📄 বাহরাইনবাসীর ইরতিদাদ
রাসুল আলা ইবনুল হাজরামিকে বাহরাইনের বাদশাহ মুনজির ইবনু সাবি আবাদির কাছে পাঠালে তিনি তাঁর পুরো জাতিকে নিয়ে ইসলামের ছায়াতলে চলে আসেন। এরপর মুনজির তাঁর জাতির মধ্যে ইসলাম ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন। রাসুলের ইনতিকালের কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করেন। তাঁর ইনতিকালের পরপরই বাইরাইনবাসী মুরতাদ হয়ে মুনজির ইবনু নুমান আল গুরুরকে তাদের বাদশাহ বানিয়ে নেয়।
আবু বকর রা. আলা ইবনুল হাজরামির নেতৃত্বে একদল মুজাহিদ পাঠান। তাঁরা যখন বাহরাইনের কাছে এসে পৌঁছান, তখন সুমামা ইবনু উসালও তাঁর গোত্র সুহাইমের একটা বিশাল দল নিয়ে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন এবং এলাকার অন্য মুসলিমদেরও ইসলামের সাহায্যে এগিয়ে আসতে উদ্দীপ্ত করেন। অপরদিকে জারুদ ইবনু মুআল্লাও তাঁর গোত্রের লোকজন নিয়ে সেখানে পৌঁছান। এভাবে মুসলিমদের দল ভারী হয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে নিয়ে আলা রা. মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। আল্লাহ তখন ইমানদারদের সাহায্য করেন। ফলে বাহরাইনে ইরতিদাদি ফিতনার মূলোৎপাটন ঘটে। যাঁরা আলা রা.-কে সহায়তা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কায়েস ইবনু আসিম মিনকারি, আফিফ ইবনুল মুনজির এবং মুসান্না ইবনুল হারিসা শায়বানির নাম তালিকার শীর্ষে।
১. আলা ইবনুল হাজরামির কারামত
আলা ইবনুল হাজরামি ছিলেন একজন আলিম, আবিদ ও মুসতাজাবুদ দাওয়াত (যার দুআ কবুল হয়) সাহাবি। তিনি যুদ্ধের জন্য শত্রুদের এলাকায় যাওয়ার সময় মরুভূমির মধ্যখানে একজায়গায় শিবির স্থাপন করেন। মুজাহিদরা তাঁদের উট থেকে নেমে স্থির হওয়ার আগেই উটগুলো তাদের পিঠে থাকা খাবার-পানীয়, যুদ্ধসরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসপত্রসহ পালিয়ে যায়। একটা উটও পাকড়াও করা সম্ভব হয়নি। মুজাহিদদের কাছে তখন শরীরের পরিধেয় পোশাক ছাড়া আর কিছু ছিল না। সবাই বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। ভয়াবহ এ অবস্থায় একজন অপরজনকে অসিয়ত করা শুরু করেন।
এমন নাজুক মুহূর্তে আলা ইবনুল হাজরামি রা. সবাইকে একত্রিত করে বলেন, 'আপনারা কি মুসলমান নন? আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী হিসেবে তাঁর পথে বের হননি?' তারা বলেন, 'অবশ্যই।' আলা বলেন, 'তাহলে চিন্তা করবেন না, আল্লাহ আপনাদের মতো লোকদের লজ্জিত করতে পারেন না।' এরপর ফজরের আজান দেওয়া হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সালাত আদায় করেন। সালাত শেষে হাঁটু গেড়ে বসেন। সবাই আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দুআ শুরু করেন। দুআ অবস্থায়ই সূর্যোদয় হয়। মানুষ সূর্যের আলোকরশ্মি তাকিয়ে দেখছিল। সময় যত গড়াচ্ছিল, সূর্য তার তাপ মেলে ধরছিল। আলা তখনো দুআ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এভাবে বেলা গড়িয়ে তৃতীয় প্রহরে উপনীত হলে আল্লাহ তাআলা তাঁদের পাশেই মিঠা পানির একটা কূপ তৈরি করে দেন। তিনি লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে সেই কূপের পানি পান করেন। গোসলও করেন। আরেকটু পর সূর্য যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, উটগুলো একে একে চতুর্দিক থেকে তাদের পিঠের মাল-সামানাসহ ফিরে আসতে থাকে। লোকজন তাঁদের সাজসরঞ্জাম যে যতটুকু রেখেছিলেন, সবই পান। কোনো কমবেশ হয়নি। এরপর তাঁরা উটগুলোকে পরিতৃপ্ত করে পানি পান করান। এই অভিযানে মুমিনরা চাক্ষুষভাবে আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যক্ষ করেন。
