📄 আবু বকরের শাসনামলে খালিদ
১. আবু বকরের শাসনামলে বিভিন্ন শহরে গভর্নর নিয়োগ
নবিজির ইনতিকালের পর আবু বকর রা. খলিফা মনোনীত হন। তিনি শহরে শহরে গভর্নর নিযুক্ত করে বিভিন্ন দপ্তর পরিচালনা, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়ন, সালাতের ইমামত, সাদাকা-কর আদায় ইত্যাদির দায়িত্ব দিতেন। আমির ও গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি রাসুলের অনুসরণ করতেন। এ জন্য নবিজির নিয়োগকৃত গভর্নরদের স্বপদে বহাল রাখেন। তবে গুরুত্ব ও প্রয়োজন বিবেচনায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তাঁদের বদলি করেছেন; কিন্তু কাউকে পদচ্যুত করেননি—যেমনটা ঘটেছিল আমর ইবনুল আসের ক্ষেত্রে।
গভর্নর তাঁর অধীন এলাকার তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার পুরোপুরি দায়ীত্বশীল ছিলেন। কোথাও সফরে গেলে তাঁর ওপর দায়িত্ব থাকত, তিনি অন্য কাউকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যাওয়ার। যেমন: মুহাজির ইবনু উমাইয়াকে রাসুল ﷺ কিন্দার শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। রাসুলের ইনতিকালের পরও তিনি সে দায়িত্বে বহাল ছিলেন; কিন্তু অসুস্থতার কারণে ইয়ামেন যেতে দেরি হলে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত জিয়াদ ইবনু লাবিদকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন। পরে আবু বকরও ভারপ্রাপ্ত হিসেবে তাঁকে এই পদে বহাল রাখেন। একইভাবে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ইরাকের গভর্নরপদে থাকার সময় যখন হিরায় উপস্থিত থাকতে পারতেন না, তখন অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে যেতেন।
আমির ও গভর্নরদের নিয়োগ দেওয়ার আগে আবু বকর রা. অন্যান্য সাহাবির সঙ্গে পরামর্শ করতেন—চাই তা সেনাবাহিনীর আমির নির্ধারণের বিষয়ে হোক কিংবা কোনো অঞ্চলের। এসব পরামর্শে উমর ও আলি রা. সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতেন। এ ছাড়া তিনি যাকে গভর্নর নিয়োগের ইচ্ছা করতেন, তার সঙ্গেও ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ করে নিতেন। বিশেষত যখন কাউকে স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দিত। সুতরাং যখন আমর ইবনুল আসকে তাঁর শাসনাধীন অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনে বদলির প্রয়োজন দেখা দিলো, তখন নির্দেশটি ততক্ষণ কার্যকর করেননি, যতক্ষণ-না এ ব্যাপারে সরাসরি আমরের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। একইভাবে মুহাজির ইবনু উমাইয়াকে ইয়ামেন বা হাজারামাউত— যেকোনো একজায়গার গভর্নর পদ গ্রহণের অনুমতি দেন। এরপর মুহাজির ইয়ামেনকে বেছে নিলে আবু বকর তাঁকে সেখানকার গভর্নর হিসেবেই নিয়োগ দেন।
আবু বকরের নীতি ছিল, তিনি নবিজির সুন্নাহর ওপর আমল করতেন। কোনো সম্প্রদায়ের ওপর কাউকে গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে আগে দেখতেন সে সম্প্রদায়ে পুণ্যবান, বুদ্ধিমান উপযুক্ত কেউ আছে কি না। থাকলে তাকেই নিয়োগ দিতেন। কাউকে কোনো অঞ্চলের গভর্নর নিয়োগ দিলে সেখানে তার গভর্নরবিষয়ক ফরমান লিখে পাঠাতেন। অনেক সময় তাকে সেখানে যাওয়ার পথও নির্ধারণ করে দিতেন। সেসব এলাকার নামও বলে দিতেন, যেসব এলাকা হয়ে তিনি সেখানে যাবেন। বিশেষ করে ওইসব এলাকার ক্ষেত্রে এ পন্থা অবলম্বন করতেন, যেসব এলাকা তখনো বিজিত হয়নি; যেগুলো তখনো ইসলামি খিলাফতের আওতার বাইরে ছিল। শাম ও ইরাক বিজয় এবং ইরতিদাদবিরোধী যুদ্ধকালে এ বিষয়টা স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছিল।
অনেক সময় কোনো এলাকাকে অন্য এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত করে দিতেন। মুরতাদবিরোধী যুদ্ধের পর এ বিষয়টা লক্ষ করা যায়। যেমন: জিয়াদ ছিলেন হাজারামাউতের গভর্নর। একপর্যায়ে কিন্দাও তাঁর শাসনাধীন করা হয়। তখন থেকে তিনি হাজারামাউত ও কিন্দার গভর্নর গণ্য হন।
