📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে ইরাকের দিকে প্রেরণ
এ অভিযান ১২ হিজরিতে হয়েছিল। অপর এক বর্ণনায় ১২ হিজরির মুহাররামের কথা বলা হয়েছে。
১. আবু বকরের রণকৌশল আবু বকর রা. তাঁর উভয় সেনাপতি খালিদ ও ইয়াজ রা.-কে যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, এটা তাঁর উন্নত সামরিক প্রজ্ঞা এবং যুদ্ধাভিজ্ঞতার প্রমাণ বহন করে। তিনি তাঁদের কৌশলপূর্ণ দক্ষতা ও সামরিক শিক্ষা দেন। ভৌগোলিক সুবিধা বিবেচনা করে দুই সেনাপতিকে দু-দিক থেকে ইরাকে প্রবেশের নির্দেশ দেন। তাঁর এ নির্দেশনা থেকে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন হিজাজের সামরিক অপারেশনকক্ষে বসে নেতৃত্ব পরিচালনা করছিলেন। তাঁর সামনে যেন রয়েছে ইরাকের ভৌগোলিক মানচিত্র, যে মানচিত্রে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত রয়েছে রাস্তাঘাটসহ উঁচু-নিচু ভূমি। তিনি খালিদকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, তিনি যেন ইরাকের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে প্রবেশ করেন। এরপর ঢালুভূমি 'আবলা'য় গিয়ে পৌঁছান। আর ইয়াজকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, তিনি যেন ইরাকে উঁচুভূমির পূর্ব-উত্তর থেকে প্রবেশ করে মাসিখে যান। পাশাপাশি উভয়ের প্রতি সমন্বিত নির্দেশ ছিল, ইরাকের মধ্যাঞ্চলে গিয়ে তাঁরা যেন একত্রিত হন। সঙ্গে এই নির্দেশনা দিতেও ভুল করেননি যে, জোরপূর্বক কাউকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে যেন বাধ্য করা না হয়। তাঁর কাছে সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিষয়টা ছিল ঐচ্ছিক বিষয়।
২. সামরিক গুরুত্ব বিবেচনায় 'হিরা'কে নির্বাচন সামরিক কৌশল ও অবস্থানগত গুরুত্ব বিবেচনায় আবু বকর রা. হিরা দখলের অভিপ্রায় লালন করতেন। হিরার অবস্থান কুফা থেকে দক্ষিণে তিন মাইল দূরে এবং নাজাফ থেকে দক্ষিণ-পূর্বে অশ্বারোহীদের জন্য এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। এই মানচিত্রের ওপর যে-কেউ তাকালে প্রথম দৃষ্টিতেই হিরার অবস্থানগত গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে। হিরা যোগাযোগমাধ্যমের এমন এক কেন্দ্রস্থল ছিল, যেখানে এসে মিলিত হয়েছে সব পথ। এখান থেকে পূর্বে ফোরাত নদী হয়ে যেমন মাদায়েন যাওয়া যায়, তেমনি উত্তরে 'হায়ত' এবং 'আনবারে'ও পৌঁছা যায়। এ ছাড়া এখান থেকে একটা রাস্তা পশ্চিম দিকে একেবারে শাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। একইভাবে অপর রাস্তা বসরার আবলায় গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর বাইরে সাওয়াদের 'কিসকার' এবং দিজলার তীরবর্তী 'নুমানিয়া'র সঙ্গেও হিরার ভালো যোগাযোগব্যবস্থা ছিল। এসব বিবেচনায় হিরা দখলের গুরুত্ব সহজে অনুমেয়।
আবু বকর রা. উভয় সেনাপতির জন্য এই ভূখন্ডকে টার্গেট বানানোর নির্দেশ দিতে অত্যন্ত সুচিন্তিত ও সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। হিরা ছিল ইরাকের কলিজাসদৃশ। সর্বোপরি এটা ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েনের একেবারে নিকটবর্তী। পারস্যবাসীও হিরার গুরুত্ব সম্পর্কে ছিল সম্যক অবগত। তাই তারা এর দখল ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত সেনাদল পাঠাচ্ছিল। তারা জানত, হিরা যাদের দখলে থাকবে, তাদের জন্য ফুরাতের পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সহজ হয়ে যাবে। এ ছাড়া শামে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে হিরা মুজাহিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