২. মুরতাদদের পরাজয়
আলা রা. মুরতাদদের বিশাল বাহিনীর পাশেই শিবির স্থাপন করেন। রাতে হঠাৎ করে শত্রুশিবির থেকে শোরগোল শুনতে পেয়ে সেনাদলকে বলেন, 'কে ওদের সংবাদ নিয়ে আসতে পারবে?' আবদুল্লাহ ইবনু হাজফ দাঁড়িয়ে বলেন, 'আমি'। তিনি সেখানে গিয়ে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েন। দেখতে পান, তারা মদপান করে মাতাল হয়ে আছে। ফিরে এসে সংবাদ দেওয়া মাত্র আলা রা. তৎক্ষণাৎ তাদের ওপর চড়াও হন এবং ইচ্ছামতো কচুকাটা করতে থাকেন। এই অতর্কিত হামলায় অল্পসংখ্যকই পালিয়ে যেতে পেরেছিল। যুদ্ধে তাদের সমুদয় মালসামানা মুসলিমদের হস্তগত হয়। এ ছাড়াও তাঁরা বিপুল গনিমত লাভ করেন।
হুতাম ইবনু জুবায়আ ছিল বনু কায়েস ইবনু সালাবার নেতা। মুসলিমদের আচমকা হামলায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠেই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে; কিন্তু তার ঘোড়ার পা-দানি ভেঙে যায়। সে তখন ডেকে বলে, 'কেউ কি আমার ঘোড়ার পা-দানিটা ঠিক করে দেবে?' রাত ছিল গভীর অন্ধকার। একজন মুজাহিদ এগিয়ে এসে বলেন, 'আমি ঠিক করে দিচ্ছি, পা ওঠাও'। সে পা তোলামাত্রই তিনি তরবারি দিয়ে তার পা কেটে ফেলেন। হুতাম তখন তাকে বলে, 'এভাবে ফেলে না রেখে মেরে ফেলো'। ওই মুজাহিদ তখন জবাব দেন, 'না, আমি তা করতে পারি না'। সে তখন ঘোড়া থেকে পড়ে যায়। এরপর যে-ই তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, হুতাম তাকেই ডেকে বলছিল, 'আমাকে শেষ করে দিয়ে যাও!' কিন্তু কেউই তাকে হত্যা করতে রাজি হয়নি।
একপর্যায়ে কায়েস ইবনু আসিম তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে ডেকে বলে, 'আমি হুতাম, আমাকে শেষ করে যাও!' কায়েস তাকে হত্যা করে ফেলেন; কিন্তু পরে তার পা কাটা দেখতে পেয়ে এ হত্যাকাণ্ডের ওপর লজ্জিত হন। কায়েস বলেন, 'বিষয়টা আগে থেকে জানা থাকলে আমি তাকে ওই অবস্থায় ফেলে যেতাম।'
মুসলিমরা পলায়নপরদের ধাওয়া করছিলেন, তাঁরা প্রতিটা রাস্তায় তাদের হত্যা করে চলছিল। যারা পালাতে পেরেছিল, তারা নৌযোগে দারিনে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
এদিকে আলা ইবনুল হাজরামি রা. গনিমত বণ্টন শুরু করে দেন। বণ্টন শেষে তিনি মুসলিমদের উদ্দেশে বলেন, 'চলো আমরা দারিন যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে আবারও জিহাদ চালাতে হবে'। লোকজন দ্রুত প্রস্তুতি সেরে নেন। তারা যখন সমুদ্রতীরে গিয়ে নৌকায় উঠতে যাবেন, তখন দেখেন দূরত্বটা অনেক—নৌযোগে সেখানে যেতে যেতে শত্রুরা পালিয়ে যাবে। তখন তিনি এই বলে ঘোড়া নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন,
يا ارحم الراحمين يا حكيم يا كريم يا احد يا صمد ياحي يا قيوم يا ذا الجلال والاكرام لا اله الا انت يا ربنا.
