📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 সাকিফের প্রতিনিধিদের আগমন ও ইসলামগ্রহণ

📄 সাকিফের প্রতিনিধিদের আগমন ও ইসলামগ্রহণ


রাসুল যখন তায়েফ থেকে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন উরওয়া ইবনু মাসউদ সাকাফিও তাঁর পেছনে পেছনে গিয়েছিলেন। পথিমধ্যে তিনি নবিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হন এবং ইসলামগ্রহণ করে স্বগোত্রে ফিরে যান। তাঁর লোকদের ইসলামের প্রতি আহ্বান জানালে তারা তাঁকে বর্শার আঘাত করে শহিদ করে দেয়; কিন্তু যখন তারা বুঝতে পারে তাদের পার্শ্ববর্তী ইসলামগ্রহণকারী গোত্রগুলোর মোকাবিলা করে টিকে থাকা সম্ভব নয়, তখন রাসুলের কাছে প্রতিনিধিদল পাঠানোর ইচ্ছা করে। এরপর নবম হিজরিতে তাবুকযুদ্ধ থেকে রাসুলের প্রত্যাবর্তনের পর রমজানে তাদের ছয় সদস্যের একটা প্রতিনিধিদল রাসুলের দরবারে আসে।

বনু মালিক ও আহলাফের তিনজন করে ছয়জনের সমন্বয়ে প্রতিনিধিদলটা গঠন করা হয়েছিল। প্রতিনিধিদলের প্রধান মনোনীত করা হয়েছিল আবদি ইয়ালিল ইবনু আমরকে। দল গঠনে গভীর রাজনৈতিক চিন্তাধারা ছিল ক্রিয়াশীল। সাকিফ গোত্র আশা করছিল, তাদের পরীক্ষিত মিত্র বনু উমাইয়া রাসুলের সঙ্গে তাদের মৈত্রীচুক্তিতে সহযোগিতা করতে পারবে।

সাহাবিরা সাকিফের ইসলামগ্রহণের ব্যাপারে রাসুলের প্রবল আগ্রহের বিষয়টা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এ কারণেই বনু সাকিফের লোকজন মদিনার নিকটবর্তী হলে আবু বকর ও মুগিরা রা. প্রতিনিধিদলের আগমনের সংবাদ রাসুলের কাছে পৌঁছাতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। যদিও শেষপর্যন্ত মুগিরা রা. আবু বকরকে এ সংবাদ দিতে এগিয়ে দিয়েছিলেন।

রাসুল সহাস্যে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের জন্য তাঁবু খাটিয়ে দেন, যেন তারা কুরআন শ্রবণ ও মুসলিমদের সালাত প্রত্যক্ষ করতে পারেন। তারা সেখানে রাসুলের মেহমান হিসেবে অবস্থান করেন। প্রতিনিধিদলের সদস্য উসমান ইবনু আবিল আসকে তাঁবুতে রেখে অন্যরা প্রতিদিন রাসুলের সঙ্গে মিলিত হতেন। তাঁরা যখন রাসুলের দরবার থেকে ফিরে বিশ্রামে যেতেন, তখন উসমান রাসুলের দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁর কাছ থেকে ধর্মীয় বিধান জানার পাশাপাশি কুরআন শিখতেন। তিনি গোত্রের লোকদের অগোচরে নিয়মিত জ্ঞানার্জন করতেন। এভাবে তিনি ধর্মীয় জ্ঞানের পান্ডিত্য অর্জন করেন। রাসুলের অনুপস্থিতিতে তিনি আবু বকরের কাছে যেতেন এবং তাঁর কাছ থেকেও জ্ঞানার্জন করতেন। ধর্মীয় জ্ঞানার্জনে তাঁর এই আগ্রহ নবিজিকে মুগ্ধ করেছিল।

এভাবে কিছুদিন অবস্থান করে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা রাসুলের কাছে আসা-যাওয়া করতে থাকেন। রাসুল তাঁদের ইসলামগ্রহণের প্রতি আহ্বান জানালে আবদি ইয়ালিল বলেন, 'আপনি কি আমাদের পরিবার-পরিজন ও গোত্রের কাছে ফিরে যাওয়ার অবকাশ দেবেন?' রাসুল বলেন, 'তোমরা ইসলামগ্রহণ করলে আমি তোমাদের আলোচনার সুযোগ দেবো; অন্যথায় তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা বা সন্ধি নেই।'