২. উসামাবাহিনী পাঠানোর উদ্দেশ্য
আরবরা তখন যদিও দলে দলে ইসলামগ্রহণ করছিল, তবু তাদের অন্তরে রোমানভীতি কাজ করছিল। কারণ, রোমানরা তখন বিশ্বপরাশক্তি। আরবদের অন্তর থেকে রোমানভীতি দূর করতে রাসুল ﷺ সেনা অভিযান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। নবিজির এই আক্রমণ-পরিকল্পনার দুটি উদ্দেশ্য ছিল :
১. রোমানদের কাছে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া এবং তাদের দ্বিধায় ফেলা।
২. মুসলিমদের মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করা যে, আল্লাহর সাহায্যে তাঁরাও রোমানদের মোকাবিলায় দাঁড়াতে পারেন।
এরপর নবিজির নির্দেশে মুসলিমরা সে অঞ্চল জয়ে বেরিয়ে পড়েন। সপ্তম হিজরিতে একটা বাহিনী পাঠালে আরব ও রোমান-খ্রিষ্টানদের যৌথবাহিনীর বিরুদ্ধে মুতা প্রান্তরে প্রচন্ড রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ হয়। ইতিহাসে এটা 'মুতার যুদ্ধ' নামে পরিচিত। যুদ্ধে পর্যায়ক্রমে তিনজন মুসলিম সেনাপতি—জায়েদ ইবনু হারিসা, জাফর তাইয়ার এবং আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রা. - শাহাদাতবরণ করেন। শেষপর্যন্ত বাহিনীর নেতৃত্ব নেন সাইফুল্লাহ তথা আল্লাহর তরবারিখ্যাত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.। তিনি অসামান্য যোগ্যতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করে মুসলিমবাহিনীকে নিরাপদে মদিনায় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন。
এর পর নবম হিজরিতে খোদ রাসুল বড় একটা বাহিনী নিয়ে শাম অভিমুখে রওনা হয়ে তাবুক পর্যন্ত পৌঁছে যান। এ অভিযানে মুসলিম ও রোমানবাহিনীর মধ্যে সরাসরি কোনো যুদ্ধ হয়নি। তবে সেখানকার নেতৃস্থানীয় ও শাসকশ্রেণির লোকজন জিজয়া আদায়ের মাধ্যমে সন্ধি করতে আগ্রহী হয়। তাবুকে ২০ দিন অবস্থান করে বাহিনী নিয়ে রাসুল মদিনায় ফেরেন。
তাবুক অভিযানের পর ১১ হিজরিতে রাসুল বালকা (জর্দান) ও ফিলিস্তিনে রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য বাহিনীও প্রস্তুত করেন। শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের সমন্বয়ে গঠিত এই বাহিনীর সেনাপতি নির্ধারণ করেন তরুণ সাহাবি উসামা ইবনু জায়েদকে。
হাফিজ ইবনু হাজার রাহ. বলেন, নবিজির ইনতিকালের দু-দিন আগে শনিবারে উসামাবাহিনীর প্রস্তুতি পূর্ণতায় পৌঁছায়। তবে অসুস্থ হওয়ার অনেক আগে সফর মাসের শেষ দিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন নবিজি। উসামাকে বলেছিলেন, 'তোমার পিতার শাহাদাতস্থলের দিকে বেরিয়ে পড়ো। আমি তোমাকে এই বাহিনীর সেনাপতি নির্ধারণ করলাম। '
উসামাকে সেনাপতি মনোনীত করায় কয়েকজন সাহাবি নবিজির কাছে আপত্তি জানান। কারণ, একে তো তিনি ছিলেন বয়সে তরুণ, তার ওপর যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ। তা ছাড়া বাহিনীতে আবু বকর ও উমরের মতো শীর্ষস্থানীয় সাহাবিও ছিলেন। কিন্তু যাঁরা আপত্তি উত্থাপন করেছিলেন, তাঁরা এটা হয়তো লক্ষ করেননি যে, এ সিদ্ধান্ত খোদ রাসুল নিয়েছেন; আর রাসুলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। রাসুল আপত্তিকারীদের বলেন, 'আজ যদি তোমরা উসামার নেতৃত্বে অভিযোগ উত্থাপন করো, তাহলে ইতিপূর্বে তো তাঁর পিতার নেতৃত্ব নিয়েও অভিযোগ ছিল। আল্লাহর শপথ, তাঁর পিতা নেতৃত্বের উপযুক্ত ছিল। সে ছিল আমার প্রিয়ভাজন। তাঁর অবর্তমানে তাঁর সন্তান উসামাও আমার কাছে প্রিয়দের একজন。
যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু হওয়ার দু-দিনের মাথায় রাসুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা ক্রমশ বেড়েই চলছিল। ফলে উসামাবাহিনীও রওনা হতে পারছিল না। তাঁরা মদিনার পার্শ্ববর্তী জুরফে শিবির স্থাপন করে অবস্থান করছিলেন। পরে নবিজির ইনতিকালের সংবাদ পেয়ে মদিনায় চলে আসেন。
