📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 মুসায়লিমাতুল কাজ্জাব ও বনু হানিফা

📄 মুসায়লিমাতুল কাজ্জাব ও বনু হানিফা


১. পরিচিতি ও ভূমিকা
তার নাম মুসায়লিমা ইবনু সুমামা ইবনু কাবির ইবনু হাবিব হানাফি। উপনাম আবু শামাহ। সে ছিল নবুওয়াতের দাবিদারদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ। মিথ্যাবাদিতায় তার বেশ নামডাক ছিল। মানুষ উপমাস্বরূপ বলত 'লোকটা মুসায়লিমার চেয়েও বড় মিথ্যাবাদী।' ইয়ামামার একটা ছোট্ট বস্তিতে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এলাকাটা বর্তমানে জাবালিয়া নামে পরিচিত। এটা নাজদের উয়াইনার পার্শ্ববর্তী ওয়াদিউল হানিফিয়াতে অবস্থিত। জাহিলি যুগে তার উপাধি ছিল রাহমান। সে 'রাহমানুল ইয়ামামা' নামে খ্যাত ছিল。
আরব-অনারবে ভ্রমণ করে লোকজনকে আকর্ষণের বিদ্যা ভালো করেই রপ্ত করে নিয়েছিল। পূজারি, পুরোহিত, ভবিষ্যদ্বক্তা, গণক, জ্যোতিষী, জাদুকর, ঐন্দ্রজালিক ব্যক্তি এবং জিনের মক্কেলদের কাছ থেকে এসব কু-জ্ঞান অর্জন করেছিল। তার ইন্দ্রজালের মধ্যে একটা ছিল—পাখির কাটা পাখা তার ডানায় জুড়ে দিতে পারত, ডিমকে বোতলে ভরে নিতে পারত। মুসায়লিমা রাসুলের জীবদ্দশায়ই নবুওয়াতের দাবি করে। সে কুরআন শুনে আসতে লোকজনকে মক্কায় পাঠাত, যেন কুরআনের মতো কথা তৈরি করতে পারে; কিংবা একেই তার কথা বলে চালিয়ে দিতে পারে。
নবম হিজরিতে ইসলাম পুরো জাজিরাতুল আরবে ছড়িয়ে পড়লে মুসায়লিমাও বনু হানিফার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মদিনায় আসে। মানুষ তাকে তাদের কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল। সে যখন রাসুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কথাবার্তা বলে, তখন রাসুলের হাতে ছিল খেজুরগাছের একটা কাণ্ড। নবিজি তাকে বলেছিলেন, 'তুমি যদি আমার কাছে মূল্যহীন খেজুরগাছের এই কাণ্ডটাও চাও, তথাপি এটা আমি তোমাকে দেবো না। এ থেকে এটাই প্রকাশ পায় যে, সে হয়তো নবুওয়াতে অংশীদারত্ব কিংবা তাঁর পরে খিলাফতের দাবি জানিয়েছিল।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, মুসায়লিমা প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে নবিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেনি; বরং কাফেলার মালসামানা দেখাশোনার জন্য পেছনে থেকে গিয়েছিল। নবিজি প্রতিনিধিদলকে কিছু উপহার দিলে তাকেও তাদের সমান অংশ দেন। এরপর তাদের বলেন, 'সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ নয়, সে তোমাদের মালসামানার নিরাপত্তা দিচ্ছে। প্রথম বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়, সে ছিল সন্দেহভাজন ব্যক্তি; যে কারণে তাকে কাপড় দিয়ে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল। সে তার ভেতরে অনেক কিছু লুকিয়ে রেখেছিল, যা ছিল বাস্তবতাবিবর্জিত। সে মূলত এমনই ছিল। নবিজির উক্তি 'সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ নয়'-এর অর্থ কিন্তু এটা নয় যে, সে ভালো মানুষ ছিল; বরং নবিজির উদ্দেশ্য ছিল, তোমরা সবাই খারাপ। সে-ও তোমাদের মতোই খারাপ। ভবিষ্যতে এ সত্যই প্রকাশ পেয়েছিল। বনু হানিফার কেউ-ই ভালো ছিল না। আর তাদের নেতা মুসায়লিমাতুল কাজ্জাব তো ছিল অনিষ্টের মূল।
