📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 তুলায়হা আসাদির ফিতনা মোকাবিলায় খালিদ

📄 তুলায়হা আসাদির ফিতনা মোকাবিলায় খালিদ


১. তুলায়হা আসাদির ফিতনা
নবুওয়াতের দাবিদারদের মধ্যে তুলায়হা আসাদি ছিল তৃতীয় অবস্থানে। সে নবিজির জীবনের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে আত্মপ্রকাশ করে। তার নাম তুলায়হা ইবনু খুওয়াইলিদ ইবনু নাওফাল ইবনু নাজলা আল আসাদি। নবম হিজরিতে সে একদল প্রতিনিধিসহ রাসুলের দরবারে আসে। মদিনায় পৌঁছে রাসুল ﷺ-কে সালাম দেয়। এরপর অনুগ্রহের প্রকাশ দেখাতে গিয়ে বলে, 'আমরা নিজে থেকে আপনার খিদমতে এসেছি। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আপনি তাঁর বান্দা ও রাসুল; অথচ তিনি আমাদের কাছে কাউকে পাঠাননি। আমরা আমাদের পেছনে থাকা লোকদের জন্য যথেষ্ট।' এর ভিত্তিতে আল্লাহর বাণী অবতীর্ণ হয়,
يَمُنُّوْنَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوْا قُلْ لَّا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَيكُمْ لِلْإِيْمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِيْنَ
তারা মুসলমান হয়ে আপনাকে ধন্য করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ এটা মনে করো না; বরং আল্লাহ ইমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদের ধন্য করেছেন; যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকো। [সুরা হুজুরাত : ১৭]

এরপর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তুলায়হাও নিজের এলাকায় ফিরে আসে এবং একসময় ইরতিদাদের শিকার হয়ে নবুওয়াতের দাবি করে বসে। নবুওয়াতের দাবি করার পর চতুর তুলায়হা যখন বুঝতে পারে-মুসলিমদের সঙ্গে তার সংঘাত অনিবার্য, তখন সামিরা অঞ্চলকে নিজের সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে নেয়। এভাবে সাধারণ মানুষ তার অনুগত হতে থাকলে ধীরে ধীরে তার নবুওয়াতের বিষয়টাও ছড়াতে থাকে। মানুষের পথভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ ছিল, তারা তার সঙ্গে এক সফরে ছিল। সফরের একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে থাকা পানি শেষ হয়ে যায় এবং প্রচণ্ড পিপাসায় তারা কাতরাতে থাকে। তখন সে লোকজনকে বলে, 'তোমরা আমার ঘোড়া “ইলালে” চড়ে কয়েক মাইল যাও, পানি পেয়ে যাবে।' তারা এমনটা করলে পানি পেয়ে যায়। এভাবে গ্রাম্য সহজ-সরল লোকগুলো তার ফিতনায় পড়ে।

তার কুকীর্তির মধ্যে এটাও একটা যে, সে সালাতের মধ্যে সিজদা ছেড়ে দেয়। তার ধারণা ছিল, আসমান থেকে তার ওপর ওহি নাজিল হয়। তার ছন্দোবদ্ধ বাক্যসমূহের এটাও একটা, যাকে সে ওহি বলে দাবি করত,
والحمام واليمام، والصرد والصوام، قد صمن قبلكم باعوام، ليبلغن ملكنا العراق والشام .
কবুতর ও জংলি কবুতর, সুরদ ও সাওয়ام, তোমরা ইতিপূর্বে অনেক বছর রোজা রেখেছ। ইরাক ও শামে আমাদের রাজত্ব হবে。

তুলায়হার অহংকার ক্রমশ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে তার শক্তি ও জনবল। রাসুল তার এসব কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর জিরার ইবনুল আজওয়ার আসাদিকে তার মোকাবিলায় পাঠান; কিন্তু আসাদ ও গাতফানের মতো শক্তিশালী দুই গোত্র তার অনুগত ছিল। এ কারণে তার মোকাবিলা করা জিরারের পক্ষে সম্ভব হয়নি。

