📄 বনু হানিফার যারা ইসলামে অটল ছিলেন
ইয়ামামায় মুসায়লিমাতুল কাজ্জাবের ইরতিদাদের সংবাদ বেশ প্রসার লাভ করে। ফলে ইয়ামামার, বিশেষ করে বনু হানিফার খাঁটি মুসলিমদের ইসলামে দৃঢ় থাকার সংবাদটা এর নিচে চাপা পড়ে যায়। এ জন্য অধিকাংশ নতুন ইতিহাসবিদ তাদের কোনো আলোচনাই করেন না, যাঁরা সেই কঠিন মুহূর্তে ইসলামে দৃঢ়পদ ছিলেন। ফিতনার বিরুদ্ধে নিজেদের সীমিত সামর্থ্যে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ফিতনাকে গুঁড়িয়ে দিতে খিলাফতের পক্ষ থেকে আগত বাহিনীর সঙ্গ দিয়েছিলেন। আমি এমনকিছু গ্রহণযোগ্য বর্ণনা খুঁজে পেয়েছি, যা এই বাস্তবতার কথা বলে। যেগুলো আজও অধিকাংশ মানুষের কাছে অজানা。
১. সুমামা ইবনু উসাল হানাফি ইবনু আসামের বর্ণনা, ইয়ামামায় দৃঢ়পদ ব্যক্তিদের শীর্ষে ছিলেন সুমামা ইবনু উসাল হানাফি রা.। তিনি ছিলেন বনু হানিফার একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। লোকজন যখন জানতে পারেন, খালিদ রা. মুসায়লিমাকে দমনের জন্য ধেয়ে আসছেন, তখন তাঁরা সুমামার পাশে জড়ো হতে থাকে। সুমামা ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী। ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারঙ্গম ব্যক্তি। ইরতিদাদের প্রশ্নে ছিলেন মুসায়লিমার ঘোর বিরোধী। এ প্রসঙ্গে তিনি মুসায়লিমার সঙ্গী-সাথিদের যেসব কথাবার্তা বলেছিলেন, সেগুলোতে এ ভাষণটি ছিল অন্যতম-
হে বনু হানিফা, আমার কথা শোনো, তোমরা সফল হবে। আমার অনুসরণ করো, সত্য পথ পাবে। জেনে রেখো, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর প্রেরিত নবি। তাঁর নবুওয়াত সন্দেহের ঊর্ধ্বে। মুসায়লিমা আপাদমস্তক মিথ্যাবাদী। তার কথা আর মিথ্যা কাহিনি শুনে ধোঁকা খেয়ো না। তোমরা সেই কুরআন শুনেছ, যা মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, 'হা-মিম। কুরআন নাজিল হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে, যিনি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ। পাপ ক্ষমাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা ও সামর্থ্যবান। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।' [সুরা মুমিন: ১-৩]
কোথায় আল্লাহর কালাম, আর কোথায় মুসায়লিমার প্রলাপ! উভয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে? তোমরা নিজেদের ব্যাপারে চিন্তা করো এবং এ থেকে বিমুখ হয়ো না। সাবধান হয়ে যাও, আমি রাতেই নিজের জানমাল ও পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার লক্ষ্যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে যাচ্ছি।
বনু হানিফার হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকজন উত্তরে বলে, 'আবু আমির, আমরা আপনার সঙ্গে আছি, থাকব।' এরপর সুমামা রা. রাতের আঁধারে বনু হানিফার কতিপয় লোককে নিয়ে খালিদের কাছে চলে যান। তাঁর কাছে নিরাপত্তা কামনা করেন। খালিদ রা. সুমামা ও তাঁর সঙ্গী-সাথিদের নিরাপত্তা দেন। কিলায়ির বর্ণনামতে, তাঁর এ কথাটিও বর্ণিত হয়েছে যে, 'মুহাম্মাদ ﷺ-এর সঙ্গে কিংবা তাঁর পরে কোনো নবি নেই।' এরপর তিনি মুসায়লিমার ধারণাপ্রসূত কুরআনের কিছু উদ্ধৃতি পেশ করেন, যাতে এর অসারতা, মিথ্যা ও দুর্বলতা ফুটে ওঠে। এ প্রসঙ্গে সুমামার দিকে সংশ্লিষ্ট করা এমন কয়েকটা পঙ্ক্তি হচ্ছে,