আবদি ইয়ালিল বলেন, 'ব্যভিচারের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? কেননা, আমরা স্ত্রীসঙ্গ ছাড়া দূরদূরান্তে ভ্রমণ করি, যার জন্য অনেক সময় আমাদের সংযম অবলম্বন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।' নবিজি বলেন, 'বিষয়টা আল্লাহ সকল মুসলিমের জন্য হারাম ও অবৈধ করেছেন। আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
আর ব্যভিচারের ধারেকাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।' [সুরা ইসরা : ৩২]

আবদি ইয়ালিল আবার প্রশ্ন করেন, 'সুদের ব্যাপারে আপনার মত কী?' তিনি বললেন, 'সুদ অবৈধ।' ইয়ালিল পুনরায় প্রশ্ন করেন, 'আমাদের যাবতীয় সম্পদেই তো সুদের মিশ্রণ।' উত্তরে নবিজি বলেন, 'তোমাদের জন্য মূলধন অবশ্যই বৈধ। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
হে মুমিনরা, আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের লেনদেন থেকে বিরত থাকো; যদি তোমরা ইমানের দাবিতে সত্যবাদী হও। [সুরা বাকারা: ২৭৮]

এরপর তিনি মদের বৈধতা-অবৈধতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাপূর্বক বলেন, 'আঙুর নিংড়ানো এই রসালো পানীয় গ্রহণে আমরা অভ্যস্ত, যা পরিহার করা আমাদের জন্য কষ্টকর।' নবিজি তখন বলেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ এটাও তোমাদের জন্য হারাম করেছেন।' এ কথা বলে রাসুল তিলাওয়াত করেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
হে মুমিনগণ, মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী এবং জুয়ার তির অপবিত্র শয়তানের কাজ। অতএব, এগুলো পরিহার করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। [সুরা মায়িদা : ৯০]

প্রতিনিধিদল উঠে গিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাদাভাবে পরামর্শ করে। সেখানে আবদি ইয়ালিল বলেন, 'তোমাদের ধ্বংস হোক, আমরা এ তিনটা বিষয়ের নিষিদ্ধতার বিধান নিয়ে কীভাবে গোত্রে ফিরে যাব? আল্লাহর শপথ, সাকিফের লোকজন কখনোই মাদক সেবন থেকে বিরত থাকতে পারবে না এবং ব্যভিচার থেকেও সংযম অবলম্বন করতে পারবে না।'

প্রতিনিধিদলের একজন সুফিয়ান ইবনু আবদিল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাদের কল্যাণ চাইলে তারা অবশ্যই এসব থেকে বিরত থাকবে। নিশ্চয় মুহাম্মাদের সাথিরা অতীতে আমাদের মতোই ছিল; কিন্তু তাঁরা এসব বিষয় থেকে সংযত হয়েছে এবং পুরানো অভ্যাস পরিত্যাগ করেছে। বর্তমানে আমরা মুহাম্মাদের বিজয় প্রত্যক্ষ করছি। তিনি একের পর এক ভূখণ্ড জয় করে নিচ্ছেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহেও ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহর কসম, যদি তাঁরা মাসব্যাপী আমাদের কেল্লা অবরুদ্ধ করে রাখে, তাহলে আমরা অনাহারে মারা যাব। আমি ইসলামগ্রহণ ছাড়া বিকল্প দেখছি না। অন্যথায় আমি আমাদের ওপর মক্কাবিজয়কালীন পরিস্থিতির আশঙ্কা করছি।'

খালিদ ইবনু সায়িদ ইবনুল আস তাঁদের ও রাসুলের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করতেন। শেষপর্যন্ত তাঁরা সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ফলে খালিদ চুক্তিনামা লিপিবদ্ধ করেন।

চুক্তিপত্রের খসড়া প্রস্তুতকালে তাঁরা তাঁদের একটা বিশেষ মূর্তি তথা রাব্বাহ নিয়ে নবিজিকে প্রশ্ন করলে তিনি তা ধ্বংস করার আদেশ দেন।