নবিজির ইনতিকালের পর অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। এ সময়ের পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে আয়েশা রা. বলেন, 'রাসুলের ইনতিকালের পর অধিকাংশ আরব মুরতাদ হয়ে যায়। সর্বত্র নিফাক ছড়িয়ে পড়ে। আমার ওপর এমন বিপদ নেমে আসে, যদি তা কোনো পাহাড়ে পড়ত, তাহলে পাহাড়ও ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেত। তখন সাহাবিদের অবস্থা এমন ছিল, যেন বৃষ্টিঝরা রাতে ভেজা বকরিগুলো হিংস্র পশুতে ভরপুর কোনো মাঠে অবস্থান করছে।
এর পর আবু বকর রা. খিলাফতের দায়িত্ব নিজ কাঁধে উঠিয়ে নিলে নবিজির ইনতিকালের তৃতীয় দিন ঘোষক মারফত জনগণকে জানিয়ে দেওয়া হয়- 'উসামাবাহিনী তার লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাবে। অতএব, যাঁরা ইতিপূর্বে তাঁর বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল, তারা যেন দ্রুত মদিনার বাইরে জুরফে চলে যায়। '
৩. আবু বকর কর্তৃক উসামাবাহিনী প্রেরণ
উসামাবাহিনী ৪০ দিন, মতান্তরে দু-মাস পর মদিনায় ফিরে এলে আবু বকর রা. সাহাবিদের নিয়ে মদিনা থেকে এক দিনের দূরত্বে অবস্থিত 'জুল-কিসসা'য় মুরতাদ এবং ঔদ্ধত্য প্রদর্শনকারীদের শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে চড়াও হন। সাহাবিরা তাঁর কাছে আবেদন করেন, 'আপনি অন্য কাউকে পাঠিয়ে নিজে মদিনায় থাকুন এবং খিলাফত পরিচালনা করুন।' তাঁরা এই দাবির ওপর খুবই জোর দিচ্ছিলেন। আয়েশা রা. বলেন, আব্বাজান তরবারি বের করে 'জুল-কিসসা' অভিমুখে বেরিয়ে পড়েন। তখন আলি ইবনু আবি তালিব বেরিয়ে এসে তাঁর উটের লাগাম ধরে বলতে থাকেন, 'আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আমি আপনাকে তা-ই বলব, যা উহুদের দিন নবিজি আপনাকে বলেছিলেন- "তরবারি খাপে ঢুকিয়ে নাও এবং নিজের ব্যাপারে দুঃসংবাদ শুনতে না দাও!” আল্লাহর শপথ, আপনার যদি কিছু একটা হয়ে যায়, তাহলে মদিনায় ইসলামের অবস্থা বিশৃঙ্খল হয়ে যাবে। অতএব, আপনি ফিরে আসুন। '
৪. মুসলিমবাহিনীকে ১১ ভাগ করে প্রত্যেক ভাগের আমির নির্ধারণ
আবু বকর মুসলিমবাহিনীকে ১১ ভাগে ভাগ করেন এবং প্রত্যেক ভাগে একজন করে আমির নিযুক্ত করেন। আর আমিরদের নির্দেশ দেন, যে এলাকার পাশ দিয়েই যাবে, সেখানকার মুসলিমদের নিজেদের সঙ্গে নিয়ে নেবে। সেই বাহিনীগুলো ছিল নিম্নরূপ :
• খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বাহিনী: প্রথমে বনু আসাদের দিকে, এরপর বনু তামিমের দিকে, সব শেষে ইয়ামামার দিকে।
• ইকরিমা ইবনু আবি জাহলের বাহিনী: প্রথমে বনু হানিফায় মুসায়লিমাতুল কাজ্জাবের দিকে, এরপর যথাক্রমে ওমান, মাহরা, হাজারামাউত ও ইয়ামেনের দিকে।
• শুরাহবিল ইবনু হাসানার বাহিনী: প্রথমে ইয়ামামায় ইকরিমার পেছনে পেছনে, এরপর হাজারামাউতের দিকে।
• তুরায়ফা ইবনু হাজিবের বাহিনী: হাওয়াজিন গোত্রের শাখা বনু সালিমের দিকে।
• আমর ইবনুল আসের বাহিনী: কুজাআর দিকে।
• খালিদ ইবনু সাআদ ইবনু আসের বাহিনী: শামের দিকে।
• আলা ইবনুল হাজরামির বাহিনী: বাহরাইনের দিকে।
• হুজায়ফা ইবনু মিহসান গিলফায়ির বাহিনী: ওমানের দিকে।
• আরফাজা ইবনু হারমাসার বাহিনী: মাহরার দিকে।
• মুহাজির ইবনু উমাইয়ার বাহিনী: ইয়ামেনের দিকে (সানা হাজারামাউত)।
• সুওয়াইদ ইবনু মুকাররিনের বাহিনী: তিহামা ও ইয়ামেনের দিকে।
এভাবে জুল-কিসসাকে কেন্দ্র বানিয়ে চারদিকে সেনাবাহিনী ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আবু বকরের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত বিরল সামরিক যোগ্যতার স্বাক্ষর এবং এটা ছিল তাঁর সূক্ষ্ম ভৌগোলিক জ্ঞানের পরিচায়ক。
৫. বাহিনী পরিচালনায় আবু বকরের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা
বাহিনীবণ্টন এবং স্থাননির্ধারণ থেকে আবু বকরের ভৌগোলিক জ্ঞানের গভীরতা স্পষ্ট। এটা প্রমাণ করে যে, তিনি ভূখণ্ডের চিহ্ন, জনবসতি এবং জাজিরাতুল আরবের রাস্তাঘাট সম্পর্কে ছিলেন সম্যক অবহিত। তাঁর সামনে জাজিরাতুল আরব যেন একটা কায়া হিসেবে দৃশ্যমান ছিল; তিনি যেন তা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলেন। তাঁর সে কেন্দ্রটা যেন ছিল বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধকেন্দ্রসমূহের মতো, যেখানে বসে যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বাহিনী পাঠানো, তাদের গন্তব্য নির্ধারণ, বিচ্ছিন্নতা দেখা দিলে পুনরায় সংগঠিতকরণের ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিন্তা করবে। যারা জাজিরাতুল আরবের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে অবহিত, তারা অবশ্যই অনুমান করতে পারবে—আবু বকরের এই ব্যবস্থাপনা ছিল আদর্শিক ও যুগান্তকারী একটা ব্যবস্থাপনা।
এই ১১ বাহিনীর এক দলের সঙ্গে অপর দলের যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত চমৎকার। আবু বকর কেন্দ্রে বসে সারাক্ষণ জানতে পারতেন তাঁর কোন বাহিনী কোথায় অবস্থান করছে। তাদের প্রতিটা পদবিক্ষেপের খবর রাখতেন। জানতেন কোথায় আজ সফলতা এসেছে এবং তাদের কালকের পরিকল্পনাই-বা কী! যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত গোপন অথচ গতিময়। প্রতিটা রণক্ষেত্র থেকে মদিনায় তাঁর কাছে তাৎক্ষণিকভাবে খবর আদানপ্রদান হতো। এককথায়, পুরো বাহিনীর সঙ্গে যেন তাঁর অদৃশ্য এক যোগাযোগ ছিল। কেন্দ্র ও রণক্ষেত্রে সংবাদ আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে আবু খায়সামা আনসারি, সালমা ইবনু সালামা, আবু বারজা আসলামি ও সালমা ইবনু ওয়াক্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন。
আবু বকর রা. যেসব বাহিনী পাঠিয়েছিলেন, তাঁরা যেন একটা শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলেন। এ ছিল খিলাফতের অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা। এসব বাহিনীর মধ্যে নেতৃত্বের দক্ষতার পাশাপাশি সুশৃঙ্খলা ছিল অটুট। এঁরা ছিলেন যুদ্ধের ব্যাপারে পূর্ব-অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ। রাসুলের যুগেই তাঁরা নিজেদের সামরিক দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। আবু বকরের সামরিক প্রজ্ঞা জাজিরাতুল আরবের সকল সামরিক নেতার চেয়ে ছিল অনেক ঊর্ধ্বে, অনেক আধুনিক।
টিকাঃ
১১২. আল-ওয়ালায়াতু আলাল বুলদান, আবদুল আজিজ ইবরাহিম আল উমরি: ১/৫৫১।
১১৩. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া লিস সাহিহা, উমারি: ২/৪৬৭-৪৭০।
১১৪. সহিহ মুসলিম—আল-ফাজায়িল: ৪/৪৭৮৪।
১১৫. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া আস-সাহিহা: ২/৫৩৫।
১১৬. কিসসাতু বা'সি জায়শি উসামা রা. ড. ফজলে এলাহি: ৮।
১১৭. ফাতহুল বারি: ৮/১৫৪।
১১৮. সহিহ বুখারি, কিতাবুল মাগাজি : ৪৪৬৯।
১১৯. জুরফ হচ্ছে শামের দিকে মদিনা থেকে তিন মাইল দূরের একটি জায়গার নাম।
১২০. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া আস-সাহিহা: ২/৫৫২; আস-সিরাতুন নাবাবিয়া ফি জু-ইল মাসাদিরিল আসলিয়াহ: ৬৮৫।
১২১. আন-নিহায়া ফিল গারিবিল হাদিস: ২/৪৫৫।
১২২. তারিখু খলিফা: ১০২। 'আমার পিতার ওপর'।
১২৩. আন-নিহায়া: ৫/২৮৮।
১২৪. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩০৯।
১২৫. প্রাগুক্ত: ৬/৩০৭।
১২৬. এর দ্বারা ইশারা হচ্ছে সেই ঘটনার দিকে যে, উহুদের দিন যখন আবু বকর রা. প্রতিপক্ষে থাকা তাঁর ছেলে আবদুর রাহমানকে হত্যার জন্য অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন নবিজি বলেছিলেন, 'তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে তোমার জায়গায় চলে যাও!'