মুসায়লিমা, তুই তোর অবস্থান থেকে ফিরে আয়! ঝগড়া করিস না, তুই কখনো আল্লাহর রাসুলের নবুওয়াতে অংশীদার নয়। ওহির ব্যাপারে তুই আল্লাহর ওপর মিথ্যাপ্রতিপাদন করছিস। তোর খাহেশ হচ্ছে কতিপয় আহাম্মকের খাহেশের মতো। তোর জাতি তোকে আশ্বাস দিচ্ছে তারা তোর নিরাপত্তা দেবে; কিন্তু খালিদের বাহিনী আসার পর তারা পালিয়ে যাবে। এমতাবস্থায় তুই না পাবি আকাশে ওঠার কোনো সিঁড়ি, না পাবি জমিনে পালিয়ে নিরাপত্তালাভের স্থান。
অন্য বর্ণনায়ও মুসায়লিমাবিরোধী যুদ্ধে ইকরিমা ইবনু আবি জাহলের সঙ্গদানে সুমামার কৃতিত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে。
সুমামা বাহরাইনের ইরতিদাদ দমনে আলা ইবনুল হাজরামির সঙ্গে আন্তরিক সঙ্গ দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে বনু হানিফার শাখা বনু সুহাইমসহ কতিপয় শাখাগোত্রের মুসলিমরা ছিলেন। ওই যুদ্ধে তিনি বীরত্বের অন্তহীন পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন。
২. মামার ইবনু কিলাব রুমানি
ইয়ামামায় সত্যে অবিচল থাকা ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন মামার ইবনু কিলাব রুমানি। তিনি মুসায়লিমা ও তার অনুসারীদের উপদেশ দেন। ইরতিদাদ থেকে বিরত থাকতে বলেন। তিনি ছিলেন সুমামার অনুসারী। ইয়ামামার যুদ্ধে খালিদের সঙ্গ দিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ইয়ামামার নেতৃস্থানীয়দের যাঁরা নিজেদের ইসলাম গোপন করে রেখেছিলেন, রাজ্জালের অন্যতম বন্ধু ইবনু আমর ইয়াশকুরি তাঁদের একজন। তিনি তখন কিছু কবিতা আবৃত্তি করেছেন, যা ইয়ামামার লোকজনের মুখে মুখে ফিরে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। কয়েকটা পঙ্ক্তি হচ্ছে,
নিঃসন্দেহে আমার দীন হচ্ছে মুহাম্মাদের দীন জাতির অনেক মানুষ আমার মতোই সত্যের ওপর দৃঢ় রয়েছে।
জাতির মধ্যে সবার চেয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে মুহকাম ইবনু তুফায়েল এবং রাজ্জালও, যারা আমাদের কাছে পুরুষ হিসেবে বিবেচিত নয়। যদি সত্য দীনের ওপর আমার মৃত্যু হয় তাহলে আমার তাতে কোনো পরোয়া নেই।
এই পঙ্ক্তিগুলো মুসায়লিমা, মুহকামসহ ইয়ামামার নেতাদের কানে গেলে তারা তাঁকে গ্রেপ্তার করতে উদ্ধত হয়; কিন্তু তিনি এর আগেই খালিদের কাছে চলে যান। সেখানে গিয়ে খালিদকে ইয়ামামাবাসীর অবস্থা জানান। এ ছাড়া তাদের গোপন কিছু বিষয় সম্পর্কেও অবহিত করেন。
একইভাবে ইয়ামামায় ইসলামের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসীদের মধ্যে আমির ইবনু মাসলামা ও তাঁর গোত্র ছিল উল্লেখযোগ্য। আবু বকর রা. ইসলামে অটল বনু হানিফার লোকদের অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন। অনেক কিছু তাঁদের উপহার দেন। মুতরিফ ইবনু নুমানকে ইয়ামামার গভর্নর নিযুক্ত করেন। মুতরিফ ছিলেন সুমামা ইবনু উসাল ও আমির ইবনু মাসলামার ভাতিজা。
টিকাঃ
২২৫ আমি এসব বর্ণনা ড. মাহদি রিজকুল্লাহর আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম গ্রন্থে খুঁজে পেয়েছি।
২২৬ আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৫১।
২২৭ প্রাগুক্ত: ৫২।
২২৮ হুরুবুর রিদ্দাহ, আল কিলায়ি: ১১৭।
২২৯ আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৫৩।
২৩০ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৬১।