প্রত্যুত্তরে তাঁরা বলেন, 'হায়! হায়! রাব্বাহ যদি জানতে পারে আমরা তাকে ধ্বংসের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে এসেছি, তাহলে সে আমাদের পরিবারসহ সবাইকে ধ্বংস করে ফেলবে!' তখন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলে ওঠেন, 'হে আবদি ইয়ালিল, তোমার ধ্বংস হোক! রাব্বাহ তো একটা পাথরমাত্র। সে জানে না কে তার উপাসনা করেছে আর কে করেনি।' ইয়ালিল বলেন, 'উমর, আমরা তোমার কাছে আসিনি।'

এরপর তাঁরা ইসলামগ্রহণ করে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিপত্রটা খালিদ ইবনু সায়িদ লিপিবদ্ধ করেন। চুক্তিপত্র সম্পাদিত হলে তাঁরা এই মূর্তির বিষয়ে রাসুলের সঙ্গে কথা বলেন এবং মূর্তি ভাঙার ব্যাপারে তিন বছর সময় চান। রাসুল তিন বছর সুযোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁরা দুই বছরের অবকাশ চান। নবিজি তাতেও সম্মত না হলে তাঁরা এক বছরের অবকাশ চান; কিন্তু তিনি তাতেও অস্বীকৃতি জানান। এরপর তাঁরা বলেন, 'আপনি এ ব্যাপারে আমাদের অন্তত এক মাস সময় দিন।' কিন্তু নবিজি তাঁদের কোনো সময় দিতে রাজি হননি।

প্রতিনিধিদলের লোকজন মূর্তি ভাঙার ব্যাপারে তাঁদের বোকা ও নির্বোধ সম্প্রদায়ের প্রতিবাদী হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছিল। শেষপর্যন্ত তাঁরা রাসুলের কাছে নিজেরা মূর্তি ভাঙার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলে তিনি তা মনজুর করেন। এরপর তাঁরা সালাত না পড়ার অনুমতি চান। তাঁদের এ কথা শুনে নবিজি বলেন, 'ওই ধর্মে কোনো কল্যাণ নেই, যেখানে সালাত নেই।'

এভাবে সাকিফের লোকজন রাসুলের কাছে বিভিন্ন ফরজ ইবাদত পালনের ব্যাপারে শৈথিল্য এবং বিভিন্ন হারাম কাজের অনুমতি চাইছিলেন; কিন্তু তাঁদের কোনো দাবিই মানা হয়নি। ফলে তাঁরা পূর্ণরূপে সত্যধর্মের অনুসারী হতে বাধ্য হন।

রাসুল প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সদাচরণ করেন এবং সম্মানজনকভাবেই তাঁদের আপ্যায়ন করেন। আগমন থেকে বিদায় পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে অত্যন্ত ভালো আচরণ করেন। তিনি তখন উসমান ইবনু আবিল আসকে তায়েফের শাসক নিযুক্ত করেন। উসমান বয়সে তাঁদের মধ্যে কনিষ্ঠ হলেও কুরআন ও ধর্মীয় জ্ঞানে ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা নবিজির আচরণ এবং তাঁদের সঙ্গে মুসলিমদের মেলামেশায় অত্যন্ত প্রভাবিত হন। এমনকি তাঁরা রমজানের বাকি দিনগুলোতে রোজা রাখতে শুরু করেন। এভাবে মদিনায় ১৫ দিন অবস্থান করে তাঁরা তায়েফে ফিরে যান।

টিকাঃ
৯২. রিসালাতুল আমবিয়া: ১৯৯。
৯৩. সিরাতু নাবাবি, ইবনু হিশাম: ৪/১৯৩。
৯৪. রিজালুল ইদারাহ ফিদ দাওলাতিল ইসলামিয়া, ড. হুসাইন মুহাম্মাদ: ৭৬。
৯৫. সিরাতু নাবাবি, ইবনু হিশام : ৪/১৯৩。
৯৬. তারিখুল ইসলাম, মাগাজি অধ্যায়, জাহাবি: ৬৮০。
৯৭. মাগাজি, ওয়াকিদি: ৩/৯২৮。
৯৮. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া আস-সাহিহা: ২/৫১৯-৫২০。

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বনু সাকিফের কাছে খালিদের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল

📄 বনু সাকিফের কাছে খালিদের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল


তাঁদের ফিরে যাওয়ার পর বনু সাকিফের কাছে রাসুল খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুগিরা ইবনু শুবা ও আবু সুফিয়ানের সমন্বয়ে একটা প্রতিনিধিদল পাঠান。