১২৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩১৯।
১২৮. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৪৯।
১২৯. তারিখুত তাবারি: ৪/৬৮; দিরাসাতুন ফি আসরিন নুবুওয়াহ: ৩২১।
১৩০. দিরাসাতুন ফি আহদিন নুবুওয়াতি ওয়াল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৩২১।
১৩১. ফিত তারিখিল ইসলামি, শাওকি আবু খলিল: ২২৬-২২৭।
১৩২. মিন দাওলাতি উমারা ইলা দাওলাতি আবদিল মালিক, ইবরাহিম বায়জুন: ২৭।
📄 ইরতিদাদি ফিতনা দমনে খালিদ
আবু বকর রা. এই ১১ বাহিনীর সামগ্রিক নেতৃত্ব অর্পণ করেছিলেন আল্লাহর তরবারিখ্যাত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের হাতে। খালিদ ছিলেন ইসলামের বিজয়াভিযানের প্রাণপুরুষ এবং ইরতিদাদি ফিতনা দমনে অনুপম সামরিক প্রজ্ঞা প্রদর্শনকারী ব্যক্তি। মুসলিমবাহিনীর এই বণ্টনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যবস্থাপনা। মুরতাদরা তখনো ছিল যার যার এলাকায় পৃথক পৃথক অবস্থানে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে তখনো ঐক্যবদ্ধ ছিল না। বড় বড় গোত্র ছিল দূরদূরান্তে বিক্ষিপ্ত অবস্থায়। তারা একত্রিত হওয়ার সময় করে উঠতে পারেনি। কারণ, প্রথমত ইরতিদাদি ফিতনা শুরু হওয়ার পর তখনো তিন মাস অতিক্রান্ত হয়নি। দ্বিতীয়ত, তারা মুসলিমদের পক্ষ থেকে নিজেদের কোনো প্রকার শঙ্কার মধ্যে আছে বলে মনে করেনি। তারা এই দিবাস্বপ্নে বিভোর ছিল যে, কয়েক মাসের মধ্যেই মুসলিমদের নির্মূল করে ফেলবে। তাই আবু বকর রা. চাচ্ছিলেন, সংগঠিত হওয়ার আগেই ওদের শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলবেন। ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তুলবেন। এ উদ্দেশ্যে ফিতনাটা পূর্ণ শক্তিতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই তিনি তৎসংশ্লিষ্ট যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তাদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর অবকাশটুকুও দেননি। আবু বকর তখন এই হিকমাহর ওপর আমল করেছিলেন,
বুদ্ধিমান হয়ে থাকলে সাপের লেজ কেটে ছেড়ে দেবে না
যদি পারো লেজের সঙ্গে মাথাটাও কেটে ফেলো।
তিনি এই ফিতনার ভয়াবহতা ও এর মন্দ পরিণতি ভালো করে আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, শুরুতেই যদি এর টুটি চেপে ধরা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ছাইচাপা আগুন থেকে লেলিহান শিখা জ্বলে উঠতে পারে। তখন ওই আগুন শুকনো ও ভেজা সবকিছু পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেবে। কবি বলেন,
ছাইয়ের নিচে আমি আগুন দেখতে পাচ্ছি,
শীঘ্রই তা দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে。
ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর ছিলেন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং দক্ষ একজন সমরবিদ। যেকোনো বিষয়ের সঠিক ধারণা রাখায় ছিলেন বিশেষ পারঙ্গম। এ ছাড়া ছিলেন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাগ্রহণে অত্যন্ত দক্ষ।
একপর্যায়ে সেই ১১টা বাহিনী বেরিয়ে পড়ে। তাঁদের হাতে ইসলামের পতাকা পতপত করে উড়ছিল। তাঁদের ইমানে দেখা দিয়েছিল জগৎপ্লাবী জোয়ার। তাঁরা ছিলেন আল্লাহর বড়ত্ব উপস্থাপনকারী। তাঁদের অন্তর থেকে নিষ্ঠাপূর্ণ দুআ বের হতো। কণ্ঠ কেবল আল্লাহর জিকির দ্বারা সচল থাকত। আল্লাহ তাঁদের পবিত্র দুআ কবুল করেন। তাঁদের ওপর তাঁর সাহায্য অবারিত করেন। তাঁদের মাধ্যমে তাঁর বাণী ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। দীনের হিফাজতের যে অঙ্গীকার তিনি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন করেন। ফলে মাত্র কয়েক মাসেই জাজিরাতুল আরব ইসলামের অনুগত হয়ে যায়。
