📄 ইরতিদাদি ফিতনা দমনে খালিদ
আবু বকর রা. এই ১১ বাহিনীর সামগ্রিক নেতৃত্ব অর্পণ করেছিলেন আল্লাহর তরবারিখ্যাত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের হাতে। খালিদ ছিলেন ইসলামের বিজয়াভিযানের প্রাণপুরুষ এবং ইরতিদাদি ফিতনা দমনে অনুপম সামরিক প্রজ্ঞা প্রদর্শনকারী ব্যক্তি। মুসলিমবাহিনীর এই বণ্টনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যবস্থাপনা। মুরতাদরা তখনো ছিল যার যার এলাকায় পৃথক পৃথক অবস্থানে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে তখনো ঐক্যবদ্ধ ছিল না। বড় বড় গোত্র ছিল দূরদূরান্তে বিক্ষিপ্ত অবস্থায়। তারা একত্রিত হওয়ার সময় করে উঠতে পারেনি। কারণ, প্রথমত ইরতিদাদি ফিতনা শুরু হওয়ার পর তখনো তিন মাস অতিক্রান্ত হয়নি। দ্বিতীয়ত, তারা মুসলিমদের পক্ষ থেকে নিজেদের কোনো প্রকার শঙ্কার মধ্যে আছে বলে মনে করেনি। তারা এই দিবাস্বপ্নে বিভোর ছিল যে, কয়েক মাসের মধ্যেই মুসলিমদের নির্মূল করে ফেলবে। তাই আবু বকর রা. চাচ্ছিলেন, সংগঠিত হওয়ার আগেই ওদের শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলবেন। ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তুলবেন। এ উদ্দেশ্যে ফিতনাটা পূর্ণ শক্তিতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই তিনি তৎসংশ্লিষ্ট যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তাদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর অবকাশটুকুও দেননি। আবু বকর তখন এই হিকমাহর ওপর আমল করেছিলেন,
বুদ্ধিমান হয়ে থাকলে সাপের লেজ কেটে ছেড়ে দেবে না
যদি পারো লেজের সঙ্গে মাথাটাও কেটে ফেলো।
তিনি এই ফিতনার ভয়াবহতা ও এর মন্দ পরিণতি ভালো করে আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, শুরুতেই যদি এর টুটি চেপে ধরা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ছাইচাপা আগুন থেকে লেলিহান শিখা জ্বলে উঠতে পারে। তখন ওই আগুন শুকনো ও ভেজা সবকিছু পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেবে। কবি বলেন,
ছাইয়ের নিচে আমি আগুন দেখতে পাচ্ছি,
শীঘ্রই তা দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে。
ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর ছিলেন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং দক্ষ একজন সমরবিদ। যেকোনো বিষয়ের সঠিক ধারণা রাখায় ছিলেন বিশেষ পারঙ্গম। এ ছাড়া ছিলেন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাগ্রহণে অত্যন্ত দক্ষ।
একপর্যায়ে সেই ১১টা বাহিনী বেরিয়ে পড়ে। তাঁদের হাতে ইসলামের পতাকা পতপত করে উড়ছিল। তাঁদের ইমানে দেখা দিয়েছিল জগৎপ্লাবী জোয়ার। তাঁরা ছিলেন আল্লাহর বড়ত্ব উপস্থাপনকারী। তাঁদের অন্তর থেকে নিষ্ঠাপূর্ণ দুআ বের হতো। কণ্ঠ কেবল আল্লাহর জিকির দ্বারা সচল থাকত। আল্লাহ তাঁদের পবিত্র দুআ কবুল করেন। তাঁদের ওপর তাঁর সাহায্য অবারিত করেন। তাঁদের মাধ্যমে তাঁর বাণী ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। দীনের হিফাজতের যে অঙ্গীকার তিনি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন করেন। ফলে মাত্র কয়েক মাসেই জাজিরাতুল আরব ইসলামের অনুগত হয়ে যায়。
