📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 মুজ্জাআর প্রতারণা ও খালিদের বিয়ে

📄 মুজ্জাআর প্রতারণা ও খালিদের বিয়ে


১. মুজ্জাআর প্রতারণা
হাদিকাতুল মাউতে (মৃত্যু-বাগান) বিজয় অর্জনের পর খালিদ রা. ইয়ামামার সর্বত্র অশ্বারোহী বাহিনী ছড়িয়ে দেন। তাদের নির্দেশ দেন, প্রতিটা দুর্গের সম্পদ ও বন্দিদের যেন একত্রিত করে নিয়ে আসা হয়। এরপর সেখানকার দুর্গসমূহে হামলার পরিকল্পনা করেন। দুর্গসমূহে তখন কেবল নারী-বৃদ্ধ আর শিশুরাই ছিল; কিন্তু মুজ্জাআ খালিদকে এই বলে ধোঁকা দেয় যে, এসব দুর্গ সশস্ত্র যোদ্ধায় পরিপূর্ণ। সে তাঁকে বলে, 'আপনি আমার সঙ্গে একটা সন্ধিতে আসতে পারেন।' মুসলিমরা অব্যাহত যুদ্ধে ক্লান্ত ছিলেন বিধায় খালিদ রা. সন্ধির ব্যাপারে রাজি হয়ে যান। মুজ্জাআ বলে, 'আমাকে একটু সুযোগ দিন, আমি তাদের সঙ্গে সন্ধির বিষয়ে মতবিনিময় করে নিই।' খালিদ তাকে সেই সুযোগ দিলে সে ভেতরে গিয়ে নারীদের বলে, 'তোমরা যুদ্ধের পোশাক পরে দুর্গপ্রাচীরে দাঁড়িয়ে যাবে।' খালিদ কেল্লার দিকে তাকালে দেখতে পান, সেখানে অসংখ্য মাথা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে মুজ্জাআর কথায় তিনি বিশ্বাস করে তাদের সঙ্গে সন্ধি করেন।
এরপর ইসলামের দিকে তাদের আহ্বান করলে তারা ইসলামগ্রহণ করে। খালিদ তখন তাদের কিছুসংখ্যক বন্দিকে ছেড়ে বাকিদের খলিফার দরবারে পাঠিয়ে দেন। এদের থেকেই এক বাঁদিকে আলি রা. কিনে নেন এবং ওই বাঁদির গর্ভেই তাঁর পুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া রাহ. জন্মান。
ইয়ামামার যুদ্ধ ১১ হিজরিতে হয়। ওয়াকিদিসহ কয়েকজন বর্ণনাকারীর মতে, যুদ্ধটা শুরু হয় ১১ হিজরিতে আর সমাপ্ত হয় ১২ হিজরিতে。
২. মুজ্জাআ-কন্যার সঙ্গে খালিদের বিয়ে এবং আবু বকরের সঙ্গে পত্রযোগাযোগ
সন্ধি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর খালিদ রা. মুজ্জাআর কাছে তার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। মুজ্জাআ বলে, 'আপনি আমার মেয়েকে বিয়ে করলে আমি-আপনি উভয়েই খলিফার ক্রোধের মুখে পড়ব।' খালিদ এটাকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, 'তুমি তোমার মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দাও।' এরপর মেয়েকে তাঁর হাতে তুলে দেয়。
এদিকে আবু বকর রা. সালমা ইবনু ওয়াকশকে খালিদের প্রতি এই নির্দেশ দিয়ে পাঠান- 'বনু হানিফার প্রাপ্তবয়স্ক সকল পুরুষকে যেন হত্যা করা হয়।' কিন্তু তত দিনে ওদের সঙ্গে খালিদ সন্ধি করে নিয়েছিলেন বিধায় তিনি সন্ধির মর্যাদা ভঙ্গ হতে দেননি。
আবু বকর রা. ইয়ামামার খবর জানতে সবসময় খালিদের প্রেরিত সংবাদবাহকের অপেক্ষায় থাকতেন। একদিন বিকালে মুহাজির ও আনসারদের একটা বাহিনী নিয়ে হাররার দিকে বেরোলে সেখানে খালিদের সংবাদবাহক আবু খায়সামা নাজারির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। আবু বকর তাঁর সাক্ষাৎ পেয়েই জিজ্ঞেস করেন, 'পেছনের খবর কী?' তিনি বলেন, 'খলিফাতুল মুসলিমিন, খবর ভালো। আমরা ইয়ামামায় বিজয় অর্জন করেছি; আর এই নিন খালিদের চিঠি।'
আবু বকর তৎক্ষণাৎ শুকরিয়ার সালাত আদায় করে বলেন, 'আমাকে যুদ্ধের অবস্থার বিবরণ শোনাও। বলো, সেখানে কী ঘটেছিল?' আবু খায়সামা তখন খালিদ কীভাবে সেনাবিন্যাস করেছিলেন, কীভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, কোন কোন সাহাবি শাহাদতবরণ করেছেন, सबकुछ তুলে ধরেন। এরপর বলেন, 'আমরা প্রথমে বেদুইনদের পক্ষ থেকে পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলাম। তারা আমাদের এমন জিনিসে অভ্যস্ত করে তুলেছিল, যা আমাদের ভালোভাবে জানা ছিল না।'
৩. খালিদের প্রতি খলিফা আবু বকরের চিঠি
এরপর খালিদের বিয়ের সংবাদ আবু বকরের কানে গেলে তিনি তাঁকে লেখেন,
খালিদ, তুমি বিয়ের জন্য এতটা উতলা হয়ে উঠলে; অথচ তোমার আঙিনায় এখনো ১ হাজার ২০০ শহিদের রক্ত শুকিয়ে যায়নি। তার ওপর মুজ্জাআ তোমাকে প্রতারিত করে সন্ধি করিয়ে নিল! আল্লাহ তো তোমাকে তাদের ওপর পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছিলেন!