আবু বকর রা. ইরতিদাদের শিকার গোত্রগুলোর উদ্দেশে একটা চিঠি লেখেন। চিঠিতে তাদের ইসলামের দিকে ফিরে আসা এবং একে সত্যিকার অর্থে ধারণের আহ্বান জানান। বাতিল আঁকড়ে থাকার ব্যাপারে ইহ ও পরকালীন শাস্তির ভয় দেখান। এতে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। পদ্ধতিটা ছিল দীন থেকে প্রত্যাবৃত্ত হওয়ার এবং বাতিলের ওপর জমে থাকার মোকাবিলায় যথোপযুক্ত প্রতিষেধক। তাদের নেতাদের মাথায় ঔদ্ধত্য ও অহংকার ছেয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতা তাদের অনুসারীদের মস্তিষ্ক গুলিয়ে দিয়েছিল। এ জন্য তাদের মাথা থেকে ঔদ্ধত্যের এই ভূত নামাতে কঠোরতাই কাম্য ছিল。
টিকাঃ
১৩৩. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৫১。
১৩৪. হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৩১২-৩১৩。
১৩৫. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/৫১。
১৩৬. প্রাগুক্ত: ৯/৫৫。
📄 তুলায়হা আসাদির ফিতনা মোকাবিলায় খালিদ
১. তুলায়হা আসাদির ফিতনা
নবুওয়াতের দাবিদারদের মধ্যে তুলায়হা আসাদি ছিল তৃতীয় অবস্থানে। সে নবিজির জীবনের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে আত্মপ্রকাশ করে। তার নাম তুলায়হা ইবনু খুওয়াইলিদ ইবনু নাওফাল ইবনু নাজলা আল আসাদি। নবম হিজরিতে সে একদল প্রতিনিধিসহ রাসুলের দরবারে আসে। মদিনায় পৌঁছে রাসুল ﷺ-কে সালাম দেয়। এরপর অনুগ্রহের প্রকাশ দেখাতে গিয়ে বলে, 'আমরা নিজে থেকে আপনার খিদমতে এসেছি। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আপনি তাঁর বান্দা ও রাসুল; অথচ তিনি আমাদের কাছে কাউকে পাঠাননি। আমরা আমাদের পেছনে থাকা লোকদের জন্য যথেষ্ট।' এর ভিত্তিতে আল্লাহর বাণী অবতীর্ণ হয়,
يَمُنُّوْنَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوْا قُلْ لَّا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَيكُمْ لِلْإِيْمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِيْنَ
তারা মুসলমান হয়ে আপনাকে ধন্য করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ এটা মনে করো না; বরং আল্লাহ ইমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদের ধন্য করেছেন; যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকো। [সুরা হুজুরাত : ১৭]
এরপর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তুলায়হাও নিজের এলাকায় ফিরে আসে এবং একসময় ইরতিদাদের শিকার হয়ে নবুওয়াতের দাবি করে বসে। নবুওয়াতের দাবি করার পর চতুর তুলায়হা যখন বুঝতে পারে-মুসলিমদের সঙ্গে তার সংঘাত অনিবার্য, তখন সামিরা অঞ্চলকে নিজের সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে নেয়। এভাবে সাধারণ মানুষ তার অনুগত হতে থাকলে ধীরে ধীরে তার নবুওয়াতের বিষয়টাও ছড়াতে থাকে। মানুষের পথভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ ছিল, তারা তার সঙ্গে এক সফরে ছিল। সফরের একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে থাকা পানি শেষ হয়ে যায় এবং প্রচণ্ড পিপাসায় তারা কাতরাতে থাকে। তখন সে লোকজনকে বলে, 'তোমরা আমার ঘোড়া “ইলালে” চড়ে কয়েক মাইল যাও, পানি পেয়ে যাবে।' তারা এমনটা করলে পানি পেয়ে যায়। এভাবে গ্রাম্য সহজ-সরল লোকগুলো তার ফিতনায় পড়ে।
তার কুকীর্তির মধ্যে এটাও একটা যে, সে সালাতের মধ্যে সিজদা ছেড়ে দেয়। তার ধারণা ছিল, আসমান থেকে তার ওপর ওহি নাজিল হয়। তার ছন্দোবদ্ধ বাক্যসমূহের এটাও একটা, যাকে সে ওহি বলে দাবি করত,
والحمام واليمام، والصرد والصوام، قد صمن قبلكم باعوام، ليبلغن ملكنا العراق والشام .