২৩১ আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৫৪।
২৩২ হুরুবুর রিদ্দাহ, আল কিলায়ি: ১০৪-১০৬।
২০০ আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৫৭-৫৮।
📄 মুসায়লিমার ওপর খালিদের চড়াও হওয়া
আবু বকর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন— ‘আসাদ, গাতফান ও মালিক ইবনু নুবায়রাকে দেখে নেওয়ার পর ইয়ামামা অভিমুখে এগিয়ে যাবে।’ বিষয়টাতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করছিলেন। শারিক আল ফাজারি বলেন, বুজাখার যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিল, আমিও তাঁদের সঙ্গে ছিলাম। এরপর আমি খলিফার কাছে গেলে তিনি আমাকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে পাঠিয়ে দেন। আমার মাধ্যমে খালিদকে উদ্দেশ্য করে একটা চিঠি পাঠান, তাতে লেখা ছিল,
বার্তাবাহকের মাধ্যমে তোমার চিঠি আমার হস্তগত হয়েছে। এতে বুজাখার যুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় ও সাহায্যের কথা উল্লেখ আছে। এ ছাড়া আসাদ ও গাতফানের সঙ্গে তুমি যে ব্যবহার করেছ, তারও উল্লেখ আছে। তুমি আরও উল্লেখ করেছ, ‘আমি ইয়ামামার অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছি’; এ ক্ষেত্রে আমার উপদেশ থাকবে, এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর তাকওয়া বুকে ধারণ করবে। তোমার সঙ্গে যে-সকল মুসলিম আছেন, তাঁদের সঙ্গে পিতার মতো আচরণ করবে।
খালিদ, সাবধান, বনু মুগিরার অহংকার ও ঔদ্ধত্য থেকে বেঁচে থাকবে। আমি তোমার সম্পর্কে তাদের কথা গ্রহণ করিনি, যাদের কথা আমি কখনোই প্রত্যাখ্যান করতাম না। অতএব, তুমি যখন বনু হানিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে, তখন সাবধানতা অবলম্বন করবে। স্মরণ রাখবে, বনু হানিফার মতো শক্তিশালী কারও সঙ্গে এখনো তোমার মোকাবিলা হয়নি। এরা সবাই তোমার বিরোধী। এদের শাসনাধীন এলাকা বেশ প্রশস্ত। অতএব, সেখানে পৌঁছে বাহিনীর কমান্ড নিজের হাতে উঠিয়ে নেবে। ডান বাহুতে একজন আর বাম বাহুতে একজন নির্দিষ্ট করে রাখবে। আর অশ্বারোহীদের নেতৃত্বও ঠিক করে দেবে। তোমার সঙ্গে যে-সকল আনসার ও মুহাজির প্রবীণ সাহাবি আছেন, প্রতিনিয়ত তাঁদের পরামর্শ নেবে। তাঁদের মর্যাদাকে সম্মান জানাবে। পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ময়দানে নামবে। শত্রুবাহিনী যখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবে, তখনই তাদের ওপর হামলে পড়বে। তিরের মোকাবিলায় তির, বর্শার মোকাবিলায় বর্শা ও তরবারির মোকাবিলায় তরবারি ব্যবহার করবে। তরবারির জোরে তাদের বন্দিদের উঠিয়ে নেবে। হত্যার মাধ্যমে ভীতি ছড়িয়ে দেবে। তাদের আগুনে ঠেলে দেবে। আমার নির্দেশ অমান্য করবে না। ওয়াসসালামু আলাইকা।
চিঠিপ্রাপ্তির পর খালিদ রা. সেটা পাঠ করে বলেন, 'আমরা তাঁর কথা শুনেছি। এসব নির্দেশ অবশ্যই বাস্তবায়ন করব।'