দায়িরাতুল মাআরিফিল ইসলামিয়া (ইসলামি এনসাইক্লোপিডিয়া) তুলায়হার ব্যাপারে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছে। এতে লেখা হয়েছে, 'সে উপস্থিত কবিতা আবৃত্তি করতে পারত। রণাঙ্গনে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই সেনাদের মধ্যে উদ্দীপনামূলক ভাষণ দিতে পারত।' এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, সে ছিল জাহিলি যুগের নেতাদের অনুসরণীয় ব্যক্তি। তার মধ্যে অনেক গুণের সমাহার ছিল। সে ছিল গণক, কবি, বক্তা ও যোদ্ধা。

এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে তুলায়হা আসাদির প্রশংসা করা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যায়, সে ছিল একজন আদর্শ নেতা। উপস্থিত কবিতা আবৃত্তি ও ভাষণ দিতে ছিল পারঙ্গম। তৎকালে আরবরা এ দুটি গুণের খুব কদর করত। আর এনসাইক্লোপিডিয়ার পক্ষ থেকে এমন ব্যক্তির প্রশংসা নতুন কিছু নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসলাম নিয়ে সমালোচনা। আমাদের জানা নেই তারা জানে কি না যে, তুলায়হা তাওবা করে ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে খাঁটি মুসলিম হিসেবে বাকি জীবন অতিবাহিত করেছেন।

২. তুলায়হার মোকাবিলায় খালিদ
তুলায়হার ব্যাপারটা ঝুলন্ত অবস্থায়ই নবিজি ইনতিকাল করেন। এর পর খিলাফতের বাগডোর আবু বকরের হাতে আসে। তিনি খলিফা হওয়ার পরই মুরতাদদের নির্মূল করতে সেনাবাহিনী গঠন করতে মনোযোগী হন। পৃথক পৃথক সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তুলায়হা আসাদিকে দমন করতে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে পাঠিয়েছিলেন।

ইমাম আহমাদের বর্ণনা; আবু বকর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নিযুক্ত করার সময় বলেছিলেন, 'আমি রাসুল -কে বলতে শুনেছি, "খালিদ আল্লাহর উত্তম একজন বান্দা। নিজের গোত্রেও উত্তম ব্যক্তি। তিনি আল্লাহর তরবারিসমূহের একটি তরবারি। আল্লাহ তাঁকে কুফফার ও মুনাফিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।”

খালিদ রা. জুল-কিসসা অভিমুখে রওনা হলে আবু বকর রা. তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে বলেন, তিনি অন্যান্য নেতাকে নিয়ে খায়বারের দিক থেকে এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হবেন। তাঁকে নির্দেশ দেন, 'প্রথমে আপনি তুলায়হার দিকে যাবেন। তাদের শায়েস্তার পর বনু তামিমের মোকাবিলা করবেন।'

তুলায়হা এ সময় বনু আসাদ ও গাতফানে অবস্থান করছিল। ইতিমধ্যে বনু আবস ও জুবইয়ানের লোকেরা তার সঙ্গ দেয়। সে তখন বনু তাইয়ের শাখা জাদিলা ও গাওসের সাহায্য চায়। লোক পাঠিয়ে দ্রুত তাদের তার সঙ্গ দেওয়ার আহ্বান জানায়। এদিকে আবু বকর রা. বনু তাইকে তুলায়হার সঙ্গ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে আদি ইবনু হাতিমকে খালিদের আগেই বনি তাইয়ের দিকে পাঠিয়ে দেন। তিনি আদিকে বলেন, 'তুমি তাদের বিরত রাখার চেষ্টা করবে। বিরত না হলে ভয়ংকর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।'

