📄 উম্মু তামিমের সঙ্গে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বিয়ে
১. উম্মু তামিমের সঙ্গে খালিদের বিয়ে মালিক ইবনু নুবায়রার স্ত্রী উম্মু তামিমের নাম ছিল লায়লা বিনতু সিনান আল মিনহাল। তার সঙ্গে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বিয়ের ঘটনা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। কিছু মানুষ নিজেদের কুৎসিত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এ নিয়ে খালিদের প্রতি তীর্যক মন্তব্য করে থাকে, রটিয়ে থাকে বিভিন্ন ধরনের অপবাদ; অথচ বাস্তবতার সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। বিশুদ্ধ ইলমি তাহকিকের সামনে এসব ধোপে টিকবে না।
ঘটনা হচ্ছে, কিছুসংখ্যক মানুষ খালিদের ওপর এই অপবাদ রটিয়ে থাকে যে, উম্মু তামিম বন্দি হওয়ামাত্রই তাকে বিয়ে করে ফেলেন। তিনি নাকি তার সৌন্দর্যে আত্মহারা ছিলেন, তাকে ভালোবাসতেন। তাকে ছাড়া তিনি একমুহূর্তও ধৈর্যধারণ করতে পারেননি। তাদের এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এটা বিয়ে ছিল না; বরং এ ছিল একপ্রকার ব্যভিচার (নাউজুবিল্লাহ)। তবে সত্য হচ্ছে, তাদের এ দাবি ও প্রচারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সত্যের সঙ্গে এর দূরতম সম্পর্ক নেই। পুরানো কোনো ঐতিহাসিক উৎসে এ ব্যাপারে সামান্য কোনো ইঙ্গিতও খুঁজে পাওয়া যায় না।
আল্লামা মাওয়ারদি রাহ. স্পষ্টভাবে লেখেন, খালিদ রা. কর্তৃক মালিক ইবনু নুবায়রাকে হত্যার একমাত্র কারণ ছিল সে জাকাত আটকে রেখেছিল। এ কারণে তার রক্ত হালাল হয়ে গিয়েছিল। একই কারণে উম্মু তামিমের সঙ্গে তার বৈবাহিক সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। মুরতাদদের নারীদের ব্যাপারে শরিয়তের বিধান হচ্ছে, তারা দারুল হারবে গিয়ে মিলিত হলে তাদের শুধু বন্দি করা যাবে, হত্যা করা যাবে না। ইমাম সারাখসি রাহ. এ কথার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
উম্মু তামিম বন্দি হলে খালিদ তাকে নিজের জন্য নির্ধারণ করেন। এরপর হালাল হয়ে গেলে তার সঙ্গে সহবাস করেন। শায়খ আহমাদ শাকির এই ঘটনায় সংযুক্তি করে বলেন, 'খালিদ উম্মু তামিম ও তার ছেলেকে “মিলকে ইয়ামিন”-এর ভিত্তিতে গ্রহণ করেছিলেন। কেননা, তারা ছিল যুদ্ধবন্দি। এ ধরনের নারীদের কোনো ইদ্দত পালন করতে হয় না। তবে গর্ভবতী হলে প্রসবকাল পর্যন্ত মালিকের জন্য ভোগ করা হারাম। গর্ভবতী না হলে একবার হায়িজ হলেই সে হালাল হয়ে যায়। এরপর তার সঙ্গে সম্ভোগ বৈধ। এ হুকুম শরিয়তসিদ্ধ তথা জায়িজ। এ নিয়ে সমালোচনার কোনো অবকাশ নেই।' কিন্তু খালিদের শত্রুরা সুযোগটাকে তাদের কুৎসিত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে অস্ত্র হিসেবে নেয়। তাদের ধারণা, মালিক ইবনু নুবায়রা মুসলিম ছিল; খালিদ রা. তার স্ত্রীকে পেতে তাকে হত্যা করেছিলেন।
একইভাবে এই অপবাদ আরোপ করা হয় যে, এর মাধ্যমে খালিদ রা. আরবের চিরন্তন ঐতিহ্য ভঙ্গ করেছিলেন। যেমন: আক্কাদ বলেন, 'ইবনু নুবায়রাকে হত্যা করে রণাঙ্গনেই তার সঙ্গে সহবাস ছিল আরবদের জাহিলি ও ইসলামি যুগের ঐতিহ্যের পরিপন্থি। একইভাবে এটা ছিল মুসলিমদের সংস্কৃতি ও শরিয়তের পরিপন্থি।'
কিন্তু আক্কাদের এ কথায় সত্যের লেশমাত্র নেই। আরবদের কাছে ইসলামপূর্ব যুগে যুদ্ধে শত্রুর ওপর বিজয়ের পর শত্রুর নারীদের বিয়ে করার ব্যাপক নজির রয়েছে। তারা বরং এ নিয়ে গৌরব প্রকাশ করত। অনুরূপ তাদের সমাজে বন্দি নারীদের প্রচুর সন্তান ছিল। হাতিম তাইয়ের ভাষ্য লক্ষ করুন,
তারা সন্তুষ্ট চিত্তে আমাদের সঙ্গে তাদের মেয়েদের বিয়ে দেয়নি; কিন্তু আমরা তরবারির জোরে তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছি। তোমরা আমাদের মধ্যে যুদ্ধবন্দি নারীদের প্রচুর সন্তান দেখতে পাবে তারা বাহাদুরদের মুখোমুখি হলে প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়ে আঘাত করে। তারা হাতের বর্শায় গেঁথে পতাকা উঠিয়ে থাকে; যেগুলো শুরুতে থাকে সাদা, এরপর শত্রুর খুনে লাল হয়ে যায়。
২. শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে উম্মু তামিমের সঙ্গে খালিদের বিয়ে শরিয়তের দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে, খালিদ রা. কেবল একটা মুবাহ কাজ করেছেন; শরিয়তের বাইরে যাননি। এমনটা খোদ রাসুল থেকে প্রমাণিত। তিনি নিজেই গাজওয়ায়ে মুরায়সির পর জুওয়াইরিয়া রা.-কে বিয়ে করেছিলেন এবং সে যুদ্ধ গোত্রের জন্য অত্যন্ত বরকতময় প্রমাণিত হয়েছিল। সে গোত্রের প্রায় শতাধিক মানুষকে মুক্ত করা হয়েছিল। তারা নবিজির শ্বশুরালয়ের সম্পর্কযুক্ত হয়ে গিয়েছিল। সে বিয়ের বরকতেই জুওয়াইরিয়ার পিতা হারিস ইবনু জিরার মুসলমান হন। একইভাবে নবিজি খায়বারযুদ্ধের পরপরই সাফিয়া বিনতু হুয়াই ইবনু আখতাবের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ এবং খায়বারে অথবা ফেরার পথে বাসর যাপন করেছিলেন। যেহেতু নবিজি থেকেই এ বিষয়টা প্রমাণিত, তাই এর জন্য কোনো প্রকার সমালোচনা থাকতে পারে না। এ অভিযোগ এমনিতেই ফালতু প্রমাণিত হয়ে যায়।
অনুরূপ ড. মুহাম্মাদ হুসাইন হায়কাল খালিদের ওপর থেকে অপবাদ দূর করতে যে পন্থা অবলম্বন করেছেন, তা-ও গ্রহণযোগ্য নয়। ড. হায়কাল তো খালিদের ভুলের ওপর পর্দা ফেলতে গিয়ে ইসলামের জানাজাই পড়ে ফেলেছেন! খালিদসহ উম্মাহর সবাই ছিলেন শরিয়তের অধীন। শরিয়ত সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ব্যক্তির সাফাই গাওয়ার অর্থ কখনো শরিয়তকে বিকৃতকরণ হতে পারে না। হায়কাল যে পথ অবলম্বন করেছেন, তার সারাংশ হচ্ছে, 'আরবদের সংস্কৃতির বিপরীতে কোনো বন্দি মহিলাকে বিয়ে করা এবং গর্ভাশয় পবিত্র হওয়ার আগে যৌনসম্ভোগ যদি ইসলামের মহান কোনো গাজীর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে তা অপরাধ গণ্য হতে পারে না। অবশ্যই তাঁর অধিকার আছে যে, যুদ্ধবন্দি নারীরা তাঁর "মিলকে ইয়ামিন" হবে। গর্ভাশয় পবিত্র হওয়ার আগেই তিনি যুদ্ধবন্দি মহিলাকে সম্ভোগ করতে পারবেন।'
শরিয়তের বিধানে সামঞ্জস্য করতে গিয়ে অতি বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি কাম্য হতে পারে না। আর এ উদ্দেশ্যে খালিদের মতো সত্তাকে নির্বাচিত করা তো রীতিমতো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। বিশেষ করে এর ফলে যদি রাষ্ট্রপরিচালনায় কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
শায়খ আহমাদ শাকির হায়কালের এই কান্ডজ্ঞানহীন মন্তব্যের বিরোধিতায় লেখেন, 'সন্দেহ হচ্ছে, তিনি তো নেপোলিয়নের মতো ইউরোপীয় বাদশাহদের কুকীর্তি ঢাকতে ইংরেজ লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত নন? তারা যেমন তাদের নেতাদের প্রতিষ্ঠিত অপরাধ ঢাকতে বা হালকা করতে তাদের কৃতিত্বপূর্ণ কর্মগুলোকে আড়কাঠি হিসেবে ব্যবহার করে থাকে, খুব সম্ভব এমন মানসিকতায় তাড়িত হয়েই ড. হায়কালও এই দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন করে নিয়েছেন যে, আমাদের সোনালি যুগের আদর্শপুরুষরাও বদমাশ ইংরেজ নেতাদের মতোই ছিলেন। নতুবা শরিয়তবিষয়ক বাড়াবাড়ি পূর্ণ কথাগুলো খালিদের মতো ব্যক্তির সঙ্গে জোড়ার সাহস পেতেন না। এই চিন্তাধারা মূলত দীন ও চরিত্রবিধ্বংসী。
টিকাঃ
১৮১ পাকিস্তানের জেনারেল আকরাম তাঁর সাইফুল্লাহ হজরত খালিদ রা. গ্রন্থের ১৯৮ পৃষ্ঠায় লেখেন, 'খালিদ রা. সে রাতেই তাঁকে বিয়ে করেন।'
১৮২ আল-আহকামুস সুলতানিয়াহ: ৪৭; হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২২৯।
১৮৩ আল-মাবসুত: ১০/১১১; হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২২৯।
১৮৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৬।
১৮৫ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৩০।
১৮৬ আবকারিয়াতুস সিদ্দিক: ৭০।
১৮৭ আল-ইকদুল ফরিদ: ইবনু আবদি রাব্বিহি: ৭/১২৩।
১৮৮ সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/২৯০-২৯৫।
১৮৯ প্রাগুক্ত: ২/২৩৯।
১৯০ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৩৭।
১৯১ আস-সিদ্দিক আবু বাকার: ১৪০।
১৯২ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৩২।