📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বনু সাকিফের কাছে খালিদের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল

📄 বনু সাকিফের কাছে খালিদের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল


তাঁদের ফিরে যাওয়ার পর বনু সাকিফের কাছে রাসুল খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুগিরা ইবনু শুবা ও আবু সুফিয়ানের সমন্বয়ে একটা প্রতিনিধিদল পাঠান。

বনু সাকিফের প্রতিনিধিদলের প্রচেষ্টায় যখন বনু সাকিফের সবাই ইসলাম কবুল করে নেন, তখন রাসুলের পাঠানো প্রতিনিধিদলও তায়েফে পৌঁছে যায়। মুগিরা ইবনু শুবার নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটা প্রতিনিধিদল তাঁদের সেই রাব্বাহ মূর্তি ধ্বংস করতে নেমে পড়েন। উরওয়া ইবনু মাসউদের পরিণতির কথা স্মরণ করে অতর্কিত আক্রমণ থেকে বাঁচতে কঠিন পাহারায় মূর্তি ধ্বংসের কাজ আরম্ভ হয়। সাকিফিদের ধারণা ছিল, প্রবল ক্ষমতার অধিকারী মূর্তিটা কখনো ধ্বংস করা সম্ভব হবে না। তাই মূর্তির ধ্বংস হওয়ার দৃশ্য দেখতে নারী-পুরুষ, জোয়ান-বুড়া-শিশু সবাই মাঠে নেমে আসে।

মুগিরা ইবনু শুবা বুদ্ধিমান ও বিনোদনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি বনু সাকিফের হাস্যকর একটা বিষয় তোমাদের দেখাতে চাই।' এরপর তিনি কুঠার দিয়ে মূর্তিটাকে সজোরে আঘাত করে নিজে নিচে পড়ে যাওয়ার অভিনয় করেন। মূর্তির আক্রোশের শিকার হয়ে তিনি ব্যথা পেয়েছেন ভেবে তায়েফের জনগণ সজোরে চিৎকার করে ওঠে। তারা বলতে থাকে, 'আল্লাহ মুগিরাকে ধ্বংস করুক! নিশ্চয় সে মূর্তির আক্রোশের শিকার হয়েছে।' তারা তাঁকে ভূপাতিত হতে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে মুসলিমবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলছিল, 'তোমাদের কারও সাধ্য থাকলে দ্বিতীয়বার মূর্তি ধ্বংসের চেষ্টা করে দেখো! আল্লাহর শপথ, কখনোই তোমরা তা করতে পারবে না।' মুগিরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ান এবং বলেন, 'হে সাকিফের লোকেরা, নিশ্চয় এটা একটা পাথরের মূর্তি। তোমরা এর শোচনীয় অবস্থা প্রত্যক্ষ করো এবং আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হও。

মুগিরা ও তাঁর সঙ্গীরা মূর্তিটা সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিলে এর পুরোহিত রাগে-ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে এবং তাদের কল্পিত প্রভুর পক্ষ থেকে এঁদের ধ্বংস করার অপেক্ষা করতে থাকে। মূর্তির কাঠামো ধসে পড়লে সে চিৎকার করে বলে ওঠে, 'যদি তোমরা মূর্তির বেদীতে আঘাত হানো, তাহলে অবশ্যই তোমাদের কাজের মন্দ ফল দেখতে পাবে।' তার এই মূর্খতাপূর্ণ কথা শুনে মুগিরা বলে ওঠেন, ‘দেখো, আমি এই মূর্তিটার বেদীতে কী করি!’ এরপর তিনি মূর্তির বেদী খনন করে সেখান থেকে তার মাটি সরিয়ে প্রোথিত সোনাদানা বের করে আনেন। এই দৃশ্য দেখে মূর্তির তত্ত্বাবধায়ক স্তব্ধ হয়ে পড়ে এবং তার দৃষ্টি থেকে অন্ধত্বের পর্দা সরে যায়।

রাসুলের পাঠানো বাহিনী তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে মূর্তির কাপড় ও অলংকারাদি নিয়ে ফিরে আসে। মুসলিমবাহিনীর সফলতায় আল্লাহর প্রশংসা করে তাঁদের আনীত সম্পদ রাসুল সেদিনই তাঁদের মধ্যে বণ্টন করে দেন।

এভাবেই আরবভূমি থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মূর্তি অপসারণ করে সেখানে আল্লাহর ঘর নির্মাণ করা হয়। কেননা, রাসুল তায়েফে নিযুক্ত তাঁর প্রতিনিধি উসমান ইবনু আবিল আসকে আদেশ দিয়েছিলেন, যেন তায়েফের সেই প্রসিদ্ধ মূর্তির স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়。