আদি রা. বনু তাইয়ে উপস্থিত হয়ে তাঁর গোত্রকে আবু বকরের হাতে বায়আত হতে আহ্বান জানান। তাদের বলেন, 'আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো।' তারা জবাব দেয়, 'আমরা আবু ফুসাইলের (আবু বকর) হাতে বায়আত হব না।' আদি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আবু বকরের বাহিনী তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছে গেলে যতক্ষণ-না তোমরা জেনে যাচ্ছ যে, আবুল ফাহাল হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিষয়, ততক্ষণ তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।'

আদি ইবনু হাতিম তাদের পেছনে লেগে থাকেন। একপর্যায়ে তারা অনেকটা নমনীয় হয়ে আসে। এরইমধ্যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদও তাঁর বাহিনী নিয়ে সেখানে পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে যে-সকল আনসার সাহাবি ছিলেন, তাঁদের প্রথম কাতারের সেনাপতি ছিলেন সাবিত ইবনু কায়েস ইবনু শাম্মাস। তিনি সেখানে এসেই শত্রুবাহিনীর গতিবিধির খোঁজ নিতে সাবিত ইবনু আকরাম ও উল্কাশা ইবনু মিহসানকে পাঠিয়ে দেন। তাঁরা তুলায়হার ভাতিজা হিবালকে পেয়ে তাকে হত্যা করে ফেলেন। সংবাদটা জানতে পেরে তুলায়হা ও তার ভাই সালমা বেরিয়ে আসে। ফলে সাবিতের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে তুলায়হা উক্কাশা ও সাবিতকে শহিদ করে ফেলে।

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. সেখানে পৌঁছে তাঁদের শহিদ অবস্থায় দেখতে পেয়ে জ্বলে ওঠেন। প্রত্যেক মুসলিমের কাছে ব্যাপারটা ভীষণ পীড়াদায়ক ঠেকে। খালিদ তখন সেখান থেকে সোজা বনু তাইয়ের দিকে মোড় নেন। সেখানে পৌঁছতেই আদি ইবনু হাতিম বেরিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। তিনি তাঁর কাছে আবেদন জানান, 'আপনি আমাকে আরও তিনটা দিন অবকাশ দিন। তারা আমার কাছে এই অবকাশটুকু চেয়েছে, যাতে তাদের যে লোকজন তুলায়হার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে পারে। তারা আশঙ্কা করছে, এই মুহূর্তে তারা আপনার সঙ্গ দিলে তুলায়হা হয়তো তার কাছে থাকা বনু তাইয়ের যুবকদের হত্যা করে ফেলতে পারে। আশা করি, তারা জাহান্নামে পড়ার চেয়ে তাদের প্রত্যাবর্তন আপনার কাছে ভালোই লাগবে।' তিন দিন পর আদি রা. তাঁর গোত্রের ৫০০ মুজাহিদ নিয়ে খালিদের সঙ্গে যোগ দেন। এভাবে তাঁরা সবাই সত্যের দিকে ফিরে এসেছিল।

টিকাঃ
১৩৭. উসদুল গাবাহ: ৩/৯৫।
১৩৮. হুরুবির রিদ্দাহ, মুহাম্মাদ আহমাদ বাশমিল: ৭৯।
১৩৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৩।
১৪০. উসদুল গাবাহ: ৩/৯৫।
১৪১. দায়িরাতুল মাআরিফিল ইসলামিয়া-হারকাতুর রিদ্দাহ: ৭৮।
১৪২. হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৭৮।
১৪৩. মুসনাদু আহমাদ: ১/১৭৩। শায়খ আহমাদ শাকির হাদিসটির সনদ বিশুদ্ধ বলেছেন।
১৪৪. তারতিবু ওয়া তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খিলাফাতু আবি বাকরিন, ড. সামিল সুলামি : ১০১।
১৪৫. ফুসাইল অর্থ ছোট উট বা উটের বাচ্চা।
১৪৬. ফাহাল অর্থ বড় ষাঁড় উট।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বনু জাদিলা অভিমুখে খালিদ