হিরা বিজয়ের লক্ষ্যে সেখান পর্যন্ত পৌঁছতে আবু বকরের পরিকল্পনা ছিল আধুনিক যুদ্ধ-পরিকল্পনার মতো। অর্থাৎ, চারদিক থেকে বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে অবরুদ্ধ করে নেওয়ার বাস্তব উদাহরণ। এ থেকে প্রমাণিত হয়, যুদ্ধের মাধ্যমে ইরাক ও জাজিরাতুল আরবের বিভিন্ন অঞ্চলকে মুসলিম অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলা আচমকা কোনো ঘটনা ছিল না। গবেষক ও তথ্যসন্ধানীরা দেখতে পাবে, আবু বকরের পরিকল্পনা ছিল উন্নত বিবেচনাবোধ ও দূরদর্শিতাসমৃদ্ধ। তাঁর বিস্ময়কর সেনাবিন্যাস, সেনাপতি ও বাহিনীকে সঠিক পথপ্রদর্শন, তাদের কর্তব্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ, তাদের সাহায্য প্রদান, তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধের ময়দানে ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব প্রদানসহ অন্যান্য বিষয়ে ছিল অনন্য প্রজ্ঞা ও অগাধ দক্ষতা। তিনি সবকিছু সেনাপতিদের ওপর চাপিয়ে দিতেন না। সামরিক কাজকর্মে তাঁদের স্বাধীনতা দিতেন। প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনায় সময়-সুযোগমতো যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের অনুমতি দিতে মোটেও কার্পণ্য করতেন না。
৩. মুসান্না ইবনুল হারিসার বিনয় ও নম্রতা ইরাকযুদ্ধে মুসান্না ইবনুল হারিসার অবস্থান ছিল অত্যন্ত আলোকময়। তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে ইরাকে যুদ্ধরত ছিলেন। আবু বকর রা. বিষয়টা জানতে পেরে তাঁকে সেখানকার সেনাপতি নিযুক্ত করেন। এটা হচ্ছে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইরাকে পৌঁছার আগের কথা; কিন্তু তিনি যখন পারস্য সাম্রাজ্যের ওপর আক্রমণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজের জন্য একমাত্র খালিদ ইবনুল ওয়ালিদই যোগ্যতম ব্যক্তি বিবেচিত হচ্ছিলেন। এ জন্য খালিদকে সেনাপতি নিযুক্ত করে মুসান্না রা.-কে লিখে পাঠান—'তুমি খালিদের সঙ্গে যোগ দেবে। তাঁর আনুগত্য করবে।' নির্দেশ পেয়েই মুসান্না কোনো দ্বিধা ছাড়াই দ্রুত খালিদের বাহিনীতে যোগ দেন। মুসান্নার এ অবস্থান সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তাঁর বাহিনীর সেনাধিক্য এবং খালিদের আগে থেকে ইরাকযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের ব্যাপারটা তাঁকে প্রতারিত করতে পারেনি। নেতৃত্বের প্রশ্নে খালিদ থেকে তিনি যোগ্যতর ছিলেন, এমন অহমিকারও শিকার হননি。
৪. জিহাদ বিষয়ে আবু বকরের সাবধানতা আবু বকর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ও ইয়াজ ইবনু গানাম রা.-কে জোর দিয়ে এই নির্দেশ দেন—'আমার পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত যারা মুরতাদবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিয়েছে এবং নবিজির ইনতিকালের পর ইসলামে অটল থেকেছে, সেনাদলে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেবে। আর যারা কোনো একসময় ইরতিদাদের শিকার হয়েছিল এবং বর্তমানে ইসলামে অটল রয়েছে, ইরাকযুদ্ধে তাদের অংশ নেওয়ার সুযোগ দেবে না।' এ কারণে ইরাকযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে এমন কেউ যোগদানের সুযোগ পায়নি। পরে যখন তারা ইসলামের ব্যাপারে একনিষ্ঠ হয়ে যায়, তখন পরবর্তী অভিযানসমূহে তারাও শরিক হয়। শীঘ্রই এ সংক্রান্ত বর্ণনা আসছে। আবু বকরের এ সিদ্ধান্ত ছিল যুদ্ধের ব্যাপারে সাবধানতার অনুপম স্বাক্ষর, যাতে দুর্বল বিশ্বাসীরা যুদ্ধে অংশ নিয়ে দৃঢ় বিশ্বাসীদের দুর্বল করে তোলা ও তাদের মধ্যে বিক্ষিপ্ততা ছড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠতে না পারে। আবু বকর এ শিক্ষা খোদ রাসুল থেকে গ্রহণ করেছিলেন। নবিজির শিক্ষা ছিল, সেনাবাহিনীকে সব ধরনের ত্রুটি থেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তাদের সবার লক্ষ্য হতে হবে এক ও অভিন্ন এবং সেটা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। এভাবে ভিন্ন মত ও ভিন্ন লক্ষ্যের কারণে যে মতবিরোধ তৈরি হয়, তা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আবু বকর রা. উন্নত ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি অবলম্বনে আগ্রহী ছিলেন। এ ছাড়া সে সময় মুসলিমবাহিনীর জন্য সেনার প্রয়োজন বেশি থাকলেও এই পদক্ষেপ তাঁর অসীম ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার স্পষ্ট দলিল। কারণ, তাঁর কাছে মূল বিষয় ছিল নিষ্ঠা; সংখ্যাগরিষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ছিল না。
৫. মানুষের সঙ্গে নম্রতা এবং ইরাকের কৃষকদের ব্যাপারে উপদেশ
আবু বকর রা. খালিদ রা.-কে বলেছিলেন, 'পারসিকসহ সেখানে যেসব জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে, তাদের আপন করে নাও।' তাঁর এ কথার মাধ্যমে জিহাদের মূল লক্ষ্য পরিষ্কার হয়ে যায়। মূলত, জিহাদ হচ্ছে একটি দাওয়াতি কাজ। এর লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা। যেহেতু কাফির সরকারের মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছানো সম্ভব নয়, এ জন্য সেই সরকারকে হটিয়ে দেওয়া জরুরি; যাতে মানুষের কাছে ইসলামের আহ্বান তুলে ধরতে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে।
সাহাবিদের যুদ্ধগুলোতে এই উদ্দেশ্য ছিল একেবারে স্পষ্ট। প্রথমে তাঁরা মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতেন। ইসলাম কবুল করে নিলে সর্বক্ষেত্রে তারা মুসলিমদের মতো সার্বিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। মুসলিমদের মতোই তাদের ওপর ইসলামের বিধিবিধান আরোপ হতো। পক্ষান্তরে ইসলামি শাসনব্যবস্থা মেনে নিয়েও যদি কুফরে অটল থাকত, তাহলে নির্দিষ্ট পরিমাণ জিজয়া আদায় করতে হতো। জিজয়া আদায়ের ফলে তাদের জানমালের নিরাপত্তা মুসলিমদের দায়িত্বে চলে আসত। যদি তা-ও গ্রহণ না করত, তাহলে আল্লাহর বাণী উঁচু না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া হতো。
উভয় সেনাপতির প্রতি আবু বকরের নির্দেশ ছিল, তাঁরা যেন ইরাকের কৃষক ও সাওয়াদবাসীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করেন। এ থেকেই বোঝা যায়, তিনি মানুষের হিদায়াত এবং ঘরবাড়ি ও সম্পদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কতটা দরদি ও আগ্রহী ছিলেন। আপনারা নিশ্চয় জেনে থাকবেন যে, কোনো শহর ও জনপদই সরকার-ব্যবস্থাপনার বর্তমানে টিকে থাকতে পারে না। একইভাবে কৃষি হচ্ছে সম্পদের উৎস। মানুষের জীবনের সঙ্গে কৃষির রয়েছে গভীর সম্পৃক্ততা。
৬. 'সে বাহিনী পরাজিত হতে পারে না, যে বাহিনীতে ওর মতো লোক রয়েছে'
