📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 সাজাহ, বনু তামিম ও মালিক ইবনু নুয়ায়রার হত্যা

📄 সাজাহ, বনু তামিম ও মালিক ইবনু নুয়ায়রার হত্যা


ইরতিদাদি ফিতনার সময় বনু তামিম ছিল শতধাবিভক্ত। তাদের কিছুসংখ্যক মুরতাদ হয়ে নিজেদের জাকাত আটকে দেয়। কিছুসংখ্যক তাঁদের জাকাত আবু বকরের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আর কেউ কেউ এ নিয়ে দ্বিধা ও সংশয়ে ভুগতে থাকে। ইতিমধ্যে তাদের কাছে সাজাহ বিনতু হারিস ইবনু সুওয়াইদ ইবনু উকফানের আগমন ঘটে। সে ছিল বনু তাগলিব বংশোদ্ভূত এবং ধর্মবিশ্বাসে খ্রিষ্টান। লোকটা নবুওয়াতের দাবি করে বসে। তার সঙ্গে ছিল গোত্র ও সহকারীদের বড় এক বাহিনী। তারা আবু বকরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য অঙ্গীকার করেছিল। এ লক্ষ্যে তারা বনু তামিমের বস্তি অতিক্রমকালে তাদের সঙ্গ দেওয়ার আহ্বান জানালে অধিকাংশ তামিমি তার আহ্বানে সাড়া দেয়। তাদের মধ্যে মালিক ইবনু নুবায়রা তামিমি, উতারিদ ইবনু হাজিবসহ বনু তামিমের সরদারদের বড় একটা দল ছিল; আর কিছুসংখ্যক এ থেকে দূরে থাকে। তবে উভয় দল পরস্পর যুদ্ধে না জড়াতে সমঝোতা করে নিয়েছিল।
মালিক ইবনু নুবায়রা সাজাহের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ফেলে। সে সাজাহকে বনু ইয়ারবুর বিরুদ্ধে উসকে দিলে তারা পারস্পরিক যুদ্ধের জন্য তেতে ওঠে; কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায়- কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে! তখন সাজাহ ছন্দোবদ্ধ বাক্যে বলে ওঠে,
اعدوا الركاب، واستعدوا النهاب، ثم اغيروا على الرباب، فليس دونها حجاب
বাহন প্রস্তুত করো। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। এরপর রুবাবের ওপর আক্রমণ চালাও; ওদের মধ্যে কোনো বাধা নেই।
এরপর বনু তামিম তাকে ইয়ামামার দিকে অভিযানে নিয়ে যেতে সফল হয়, যাতে ইয়ামামাকে মুসায়লিমাতুল কাজ্জাবের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা যায়; কিন্তু তার জাতি মুসায়লিমার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ব্যাপারে ভীত হয়ে পড়ে। তারা তার প্রতিপত্তি দেখে ঘাবড়ে যায়। কারণ, সে ততদিনে তার শক্তি সংহত করে তুলেছিল। তখন সাজাহ বলে ওঠে, عليكم باليمامة، دفوا دفيف الحمامة، فانها عزوة صرامة، لا تلحقكم بعدها ملامة.
ইয়ামামার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। কবুতরের মতো উড়াল দাও। এটা শত্রুকে কেটে রাখার যুদ্ধ, এরপর তোমরা কোনোভাবে সমালোচিত হবে না।
সাজাহের নির্দেশ পেয়ে তামিমিরা মুসায়লিমার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। মুসায়লিমা সংবাদটা শুনে ভীত হয়ে পড়ে। কারণ, সে তখন সুমামা ইবনু উসালের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এদিকে ইকরিমাও সুমামার সহায়তায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া খালিদ ইবনুল ওয়ালিদও ধেয়ে আসছিলেন। মুসায়লিমা এ পরিস্থিতিতে সাজাহের কাছে দূত পাঠিয়ে নিরাপত্তা চায়। তাকে ওয়াদা দেয়— 'আমি সফল হতে পারলে কুরাইশের অর্ধেক ভূখণ্ড তোমাকে দেবো।' এ ছাড়া সাজাহকে লিখে জানায়, সে তার গোত্রের কিছুসংখ্যক লোকসহ তার সাক্ষাৎপ্রার্থী। সাজাহ এতে সম্মতি প্রকাশ করলে মুসায়লিমা ৪০ জন সাথি নিয়ে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। উভয় ভণ্ড একটা তাঁবুতে মিলিত হয় এবং একান্তে আলোচনা করে। মুসায়লিমা তাকে বিজিত ভূখণ্ডের অর্ধেক দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে সাজাহ তা মেনে নেয়। মুসায়লিমা বলে, 'আল্লাহ শ্রবণকারীর কথাই শ্রবণ করেন। যখন সে লোভ করে, তখন কল্যাণ প্রদান করা হয়। এখন পর্যন্ত যা কিছু হচ্ছে, সবকিছু ঠিকমতো হচ্ছে।'