📄 বনু জাদিলা অভিমুখে খালিদ


এর পর খালিদ বনু জাদিলা অভিমুখে বের হন। আদি তখনো এগিয়ে এসে বলেন, 'আমাকে কয়েকটা দিনের অবকাশ দিন, ইনশাআল্লাহ আমি তাদেরও আপনার কাছে নিয়ে আসছি। আমি যথেষ্ট আশাবাদী যে, আল্লাহ তাদেরও বনু গাওসদের মতো রক্ষা করবেন।' সুযোগ পেয়ে আদি রা. তাদের কাছে যান এবং নাছোড়বান্দার মতো তাদের পেছনে লেগে থাকেন। একপর্যায়ে তারা আদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলামের দিকে ফিরে আসে। তাদের ১ হাজার যোদ্ধা মুসলিমবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। এভাবে আদি তাঁর গোত্রের উভয় শাখার জন্য একজন মহান ত্রাতা ও বরকতময় সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হন。

টিকাঃ
১৪৭. তারতিবু ওয়া তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-খিলাফাতু আবি বাকরিন, ড. মুহাম্মাদ সামিল সুলামি : ১০২。
১৪৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩২২。

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বুজাখার যুদ্ধ এবং বনু আসাদের বিদ্রোহ দমন

📄 বুজাখার যুদ্ধ এবং বনু আসাদের বিদ্রোহ দমন


খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বনু আদির ব্যাপারটা সফলভাবে সমাধানের পর সেখান থেকে বেরিয়ে 'আজা' ও 'সালমা'য় যান। এরপর সেনাবিন্যাস করে তুলায়হার মুখোমুখি হন। তখন অনেক গোত্র দেখতে চেয়েছিল কারা বিজয়ী হয়। তুলায়হা তার গোত্র ও সহযোগী গোত্রগুলো নিয়ে ময়দানে চলে আসে। বনু ফাজারার উয়াইনা ইবনু হিসনও ৭০০ সেনা নিয়ে তার সঙ্গে যোগ দেয়। সেনাসারি বিন্যস্ত করার পর সে নিজেকে চাদরে জড়িয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যাচ্ছিল। অপেক্ষা করছিল তার কল্পিত ওহি অবতরণের। ইতিমধ্যে উয়াইনা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। যুদ্ধ করতে করতে একসময় সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন তুলায়হার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, 'কী খবর, জিবরিল এসেছিলেন?' তুলায়হা জবাব দেয়, 'না।' উয়াইনা তখন ফিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পুনরায় এসে জিজ্ঞেস করে, 'জিবরিল এসেছিলেন?' এবারও সে উত্তর দেয়, 'না।' সে পুনরায় ফিরে যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জিজ্ঞেস করে, 'এসেছিলেন?' তুলায়হা জবাবে বলে, 'হ্যাঁ, এসেছিলেন।' উয়াইনা জানতে চায়, 'তিনি কী বললেন?' তুলায়হা বলে, 'জিবরিল বলেছেন “তোমার জন্য রয়েছে একটা চাকা, ঠিক তার চাকার মতো। আর এমন ঘটনা, যা জীবনেও ভুলতে পারবে না।”

উয়াইনা তখন তাকে বলে, 'মনে হয়, আল্লাহ জেনে গেছেন তোমার সঙ্গে অনুরূপ ঘটনাই ঘটতে যাচ্ছে, যা তুমি জীবনে কখনো ভুলতে পারবে না।' এরপর সে উঁচু আওয়াজে বনু ফাজারাকে বলে, 'যুদ্ধ বন্ধ করো, আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি।' মুসলিমরা তুলায়হার কাছাকাছি পৌঁছে দেখতে পান, সে আগে থেকেই তার ঘোড়া প্রস্তুত করে রেখেছে এবং সে ও তার স্ত্রী নাওয়ার উটে সওয়ার হয়ে আছে। তারা আরেকটু কাছাকাছি হতেই তুলায়হা সস্ত্রীক শামের দিকে পালিয়ে যায়। সে পালানোর সঙ্গে সঙ্গে তার বাহিনীও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহ তখন মুসলিমদের হাতে তার সঙ্গী-সাথিদের বড় একটা অংশকে মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছে দেন।

খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকরের কাছে খালিদের বিজয় এবং তুলায়হার পরাজয়ের সংবাদ এসে পৌঁছলে তিনি এক চিঠিতে খালিদকে বলেন,

আল্লাহ তোমার ওপর যে অনুগ্রহ করেছেন, এতে নিশ্চয় তোমার কল্যাণে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। তুমি নিজের ব্যাপারে খোদাভীতি অবলম্বন করবে। আল্লাহ মুত্তাকি ও পরহেজগারদের সঙ্গ দেন। নিজের অভিপ্রায়ে অটল থাকবে। কখনো নরম হবে না। যদি মুশরিকদের এমন কাউকে পাও, যারা মুসলিমদের হত্যা করেছে, তাকে শিক্ষণীয় শাস্তি দেবে।

১. বুজাখায় খালিদের অবস্থান
এরপর খালিদ রা. বুজাখায় এক মাস অবস্থান করেন। সেখানে অবস্থানকালে সে-সকল লোককে খুঁজতে থাকেন, যাদের ব্যাপারে আবু বকর রা. উপরিউক্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইরতিদাদি ফিতনা চলাকালে কোনো মুসলমানকে হত্যা করেছে—তিনি সেখানে এমন যাকেই পেতেন—তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে থাকেন। এক মাস তিনি এই অভিযানেই ব্যস্ত থাকেন। কাউকে কিসাসস্বরূপ আগুনে ঠেলে দেন। কাউকে পাথর দিয়ে থ্যাঁতলে দেন। কাউকে পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেন। এসব করার কারণ ছিল—মুরতাদরা আরবের মুসলিমদের এমন বেদনাদায়ক কষ্ট দিয়েই হত্যা করেছিল।

২. উম্মু জিমালের কাহিনি
তুলায়হার ভ্রান্ত সঙ্গীদের মধ্যে বনু গাতফানের বড় একটা দল জাফারে উন্মু জিমাল সালমা বিনতু মালিক ইবনু হুজায়ফা নামের এক মহিলার পাশে জড়ো হয়। এই মহিলাও ছিল উম্মু কিরফার মতো আরবের নেতৃস্থানীয় মহিলা। মর্যাদা ও অবস্থান বোঝাতে গিয়ে তার মায়ের উদাহরণ পেশ করা হয়। তার প্রচুর সন্তান ছিল। এ ছাড়া তার পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদার দিক দিয়ে বিখ্যাত। তারা মহিলাটার পাশে জড়ো হলে সে খালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তাদের উসকানি দেয়। এতে তারা আগুনের মতো জ্বলে ওঠে এবং বনু সালিম, তাই, হাওয়াজিন ও আসাদের লোকজন তার সঙ্গী হয়ে যায়। এরপর উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। মহিলা তার মায়ের উটে আরোহী ছিল—যে উটের ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে, যে ব্যক্তি এই উটকে উত্তেজিত করতে পারবে, তার জন্য রয়েছে ১০০টা উট পুরস্কার। এটা শুধু এর সম্মান ও শক্তি দেখানোর উদ্দেশ্যেই। খালিদ তাদের স্পষ্ট পরাজয় উপহার দেন। তার উটসহ তাকে হত্যা করেন। এরপর বিজয়ের সুসংবাদ মদিনায় সিদ্দিকে আকবরের কাছে পাঠান。