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ইরাক যাওয়ার পথে আবু বকরের কাছে সাহায্য চাইলে তিনি কা'কা ইবনু আমর তামিমিকে তাঁর সাহায্যে পাঠিয়ে দেন। তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়, 'আপনি বিক্ষিপ্ত একটা বাহিনীর নেতার সাহায্যে মাত্র একজনকে পাঠালেন?' উত্তরে তিনি বলেন, 'সে বাহিনী পরাজিত হতে পারে না, যে বাহিনীতে ওর (কা'কা ইবনু আমর) মতো লোক রয়েছে। এ ছিল তাঁর অন্তর্দৃষ্টির উদাহরণ। তাঁর এ নির্বাচনের যথার্থতা ইরাকের পরবর্তী যুদ্ধসমূহে প্রকাশ পেয়েছিল। আবু বকর রা. মানুষ এবং তাদের মধ্যকার শক্তি ও নানাবিধ যোগ্যতা অনুধাবনের ক্ষেত্রে অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন。
টিকাঃ
২৭৮ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৪৭।
২৭৯ আল-ফাযলুল আসকারিয়িল ইসলামি: ৮৩-৮৪।
২৮০ মাআরিকু খালিদিবনিল ওয়ালিদ জিদ্দাল ফুরুসি, আবদুল জাব্বার আস সামরায়ি: ৩৫।
২৮১ আবু বকরিনিস সিদ্দিক, নাজার আল হাদিসি ও খালিদ আল জুনাবি: ৪৫।
২৮২ মাশাহিরুল খুলাফা ওয়াল উমারা আস-সিদ্দিক, বিসাম আল আসালি: ১২৭।
২৮৩ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩০।
২৮৪ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৩।
২৮৫ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩১।
২৮৬ তারিখুত তাবারি: ৪/১৫৯।
২৮৭ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩০১।
২৮৮ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ৩৪২।
২৮৯ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৩।
২৯০ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১২৯।
📄 ইরাকে খালিদের যুদ্ধ
খালিদ রা. মুরতাদদের সঙ্গে যুদ্ধাভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মাত্র ২ হাজার সেনার ছোট এক বাহিনী নিয়ে ইরাকে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে রাবিআ গোত্র থেকে ৮ হাজার সেনা সংগ্রহ করেন। এরপর ইরাকে অবস্থানরত তিনজন আমিরের কাছে চিঠি লেখেন, যাঁদের কাছে যুদ্ধ করার মতো যথেষ্ট সেনা ছিল। তাঁরা ছিলেন মাজউর ইবনু আদি আজালি, সুলমা ইবনুল কাইন তামিমি এবং হারমালা ইবনু মুরাইত তামিমি। তাঁরা খালিদের নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ সেনাসহ তাঁর বাহিনীতে যোগ দেন। তাঁদের ও মুসান্নার সেনাসংখ্যা মিলে এ বাহিনীর সংখ্যা ৮ হাজারে পৌঁছায়। এভাবে মুসলিমবাহিনীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮ হাজার। এরপর তাঁরা এই সিদ্ধান্তে যান যে, সবাই 'আবলা' প্রান্তরে সমবেত হবেন。
ইরাকের দিকে রওনা হওয়ার আগে খালিদ হুরমুজকে সতর্ক করে বার্তা পাঠান,
হমদ ও সালাতের পর, ইসলামগ্রহণ করে নাও, নিরাপদ থাকবে। অথবা নিজের ও জাতির নিরাপত্তাপ্রত্যাশায় সন্ধি করে জিজয়া প্রদানে সম্মত হয়ে যাও। অন্যথায় পরিণতির জন্য নিজেকে ছাড়া কাউকে দায়ী করো না। আমি এমন লোকদের নিয়ে এগিয়ে আসছি, যাদের কাছে মৃত্যু এতটাই লোভনীয়, যেমন লোভনীয় তোমাদের কাছে তোমাদের জীবন。
এই সতর্ক-সংকেত ছিল মূলত মনস্তাত্ত্বিক একটা যুদ্ধ, যাতে হুরমুজ ও তার বাহিনীর মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। শত্রুর কাছাকাছি পৌঁছেই খালিদ রা. সেনাবাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করেন। দলপ্রধানদের নির্দেশ দেন, 'প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে এগিয়ে যাও।' তিনি সবাইকে একপথে রাখেননি, যাতে যুদ্ধের প্রাথমিক মূলনীতি তথা 'নিজ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা' বিঘ্নিত না হয়। প্রথম বাহিনীর নেতা ছিলেন মুসান্না ইবনুল হারিসা, দ্বিতীয় বাহিনীর আদি ইবনু হাতিম তাই। তাঁদের পরে ছিলেন খোদ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.। তিনি হাজিরে উভয়ের সঙ্গে মিলিত হওয়ার অঙ্গীকার করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, সেখানে গিয়েই শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন。