আবু বকর রা. ইরতিদাদের শিকার গোত্রগুলোর উদ্দেশে একটা চিঠি লেখেন। চিঠিতে তাদের ইসলামের দিকে ফিরে আসা এবং একে সত্যিকার অর্থে ধারণের আহ্বান জানান। বাতিল আঁকড়ে থাকার ব্যাপারে ইহ ও পরকালীন শাস্তির ভয় দেখান। এতে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। পদ্ধতিটা ছিল দীন থেকে প্রত্যাবৃত্ত হওয়ার এবং বাতিলের ওপর জমে থাকার মোকাবিলায় যথোপযুক্ত প্রতিষেধক। তাদের নেতাদের মাথায় ঔদ্ধত্য ও অহংকার ছেয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতা তাদের অনুসারীদের মস্তিষ্ক গুলিয়ে দিয়েছিল। এ জন্য তাদের মাথা থেকে ঔদ্ধত্যের এই ভূত নামাতে কঠোরতাই কাম্য ছিল。
টিকাঃ
১৩৩. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৫১。
১৩৪. হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৩১২-৩১৩。
১৩৫. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৫১。
১৩৬. প্রাগুক্ত: ৯/৫৫。
📄 তুলায়হা আসাদির ফিতনা মোকাবিলায় খালিদ
১. তুলায়হা আসাদির ফিতনা
নবুওয়াতের দাবিদারদের মধ্যে তুলায়হা আসাদি ছিল তৃতীয় অবস্থানে। সে নবিজির জীবনের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে আত্মপ্রকাশ করে। তার নাম তুলায়হা ইবনু খুওয়াইলিদ ইবনু নাওফাল ইবনু নাজলা আল আসাদি। নবম হিজরিতে সে একদল প্রতিনিধিসহ রাসুলের দরবারে আসে। মদিনায় পৌঁছে রাসুল ﷺ-কে সালাম দেয়। এরপর অনুগ্রহের প্রকাশ দেখাতে গিয়ে বলে, 'আমরা নিজে থেকে আপনার খিদমতে এসেছি। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আপনি তাঁর বান্দা ও রাসুল; অথচ তিনি আমাদের কাছে কাউকে পাঠাননি। আমরা আমাদের পেছনে থাকা লোকদের জন্য যথেষ্ট।' এর ভিত্তিতে আল্লাহর বাণী অবতীর্ণ হয়,
يَمُنُّوْنَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوْا قُلْ لَّا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَيكُمْ لِلْإِيْمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِيْنَ
তারা মুসলমান হয়ে আপনাকে ধন্য করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ এটা মনে করো না; বরং আল্লাহ ইমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদের ধন্য করেছেন; যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকো। [সুরা হুজুরাত : ১৭]
এরপর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তুলায়হাও নিজের এলাকায় ফিরে আসে এবং একসময় ইরতিদাদের শিকার হয়ে নবুওয়াতের দাবি করে বসে। নবুওয়াতের দাবি করার পর চতুর তুলায়হা যখন বুঝতে পারে-মুসলিমদের সঙ্গে তার সংঘাত অনিবার্য, তখন সামিরা অঞ্চলকে নিজের সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে নেয়। এভাবে সাধারণ মানুষ তার অনুগত হতে থাকলে ধীরে ধীরে তার নবুওয়াতের বিষয়টাও ছড়াতে থাকে। মানুষের পথভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ ছিল, তারা তার সঙ্গে এক সফরে ছিল। সফরের একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে থাকা পানি শেষ হয়ে যায় এবং প্রচণ্ড পিপাসায় তারা কাতরাতে থাকে। তখন সে লোকজনকে বলে, 'তোমরা আমার ঘোড়া “ইলালে” চড়ে কয়েক মাইল যাও, পানি পেয়ে যাবে।' তারা এমনটা করলে পানি পেয়ে যায়। এভাবে গ্রাম্য সহজ-সরল লোকগুলো তার ফিতনায় পড়ে।
তার কুকীর্তির মধ্যে এটাও একটা যে, সে সালাতের মধ্যে সিজদা ছেড়ে দেয়। তার ধারণা ছিল, আসমান থেকে তার ওপর ওহি নাজিল হয়। তার ছন্দোবদ্ধ বাক্যসমূহের এটাও একটা, যাকে সে ওহি বলে দাবি করত,
والحمام واليمام، والصرد والصوام، قد صمن قبلكم باعوام، ليبلغن ملكنا العراق والشام .