মুজ্জাআর সঙ্গে সন্ধি এবং তার মেয়েকে বিয়ের কারণে আবু বকর তাঁকে তিরস্কার করে চিঠি লেখেন। জবাবি চিঠিতে খালিদ তাঁর অবস্থানের সাফাই গেয়ে আবু বারজা আসলামিকে তাঁর দরবারে পাঠান। চিঠিটা ছিল ভাষার স্পষ্টতা এবং কথার দৃঢ়তায় অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি লিখেছিলেন,
আল্লাহর শপথ, আমি ততক্ষণ বিয়ে করিনি, যতক্ষণ-না আনন্দ পূর্ণতায় উপনীত হয়েছে। আমি এমন একজনের মেয়েকে বিয়ে করেছি, যার কাছে মদিনা থেকে প্রস্তাব পাঠালেও অস্বীকার করত না। ক্ষমা করবেন, আমি আমার অবস্থান থেকেই বার্তা পাঠানোকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। এই সম্পর্কটা আপনার কাছে দীনি বা দুনিয়াবি দিক থেকে অপছন্দনীয় হয়ে থাকলে বলুন, আমি আপনার আদেশ পূরণের চেষ্টা করব।
আর শহিদদের সমবেদনার প্রশ্ন? কারও চিন্তা ও ব্যথা যদি কোনো জীবিতকে বাঁচিয়ে রাখার কিংবা মৃতকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যম হতো, তাহলে অবশ্যই আমার ব্যথা আর চিন্তাই জীবিতকে বাঁচিয়ে রাখত, মৃতকে ফিরিয়ে আনত। আমি এমনভাবে হামলা করেছিলাম যে, জীবন থেকে প্রায় নিরাশ হয়ে পড়েছিলাম। শত্রুদের প্রতিরোধ এতটাই শক্ত ছিল যে, মৃত্যুর নিশ্চয়তার ব্যাপারে আমার বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল। এ ছাড়া মুজ্জাআর প্রতারণার কথা? এখানেও আমি সিদ্ধান্তগ্রহণে ভুল করিনি; কিন্তু আমি তো আর গাইবের খবর জানি না। আল্লাহ যা কিছু করেছেন, মুসলিমদের কল্যাণের জন্যই করেছেন। মুসলিমদের ভূমির উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন এবং পরকালের কল্যাণ তো মুত্তাকিদের জন্যই。
চিঠি পেয়ে আবু বকর অনেকটা নরম হয়ে যান। এ ছাড়া আবু বারজাসহ কুরাইশের একদল লোকও খলিফার কাছে খালিদের পক্ষ নেন। আবু বারজা বলেন, 'আল্লাহর রাসুলের খলিফা, খালিদের ওপর ভীরুতা কিংবা খিয়ানতের দায় চাপানো যাবে না। তিনি শাহাদাতের প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়েই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাঁর ওজর গ্রহণ করা যেতেই পারে। তিনি কঠিন পরিস্থিতিতেও দৃঢ়পদ ছিলেন এবং শেষপর্যন্ত বিজয় ছিনিয়ে আনেন। বনু হানিফার সঙ্গে সন্ধিটি কোনো চাপের বশবর্তী হয়ে করেননি; সন্তুষ্ট চিত্তেই করেছেন। তিনি যে কল্যাণচিন্তায় সন্ধি করেছেন, তাতে সিদ্ধান্তটা অদূরদর্শী বলা যাবে না। তাদের দুর্গে অসংখ্য মহিলাকে পুরুষের যুদ্ধ-পোশাক পরিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল।'
আবু বকর বলেন, 'তুমি সত্য বলেছ। খালিদের ওজরের ব্যাপারে তাঁর পাঠানো চিঠির চেয়ে তোমার কথাই যথোপযুক্ত।'
৪. খলিফার কাছে পাঠানো খালিদের চিঠির গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক খালিদের চিঠির গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক তুলে ধরছি, যেগুলো দ্বারা তিনি তাঁর কাজের সাফাই গেয়েছিলেন:
* বিজয় ও সাহায্য সুনিশ্চিত হওয়া এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পরই তিনি মুজ্জাআর মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। * তিনি এমন একজনের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়েছেন, যে ছিল তার গোত্রের অভিজাত নেতা। সম্পর্ক গড়তে তাঁকে একটুও কষ্ট করতে হয়নি। * এ সম্পর্ক স্থাপনের মধ্যে দীনি ও দুনিয়াবি কোনো অকল্যাণ ছিল না। * চিন্তাভারাক্রান্ত অবস্থার কারণে বিয়েশাদি থেকে বিরত থাকা কোনো প্রশংসনীয় কাজ হতে পারে না। চিন্তা ও ব্যথা যেমন জীবিতকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, তেমনি তা মৃতকেও ফিরিয়ে আনতে পারে না।
* মুজ্জাআর সঙ্গে সন্ধির ক্ষেত্রে মুসলিমদের স্বার্থের ব্যাপারটাকে তিনি অগ্রাধিকার দিতে কোনো ত্রুটি করেননি। যদিও মুজ্জাআ তাঁকে সঠিক সংবাদ দেয়নি। তিনি তো মানুষ ছিলেন। অদৃশ্যের খবর জানতেন না। শেষপর্যন্ত পরিণাম মুসলিমদের পক্ষেই থাকে। তাঁরা বনু হানিফার ভূখণ্ডের অধিকারী হন। বাকিরা ইসলামে ফিরে আসে। মুজ্জাআর মেয়ের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারটা স্বভাবজাত একটা বিষয়। এ কারণে তাঁর সমালোচনা করা যায় না।