টিকাঃ
৯৯. প্রাগুক্ত: ৪/১৯৫。
১০০. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি: ৫/৩০৪。
১০১. মাগাজি, ওয়াকিদি: ৩/৬৭১。
১০২. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি: ৪/৩০৩-৩০৪。
১০৩. আস-সারায়া ওয়াল বুয়ুস: ৩০০。
১০৪. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি: ৫/৩০৪。
১০৫. আস-সারায়া ওয়াল বুয়ুস: ৩০০。
১০৬. মাগাজি, ওয়াকিদি: ৩/৯৭২。
১০৭. তারিখু ইবনি শায়বাহ: ২/৫০৭。
১০৮. আস-সারায়া ওয়াল বুয়ুস: ৩০০。
১০৯. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি: ৫/২৯৯-৩০৩。

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বনু হারিস ইবনু কা‘আবের বিরুদ্ধে খালিদের যাত্রা

📄 বনু হারিস ইবনু কা‘আবের বিরুদ্ধে খালিদের যাত্রা


বনু হারিস ইবনু কাব নাজরানে থাকত। তখন পর্যন্ত তাদের গোত্রের কেউ ইসলাম গ্রহণ করেনি। রাসুল দশম হিজরির রবিউল আউয়াল অথবা জুমাদাল উলায় খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে এই নির্দেশ দিয়ে পাঠান যে, তিনি তাদের পরপর তিনবার ইসলামের দিকে আহ্বান করবেন। যদি তারা সাড়া দেয়, তাহলে তা মেনে নেবেন; অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। খালিদ রা. সেখানে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতে চারদিকে অশ্বারোহী পাঠান। বনু হারিস তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে ইসলামগ্রহণ করলে তিনি রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে অবস্থান করেন এবং তাঁদের ইসলাম, কিতাবুল্লাহ ও রাসুলের সুন্নাহ শিক্ষা দেন। এরপর রাসুলের কাছে গোত্রবাসীর ইসলামগ্রহণ এবং তাঁদের মধ্যে অবস্থান করার সংবাদ জানিয়ে চিঠি লিখলে রাসুল তাঁকে গোত্রবাসীর পক্ষ থেকে একটা প্রতিনিধিদল নিয়ে মদিনায় ফিরে আসতে বলেন। নবিজির নির্দেশ অনুযায়ী গোত্রের প্রতিনিধিদল নিয়ে মদিনায় রওনা হন খালিদ।

মদিনায় রওনা হওয়ার আগে কায়েস ইবনু হুসাইন রা.-কে তাঁদের নেতা মনোনীত করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের দীনি শিক্ষা প্রদান ও রাসুলের সুন্নাহ শেখাতে আমর ইবনু হাজম রা.-কে শিক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়।

অন্য বর্ণনায় আছে, রাসুল খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পরিবর্তে আলি রা.-কে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। পথিমধ্যে যখন তিনি হামাদান গোত্রে পৌঁছান, তখন তাঁদের সামনে রাসুলের চিঠি পাঠ করলে তাঁরা সবাই ইসলামগ্রহণ করে। আলি রা. রাসুলের কাছে তাঁদের ইসলামগ্রহণের কথা জানিয়ে চিঠি লিখলে তিনি তা পাঠে আনন্দিত হন এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। এরপর মাথা উঠিয়ে বলেন, 'হামাদানের ওপর শান্তি বর্ষুক! হামাদানের ওপর শান্তি বর্ষক!'

দক্ষিণাঞ্চল তথা ইয়ামেনবাসী ইসলাম গ্রহণ করুক—রাসুল তা মনেপ্রাণে প্রত্যাশা করতেন। তাঁর চাওয়ামতো দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করলে ইয়ামেন থেকে একের পর এক প্রতিনিধিদল মদিনায় আসতে শুরু করে। এ থেকে এটাও স্পষ্ট হয় যে, ইয়ামেন অভিমুখী বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের কার্যক্রম প্রায় একই সময়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিচালিত হয়েছিল। রাসুলের প্রতিনিধিদল মূলত শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামি দাওয়াতের প্রতি মনোনিবেশ করত। আর এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়েই প্রথমে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এবং পরে আলি ইবনু আবি তালিবকে পাঠানো হয়েছিল।

টিকাঃ
১১০. সিরাতু ইবনি হিশام: ৪/২৫০。
১১১. আল-ফিকহুস সিয়াসি লিল-ওসায়িকিন নাবাবিয়া: ২৩১。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00