২. বনু হানিফার প্রতিনিধিদলের প্রত্যাবর্তন বনু হানিফার প্রতিনিধিদল রাসুলের কাছ থেকে চলে যাওয়ার পর মুসায়লিমাতুল কাজ্জাব রীতিমতো নিজেকে নবি দাবি করে বসে। সে নবিজির সঙ্গে নবুওয়াতে শরিক বলে ঘোষণা দেয়। ভণ্ডটা নবিজির এই কথাকে আড়কাঠি বানাচ্ছিল- 'সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ নয়।' মুসায়লিমা তার জাতিকে ছন্দোবদ্ধ বাক্য শোনাতে থাকে এবং ইচ্ছামতো যেকোনো বিষয়কে হালাল-হারাম ঘোষণা করতে শুরু করে। এভাবে সে তার নবুওয়াতের বগলবাদ্য বাজিয়ে চলছিল। তার কল্পিত কুরআনের আয়াতের নমুনা হচ্ছে, لقد انعم الله على الحبلى، اخرج منه نسمة لا تسعى، من بين صفاق وحشى، فمنهم من يموت ويدس الى الثرى، ومن يبقى الى اجل مسمى والله يعلم السر و اخفى. নিঃসন্দেহে আল্লাহ গর্ভবতীদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, যিনি হালকা চামড়া ও নাড়িভুঁড়ির মধ্যখান থেকে প্রাণবান সত্তার জন্ম দিয়েছেন। এদের মধ্যে কতক মরে যায়, মাটির নিচে তাদের পুঁতে রাখা হয়। আর কতক তাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বাকি থাকে। আল্লাহ গোপন বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবহিত。
يا ضفدع بنت ضفدعين نقى ما تنقين اعلاك في الماء واسفلك في الطين، لا الشارب تمنعين ولا الماء تكدرين . হে ব্যাঙদের মেয়ে ব্যাঙ, ঘ্যাঙরঘ্যাং করতে থাক। তোর মাথা পানিতে আর পাছা কাদায়। পানি পানকারীকে তুই বাধা দিস না; আর পানিও ঘোলা করিস না!
মুসায়লিমাতুল কাজ্জাব অর্থ পরিবর্তন করে কুরআনের বাচনভঙ্গি চুরি করার প্রয়াস পাচ্ছিল। সে কুরআনকে বিকৃত করতে চেয়েছিল। যেমন: তার কথা ছিল,
فسبحان الله اذا جاء الحياة فكيف تحيون؟ والى ملك السماء ترقون، فلو انها حبة خردلة لقام عليها شهيد يعلم ما في الصدور ولا كثر الناس فيها ثبور .
সুবহানাল্লাহ, যখন জীবন এসে যাবে, তখন কীভাবে জীবিত থাকবে? কীভাবে ঊর্ধ্বগামী হবে আকাশের দিকে। যদি সরিষার দানাও হয়, সে তার সামনে সাক্ষ্য দেবে যিনি অন্তর্যামী। অধিকাংশ মানুষের জন্য এতে রয়েছে ধ্বংস。
এগুলো যে অর্থহীন ও অসামঞ্জস্যে ভরপুর একধরনের প্রলাপ, তা সাধারণ কোনো মানুষের কাছেও অবোধ্য নয়। ইবনু কাসির বলেন, ইসলাম গ্রহণের আগে আমর ইবনুল আস মুসায়লিমাতুল কাজ্জাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'মুহাম্মাদের ওপর কুরআনের মধ্যে কী বিষয় নাজিল হয়?' আমর জবাব দিয়েছিলেন, 'তাঁর ওপর সুরাতুল আসর নাজিল হয়েছে।' সে বলে ওঠে, 'আমার ওপরও আল্লাহ অনুরূপ কালাম নাজিল করেছেন,
يا وبر يا وبر انما انت اذنان وصدر وسائرك حفر نقر .
হে ওবর, হে ওবর! তোমার দুই কান ও বক্ষ এবং বাকি সারা শরীর খোদাইকৃত, কুৎসিত。
আমর তখন বলেছিলেন, 'আল্লাহর শপথ হে মুসায়লিমা, জানিস আমি তোকে মিথ্যাবাদী মনে করি!'
