📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 আদি ইবনু আবি হাতিমের প্রচেষ্টা

📄 আদি ইবনু আবি হাতিমের প্রচেষ্টা


১. আদি কর্তৃক নিজের গোত্রকে উপদেশ এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
আদি ইবনু আবি হাতিম রা. তাঁর গোত্রে পৌঁছে ইসলামের প্রতি তাদের আহ্বান জানান। তারা প্রথমে ঔদ্ধত্যের সুরে জবাব দেয়, 'আমরা আবু ফুসাইলের হাতে বায়আত হব না।' জবাবে আদি বলেন, 'তোমাদের কাছে এমন এক জাতি এসে পৌঁছেছে, যারা তোমাদের নারীদের নিজেদের জন্য হালাল করে নেবে। এরপর তোমরা তাঁকে আবু ফাহাল উপনামে ডাকতে বাধ্য হবে। এবার তোমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারো কী করবে।' গোত্রের লোকজন তখন তাঁকে বলে, 'তাহলে তুমি তাদের কয়েকটা দিন থামিয়ে রাখো, যাতে আমাদের যে-সকল যুবক ইতিমধ্যে তুলায়হার কাছে বুজাখায় চলে গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে পারি। আমরা যদি এখনই তুলায়হার বিরুদ্ধে চলে যাই, তাহলে তার কাছে থাকা আমাদের যুবকদের সে হত্যা করবে; অথবা পণবন্দি করে নিতে পারে।' এরপর আদি রা. সুনাহ নামক স্থানে খালিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর কাছে আবেদন জানান, 'অনুগ্রহ করে আপনি এখানে তিন দিন অপেক্ষা করুন। আমি আপনার কাছে ৫০০ যোদ্ধা পাঠিয়ে দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে নিয়ে আপনি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন। এখনই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাদের জাহান্নামি বানানো থেকে এটা উত্তম হবে বলে মনে করি।' খালিদ তাঁর কথা মেনে নেন। এরপর আদি তাদের ইসলামগ্রহণের সুসংবাদ নিয়ে খালিদের কাছে পৌঁছান।

এভাবে আদি তাঁর গোত্রের উভয় শাখা তথা বনু গাওস ও জাদিলা থেকে এ বিষয়ে নিশ্চয়তা আদায় করেন যে, তারা তুলায়হার সঙ্গ ত্যাগ করে খালিদের দলে যোগ দেবে। বনু তাইয়ের এই প্রত্যাবর্তন ও বিপ্লব বুজাখাযুদ্ধের ফলাফলে ব্যাপক অবদান রেখেছিল।

যখন মুসলিমদের জন্য সম্পদের প্রয়োজন ছিল অন্য সময়ের চেয়ে বেশি, ঠিক তখন আবু বকরের কাছে সর্বাগ্রে নিজ গোত্রের জাকাত নিয়ে উপস্থিত হওয়াটা ইতিহাসের পাতায় আদির মহান মর্যাদা ও কৃতিত্ব হিসেবে অক্ষয় হয়ে থাকবে। ইসলামগ্রহণের প্রথম দিন থেকেই তাঁর মধ্যে একজন বুদ্ধিদীপ্ত প্রাজ্ঞ ব্যক্তির প্রতিচ্ছবি ছিল। তিনি অন্তহীন সংযম ও সন্তুষ্ট চিত্তে ইসলামগ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম ও মুসলিমদের বিজয়ের ব্যাপারে তাঁর বিশ্বাস ছিল অটল পাথরের মতো। নবিজি যে দিন তাঁকে ইসলামে দীক্ষিত করেছিলেন, সে দিনই তাঁকে ইসলামের বিশাল বিজয়ের সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন। বনু আদির ইসলামে ফেরার নেপথ্যে তাঁর ইমানের দৃঢ়তারও একটা প্রভাব ছিল। তাঁর অল্পে তুষ্টি, সাবধানতা ও ধৈর্যের কোনো তুলনা ছিল না। তিনি নিজের গোত্রকে দ্বিধাগ্রস্ত থাকার সুযোগ না দিয়ে তাদের থেকে দেড় হাজার যোদ্ধা নিয়ে মুসলিমবাহিনীতে যোগ দেন। এ ঘটনাটা গোত্রে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে。