সাজাহ বলে, 'তুমি আমাকে বিয়ে করতে সম্মত হবে? যদি সম্মত হও, তাহলে উভয়ে স্ব স্ব গোত্র সঙ্গে নিয়ে আরবদের গিলে ফেলতাম।' মুসায়লিমা জবাবে বলে, 'আমি রাজি।' লোকজন যখন সাজাহকে জিজ্ঞেস করে, 'মুসায়লিমা তোমাকে কী মোহর দিলো?' সাজাহ বলে, 'না তো, কোনো মোহর দেয়নি।' লোকজন বলে, 'তোমার মতো একজন নারী মোহর ছাড়া বিয়েতে বসতে পারে?' সাজাহ তখন মোহরের দাবি জানিয়ে মুসায়লিমার কাছে লোক পাঠালে সে উত্তরে বলে, 'তুমি তোমার ঘোষককে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।' সাজাহ তার ঘোষক শাবত ইবনু রিবয়ি আর-রিয়াহিকে তার কাছে পাঠালে সে তাকে বলে, 'যাও, তোমার জাতির কাছে গিয়ে এই ঘোষণা দাও যে, আল্লাহর রাসুল মুসায়লিমা তোমাদের ওপর থেকে ফজর ও ইশার দুই ওয়াক্ত সালাত—যা মুহাম্মাদ তোমাদের ওপর জরুরি করেছিলেন—রহিত করিয়ে দিয়েছেন। আর এটাই হচ্ছে সাজাহের মোহর!'
পরে খালিদ রা. ইয়ামামার নিকটবর্তী হলে সাজাহ মুসায়লিমার কাছ থেকে ভূমির অর্ধেক কর সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে বনু তাগলিবের কাছে চলে আসে। এর অনেক দিন পর ‘আমুল জামাআহ’য় মুআবিয়া রা. খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে বনু তাগলিবকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেন।
১. বুতাহের পথে খালিদের যাত্রা এবং আনসারদের অসম্মতি
সাজাহ জাজিরা থেকে আরবে এসে পৌঁছালে মালিক ইবনু নুবায়রা তার সঙ্গ দিয়েছিল। সে তাকে মুসায়লিমার বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি দিয়ে ইয়ামামার দিকে নিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু সাজাহ কোথায় তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; বরং তার সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। ফলে ইবনু নুবায়রা নিজের ব্যর্থতার ওপর চরমভাবে লজ্জিত হয়। এতে সে সন্দেহে পড়ে যায় এবং বুতাহে বসবাস করতে থাকে। খবর পেয়ে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে বুতাহের দিকে যাত্রা করলে আনসাররা এই বলে পেছনে থেকে যান যে, ‘আবু বকর আমাদের যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আমরা তা আদায় করে নিয়েছি।’ খালিদ বলেন, ‘এটাও করা আবশ্যক এবং এখনই উপযুক্ত সময়। এই সুযোগকে গনিমত মনে করা জরুরি। যদিও এ ব্যাপারে খলিফাতুর রাসুলের কোনো চিঠি এসে পৌঁছায়নি; কিন্তু আমি তো দলের আমির। আর ভালোমন্দের খবর তো আমার কাছেই এসে পৌঁছায়। আমি তোমাদের বাধ্য করতে পারি না, তবে আমি বুতাহের দিকে এগিয়ে চললাম।’
তিনি চলে যাওয়ার দু-দিন পর আনসারদের পক্ষ থেকে একব্যক্তি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন, ‘অনুগ্রহপূর্বক আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আনসাররাও আপনার সঙ্গ দিতে চলে আসছেন।’ খানিক পর তাঁরা এসে গেলে খালিদ রা. সবাইকে নিয়ে বুতাহ পৌঁছান।
২. মালিক ইবনু নুবায়রার হত্যা
