📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খালিদবাহিনীর মোকাবিলায় মুসায়লিমার সেনাবিন্যাস

📄 খালিদবাহিনীর মোকাবিলায় মুসায়লিমার সেনাবিন্যাস


মুসায়লিমাতুল কাজ্জাব খালিদের বাহিনীর আগমন সম্পর্কে অবহিত হলে ইয়ামামার আকরিবা এলাকায় বাহিনী প্রস্তুত করে। ইয়ামামাবাসী তখন দলে দলে তার কাছে জড়ো হয় এবং সে লোকজনকে খালিদের মোকাবিলায় উদ্দীপ্ত করে। মুসায়লিমা তার বাহিনীর ডান ও বামে যথাক্রমে মুহকাম ইbনু তুফায়েল ও রাজ্জাল ইবনু উনফুয়াকে সেনাপতি নিযুক্ত করে।
এদিকে খালিদ রা. ইকরিমা ও শুরাহবিলের সঙ্গে মিলিত হন। অগ্রবাহিনীতে ছিলেন শুরাহবিল ইবনু হাসানা; আর সেনাবাহিনীর ডান ও বাম বাহুতে ছিলেন যথাক্রমে জায়েদ ইবনুল খাত্তাব ও আবু হুজায়ফা ইবনু উতবা ইবনু রাবিআ。

টিকাঃ
২৩৯ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৮০।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 মুজ্জাআ ইবনু মুরারা হানাফির গ্রেপ্তারি

📄 মুজ্জাআ ইবনু মুরারা হানাফির গ্রেপ্তারি


- ৪০ অথবা ৬০ জন অশ্বারোহীর একটা বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিল মুজ্জাআ ইবনু মুরারা হানাফি। পথিমধ্যে তাদের সঙ্গে খালিদের অগ্রবর্তী বাহিনীর অকস্মাৎ দেখা হয়ে যায়। মুজ্জাআর এই বাহিনী মূলত বনু তামিম ও বনু আমির থেকে প্রতিশোধ নিতে বেরিয়েছিল। পথে মুসলিমরা তাদের গ্রেপ্তার করে খালিদের দরবারে নিয়ে আসে। খালিদ তাদের বলেন, 'তোমরা কী বলো?' তারা উত্তর দেয়, 'আমরা বলি, একজন নবি তোমাদের থেকে আর একজন আমাদের থেকে!' এমন উত্তর শুনে তাদের সবাইকে তিনি হত্যা করেন。
অন্য বর্ণনামতে, খালিদ তাদের জিজ্ঞেস করেন, 'তোমরা আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েছ?' তারা বলে, 'আপনাদের উপস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা ছিল না। আমরা তো বনু তামিম ও আমির থেকে প্রতিশোধ নিতে বেরিয়েছি।' খালিদ তাদের কথা বিশ্বাস করেননি। তিনি মুসায়লিমার গোয়েন্দা ভেবে তাদের সবাইকে হত্যা করে ফেলেন। যখন তাদের হত্যা করা হচ্ছিল, তখন তারা মুজ্জাআর দিকে ইশারা করে বলে, 'আপনি ইয়ামামাবাসীর সঙ্গে কল্যাণ বা অকল্যাণ যা-ই চান না কেন, এর জন্য আমাদের নেতা মুজ্জাআকে বাঁচিয়ে রাখুন।' তিনি তাদের কথামতো মুজ্জাআকে বাঁচিয়ে রেখে বাকিদের হত্যা করেন。
মুজ্জাআ ছিল বনু হানিফার সরদার। সে অভিজাত ও অনুসরণীয় ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এরপর খালিদ রা. যেখানেই অবস্থান করতেন, তাকে পাশে ডাকতেন। তাকে সঙ্গে নিয়ে খাবার খেতেন, কথাবার্তা বলতেন। একদিন বলেন, 'মুসায়লিমা সম্পর্কে কিছু বলো! সে কি তোমাকে কিছু পড়ে শোনাত? তার কোনো কথা তোমার স্মরণ আছে?' মুজ্জাআ বলে, 'হ্যাঁ, অবশ্যই স্মরণ আছে।' এরপর সে মুসায়লিমার