বনু সাকিফের প্রতিনিধিদলের প্রচেষ্টায় যখন বনু সাকিফের সবাই ইসলাম কবুল করে নেন, তখন রাসুলের পাঠানো প্রতিনিধিদলও তায়েফে পৌঁছে যায়। মুগিরা ইবনু শুবার নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটা প্রতিনিধিদল তাঁদের সেই রাব্বাহ মূর্তি ধ্বংস করতে নেমে পড়েন। উরওয়া ইবনু মাসউদের পরিণতির কথা স্মরণ করে অতর্কিত আক্রমণ থেকে বাঁচতে কঠিন পাহারায় মূর্তি ধ্বংসের কাজ আরম্ভ হয়। সাকিফিদের ধারণা ছিল, প্রবল ক্ষমতার অধিকারী মূর্তিটা কখনো ধ্বংস করা সম্ভব হবে না। তাই মূর্তির ধ্বংস হওয়ার দৃশ্য দেখতে নারী-পুরুষ, জোয়ান-বুড়া-শিশু সবাই মাঠে নেমে আসে।

মুগিরা ইবনু শুবা বুদ্ধিমান ও বিনোদনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি বনু সাকিফের হাস্যকর একটা বিষয় তোমাদের দেখাতে চাই।' এরপর তিনি কুঠার দিয়ে মূর্তিটাকে সজোরে আঘাত করে নিজে নিচে পড়ে যাওয়ার অভিনয় করেন। মূর্তির আক্রোশের শিকার হয়ে তিনি ব্যথা পেয়েছেন ভেবে তায়েফের জনগণ সজোরে চিৎকার করে ওঠে। তারা বলতে থাকে, 'আল্লাহ মুগিরাকে ধ্বংস করুক! নিশ্চয় সে মূর্তির আক্রোশের শিকার হয়েছে।' তারা তাঁকে ভূপাতিত হতে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে মুসলিমবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলছিল, 'তোমাদের কারও সাধ্য থাকলে দ্বিতীয়বার মূর্তি ধ্বংসের চেষ্টা করে দেখো! আল্লাহর শপথ, কখনোই তোমরা তা করতে পারবে না।' মুগিরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ান এবং বলেন, 'হে সাকিফের লোকেরা, নিশ্চয় এটা একটা পাথরের মূর্তি। তোমরা এর শোচনীয় অবস্থা প্রত্যক্ষ করো এবং আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হও。

মুগিরা ও তাঁর সঙ্গীরা মূর্তিটা সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিলে এর পুরোহিত রাগে-ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে এবং তাদের কল্পিত প্রভুর পক্ষ থেকে এঁদের ধ্বংস করার অপেক্ষা করতে থাকে। মূর্তির কাঠামো ধসে পড়লে সে চিৎকার করে বলে ওঠে, 'যদি তোমরা মূর্তির বেদীতে আঘাত হানো, তাহলে অবশ্যই তোমাদের কাজের মন্দ ফল দেখতে পাবে।' তার এই মূর্খতাপূর্ণ কথা শুনে মুগিরা বলে ওঠেন, ‘দেখো, আমি এই মূর্তিটার বেদীতে কী করি!’ এরপর তিনি মূর্তির বেদী খনন করে সেখান থেকে তার মাটি সরিয়ে প্রোথিত সোনাদানা বের করে আনেন। এই দৃশ্য দেখে মূর্তির তত্ত্বাবধায়ক স্তব্ধ হয়ে পড়ে এবং তার দৃষ্টি থেকে অন্ধত্বের পর্দা সরে যায়।

রাসুলের পাঠানো বাহিনী তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে মূর্তির কাপড় ও অলংকারাদি নিয়ে ফিরে আসে। মুসলিমবাহিনীর সফলতায় আল্লাহর প্রশংসা করে তাঁদের আনীত সম্পদ রাসুল সেদিনই তাঁদের মধ্যে বণ্টন করে দেন।

এভাবেই আরবভূমি থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মূর্তি অপসারণ করে সেখানে আল্লাহর ঘর নির্মাণ করা হয়। কেননা, রাসুল তায়েফে নিযুক্ত তাঁর প্রতিনিধি উসমান ইবনু আবিল আসকে আদেশ দিয়েছিলেন, যেন তায়েফের সেই প্রসিদ্ধ মূর্তির স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়。