মালিক ইবনু নুবায়রা তখন বুতাহে অবস্থান করছিল। খালিদ রা. সেখানে পৌঁছে চতুর্দিকে ছোট ছোট বাহিনী ছড়িয়ে দেন। তাঁরা মানুষকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে থাকেন। বনু তামিমের লোকজন তাঁদের দাওয়াত গ্রহণ করে। নেতারা তাদের কথা মেনে নিয়ে আনুগত্যের ঘোষণা জানিয়ে দেয়; কিন্তু মালিক ইবনু নুবায়রা তখনো দ্বিধান্বিত ছিল। সে তার লোকজন থেকে পৃথক হয়ে যায়। একপর্যায়ে মুসলিমবাহিনী তাকে তার সঙ্গী-সাথিসহ বন্দি করে ফেলে। তাকে যে অবস্থায় বন্দি করা হয়েছিল, সে অবস্থার বিবরণে মুসলিমবাহিনীর সদস্যরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। আবু কাতাদা বলেন, তারা সালাত পড়ছিল; আর অন্যরা বলেন, তারা আজানও দেয়নি, সালাতও পড়েনি। এক বর্ণনামতে, বন্দিরা শেকলবদ্ধ অবস্থায় রাতযাপন করছিল। তখন প্রচণ্ড শীত ছিল। খালিদ রাতে ঘোষণা দেন, 'কয়েদিদের তাপ দাও।' মানুষ তাঁর এ কথার ভুল মর্ম বুঝে নেয়। তারা মনে করে, তিনি তাদের হত্যার নির্দেশ দিচ্ছেন। সুতরাং তারা সকল বন্দিকে হত্যা করে ফেলে। জিরার ইবনুল আজওয়ার নিজে মালিক ইবনু নুবায়রাকে হত্যা করেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ শোরগোল শুনে যখন তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসেন, ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। সবাই মারা গেছে। খালিদ তখন বলেন, 'আল্লাহ যা করার ইচ্ছা করেন।'
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. মালিক ইবনু নুবায়রাকে ডেকে পাঠান। তাকে সাজাহের সঙ্গদান এবং জাকাত আটকে রাখার ব্যাপারে খুব করে শাসিয়ে বলেন, 'তুমি কি জানো না সালাত ও জাকাতের বিধান একই?' মালিক উত্তরে বলে, 'তোমাদের নবির ধারণামতে তো তা-ই।' খালিদ বলেন, 'তিনি কি কেবল আমাদের নবি, তোমার নবি নন?' এরপর জিরার রা.-কে ডেকে বলেন, 'জিরার, ওর গর্দান উড়িয়ে দাও।'
৩. খালিদের বিরুদ্ধে খলিফার কাছে নালিশ আবু কাতাদা রা. এই হত্যাকাণ্ডের বিষয় নিয়ে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন। পরে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে আবু বকরের কাছে চলে যান এবং তাঁকে বিষয়টা খুলে বলেন। এ সময় উমর রা.-ও খালিদের বিরুদ্ধে আবু কাতাদার পক্ষ হয়ে আবু বকরের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, 'আপনি খালিদকে অপসারণ করুন, তার তরবারি থেকে অন্যায় রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে।' উত্তরে আবু বকর বলেন, 'আল্লাহ যে তরবারি কাফিরদের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, আমি সেই তরবারি কোষবদ্ধ করতে পারি না।' মুতামিম ইবনু নুবায়রাও এই অভিযোগ নিয়ে তাঁর কাছে যান। উমর তাঁকেও এ ব্যাপারে সহায়তা করেন। মুতাম্মিম আবু বকরকে মালিকের যে শোকগাথা শুনিয়েছিলেন, এটা শুনে তিনি নিজের পক্ষ থেকে তার রক্তপণ আদায় করেন。
৪. খালিদ কর্তৃক ইবনু নুবায়রার হত্যাকান্ড নিয়ে ইতিহাসবিদদের মত ইবনু নুবায়রা হত্যার উপযুক্ত ছিল, নাকি তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে, এ ব্যাপারে ভিন্নমত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ড. আলি আতুম তাঁর আল-হারকাতুর রিদ্দাহ এবং শায়খ মুহাম্মাদ তাহির ইবনু আশুর তাঁর নাকদুন ইলমিয়ুন আলা কিতাবিল ইসলামি ওয়া উসুলিল হুকমি গ্রন্থে এই কাহিনি আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। অনুরূপ জাহিদ কাওসারি তাঁর মাকালাতুল কাওসারি গ্রন্থে খালিদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন。