টিকাঃ
২৯১ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৩।
২৯২ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, খালিদ আল জুনাবি, নাজার আল হাদিসি: ৪৬।
২৯৩ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৪।
📄 জাতুস সালাসিলযুদ্ধ ও হুরমুজকে হত্যা
এদিকে হুরমুজ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের রওনা এবং মুসলিমদের হাজিরে জমায়েত হওয়ার পরিকল্পনা-সংবাদ জেনে যায়। বিষয়গুলো জানার পর সে তাদের আগেই সেখানে পৌঁছে যায় এবং তার অগ্রবাহিনীতে কাবাজ ও আনুশজান নামের দুই সেনাপতিকে নিযুক্ত করে। খালিদ শত্রুবাহিনী হাজির পৌঁছার সংবাদ জানতে পেরে হাজিরের পরিবর্তে কাজিমার দিকে মোড় ঘুরিয়ে নেন; কিন্তু হুরমুজ সেখানেও তাঁর আগে পৌঁছে যায়। সেখানে পৌঁছেই সে পানির দখল নিয়ে নেয় এবং তার বাহিনীকে সুবিধাজনক জায়গায় মোতায়েন করে রাখে। খালিদ সেখানে পৌঁছলে তাঁকে এমন জায়গায় শিবির স্থাপন করতে হয়, যেখানে পানি ছিল না। তিনি তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দেন, 'নিজেদের মালসামানা নামিয়ে নাও। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই পানির ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করতে হবে তোমাদের। আল্লাহর শপথ, পানি তারাই পাবে, যারা বেশি ধৈর্যধারণকারী এবং আল্লাহর কাছে সম্মানিত বিবেচিত。
এরপর মুসলিমবাহিনী বাহন থেকে তাদের মালসামানা নামিয়ে রাখে। অশ্বারোহীরা নিজ নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকেন আর পদাতিকরা শত্রুর দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝটিকা হামলা চালান। আল্লাহ তাঁর অসীম অনুগ্রহে মুসলিমবাহিনীর ওপর দয়া করেন। এর মধ্যে আকাশ বাদলে ছেয়ে যায় এবং একসময় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। মুসলিমবাহিনী তৃপ্ত হয়ে পানি পান করে। তাঁদের শক্তি ফিরে আসে। আল্লাহ কর্তৃক তাঁর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে এমন দয়ার আচরণের অসংখ্য নজির বিদ্যমান।
মুসলিমরা হুরমুজের মোকাবিলা করেন। হুরমুজের জঘন্য আচরণ ছিল প্রবাদপ্রতিম। সে খালিদের জন্য চক্রান্তের একটা ফাঁদ পাতে। তার প্রতিরক্ষাবাহিনীকে বলে, 'আমি খালিদকে দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানাচ্ছি। সে মাঠে বেরিয়ে এলে তোমরা আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করে ফেলবে।' এই পরিকল্পনা সাজিয়ে হুরমুজ সেনাদল থেকে বেরিয়ে এসে খালিদকে দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানায়। খালিদ বেরিয়ে এসেই তাকে কাবু করে ফেলেন। ইতিমধ্যে হুরমুজের প্রতিরক্ষাদল আচমকা হামলে পড়ে তাঁকে তাদের ঘেরাওয়ে নিয়ে নেয়; কিন্তু এমতাবস্থায়ও খালিদ হুরমুজকে হত্যা করে ফেলেন।