তিনি তাঁর বাহিনীকেও নির্দেশ দেন, 'আল্লাহর জিকির করতে করতে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ো।' নির্দেশ পেয়ে পুরো সেনাদল সাগরে নেমে যায়। আল্লাহর অনুগ্রহে তাঁরা উপসাগরটা এমনভাবে পাড়ি দেন যে, যেন তাঁরা এমন নরম বালিতে ঘোড়া দৌড়াচ্ছিলেন, যে বালির উপর রয়েছে পানি, যা তাদের ঘোড়া ও উটের টাখনু পর্যন্ত পৌঁছায়নি। দূরত্বটা ছিল নৌযোগে এক দিন ও এক রাতের সমান; কিন্তু মুসলিমবাহিনী মাত্র এক দিনে সেখানে গিয়ে আবার ফিরে আসেন। শত্রুবাহিনীর মধ্যে সংবাদ পৌঁছানোর মতোও কেউ তখন বাকি থাকেনি। তাঁরা তাদের যাবতীয় মালসামানা, গবাদি পশু এবং নারী ও শিশুদের ধরে নিয়ে আসেন। সমুদ্রে মুসলিমদের কোনো জিনিস খোয়া যায়নি। ঘোড়া থেকে শুধু একজনের একটা থলে পড়ে গিয়েছিল। আলা রা. সেটাও ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। এরপর গনিমতের সেই মাল মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। বাহিনীর সেনাসংখ্যা প্রচুর হওয়ার পরও অশ্বারোহীরা ৬ হাজার এবং পদাতিকরা ২ হাজার করে মুদ্রা পেয়েছিলেন। তারা আবু বকর রা.-কে এ বিজয় সম্পর্কে অবহিত করলে তিনি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করেন।
মুসলিমদের পাশাপাশি হিজরের এক পাদরিও আলার কারামত দেখতে পেয়েছিল। এটা দেখে সে তখনই ইসলামগ্রহণ করে। পাদরি বলছিল, 'আমার ভয় হচ্ছিল, আমি যদি তা না করি তাহলে আল্লাহ আমার রূপ পরিবর্তন করে দেবেন। কেননা, আমি আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেছি। এ ছাড়া আমি ভোরে ইথারে একটা প্রার্থনা শুনেছিলাম।' মানুষ তাকে জিজ্ঞেস করে, 'প্রার্থনাটা কী ছিল?' সে বলে,
اللهم انت الرحمن الرحيم، لا اله غيرك، والبديع ليس قبلك شيئ ، والدائم غير الغافل، والذى لا يموت، وخالق ما يرى وما لا يرى وكل يوم انت في شان، وعلمت اللهم كل شيئ علما .
