📄 খালিদবাহিনীর সেনাবিন্যাস
খালিদ মুসায়লিমার সঙ্গে আকরিবায় যুদ্ধে জড়ানোর আগে মিকনাফ ইবনু জায়েদ ও তাঁর ভাই হুরাইসকে প্রথমসারির অধিনায়ক নিযুক্ত করেন, যাতে তাঁরা যুদ্ধ-সংক্রান্ত জরুরি তথ্য সরবরাহ করতে পারেন। সেনাসারি বিন্যস্ত করার সময় ছিল একেবারে নিকটে। অবস্থা ছিল খুবই গুরুতর। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ ছিল অনিবার্য। যুদ্ধের পতাকাবাহী ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু হাফস ইবনু গানিম রা.। এরপর তা আবু হুজায়ফার গোলাম সালিমের কাছে অর্পণ করা হয়। আরবদের মধ্যে এই প্রবাদ বিখ্যাত ছিল—'লোকজন নিজেদের পতাকাতলে সমবেত থাকে, পতাকা পড়ে গেলে মানুষও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।'
খালিদ এই যুদ্ধে শুরাহবিল ইবনু হাসানাকে আগে রেখে দেন এবং বাহিনীকে মোট পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন। সম্মুখসারিতে ছিলেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ মাখজুমি, ডান বাহুতে আবু হুজায়ফা, বাম বাহুতে শুজা, মধ্যখানে জায়েদ ইবনুল খাত্তাব এবং অশ্বারোহী বাহিনীতে উসামা ইবনু জায়েদ রা.। উটগুলোকে রাখেন সবার পেছনে। এগুলোর ওপর ছিল তাঁদের তাঁবু। নারীরাও তাতে আরোহী ছিলেন। এ ছিল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের শেষ সারিবিন্যাস।
টিকাঃ
২৪৫ প্রাগুক্ত: ২/১৪৫; ফান্নু ইদারাতিল মারিকা, মুহাম্মাদ ফারাজ: ১৩৮-১৪০。
২৪৬ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ১৯৯-২০০。
📄 চূড়ান্ত যুদ্ধ
উভয় বাহিনী মাঠে নেমে এলে মুসায়লিমা তার বাহিনীর উদ্দেশে একটা ভাষণ দেয়। সে তাদের বলে, 'আজ আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিন। আজ তোমরা হেরে গেলে ওরা তোমাদের নারীদের ধরে নিয়ে বিয়ে করবে। তবে এ বিয়ে তাদের জন্য সুখকর ভবিষ্যৎ নিয়ে আসবে না। তাই বংশমর্যাদা রক্ষার জন্য দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাও। নিজেদের নারীদের সম্ভ্রম হিফাজত করো।'
খালিদ রা. মুসলিমবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। সেখানে এমন একটা টিলায় ওঠেন, যেটা থেকে পুরো ইয়ামামা শহর পর্যবেক্ষণ করা যেত। সেখানেই তাঁর বাহিনীকে থামিয়ে দেন। এর পরপরই মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। প্রথম আক্রমণে মুসলিমবাহিনী পরাজিত হয়। বনু হানিফার যোদ্ধারা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের তাঁবুতে ঢুকে পড়ে। তারা উম্মু তামিমকে হত্যা করতে উদ্ধত হলে মুজ্জাআ তাঁকে বাঁচিয়ে নেয়। সে তাদের বলে, 'তিনি একজন সম্ভ্রান্ত ও স্বাধীন নারী।'
তারা যদিও খালিদের তাঁবুতে ঢুকে পড়েছিল; কিন্তু এ সময় তাদের বড় ক্ষতি হয়ে যায়। তাদের নেতা রাজ্জাল ইবনু উনফুয়াকে হত্যা করে ফেলা হয়। তাকে হত্যা করেন জায়েদ ইবনুল খাত্তাব রা.। সাহাবিরা একজন অপরজনকে উত্তেজিত করার পাশাপাশি পিছিয়ে যাওয়ার ওপর তীব্র সমালোচনা করতে থাকেন। সাবিত ইবনু কায়েস ইবনু শাম্মাস বলেন, 'তোমরা তোমাদের সঙ্গীদের কতই-না মন্দকাজে অভ্যস্ত করে নিয়েছ।' চতুর্দিক থেকে একই আওয়াজ আসছিল— 'খালিদ, আমাদের কাছে আসুন।' ইতিমধ্যে মুহাজির ও আনসারদের একটা দল এসে পৌঁছায়। তাঁদের এই আগমন মুসলিমবাহিনীর জন্য আত্মরক্ষার মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বনু হানিফা তখন প্রচণ্ড বীরত্বের সঙ্গে লড়ছিল। সাহাবিরা একজন অপরজনকে অসিয়ত করে বলছিলেন, 'হে সুরায়ে বাকারাওয়ালারা, আজ জাদু ভেঙে গেছে।' সাবিত ইবনু কায়েস তাঁর শরীরে সুগন্ধি মেখে কাফন জড়িয়ে নেন। এরপর নিজের পা মাটিতে পুঁতে আনসারদের পতাকা হাতে সেখানে দৃঢ়তার সঙ্গে অবস্থান করেন। শেষপর্যন্ত তিনি সেখানেই শাহাদাতবরণ করেন। মুহাজিররা আবু হুজায়ফার গোলাম সালিমকে বলেন, 'আপনি কি এই আশঙ্কা করছেন যে, আপনার দিক থেকে শত্রুরা হামলে পড়তে পারে?' সালিম রা. বলেন, 'এমন হলে আমি নিজেকে কুরআনের একজন অযোগ্য ধারক মনে করব।' জায়েদ ইবনুল খাত্তাব রা. বলছিলেন, 'লোকজন, তোমরা দাঁতে দাঁত চেপে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। তীব্রবেগে সামনে অগ্রসর হও।' এরপর বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি তাদের পরাজিত করা অথবা আল্লাহর দরবারে পৌঁছা অবধি কোনো কথা বলব না।' অবশেষে তিনিও সেখানে শাহাদাতের পেয়ালায় চুমুক দেন।
আবু হুজায়ফা বলছিলেন, 'কুরআন ধারণকারীরা, তোমরা নিজেদের কাজের মাধ্যমে কুরআনকে সাজিয়ে তুলো।' এরপর তিনি শত্রুবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের পিছু হটান এবং নিজেও আহত হন।
এদিকে খালিদ ক্ষুধার্ত বাঘের মতো হামলা চালিয়ে শত্রুসারি তছনছ করে এগোতে থাকেন। তিনি সরাসরি মুসায়লিমার দিকে এগোচ্ছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, তিনি নিজেই মুসায়লিমার মোকাবিলা করে তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেবেন। খালিদ উভয় বাহিনীর মধ্যখানে দাঁড়িয়ে সিংহের মতো গর্জন ছেড়ে বলেন, 'আমি ওয়ালিদের পুত্র খালিদ, আমি আমর ও জায়েদের সন্তান।' এরপর তিনি মুসলিমদের যুদ্ধ-সংকেত 'ইয়া মুহাম্মাদাহ' শব্দ উচ্চারণ করেন。
শত্রুবাহিনীর যে-ই তাঁর দিকে এগিয়ে আসছিল, তাকেই জাহান্নামে পাঠাচ্ছিলেন। খালিদ মুহাজির ও আনসারদের বেদুইনদের থেকে পৃথক রেখেছিলেন। প্রত্যেক গোত্রের হাতে ছিল তাদের নিজস্ব পতাকা। বিপদ কোন দিক থেকে এগিয়ে আসছে, বোঝার জন্য তারা পতাকাগুলোর পাশে জমে লড়াই করছিলেন।
সাহাবিরা এই যুদ্ধে অচিন্তনীয় দৃঢ়তা ও ধৈর্যের প্রমাণ দেন। তাঁরা বার বার শত্রুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। শেষপর্যন্ত আল্লাহ মুসলিমদের বিজয়দানে ধন্য করেন। কাফিররা তখন পালিয়ে যেতে থাকে। মুসলিমরা তাদের পিছু ধাওয়া করে ইচ্ছামতো হত্যা করেন। তাদের ঘাড়ে মুহুর্মুহু তরবারি চলছিল। একপর্যায়ে তারা হাদিকাতুল মাউতে (মৃত্যু- বাগানে) আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। মুহকাম ইবনু তুফায়েল তাদের ওই বাগানে প্রবেশ করার ইঙ্গিত করে। অভিশপ্ত মুসায়লিমাও সেখানে আশ্রয় নেয়। আবদুর রাহমান ইবনু আবি বকর রা. দেখতে পান, মুহকাম সেখানে তাদের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছে। তিনি তির ছুড়ে তাকে হত্যা করে ফেলেন। তার মৃত্যুর পর তার গোত্রের লোকেরা বনু হানিফার বাগানে আশ্রয় নেয়। পরে সাহাবিরা চারদিক থেকে বাগানটা অবরোধ করেন。
টিকাঃ
২৪৭ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৮。
২৪৮ এটি ছিল একটি সামরিক নিদর্শন, যা এই যুদ্ধে গ্রহণ করা হয়েছিল। এটি ফরিয়াদ কিংবা সাহায্যপ্রার্থনা হিসেবে ছিল না। - সংকলক。