কবুতর ও জংলি কবুতর, সুরদ ও সাওয়ام, তোমরা ইতিপূর্বে অনেক বছর রোজা রেখেছ। ইরাক ও শামে আমাদের রাজত্ব হবে。
তুলায়হার অহংকার ক্রমশ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে তার শক্তি ও জনবল। রাসুল তার এসব কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর জিরার ইবনুল আজওয়ার আসাদিকে তার মোকাবিলায় পাঠান; কিন্তু আসাদ ও গাতফানের মতো শক্তিশালী দুই গোত্র তার অনুগত ছিল। এ কারণে তার মোকাবিলা করা জিরারের পক্ষে সম্ভব হয়নি。
দায়িরাতুল মাআরিফিল ইসলামিয়া (ইসলামি এনসাইক্লোপিডিয়া) তুলায়হার ব্যাপারে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছে। এতে লেখা হয়েছে, 'সে উপস্থিত কবিতা আবৃত্তি করতে পারত। রণাঙ্গনে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই সেনাদের মধ্যে উদ্দীপনামূলক ভাষণ দিতে পারত।' এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, সে ছিল জাহিলি যুগের নেতাদের অনুসরণীয় ব্যক্তি। তার মধ্যে অনেক গুণের সমাহার ছিল। সে ছিল গণক, কবি, বক্তা ও যোদ্ধা。
এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে তুলায়হা আসাদির প্রশংসা করা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যায়, সে ছিল একজন আদর্শ নেতা। উপস্থিত কবিতা আবৃত্তি ও ভাষণ দিতে ছিল পারঙ্গম। তৎকালে আরবরা এ দুটি গুণের খুব কদর করত। আর এনসাইক্লোপিডিয়ার পক্ষ থেকে এমন ব্যক্তির প্রশংসা নতুন কিছু নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসলাম নিয়ে সমালোচনা। আমাদের জানা নেই তারা জানে কি না যে, তুলায়হা তাওবা করে ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে খাঁটি মুসলিম হিসেবে বাকি জীবন অতিবাহিত করেছেন।
২. তুলায়হার মোকাবিলায় খালিদ
তুলায়হার ব্যাপারটা ঝুলন্ত অবস্থায়ই নবিজি ইনতিকাল করেন। এর পর খিলাফতের বাগডোর আবু বকরের হাতে আসে। তিনি খলিফা হওয়ার পরই মুরতাদদের নির্মূল করতে সেনাবাহিনী গঠন করতে মনোযোগী হন। পৃথক পৃথক সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তুলায়হা আসাদিকে দমন করতে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে পাঠিয়েছিলেন।
ইমাম আহমাদের বর্ণনা; আবু বকর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নিযুক্ত করার সময় বলেছিলেন, 'আমি রাসুল -কে বলতে শুনেছি, "খালিদ আল্লাহর উত্তম একজন বান্দা। নিজের গোত্রেও উত্তম ব্যক্তি। তিনি আল্লাহর তরবারিসমূহের একটি তরবারি। আল্লাহ তাঁকে কুফফার ও মুনাফিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।”
খালিদ রা. জুল-কিসসা অভিমুখে রওনা হলে আবু বকর রা. তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে বলেন, তিনি অন্যান্য নেতাকে নিয়ে খায়বারের দিক থেকে এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হবেন। তাঁকে নির্দেশ দেন, 'প্রথমে আপনি তুলায়হার দিকে যাবেন। তাদের শায়েস্তার পর বনু তামিমের মোকাবিলা করবেন।'