আল্লাহ, আপনি দয়ালু ও মেহেরবান। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনার আগে কোনো উদ্ভাবক নেই। আপনি সর্বস্থায়ী, অসতর্ক নন। আপনি এমন সত্তা, যাঁর কোনো মৃত্যু নেই। আপনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের স্রষ্টা। আপনি প্রতিদিন আপনার মর্যাদা অনুযায়ী আছেন। আল্লাহ, আপনি সবকিছু জানার মতোই জানেন।
এ থেকে আমি বুঝে নিয়েছি, 'ফেরেশতাদের মাধ্যমে এ জন্য তাদের সহায়তা করা হয়েছে যে, তারা তাঁর দীনে অটল আছেন।' এরপর তার বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে যায়। সাহাবিরা তখন কান পেতে তার কথাগুলো শুনছিলেন。
মুরতাদদের পরাজয়ের পর ইবনুল হাজরামি বাহরাইন চলে আসেন। ইসলাম তখন সেখানে বিস্তৃতি লাভ করেছে। ইসলাম ও মুসলিমরা সেখানে সম্মানের শীর্ষস্থানে পৌঁছায়; আর কুফর-শিরক লজ্জিত ও অপমানিত হয়। যদি মুরতাদরা বাইরের সাহায্য না পেত, তাহলে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে থাকার অবস্থায় ছিল না। পারসিকরা মুরতাদদের ৯ হাজার সেনাসহায়তা দিয়েছিল। আরব মুরতাদদের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার। বিপরীতে মুসলিমদের সেনাসংখ্যা ছিল মোট ৪ হাজার。
বাহরাইনে ইরতিদাদি ফিতনার আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে মুসান্না ইবনুল হারিসা বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। তিনি তাঁর দলবল নিয়ে ইবনুল হাজরামির সঙ্গে যোগ দেন। নিজের বাহিনী নিয়ে বাহরাইন থেকে উত্তর দিকে রওনা হয়ে কাতিফ ও হিজরে আধিপত্য বিস্তার করে একেবারে দিজলার তীর পর্যন্ত পৌঁছে যান। মুসান্না এই মিশনেই লেগে থাকেন। একপর্যায়ে মুরতাদদের সহায়তাকারী পারস্যবাহিনী ও তাদের গভর্নরদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। এরপর মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য ওই এলাকার ইসলামের দৃঢ় বিশ্বাসীদের নিয়ে আলার সঙ্গে এসে মিলিত হন। এরপর উপকূল ধরে উত্তর দিকে এগোতে থাকেন। একপর্যায়ে দিজলা ও ফুরাতের মোহনায় অবস্থিত আরব গোত্রসমূহের কাছে পৌঁছে যান। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শেষে সন্ধি স্থাপন করেন।
খলিফাতুর রাসুল আবু বকর রা. মুসান্না ইবনুল হারিসা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে কায়েস ইবনু আসিম মিনকারি বলেন, 'তিনি অজ্ঞাত, বংশপরিচয়হীন বা অনভিজাত কোনো লোক নন। তিনি তো মুসান্না ইবনুল হারিসা শায়বানি।'
আবু বকর তখন মুসান্নার নামে এই বার্তা পাঠান যে, তিনি যেন ইরাকে আরবদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে থাকেন। মুসান্নার কার্যক্রমকে তিনি ইরাক বিজয়ের প্রাথমিক পদক্ষেপ আখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর পরই খালিদ রা. সেখানে মুসলিমবাহিনী নিয়ে ইতিহাসের মোড় পালটানো পদক্ষেপ নেন。
টিকাঃ
১৯৬ আত-তারাতিবুল ইদারিয়াহ: ৬/৩৩৫।
১৯৭ আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৬৩।
১৯৮ তাবাকাত, ইবনু সাআদ: ৪/৩৬৩।
১৯৯ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৩৩।
২০০ বাহরাইনের একটি বস্তির নাম।
২০১ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৬/১২১।
২০২ প্রাগুক্ত: ৬/৩৩৪।
২০০ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১০৫।
২০৪ ফুতুহু ইবনু আ'সাম: ৪৭; আস-সাবিতুনা আলাল ইসলাম: ৬৪।
২০৫ ফুতুহুল বুলদান, বালাজুরি রা. : ২৪২; আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., খালিদ জাসিম: ৪৪।
২০৬ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা.. ৪৪. খালিদ আল জুনাবি ও নাজার আল হাদিসি।