কবুতর ও জংলি কবুতর, সুরদ ও সাওয়ام, তোমরা ইতিপূর্বে অনেক বছর রোজা রেখেছ। ইরাক ও শামে আমাদের রাজত্ব হবে。
তুলায়হার অহংকার ক্রমশ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে তার শক্তি ও জনবল। রাসুল তার এসব কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর জিরার ইবনুল আজওয়ার আসাদিকে তার মোকাবিলায় পাঠান; কিন্তু আসাদ ও গাতফানের মতো শক্তিশালী দুই গোত্র তার অনুগত ছিল। এ কারণে তার মোকাবিলা করা জিরারের পক্ষে সম্ভব হয়নি。
দায়িরাতুল মাআরিফিল ইসলামিয়া (ইসলামি এনসাইক্লোপিডিয়া) তুলায়হার ব্যাপারে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছে। এতে লেখা হয়েছে, 'সে উপস্থিত কবিতা আবৃত্তি করতে পারত। রণাঙ্গনে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই সেনাদের মধ্যে উদ্দীপনামূলক ভাষণ দিতে পারত।' এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, সে ছিল জাহিলি যুগের নেতাদের অনুসরণীয় ব্যক্তি। তার মধ্যে অনেক গুণের সমাহার ছিল। সে ছিল গণক, কবি, বক্তা ও যোদ্ধা。
এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে তুলায়হা আসাদির প্রশংসা করা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যায়, সে ছিল একজন আদর্শ নেতা। উপস্থিত কবিতা আবৃত্তি ও ভাষণ দিতে ছিল পারঙ্গম। তৎকালে আরবরা এ দুটি গুণের খুব কদর করত। আর এনসাইক্লোপিডিয়ার পক্ষ থেকে এমন ব্যক্তির প্রশংসা নতুন কিছু নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসলাম নিয়ে সমালোচনা। আমাদের জানা নেই তারা জানে কি না যে, তুলায়হা তাওবা করে ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে খাঁটি মুসলিম হিসেবে বাকি জীবন অতিবাহিত করেছেন।
২. তুলায়হার মোকাবিলায় খালিদ
তুলায়হার ব্যাপারটা ঝুলন্ত অবস্থায়ই নবিজি ইনতিকাল করেন। এর পর খিলাফতের বাগডোর আবু বকরের হাতে আসে। তিনি খলিফা হওয়ার পরই মুরতাদদের নির্মূল করতে সেনাবাহিনী গঠন করতে মনোযোগী হন। পৃথক পৃথক সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তুলায়হা আসাদিকে দমন করতে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে পাঠিয়েছিলেন।
ইমাম আহমাদের বর্ণনা; আবু বকর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নিযুক্ত করার সময় বলেছিলেন, 'আমি রাসুল -কে বলতে শুনেছি, "খালিদ আল্লাহর উত্তম একজন বান্দা। নিজের গোত্রেও উত্তম ব্যক্তি। তিনি আল্লাহর তরবারিসমূহের একটি তরবারি। আল্লাহ তাঁকে কুফফার ও মুনাফিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।”
খালিদ রা. জুল-কিসসা অভিমুখে রওনা হলে আবু বকর রা. তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে বলেন, তিনি অন্যান্য নেতাকে নিয়ে খায়বারের দিক থেকে এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হবেন। তাঁকে নির্দেশ দেন, 'প্রথমে আপনি তুলায়হার দিকে যাবেন। তাদের শায়েস্তার পর বনু তামিমের মোকাবিলা করবেন।'
তুলায়হা এ সময় বনু আসাদ ও গাতফানে অবস্থান করছিল। ইতিমধ্যে বনু আবস ও জুবইয়ানের লোকেরা তার সঙ্গ দেয়। সে তখন বনু তাইয়ের শাখা জাদিলা ও গাওসের সাহায্য চায়। লোক পাঠিয়ে দ্রুত তাদের তার সঙ্গ দেওয়ার আহ্বান জানায়। এদিকে আবু বকর রা. বনু তাইকে তুলায়হার সঙ্গ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে আদি ইবনু হাতিমকে খালিদের আগেই বনি তাইয়ের দিকে পাঠিয়ে দেন। তিনি আদিকে বলেন, 'তুমি তাদের বিরত রাখার চেষ্টা করবে। বিরত না হলে ভয়ংকর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।'