তুলায়হা এ সময় বনু আসাদ ও গাতফানে অবস্থান করছিল। ইতিমধ্যে বনু আবস ও জুবইয়ানের লোকেরা তার সঙ্গ দেয়। সে তখন বনু তাইয়ের শাখা জাদিলা ও গাওসের সাহায্য চায়। লোক পাঠিয়ে দ্রুত তাদের তার সঙ্গ দেওয়ার আহ্বান জানায়। এদিকে আবু বকর রা. বনু তাইকে তুলায়হার সঙ্গ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে আদি ইবনু হাতিমকে খালিদের আগেই বনি তাইয়ের দিকে পাঠিয়ে দেন। তিনি আদিকে বলেন, 'তুমি তাদের বিরত রাখার চেষ্টা করবে। বিরত না হলে ভয়ংকর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।'
আদি রা. বনু তাইয়ে উপস্থিত হয়ে তাঁর গোত্রকে আবু বকরের হাতে বায়আত হতে আহ্বান জানান। তাদের বলেন, 'আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো।' তারা জবাব দেয়, 'আমরা আবু ফুসাইলের (আবু বকর) হাতে বায়আত হব না।' আদি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আবু বকরের বাহিনী তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছে গেলে যতক্ষণ-না তোমরা জেনে যাচ্ছ যে, আবুল ফাহাল হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিষয়, ততক্ষণ তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।'
আদি ইবনু হাতিম তাদের পেছনে লেগে থাকেন। একপর্যায়ে তারা অনেকটা নমনীয় হয়ে আসে। এরইমধ্যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদও তাঁর বাহিনী নিয়ে সেখানে পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে যে-সকল আনসার সাহাবি ছিলেন, তাঁদের প্রথম কাতারের সেনাপতি ছিলেন সাবিত ইবনু কায়েস ইবনু শাম্মাস। তিনি সেখানে এসেই শত্রুবাহিনীর গতিবিধির খোঁজ নিতে সাবিত ইবনু আকরাম ও উল্কাশা ইবনু মিহসানকে পাঠিয়ে দেন। তাঁরা তুলায়হার ভাতিজা হিবালকে পেয়ে তাকে হত্যা করে ফেলেন। সংবাদটা জানতে পেরে তুলায়হা ও তার ভাই সালমা বেরিয়ে আসে। ফলে সাবিতের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে তুলায়হা উক্কাশা ও সাবিতকে শহিদ করে ফেলে।
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. সেখানে পৌঁছে তাঁদের শহিদ অবস্থায় দেখতে পেয়ে জ্বলে ওঠেন। প্রত্যেক মুসলিমের কাছে ব্যাপারটা ভীষণ পীড়াদায়ক ঠেকে। খালিদ তখন সেখান থেকে সোজা বনু তাইয়ের দিকে মোড় নেন। সেখানে পৌঁছতেই আদি ইবনু হাতিম বেরিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। তিনি তাঁর কাছে আবেদন জানান, 'আপনি আমাকে আরও তিনটা দিন অবকাশ দিন। তারা আমার কাছে এই অবকাশটুকু চেয়েছে, যাতে তাদের যে লোকজন তুলায়হার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে পারে। তারা আশঙ্কা করছে, এই মুহূর্তে তারা আপনার সঙ্গ দিলে তুলায়হা হয়তো তার কাছে থাকা বনু তাইয়ের যুবকদের হত্যা করে ফেলতে পারে। আশা করি, তারা জাহান্নামে পড়ার চেয়ে তাদের প্রত্যাবর্তন আপনার কাছে ভালোই লাগবে।' তিন দিন পর আদি রা. তাঁর গোত্রের ৫০০ মুজাহিদ নিয়ে খালিদের সঙ্গে যোগ দেন। এভাবে তাঁরা সবাই সত্যের দিকে ফিরে এসেছিল।
টিকাঃ
১৩৭. উসদুল গাবাহ: ৩/৯৫।
১৩৮. হুরুবির রিদ্দাহ, মুহাম্মাদ আহমাদ বাশমিল: ৭৯।
১৩৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৩।
১৪০. উসদুল গাবাহ: ৩/৯৫।