খালিদ মুসলিমবাহিনীকে প্রস্তুত করে বনু হানিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে যান। আনসারদের নেতা নিযুক্ত হন সাবিত ইবনু কায়েস ইবনু শাম্মাস। মুরতাদদের যাদের সঙ্গেই পথে সাক্ষাৎ হতো, তিনি তাদের শিক্ষণীয় শাস্তি দিতেন। এদিকে আবু বকর খালিদের পেছন দিকের নিরাপত্তার জন্য বড় একটা সশস্ত্র বাহিনী পাঠিয়ে দেন। ইয়ামামার যাযাবর অনেক গোত্রের পাশ দিয়ে খালিদবাহিনীকে পথ চলতে হয়। সেসব গোত্রের লোকেরা মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। পথ অতিক্রমকালে খালিদ তাদের মোকাবিলা করে পুনরায় ইসলামের দিকে নিয়ে আসেন। পথে সাজাহের বিক্ষিপ্ত বাহিনীর সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তাদেরও হত্যা করে সামনের দিকে এগিয়ে যান। এরপর ইয়ামামার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন。
টিকাঃ
২০৪ শারিক আল ফাজারি রা. একজন সাহাবি। তিনি আবু বকর ও খালিদ রা.-এর মধ্যে যুদ্ধবিষয়ক পত্র আদানপ্রদানের দায়িত্বে ছিলেন।
২৩৫ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৭৮।
২৩৬ মাজমুআতুল ওয়াসায়িকিস সিয়াসিয়া: ৩৪৮-৩৪৯; হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৭৯।
২৩৭ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৭৯।
২৩৮ আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা: ১০৫।
📄 খালিদবাহিনীর মোকাবিলায় মুসায়লিমার সেনাবিন্যাস
মুসায়লিমাতুল কাজ্জাব খালিদের বাহিনীর আগমন সম্পর্কে অবহিত হলে ইয়ামামার আকরিবা এলাকায় বাহিনী প্রস্তুত করে। ইয়ামামাবাসী তখন দলে দলে তার কাছে জড়ো হয় এবং সে লোকজনকে খালিদের মোকাবিলায় উদ্দীপ্ত করে। মুসায়লিমা তার বাহিনীর ডান ও বামে যথাক্রমে মুহকাম ইbনু তুফায়েল ও রাজ্জাল ইবনু উনফুয়াকে সেনাপতি নিযুক্ত করে।
এদিকে খালিদ রা. ইকরিমা ও শুরাহবিলের সঙ্গে মিলিত হন। অগ্রবাহিনীতে ছিলেন শুরাহবিল ইবনু হাসানা; আর সেনাবাহিনীর ডান ও বাম বাহুতে ছিলেন যথাক্রমে জায়েদ ইবনুল খাত্তাব ও আবু হুজায়ফা ইবনু উতবা ইবনু রাবিআ。
টিকাঃ
২৩৯ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৮০।
📄 মুজ্জাআ ইবনু মুরারা হানাফির গ্রেপ্তারি
- ৪০ অথবা ৬০ জন অশ্বারোহীর একটা বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিল মুজ্জাআ ইবনু মুরারা হানাফি। পথিমধ্যে তাদের সঙ্গে খালিদের অগ্রবর্তী বাহিনীর অকস্মাৎ দেখা হয়ে যায়। মুজ্জাআর এই বাহিনী মূলত বনু তামিম ও বনু আমির থেকে প্রতিশোধ নিতে বেরিয়েছিল। পথে মুসলিমরা তাদের গ্রেপ্তার করে খালিদের দরবারে নিয়ে আসে। খালিদ তাদের বলেন, 'তোমরা কী বলো?' তারা উত্তর দেয়, 'আমরা বলি, একজন নবি তোমাদের থেকে আর একজন আমাদের থেকে!' এমন উত্তর শুনে তাদের সবাইকে তিনি হত্যা করেন。
অন্য বর্ণনামতে, খালিদ তাদের জিজ্ঞেস করেন, 'তোমরা আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েছ?' তারা বলে, 'আপনাদের উপস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা ছিল না। আমরা তো বনু তামিম ও আমির থেকে প্রতিশোধ নিতে বেরিয়েছি।' খালিদ তাদের কথা বিশ্বাস করেননি। তিনি মুসায়লিমার গোয়েন্দা ভেবে তাদের সবাইকে হত্যা করে ফেলেন। যখন তাদের হত্যা করা হচ্ছিল, তখন তারা মুজ্জাআর দিকে ইশারা করে বলে, 'আপনি ইয়ামামাবাসীর সঙ্গে কল্যাণ বা অকল্যাণ যা-ই চান না কেন, এর জন্য আমাদের নেতা মুজ্জাআকে বাঁচিয়ে রাখুন।' তিনি তাদের কথামতো মুজ্জাআকে বাঁচিয়ে রেখে বাকিদের হত্যা করেন。