আদি রা. বনু তাইয়ে উপস্থিত হয়ে তাঁর গোত্রকে আবু বকরের হাতে বায়আত হতে আহ্বান জানান। তাদের বলেন, 'আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো।' তারা জবাব দেয়, 'আমরা আবু ফুসাইলের (আবু বকর) হাতে বায়আত হব না।' আদি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আবু বকরের বাহিনী তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছে গেলে যতক্ষণ-না তোমরা জেনে যাচ্ছ যে, আবুল ফাহাল হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিষয়, ততক্ষণ তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।'
আদি ইবনু হাতিম তাদের পেছনে লেগে থাকেন। একপর্যায়ে তারা অনেকটা নমনীয় হয়ে আসে। এরইমধ্যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদও তাঁর বাহিনী নিয়ে সেখানে পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে যে-সকল আনসার সাহাবি ছিলেন, তাঁদের প্রথম কাতারের সেনাপতি ছিলেন সাবিত ইবনু কায়েস ইবনু শাম্মাস। তিনি সেখানে এসেই শত্রুবাহিনীর গতিবিধির খোঁজ নিতে সাবিত ইবনু আকরাম ও উল্কাশা ইবনু মিহসানকে পাঠিয়ে দেন। তাঁরা তুলায়হার ভাতিজা হিবালকে পেয়ে তাকে হত্যা করে ফেলেন। সংবাদটা জানতে পেরে তুলায়হা ও তার ভাই সালমা বেরিয়ে আসে। ফলে সাবিতের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে তুলায়হা উক্কাশা ও সাবিতকে শহিদ করে ফেলে।
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. সেখানে পৌঁছে তাঁদের শহিদ অবস্থায় দেখতে পেয়ে জ্বলে ওঠেন। প্রত্যেক মুসলিমের কাছে ব্যাপারটা ভীষণ পীড়াদায়ক ঠেকে। খালিদ তখন সেখান থেকে সোজা বনু তাইয়ের দিকে মোড় নেন। সেখানে পৌঁছতেই আদি ইবনু হাতিম বেরিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। তিনি তাঁর কাছে আবেদন জানান, 'আপনি আমাকে আরও তিনটা দিন অবকাশ দিন। তারা আমার কাছে এই অবকাশটুকু চেয়েছে, যাতে তাদের যে লোকজন তুলায়হার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে পারে। তারা আশঙ্কা করছে, এই মুহূর্তে তারা আপনার সঙ্গ দিলে তুলায়হা হয়তো তার কাছে থাকা বনু তাইয়ের যুবকদের হত্যা করে ফেলতে পারে। আশা করি, তারা জাহান্নামে পড়ার চেয়ে তাদের প্রত্যাবর্তন আপনার কাছে ভালোই লাগবে।' তিন দিন পর আদি রা. তাঁর গোত্রের ৫০০ মুজাহিদ নিয়ে খালিদের সঙ্গে যোগ দেন। এভাবে তাঁরা সবাই সত্যের দিকে ফিরে এসেছিল।
টিকাঃ
১৩৭. উসদুল গাবাহ: ৩/৯৫।
১৩৮. হুরুবির রিদ্দাহ, মুহাম্মাদ আহমাদ বাশমিল: ৭৯।
১৩৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৩।
১৪০. উসদুল গাবাহ: ৩/৯৫।
১৪১. দায়িরাতুল মাআরিফিল ইসলামিয়া-হারকাতুর রিদ্দাহ: ৭৮।
১৪২. হারকাতুর রিদ্দাহ, ড. আলি আতুম: ৭৮।
১৪৩. মুসনাদু আহমাদ: ১/১৭৩। শায়খ আহমাদ শাকির হাদিসটির সনদ বিশুদ্ধ বলেছেন।
১৪৪. তারতিবু ওয়া তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খিলাফাতু আবি বাকরিন, ড. সামিল সুলামি : ১০১।
১৪৫. ফুসাইল অর্থ ছোট উট বা উটের বাচ্চা।
১৪৬. ফাহাল অর্থ বড় ষাঁড় উট।
📄 বনু জাদিলা অভিমুখে খালিদ
এর পর খালিদ বনু জাদিলা অভিমুখে বের হন। আদি তখনো এগিয়ে এসে বলেন, 'আমাকে কয়েকটা দিনের অবকাশ দিন, ইনশাআল্লাহ আমি তাদেরও আপনার কাছে নিয়ে আসছি। আমি যথেষ্ট আশাবাদী যে, আল্লাহ তাদেরও বনু গাওসদের মতো রক্ষা করবেন।' সুযোগ পেয়ে আদি রা. তাদের কাছে যান এবং নাছোড়বান্দার মতো তাদের পেছনে লেগে থাকেন। একপর্যায়ে তারা আদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলামের দিকে ফিরে আসে। তাদের ১ হাজার যোদ্ধা মুসলিমবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। এভাবে আদি তাঁর গোত্রের উভয় শাখার জন্য একজন মহান ত্রাতা ও বরকতময় সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হন。
টিকাঃ
১৪৭. তারতিবু ওয়া তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-খিলাফাতু আবি বাকরিন, ড. মুহাম্মাদ সামিল সুলামি : ১০২。
১৪৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩২২。