১৪১. দায়িরাতুল মাআরিফিল ইসলামিয়া-হারকাতুর রিদ্দাহ: ৭৮।
১৪২. হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৭৮।
১৪৩. মুসনাদু আহমাদ: ১/১৭৩। শায়খ আহমাদ শাকির হাদিসটির সনদ বিশুদ্ধ বলেছেন।
১৪৪. তারতিবু ওয়া তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খিলাফাতু আবি বাকরিন, ড. সামিল সুলামি : ১০১।
১৪৫. ফুসাইল অর্থ ছোট উট বা উটের বাচ্চা।
১৪৬. ফাহাল অর্থ বড় ষাঁড় উট।
📄 বনু জাদিলা অভিমুখে খালিদ
এর পর খালিদ বনু জাদিলা অভিমুখে বের হন। আদি তখনো এগিয়ে এসে বলেন, 'আমাকে কয়েকটা দিনের অবকাশ দিন, ইনশাআল্লাহ আমি তাদেরও আপনার কাছে নিয়ে আসছি। আমি যথেষ্ট আশাবাদী যে, আল্লাহ তাদেরও বনু গাওসদের মতো রক্ষা করবেন।' সুযোগ পেয়ে আদি রা. তাদের কাছে যান এবং নাছোড়বান্দার মতো তাদের পেছনে লেগে থাকেন। একপর্যায়ে তারা আদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলামের দিকে ফিরে আসে। তাদের ১ হাজার যোদ্ধা মুসলিমবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। এভাবে আদি তাঁর গোত্রের উভয় শাখার জন্য একজন মহান ত্রাতা ও বরকতময় সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হন。
টিকাঃ
১৪৭. তারতিবু ওয়া তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-খিলাফাতু আবি বাকরিন, ড. মুহাম্মাদ সামিল সুলামি : ১০২。
১৪৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩২২。
📄 বুজাখার যুদ্ধ এবং বনু আসাদের বিদ্রোহ দমন
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বনু আদির ব্যাপারটা সফলভাবে সমাধানের পর সেখান থেকে বেরিয়ে 'আজা' ও 'সালমা'য় যান। এরপর সেনাবিন্যাস করে তুলায়হার মুখোমুখি হন। তখন অনেক গোত্র দেখতে চেয়েছিল কারা বিজয়ী হয়। তুলায়হা তার গোত্র ও সহযোগী গোত্রগুলো নিয়ে ময়দানে চলে আসে। বনু ফাজারার উয়াইনা ইবনু হিসনও ৭০০ সেনা নিয়ে তার সঙ্গে যোগ দেয়। সেনাসারি বিন্যস্ত করার পর সে নিজেকে চাদরে জড়িয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যাচ্ছিল। অপেক্ষা করছিল তার কল্পিত ওহি অবতরণের। ইতিমধ্যে উয়াইনা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। যুদ্ধ করতে করতে একসময় সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন তুলায়হার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, 'কী খবর, জিবরিল এসেছিলেন?' তুলায়হা জবাব দেয়, 'না।' উয়াইনা তখন ফিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পুনরায় এসে জিজ্ঞেস করে, 'জিবরিল এসেছিলেন?' এবারও সে উত্তর দেয়, 'না।' সে পুনরায় ফিরে যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জিজ্ঞেস করে, 'এসেছিলেন?' তুলায়হা জবাবে বলে, 'হ্যাঁ, এসেছিলেন।' উয়াইনা জানতে চায়, 'তিনি কী বললেন?' তুলায়হা বলে, 'জিবরিল বলেছেন “তোমার জন্য রয়েছে একটা চাকা, ঠিক তার চাকার মতো। আর এমন ঘটনা, যা জীবনেও ভুলতে পারবে না।”