২৪৯ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৯。
📄 বারা ইবনু মালিকের ভীষণ শপথ
বারা ইবনু মালিক রা. বলেন, 'হে মুজাহিদ ভাইয়েরা, আমাকে বাগানের ভেতর ছুড়ে দাও।' সাহাবিরা তাঁকে ঢালে উঠিয়ে বর্শার সাহায্যে দেয়ালের ওপারে পৌঁছে দেন। তিনি বীরত্বের সঙ্গে লড়ে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দরজা খুলে দেন। ফলে মুসলিমবাহিনী তীব্রবেগে বাগানে ঢুকে পড়ে। তাঁরা ভেতরে পৌঁছেই বাগানের সব দরজা খুলে দেন।
মুরতাদরা তখন মুসলিমদের ঘেরাওয়ে পড়ে ভাবে, এবার আর বাঁচতে পারবে না। সত্য এসে পড়েছে, বাতিল বিলীন হয়ে গেছে。
টিকাঃ
২৫০ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খলিল: ৯২।
📄 মুসায়লিমাতুল কাজ্জাবকে হত্যা
মুসলিমরা মুরতাদদের হত্যা করতে করতে একেবারে মুসায়লিমার নিকটবর্তী হয়ে যান। তার বাহিনীর শোচনীয় অবস্থা দেখে সে রাগে পাগলের মতো হয়ে একটা দেয়ালের ভাঙা অংশের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষার উপায় খুঁজছিল। শয়তান যখন তার ওপর সওয়ার হতো, তখন মুখ দিয়ে ফেনা বেরোতে থাকত। এ অবস্থায় উহুদযুদ্ধে হামজা রা.-কে শহিদকারী জুবায়ের ইবনু মুতয়িমের হাবশি গোলাম ওয়াহশি রা. মুসায়লিমাকে দেখতে পেয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যান। একপর্যায়ে তাঁর সেই বিখ্যাত বর্শা ছুঁড়ে মারেন। বর্শাটা মুসায়লিমার বুকের একদিকে লেগে অপরদিকে বেরিয়ে যায়। এরপর দ্রুত আবু দুজানা সিমাক ইবনু খারশা তার দিকে অগ্রসর হন। তিনি তরবারি দিয়ে আঘাত করলে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পাশের এক মহল থেকে এক মহিলা মুসায়লিমাকে হত্যার এই দৃশ্য দেখে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে 'সৌন্দর্যের প্রতীক আমিরকে এক কৃষ্ণকায় গোলাম হত্যা করে ফেলেছে!'
যুদ্ধের ময়দান ও বাগান সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার মুরতাদ নিহত হয়। এক বর্ণনামতে, এ সংখ্যা ছিল ২১ হাজার। আর শাহাদাতপিয়াসি মুসলিমের সংখ্যা ছিল ৬০০। অন্য এক বর্ণনায় শহিদের সংখ্যা ৫০০ ছিল বলে উল্লেখ হয়েছে (আল্লাহই ভালো জানেন)। শহিদদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় সাহাবিরাও ছিলেন।
এরপর খালিদ রা. নিহতদের পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে বের হন। মুজ্জাআ ইবনু মুরারা তাঁর পেছনে পেছনে শেকলবন্দি হয়ে চলছিল। তিনি তার মাধ্যমে নিহতদের মধ্যে মুসায়লিমার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলেন। রাজ্জাল ইবনু উনফুয়ার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খালিদ জিজ্ঞেস করেন, 'এ লোকটা কি মুসায়লিমা?' সে বলে, 'না, এ হচ্ছে রাজ্জাল ইবনু উনফুয়া। সে তার থেকে অনেক ভালো।' এরপর হলদেরাঙা চ্যাপ্টা নাকবিশিষ্ট লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে জিজ্ঞেস করেন, 'এ-ই নিশ্চয় তোমাদের নেতা? আল্লাহ এর আনুগত্যের কারণে তোমাদের ধ্বংস করেছেন।' এরপর খালিদ রা. অশ্বারোহী বাহিনীকে ইয়ামামার আশেপাশে ছড়িয়ে দেন, যেন তারা সেখানকার দুর্গসমূহ এবং সেগুলোর আশপাশ থেকে মালসামানা ও বন্দিদের নিয়ে আসেন。
টিকাঃ
২৫১ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৩০।