আল্লামা ইবনু কাসির রাহ. বলেন, মুসায়লিমা তার এই প্রলাপের মাধ্যমে কুরআনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিল; কিন্তু তখনকার কোনো মূর্তিপূজারির ওপরও তার এই ভোজবাজি কোনো ফল দেয়নি。
আবু বকর বাকিল্লানি রাহ. বলেন, কুরআন হিসেবে দাবিকৃত মুসায়লিমার এসব কথাবার্তা এতটাই হাস্যকর ছিল যে, তা শ্রবণযোগ্য ছিল না। এগুলো এতই নিম্নমানের যে, তাতে চিন্তার কোনো খোরাক ছিল না। তা ছিল শ্রোতাকে কেবল ক্ষণিকের জন্য বিস্ময়ের ঘোরে ফেলে রাখার টোটকা। শিক্ষা ও উপদেশ নেওয়ার মতো কিছুই তাতে ছিল না। সর্বোপরি তা ছিল ভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ。
৩. রাসুলের নামে মুসায়লিমার চিঠি ও এর উত্তর হিজরতের দশম বর্ষে নবিজি মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলে এই দুর্মতির দুঃসাহস চরমে পৌঁছায়। নবিজিকে চিঠি পাঠিয়ে জানায়, নবুওয়াতে সে তাঁর সঙ্গে অংশীদার! চিঠিটা লিখেছিল আমর ইবনু জারুদ হানাফি এবং এর বাহক ছিল ইবনুন নাওয়াহা-খ্যাত উবাদা ইবনু হারিস হানাফি। চিঠির ভাষ্য ছিল,
আল্লাহর রাসুল মুসায়লিমার পক্ষ থেকে মুহাম্মাদুর রাসুলের নামে। অর্ধেক ভূখণ্ড আমাদের আর অর্ধেক কুরাইশিদের; কিন্তু কুরাইশরা আমাদের সঙ্গে ইনসাফ করছে না।
রাসুল জবাব দেন। উবাই ইবনু কাব জবাবটা রচনা করেন। জবাব ছিল, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আল্লাহর নবি মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে মুসায়লিমাতুল কাজ্জাবের নামে। জমিন আল্লাহর। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে ইচ্ছা এর উত্তরাধিকারী বানিয়ে থাকেন।
আর ভালো পরিণতি মুমিনদের জন্যই। যারা হিদায়াতের পথ অনুসরণ করে তাদের সালাম।
মুসায়লিমা দুজন বাহকের মাধ্যমে তার চিঠি পাঠিয়েছিল। একজন ছিল উল্লিখিত ইবনুন নাওয়াহা। নবিজি চিঠি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর তাদের বলেন, 'তোমরা কী বলো?' তারা জবাব দেয়, 'আমরা তা-ই বলি, যা মুসায়লিমা বলে থাকে।' রাসুল ﷺ তখন বলেন, 'আমি যদি দূতহত্যা সঠিক মনে করতাম, তাহলে তোমাদের ঘাড় মটকে দিতাম。
৪. নবিজির পত্রবাহক হাবিব ইবনু জায়েদ আনসারির অবস্থান উম্মু আম্মারা নাসাবিয়া বিনতু কাব মাজানিয়ার সন্তান হাবিব ইবনু জায়েদ রাসুলের চিঠি নিয়ে মুসায়লিমার কাছে যান। তিনি তার হাতে চিঠিটা তুলে দিলে সে তাঁকে জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কি এ কথার সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল?' তিনি বলেন, 'হ্যাঁ।' এরপর বলে, 'তুমি কি এ সাক্ষ্য দাও যে, আমি আল্লাহর রাসুল?' হাবিব বলেন, 'আমি বধির; শুনতে পাচ্ছি না।' মুসায়লিমা বার বার একই প্রশ্ন করছিল আর তিনিও সেই একই জবাব দিচ্ছিলেন। যখনই হাবিব থেকে তার প্রত্যাশিত উত্তর পেত না, তখনই তাঁর একটা অঙ্গ কেটে ফেলত। এভাবেই শেষপর্যন্ত হাবিব শাহাদাতের সুধা পান করেন。