৩. শিক্ষা ও তাৎপর্য
ক. আবু বকরের আল্লাহ-নির্ভরতা ও সামরিক দক্ষতা
আবু বকর রা. আদি ইবনু হাতিমকে বলেছিলেন, 'তুমি তোমার গোত্রে দ্রুত পৌঁছে যাও, যাতে তারা তুলায়হার সঙ্গে যোগ দিয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি না হয়।' এটা তাঁর বিশ্বাস এবং আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থনের ওপর পূর্ণ আস্থার স্পষ্ট দলিল। বনু তাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেই যুদ্ধের পরিণতির কথা বলে দিয়েছিলেন। এরপর খালিদকে এই নির্দেশনা দিয়ে পাঠান—'বনি তাইকে দিয়েই যুদ্ধ শুরু করবে।' অথচ তারা ছিল তুলায়হার অবস্থান থেকে অনেক দূরে। উদ্দেশ্য ছিল, বনি তাই যেন ভয়ে তুলায়হার সঙ্গ না দেয়। যারা ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছে, তারাও যাতে নিজের গোত্র-রক্ষার লক্ষ্যে তুলায়হার সঙ্গ ছেড়ে মুসলিমবাহিনীতে যোগ দেয়। এ ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও সুচিন্তিত যুদ্ধপরিকল্পনা। তিনি চাচ্ছিলেন বনু তাই ও তাদের পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোকে ভয় পাইয়ে দিতে।

খ. খালিদের প্রতি আবু বকরের উপদেশ
এ অভিযানের জন্য আবু বকর রা. আবু সুলায়মান খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-কে নির্বাচন করেন, যাঁর পতাকা কখনো নিচু হয়নি। এর মাধ্যমে ব্যক্তিনির্বাচনেও তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পায়। আর বুজাখার যুদ্ধের পর খালিদকে লেখা আবু বকরের চিঠিতে বেশকিছু উপদেশ ছিল। যেমন :

• খালিদ রা.-কে দুআ দেন এবং তাঁর উচ্চপ্রশংসা করেন।
• চিঠিতে তাঁকে তাকওয়া অবলম্বনের পরামর্শ দেন, যা মানুষকে তার প্রবৃত্তিগত ভুলত্রুটি থেকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে কার্যকারী মাধ্যম।
তাঁকে অহংকারে স্ফীত শত্রুর বিরুদ্ধে বাহাদুরি ও বীরত্ব প্রদর্শনের নির্দেশ দেন।

আবু বকরের এই যে কঠিন অবস্থান, এটা তাঁর দৃঢ় সংকল্প ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক। কারণ, সেখানে তখন এমন বহু গোত্র ছিল, যারা হক-বাতিল তথা ইমান ও কুফরের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। তাই অবস্থার চাহিদা ছিল, তাদের কঠিন শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে বাকিদের অন্তর থেকে সংশয় দূর করা এবং কুফর থেকে বিরত রাখা। এই পদক্ষেপ তাঁর সীমাহীন শক্তি, সংকল্পের দৃঢ়তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণের অনন্য উপমা। স্বভাবত নম্র হলেও কঠোরতার জায়গায় কঠোরতা এবং নম্রতার জায়গায় নম্রতা অবলম্বনে তিনি ছিলেন বেশ দক্ষ। কবি কতই-না উত্তম বলেছেন,

শবনমকে তরবারির জায়গায় রাখা ভুল
যেভাবে ভুল তরবারিকে শবনমের জায়গায় রাখা।

টিকাঃ
১৪৯. এটি বসরা থেকে মদিনার পথে হাওয়াবের কাছে অবস্থিত।
১৫০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩২৩।
১৫১. আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৯/৬০-৬৩।
১৫২. প্রাগুক্ত: ৯/৬১।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 আদি ইবনু আবি হাতিমের প্রচেষ্টা