আর আক্কাদের মতো এ কথাও বলা যাবে না যে, 'মুজ্জাআর গোত্রীয় আত্মমর্যাদাবোধ খালিদকে প্রভাবিত করেছিল, এ কারণে তিনি তার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন, দীনি সম্পর্ক যেন ঐতিহ্য ও বংশগত সম্পর্কের মাধ্যমে দৃঢ় হয়। খালিদ রা. কখনো দীনি সম্পর্কের ওপর অন্য সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিতেন না; অথবা দীনি সম্পর্কের সঙ্গে অন্য কোনো সম্পর্ক একত্রিত করতেন না。
খালিদের পক্ষে ওজর বর্ণনার ক্ষেত্রে ড. হুসাইন হায়কালের পন্থাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, তার বর্ণনাধারা ইসলামি বিধানের বিপরীত। হায়কালের ভাষ্যমতে, 'বিজয়োৎসবে (যা উদ্যাপন করা খালিদের জন্য জরুরি ছিল) মুজ্জাআ-কন্যার গুরুত্ব কোথায়? এটা তো এই মহান প্রতিভাধর দিগ্বিজয়ীর পায়ে নিজেকে কুরবান করার চেয়ে আলাদা কোনো মর্যাদা রাখে না—যে মহান সত্তা এই আশা বুকে লালন করে ইয়ামামার ভূখণ্ডকে রক্তের দ্বারা তৃপ্ত করে দিয়েছিলেন যে, এখানকার সকল অকল্যাণ ও অপবিত্রতা দূর হয়ে যাবে।'
এখানে হুসাইন হায়কাল মহান সাহাবি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে প্রতিমাপূজারি গ্রিক যোদ্ধা আকিলিস (Achilles), হেক্টর (Hector) আর অ্যাগামেমননের (Agamemnon) মতো তুলে ধরছেন, যারা কেবল খ্যাতি অর্জন ও নেতৃত্বপ্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করত। হায়কালের কথায় মনে হয়, খালিদ যেন আরবের এমন এক দেবতা ছিলেন, যার পায়ে মানুষের রক্ত অর্ঘ্য দেওয়া হয়; অথবা নীলনদের সেই দেবতা, যার সম্পর্কে বলা হয়— যতক্ষণ-না তাকে কোনো সুন্দর কুমারীকে অর্ঘ্য হিসেবে দেওয়া হতো, ততক্ষণ নীলে জোয়ার আসত না।
আল্লাহ ক্ষমা করুন, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. ছিলেন এসব থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তিনি একজন খাঁটি মুমিন ছিলেন। কেবল আল্লাহর বাণী উঁচু করার লক্ষ্য নিয়েই জিহাদ করতেন। কোনো সৃষ্টির কাছে এর প্রতিদান কিংবা কৃতজ্ঞতা পাওয়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
একইভাবে জেনারেল আকরামের ধারণাও ভুল। তিনি ইরতিদাদি যুদ্ধ চলাকালে খালিদের বিয়ে-সংক্রান্ত কাহিনির ওপর উত্থাপিত অভিযোগ এবং দোষারোপের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, 'তাঁর শারীরিক সক্ষমতা এবং অপার যোগ্যতার কারণে আরব উপদ্বীপের সুন্দর মেয়েদের পক্ষ থেকে তাঁকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।' জেনারেল আকরামের এই বক্তব্য থেকে অনুমিত হয়, খালিদ যেন আনন্দ-মাহফিলের একজন নায়ক অথবা সুন্দর নারীদের জন্য পাগলপারা ছিলেন; অথচ আল্লাহর পথে লড়াই ছাড়া খালিদের কাছে অধিক প্রিয় কিছু ছিল না; কিন্তু এ সকল লেখক-গবেষক কত সহজে এবং নির্লজ্জভাবে একটা সত্য ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা করেছে, যা স্থান-কাল-পাত্র, সাক্ষ্য এবং পরিষ্কার ঘটনার সম্পূর্ণ বিরোধী。
খালিদ শুধু দীনের হিফাজতের লক্ষ্যেই জিহাদ করতেন। কেবল আল্লাহর কাছেই এর বিনিময়ের আশা করতেন। যুদ্ধে নিজে যোগ দিতেন। তাঁর সম্পর্কে তো এটা প্রসিদ্ধ যে, তাঁর মধ্যে ছিল বিড়ালের ধৈর্য এবং সিংহের অমিততেজা সাহস। কোনোদিন তিনি বাহিনী থেকে পেছনে থাকেননি। শত্রুরা সর্বদা তাঁকে সম্মুখসারিতেই দেখতে পেত। বুজাখাযুদ্ধেও তিনি বীরত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। ঘোড়া নিয়ে কেবল এগিয়েই যাচ্ছিলেন। লোকজন বলছিল, 'আল্লাহ, আল্লাহ, আপনি তো আমাদের আমির। আপনার জন্য এতটা এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়।' তিনি জবাবে বলছিলেন, 'আল্লাহর শপথ, আপনাদের কথা আমি বুঝতে পারছি; কিন্তু যেখানে মুসলিমদের পরাজয়ের শঙ্কা, সেখানে আমার পক্ষে নিজেকে ধরে রাখার সাধ্য কোথায়?'