মুখে শোনা প্রাণোদ্দীপক কিছু কবিতা আবৃত্তি করে। খালিদ তখন নিজের এক হাত অন্য হাতের উপর মেরে বলতে থাকেন, 'মুসলিমরা, শোনো, সে কীভাবে কুরআনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।' এরপর বলেন, 'মুজ্জাআ, তুমি একজন সরদার ও বুদ্ধিমান লোক। অতএব, আগে আল্লাহর কালাম শোনো, এরপর দেখো আল্লাহর এই শত্রু কীভাবে তাঁর কালামের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়। পরে খালিদ তাঁকে 'সুরা আলা' তিলাওয়াত করে শোনান।
তিলাওয়াত শোনার পর মুজ্জাআ বলে, 'বাহরাইনের একব্যক্তি ছিল মুসায়লিমার কাতিব। মুসায়লিমা তাকে একেবারে ঘনিষ্ঠ বানিয়ে নিয়েছিল। অন্য কেউ তার এত ঘনিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সে একদিন আমাদের কাছে এসে বলে, “হে ইয়ামামাবাসী, তোমাদের ধ্বংস হোক। আল্লাহর শপথ, তোমাদের সাথি মিথ্যাবাদী। আমার ধারণা, এতে তোমরা আমাকে অপবাদ আরোপকারী বলবে না। তোমরা জানো তার কাছে আমার মর্যাদা কোথায়; কিন্তু আল্লাহর শপথ, সে তোমাদের সঙ্গে মিথ্যা বলছে। তোমাদের কাছ থেকে অন্যায়ের ওপর বায়আত নিচ্ছে।””
খালিদ বলেন, 'এরপর এই বাহরাইনি লোকটা কী করল?' মুজ্জাআ বলে, 'তার কাছ থেকে পালিয়ে যায়।' খালিদ বলেন, 'এই মিথ্যাবাদীর আরও কিছু মিথ্যা বর্ণনা করো।' মুজ্জাআ তখন উদ্দীপনাময়ী তার আরও কিছু পঙ্ক্তি তুলে ধরে। এসব শুনে খালিদ তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কি এগুলো বিশ্বাস করো? এগুলোকে হক মনে করো?' সে উত্তর দেয়, 'এগুলো যদি আমাদের কাছে সত্য মনে না হতো, তাহলে কাল আপনার বিরুদ্ধে ১০ হাজার তরবারি জমায়েত হতো না।' খালিদ বলেন, 'তোমাদের মোকাবিলায় আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনিই তাঁর দীনকে বিজয়ী করবেন। তারা আমাদের বিরুদ্ধে নয়; আল্লাহর দীনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তাঁর দীনকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে。
জবাবটি খালিদের দৃঢ় ইমান এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার স্পষ্ট দলিল। আল্লাহর ওপর অটল ইমান এবং দীনের ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্যের ওপর শর্তহীন নির্ভরতার এই গুণ দুটিই খালিদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে সামরিক সক্ষমতা এবং নেতৃপর্যায়ের দক্ষতার জন্ম দিয়েছিল। বুজাখাযুদ্ধে তিনি দুটি তরবারি নিয়ে যুদ্ধ চালিয়েছিলেন। একপর্যায়ে উভয় তরবারি ভেঙে গিয়েছিল। তাঁর অন্তর ইমানে পরিপূর্ণ। আল্লাহর ওপর ছিল অগাধ আস্থা। যে কারণে তিনি নিজেকে শক্তিমান অনুভব করতেন। তাঁর অন্তর ছিল শত্রুদের থেকে ভয়শূন্য। আর শত্রুর অন্তর থাকত আল্লাহর ভীতিতে পরিপূর্ণ। এটিই ছিল বিজয় ও সাহায্য অর্জন এবং শত্রুকে ধ্বংস করার প্রথম কারণ。