উয়াইনা তখন তাকে বলে, 'মনে হয়, আল্লাহ জেনে গেছেন তোমার সঙ্গে অনুরূপ ঘটনাই ঘটতে যাচ্ছে, যা তুমি জীবনে কখনো ভুলতে পারবে না।' এরপর সে উঁচু আওয়াজে বনু ফাজারাকে বলে, 'যুদ্ধ বন্ধ করো, আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি।' মুসলিমরা তুলায়হার কাছাকাছি পৌঁছে দেখতে পান, সে আগে থেকেই তার ঘোড়া প্রস্তুত করে রেখেছে এবং সে ও তার স্ত্রী নাওয়ার উটে সওয়ার হয়ে আছে। তারা আরেকটু কাছাকাছি হতেই তুলায়হা সস্ত্রীক শামের দিকে পালিয়ে যায়। সে পালানোর সঙ্গে সঙ্গে তার বাহিনীও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহ তখন মুসলিমদের হাতে তার সঙ্গী-সাথিদের বড় একটা অংশকে মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছে দেন।
খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকরের কাছে খালিদের বিজয় এবং তুলায়হার পরাজয়ের সংবাদ এসে পৌঁছলে তিনি এক চিঠিতে খালিদকে বলেন,
আল্লাহ তোমার ওপর যে অনুগ্রহ করেছেন, এতে নিশ্চয় তোমার কল্যাণে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। তুমি নিজের ব্যাপারে খোদাভীতি অবলম্বন করবে। আল্লাহ মুত্তাকি ও পরহেজগারদের সঙ্গ দেন। নিজের অভিপ্রায়ে অটল থাকবে। কখনো নরম হবে না। যদি মুশরিকদের এমন কাউকে পাও, যারা মুসলিমদের হত্যা করেছে, তাকে শিক্ষণীয় শাস্তি দেবে।
১. বুজাখায় খালিদের অবস্থান
এরপর খালিদ রা. বুজাখায় এক মাস অবস্থান করেন। সেখানে অবস্থানকালে সে-সকল লোককে খুঁজতে থাকেন, যাদের ব্যাপারে আবু বকর রা. উপরিউক্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইরতিদাদি ফিতনা চলাকালে কোনো মুসলমানকে হত্যা করেছে—তিনি সেখানে এমন যাকেই পেতেন—তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে থাকেন। এক মাস তিনি এই অভিযানেই ব্যস্ত থাকেন। কাউকে কিসাসস্বরূপ আগুনে ঠেলে দেন। কাউকে পাথর দিয়ে থ্যাঁতলে দেন। কাউকে পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেন। এসব করার কারণ ছিল—মুরতাদরা আরবের মুসলিমদের এমন বেদনাদায়ক কষ্ট দিয়েই হত্যা করেছিল।
২. উম্মু জিমালের কাহিনি
তুলায়হার ভ্রান্ত সঙ্গীদের মধ্যে বনু গাতফানের বড় একটা দল জাফারে উন্মু জিমাল সালমা বিনতু মালিক ইবনু হুজায়ফা নামের এক মহিলার পাশে জড়ো হয়। এই মহিলাও ছিল উম্মু কিরফার মতো আরবের নেতৃস্থানীয় মহিলা। মর্যাদা ও অবস্থান বোঝাতে গিয়ে তার মায়ের উদাহরণ পেশ করা হয়। তার প্রচুর সন্তান ছিল। এ ছাড়া তার পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদার দিক দিয়ে বিখ্যাত। তারা মহিলাটার পাশে জড়ো হলে সে খালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তাদের উসকানি দেয়। এতে তারা আগুনের মতো জ্বলে ওঠে এবং বনু সালিম, তাই, হাওয়াজিন ও আসাদের লোকজন তার সঙ্গী হয়ে যায়। এরপর উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। মহিলা তার মায়ের উটে আরোহী ছিল—যে উটের ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে, যে ব্যক্তি এই উটকে উত্তেজিত করতে পারবে, তার জন্য রয়েছে ১০০টা উট পুরস্কার। এটা শুধু এর সম্মান ও শক্তি দেখানোর উদ্দেশ্যেই। খালিদ তাদের স্পষ্ট পরাজয় উপহার দেন। তার উটসহ তাকে হত্যা করেন। এরপর বিজয়ের সুসংবাদ মদিনায় সিদ্দিকে আকবরের কাছে পাঠান。
৩. শিক্ষা ও তাৎপর্য
ক. আবু বকরের আল্লাহ-নির্ভরতা ও সামরিক দক্ষতা
আবু বকর রা. আদি ইবনু হাতিমকে বলেছিলেন, 'তুমি তোমার গোত্রে দ্রুত পৌঁছে যাও, যাতে তারা তুলায়হার সঙ্গে যোগ দিয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি না হয়।' এটা তাঁর বিশ্বাস এবং আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থনের ওপর পূর্ণ আস্থার স্পষ্ট দলিল। বনু তাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেই যুদ্ধের পরিণতির কথা বলে দিয়েছিলেন। এরপর খালিদকে এই নির্দেশনা দিয়ে পাঠান—'বনি তাইকে দিয়েই যুদ্ধ শুরু করবে।' অথচ তারা ছিল তুলায়হার অবস্থান থেকে অনেক দূরে। উদ্দেশ্য ছিল, বনি তাই যেন ভয়ে তুলায়হার সঙ্গ না দেয়। যারা ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছে, তারাও যাতে নিজের গোত্র-রক্ষার লক্ষ্যে তুলায়হার সঙ্গ ছেড়ে মুসলিমবাহিনীতে যোগ দেয়। এ ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও সুচিন্তিত যুদ্ধপরিকল্পনা। তিনি চাচ্ছিলেন বনু তাই ও তাদের পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোকে ভয় পাইয়ে দিতে।
খ. খালিদের প্রতি আবু বকরের উপদেশ
এ অভিযানের জন্য আবু বকর রা. আবু সুলায়মান খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-কে নির্বাচন করেন, যাঁর পতাকা কখনো নিচু হয়নি। এর মাধ্যমে ব্যক্তিনির্বাচনেও তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পায়। আর বুজাখার যুদ্ধের পর খালিদকে লেখা আবু বকরের চিঠিতে বেশকিছু উপদেশ ছিল। যেমন :
• খালিদ রা.-কে দুআ দেন এবং তাঁর উচ্চপ্রশংসা করেন।
• চিঠিতে তাঁকে তাকওয়া অবলম্বনের পরামর্শ দেন, যা মানুষকে তার প্রবৃত্তিগত ভুলত্রুটি থেকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে কার্যকারী মাধ্যম।
তাঁকে অহংকারে স্ফীত শত্রুর বিরুদ্ধে বাহাদুরি ও বীরত্ব প্রদর্শনের নির্দেশ দেন।
আবু বকরের এই যে কঠিন অবস্থান, এটা তাঁর দৃঢ় সংকল্প ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক। কারণ, সেখানে তখন এমন বহু গোত্র ছিল, যারা হক-বাতিল তথা ইমান ও কুফরের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। তাই অবস্থার চাহিদা ছিল, তাদের কঠিন শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে বাকিদের অন্তর থেকে সংশয় দূর করা এবং কুফর থেকে বিরত রাখা। এই পদক্ষেপ তাঁর সীমাহীন শক্তি, সংকল্পের দৃঢ়তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণের অনন্য উপমা। স্বভাবত নম্র হলেও কঠোরতার জায়গায় কঠোরতা এবং নম্রতার জায়গায় নম্রতা অবলম্বনে তিনি ছিলেন বেশ দক্ষ। কবি কতই-না উত্তম বলেছেন,
শবনমকে তরবারির জায়গায় রাখা ভুল
যেভাবে ভুল তরবারিকে শবনমের জায়গায় রাখা।
টিকাঃ
১৪৯. এটি বসরা থেকে মদিনার পথে হাওয়াবের কাছে অবস্থিত।
১৫০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩২৩।
১৫১. আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৯/৬০-৬৩।
১৫২. প্রাগুক্ত: ৯/৬১।