ইয়ামামার যুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন বনু হানিফার সারিতে লাশের স্তূপ জমা হওয়ার পরও তারা অমিত বিক্রম দেখিয়ে চলছিল, কঠিন সেই পরিস্থিতিতে তিনি রণাঙ্গনে নেমে আসেন। সেনাসারির মধ্যখানে দাঁড়িয়ে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান জানান। মুসলিমদের যুদ্ধের সংকেত-শব্দ 'ইয়া মুহাম্মাদাহ' বলে চিৎকার দেন। যে শত্রুই তাঁর দিকে এগিয়ে আসত, তাকেই হত্যা করে ফেলতেন。
খালিদ রা. সর্বদা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় ও সাহায্যের জন্য উদ্‌গ্রীব থাকতেন। তাঁর মধ্যে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। আসুন, আমরা খালিদের ভাষ্যেই ইয়ামামার মৃত্যুবাগানে মুসায়লিমার এক সেনার সঙ্গে হওয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিবরণ শুনি,
যুদ্ধের একপর্যায়ে বনু হানিফার একব্যক্তি আমার গলা জাপটে ধরে। আমরা উভয়ই অশ্বারোহী ছিলাম এবং একসঙ্গে মাটিতে পড়ে যাই। মাটিতে পড়ার পরও একে অন্যকে গলা জড়ানো অবস্থায় থাকি। আমি তখন বর্শা দিয়ে তার ওপর আঘাত করি। সে-ও তার বর্শা দিয়ে আমার ওপর আঘাত হানে। এভাবে আমার গায়ে সাতটি জখম লাগে। এরপর আমি তাকে কঠিন একটা আঘাত করি। ফলে সে আমার হাতে নেতিয়ে পড়ে। জখমের ব্যথায় আমি নড়তে পারছিলাম না। শরীর থেকে প্রচুর রক্ত বয়ে যায়; কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, মৃত্যুর দুয়ারে সে আমার আগে পৌঁছে যায়।
খালিদ রা. বনু হানিফার শক্তি ও বীরত্বের স্বীকৃতি দিতে গিয়ে বলেন,
আমি বড় বড় ২০টা রণাঙ্গনে অংশ নিয়েছি; কিন্তু ইয়ামামাযুদ্ধের দিন বনু হানিফার যোদ্ধাদের থেকে অধিকতর তলোয়ারবাজ, তরবারির আঘাতের ওপর অধিকতর দৃঢ় এবং ধৈর্যশীল কাউকে পাইনি। জখমের তীব্রতায় আমি নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলি; কিন্তু এরপরও শত্রুব্যূহে ঢুকে পড়ি। একপর্যায়ে জীবন থেকে নিরাশ হয়ে মৃত্যুকে নিশ্চিত মনে করতে থাকি。

টিকাঃ
২৫২ তারতিব ওয়া তাহজিব, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খিলাফাতু আবি বাকরিন: ১১৫১।
২৫৩ আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা: ১১০।
২৫৪ আল-কামিল: ২/৩৮।
২৫৫ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খলিল: ৯৭; আল-ইকতিফা: ২/১৪।
২৫৬ হুরুবুর রিদ্দাহ: ৯৮।
২৫৭ আবকারিয়াতু খালিদ (আ-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়াহ): ৯২২।
২৫৮ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৩৫।
২৫৯ আস-সিদ্দিক আবু বাকার: ১৫৭।
২৬০ সাইফুল্লাহ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা., অনুবাদ আল আমিদুর বুকন সাবহি আল জাবি: ২০।
২৬১ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৩৬।
২৬২ তারিখুল ইয়াকুবি: ২/১০৮।
২৬৩ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ১৪৪১।
২৬৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৯।
২৬৫ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ১৮০।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে হত্যাচেষ্টা

📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে হত্যাচেষ্টা


জাহিলিয়াতের ভ্রান্তি, দুর্বলতা ও অসারতা পরিষ্কার হওয়ার পরও জাহিলদের জন্য তা সহজে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ, তাদের পুরো জীবনই তো এই ভ্রান্তিতে কেটে গেছে। এ জন্য যখনই জাহিলিয়াত-জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, তখনই তার সকল আবর্জনা উগরে দিতে চেয়েছে। তারা সত্যের বিপরীতে ততক্ষণ পর্যন্ত হাত থেকে তরবারি ফেলে রাখেনি, যতক্ষণ-না শক্তিবলে তাদের দমিয়ে রাখা হয়েছে। বাতিল কখনো সত্যের মোকাবিলায় নীরব হয়নি; বরং যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণার মাঠে নেমে এসেছে।
এর বাস্তব প্রমাণ হচ্ছে, সালমা ইবনু উমায়ের হানিফির আচরণ। লোকটা সন্ধির পরও খালিদকে হত্যা করতে উদ্ধত হয়। যদিও বনু হানিফার লোকজন মুসলিমদের সঙ্গে অঙ্গীকারে আবদ্ধ ছিল, এরপরও সে চুক্তি লঙ্ঘন করে তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। তাকে প্রথমবার যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন সে তার গোত্রের লোকদের কাছে অঙ্গীকার করে—দ্বিতীয়বার আর এমন জঘন্যতায় লিপ্ত হবে না; কিন্তু রাতে বাঁধনমুক্ত হতেই কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে খালিদকে হত্যার অভিপ্রায়ে তাঁর তাঁবুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে দেখামাত্রই চিৎকার দিয়ে উঠলে বনু হানিফার লোকজন তার পিছু ধাওয়া করে একটা বাগানে গিয়ে ধরে। সে তখন তাদের ওপর তরবারি চালাতে শুরু করে; কিন্তু বনু হানিফার লোকজন দূর থেকে পাথর ছুড়ে তাকে কাবু করে ফেলে। এরপর তার কণ্ঠনালিতে তরবারি ঠেসে ধরায় তার জীবনধমনি কেটে যায়। পরে সে একটা কূপে পড়ে মারা যায়。
এ হচ্ছে বাতিলের প্রতিরক্ষায় সত্যের বিপরীতে বিদ্বেষের একটা চিত্র。

টিকাঃ
২৬৬ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৯২।
২৬৭ তারিখুত তাবারি: ৪/১১৭-১১৮।
২৬৮ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৯২-২৯৫।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 ইরাক অভিযানে খালিদ ও আবু বকরের পরিকল্পনা

📄 ইরাক অভিযানে খালিদ ও আবু বকরের পরিকল্পনা


ইরতিদাদি ফিতনার কারণে আরব উপদ্বীপে যে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়েছিল, আবু বকরের সুদূরপ্রসারী চিন্তাক্ষমতার গুণে তা উৎপাটিত হয় এবং তাঁর দক্ষ নেতৃত্বের কারণে মুসলিমরা ধারাবাহিক বিজয় অর্জন করতে থাকেন। ফিতনা দমনের লক্ষ্যে সংঘটিত হওয়া এসব যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামি শাসনব্যবস্থা স্থিতিশীল এবং অরাজকতা দূর হয়। এরপর তিনি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেন, যে পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন খোদ রাসুল।
আবু বকর রা. ইরাক বিজয়ের জন্য দুটি বাহিনী গঠন করেন। প্রথম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে এবং দ্বিতীয় বাহিনীর ইয়াজ ইবনু গানাম রা.-কে। আর ইরাকে খালিদের সহযোগী হিসেবে মুসান্না ইবনুল হারিসাকে নিযুক্ত করেন।
* প্রথম বাহিনীর সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. তখন ইয়ামামায় অবস্থান করছিলেন। আবু বকর রা. তাঁকে লিখে পাঠান—তিনি যেন দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ইরাকের ওপর চড়াও হন। চিঠিতে তাঁকে নির্দেশ দেন, 'তুমি ইরাকের ঢালু এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে আল-আবলা থেকে অভিযান শুরু করবে। সেখানকার লোকজনকে প্রথমে নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। তাদের আল্লাহর পথে ডাকবে। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তো ভালো, অন্যথায় জিজয়া-কর প্রদান করতে বলবে। এতে রাজি না হলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।'
এ ছাড়া তিনি তাঁকে এই নির্দেশও দেন, কাউকে তোমার সঙ্গে যেতে বাধ্য করবে না। যারা ইতিপূর্বে ইরতিদাদের শিকার হয়েছিল, তারা যদিও ইসলামগ্রহণ করে, তবু তাদের সহায়তা নেবে না। যে এলাকার পাশ দিয়ে পথ চলবে, সেখানকার মুসলিমদের সেনাদলে যোগ করে নেবে।
এরপর আবু বকর রা. খালিদ ইবনু ওয়ালিদের জন্য বাহিনী গঠনের প্রতি মনোনিবেশ করেন।
* অপর বাহিনী ছিল ইয়াজ ইবনু গানামের নেতৃত্বাধীন। তিনি তখন নিবাজ ও হিজাজের মধ্যখানে অবস্থান করছিলেন। আবু বকর রা. তাঁকে লেখেন, 'তুমি উত্তর-পূর্বাঞ্চল হয়ে ইরাকে প্রবেশের চেষ্টা করো। আর মাসিখ থেকে অভিযান শুরু করো। এরপর ইরাকের উঁচুভূমি হয়ে খালিদের সঙ্গে যোগ দাও।' তিনি তাঁকে এ কথাও লিখে পাঠান, 'যারা তাদের বাড়িঘরে ফিরতে চায়, তাদের অনুমতি দেবে। জোরপূর্বক কাউকে সঙ্গী বানাবে না। কেউ যার ইচ্ছা করলে যুদ্ধে যাবে; অথবা তার বাড়ি ফিরে যাবে।
আবু বকর রা. অপর এক চিঠিতে খালিদ ও ইয়াজকে লেখেন, 'এরপর উভয়ে মিলে হিরার দিকে এগিয়ে যাবে। যে সেখানে আগে পৌঁছবে, সে তার সাথির আমির বিবেচিত হবে।' তিনি আরও লেখেন, 'তোমরা যখন হিরায় একত্রিত হবে এবং পারসিকদের সেনাঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে দেবে, তখন তোমাদের একজন হিরার মুসলিমদের এবং নিজ সাথিদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সেখানেই থেকে যাবে; আর অপরজন আল্লাহর শত্রু পারসিকদের মূল কেন্দ্র মাদায়েনের ওপর আক্রমণ করবে।
মুসান্না ইবনুল হারিসা আবু বকরের কাছে গিয়ে তাঁকে পারস্যবাসীর বিরুদ্ধে জিহাদের প্রতি উৎসাহ দিতে থাকেন। তাঁকে বলেন, 'আপনি আমাকে আমার জাতির প্রতি পাঠিয়ে দিন।' আবু বকর তা-ই করেন। মুসান্না ইরাকে ফিরেই যুদ্ধ শুরু করেন। এরপর তিনি তাঁর ভাই মাসউদ ইবনুল হারিসাকে আবু বকরের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠান। আবু বকর তখন মাসউদের মাধ্যমেই মুসান্নাকে লেখেন, 'আমি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে ইতিমধ্যেই ইরাকের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছি। তুমি তোমার সঙ্গীদের নিয়ে তাঁকে স্বাগত জানাবে। তাঁর সঙ্গ দেবে, সাহায্য করবে। তাঁর কোনো নির্দেশ অমান্য করবে না, সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাবে না। কেননা, সে এমন ব্যক্তি, যাঁদের ব্যাপারে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, “মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সাহাবিরা কাফিরদের প্রতি কঠোর; কিন্তু নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তাঁদের রুকু ও সিজদাবনত দেখতে পাবেন।” [সুরা ফাতহ: ২৯] যতক্ষণ সে তোমার সঙ্গে থাকবে, ততক্ষণ সে-ই তোমার আমির বিবেচিত হবে। যখন সে তোমার কাছ থেকে চলে যাবে, তখন তুমি তোমার আগের অবস্থানে থাকবে。
মাজউর ইবনু আদি নামে মুসান্নার এক স্বগোত্রীয় তাঁর থেকে পৃথক হয়ে আবু বকরের সঙ্গে আলাদাভাবে পত্রযোগাযোগ গড়ে তোলে। সে লিখে পাঠায়,