টিকাঃ
২৪০ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৮।
২৪১ তারিখুত তাবারি: ৪/১০৬; আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা: ১০৫।
২৪২ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৮২।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 সম্মুখসমর বা সরাসরি যুদ্ধ

📄 সম্মুখসমর বা সরাসরি যুদ্ধ


খালিদ রা. লড়াইয়ের আগে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানোর পরিকল্পনা নেন। সুতরাং জিয়াদ ইবনু লাবিদকে তাঁর একসময়ের বন্ধু ইয়ামামার সরদার মুহকাম ইবনু তুফায়েলকে নিজের দিকে টেনে আনতে পাঠিয়ে দেন। খালিদ বলেন, 'যদি তুমি মুহকামকে এমন কোনো জিনিস পাঠাও, যার মাধ্যমে তাকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে পারো, তাহলে ভালো।' জিয়াদ তাকে নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিগুলো লিখে পাঠান,
যদি অশ্বারোহী মুজাহিদরা বর্শাসহ ইয়ামামামায় প্রবেশ করে
তাহলে ইয়ামামায় অনিঃশেষ যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।
আল্লাহর শপথ, বর্শার অগ্রপ্রান্ত তোমাদের থেকে ফিরে থাকবে না
যতক্ষণ-না তোমারা কওমে আদ ও সামুদের মতো বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
একইভাবে খালিদ আগেই ইসলামগ্রহণ করা উমায়ের ইবনু সালিহ ইয়াশকুরির দিকে দৃষ্টি দেন। তিনি ছিলেন ইমানে সুদৃঢ় এবং বিশ্বাসে পাক্কা; কিন্তু তিনি তাঁর ইমান গোপন রাখছিলেন। খালিদ তাঁকে বলেছিলেন, 'তুমি তোমার গোত্রের কাছে যাও।' উমায়ের তাদের কাছে গিয়ে বলেন, 'খালিদ মুহাজির ও আনসারদের নিয়ে তোমাদের কাছে এসে গেছেন। আমি তাঁদের এমন জাতি হিসেবে দেখেছি, তোমরা যদি ধৈর্যের মাধ্যমে তাঁদের ওপর বিজয়ী হতে চাও, তাহলে তাঁরা আল্লাহর সাহায্য নিয়ে তোমাদের ওপর বিজয়ী হবে। আর যদি সংখ্যার দিক দিয়ে বিজয়ী হতে চাও, তাহলে তাঁরা আল্লাহর সহায়তা নিয়ে তোমাদের ওপর বিজয়ী হবে। তোমরা ও তাঁরা কোনো অবস্থায়ই সমান নও। ইসলাম এখানে অবশ্যই পৌঁছবে। অবশ্যই শিরক বিদূরিত হবে। তাঁদের সঙ্গী সত্যিকার নবি আর তোমাদের সঙ্গী মিথ্যুক। তাঁদের সঙ্গে আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, তোমাদের সঙ্গে আছে কেবল অহংকার। এখনো তরবারি খাপে আছে, তির তৃণীরে আছে। তরবারি তার খাপ থেকে উন্মুক্ত হওয়ার আগে, তির তৃণীর থেকে বেরোনোর আগে বাস্তবতা স্বীকার করে নাও।'
এরপর খালিদ রা. সুমামা ইবনু উসালের সঙ্গে মিলিত হন। তিনিও তাঁর জাতির কাছে যান। তাদের আনুগত্যের দাওয়াত দেন। তাদের ভেতর থেকে যুদ্ধের পাগলামি বের করে দিতে বলেন, 'দুই নবি একত্রে থাকতে পারেন না। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ-এর পর কোনো নবি নেই, তাঁর সঙ্গেও কোনো নবি নেই। আবু বকর তোমাদের কাছে এমন মানুষ পাঠিয়েছেন, যাঁকে তাঁর মা-বাবার রাখা নামে ডাকা হয় না; “সাইফুল্লাহ” ডাকা হয়। তাঁর সঙ্গে আছে অগণিত তরবারি। অতএব, তোমরা নিজেদের নিয়ে চিন্তা করো।'
খালিদ রা. সুদৃঢ় পরিকল্পনা করেন। তিনি শত্রুবাহিনীকে দুর্বল মনে করেননি। রণাঙ্গনে সর্বদা চৌকশ থাকতেন, যাতে কোনো অসতর্ক মুহূর্তে শত্রু আক্রমণ করে বসতে না পারে, নতুন কোনো চক্রান্ত আঁটতে না পারে। তাঁর অনন্য এক গুণ ছিল, নিজে বিশ্রাম না নিয়ে অন্যকে বিশ্রামের সুযোগ দিতেন। পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রাতযাপন করতেন। তাঁর কাছে শত্রুর কোনো বিষয়ই অস্পষ্ট থাকত না।

টিকাঃ
২৪৩ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২১৮-২১৯。
২৪৪ আল-হারবুন নাফসিয়াহ, আহমাদ নাওফাল: ১৪৪-১৪৫。

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খালিদবাহিনীর সেনাবিন্যাস

📄 খালিদবাহিনীর সেনাবিন্যাস


খালিদ মুসায়লিমার সঙ্গে আকরিবায় যুদ্ধে জড়ানোর আগে মিকনাফ ইবনু জায়েদ ও তাঁর ভাই হুরাইসকে প্রথমসারির অধিনায়ক নিযুক্ত করেন, যাতে তাঁরা যুদ্ধ-সংক্রান্ত জরুরি তথ্য সরবরাহ করতে পারেন। সেনাসারি বিন্যস্ত করার সময় ছিল একেবারে নিকটে। অবস্থা ছিল খুবই গুরুতর। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ ছিল অনিবার্য। যুদ্ধের পতাকাবাহী ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু হাফস ইবনু গানিম রা.। এরপর তা আবু হুজায়ফার গোলাম সালিমের কাছে অর্পণ করা হয়। আরবদের মধ্যে এই প্রবাদ বিখ্যাত ছিল—'লোকজন নিজেদের পতাকাতলে সমবেত থাকে, পতাকা পড়ে গেলে মানুষও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।'
খালিদ এই যুদ্ধে শুরাহবিল ইবনু হাসানাকে আগে রেখে দেন এবং বাহিনীকে মোট পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন। সম্মুখসারিতে ছিলেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ মাখজুমি, ডান বাহুতে আবু হুজায়ফা, বাম বাহুতে শুজা, মধ্যখানে জায়েদ ইবনুল খাত্তাব এবং অশ্বারোহী বাহিনীতে উসামা ইবনু জায়েদ রা.। উটগুলোকে রাখেন সবার পেছনে। এগুলোর ওপর ছিল তাঁদের তাঁবু। নারীরাও তাতে আরোহী ছিলেন। এ ছিল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের শেষ সারিবিন্যাস।

টিকাঃ
২৪৫ প্রাগুক্ত: ২/১৪৫; ফান্নু ইদারাতিল মারিকা, মুহাম্মাদ ফারাজ: ১৩৮-১৪০。
২৪৬ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ১৯৯-২০০。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00