মুজ্জাআ ছিল বনু হানিফার সরদার। সে অভিজাত ও অনুসরণীয় ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এরপর খালিদ রা. যেখানেই অবস্থান করতেন, তাকে পাশে ডাকতেন। তাকে সঙ্গে নিয়ে খাবার খেতেন, কথাবার্তা বলতেন। একদিন বলেন, 'মুসায়লিমা সম্পর্কে কিছু বলো! সে কি তোমাকে কিছু পড়ে শোনাত? তার কোনো কথা তোমার স্মরণ আছে?' মুজ্জাআ বলে, 'হ্যাঁ, অবশ্যই স্মরণ আছে।' এরপর সে মুসায়লিমার মুখে শোনা প্রাণোদ্দীপক কিছু কবিতা আবৃত্তি করে। খালিদ তখন নিজের এক হাত অন্য হাতের উপর মেরে বলতে থাকেন, 'মুসলিমরা, শোনো, সে কীভাবে কুরআনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।' এরপর বলেন, 'মুজ্জাআ, তুমি একজন সরদার ও বুদ্ধিমান লোক। অতএব, আগে আল্লাহর কালাম শোনো, এরপর দেখো আল্লাহর এই শত্রু কীভাবে তাঁর কালামের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়। পরে খালিদ তাঁকে 'সুরা আলা' তিলাওয়াত করে শোনান।
তিলাওয়াত শোনার পর মুজ্জাআ বলে, 'বাহরাইনের একব্যক্তি ছিল মুসায়লিমার কাতিব। মুসায়লিমা তাকে একেবারে ঘনিষ্ঠ বানিয়ে নিয়েছিল। অন্য কেউ তার এত ঘনিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সে একদিন আমাদের কাছে এসে বলে, “হে ইয়ামামাবাসী, তোমাদের ধ্বংস হোক। আল্লাহর শপথ, তোমাদের সাথি মিথ্যাবাদী। আমার ধারণা, এতে তোমরা আমাকে অপবাদ আরোপকারী বলবে না। তোমরা জানো তার কাছে আমার মর্যাদা কোথায়; কিন্তু আল্লাহর শপথ, সে তোমাদের সঙ্গে মিথ্যা বলছে। তোমাদের কাছ থেকে অন্যায়ের ওপর বায়আত নিচ্ছে।””
খালিদ বলেন, 'এরপর এই বাহরাইনি লোকটা কী করল?' মুজ্জাআ বলে, 'তার কাছ থেকে পালিয়ে যায়।' খালিদ বলেন, 'এই মিথ্যাবাদীর আরও কিছু মিথ্যা বর্ণনা করো।' মুজ্জাআ তখন উদ্দীপনাময়ী তার আরও কিছু পঙ্ক্তি তুলে ধরে। এসব শুনে খালিদ তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কি এগুলো বিশ্বাস করো? এগুলোকে হক মনে করো?' সে উত্তর দেয়, 'এগুলো যদি আমাদের কাছে সত্য মনে না হতো, তাহলে কাল আপনার বিরুদ্ধে ১০ হাজার তরবারি জমায়েত হতো না।' খালিদ বলেন, 'তোমাদের মোকাবিলায় আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনিই তাঁর দীনকে বিজয়ী করবেন। তারা আমাদের বিরুদ্ধে নয়; আল্লাহর দীনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তাঁর দীনকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে。
জবাবটি খালিদের দৃঢ় ইমান এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার স্পষ্ট দলিল। আল্লাহর ওপর অটল ইমান এবং দীনের ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্যের ওপর শর্তহীন নির্ভরতার এই গুণ দুটিই খালিদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে সামরিক সক্ষমতা এবং নেতৃপর্যায়ের দক্ষতার জন্ম দিয়েছিল। বুজাখাযুদ্ধে তিনি দুটি তরবারি নিয়ে যুদ্ধ চালিয়েছিলেন। একপর্যায়ে উভয় তরবারি ভেঙে গিয়েছিল। তাঁর অন্তর ইমানে পরিপূর্ণ। আল্লাহর ওপর ছিল অগাধ আস্থা। যে কারণে তিনি নিজেকে শক্তিমান অনুভব করতেন। তাঁর অন্তর ছিল শত্রুদের থেকে ভয়শূন্য। আর শত্রুর অন্তর থাকত আল্লাহর ভীতিতে পরিপূর্ণ। এটিই ছিল বিজয় ও সাহায্য অর্জন এবং শত্রুকে ধ্বংস করার প্রথম কারণ。
টিকাঃ
২৪০ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৮।
২৪১ তারিখুত তাবারি: ৪/১০৬; আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা: ১০৫।
২৪২ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৮২।