আমি বনু আজালের সদস্য। আমি কখনো ঘোড়ার পিঠ থেকে পৃথক হই না। একেবারে ভোরেই শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। আমার সঙ্গে আছে আমার বংশের লোকজন, যাদের একজনই শতজনের চেয়ে ভারী।
আমি এই দেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞ। আমি রণাঙ্গনের এক বাহাদুর। আমার রয়েছে এই ভূখণ্ডের ভৌগোলিক প্রচুর জ্ঞান। আপনি আমাকে ইরাকযুদ্ধের অধিনায়ক নিযুক্ত করুন। ইনশাআল্লাহ, আমি তা জয় করে ফেলব।
এদিকে মুসান্না ইবনুল হারিসা শায়বানিও মাজউর সম্পর্কে আবু বকরের কাছে চিঠি পাঠান। তিনি লেখেন,
আমি আল্লাহর রাসুলের খলিফাকে জানাতে চাই, আমার গোত্রের শাখা আজালের মাজউর ইবনু আদি অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে আমার বিরোধিতায় নেমেছে। তাই এ ব্যাপারে আপনাকে অবহিত করে রাখা প্রয়োজন মনে করছি, যাতে আপনি যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
আবু বকর রা. মাজউর ইবনু আদির চিঠির জবাবে লেখেন,
আমি তোমার চিঠি পেয়েছি। তুমি যা বলতে চেয়েছ, তা বুঝতে পেরেছি। তুমি তেমনই, যেমনটা চিঠিতে বলেছ। তোমার গোত্রও একটা উত্তম গোত্র। তোমার ব্যাপারে আমার নির্দেশ হচ্ছে, তুমি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে চলে যাও। তাঁর সঙ্গেই অবস্থান করো। যতদিন ইরাকে থাকবে, ততদিন তাঁর সঙ্গেই থাকবে। যখন সে ইরাক থেকে রওনা হয়ে যাবে, তুমিও তাঁর সঙ্গে চলে আসবে।
আর মুসান্না ইবনুল হারিসাকে লেখেন,
তোমার চিঠির সঙ্গে আমার কাছে আজালির পক্ষ থেকেও চিঠি এসে পৌঁছেছে। চিঠিতে সে অনেক কিছুর আবদার করেছে। আমি তাকে এর জবাবে বলে দিয়েছি, যতক্ষণ-না তার ব্যাপারে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছি, ততক্ষণ সে যেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সহযোগী হয়ে থাকে। আর এই চিঠির মাধ্যমে তোমার প্রতি আমার নির্দেশ হচ্ছে, খালিদ যতক্ষণ ইরাক থেকে অন্যত্র চলে না যায়, ততক্ষণ তুমি সেখানেই থাকবে। সে ইরাক ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তুমি পুনরায় তোমার পদ সামলে নেবে। জানি, তুমি এর চেয়েও অধিকতর যোগ্যতা ও মর্যাদার অধিকারী।
উল্লিখিত বিবরণ থেকে আমরা বেশকিছু শিক্ষা ও উপদেশ নিতে পারি। যেমন:

টিকাঃ
'আবলা' বসরার প্রাচীনতম একটি শহর। আরব উপসাগরে শাতিল আরবের নিকটবর্তী। এখানে ছিল কিসরার একটি সেনাক্যাম্প।
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৪১।
এটি মক্কা ও বসরার মধ্যবর্তী একটি বস্তি।
শাম-সীমান্তে ইরাকের নিকটবর্তী একটি জায়গা।
২৭৩ আল-ফাল্গুল আসকারিয়িল ইসলামি: ড. ইয়াসিন সুয়াইদ : ৮৩; তারিখুত তাবারি: ৪/১৬২।
২৭৪ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৩।
২৭৫ আল-ওয়াসায়িকুস সিয়াসিয়া, হামিদুল্লাহ: ৩৭১।
২৭৬ মাজমুআতুল ওয়াসায়িকিস সিয়াসিয়া: ৩৭২।
২৭৭ প্রাগুক্ত: ৩৭২-৩৭৩।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে ইরাকের দিকে প্রেরণ

📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে ইরাকের দিকে প্রেরণ


এ অভিযান ১২ হিজরিতে হয়েছিল। অপর এক বর্ণনায় ১২ হিজরির মুহাররামের কথা বলা হয়েছে。
১. আবু বকরের রণকৌশল আবু বকর রা. তাঁর উভয় সেনাপতি খালিদ ও ইয়াজ রা.-কে যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, এটা তাঁর উন্নত সামরিক প্রজ্ঞা এবং যুদ্ধাভিজ্ঞতার প্রমাণ বহন করে। তিনি তাঁদের কৌশলপূর্ণ দক্ষতা ও সামরিক শিক্ষা দেন। ভৌগোলিক সুবিধা বিবেচনা করে দুই সেনাপতিকে দু-দিক থেকে ইরাকে প্রবেশের নির্দেশ দেন। তাঁর এ নির্দেশনা থেকে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন হিজাজের সামরিক অপারেশনকক্ষে বসে নেতৃত্ব পরিচালনা করছিলেন। তাঁর সামনে যেন রয়েছে ইরাকের ভৌগোলিক মানচিত্র, যে মানচিত্রে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত রয়েছে রাস্তাঘাটসহ উঁচু-নিচু ভূমি। তিনি খালিদকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, তিনি যেন ইরাকের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে প্রবেশ করেন। এরপর ঢালুভূমি 'আবলা'য় গিয়ে পৌঁছান। আর ইয়াজকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, তিনি যেন ইরাকে উঁচুভূমির পূর্ব-উত্তর থেকে প্রবেশ করে মাসিখে যান। পাশাপাশি উভয়ের প্রতি সমন্বিত নির্দেশ ছিল, ইরাকের মধ্যাঞ্চলে গিয়ে তাঁরা যেন একত্রিত হন। সঙ্গে এই নির্দেশনা দিতেও ভুল করেননি যে, জোরপূর্বক কাউকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে যেন বাধ্য করা না হয়। তাঁর কাছে সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিষয়টা ছিল ঐচ্ছিক বিষয়।