টিকাঃ
৯৯. প্রাগুক্ত: ৪/১৯৫。
১০০. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি: ৫/৩০৪。
১০১. মাগাজি, ওয়াকিদি: ৩/৬৭১。
১০২. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি: ৪/৩০৩-৩০৪。
১০৩. আস-সারায়া ওয়াল বুয়ুস: ৩০০。
১০৪. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি: ৫/৩০৪。
১০৫. আস-সারায়া ওয়াল বুয়ুস: ৩০০。
১০৬. মাগাজি, ওয়াকিদি: ৩/৯৭২。
১০৭. তারিখু ইবনি শায়বাহ: ২/৫০৭。
১০৮. আস-সারায়া ওয়াল বুয়ুস: ৩০০。
১০৯. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকি: ৫/২৯৯-৩০৩。

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 বনু হারিস ইবনু কা‘আবের বিরুদ্ধে খালিদের যাত্রা

📄 বনু হারিস ইবনু কা‘আবের বিরুদ্ধে খালিদের যাত্রা


বনু হারিস ইবনু কাব নাজরানে থাকত। তখন পর্যন্ত তাদের গোত্রের কেউ ইসলাম গ্রহণ করেনি। রাসুল দশম হিজরির রবিউল আউয়াল অথবা জুমাদাল উলায় খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে এই নির্দেশ দিয়ে পাঠান যে, তিনি তাদের পরপর তিনবার ইসলামের দিকে আহ্বান করবেন। যদি তারা সাড়া দেয়, তাহলে তা মেনে নেবেন; অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। খালিদ রা. সেখানে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতে চারদিকে অশ্বারোহী পাঠান। বনু হারিস তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে ইসলামগ্রহণ করলে তিনি রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে অবস্থান করেন এবং তাঁদের ইসলাম, কিতাবুল্লাহ ও রাসুলের সুন্নাহ শিক্ষা দেন। এরপর রাসুলের কাছে গোত্রবাসীর ইসলামগ্রহণ এবং তাঁদের মধ্যে অবস্থান করার সংবাদ জানিয়ে চিঠি লিখলে রাসুল তাঁকে গোত্রবাসীর পক্ষ থেকে একটা প্রতিনিধিদল নিয়ে মদিনায় ফিরে আসতে বলেন। নবিজির নির্দেশ অনুযায়ী গোত্রের প্রতিনিধিদল নিয়ে মদিনায় রওনা হন খালিদ।

মদিনায় রওনা হওয়ার আগে কায়েস ইবনু হুসাইন রা.-কে তাঁদের নেতা মনোনীত করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের দীনি শিক্ষা প্রদান ও রাসুলের সুন্নাহ শেখাতে আমর ইবনু হাজম রা.-কে শিক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়।

অন্য বর্ণনায় আছে, রাসুল খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পরিবর্তে আলি রা.-কে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। পথিমধ্যে যখন তিনি হামাদান গোত্রে পৌঁছান, তখন তাঁদের সামনে রাসুলের চিঠি পাঠ করলে তাঁরা সবাই ইসলামগ্রহণ করে। আলি রা. রাসুলের কাছে তাঁদের ইসলামগ্রহণের কথা জানিয়ে চিঠি লিখলে তিনি তা পাঠে আনন্দিত হন এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। এরপর মাথা উঠিয়ে বলেন, 'হামাদানের ওপর শান্তি বর্ষুক! হামাদানের ওপর শান্তি বর্ষক!'

দক্ষিণাঞ্চল তথা ইয়ামেনবাসী ইসলাম গ্রহণ করুক—রাসুল তা মনেপ্রাণে প্রত্যাশা করতেন। তাঁর চাওয়ামতো দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করলে ইয়ামেন থেকে একের পর এক প্রতিনিধিদল মদিনায় আসতে শুরু করে। এ থেকে এটাও স্পষ্ট হয় যে, ইয়ামেন অভিমুখী বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের কার্যক্রম প্রায় একই সময়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিচালিত হয়েছিল। রাসুলের প্রতিনিধিদল মূলত শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামি দাওয়াতের প্রতি মনোনিবেশ করত। আর এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়েই প্রথমে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এবং পরে আলি ইবনু আবি তালিবকে পাঠানো হয়েছিল।

টিকাঃ
১১০. সিরাতু ইবনি হিশام: ৪/২৫০。
১১১. আল-ফিকহুস সিয়াসি লিল-ওসায়িকিন নাবাবিয়া: ২৩১。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00