একদিকে রাসুলের আচরণ দেখুন—তিনি কীভাবে অঙ্গীকার রক্ষা করছেন এবং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিকে কেমন শ্রদ্ধা দেখাচ্ছেন। তিনি তার দূতদ্বয়কে হত্যা করেননি। যদিও তারা ছিল জঘন্য শত্রু এবং ঔদ্ধত্যের সঙ্গে তাঁর সামনে কুফরির প্রকাশ ঘটিয়েছিল। অপরদিকে কাজ্জাবের আচরণ দেখুন—সে সকল অঙ্গীকার থেকে চোখ বন্ধ করে রাখে। আন্তর্জাতিক নীতির বিরোধিতা করে যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়। তা-ও সাধারণ হত্যা নয়; বরং দূতকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলেছিল। ইসলাম আর জাহিলিয়াতে পার্থক্য এখান থেকেই অনুমেয়। ইসলাম কথার মর্যাদা দেয়, মানুষের মর্যাদা দেয়। শত্রুর সঙ্গেও ভদ্রজনোচিত আচরণ এবং বীরত্বের প্রদর্শনী ঘটায়। আর জাহিলিয়াত আল্লাহর জমিনে কেবল ফ্যাসাদই বিস্তার করে। তারা প্রবৃত্তির অনুসরণ ছাড়া কিছুই বোঝে না, জানে না。

টিকাঃ
২০৭ হুরুবুর রিদ্দাহ ওয়া বিনাউদ দাওলাহ, আহমাদ সায়িদ: ১২৩; আজ-জিরকিলি: ২/১২৫।
২০৮ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৭১।
২০৯ আল-বাদউত তারিখ: ৫/১৬০; মাকদিসি কৃত হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৭১।
২১০ আস-সিরাতুন নাবাবিয়া, ইবনু হিশাম: ২/৫৭৬-৫৭৭।
২১১ প্রাগুক্ত: ২/৫৭৭।
২১২ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৭৩।
২১৩ আল-বাদউত তারিখ: ৫/১৬২, মাকদিসি।
২১৪ তারিখুত তাবারি: ৪/১০২।
২১৫ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৭১।
২১৬ 'ওবর' বিড়ালের মতো ছোট্ট একটি প্রাণী। যার কান দুটো লম্বা হয়ে থাকে। তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/৫৪৭।
২১৭ তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/৫৪৭, আল-হালাবি প্রকাশনী।
২১৮ তাফসির ইবনি কাসির: ৪/৫৪৭।
২১৯ ইজাজুল কুরআন, তাহকিক-সাইয়িদ সাকার: ১৫৬।
২২০ তারিখুত তাবারি: ৩/৩৮৬-৩৮৭।
২২১ উসদুল গাবা: ১০৪৯।
২২২ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৭৪।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 রাজ্জাল ইবনু উনফুয়া হানাফি

📄 রাজ্জাল ইবনু উনফুয়া হানাফি


বনু হানিফায় মুসায়লিমার দাওয়াত শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, তারা এই চক্রান্ত ও ধোঁকাগ্রহণের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত। কারণ, হিজরত করে নবিজির হাতে ইসলামগ্রহণকারী, তাঁর কাছে কুরআনের শিক্ষার্থী, কুরআনের বেশকিছু সুরা মুখস্থকারী রাজ্জাল ইবনু উনফুয়ার মতো ব্যক্তিও এই ফিতনার শিকারে পরিণত হয়। রাসুল তাকে মুসায়লিমার কাছে এ জন্য পাঠিয়েছিলেন যে, সে ওখানে গিয়ে মানুষকে এই ফিতনার বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত করবে, যাতে মুসায়লিমার সঙ্গী-সাথিরা তার সঙ্গ ছেড়ে সৎপথে চলে আসে; কিন্তু বিষয়টা আমূল পালটে যায়। রাজ্জাল সেখানে গিয়ে এ ঘোষণা দিতে থাকে যে, মুহাম্মাদ মুসায়লিমাকে তাঁর নবুওয়াতে শরিক করে নিয়েছেন। এই হতভাগা মানুষের জন্য মুসায়লিমার চেয়ে বড় ফitনার কারণ হয়ে উঠেছিল。