📄 আদি ইবনু আবি হাতিমের প্রচেষ্টা


১. আদি কর্তৃক নিজের গোত্রকে উপদেশ এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
আদি ইবনু আবি হাতিম রা. তাঁর গোত্রে পৌঁছে ইসলামের প্রতি তাদের আহ্বান জানান। তারা প্রথমে ঔদ্ধত্যের সুরে জবাব দেয়, 'আমরা আবু ফুসাইলের হাতে বায়আত হব না।' জবাবে আদি বলেন, 'তোমাদের কাছে এমন এক জাতি এসে পৌঁছেছে, যারা তোমাদের নারীদের নিজেদের জন্য হালাল করে নেবে। এরপর তোমরা তাঁকে আবু ফাহাল উপনামে ডাকতে বাধ্য হবে। এবার তোমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারো কী করবে।' গোত্রের লোকজন তখন তাঁকে বলে, 'তাহলে তুমি তাদের কয়েকটা দিন থামিয়ে রাখো, যাতে আমাদের যে-সকল যুবক ইতিমধ্যে তুলায়হার কাছে বুজাখায় চলে গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে পারি। আমরা যদি এখনই তুলায়হার বিরুদ্ধে চলে যাই, তাহলে তার কাছে থাকা আমাদের যুবকদের সে হত্যা করবে; অথবা পণবন্দি করে নিতে পারে।' এরপর আদি রা. সুনাহ নামক স্থানে খালিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর কাছে আবেদন জানান, 'অনুগ্রহ করে আপনি এখানে তিন দিন অপেক্ষা করুন। আমি আপনার কাছে ৫০০ যোদ্ধা পাঠিয়ে দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে নিয়ে আপনি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন। এখনই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাদের জাহান্নামি বানানো থেকে এটা উত্তম হবে বলে মনে করি।' খালিদ তাঁর কথা মেনে নেন। এরপর আদি তাদের ইসলামগ্রহণের সুসংবাদ নিয়ে খালিদের কাছে পৌঁছান।

এভাবে আদি তাঁর গোত্রের উভয় শাখা তথা বনু গাওস ও জাদিলা থেকে এ বিষয়ে নিশ্চয়তা আদায় করেন যে, তারা তুলায়হার সঙ্গ ত্যাগ করে খালিদের দলে যোগ দেবে। বনু তাইয়ের এই প্রত্যাবর্তন ও বিপ্লব বুজাখাযুদ্ধের ফলাফলে ব্যাপক অবদান রেখেছিল।

যখন মুসলিমদের জন্য সম্পদের প্রয়োজন ছিল অন্য সময়ের চেয়ে বেশি, ঠিক তখন আবু বকরের কাছে সর্বাগ্রে নিজ গোত্রের জাকাত নিয়ে উপস্থিত হওয়াটা ইতিহাসের পাতায় আদির মহান মর্যাদা ও কৃতিত্ব হিসেবে অক্ষয় হয়ে থাকবে। ইসলামগ্রহণের প্রথম দিন থেকেই তাঁর মধ্যে একজন বুদ্ধিদীপ্ত প্রাজ্ঞ ব্যক্তির প্রতিচ্ছবি ছিল। তিনি অন্তহীন সংযম ও সন্তুষ্ট চিত্তে ইসলামগ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম ও মুসলিমদের বিজয়ের ব্যাপারে তাঁর বিশ্বাস ছিল অটল পাথরের মতো। নবিজি যে দিন তাঁকে ইসলামে দীক্ষিত করেছিলেন, সে দিনই তাঁকে ইসলামের বিশাল বিজয়ের সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন। বনু আদির ইসলামে ফেরার নেপথ্যে তাঁর ইমানের দৃঢ়তারও একটা প্রভাব ছিল। তাঁর অল্পে তুষ্টি, সাবধানতা ও ধৈর্যের কোনো তুলনা ছিল না। তিনি নিজের গোত্রকে দ্বিধাগ্রস্ত থাকার সুযোগ না দিয়ে তাদের থেকে দেড় হাজার যোদ্ধা নিয়ে মুসলিমবাহিনীতে যোগ দেন। এ ঘটনাটা গোত্রে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে。