২. বনু আদির আবেদন ও খালিদের জবাব
এক বর্ণনায় আছে, বনু আদি খালিদের কাছে তাদের বংশীয় সহযোগী বনু আসাদের বিপরীতে বনু কায়েসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি চেয়েছিল। উত্তরে খালিদ বলেন, 'উভয় গোত্রের যার বিরুদ্ধে ইচ্ছা যুদ্ধ করতে পারো। তবে বনু কায়েস কিন্তু বনু আসাদ থেকে মোটেও দুর্বল নয়।' তখন আদি বলেন, 'আমার বংশের নিকটজনরাও যদি দীনকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আল্লাহর শপথ, বনু আসাদ একসময় আমাদের সহযোগী ছিল বলে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না, এমনটা হতে পারে না।' খালিদ বলেন, 'আদি, ওরা যার সঙ্গেই লড়াই করুক না কেন, তা জিহাদ গণ্য হবে। আপনি গোত্রের বিরোধিতা না করে বরং তারা যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ চালিয়ে যান। '

৩. আদির ইমানি শক্তি ও প্রজ্ঞা
এখানে আদির নিজের গোত্রের মতের বিরুদ্ধে যাওয়া মূলত তাঁর ইমানি শক্তি ও প্রজ্ঞার গভীরতার দলিল। বংশ ও রক্তের দিক থেকে অনেক দূরে থাকলেও তিনি মূলত আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। তাঁরাই ছিল তাঁর নিকটাত্মীয় পর্যায়ের। একই সঙ্গে এই ঘটনা থেকে খালিদের সামরিক প্রজ্ঞাও ফুটে ওঠে। তিনি আদিকে বলেছিলেন, 'আপনি আপনার গোত্রের চাহিদার বিরুদ্ধে যাবেন না। জিহাদের ওই ময়দানে তাদের নিয়ে যান, যেখানে গিয়ে তারা লড়াই করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।'

আদির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি তাঁর গোত্রকে মুসলিমবাহিনীতে যোগ দেওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং তাতে সফলতাও অর্জন করেছিলেন। খালিদের বাহিনীতে বনু তাইয়ের যোগ দেওয়া ছিল শত্রুবাহিনীর প্রথম পরাজয়। কারণ, জাজিরাতুল আরবে বনু তাই ছিল ঐতিহ্যবাহী ও শক্তিশালী একটা গোত্র। অন্যান্য গোত্র তাদের খুবই মূল্যায়ন করত। তাদের শক্তিসামর্থ্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে অন্য গোত্রগুলো তাদের সমীহ করত। এলাকায় তাদের প্রভাব ও সম্মান ছিল সবার ওপরে। প্রতিবেশী গোত্রগুলো তাদের সহযোগী হওয়ায় নিজেদের ধন্য মনে করত।

যখন কুফরের দলে দুর্বলতা আসে, তখন ইমান ও কুফরের বাহিনীতে যুদ্ধ বেঁধে যায়। আল্লাহ ইমানদারদের ভাগ্যে বিজয় ও সাহায্য নির্ধারণ করে দেন। দ্রুত তারা শত্রুদের হত্যা ও বন্দি করা শুরু করেন। এভাবেই শত্রুদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়। শুধু তারাই বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়, যারা আনুগত্য গ্রহণ করেছিল কিংবা পালিয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর জাজিরাতুল আরবে মুরতাদরা দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এরপর মুসলিমবাহিনীকে অন্যান্য জায়গায় মুরতাদদের পরাজিত করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি。

টিকাঃ
১৫৩. প্রাগুক্ত: ৯/৫৭。
১৫৪. প্রাগুক্ত: ৯/৬১。
১৫৫. তারিখুত তাবারি: ৪/৭৫。
১৫৬. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৬১。
১৫৭. আল-হারবুন নাফসিয়াহ মিন মানজুরিল ইসলামি, ড. আহমাদ নাওফাল: ২/১৪৩-১৪৪。

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খালিদের মোকাবিলায় তুলায়হার পরাজয়ের কারণ

📄 খালিদের মোকাবিলায় তুলায়হার পরাজয়ের কারণ


তুলায়হা আসাদির পরাজয়ের অনেক কারণ রয়েছে। যেমন:

মুসলিমরা অটল আকিদা, আল্লাহর সাহায্যের দৃঢ় বিশ্বাস এবং শাহাদাতের প্রবল আগ্রহ নিয়ে জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের প্রেরণা একটা অব্যর্থ ও তীক্ষ্ণ মানসিক অস্ত্র। খালিদ রা. শত্রুদের কাছে এই সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠাতেন, 'আমি তোমাদের কাছে এমন এক বাহিনী নিয়ে এসেছি, যাদের কাছে শাহাদাত এতটাই কাম্য, তোমাদের কাছে বেঁচে থাকা যতটা কাম্য।' মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে শত্রুদেরও এই অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং বুজাখার মাঠে তুলায়হা পরাজয়ের পর বিস্ময়ের সঙ্গে তার অনুসারীদের বলে, 'তোমাদের কী হলো! তোমরা পরাজিত হলে কেন।' তখন তাদের একজন বলে, 'এর কারণ হচ্ছে, আমাদের প্রত্যেকেই চেয়েছিল সে যেন তার সাথির পরে নিহত হয়; আর বিরোধী পক্ষের প্রত্যেকে চেয়েছিল, সে যেন তার সাথির আগে শহিদ হয়। '