নবিজি তাঁর জীবদ্দশায়ই রাজ্জালের করুণ পরিণতির দিকে ইশারা করে যান। আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি কতিপয় লোকের সঙ্গে রাসুলের কাছে বসা ছিলাম। রাজ্জাল ইবনু উনফুয়াও ছিল আমাদের সঙ্গে। নবিজি বলেছিলেন, 'তোমাদের মধ্যে এমন এক জাহান্নামি রয়েছে, যার দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের চেয়েও বড়।' এই সমাবেশের সবাই ইনতিকাল করেছেন, কেবল আমি আর উনফুয়া জীবিত আছি। আমি ভীতিজাগানিয়া এ কথাটা শোনার পর সবসময় সন্ত্রস্ত থাকতাম। একপর্যায়ে রাজ্জাল মুসায়লিমার পক্ষ হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তার নবুওয়াত স্বীকার করে নেয়। রাজ্জালের ফিতনা ছিল মুসায়লিমার ফিতনার চেয়েও ভয়ংকর。

টিকাঃ
২২৩ প্রাগুক্ত: ৭৫। আল্লামা ইবনু কাসিরের বর্ণনামতে, রাজ্জালকে আবু বকর রা. ইয়ামামাবাসীকে ইরতিদাদি ফিতনা থেকে বিরত এবং দাওয়াতের মাধ্যমে লোকজনকে ইসলামের ওপর অটল রাখতে পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু সেখানে পৌঁছে সে মুসায়লিমার ডান হাতে পরিণত হয়ে যায়। দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৩। আর আবু হুরায়রা থেকে হাদিসটি বর্ণনা করা হয়েছে, এটিও ইবনু কাসিরের বর্ণনাকে সমর্থন করে। তার থেকে ইরতিদাদ প্রকাশ পেয়েছিল আবু বকরের যুগে।
২২৪ তারিখুত তাবারি: ৪/১০৬। তবে এ বর্ণনাটি ইবনু ইসহাক একজন অপরিচিত রাবির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তাই বর্ণনাটি সনদের দিক দিয়ে দুর্বল।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বনু হানিফার যারা ইসলামে অটল ছিলেন

📄 বনু হানিফার যারা ইসলামে অটল ছিলেন


ইয়ামামায় মুসায়লিমাতুল কাজ্জাবের ইরতিদাদের সংবাদ বেশ প্রসার লাভ করে। ফলে ইয়ামামার, বিশেষ করে বনু হানিফার খাঁটি মুসলিমদের ইসলামে দৃঢ় থাকার সংবাদটা এর নিচে চাপা পড়ে যায়। এ জন্য অধিকাংশ নতুন ইতিহাসবিদ তাদের কোনো আলোচনাই করেন না, যাঁরা সেই কঠিন মুহূর্তে ইসলামে দৃঢ়পদ ছিলেন। ফিতনার বিরুদ্ধে নিজেদের সীমিত সামর্থ্যে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ফিতনাকে গুঁড়িয়ে দিতে খিলাফতের পক্ষ থেকে আগত বাহিনীর সঙ্গ দিয়েছিলেন। আমি এমনকিছু গ্রহণযোগ্য বর্ণনা খুঁজে পেয়েছি, যা এই বাস্তবতার কথা বলে। যেগুলো আজও অধিকাংশ মানুষের কাছে অজানা。
১. সুমামা ইবনু উসাল হানাফি ইবনু আসামের বর্ণনা, ইয়ামামায় দৃঢ়পদ ব্যক্তিদের শীর্ষে ছিলেন সুমামা ইবনু উসাল হানাফি রা.। তিনি ছিলেন বনু হানিফার একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। লোকজন যখন জানতে পারেন, খালিদ রা. মুসায়লিমাকে দমনের জন্য ধেয়ে আসছেন, তখন তাঁরা সুমামার পাশে জড়ো হতে থাকে। সুমামা ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী। ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারঙ্গম ব্যক্তি। ইরতিদাদের প্রশ্নে ছিলেন মুসায়লিমার ঘোর বিরোধী। এ প্রসঙ্গে তিনি মুসায়লিমার সঙ্গী-সাথিদের যেসব কথাবার্তা বলেছিলেন, সেগুলোতে এ ভাষণটি ছিল অন্যতম-