২. সামরিক গুরুত্ব বিবেচনায় 'হিরা'কে নির্বাচন সামরিক কৌশল ও অবস্থানগত গুরুত্ব বিবেচনায় আবু বকর রা. হিরা দখলের অভিপ্রায় লালন করতেন। হিরার অবস্থান কুফা থেকে দক্ষিণে তিন মাইল দূরে এবং নাজাফ থেকে দক্ষিণ-পূর্বে অশ্বারোহীদের জন্য এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। এই মানচিত্রের ওপর যে-কেউ তাকালে প্রথম দৃষ্টিতেই হিরার অবস্থানগত গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে। হিরা যোগাযোগমাধ্যমের এমন এক কেন্দ্রস্থল ছিল, যেখানে এসে মিলিত হয়েছে সব পথ। এখান থেকে পূর্বে ফোরাত নদী হয়ে যেমন মাদায়েন যাওয়া যায়, তেমনি উত্তরে 'হায়ত' এবং 'আনবারে'ও পৌঁছা যায়। এ ছাড়া এখান থেকে একটা রাস্তা পশ্চিম দিকে একেবারে শাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। একইভাবে অপর রাস্তা বসরার আবলায় গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর বাইরে সাওয়াদের 'কিসকার' এবং দিজলার তীরবর্তী 'নুমানিয়া'র সঙ্গেও হিরার ভালো যোগাযোগব্যবস্থা ছিল। এসব বিবেচনায় হিরা দখলের গুরুত্ব সহজে অনুমেয়।
আবু বকর রা. উভয় সেনাপতির জন্য এই ভূখন্ডকে টার্গেট বানানোর নির্দেশ দিতে অত্যন্ত সুচিন্তিত ও সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। হিরা ছিল ইরাকের কলিজাসদৃশ। সর্বোপরি এটা ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েনের একেবারে নিকটবর্তী। পারস্যবাসীও হিরার গুরুত্ব সম্পর্কে ছিল সম্যক অবগত। তাই তারা এর দখল ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত সেনাদল পাঠাচ্ছিল। তারা জানত, হিরা যাদের দখলে থাকবে, তাদের জন্য ফুরাতের পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সহজ হয়ে যাবে। এ ছাড়া শামে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে হিরা মুজাহিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
হিরা বিজয়ের লক্ষ্যে সেখান পর্যন্ত পৌঁছতে আবু বকরের পরিকল্পনা ছিল আধুনিক যুদ্ধ-পরিকল্পনার মতো। অর্থাৎ, চারদিক থেকে বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে অবরুদ্ধ করে নেওয়ার বাস্তব উদাহরণ। এ থেকে প্রমাণিত হয়, যুদ্ধের মাধ্যমে ইরাক ও জাজিরাতুল আরবের বিভিন্ন অঞ্চলকে মুসলিম অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলা আচমকা কোনো ঘটনা ছিল না। গবেষক ও তথ্যসন্ধানীরা দেখতে পাবে, আবু বকরের পরিকল্পনা ছিল উন্নত বিবেচনাবোধ ও দূরদর্শিতাসমৃদ্ধ। তাঁর বিস্ময়কর সেনাবিন্যাস, সেনাপতি ও বাহিনীকে সঠিক পথপ্রদর্শন, তাদের কর্তব্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ, তাদের সাহায্য প্রদান, তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধের ময়দানে ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব প্রদানসহ অন্যান্য বিষয়ে ছিল অনন্য প্রজ্ঞা ও অগাধ দক্ষতা। তিনি সবকিছু সেনাপতিদের ওপর চাপিয়ে দিতেন না। সামরিক কাজকর্মে তাঁদের স্বাধীনতা দিতেন। প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনায় সময়-সুযোগমতো যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের অনুমতি দিতে মোটেও কার্পণ্য করতেন না。
৩. মুসান্না ইবনুল হারিসার বিনয় ও নম্রতা ইরাকযুদ্ধে মুসান্না ইবনুল হারিসার অবস্থান ছিল অত্যন্ত আলোকময়। তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে ইরাকে যুদ্ধরত ছিলেন। আবু বকর রা. বিষয়টা জানতে পেরে তাঁকে সেখানকার সেনাপতি নিযুক্ত করেন। এটা হচ্ছে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইরাকে পৌঁছার আগের কথা; কিন্তু তিনি যখন পারস্য সাম্রাজ্যের ওপর আক্রমণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজের জন্য একমাত্র খালিদ ইবনুল ওয়ালিদই যোগ্যতম ব্যক্তি বিবেচিত হচ্ছিলেন। এ জন্য খালিদকে সেনাপতি নিযুক্ত করে মুসান্না রা.-কে লিখে পাঠান—'তুমি খালিদের সঙ্গে যোগ দেবে। তাঁর আনুগত্য করবে।' নির্দেশ পেয়েই মুসান্না কোনো দ্বিধা ছাড়াই দ্রুত খালিদের বাহিনীতে যোগ দেন। মুসান্নার এ অবস্থান সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তাঁর বাহিনীর সেনাধিক্য এবং খালিদের আগে থেকে ইরাকযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের ব্যাপারটা তাঁকে প্রতারিত করতে পারেনি। নেতৃত্বের প্রশ্নে খালিদ থেকে তিনি যোগ্যতর ছিলেন, এমন অহমিকারও শিকার হননি。
৪. জিহাদ বিষয়ে আবু বকরের সাবধানতা আবু বকর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ও ইয়াজ ইবনু গানাম রা.