এদিকে কা'কা রা. পুরো দৃশ্যপটের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন। যখনই হুরমুজের বিশ্বাসঘাতকতা দেখতে পান, তখনই অশ্বারোহী একটা বাহিনী নিয়ে তার প্রতিরক্ষাবাহিনীর ওপর ক্ষুব্ধ আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর প্রচণ্ড হামলা ওদের চিরদিনের মতো শুইয়ে রাখে। এরপর পুরো মুসলিমবাহিনী কা'কার পেছনে পেছনে ঝড়ের বেগে শত্রুদের ওপর চড়াও হয়। পারস্যবাহিনী তখন পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। এ ছিল প্রথম সেই যুদ্ধ, যেখানে কা'কা সম্পর্কে আবু বকরের অন্তর্দৃষ্টি সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। এই কা'কা সম্পর্কেই তিনি বলেছিলেন, 'সে বাহিনী পরাজিত হতে পারে না, যে বাহিনীতে ওর মতো লোক রয়েছে。
এ যুদ্ধে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. তাঁর বীরত্ব ও দুঃসাহসের মহাকাব্য রচনা করেন। তিনি নিজ হাতে পারস্য-অধিপতির ভবলীলা সাঙ্গ করেন। যে বাহিনী তাঁকে হত্যা করতে এসেছিল, তারা তাদের অধিপতিকে বাঁচাবে দূরে থাক, নিজেরাও বাঁচতে পারেনি। খালিদ তাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত থাকতেই কা'কা সেখানে পৌঁছে যান এবং মুহূর্তেই তাদের মৃত্যুমুখে পৌঁছে দেন। পারসিকরা মাঠ থেকে পালিয়ে না যাওয়ার সংকল্পে একে অপরকে শিকলে জড়িয়ে নিয়েছিল; কিন্তু বাহাদুর সিংহগুলোর সামনে কোনো সংকল্পই হালে পানি পায়নি। তারা নিজেদের শিকলে বেঁধে নিয়েছিল বলেই যুদ্ধটি 'জাতুস সালাসিল' নামে প্রসিদ্ধি পায়。
এ যুদ্ধে মুসলিমবাহিনী ১ হাজার উট-বোঝাই পরিমাণ গনিমত পায়। এরপর খালিদ রা. হিরার আশপাশের কেল্লাগুলো জয় করতে ছোট ছোট দল পাঠান। এভাবে মুসলিমবাহিনী গনিমত হিসেবে বিপুল সম্পদ অর্জন করে। খালিদ রা. যুদ্ধ থেকে দূরে থাকা কৃষকদের সঙ্গে কোনো প্রকার দুর্ব্যবহার করেননি; বরং সিদ্দিকে আকবরের নির্দেশমতো তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেন। তাদেরকে তাদের ভূখণ্ডে জমির মালিকানাসহ থাকতে দেন, যাতে তাদের কোনো কষ্টের মুখোমুখি হতে না হয়। যারা ইসলামগ্রহণ করেছিল, তাদের জন্য জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করেন; আর যারা নিজেদের ধর্মে অটল ছিল, তাদের ওপর জিজয়া-কর আরোপ করেন। তবে সে জিজয়া ছিল পরিমাণে এতটাই অল্প, যা তাদের স্বজাতির ভূপতি কর্তৃক আদায়কৃত খাজনা থেকেও কম ছিল।
যারা পারস্যের জমিদার ছিল, তাদের জমি ছিনিয়ে নেওয়া হয়নি। তবে সেসব জমিতে কর্মরত মজুরদের সঙ্গে ইনসাফপূর্ণ ব্যবহারের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে মানুষের মধ্যে এই বোধ জাগে যে, এই বিজয়ের কারণে সাম্য ও মানবিক ভ্রাতৃত্বের এক বদ্ধ অর্গল তাদের সামনে উন্মুক্ত হয়েছে। খালিদ রা. গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ খলিফা আবু বকরের কাছে পাঠিয়ে বাকিটা মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। আবু বকরের কাছে যা পাঠানো হয়েছিল, তার মধ্যে হুরমুজের একটা টুপিও ছিল। তবে আবু বকর খালিদের উত্তম কৃতিত্বের পুরস্কারস্বরূপ টুপিটা তাঁকে উপহার হিসেবে ফেরত পাঠিয়ে দেন。
হুরমুজের সেই টুপির মূল্য ছিল ১ লাখ মুদ্রা। এটা ছিল মূল্যবান পাথরখচিত টুপি। পারসিকদের টুপিগুলো হতো তাদের বংশীয় মর্যাদার প্রতীক। যে বংশ মর্যাদার উচ্চাসনে থাকত, তাদের টুপির মূল্য হতো ১ লাখ। হুরমুজ ছিল সেই শ্রেণির একজন, যে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বে শীর্ষস্থানে অবস্থান করত。
টিকাঃ
২৯৪ 'হাজির' বসরা থেকে চার মাইল দূরের একটি পানির ঝরনা। আল-মুজাম, ইয়াকুত: ২/২৭৭।