হে বনু হানিফা, আমার কথা শোনো, তোমরা সফল হবে। আমার অনুসরণ করো, সত্য পথ পাবে। জেনে রেখো, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর প্রেরিত নবি। তাঁর নবুওয়াত সন্দেহের ঊর্ধ্বে। মুসায়লিমা আপাদমস্তক মিথ্যাবাদী। তার কথা আর মিথ্যা কাহিনি শুনে ধোঁকা খেয়ো না। তোমরা সেই কুরআন শুনেছ, যা মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, 'হা-মিম। কুরআন নাজিল হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে, যিনি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ। পাপ ক্ষমাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা ও সামর্থ্যবান। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।' [সুরা মুমিন: ১-৩]
কোথায় আল্লাহর কালাম, আর কোথায় মুসায়লিমার প্রলাপ! উভয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে? তোমরা নিজেদের ব্যাপারে চিন্তা করো এবং এ থেকে বিমুখ হয়ো না। সাবধান হয়ে যাও, আমি রাতেই নিজের জানমাল ও পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার লক্ষ্যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে যাচ্ছি।
বনু হানিফার হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকজন উত্তরে বলে, 'আবু আমির, আমরা আপনার সঙ্গে আছি, থাকব।' এরপর সুমামা রা. রাতের আঁধারে বনু হানিফার কতিপয় লোককে নিয়ে খালিদের কাছে চলে যান। তাঁর কাছে নিরাপত্তা কামনা করেন। খালিদ রা. সুমামা ও তাঁর সঙ্গী-সাথিদের নিরাপত্তা দেন। কিলায়ির বর্ণনামতে, তাঁর এ কথাটিও বর্ণিত হয়েছে যে, 'মুহাম্মাদ ﷺ-এর সঙ্গে কিংবা তাঁর পরে কোনো নবি নেই।' এরপর তিনি মুসায়লিমার ধারণাপ্রসূত কুরআনের কিছু উদ্ধৃতি পেশ করেন, যাতে এর অসারতা, মিথ্যা ও দুর্বলতা ফুটে ওঠে। এ প্রসঙ্গে সুমামার দিকে সংশ্লিষ্ট করা এমন কয়েকটা পঙ্ক্তি হচ্ছে,
মুসায়লিমা, তুই তোর অবস্থান থেকে ফিরে আয়! ঝগড়া করিস না, তুই কখনো আল্লাহর রাসুলের নবুওয়াতে অংশীদার নয়। ওহির ব্যাপারে তুই আল্লাহর ওপর মিথ্যাপ্রতিপাদন করছিস। তোর খাহেশ হচ্ছে কতিপয় আহাম্মকের খাহেশের মতো। তোর জাতি তোকে আশ্বাস দিচ্ছে তারা তোর নিরাপত্তা দেবে; কিন্তু খালিদের বাহিনী আসার পর তারা পালিয়ে যাবে। এমতাবস্থায় তুই না পাবি আকাশে ওঠার কোনো সিঁড়ি, না পাবি জমিনে পালিয়ে নিরাপত্তালাভের স্থান。
অন্য বর্ণনায়ও মুসায়লিমাবিরোধী যুদ্ধে ইকরিমা ইবনু আবি জাহলের সঙ্গদানে সুমামার কৃতিত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে。
সুমামা বাহরাইনের ইরতিদাদ দমনে আলা ইবনুল হাজরামির সঙ্গে আন্তরিক সঙ্গ দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে বনু হানিফার শাখা বনু সুহাইমসহ কতিপয় শাখাগোত্রের মুসলিমরা ছিলেন। ওই যুদ্ধে তিনি বীরত্বের অন্তহীন পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন。
২. মামার ইবনু কিলাব রুমানি
ইয়ামামায় সত্যে অবিচল থাকা ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন মামার ইবনু কিলাব রুমানি। তিনি মুসায়লিমা ও তার অনুসারীদের উপদেশ দেন। ইরতিদাদ থেকে বিরত থাকতে বলেন। তিনি ছিলেন সুমামার অনুসারী। ইয়ামামার যুদ্ধে খালিদের সঙ্গ দিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ইয়ামামার নেতৃস্থানীয়দের যাঁরা নিজেদের ইসলাম গোপন করে রেখেছিলেন, রাজ্জালের অন্যতম বন্ধু ইবনু আমর ইয়াশকুরি তাঁদের একজন। তিনি তখন কিছু কবিতা আবৃত্তি করেছেন, যা ইয়ামামার লোকজনের মুখে মুখে ফিরে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। কয়েকটা পঙ্ক্তি হচ্ছে,
