ শুরু হয়ে উভয় পক্ষে তুমুল লড়াই চলতে থাকে। খালিদ সামনের দিক থেকে পারস্যবাহিনীকে চেপে ধরেন। আর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষারত খণ্ডবাহিনীও যথাসময়ে প্রচণ্ড বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে চোখে অন্ধকার দেখা পারস্যবাহিনী অল্পক্ষণেই পরাজিত হয়ে পালাতে থাকে। আন্দারজাগার তখন অল্পসংখ্যক সেনাসহ পালিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু পথে তারা পিপাসার তীব্রতায় মারা পড়ে。
২. যুদ্ধ সমাপ্তির পর খালিদের ভাষণ যুদ্ধ সমাপ্তির পর খালিদ রা. তাঁর বাহিনীর উদ্দেশে তেজোদীপ্ত এক ভাষণ দেন। ভাষণে আরবের পরিবর্তে আজমের দিকে তাদের আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা চালান। তিনি বলছিলেন,
আমরা কি এখানে রকমারি খাদ্যদ্রব্যের বিপুল সমাহার দেখতে পাচ্ছি না? আল্লাহর শপথ, যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ এবং ইসলামের দিকে আহ্বান আমাদের ওপর ফরজ না-ও হতো, তবু বুদ্ধিমানের কাজ এটাই ছিল—আমরা এ ভূখণ্ড অর্জনের জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস চালাই; আর ক্ষুধা-পিপাসা তাদের জন্য রেখে দিই, যারা আমাদের সঙ্গে বেরোতে রাজি নয়।
খালিদ রা. গনিমতের পাঁচ ভাগের চার অংশ মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে এক অংশ মদিনায় আবু বকরের কাছে পাঠিয়ে দেন। এরপর বিদ্রোহী লড়াইকারীদের পরিবার-পরিজনদের বন্দি করে কৃষকদের ওপর জিজয়া-কর আবশ্যক করেন。
খালিদের ভাষণ থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে, আরবরা ছিল অন্ধকারে। তারা পরকালের ব্যাপারে ছিল অজ্ঞ। আর পারস্পরিক ঝগড়ার কারণে পার্থিব সমৃদ্ধি অর্জনেও অন্যান্য জাতি থেকে পিছিয়ে ছিল। খালিদ রা. মূলত এ কথাই বলতে চেয়েছিলেন- 'আমরা পরকালপ্রত্যাশী। আমরা একটা মহান উদ্দেশ্য নিয়ে দাঁড়িয়েছি। এর দিকে মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছি। এই লক্ষ্যেই জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছি। যদি মেনেও নিই, এ মহান উদ্দেশ্য আমাদের মৌলিক উদ্দেশ্য নয়, তথাপি বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে, অন্তত পার্থিব জীবনমান সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে এখানে যুদ্ধ করি।' খালিদের এ কথার উদ্দেশ্য কখনোই মহান উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পদ অর্জনকে মিলিয়ে ফেলা ছিল না; বরং তিনি একে কল্পনাগত অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, যখন বিবেকের চাহিদায় আমরা জাগতিক জীবনের সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এখানে যুদ্ধ করতে পারি, তাহলে পরকালের কল্যাণের জন্য কেন করব না?
এ ধরনের কথায় সাধারণত সাহস বৃদ্ধি পায়। সংকল্প দৃঢ় হয়। চেতনার স্ফুরণ ঘটে। শক্তি উছলে ওঠে। এ কারণেই মুমিনরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য নিজেদের পুরো শক্তিসামর্থ্য ও জিনিসপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়。
৩. ওয়ালজাযুদ্ধে খালিদের বীরত্ব এক বর্ণনামতে, খালিদ রা. এই যুদ্ধে এমন ব্যক্তির মোকাবিলায় দ্বৈতযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, যাকে হাজার মানুষের সমান শক্তিধর মনে করা হতো; কিন্তু তিনি তাকে হত্যা করতে সমর্থ হন। তাকে হত্যার পর তার গায়ে হেলান দিয়ে নিজের জন্য খাদ্য চেয়ে পাঠান। কাজটা মূলত পারসিকদের অপমানিত করতে করেছিলেন। এর দ্বারা তাদের অহংকার ও দম্ভ চূর্ণ করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য。
টিকাঃ
৩০০ আল-কামিল, ইবনু আসির: ২/৫২; আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., খালিদ আল জুনাবি: ৪৮।
৩০৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩৫০。
৩০৫ আত-তারিখুল ইসলামি: ১/১৩৯।
৩০৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩৫০।
৩০৭ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩৮।