📄 বুজাখাযুদ্ধের ফল
নবুওয়াতের এক মিথ্যা দাবিদারের ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলে আরবের বড় একটা অংশ পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে। বুজাখার পরাজয়ের পর বনু আমির এই বলে তাদের অবস্থান থেকে ফিরে আসে, 'আমরা যেখান থেকে বেরিয়েছিলাম, সেখানে ঢুকে যাচ্ছি।' খালিদ রা. তাদের থেকে সেই শর্তে ইসলামের বায়আত নেন, যে শর্তে ইতিপূর্বে বুজাখাবাসীসহ বনু আসাদ, গাতফান ও তাই থেকে বায়আত নিয়েছিলেন। তিনি ইসলামের নামে নিজের হাত তাদের ওপর রেখে দেন।
📄 ইরতিদাদি ফিতনার কুশীলবদের করুণ পরিণতি
খালিদ রা. আসাদ, গাতফান, হাওয়াজিন, সালিম ও তাই গোত্রের ওপর এই শর্ত চাপিয়ে দেন যে, সেই লোকদের উপস্থিত করতে হবে, যারা ইরতিদাদি ফিতনা চলাকালে মুসলিমদের আগুনে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁদের অঙ্গ বিকৃত করে অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছিল। তারা ওদের তাঁর সামনে নিয়ে এলে তিনি অপরাধের ভিত্তিতে ওদের কাউকে আগুনে ঠেলে দেন, কাউকে পাথর দ্বারা খ্যাঁতলে দেন, কাউকে পাহাড়ের চূড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। অনেককে কূপে উপুড় করে ঝুলিয়ে রাখেন। কতিপয় পাপিষ্ঠকে তির মেরে হত্যা করেন। বাকরা ইবনু হুবায়রাসহ কিছু বন্দিকে মদিনায় খলিফার কাছে পাঠিয়ে দেন।
এ ছাড়া আবু বকরের কাছে এই মর্মে চিঠি পাঠান যে, 'বনু আমির ইসলাম থেকে ফিরে যাওয়ার পর পুনরায় ইসলামে চলে এসেছে। যারা আমার মোকাবিলায় যুদ্ধ করেছে কিংবা আমার কাছে সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, আমি এই শর্ত ছাড়া তাদের বায়আত নিইনি যে, তারা সে-সকল লোককে আমার কাছে অর্পণ করবে, যারা মুসলিমদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিল। এ পর্যায়ে আমি বাকরা ও তার সাথিদের আপনার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি।'
টিকাঃ
১৬১ তারিখুত তাবারি: ৪/৮২।
📄 বুজাখাযুদ্ধে বন্দিদের সঙ্গে খালিদের আচরণ
বন্দিদের একজন ছিল উয়াইনা ইবনু হিসন। খালিদ রা. উচিত শিক্ষা দিতে তাকে শক্ত করে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মদিনায় প্রবেশের সময় তার উভয় হাত ঘাড়ের সঙ্গে বাঁধা ছিল। তার সঙ্গে এমন আচরণের উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তার পরিণতি দেখে অন্য অপরাধীরা শিক্ষা নেয়। সে ওই অবস্থায় মদিনায় প্রবেশ করছিল; আর মদিনার শিশু-কিশোররা তাকে নিয়ে উপহাসে মেতে উঠছিল। তারা এই বলে কচি হাত দ্বারা তাকে ঘুসি মারছিল, 'আল্লাহর দুশমন, তুই ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলি।' সে বলছিল, 'আমি তো আদতে ইমানই আনিনি!'
এরপর তাকে আবু বকরের কাছে নিয়ে আসা হলে তিনি তার সঙ্গে এমন ক্ষমাসুলভ আচরণ করেন, যা সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। আবু বকর তার হাত খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তাকে তাওবা করান। উয়াইনা তখন নিষ্ঠ চিত্তে তাওবা করে এবং নিজের ভুল স্বীকারপূর্বক ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে ইসলামগ্রহণ করে। এরপর আজীবন ইসলামে অটল থাকে।
অপরদিকে তুলায়হা পালিয়ে বনু কালবের আশ্রয়ে চলে যায়। আবু বকরের ইনতিকাল পর্যন্ত সে ওখানেই থাকে। এরপর বনু আসাদ, গাতফান ও আমিরের ইসলামগ্রহণের কথা জানতে পেরে সে-ও মুসলমান হয়। আবু বকরের খিলাফতকালেই সে উমরা পালন করতে মক্কার দিকে রওনা হয়। সে যখন মদিনার কাছাকাছি চলে আসে, তখন লোকজন আবু বকরকে তার সম্পর্কে অবহিত করলে তিনি বলেন, 'আমি কী করতে পারি? তাকে ছেড়ে দাও; আল্লাহ তাকে ইসলামের দিকে পথপ্রদর্শন করেছেন।' ইবনু কাসির রাহ. উল্লেখ করেছেন, এর পর তুলায়হা ইসলামের দিকে ফিরে আসে এবং সিদ্দিকে আকবরের শাসনামলেই মক্কায় উমরার উদ্দেশ্যে গমন করে। তবে লজ্জায় সে আবু বকরের সঙ্গে তাঁর জীবদ্দশায় সাক্ষাৎ করেনি。
টিকাঃ
১৬২ আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা: ৮৭।
১৬৩ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৫৯।
📄 আবু বকরের সাবধানতা
একসময় যারা মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, আবু বকর রা. ইরাক ও শামের বিজয়াভিযানসমূহে তাদের অংশগ্রহণের অধিকার দেননি। এটি ছিল উম্মাহর কল্যাণে তাঁর সাবধানতা। কারণ, তাদের ওপর আস্থা রাখা ছিল ঝুঁকির ব্যাপার। হতে পারে, তাদের আনুগত্য ছিল কেবল মুসলিমদের শক্তির ভয়ে। কারণ, আবু বকর ছিলেন মানুষের কল্যাণের পথনির্মাতা। মানুষ তাঁর কথা ও কাজের আনুগত্য করত। তাই যদিও এর ফলে কিছুসংখ্যক মানুষের মর্যাদাহানি হচ্ছিল, তবু উম্মাহর সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যেই তিনি এ ক্ষেত্রে উদারতার চেয়ে সাবধানতার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেন। উম্মাহ এ থেকে এক বিরাট শিক্ষা নিতে পারে। অর্থাৎ, এমনসব মানুষের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা যাবে না, যারা অতীতে ধর্মদ্রোহিতায় লিপ্ত ছিল; কিন্তু পরে দীনের বৃত্তে ঢুকে পড়েছে। এমন মানুষের ওপর নিবিড় আস্থা রাখা, উদারতা দেখানো এবং তাদের হাতে নেতৃত্বভার দেওয়ার কারণে উম্মাহকে যুগে যুগে বড় ধরনের দুর্যোগময় পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে। তবে সাবধানতা অবলম্বনের অর্থ এই নয় যে, আদতেই তাদের বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হবে না। কিন্তু এ ধরনের মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সিদ্দিকি আদর্শ হচ্ছে শ্রেয়。
টিকাঃ
১৬৪ প্রাগুক্ত: ৯/৬৮।