নিঃসন্দেহে আমার দীন হচ্ছে মুহাম্মাদের দীন জাতির অনেক মানুষ আমার মতোই সত্যের ওপর দৃঢ় রয়েছে।
জাতির মধ্যে সবার চেয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে মুহকাম ইবনু তুফায়েল এবং রাজ্জালও, যারা আমাদের কাছে পুরুষ হিসেবে বিবেচিত নয়। যদি সত্য দীনের ওপর আমার মৃত্যু হয় তাহলে আমার তাতে কোনো পরোয়া নেই।
এই পঙ্ক্তিগুলো মুসায়লিমা, মুহকামসহ ইয়ামামার নেতাদের কানে গেলে তারা তাঁকে গ্রেপ্তার করতে উদ্ধত হয়; কিন্তু তিনি এর আগেই খালিদের কাছে চলে যান। সেখানে গিয়ে খালিদকে ইয়ামামাবাসীর অবস্থা জানান। এ ছাড়া তাদের গোপন কিছু বিষয় সম্পর্কেও অবহিত করেন。
একইভাবে ইয়ামামায় ইসলামের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসীদের মধ্যে আমির ইবনু মাসলামা ও তাঁর গোত্র ছিল উল্লেখযোগ্য। আবু বকর রা. ইসলামে অটল বনু হানিফার লোকদের অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন। অনেক কিছু তাঁদের উপহার দেন। মুতরিফ ইবনু নুমানকে ইয়ামামার গভর্নর নিযুক্ত করেন। মুতরিফ ছিলেন সুমামা ইবনু উসাল ও আমির ইবনু মাসলামার ভাতিজা。

টিকাঃ
২২৫ আমি এসব বর্ণনা ড. মাহদি রিজকুল্লাহর আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম গ্রন্থে খুঁজে পেয়েছি।
২২৬ আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৫১।
২২৭ প্রাগুক্ত: ৫২।
২২৮ হুরুবুর রিদ্দাহ, আল কিলায়ি: ১১৭।
২২৯ আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৫৩।
২৩০ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৬১।
২৩১ আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৫৪।
২৩২ হুরুবুর রিদ্দাহ, আল কিলায়ি: ১০৪-১০৬।
২০০ আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৫৭-৫৮।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 মুসায়লিমার ওপর খালিদের চড়াও হওয়া

📄 মুসায়লিমার ওপর খালিদের চড়াও হওয়া


আবু বকর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন— ‘আসাদ, গাতফান ও মালিক ইবনু নুবায়রাকে দেখে নেওয়ার পর ইয়ামামা অভিমুখে এগিয়ে যাবে।’ বিষয়টাতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করছিলেন। শারিক আল ফাজারি বলেন, বুজাখার যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিল, আমিও তাঁদের সঙ্গে ছিলাম। এরপর আমি খলিফার কাছে গেলে তিনি আমাকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে পাঠিয়ে দেন। আমার মাধ্যমে খালিদকে উদ্দেশ্য করে একটা চিঠি পাঠান, তাতে লেখা ছিল,
বার্তাবাহকের মাধ্যমে তোমার চিঠি আমার হস্তগত হয়েছে। এতে বুজাখার যুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় ও সাহায্যের কথা উল্লেখ আছে। এ ছাড়া আসাদ ও গাতফানের সঙ্গে তুমি যে ব্যবহার করেছ, তারও উল্লেখ আছে। তুমি আরও উল্লেখ করেছ, ‘আমি ইয়ামামার অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছি’; এ ক্ষেত্রে আমার উপদেশ থাকবে, এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর তাকওয়া বুকে ধারণ করবে। তোমার সঙ্গে যে-সকল মুসলিম আছেন, তাঁদের সঙ্গে পিতার মতো আচরণ করবে।