এ ছাড়া অনেকে প্রসঙ্গটা নিয়ে গবেষণা করেছেন; কিন্তু আমি এ ব্যাপারে ড. আলি আতুমের গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কেননা, এ বিষয়ে তিনি বিরল ইলমি গবেষণার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি ইরতিদাদের বিষয়টাকে যে পরিমাণ গুরুত্ব দিয়েছেন, আমার জানামতে সমকালের আলিমদের মধ্যে এর কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।
ড. আতুম ওই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গবেষণা-পর্যালোচনার পর যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, আমি এর সঙ্গে পুরোপুরি একমত। মালিক ইবনু নুবায়রাকে যে জিনিস ধ্বংস করেছিল, তা ছিল তার অহংকার ও দ্বিধা। তার ভেতরে জাহিলিয়াতের গোঁয়ারতুমি রয়ে গিয়েছিল। নতুবা রাসুলের ইনতিকালের পর আবু বকরের হাতে খিলাফতের বায়আতগ্রহণ এবং জাকাত আদায়ে ইতস্তত করত না। আমার ধারণা, সে প্রচণ্ড ক্ষমতালিপ্স ছিল। পাশাপাশি তামিমি মুসলিম সরদারদের ব্যাপারে তার অন্তরে হিংসা ও সন্দেহ ছিল। ইবনু নুবায়রার কথা ও কাজ এই সত্যেরই প্রতিনিধিত্ব করে। তার মুরতাদ হওয়া, সাজাহকে সঙ্গদান, জাকাতের উট নিজেদের লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া, আবু বকরের কাছে জাকাতপ্রদানে বাধা দেওয়া, অহংকার ও অবাধ্যতার বশে মুসলিমদের উপদেশকে অবমূল্যায়ন—এসব বিষয় তাকে অপরাধীই প্রমাণিত করে। এর মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হয় যে, সে ইমানের চেয়ে কুফরের নিকটবর্তী ছিল।
মালিক ইবনু নুবায়রার বিরুদ্ধে যদি শক্তিশালী কোনো দলিল না-ও থাকে, তথাপি জাকাত আটকে রাখার অপরাধই তার এ শাস্তির জন্য যথেষ্ট ছিল। শীর্ষস্থানীয় ইতিহাসবিদদের কাছে প্রমাণিত সত্য হচ্ছে, সে জাকাত আদায়ে অস্বীকার করেছিল। ইবনু আবদিস সালামের তাবাকাতু ফুহুলিশ শুআরা গ্রন্থে আছে, 'এটা সর্বসম্মত বাস্তবতা যে, খালিদ তার সঙ্গে কথা বলেছেন, তাকে তার অবস্থান থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন; কিন্তু মালিক সালাত স্বীকার করলেও জাকাত প্রদানে অস্বীকার করে।' আর মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে আল্লামা নববি রাহ. মুরতাদদের ব্যাপারে বলেন, 'এর মধ্যে তারাও গণ্য ছিল, যারা জাকাত স্বীকার করত এবং তা আটকেও রাখেনি। তবে তাদের নেতারা জাকাত তাদের দিতে আটকে রেখেছিল।' যেমন: বনু ইয়ারবু; তারা তাদের জাকাত একত্রিত করে আবু বকরের কাছে পৌঁছাতে চাইলে মালিক ইবনু নুবায়রা তাদের আটকে রাখে। সে ওই জাকাত লোকদের বণ্টন করে দিয়েছিল。
৫. খলিফা কর্তৃক খালিদের দায়মুক্তির ঘোষণা
খালিদের বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের ভাষ্য ছিল, 'মুসলিমদের আজান শুনতে পেয়ে মালিক ইবনু নুবায়রার লোকজনও আজান দেয়।' এভাবেই তারা নিজেদের রক্ত নিরাপদ করে নেয়। এই দলে আবু কাতাদার মতো মহান ব্যক্তিও ছিলেন। তাঁর কাছে বিষয়টা অত্যন্ত বড় মনে হচ্ছিল। এরপর যখন দেখতে পান, খালিদ রা. মালিক ইবনু নুবায়রার স্ত্রীকে বিয়ে করে নিয়েছেন, তখন তাঁর এই মানসিকতা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তিনি খালিদের সঙ্গ ত্যাগ করে অভিযোগ নিয়ে খলিফার কাছে চলে যান; কিন্তু আবু বকর রা. আবু কাতাদার এ অবস্থানকে মোটেও সমর্থন করেননি।
খালিদ ছিলেন তাঁর আমির, তিনি তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেছিলেন; অথচ সঙ্গত্যাগের জন্য তিনি খালিদের পক্ষ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন না। তাঁর এই পদক্ষেপ মুসলিমদের জন্য ক্ষতির কারণ হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই খলিফা আবু কাতাদার সঙ্গে কঠোর আচরণ করেন। তাঁকে তৎক্ষণাৎ খালিদের কাছে পাঠিয়ে দেন। পুনরায় খালিদের পতাকাতলে যোগ দিতে বাধ্য করেন। এ ছাড়া ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে তিনি রাজি হননি। আবু বকরের এ সিদ্ধান্ত ছিল ইসলামি যুদ্ধের জন্য আদর্শিক একটা সিদ্ধান্ত।
আবু বকর রা. মালিক ইবনু নুবায়রার হত্যা-সংক্রান্ত ঘটনার ব্যাপারে পূর্ণ অনুসন্ধান চালিয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, রটানো অপবাদ থেকে খালিদ সম্পূর্ণ মুক্ত। ঘটনার বাস্তবতা সম্পর্কে আবু বকরই অন্যদের থেকে বেশি অবহিত হওয়ার কথা। কারণ, তিনি ছিলেন খলিফা। ইতি-নেতিবাচক সব খবরই তাঁর কাছে বেশি পৌঁছাত। অন্যদের তুলনায় তাঁর ইমানও বেশি মজবুত ছিল। খালিদ রা. এ ক্ষেত্রে সুন্নাতে রাসুলেরই অনুসরণ করেছিলেন। খোদ রাসুল ﷺ তাঁকে বিভিন্ন দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। যদিও কয়েকবার তাঁর পক্ষ থেকে এমনকিছু আচরণ প্রকাশ পেয়েছিল, যার ওপর নবিজি সন্তুষ্ট ছিলেন না, তথাপি কখনো তাঁকে পদচ্যুত করেননি। এমন ক্ষেত্রে তিনি তাঁর ওজর গ্রহণ করে বলতেন, 'খালিদকে কষ্ট দিয়ো না। সে আল্লাহর তরবারিসমূহের একটা তরবারি, যে তরবারি আল্লাহ কাফিরদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।'
৬. ভারসাম্য রক্ষায় আবু বকরের নম্রতা ও খালিদের কঠোরতা
আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্ব তো এখানেই যে, তিনি খালিদের কাঁধে নেতৃত্বের রশি তুলে দিয়ে তাঁর কাছ থেকে সেবা নিতে পেরেছিলেন। অথচ তাঁর মধ্যে ছিল কঠোরতা; আর বিপরীতে আবু বকরের মধ্যে ছিল কোমলতা। তিনি চাচ্ছিলেন তাঁর নম্রতার প্রভাবে খালিদের কঠোরতার মধ্যে একপ্রকার ভারসাম্য আসুক। স্রেফ কঠোরতা কিংবা নম্রতা ধ্বংসাত্মক। এ জন্য আবু বকর উমর থেকে পরামর্শ নিলেও খালিদকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এটাই ছিল পূর্ণতা ও পরিপক্কতা। খলিফাতুর রাসুল এ পন্থাই গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণেই মুরতাদদের ব্যাপারে খলিফার অবস্থান ছিল উমরের অবস্থানের চেয়ে কঠোর। আল্লাহ তাঁর মধ্যে এমন কঠোরতা দান করেছিলেন, যা ইতিপূর্বে কখনো তাঁর মধ্যে দেখা যায়নি; আর উমরের মধ্যে কঠোরতা থাকলেও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই নিহিত ছিল যে, তিনি আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস, আবু উবায়েদ সাকাফি, নুমান ইবনু মুকাররিন ও সায়িদ ইবনু আমির রা.-দের মতো কোমলপ্রাণ ব্যক্তির সেবা নিয়েছিলেন, যাঁরা পরহেজগারি ও ইবাদত-বন্দেগিতে ছিলেন খালিদ থেকে অনেক অনেক এগিয়ে। এর ফল দাঁড়িয়েছিল, খিলাফতগ্রহণের পর তাঁর মধ্যে এত নম্রতা দেখা যাচ্ছিল, যা ইতিপূর্বে কখনো পরিলক্ষিত হয়নি。
আল্লামা ইবনু তাইমিয়া এ ব্যাপারে সুন্দর আলোচনা করেছেন। তিনি লেখেন, 'আবু বকর ইরতিদাদবিরোধী যুদ্ধসহ ইরাক ও শামের বিজয়াভিযানে খালিদের সেবা নিতে থাকেন। যদিও ব্যাখ্যা-সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর থেকে মাঝেমধ্যে ভুল হয়ে যেত। অনেকবার তাঁর কাছে এ নিয়ে অভিযোগও করা হয়; কিন্তু তিনি একবারও তাঁকে পদচ্যুত করেননি। শুধু তিরস্কারকে যথেষ্ট মনে করতেন। তাঁকে তো সেনাপতি হিসেবে রাখাই ছিল উম্মাহর জন্য কল্যাণকর। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। নিয়ম হচ্ছে, সর্বোচ্চ নেতাদের মধ্যে যদি নম্রতা থাকে, তাহলে সহযোগী হিসেবে কোনো কঠোর ব্যক্তিকে নির্বাচন করা বিধেয়। আর যদি সর্বোচ্চ ব্যক্তির মধ্যে কঠোরতা থাকে, তাহলে তার সহকারী হিসেবে নম্র প্রকৃতির লোক নির্বাচন করা আবশ্যক, যাতে ভারসাম্য রক্ষা পায়। এ জন্যই আবু বকর রা. খালিদের জন্য সহকারী নিয়োগ দেওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছিলেন; আর উমর রা. তাঁকে পদচ্যুত করে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত বানানোকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। খালিদ ছিলেন উমরের মতো কঠোর প্রকৃতির আর ইবনুল জাররাহ ছিলেন আবু বকরের মতো কোমলপ্রাণ। তাঁরা উভয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ সঠিক পদ্ধতি। এভাবেই তাঁদের শাসনকালে ভারসাম্য পূর্ণমাত্রায় বহাল ছিল এবং আদর্শপুরুষ হিসেবে নবিজির সত্যিকার খলিফা হতে পেরেছিলেন তাঁরা। রাসুল ﷺ বলেছেন, 'আমি রহমতের নবি, আমি মালহামার (যুদ্ধের) নবি।

টিকাঃ
১৬৭ রুবাব হচ্ছে বনু তামিমের একটি শাখা।
১৬৮ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৬।
১৯৬ এটি নাজদে বনু আসাদের এলাকাধীন একটি কূপের নাম।
১৭০ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৭।
১৭১ নাকদুন ইলমিয়ুন আলা কিতাবিল ইসলামি ওয়া উসুলিল হুকমি: ৩৩।
১৭২ মাকালাতুল কাওসারি: ৩১২; জাহাবির আল-খুলাফাউর রাশিদুন: ৩৬ থেকে উদ্ভূত।
১৭৩ তাবাকাতু ফুহুলিশ শুআরা, তাহকিক মাহমুদ শাকির: ১৭২।
১৭৪ শারহুন নাবাবি আলা সাহিহিল মুসলিম: ১/২০৩।
১৭৫ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৩১।
১৭৬ আল-খিলাফাতু ওয়াল খুলাফাউর রাশিদুন, বাহানসাবি: ১১২; আল-খুলাফাউর রাশিদুন, নাজ্জার: ৫৮।
১৭৭ ফাতহুল বারি: ৭/১০১।
১৭৮ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক আফজালুস সাহাবাতি ওয়া আহাক্কুহুম বিল খিলাফাতি: ১৯৩-১৯৪।
১৭৯ মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৮/১৪৪।
১৮০ মুসনাদু আহমাদ: ৪/৩৯৫-৪০৪-৪০৭।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 উম্মু তামিমের সঙ্গে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বিয়ে

📄 উম্মু তামিমের সঙ্গে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বিয়ে


১. উম্মু তামিমের সঙ্গে খালিদের বিয়ে মালিক ইবনু নুবায়রার স্ত্রী উম্মু তামিমের নাম ছিল লায়লা বিনতু সিনান আল মিনহাল। তার সঙ্গে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বিয়ের ঘটনা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। কিছু মানুষ নিজেদের কুৎসিত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এ নিয়ে খালিদের প্রতি তীর্যক মন্তব্য করে থাকে, রটিয়ে থাকে বিভিন্ন ধরনের অপবাদ; অথচ বাস্তবতার সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। বিশুদ্ধ ইলমি তাহকিকের সামনে এসব ধোপে টিকবে না।
ঘটনা হচ্ছে, কিছুসংখ্যক মানুষ খালিদের ওপর এই অপবাদ রটিয়ে থাকে যে, উম্মু তামিম বন্দি হওয়ামাত্রই তাকে বিয়ে করে ফেলেন। তিনি নাকি তার সৌন্দর্যে আত্মহারা ছিলেন, তাকে ভালোবাসতেন। তাকে ছাড়া তিনি একমুহূর্তও ধৈর্যধারণ করতে পারেননি। তাদের এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এটা বিয়ে ছিল না; বরং এ ছিল একপ্রকার ব্যভিচার (নাউজুবিল্লাহ)। তবে সত্য হচ্ছে, তাদের এ দাবি ও প্রচারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সত্যের সঙ্গে এর দূরতম সম্পর্ক নেই। পুরানো কোনো ঐতিহাসিক উৎসে এ ব্যাপারে সামান্য কোনো ইঙ্গিতও খুঁজে পাওয়া যায় না।
আল্লামা মাওয়ারদি রাহ. স্পষ্টভাবে লেখেন, খালিদ রা. কর্তৃক মালিক ইবনু নুবায়রাকে হত্যার একমাত্র কারণ ছিল সে জাকাত আটকে রেখেছিল। এ কারণে তার রক্ত হালাল হয়ে গিয়েছিল। একই কারণে উম্মু তামিমের সঙ্গে তার বৈবাহিক সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। মুরতাদদের নারীদের ব্যাপারে শরিয়তের বিধান হচ্ছে, তারা দারুল হারবে গিয়ে মিলিত হলে তাদের শুধু বন্দি করা যাবে, হত্যা করা যাবে না। ইমাম সারাখসি রাহ. এ কথার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
উম্মু তামিম বন্দি হলে খালিদ তাকে নিজের জন্য নির্ধারণ করেন। এরপর হালাল হয়ে গেলে তার সঙ্গে সহবাস করেন। শায়খ আহমাদ শাকির এই ঘটনায় সংযুক্তি করে বলেন, 'খালিদ উম্মু তামিম ও তার ছেলেকে “মিলকে ইয়ামিন”-এর ভিত্তিতে গ্রহণ করেছিলেন। কেননা, তারা ছিল যুদ্ধবন্দি। এ ধরনের নারীদের কোনো ইদ্দত পালন করতে হয় না। তবে গর্ভবতী হলে প্রসবকাল পর্যন্ত মালিকের জন্য ভোগ করা হারাম। গর্ভবতী না হলে একবার হায়িজ হলেই সে হালাল হয়ে যায়। এরপর তার সঙ্গে সম্ভোগ বৈধ। এ হুকুম শরিয়তসিদ্ধ তথা জায়িজ। এ নিয়ে সমালোচনার কোনো অবকাশ নেই।' কিন্তু খালিদের শত্রুরা সুযোগটাকে তাদের কুৎসিত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে অস্ত্র হিসেবে নেয়। তাদের ধারণা, মালিক ইবনু নুবায়রা মুসলিম ছিল; খালিদ রা. তার স্ত্রীকে পেতে তাকে হত্যা করেছিলেন।
একইভাবে এই অপবাদ আরোপ করা হয় যে, এর মাধ্যমে খালিদ রা. আরবের চিরন্তন ঐতিহ্য ভঙ্গ করেছিলেন। যেমন: আক্কাদ বলেন, 'ইবনু নুবায়রাকে হত্যা করে রণাঙ্গনেই তার সঙ্গে সহবাস ছিল আরবদের জাহিলি ও ইসলামি যুগের ঐতিহ্যের পরিপন্থি। একইভাবে এটা ছিল মুসলিমদের সংস্কৃতি ও শরিয়তের পরিপন্থি।'
কিন্তু আক্কাদের এ কথায় সত্যের লেশমাত্র নেই। আরবদের কাছে ইসলামপূর্ব যুগে যুদ্ধে শত্রুর ওপর বিজয়ের পর শত্রুর নারীদের বিয়ে করার ব্যাপক নজির রয়েছে। তারা বরং এ নিয়ে গৌরব প্রকাশ করত। অনুরূপ তাদের সমাজে বন্দি নারীদের প্রচুর সন্তান ছিল। হাতিম তাইয়ের ভাষ্য লক্ষ করুন,
তারা সন্তুষ্ট চিত্তে আমাদের সঙ্গে তাদের মেয়েদের বিয়ে দেয়নি; কিন্তু আমরা তরবারির জোরে তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছি। তোমরা আমাদের মধ্যে যুদ্ধবন্দি নারীদের প্রচুর সন্তান দেখতে পাবে তারা বাহাদুরদের মুখোমুখি হলে প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়ে আঘাত করে। তারা হাতের বর্শায় গেঁথে পতাকা উঠিয়ে থাকে; যেগুলো শুরুতে থাকে সাদা, এরপর শত্রুর খুনে লাল হয়ে যায়。
২. শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে উম্মু তামিমের সঙ্গে খালিদের বিয়ে শরিয়তের দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে, খালিদ রা. কেবল একটা মুবাহ কাজ করেছেন; শরিয়তের বাইরে যাননি। এমনটা খোদ রাসুল থেকে প্রমাণিত। তিনি নিজেই গাজওয়ায়ে মুরায়সির পর জুওয়াইরিয়া রা.-কে বিয়ে করেছিলেন এবং সে যুদ্ধ গোত্রের জন্য অত্যন্ত বরকতময় প্রমাণিত হয়েছিল। সে গোত্রের প্রায় শতাধিক মানুষকে মুক্ত করা হয়েছিল। তারা নবিজির শ্বশুরালয়ের সম্পর্কযুক্ত হয়ে গিয়েছিল। সে বিয়ের বরকতেই জুওয়াইরিয়ার পিতা হারিস ইবনু জিরার মুসলমান হন। একইভাবে নবিজি খায়বারযুদ্ধের পরপরই সাফিয়া বিনতু হুয়াই ইবনু আখতাবের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ এবং খায়বারে অথবা ফেরার পথে বাসর যাপন করেছিলেন। যেহেতু নবিজি থেকেই এ বিষয়টা প্রমাণিত, তাই এর জন্য কোনো প্রকার সমালোচনা থাকতে পারে না। এ অভিযোগ এমনিতেই ফালতু প্রমাণিত হয়ে যায়।