২. বনু আদির আবেদন ও খালিদের জবাব
এক বর্ণনায় আছে, বনু আদি খালিদের কাছে তাদের বংশীয় সহযোগী বনু আসাদের বিপরীতে বনু কায়েসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি চেয়েছিল। উত্তরে খালিদ বলেন, 'উভয় গোত্রের যার বিরুদ্ধে ইচ্ছা যুদ্ধ করতে পারো। তবে বনু কায়েস কিন্তু বনু আসাদ থেকে মোটেও দুর্বল নয়।' তখন আদি বলেন, 'আমার বংশের নিকটজনরাও যদি দীনকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আল্লাহর শপথ, বনু আসাদ একসময় আমাদের সহযোগী ছিল বলে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না, এমনটা হতে পারে না।' খালিদ বলেন, 'আদি, ওরা যার সঙ্গেই লড়াই করুক না কেন, তা জিহাদ গণ্য হবে। আপনি গোত্রের বিরোধিতা না করে বরং তারা যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ চালিয়ে যান। '

৩. আদির ইমানি শক্তি ও প্রজ্ঞা
এখানে আদির নিজের গোত্রের মতের বিরুদ্ধে যাওয়া মূলত তাঁর ইমানি শক্তি ও প্রজ্ঞার গভীরতার দলিল। বংশ ও রক্তের দিক থেকে অনেক দূরে থাকলেও তিনি মূলত আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। তাঁরাই ছিল তাঁর নিকটাত্মীয় পর্যায়ের। একই সঙ্গে এই ঘটনা থেকে খালিদের সামরিক প্রজ্ঞাও ফুটে ওঠে। তিনি আদিকে বলেছিলেন, 'আপনি আপনার গোত্রের চাহিদার বিরুদ্ধে যাবেন না। জিহাদের ওই ময়দানে তাদের নিয়ে যান, যেখানে গিয়ে তারা লড়াই করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।'

আদির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি তাঁর গোত্রকে মুসলিমবাহিনীতে যোগ দেওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং তাতে সফলতাও অর্জন করেছিলেন। খালিদের বাহিনীতে বনু তাইয়ের যোগ দেওয়া ছিল শত্রুবাহিনীর প্রথম পরাজয়। কারণ, জাজিরাতুল আরবে বনু তাই ছিল ঐতিহ্যবাহী ও শক্তিশালী একটা গোত্র। অন্যান্য গোত্র তাদের খুবই মূল্যায়ন করত। তাদের শক্তিসামর্থ্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে অন্য গোত্রগুলো তাদের সমীহ করত। এলাকায় তাদের প্রভাব ও সম্মান ছিল সবার ওপরে। প্রতিবেশী গোত্রগুলো তাদের সহযোগী হওয়ায় নিজেদের ধন্য মনে করত।

যখন কুফরের দলে দুর্বলতা আসে, তখন ইমান ও কুফরের বাহিনীতে যুদ্ধ বেঁধে যায়। আল্লাহ ইমানদারদের ভাগ্যে বিজয় ও সাহায্য নির্ধারণ করে দেন। দ্রুত তারা শত্রুদের হত্যা ও বন্দি করা শুরু করেন। এভাবেই শত্রুদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়। শুধু তারাই বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়, যারা আনুগত্য গ্রহণ করেছিল কিংবা পালিয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর জাজিরাতুল আরবে মুরতাদরা দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এরপর মুসলিমবাহিনীকে অন্যান্য জায়গায় মুরতাদদের পরাজিত করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি。

টিকাঃ
১৫৩. প্রাগুক্ত: ৯/৫৭。
১৫৪. প্রাগুক্ত: ৯/৬১。
১৫৫. তারিখুত তাবারি: ৪/৭৫。
১৫৬. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৬১。
১৫৭. আল-হারবুন নাফসিয়াহ মিন মানজুরিল ইসলামি, ড. আহমাদ নাওফাল: ২/১৪৩-১৪৪。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00