📄 রণাঙ্গনে যেভাবে সেনাপতির দায়িত্ব পান খালিদ
রাসুলের পক্ষ থেকে নির্ধারিত শেষ সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার শাহাদাতের পর সাবিত ইবনু আকরাম এগিয়ে এসে মুসলিমবাহিনীর পতাকা ধারণ করেন। একজন যোদ্ধা হিসেবে তাঁর যা করণীয় ছিল, তিনি তা করেছিলেন। তখন পতাকা ভূলুণ্ঠিত হওয়াকে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পরাজয় ধরে নেওয়া হতো। তাই তিনি পতাকা সমুন্নত রেখে উচ্চৈঃস্বরে মুসলিমদের ডেকে বলছিলেন, তাঁরা যেন তাঁদের নেতা নির্বাচিত করে নেন। যুদ্ধ চলাকালে তাঁকেই নেতৃত্বের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, 'আমি এ বোঝা বহনে অসমর্থ।' এরপর লোকেরা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে নির্বাচিত করে।
এক বর্ণনায় দেখা যায়, সাবিত রা. পতাকা উঠিয়ে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে চলে আসেন। খালিদ তাঁকে বলেন, 'আমি আপনার কাছ থেকে এ পতাকা নেব না। আপনিই তা বহনের অধিক হকদার।' উত্তরে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি তা আপনাকে দিতেই হাতে নিয়েছিলাম।'
ইমতাউল আসমা গ্রন্থে আছে, সাবিত ইবনু আকরাম রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে সম্বোধন করে বলেন, 'আবু সুলায়মান, আপনি পতাকা হাতে নিন।' খালিদ উত্তরে বলেন, 'আপনি আমার চেয়ে এই পতাকা বহনের বেশি উপযুক্ত। কেননা, একে তো আপনি বয়সে বড় ও অভিজ্ঞ; তার ওপর আপনি বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য অর্জনকারী।' উত্তরে সাবিত বলেন, 'আমি তো এই পতাকা শুধু আপনাকেই দিতেই হাতে উঠিয়েছি; সুতরাং আপনিই নিন।' এরপর খালিদ পতাকা নেন।
টিকাঃ
৬০. ইমতাউল আসমা: ১/৩৪৮-৩৪৯।
📄 নেতৃত্বের অধিকার
উভয় বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সাবিত রা. প্রথমে মুসলিমদের একত্রিত করেছিলেন এবং পতাকা খালিদের মতো যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির হাতে অর্পণ করেছিলেন। যদিও উপস্থিত সবাই বলেন, 'আপনি আমাদের নেতৃত্ব নিন।' কিন্তু তিনি নিজেকে এ পদের জন্য সমীচীন মনে করেননি। তিনি ভাবছিলেন, যেহেতু এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি উপস্থিত আছেন, তখন অযোগ্য ব্যক্তির কাছে নেতৃত্ব রাখা বা দেওয়া উচিত নয়। কোনো কাজ যখন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তখন সেখানে কোনো প্রকার মর্যাদা বা প্রতিপত্তির লোভ থাকে না।
সাবিত রা. মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বদানে অক্ষম ছিলেন না। তিনি বদরযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু তাঁর চেয়ে যোগ্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিনি তা নেওয়া সমীচীন মনে করেননি। যদিও তখন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণের বয়স ছিল মাত্র তিন মাস। এ ক্ষেত্রে মৌলিক লক্ষ্য থাকে আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও সমীচীন পন্থায় আদায়ের সক্ষমতা।
বর্তমানে মুসলিম নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে নেতৃত্ব চলে যাওয়ার আশঙ্কা, নিজের ওপর অত্যধিক আত্মবিশ্বাস এবং পার্থিব কামনা-বাসনার বাস্তবায়ন। সাবিত রা.-এর দেখানো উত্তম আদর্শ বর্তমানের নেতাদের সামনে উপদেশের ডালি নিয়ে উপস্থিত হয়; কিন্তু তা থেকে উপদেশ নেন কেবল তাঁরা, যাঁদের রয়েছে অনুধাবনের মতো আত্মা, শোনার মতো কান।