-কে জোর দিয়ে এই নির্দেশ দেন—'আমার পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত যারা মুরতাদবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিয়েছে এবং নবিজির ইনতিকালের পর ইসলামে অটল থেকেছে, সেনাদলে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেবে। আর যারা কোনো একসময় ইরতিদাদের শিকার হয়েছিল এবং বর্তমানে ইসলামে অটল রয়েছে, ইরাকযুদ্ধে তাদের অংশ নেওয়ার সুযোগ দেবে না।' এ কারণে ইরাকযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে এমন কেউ যোগদানের সুযোগ পায়নি। পরে যখন তারা ইসলামের ব্যাপারে একনিষ্ঠ হয়ে যায়, তখন পরবর্তী অভিযানসমূহে তারাও শরিক হয়। শীঘ্রই এ সংক্রান্ত বর্ণনা আসছে। আবু বকরের এ সিদ্ধান্ত ছিল যুদ্ধের ব্যাপারে সাবধানতার অনুপম স্বাক্ষর, যাতে দুর্বল বিশ্বাসীরা যুদ্ধে অংশ নিয়ে দৃঢ় বিশ্বাসীদের দুর্বল করে তোলা ও তাদের মধ্যে বিক্ষিপ্ততা ছড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠতে না পারে। আবু বকর এ শিক্ষা খোদ রাসুল থেকে গ্রহণ করেছিলেন। নবিজির শিক্ষা ছিল, সেনাবাহিনীকে সব ধরনের ত্রুটি থেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তাদের সবার লক্ষ্য হতে হবে এক ও অভিন্ন এবং সেটা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। এভাবে ভিন্ন মত ও ভিন্ন লক্ষ্যের কারণে যে মতবিরোধ তৈরি হয়, তা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আবু বকর রা. উন্নত ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি অবলম্বনে আগ্রহী ছিলেন। এ ছাড়া সে সময় মুসলিমবাহিনীর জন্য সেনার প্রয়োজন বেশি থাকলেও এই পদক্ষেপ তাঁর অসীম ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার স্পষ্ট দলিল। কারণ, তাঁর কাছে মূল বিষয় ছিল নিষ্ঠা; সংখ্যাগরিষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ছিল না。
৫. মানুষের সঙ্গে নম্রতা এবং ইরাকের কৃষকদের ব্যাপারে উপদেশ
আবু বকর রা. খালিদ রা.-কে বলেছিলেন, 'পারসিকসহ সেখানে যেসব জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে, তাদের আপন করে নাও।' তাঁর এ কথার মাধ্যমে জিহাদের মূল লক্ষ্য পরিষ্কার হয়ে যায়। মূলত, জিহাদ হচ্ছে একটি দাওয়াতি কাজ। এর লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা। যেহেতু কাফির সরকারের মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছানো সম্ভব নয়, এ জন্য সেই সরকারকে হটিয়ে দেওয়া জরুরি; যাতে মানুষের কাছে ইসলামের আহ্বান তুলে ধরতে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে।
সাহাবিদের যুদ্ধগুলোতে এই উদ্দেশ্য ছিল একেবারে স্পষ্ট। প্রথমে তাঁরা মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতেন। ইসলাম কবুল করে নিলে সর্বক্ষেত্রে তারা মুসলিমদের মতো সার্বিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। মুসলিমদের মতোই তাদের ওপর ইসলামের বিধিবিধান আরোপ হতো। পক্ষান্তরে ইসলামি শাসনব্যবস্থা মেনে নিয়েও যদি কুফরে অটল থাকত, তাহলে নির্দিষ্ট পরিমাণ জিজয়া আদায় করতে হতো। জিজয়া আদায়ের ফলে তাদের জানমালের নিরাপত্তা মুসলিমদের দায়িত্বে চলে আসত। যদি তা-ও গ্রহণ না করত, তাহলে আল্লাহর বাণী উঁচু না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া হতো。
উভয় সেনাপতির প্রতি আবু বকরের নির্দেশ ছিল, তাঁরা যেন ইরাকের কৃষক ও সাওয়াদবাসীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করেন। এ থেকেই বোঝা যায়, তিনি মানুষের হিদায়াত এবং ঘরবাড়ি ও সম্পদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কতটা দরদি ও আগ্রহী ছিলেন। আপনারা নিশ্চয় জেনে থাকবেন যে, কোনো শহর ও জনপদই সরকার-ব্যবস্থাপনার বর্তমানে টিকে থাকতে পারে না। একইভাবে কৃষি হচ্ছে সম্পদের উৎস। মানুষের জীবনের সঙ্গে কৃষির রয়েছে গভীর সম্পৃক্ততা。
৬. 'সে বাহিনী পরাজিত হতে পারে না, যে বাহিনীতে ওর মতো লোক রয়েছে'
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ইরাক যাওয়ার পথে আবু বকরের কাছে সাহায্য চাইলে তিনি কা'কা ইবনু আমর তামিমিকে তাঁর সাহায্যে পাঠিয়ে দেন। তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়, 'আপনি বিক্ষিপ্ত একটা বাহিনীর নেতার সাহায্যে মাত্র একজনকে পাঠালেন?' উত্তরে তিনি বলেন, 'সে বাহিনী পরাজিত হতে পারে না, যে বাহিনীতে ওর (কা'কা ইবনু আমর) মতো লোক রয়েছে। এ ছিল তাঁর অন্তর্দৃষ্টির উদাহরণ। তাঁর এ নির্বাচনের যথার্থতা ইরাকের পরবর্তী যুদ্ধসমূহে প্রকাশ পেয়েছিল। আবু বকর রা. মানুষ এবং তাদের মধ্যকার শক্তি ও নানাবিধ যোগ্যতা অনুধাবনের ক্ষেত্রে অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন。

টিকাঃ
২৭৮ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৪৭।
২৭৯ আল-ফাযলুল আসকারিয়িল ইসলামি: ৮৩-৮৪।
২৮০ মাআরিকু খালিদিবনিল ওয়ালিদ জিদ্দাল ফুরুসি, আবদুল জাব্বার আস সামরায়ি: ৩৫।
২৮১ আবু বকরিনিস সিদ্দিক, নাজার আল হাদিসি ও খালিদ আল জুনাবি: ৪৫।
২৮২ মাশাহিরুল খুলাফা ওয়াল উমারা আস-সিদ্দিক, বিসাম আল আসালি: ১২৭।
২৮৩ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩০।
২৮৪ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৩।
২৮৫ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩১।
২৮৬ তারিখুত তাবারি: ৪/১৫৯।
২৮৭ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩০১।
২৮৮ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ৩৪২।
২৮৯ তারিখুত তাবারি: ৪/১৬৩।
২৯০ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১২৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00