অনুরূপ ড. মুহাম্মাদ হুসাইন হায়কাল খালিদের ওপর থেকে অপবাদ দূর করতে যে পন্থা অবলম্বন করেছেন, তা-ও গ্রহণযোগ্য নয়। ড. হায়কাল তো খালিদের ভুলের ওপর পর্দা ফেলতে গিয়ে ইসলামের জানাজাই পড়ে ফেলেছেন! খালিদসহ উম্মাহর সবাই ছিলেন শরিয়তের অধীন। শরিয়ত সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ব্যক্তির সাফাই গাওয়ার অর্থ কখনো শরিয়তকে বিকৃতকরণ হতে পারে না। হায়কাল যে পথ অবলম্বন করেছেন, তার সারাংশ হচ্ছে, 'আরবদের সংস্কৃতির বিপরীতে কোনো বন্দি মহিলাকে বিয়ে করা এবং গর্ভাশয় পবিত্র হওয়ার আগে যৌনসম্ভোগ যদি ইসলামের মহান কোনো গাজীর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে তা অপরাধ গণ্য হতে পারে না। অবশ্যই তাঁর অধিকার আছে যে, যুদ্ধবন্দি নারীরা তাঁর "মিলকে ইয়ামিন" হবে। গর্ভাশয় পবিত্র হওয়ার আগেই তিনি যুদ্ধবন্দি মহিলাকে সম্ভোগ করতে পারবেন।'
শরিয়তের বিধানে সামঞ্জস্য করতে গিয়ে অতি বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি কাম্য হতে পারে না। আর এ উদ্দেশ্যে খালিদের মতো সত্তাকে নির্বাচিত করা তো রীতিমতো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। বিশেষ করে এর ফলে যদি রাষ্ট্রপরিচালনায় কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
শায়খ আহমাদ শাকির হায়কালের এই কান্ডজ্ঞানহীন মন্তব্যের বিরোধিতায় লেখেন, 'সন্দেহ হচ্ছে, তিনি তো নেপোলিয়নের মতো ইউরোপীয় বাদশাহদের কুকীর্তি ঢাকতে ইংরেজ লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত নন? তারা যেমন তাদের নেতাদের প্রতিষ্ঠিত অপরাধ ঢাকতে বা হালকা করতে তাদের কৃতিত্বপূর্ণ কর্মগুলোকে আড়কাঠি হিসেবে ব্যবহার করে থাকে, খুব সম্ভব এমন মানসিকতায় তাড়িত হয়েই ড. হায়কালও এই দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন করে নিয়েছেন যে, আমাদের সোনালি যুগের আদর্শপুরুষরাও বদমাশ ইংরেজ নেতাদের মতোই ছিলেন। নতুবা শরিয়তবিষয়ক বাড়াবাড়ি পূর্ণ কথাগুলো খালিদের মতো ব্যক্তির সঙ্গে জোড়ার সাহস পেতেন না। এই চিন্তাধারা মূলত দীন ও চরিত্রবিধ্বংসী。

টিকাঃ
১৮১ পাকিস্তানের জেনারেল আকরাম তাঁর সাইফুল্লাহ হজরত খালিদ রা. গ্রন্থের ১৯৮ পৃষ্ঠায় লেখেন, 'খালিদ রা. সে রাতেই তাঁকে বিয়ে করেন।'
১৮২ আল-আহকামুস সুলতানিয়াহ: ৪৭; হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২২৯।
১৮৩ আল-মাবসুত: ১০/১১১; হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২২৯।
১৮৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৬।
১৮৫ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৩০।
১৮৬ আবকারিয়াতুস সিদ্দিক: ৭০।
১৮৭ আল-ইকদুল ফরিদ: ইবনু আবদি রাব্বিহি: ৭/১২৩।
১৮৮ সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/২৯০-২৯৫।
১৮৯ প্রাগুক্ত: ২/২৩৯।
১৯০ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৩৭।
১৯১ আস-সিদ্দিক আবু বাকার: ১৪০।
১৯২ হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৩২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00