টিকাঃ
৬১. আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৭/১২৪。
৬২. মুয়িনুস সিরাহ: ৩৭৬।
📄 নববি শিক্ষায় নেতৃত্বের সম্মান
আওফ ইবনু মালিক আশজায়ি রা. বলেন, আমি জায়েদ ইবনুল হারিসার সঙ্গে মুতার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ইয়ামেনের এক হিমইয়ারি সাথিও শরিক ছিল। একপর্যায়ে রোমানদের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। বর্মাচ্ছাদিত এক রোমান সেনা লাল রঙের ঘোড়ায় আরোহী ছিল। সে মুসলিমদের ওপর তুমুল আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে আমার হিমইয়ারি সাথি একটা পাথরের আড়ালে তার জন্য ওত পেতে বসা ছিল। রোমান অশ্বারোহী যখন তার সামনে পড়ে, মুহূর্তেই সে তরবারির আঘাতে ওর ঘোড়ার পা কেটে ফেলে। তখন ওই রোমান সেনা পালাতে চাইলে সে ধাওয়া করে তাকে হত্যা করে। এরপর তার ঘোড়াসহ যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়।
মুসলিমরা বিজয়ী হলে খালিদ রা. নিহতদের থেকে অর্জিত যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র জমা দেওয়ার আদেশ দেন। আওফ বলেন, আমি খালিদের কাছে গিয়ে বলি, 'খালিদ, হয়তো আপনি জানেন না, রাসুল ﷺ নিহতের অস্ত্রশস্ত্র ও সম্পদ হন্তারককে দেওয়ার বিধান দিয়েছেন।' খালিদ বলেন, 'নিঃসন্দেহে বিধান তা-ই। তবে আমার কাছে এ সম্পদ অধিক মনে হচ্ছে।' উত্তরে আমি তাঁকে বলি, 'আপনি এই পুরো সম্পদ হন্তারককেই দেবেন, অথবা আমি এ ব্যাপারে রাসুলের কাছে অভিযোগ করব।' তবু তিনি তাঁকে এ সম্পদ দিতে অস্বীকার করেন।
আওফ রা. বলেন, আমরা রাসুলের কাছে বিস্তারিত বিবরণ পেশ করি। রাসুল ﷺ বলেন, 'খালিদ, তুমি এমনটা কেন করেছ?' উত্তরে তিনি বলেন, 'আমার কাছে এ সম্পদ বেশি মনে হয়েছে।' নবিজি তখন যাবতীয় সম্পদ হন্তারককে দিয়ে দিতে বলেন।
আওফ বলেন, আমি খালিদকে বললাম, 'খালিদ, কেমন অনুভব করছ? আমি কি আমার কথা বাস্তবায়ন করে দেখাইনি?' নবিজি তখন জিজ্ঞেস করেন, 'সেটা কী?' আমি তাঁকে পুরো ঘটনা শোনালে তিনি রাগত স্বরে বলেন, 'খালিদ, তুমি এ সম্পদ ফিরিয়ে দেবে না। তোমরা কি আমার পক্ষ থেকে নির্বাচিত নেতাকে আমার দিকে চেয়ে ক্ষমা করে দিতে পারো না। তাঁদের আদেশ পালন তোমাদের জন্য আবশ্যক; তবে এতে কোনো ধরনের ত্রুটির দায় তাঁদের ওপরই বর্তাবে।'
নেতৃস্থানীয়দের পক্ষ থেকে মানবিক প্রবৃত্তিগত কারণে ভুলত্রুটি হয়ে যায়। কিন্তু সেসবের দোহাই দিয়ে তাঁদের লজ্জিত না করার ব্যাপারে রাসুলের নির্দেশনা এবং নেতার পক্ষসমর্থনে তাঁর অবস্থান-এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবিদার। অপমান কিংবা কুৎসা রটনা ছাড়া তাঁদের শোধরানোর পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।
হিমইয়ার গোত্রের সেই মুজাহিদকে নিহতের যাবতীয় সম্পদ দিয়ে দিতে খালিদ রা. অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি তাঁকে অপমানিত করেননি; বরং ইজতিহাদের ভিত্তিতে সর্বসাধারণের সুবিধার কথা ভেবে এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যেন একজন সেনা খুব বেশি সম্পদ না পায়। এর বিপরীতে যদি পুরো সম্পদ গনিমতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে অনেক সেনা অংশ পেতে পারেন।
