📄 বুজাখাযুদ্ধে বন্দিদের সঙ্গে খালিদের আচরণ
বন্দিদের একজন ছিল উয়াইনা ইবনু হিসন। খালিদ রা. উচিত শিক্ষা দিতে তাকে শক্ত করে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মদিনায় প্রবেশের সময় তার উভয় হাত ঘাড়ের সঙ্গে বাঁধা ছিল। তার সঙ্গে এমন আচরণের উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তার পরিণতি দেখে অন্য অপরাধীরা শিক্ষা নেয়। সে ওই অবস্থায় মদিনায় প্রবেশ করছিল; আর মদিনার শিশু-কিশোররা তাকে নিয়ে উপহাসে মেতে উঠছিল। তারা এই বলে কচি হাত দ্বারা তাকে ঘুসি মারছিল, 'আল্লাহর দুশমন, তুই ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলি।' সে বলছিল, 'আমি তো আদতে ইমানই আনিনি!'
এরপর তাকে আবু বকরের কাছে নিয়ে আসা হলে তিনি তার সঙ্গে এমন ক্ষমাসুলভ আচরণ করেন, যা সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। আবু বকর তার হাত খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তাকে তাওবা করান। উয়াইনা তখন নিষ্ঠ চিত্তে তাওবা করে এবং নিজের ভুল স্বীকারপূর্বক ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে ইসলামগ্রহণ করে। এরপর আজীবন ইসলামে অটল থাকে।
অপরদিকে তুলায়হা পালিয়ে বনু কালবের আশ্রয়ে চলে যায়। আবু বকরের ইনতিকাল পর্যন্ত সে ওখানেই থাকে। এরপর বনু আসাদ, গাতফান ও আমিরের ইসলামগ্রহণের কথা জানতে পেরে সে-ও মুসলমান হয়। আবু বকরের খিলাফতকালেই সে উমরা পালন করতে মক্কার দিকে রওনা হয়। সে যখন মদিনার কাছাকাছি চলে আসে, তখন লোকজন আবু বকরকে তার সম্পর্কে অবহিত করলে তিনি বলেন, 'আমি কী করতে পারি? তাকে ছেড়ে দাও; আল্লাহ তাকে ইসলামের দিকে পথপ্রদর্শন করেছেন।' ইবনু কাসির রাহ. উল্লেখ করেছেন, এর পর তুলায়হা ইসলামের দিকে ফিরে আসে এবং সিদ্দিকে আকবরের শাসনামলেই মক্কায় উমরার উদ্দেশ্যে গমন করে। তবে লজ্জায় সে আবু বকরের সঙ্গে তাঁর জীবদ্দশায় সাক্ষাৎ করেনি。
টিকাঃ
১৬২ আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা: ৮৭।
১৬৩ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৫৯।
📄 আবু বকরের সাবধানতা
একসময় যারা মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, আবু বকর রা. ইরাক ও শামের বিজয়াভিযানসমূহে তাদের অংশগ্রহণের অধিকার দেননি। এটি ছিল উম্মাহর কল্যাণে তাঁর সাবধানতা। কারণ, তাদের ওপর আস্থা রাখা ছিল ঝুঁকির ব্যাপার। হতে পারে, তাদের আনুগত্য ছিল কেবল মুসলিমদের শক্তির ভয়ে। কারণ, আবু বকর ছিলেন মানুষের কল্যাণের পথনির্মাতা। মানুষ তাঁর কথা ও কাজের আনুগত্য করত। তাই যদিও এর ফলে কিছুসংখ্যক মানুষের মর্যাদাহানি হচ্ছিল, তবু উম্মাহর সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যেই তিনি এ ক্ষেত্রে উদারতার চেয়ে সাবধানতার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেন। উম্মাহ এ থেকে এক বিরাট শিক্ষা নিতে পারে। অর্থাৎ, এমনসব মানুষের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা যাবে না, যারা অতীতে ধর্মদ্রোহিতায় লিপ্ত ছিল; কিন্তু পরে দীনের বৃত্তে ঢুকে পড়েছে। এমন মানুষের ওপর নিবিড় আস্থা রাখা, উদারতা দেখানো এবং তাদের হাতে নেতৃত্বভার দেওয়ার কারণে উম্মাহকে যুগে যুগে বড় ধরনের দুর্যোগময় পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে। তবে সাবধানতা অবলম্বনের অর্থ এই নয় যে, আদতেই তাদের বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হবে না। কিন্তু এ ধরনের মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সিদ্দিকি আদর্শ হচ্ছে শ্রেয়。
টিকাঃ
১৬৪ প্রাগুক্ত: ৯/৬৮।
📄 তুলায়হার ইসলামগ্রহণ
তুলায়হা ইসলামগ্রহণ করেছিল। এরপর উমর রা. খলিফা মনোনীত হলে সে তাঁর হাতে বায়আতের জন্য মদিনায় উপস্থিত হয়। উমর বলেন, 'তুমি তো উক্কাশা ইবনু মিহসান ও সাবিত ইবনু আকরামের হত্যাকারী। আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে কখনো পছন্দ করতে পারি না।' তুলায়হা বলে, 'আমিরুল মুমিনিন, আপনি আমাকে এমন দুই ব্যক্তির নামে অপরাধী সাব্যস্ত করেছেন, আল্লাহ আমার হাতে যাঁদের বিশাল মর্যাদা দান করেছেন। তাঁদের তিনি লজ্জিত ও অপমানিত করেননি।' এ কথা শুনে উমর রা. তার বায়আত নেন। এরপর বলেন, 'হে প্রতারিত ব্যক্তি, তোমার জ্যোতিষবাদের কিছু কি বাকি রয়েছে?' তুলায়হা বলে, 'কামারের চুলার একটা অথবা দুটো ফুঁক!'
এরপর তুলায়হা তাঁর গোত্রের কাছে চলে যান। সেখানে কিছুদিন বসবাসের পর ইরাক গিয়ে স্থায়ী হন। তাঁর ইসলামগ্রহণ ছিল অন্তর থেকে। এ ক্ষেত্রে তাঁকে সমালোচনায় বিদ্ধ করা যাবে না। তুলায়হা তাঁর দুর্বলতার ওপর লজ্জিত ও মর্মাহত হয়ে বলেছিলেন,
উক্কাশা ও সাবিত; এরপর মাবাদের মৃত্যুর ওপর আমি বড়ই লজ্জিত। উভয়কে হত্যার চেয়ে আমার বড় অপরাধ ছিল স্বেচ্ছায় জেনেবুঝে ইসলাম থেকে প্রত্যাবৃত্ত হওয়া। বিপদ অনেকই গেছে, এর মধ্যে ছিল দেশান্তরিত হওয়া। আমি তো বরাবরই দেশান্তরী জীবন কাটিয়েছি। সিদ্দিক কি আমার ফিরে আসাকে গ্রহণ করে নেবেন? তিনি কি বায়আতের জন্য তাঁর হাতটি আমার দিকে মেলে ধরবেন? ভ্রান্তির পর আমি কালিমায়ে শাহাদাতের সাক্ষ্য দিচ্ছি এই সাক্ষ্যে আমি নিশ্চিত যে, আমি মুলহিদ নই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মানুষের রবই আমার রব আমি লাঞ্ছিত আর মুহাম্মাদের দীনই সঠিক。
টিকাঃ
১৬৫ প্রাগুক্ত: ৯/৫৯; তারিখুত তাবারি: ৪/৮১।
১৬৬ দিওয়ানুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৮৬।