মুসলিমদের দলে বনু তাইয়ের অংশগ্রহণ তাঁদের শক্তিমত্তা বৃদ্ধি এবং শত্রুদের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। একইভাবে উক্কাশা ইবনু মিহসান ও সাবিত ইবনু আকরামের শাহাদাত মুসলিমদের ক্ষোভের আগুন তীব্র করে তোলে। ফলে যুদ্ধের জন্য তাঁরা প্রস্তুত হয়ে যান। অনুরূপ আবু বকরের 'তাওরিয়া' ও (গোপনীয়তা) বনু তাইয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ফলে তারা সহযোগীদের সঙ্গ ছাড়তে এবং নিজ অবস্থানে অটল থাকতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। আবু বকর রা. অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে মানুষকে এই ধন্দে ফেলে রাখেন যে, এই বাহিনী মূল রণক্ষেত্র এড়িয়ে খায়বারের দিকে যাচ্ছে।

অনুরূপ বনু তাইকে তাদের চাহিদামতো বনু কায়েসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি প্রদানের প্রভাবও ছিল অত্যন্ত গভীর। খালিদ রা. যদি আদির চাহিদামতো বনু কায়েসের পরিবর্তে বনু আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তাদের বাধ্য করতেন, তাহলে বনু তাই হয়তো যুদ্ধের ব্যাপারে দুর্বলতা প্রদর্শন করত। এ ছাড়া আরও কিছু কারণ ছিল।

টিকাঃ
১৫৮. হারকাতুর রিদ্দাহ: ২৮৯。
১৫৯. তারিখুল খামসিন, দিয়ার বিকরি: ২/২০৭; হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৮৯。
১৬০. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা., শিত খাত্তাব ৯৬-৯৭; হুরুবুর রিদ্দাহ, আহমাদ সায়িদ: ১২৪।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বুজাখাযুদ্ধের ফল

📄 বুজাখাযুদ্ধের ফল


নবুওয়াতের এক মিথ্যা দাবিদারের ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলে আরবের বড় একটা অংশ পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে। বুজাখার পরাজয়ের পর বনু আমির এই বলে তাদের অবস্থান থেকে ফিরে আসে, 'আমরা যেখান থেকে বেরিয়েছিলাম, সেখানে ঢুকে যাচ্ছি।' খালিদ রা. তাদের থেকে সেই শর্তে ইসলামের বায়আত নেন, যে শর্তে ইতিপূর্বে বুজাখাবাসীসহ বনু আসাদ, গাতফান ও তাই থেকে বায়আত নিয়েছিলেন। তিনি ইসলামের নামে নিজের হাত তাদের ওপর রেখে দেন।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 ইরতিদাদি ফিতনার কুশীলবদের করুণ পরিণতি

📄 ইরতিদাদি ফিতনার কুশীলবদের করুণ পরিণতি


খালিদ রা. আসাদ, গাতফান, হাওয়াজিন, সালিম ও তাই গোত্রের ওপর এই শর্ত চাপিয়ে দেন যে, সেই লোকদের উপস্থিত করতে হবে, যারা ইরতিদাদি ফিতনা চলাকালে মুসলিমদের আগুনে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁদের অঙ্গ বিকৃত করে অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছিল। তারা ওদের তাঁর সামনে নিয়ে এলে তিনি অপরাধের ভিত্তিতে ওদের কাউকে আগুনে ঠেলে দেন, কাউকে পাথর দ্বারা খ্যাঁতলে দেন, কাউকে পাহাড়ের চূড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। অনেককে কূপে উপুড় করে ঝুলিয়ে রাখেন। কতিপয় পাপিষ্ঠকে তির মেরে হত্যা করেন। বাকরা ইবনু হুবায়রাসহ কিছু বন্দিকে মদিনায় খলিফার কাছে পাঠিয়ে দেন।
এ ছাড়া আবু বকরের কাছে এই মর্মে চিঠি পাঠান যে, 'বনু আমির ইসলাম থেকে ফিরে যাওয়ার পর পুনরায় ইসলামে চলে এসেছে। যারা আমার মোকাবিলায় যুদ্ধ করেছে কিংবা আমার কাছে সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, আমি এই শর্ত ছাড়া তাদের বায়আত নিইনি যে, তারা সে-সকল লোককে আমার কাছে অর্পণ করবে, যারা মুসলিমদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিল। এ পর্যায়ে আমি বাকরা ও তার সাথিদের আপনার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি।'

টিকাঃ
১৬১ তারিখুত তাবারি: ৪/৮২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00