খালিদ, সাবধান, বনু মুগিরার অহংকার ও ঔদ্ধত্য থেকে বেঁচে থাকবে। আমি তোমার সম্পর্কে তাদের কথা গ্রহণ করিনি, যাদের কথা আমি কখনোই প্রত্যাখ্যান করতাম না। অতএব, তুমি যখন বনু হানিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে, তখন সাবধানতা অবলম্বন করবে। স্মরণ রাখবে, বনু হানিফার মতো শক্তিশালী কারও সঙ্গে এখনো তোমার মোকাবিলা হয়নি। এরা সবাই তোমার বিরোধী। এদের শাসনাধীন এলাকা বেশ প্রশস্ত। অতএব, সেখানে পৌঁছে বাহিনীর কমান্ড নিজের হাতে উঠিয়ে নেবে। ডান বাহুতে একজন আর বাম বাহুতে একজন নির্দিষ্ট করে রাখবে। আর অশ্বারোহীদের নেতৃত্বও ঠিক করে দেবে। তোমার সঙ্গে যে-সকল আনসার ও মুহাজির প্রবীণ সাহাবি আছেন, প্রতিনিয়ত তাঁদের পরামর্শ নেবে। তাঁদের মর্যাদাকে সম্মান জানাবে। পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ময়দানে নামবে। শত্রুবাহিনী যখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবে, তখনই তাদের ওপর হামলে পড়বে। তিরের মোকাবিলায় তির, বর্শার মোকাবিলায় বর্শা ও তরবারির মোকাবিলায় তরবারি ব্যবহার করবে। তরবারির জোরে তাদের বন্দিদের উঠিয়ে নেবে। হত্যার মাধ্যমে ভীতি ছড়িয়ে দেবে। তাদের আগুনে ঠেলে দেবে। আমার নির্দেশ অমান্য করবে না। ওয়াসসালামু আলাইকা।
চিঠিপ্রাপ্তির পর খালিদ রা. সেটা পাঠ করে বলেন, 'আমরা তাঁর কথা শুনেছি। এসব নির্দেশ অবশ্যই বাস্তবায়ন করব।'
খালিদ মুসলিমবাহিনীকে প্রস্তুত করে বনু হানিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে যান। আনসারদের নেতা নিযুক্ত হন সাবিত ইবনু কায়েস ইবনু শাম্মাস। মুরতাদদের যাদের সঙ্গেই পথে সাক্ষাৎ হতো, তিনি তাদের শিক্ষণীয় শাস্তি দিতেন। এদিকে আবু বকর খালিদের পেছন দিকের নিরাপত্তার জন্য বড় একটা সশস্ত্র বাহিনী পাঠিয়ে দেন। ইয়ামামার যাযাবর অনেক গোত্রের পাশ দিয়ে খালিদবাহিনীকে পথ চলতে হয়। সেসব গোত্রের লোকেরা মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। পথ অতিক্রমকালে খালিদ তাদের মোকাবিলা করে পুনরায় ইসলামের দিকে নিয়ে আসেন। পথে সাজাহের বিক্ষিপ্ত বাহিনীর সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তাদেরও হত্যা করে সামনের দিকে এগিয়ে যান। এরপর ইয়ামামার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন。

টিকাঃ
২০৪ শারিক আল ফাজারি রা. একজন সাহাবি। তিনি আবু বকর ও খালিদ রা.-এর মধ্যে যুদ্ধবিষয়ক পত্র আদানপ্রদানের দায়িত্বে ছিলেন।
২৩৫ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৭৮।
২৩৬ মাজমুআতুল ওয়াসায়িকিস সিয়াসিয়া: ৩৪৮-৩৪৯; হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৭৯।
২৩৭ হুরুবুর রিদ্দাহ, শাওকি আবু খালিল: ৭৯।
২৩৮ আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা: ১০৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00