২৯৫ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, খালিদ আল জুনাবি: ৪৬।
২৯৬ আল-কামিল, ইবনু আসির: ২/৫১; তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৫।
২৯৭ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৫।
২৯৮ প্রাগুক্ত: ৪/১৬৩।
২৯৯ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩৩; তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৫।
৩০০ আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা: ১৩১।
৩০১ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৬।
📄 মাজার (সানি) যুদ্ধ
হুরমুজ খালিদের চিঠিটা কিসরার দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে কিসরা হুরমুজের সাহায্যে 'কারিনে'র নেতৃত্বে একটা বাহিনী পাঠিয়ে দেয়; কিন্তু হুরমুজ মুসলিমবাহিনীকে সাধারণ একটা বাহিনী মনে করে কারিন আসার আগেই আক্রমণ চালিয়ে বসে। ফলে বিপর্যয় ও ধ্বংসই হয় তার ললাটলিখন। তার পরাজিত বাহিনী পালিয়ে কারিনের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। তারা একত্রিত হয়ে একে অপরকে উসকানি দিতে থাকে। একপর্যায়ে সবাই মিলে মাজারে মুসলিমদের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করতে সংকল্পবদ্ধ হয়। এদিকে খালিদ রা. মুসান্না ইবনুল হারিসা ও তাঁর ভাই মুআন্নাকে তাদের পেছনে লাগিয়ে রেখেছিলেন। তাঁরা উভয়ে বেশ কয়েকটা দুর্গ করায়ত্ত করে নিয়েছিলেন। ভ্রাতৃদ্বয় পারসিক বাহিনীর আগমন-সংবাদ জানার পরপরই খালিদকে এ ব্যাপারে অবহিত করেন। খালিদও বিষয়টা আবু বকরকে জানান। তারা যাতে আচমকা হামলা করতে না পারে, এ জন্য যুদ্ধপ্রস্তুতিও শুরু করেন।
মাজার নামক স্থানে শত্রুবাহিনীর সঙ্গে মুসলিমদের সংঘাত বাঁধে। জাতুস সালাসিলে পরাজয়ের কারণে তারা এমনিতেই ছিল উত্তপ্ত। তাদের নেতা কারিন ময়দানে নেমে খালিদকে দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানায়। খালিদ ময়দানে বেরিয়ে আসেন; কিন্তু তাঁর আগেই মাকিল ইবনু আমাশ ইবনু নাব্বাশ কারিনকে হত্যা করে ফেলেন। কারিন তার ডান বাহুতে কাবাজ; আর বাম বাহুতে আনুশজানকে অধিনায়ক নিযুক্ত করে রেখেছিল।
এরা জাতুস সালাসিলযুদ্ধেও অগ্রবাহিনীর নেতৃত্বে ছিল। সেই যুদ্ধে পরাজয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল তাদের। তাদের মোকাবিলায় দুই মুসলিম বাহাদুর দাঁড়িয়ে যান। কাবাজকে হত্যা করেন আদি ইবনু হাতিম তাই; আর আনুশজানকে আসিম ইবনু আমর তামিমি।
উভয় নেতা নিহত হওয়ার পরপরই শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। পরপর তিন নেতার মৃত্যুতে পারসিক বাহিনী এমনিতেই নেতৃত্বহারা হয়ে পড়েছিল। ফলে মূল যুদ্ধ শুরু হলে তারা নিজেদের সামনে কেবল অন্ধকারই দেখতে পাচ্ছিল। এই যুদ্ধে তাদের ৩০ হাজার সেনা মারা যায়। বাকিরা কোনোমতে নৌকায় চড়ে পালাতে সক্ষম হয়। পানিতে মুসলিমরা তাদের ধাওয়া করতে পারেননি। খালিদ রা. মাজারে অবস্থান করে পারস্যবাহিনীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া গনিমত মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। তা ছাড়া যুদ্ধে যারা গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছিল, গণিমতের এক-পঞ্চমাংশ থেকে তাদের বিশেষ সম্মাননাপুরস্কারও দান করেন। আর বাকি খুমুস (গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ) মদিনায় পাঠিয়ে দেন。
টিকাঃ
৩০২ প্রাগুক্ত: ৪/১৬৮; আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩৪।