📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বনু জাদিলা অভিমুখে খালিদ

📄 বনু জাদিলা অভিমুখে খালিদ


এর পর খালিদ বনু জাদিলা অভিমুখে বের হন। আদি তখনো এগিয়ে এসে বলেন, 'আমাকে কয়েকটা দিনের অবকাশ দিন, ইনশাআল্লাহ আমি তাদেরও আপনার কাছে নিয়ে আসছি। আমি যথেষ্ট আশাবাদী যে, আল্লাহ তাদেরও বনু গাওসদের মতো রক্ষা করবেন।' সুযোগ পেয়ে আদি রা. তাদের কাছে যান এবং নাছোড়বান্দার মতো তাদের পেছনে লেগে থাকেন। একপর্যায়ে তারা আদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলামের দিকে ফিরে আসে। তাদের ১ হাজার যোদ্ধা মুসলিমবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। এভাবে আদি তাঁর গোত্রের উভয় শাখার জন্য একজন মহান ত্রাতা ও বরকতময় সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হন。

টিকাঃ
১৪৭. তারতিবু ওয়া তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-খিলাফাতু আবি বাকরিন, ড. মুহাম্মাদ সামিল সুলামি : ১০২。
১৪৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩২২。

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বুজাখার যুদ্ধ এবং বনু আসাদের বিদ্রোহ দমন

📄 বুজাখার যুদ্ধ এবং বনু আসাদের বিদ্রোহ দমন


খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বনু আদির ব্যাপারটা সফলভাবে সমাধানের পর সেখান থেকে বেরিয়ে 'আজা' ও 'সালমা'য় যান। এরপর সেনাবিন্যাস করে তুলায়হার মুখোমুখি হন। তখন অনেক গোত্র দেখতে চেয়েছিল কারা বিজয়ী হয়। তুলায়হা তার গোত্র ও সহযোগী গোত্রগুলো নিয়ে ময়দানে চলে আসে। বনু ফাজারার উয়াইনা ইবনু হিসনও ৭০০ সেনা নিয়ে তার সঙ্গে যোগ দেয়। সেনাসারি বিন্যস্ত করার পর সে নিজেকে চাদরে জড়িয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যাচ্ছিল। অপেক্ষা করছিল তার কল্পিত ওহি অবতরণের। ইতিমধ্যে উয়াইনা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। যুদ্ধ করতে করতে একসময় সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন তুলায়হার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, 'কী খবর, জিবরিল এসেছিলেন?' তুলায়হা জবাব দেয়, 'না।' উয়াইনা তখন ফিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পুনরায় এসে জিজ্ঞেস করে, 'জিবরিল এসেছিলেন?' এবারও সে উত্তর দেয়, 'না।' সে পুনরায় ফিরে যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জিজ্ঞেস করে, 'এসেছিলেন?' তুলায়হা জবাবে বলে, 'হ্যাঁ, এসেছিলেন।' উয়াইনা জানতে চায়, 'তিনি কী বললেন?' তুলায়হা বলে, 'জিবরিল বলেছেন “তোমার জন্য রয়েছে একটা চাকা, ঠিক তার চাকার মতো। আর এমন ঘটনা, যা জীবনেও ভুলতে পারবে না।”

উয়াইনা তখন তাকে বলে, 'মনে হয়, আল্লাহ জেনে গেছেন তোমার সঙ্গে অনুরূপ ঘটনাই ঘটতে যাচ্ছে, যা তুমি জীবনে কখনো ভুলতে পারবে না।' এরপর সে উঁচু আওয়াজে বনু ফাজারাকে বলে, 'যুদ্ধ বন্ধ করো, আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি।' মুসলিমরা তুলায়হার কাছাকাছি পৌঁছে দেখতে পান, সে আগে থেকেই তার ঘোড়া প্রস্তুত করে রেখেছে এবং সে ও তার স্ত্রী নাওয়ার উটে সওয়ার হয়ে আছে। তারা আরেকটু কাছাকাছি হতেই তুলায়হা সস্ত্রীক শামের দিকে পালিয়ে যায়। সে পালানোর সঙ্গে সঙ্গে তার বাহিনীও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহ তখন মুসলিমদের হাতে তার সঙ্গী-সাথিদের বড় একটা অংশকে মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছে দেন।

খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকরের কাছে খালিদের বিজয় এবং তুলায়হার পরাজয়ের সংবাদ এসে পৌঁছলে তিনি এক চিঠিতে খালিদকে বলেন,

আল্লাহ তোমার ওপর যে অনুগ্রহ করেছেন, এতে নিশ্চয় তোমার কল্যাণে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। তুমি নিজের ব্যাপারে খোদাভীতি অবলম্বন করবে। আল্লাহ মুত্তাকি ও পরহেজগারদের সঙ্গ দেন। নিজের অভিপ্রায়ে অটল থাকবে। কখনো নরম হবে না। যদি মুশরিকদের এমন কাউকে পাও, যারা মুসলিমদের হত্যা করেছে, তাকে শিক্ষণীয় শাস্তি দেবে।

১. বুজাখায় খালিদের অবস্থান
এরপর খালিদ রা. বুজাখায় এক মাস অবস্থান করেন। সেখানে অবস্থানকালে সে-সকল লোককে খুঁজতে থাকেন, যাদের ব্যাপারে আবু বকর রা. উপরিউক্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইরতিদাদি ফিতনা চলাকালে কোনো মুসলমানকে হত্যা করেছে—তিনি সেখানে এমন যাকেই পেতেন—তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে থাকেন। এক মাস তিনি এই অভিযানেই ব্যস্ত থাকেন। কাউকে কিসাসস্বরূপ আগুনে ঠেলে দেন। কাউকে পাথর দিয়ে থ্যাঁতলে দেন। কাউকে পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেন। এসব করার কারণ ছিল—মুরতাদরা আরবের মুসলিমদের এমন বেদনাদায়ক কষ্ট দিয়েই হত্যা করেছিল।

২. উম্মু জিমালের কাহিনি
তুলায়হার ভ্রান্ত সঙ্গীদের মধ্যে বনু গাতফানের বড় একটা দল জাফারে উন্মু জিমাল সালমা বিনতু মালিক ইবনু হুজায়ফা নামের এক মহিলার পাশে জড়ো হয়। এই মহিলাও ছিল উম্মু কিরফার মতো আরবের নেতৃস্থানীয় মহিলা। মর্যাদা ও অবস্থান বোঝাতে গিয়ে তার মায়ের উদাহরণ পেশ করা হয়। তার প্রচুর সন্তান ছিল। এ ছাড়া তার পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদার দিক দিয়ে বিখ্যাত। তারা মহিলাটার পাশে জড়ো হলে সে খালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তাদের উসকানি দেয়। এতে তারা আগুনের মতো জ্বলে ওঠে এবং বনু সালিম, তাই, হাওয়াজিন ও আসাদের লোকজন তার সঙ্গী হয়ে যায়। এরপর উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। মহিলা তার মায়ের উটে আরোহী ছিল—যে উটের ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে, যে ব্যক্তি এই উটকে উত্তেজিত করতে পারবে, তার জন্য রয়েছে ১০০টা উট পুরস্কার। এটা শুধু এর সম্মান ও শক্তি দেখানোর উদ্দেশ্যেই। খালিদ তাদের স্পষ্ট পরাজয় উপহার দেন। তার উটসহ তাকে হত্যা করেন। এরপর বিজয়ের সুসংবাদ মদিনায় সিদ্দিকে আকবরের কাছে পাঠান。

৩. শিক্ষা ও তাৎপর্য
ক. আবু বকরের আল্লাহ-নির্ভরতা ও সামরিক দক্ষতা
আবু বকর রা. আদি ইবনু হাতিমকে বলেছিলেন, 'তুমি তোমার গোত্রে দ্রুত পৌঁছে যাও, যাতে তারা তুলায়হার সঙ্গে যোগ দিয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি না হয়।' এটা তাঁর বিশ্বাস এবং আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থনের ওপর পূর্ণ আস্থার স্পষ্ট দলিল। বনু তাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেই যুদ্ধের পরিণতির কথা বলে দিয়েছিলেন। এরপর খালিদকে এই নির্দেশনা দিয়ে পাঠান—'বনি তাইকে দিয়েই যুদ্ধ শুরু করবে।' অথচ তারা ছিল তুলায়হার অবস্থান থেকে অনেক দূরে। উদ্দেশ্য ছিল, বনি তাই যেন ভয়ে তুলায়হার সঙ্গ না দেয়। যারা ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছে, তারাও যাতে নিজের গোত্র-রক্ষার লক্ষ্যে তুলায়হার সঙ্গ ছেড়ে মুসলিমবাহিনীতে যোগ দেয়। এ ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও সুচিন্তিত যুদ্ধপরিকল্পনা। তিনি চাচ্ছিলেন বনু তাই ও তাদের পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোকে ভয় পাইয়ে দিতে।

খ. খালিদের প্রতি আবু বকরের উপদেশ
এ অভিযানের জন্য আবু বকর রা. আবু সুলায়মান খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-কে নির্বাচন করেন, যাঁর পতাকা কখনো নিচু হয়নি। এর মাধ্যমে ব্যক্তিনির্বাচনেও তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পায়। আর বুজাখার যুদ্ধের পর খালিদকে লেখা আবু বকরের চিঠিতে বেশকিছু উপদেশ ছিল। যেমন :

• খালিদ রা.-কে দুআ দেন এবং তাঁর উচ্চপ্রশংসা করেন।
• চিঠিতে তাঁকে তাকওয়া অবলম্বনের পরামর্শ দেন, যা মানুষকে তার প্রবৃত্তিগত ভুলত্রুটি থেকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে কার্যকারী মাধ্যম।
তাঁকে অহংকারে স্ফীত শত্রুর বিরুদ্ধে বাহাদুরি ও বীরত্ব প্রদর্শনের নির্দেশ দেন।

আবু বকরের এই যে কঠিন অবস্থান, এটা তাঁর দৃঢ় সংকল্প ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক। কারণ, সেখানে তখন এমন বহু গোত্র ছিল, যারা হক-বাতিল তথা ইমান ও কুফরের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। তাই অবস্থার চাহিদা ছিল, তাদের কঠিন শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে বাকিদের অন্তর থেকে সংশয় দূর করা এবং কুফর থেকে বিরত রাখা। এই পদক্ষেপ তাঁর সীমাহীন শক্তি, সংকল্পের দৃঢ়তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণের অনন্য উপমা। স্বভাবত নম্র হলেও কঠোরতার জায়গায় কঠোরতা এবং নম্রতার জায়গায় নম্রতা অবলম্বনে তিনি ছিলেন বেশ দক্ষ। কবি কতই-না উত্তম বলেছেন,

শবনমকে তরবারির জায়গায় রাখা ভুল
যেভাবে ভুল তরবারিকে শবনমের জায়গায় রাখা।

টিকাঃ
১৪৯. এটি বসরা থেকে মদিনার পথে হাওয়াবের কাছে অবস্থিত।
১৫০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩২৩।
১৫১. আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৯/৬০-৬৩।
১৫২. প্রাগুক্ত: ৯/৬১।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 আদি ইবনু আবি হাতিমের প্রচেষ্টা

📄 আদি ইবনু আবি হাতিমের প্রচেষ্টা


১. আদি কর্তৃক নিজের গোত্রকে উপদেশ এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
আদি ইবনু আবি হাতিম রা. তাঁর গোত্রে পৌঁছে ইসলামের প্রতি তাদের আহ্বান জানান। তারা প্রথমে ঔদ্ধত্যের সুরে জবাব দেয়, 'আমরা আবু ফুসাইলের হাতে বায়আত হব না।' জবাবে আদি বলেন, 'তোমাদের কাছে এমন এক জাতি এসে পৌঁছেছে, যারা তোমাদের নারীদের নিজেদের জন্য হালাল করে নেবে। এরপর তোমরা তাঁকে আবু ফাহাল উপনামে ডাকতে বাধ্য হবে। এবার তোমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারো কী করবে।' গোত্রের লোকজন তখন তাঁকে বলে, 'তাহলে তুমি তাদের কয়েকটা দিন থামিয়ে রাখো, যাতে আমাদের যে-সকল যুবক ইতিমধ্যে তুলায়হার কাছে বুজাখায় চলে গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে পারি। আমরা যদি এখনই তুলায়হার বিরুদ্ধে চলে যাই, তাহলে তার কাছে থাকা আমাদের যুবকদের সে হত্যা করবে; অথবা পণবন্দি করে নিতে পারে।' এরপর আদি রা. সুনাহ নামক স্থানে খালিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর কাছে আবেদন জানান, 'অনুগ্রহ করে আপনি এখানে তিন দিন অপেক্ষা করুন। আমি আপনার কাছে ৫০০ যোদ্ধা পাঠিয়ে দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে নিয়ে আপনি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন। এখনই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাদের জাহান্নামি বানানো থেকে এটা উত্তম হবে বলে মনে করি।' খালিদ তাঁর কথা মেনে নেন। এরপর আদি তাদের ইসলামগ্রহণের সুসংবাদ নিয়ে খালিদের কাছে পৌঁছান।

এভাবে আদি তাঁর গোত্রের উভয় শাখা তথা বনু গাওস ও জাদিলা থেকে এ বিষয়ে নিশ্চয়তা আদায় করেন যে, তারা তুলায়হার সঙ্গ ত্যাগ করে খালিদের দলে যোগ দেবে। বনু তাইয়ের এই প্রত্যাবর্তন ও বিপ্লব বুজাখাযুদ্ধের ফলাফলে ব্যাপক অবদান রেখেছিল।

যখন মুসলিমদের জন্য সম্পদের প্রয়োজন ছিল অন্য সময়ের চেয়ে বেশি, ঠিক তখন আবু বকরের কাছে সর্বাগ্রে নিজ গোত্রের জাকাত নিয়ে উপস্থিত হওয়াটা ইতিহাসের পাতায় আদির মহান মর্যাদা ও কৃতিত্ব হিসেবে অক্ষয় হয়ে থাকবে। ইসলামগ্রহণের প্রথম দিন থেকেই তাঁর মধ্যে একজন বুদ্ধিদীপ্ত প্রাজ্ঞ ব্যক্তির প্রতিচ্ছবি ছিল। তিনি অন্তহীন সংযম ও সন্তুষ্ট চিত্তে ইসলামগ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম ও মুসলিমদের বিজয়ের ব্যাপারে তাঁর বিশ্বাস ছিল অটল পাথরের মতো। নবিজি যে দিন তাঁকে ইসলামে দীক্ষিত করেছিলেন, সে দিনই তাঁকে ইসলামের বিশাল বিজয়ের সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন। বনু আদির ইসলামে ফেরার নেপথ্যে তাঁর ইমানের দৃঢ়তারও একটা প্রভাব ছিল। তাঁর অল্পে তুষ্টি, সাবধানতা ও ধৈর্যের কোনো তুলনা ছিল না। তিনি নিজের গোত্রকে দ্বিধাগ্রস্ত থাকার সুযোগ না দিয়ে তাদের থেকে দেড় হাজার যোদ্ধা নিয়ে মুসলিমবাহিনীতে যোগ দেন। এ ঘটনাটা গোত্রে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে。

২. বনু আদির আবেদন ও খালিদের জবাব
এক বর্ণনায় আছে, বনু আদি খালিদের কাছে তাদের বংশীয় সহযোগী বনু আসাদের বিপরীতে বনু কায়েসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি চেয়েছিল। উত্তরে খালিদ বলেন, 'উভয় গোত্রের যার বিরুদ্ধে ইচ্ছা যুদ্ধ করতে পারো। তবে বনু কায়েস কিন্তু বনু আসাদ থেকে মোটেও দুর্বল নয়।' তখন আদি বলেন, 'আমার বংশের নিকটজনরাও যদি দীনকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আল্লাহর শপথ, বনু আসাদ একসময় আমাদের সহযোগী ছিল বলে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না, এমনটা হতে পারে না।' খালিদ বলেন, 'আদি, ওরা যার সঙ্গেই লড়াই করুক না কেন, তা জিহাদ গণ্য হবে। আপনি গোত্রের বিরোধিতা না করে বরং তারা যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ চালিয়ে যান। '

৩. আদির ইমানি শক্তি ও প্রজ্ঞা
এখানে আদির নিজের গোত্রের মতের বিরুদ্ধে যাওয়া মূলত তাঁর ইমানি শক্তি ও প্রজ্ঞার গভীরতার দলিল। বংশ ও রক্তের দিক থেকে অনেক দূরে থাকলেও তিনি মূলত আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। তাঁরাই ছিল তাঁর নিকটাত্মীয় পর্যায়ের। একই সঙ্গে এই ঘটনা থেকে খালিদের সামরিক প্রজ্ঞাও ফুটে ওঠে। তিনি আদিকে বলেছিলেন, 'আপনি আপনার গোত্রের চাহিদার বিরুদ্ধে যাবেন না। জিহাদের ওই ময়দানে তাদের নিয়ে যান, যেখানে গিয়ে তারা লড়াই করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।'

আদির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি তাঁর গোত্রকে মুসলিমবাহিনীতে যোগ দেওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং তাতে সফলতাও অর্জন করেছিলেন। খালিদের বাহিনীতে বনু তাইয়ের যোগ দেওয়া ছিল শত্রুবাহিনীর প্রথম পরাজয়। কারণ, জাজিরাতুল আরবে বনু তাই ছিল ঐতিহ্যবাহী ও শক্তিশালী একটা গোত্র। অন্যান্য গোত্র তাদের খুবই মূল্যায়ন করত। তাদের শক্তিসামর্থ্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে অন্য গোত্রগুলো তাদের সমীহ করত। এলাকায় তাদের প্রভাব ও সম্মান ছিল সবার ওপরে। প্রতিবেশী গোত্রগুলো তাদের সহযোগী হওয়ায় নিজেদের ধন্য মনে করত।

যখন কুফরের দলে দুর্বলতা আসে, তখন ইমান ও কুফরের বাহিনীতে যুদ্ধ বেঁধে যায়। আল্লাহ ইমানদারদের ভাগ্যে বিজয় ও সাহায্য নির্ধারণ করে দেন। দ্রুত তারা শত্রুদের হত্যা ও বন্দি করা শুরু করেন। এভাবেই শত্রুদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়। শুধু তারাই বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়, যারা আনুগত্য গ্রহণ করেছিল কিংবা পালিয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর জাজিরাতুল আরবে মুরতাদরা দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এরপর মুসলিমবাহিনীকে অন্যান্য জায়গায় মুরতাদদের পরাজিত করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি。

টিকাঃ
১৫৩. প্রাগুক্ত: ৯/৫৭。
১৫৪. প্রাগুক্ত: ৯/৬১。
১৫৫. তারিখুত তাবারি: ৪/৭৫。
১৫৬. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৬১。
১৫৭. আল-হারবুন নাফসিয়াহ মিন মানজুরিল ইসলামি, ড. আহমাদ নাওফাল: ২/১৪৩-১৪৪。

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খালিদের মোকাবিলায় তুলায়হার পরাজয়ের কারণ

📄 খালিদের মোকাবিলায় তুলায়হার পরাজয়ের কারণ


তুলায়হা আসাদির পরাজয়ের অনেক কারণ রয়েছে। যেমন:

মুসলিমরা অটল আকিদা, আল্লাহর সাহায্যের দৃঢ় বিশ্বাস এবং শাহাদাতের প্রবল আগ্রহ নিয়ে জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের প্রেরণা একটা অব্যর্থ ও তীক্ষ্ণ মানসিক অস্ত্র। খালিদ রা. শত্রুদের কাছে এই সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠাতেন, 'আমি তোমাদের কাছে এমন এক বাহিনী নিয়ে এসেছি, যাদের কাছে শাহাদাত এতটাই কাম্য, তোমাদের কাছে বেঁচে থাকা যতটা কাম্য।' মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে শত্রুদেরও এই অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং বুজাখার মাঠে তুলায়হা পরাজয়ের পর বিস্ময়ের সঙ্গে তার অনুসারীদের বলে, 'তোমাদের কী হলো! তোমরা পরাজিত হলে কেন।' তখন তাদের একজন বলে, 'এর কারণ হচ্ছে, আমাদের প্রত্যেকেই চেয়েছিল সে যেন তার সাথির পরে নিহত হয়; আর বিরোধী পক্ষের প্রত্যেকে চেয়েছিল, সে যেন তার সাথির আগে শহিদ হয়। '

মুসলিমদের দলে বনু তাইয়ের অংশগ্রহণ তাঁদের শক্তিমত্তা বৃদ্ধি এবং শত্রুদের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। একইভাবে উক্কাশা ইবনু মিহসান ও সাবিত ইবনু আকরামের শাহাদাত মুসলিমদের ক্ষোভের আগুন তীব্র করে তোলে। ফলে যুদ্ধের জন্য তাঁরা প্রস্তুত হয়ে যান। অনুরূপ আবু বকরের 'তাওরিয়া' ও (গোপনীয়তা) বনু তাইয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ফলে তারা সহযোগীদের সঙ্গ ছাড়তে এবং নিজ অবস্থানে অটল থাকতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। আবু বকর রা. অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে মানুষকে এই ধন্দে ফেলে রাখেন যে, এই বাহিনী মূল রণক্ষেত্র এড়িয়ে খায়বারের দিকে যাচ্ছে।

অনুরূপ বনু তাইকে তাদের চাহিদামতো বনু কায়েসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি প্রদানের প্রভাবও ছিল অত্যন্ত গভীর। খালিদ রা. যদি আদির চাহিদামতো বনু কায়েসের পরিবর্তে বনু আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তাদের বাধ্য করতেন, তাহলে বনু তাই হয়তো যুদ্ধের ব্যাপারে দুর্বলতা প্রদর্শন করত। এ ছাড়া আরও কিছু কারণ ছিল।

টিকাঃ
১৫৮. হারকাতুর রিদ্দাহ: ২৮৯。
১৫৯. তারিখুল খামসিন, দিয়ার বিকরি: ২/২০৭; হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ২৮৯。
১৬০. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা., শিত খাত্তাব ৯৬-৯৭; হুরুবুর রিদ্দাহ, আহমাদ সায়িদ: ১২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00