আওফ ইবনু মালিক যখন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে এ থেকে নিবৃত্ত করছিলেন, তখন তিনি যথার্থ করেছিলেন। তাঁকে সঠিক মাসআলা অবহিত করেছিলেন। খালিদ তা গ্রহণ না করলে এ ব্যাপারে রাসুল -কে তাঁর অবগত করার ব্যাপারটাও সঠিক ছিল। তাঁর উচিত ছিল এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকা। কেননা, তিনি সত্যিকার পাওনাদারকে তার পাওনা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু যখন তিনি এখানে না থেমে একে ব্যক্তিগত বিজয় ও প্রতিশোধ চরিতার্থের দিকে নিয়ে যান এবং এর মাধ্যমে খালিদকে হেয় করার চেষ্টা করেন, তখন নবিজি তাঁকে সমর্থন না করে উলটো কঠিনভাবে ধমক দেন এবং নেতার অধিকার সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেন।
এখানে যে প্রশ্নটা থেকে যায় তা হচ্ছে, পরবর্তীকালে রাসুল খালিদকে নিহতের অস্ত্রশস্ত্র হিমইয়ারি মুজাহিদকে ফিরিয়ে না দেওয়ার যে আদেশ দিয়েছিলেন, তাতে কি ওই হিমইয়ারি মুজাহিদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়নি? নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায়, রাসুল একজনের অপরাধে অবশ্যই অপরজনকে শাস্তি দেননি। হয়তো তিনি ওই পাওনাদার মুজাহিদকে এ ফায়সালার ব্যাপারে সম্মত করেছিলেন। হয়তো তাঁকে এর বিনিময়ে অন্য কিছু দিয়েছিলেন; অথবা তিনি নিজেই এ পাওনা থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন। অবশ্য এই বর্ণনায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায় না।
যে জাতি নেতাদের মর্যাদা ও সম্মান উপলব্ধি করতে পারে না, তারা উন্নত সভ্যতার অধিকারী হতে পারে না। অধিকারী হতে পারে না। নববি আদর্শ উম্মাহকে এ ব্যাপারে উন্নত একটা নীতিমালা প্রদান করেছে। মুসলিমদের উচিত প্রত্যেককে তার যথাযথ অবস্থান বিবেচনা করে সম্মান দেওয়া। অনুরূপ ধর্মীয় ব্যক্তিদেরও যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান আবশ্যক। অর্থাৎ, প্রত্যেককেই তার সেই গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত, যা আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। আল্লাহ বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَفِرِيْنَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُوْنَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيْهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
হে মুমিনরা, তোমাদের কেউ দীন থেকে ফিরে গেলে নিশ্চয় আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুসলিমদের প্রতি বিনম্র আর কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রচুর দানকারী, মহাজ্ঞানী। [সুরা মায়িদা : ৫৪]
রাসূলের বাণী— 'তোমরা কি আমার পক্ষ থেকে নির্বাচিত নেতাদের আমার কারণে ক্ষমা করতে পারো না?' এটা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের মর্যাদার স্বাক্ষর বহন করে। কেননা, নবিজি তাঁকে নিজের পক্ষ থেকে নির্বাচিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মানুষের উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে এটা ছিল নববি এক উন্নত আদর্শ।
টিকাঃ
৬৩. সুনানু আবি দাউদ: ২৭১৯。
৬৪. আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৭/১৩০。
৬৫. মুয়িনুস সিরাহ: ৩৭৮।
📄 মক্কাবিজয়ের প্রাক্কালে রাসূলের পরিকল্পনা ও খালিদের ভূমিকা
১. মক্কাবিজয়
হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রে যেসব শর্ত লেখা ছিল, মুসলিমরা তাঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেগুলো পূর্ণ নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করছিলেন। কিন্তু অষ্টম হিজরিতে কুরাইশরা সেই সন্ধি ভঙ্গ করে বসে। রাসুল একজন দূত পাঠিয়ে চুক্তি নবায়নের জন্য কুরাইশদের সামনে কয়েকটা শর্ত দিয়ে শেষের দিকে লিখে দেন, 'এ শর্তগুলো তাদের মনঃপুত না হলে হুদায়বিয়ার সন্ধি ভেঙে গেছে মনে করতে হবে।' ফলে কুরাইশরা সন্ধিভঙ্গের প্রস্তাবই গ্রহণ করে। এরপর রাসুল যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন এবং অষ্টম হিজরির ১০ রমজান মঙ্গলবার আসরের সালাতের পর ১০ হাজার সাহাবির বিশাল এক বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হন।
২. খালিদসহ নেতৃস্থানীয় সাহাবির মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন
রাসুল জি-তুয়া নামক স্থানে পৌঁছে সাহাবিদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে দেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে বাহিনীর ডান পাশের এবং জুবায়ের রা.-কে বাম পাশের কমান্ডার নিযুক্ত করেন। আবু উবায়দা রা.-কে দেন পদাতিক বাহিনীর নেতৃত্ব।
এরপর রাসুল আবু হুরায়রা রা.-কে আনসার সাহাবিদের ডেকে আনতে পাঠালে তাঁরা দ্রুত ছুটে আসেন। তাঁদের বলেন, 'হে আনসার সম্প্রদায়, তোমরা কুরাইশদের উচ্ছৃঙ্খলতা দেখেছ?' তাঁরা বলেন, 'জি'। নবিজি বললেন, 'দেখতে থাকো। আগামীকাল যখন তাদের সঙ্গে মুখোমুখি হবে, তাদের কচুকাটা করবে।' এরপর তিনি ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখেন।
তারপর জুবায়ের ইবনুল আওয়ামকে মুহাজির ও তাঁদের অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে পাঠান এবং মক্কার উচ্চভূমি কুদার পথ ধরে প্রবেশের পরামর্শ দেন। তাঁদের হাজুন নামক স্থানে মুসলিমবাহিনীর পতাকা ওড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করতে বলেন।
ওদিকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে কুজাআ, সুলাইমসহ কয়েকটা গোত্রের নেতৃত্ব দিয়ে মক্কার নিম্নাঞ্চল হয়ে প্রবেশ এবং সেখানে পতাকা ওড়ানোর নির্দেশ দেন; আর সাআদ ইবনু উবাদাকে অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে আনসারদের নেতৃত্ব দিয়ে পাঠান। রাসুল তাঁদের সংযমী হওয়ার এবং আক্রান্ত না হলে আক্রমণ না করার নির্দেশ দেন। প্রতিটা বাহিনীকেই তখন নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের গন্তব্যও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল।
মুসলিম বীরসেনানীরা সমন্বিতভাবে একই সময়ে মক্কার চারপাশ দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন। কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধেই প্রতিবাদী অবস্থান নেওয়ার মতো সাহস কেউ দেখায়নি। এভাবে চারদিক থেকে একযোগে মুসলিমবাহিনীর সম্মিলিত প্রবেশ ছিল মক্কার মুশরিকদের ওপর মানসিক একটা চরম আঘাত, যা তাদের একত্রিত হওয়ার এবং প্রতিরোধ গড়ার সাহস নিঃশেষ করে দেয়।
৩. মক্কায় প্রবেশে প্রতিরোধের মুখে খালিদের বাহিনী
মুসলিমবাহিনীর শক্তিসামর্থ্য লক্ষ করে রাসুল এ বিজ্ঞজনোচিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তাতে পরিপূর্ণ সফলও হয়েছিলেন। মুশরিকরা কোনো ধরনের প্রতিরোধের সুযোগ কিংবা সাহস পায়নি। ফলে মুসলিমবাহিনী বিনা রক্তপাতে লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়। অবশ্য খালিদের বাহিনী কিছুটা প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়।
সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া, ইকরিমা ইবনু আবি জাহল ও সুহাইল ইবনু আমরের নেতৃত্বে একদল উগ্র কুরাইশ তাদের সমমনাদের নিয়ে মুসলিমবাহিনীর ওপর আক্রমণ করলে খালিদ তাদের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেন। অল্পসময়ের মধ্যে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়; আর চারদিক থেকে মুসলিমরা মক্কানগরী দখলে নিতে সক্ষম হন।
৪. হিমাস ইবনু খালিদের ঘটনা
বনু বকরের হিমাস ইবনু খালিদের ঘটনা বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে বর্ণিত আছে। মুসলিমবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সে যখন তার অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত করছিল, তখন স্ত্রী জিজ্ঞেস করেছিল, 'কেন এসব অস্ত্র প্রস্তুত করছ?' সে বলেছিল, 'আমি মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের প্রতিরোধ করতে যাচ্ছি।' স্ত্রী বলেছিল, 'আমার মনে হয় মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীরা এখন কাউকে ছাড় দেবেন না।' স্ত্রীকে প্রবোধ দিতে গিয়ে হিমাস বলে, 'সম্ভব হলে আমি কোনো মুসলিম যুদ্ধবন্দিকে দাস হিসেবে তোমাকে দেবো!' তারপর সে আবৃত্তি করে,
যদি আজ সে মোকাবিলা করতে পারে, তবে ওজর পেশ করার মতো আমার কোনোকিছুই থাকবে না;
এই হলো যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্র ও হাতিয়ার;
ধারালো বর্শা, দ্রুত কাটতে পারা দুধারী তরবারি।
মক্কাবিজয়ের দিন তারা যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে ইকরিমার নেতৃত্বে মুসলিমবাহিনীর প্রতিরোধে বের হয়; কিন্তু কুরাইশদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে দেখে হিমাস পালিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করে। স্ত্রীকে দরজা বন্ধ করতে বললে স্ত্রী জিজ্ঞেস করে, আমার জন্য যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে সে কোথায়? হিমাস তখন স্ত্রীর কাছে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে আবৃত্তি করে,
যদি তুমি আজকের ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে;
যেদিন সাফওয়ান, ইকরিমা সবাই পালিয়ে যায়!
আবু ইয়াজিদ (সুহাইল ইবনু আমর) স্তম্ভের মতো অসহায় হয়ে যেদিন দাঁড়িয়েছিল;
আর মুসলিমদের তরবারি তাদের সম্মুখে নৃত্য করছিল,
যা শুধু আমাদের বাহু ও মাথার খুলিতে আঘাত করছিল;
আর সেদিন শুধু অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যাচ্ছিল।
আতঙ্কিত হয়ে আমাদের পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
আজ আমাদের নিন্দা করে কোনো শব্দ উচ্চারণ করো না।
৫. মক্কায় প্রবেশের প্রাক্কালে আবু সুফিয়ান ও মক্কাবাসীর অবস্থা
মুসলিমবাহিনী মক্কায় প্রবেশের আগে সাধারণ নাগরিকদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের নীতি গ্রহণ করা হয়, যেন সংঘর্ষ ও রক্তপাত ছাড়া মক্কাপ্রবেশ সম্পন্ন হয়। সেদিন স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, 'যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ; যে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখবে সে নিরাপদ; যে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ।' রাসুল ﷺ আবু সুফিয়ানকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিলেন, যেন তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে সবাইকে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশে সহযোগিতা করেন। নিজের অভ্যাসবশত নেতৃত্বের ভূমিকায় সবাইকে নিরাপদ অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেন, যেন তিনি মুসলিমদের নির্বিঘ্নে মক্কায় প্রবেশের সহযোগিতা করেন। আর নিজের এ বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে যেন ইসলামের আদর্শ তাঁর মধ্যে ভালোভাবে প্রোথিত হতে পারে।
রাসুলের দরবার থেকে এসে আবু সুফিয়ান দ্রুত মক্কায় প্রবেশ করে উঁচু আওয়াজে ঘোষণা করতে থাকেন, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়, মুহাম্মাদ তাঁর বাহিনী নিয়ে তোমাদের দিকে ধেয়ে আসছেন। তোমরা তাঁদের প্রতিরোধ করতে পারবে না। যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ থাকবে।' আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতু উতবা এ কথা শুনে তাঁর দাড়ি ধরে তিরস্কার করে লোকজনকে বলেন, 'এই মটকার মতো চর্বিওয়ালা লোকটাকে তোমরা মেরে ফেলো। গোত্রের এমন নেতার ধ্বংস হোক।' আবু সুফিয়ান তাদের লক্ষ্য করে বলছিলেন, 'তোমরা এই মহিলার প্ররোচনায় নিজেদের ধ্বংস করো না। অবশ্যই মুহাম্মাদ এমন এক বাহিনী নিয়ে আসছেন, ইতিপূর্বে যার মুখোমুখি তোমরা হওনি। যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ থাকবে।' লোকজন সমস্বরে বলে ওঠে, 'আল্লাহ তোমার ধ্বংস করুক! তোমার ঘরে প্রবেশের প্রয়োজন আমাদের নেই।' এরপর আবু সুফিয়ান বলেন, 'যে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে, সে নিরাপদ থাকবে; যে মসজিদে হারামে আশ্রয় নেবে সে-ও নিরাপদ থাকবে।' তখন লোকজন নিজ নিজ ঘর এবং মসজিদে হারামের দিকে ছুটে যেতে শুরু করে।
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রা.. থেকে বর্ণিত; মক্কাবিজয়ের বছর একবার রাসুল মুসলিম নারীদের তাঁদের ঘোড়াগুলো নিজ নিজ ওড়না দিয়ে মুছে দিতে দেখেন। এই দৃশ্য দেখে আবু বকরের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বলেন, আবু বকর, এটা যেন হাসসান ইবনু সাবিতের সেই কাব্যদৃশ্যের প্রতিফলন-
আমাদের তাজা অশ্বগুলো থাকবে উদ্ধত,
নারীরা যেগুলোর পৃষ্ঠদেশ নিজেদের ওড়না দিয়ে মুছে প্রস্তুত করেছে।
৬. বনু জাজিমা অভিমুখে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ
রাসুল হুনাইনযুদ্ধের আগে অষ্টম হিজরির শাওয়ালে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে জাজিমা গোত্রে ইসলামের দাওয়াত দিতে পাঠান। বনু সুলাইম, বনু মুদলাজ ও আনসার-মুহাজিরদের সমন্বয়ে প্রায় ৩৫০ জনের এ বাহিনী বনু জাজিমা অভিমুখে বেরিয়ে পড়ে। খালিদের নেতৃত্বাধীন এ বাহিনীকে দেখে বনু জাজিমা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে প্রতিরোধ করতে এলে খালিদ রা. তাদের বলেন, 'অস্ত্র ফেলে দাও! কেননা, সকল মানুষ ইসলামগ্রহণ করেছে।' তখন জুহদার নামের একব্যক্তি চিৎকার করে বলে, 'হে বনু জাজিমা, তোমাদের ধ্বংস হোক! নিশ্চয় তিনি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ। তিনি তোমাদের অস্ত্রমুক্ত করে প্রথমে বন্দি করবেন, তারপর হত্যা করবেন। আল্লাহর শপথ, আমি অস্ত্রসমর্পণ করব না।' তবে কিছুক্ষণ পর সে অস্ত্রসমর্পণ করলে সবাই অস্ত্রসমর্পণ করতে শুরু করে।
৭. খালিদের ইজতিহাদি ভুল এবং নবিজির দায়মুক্তির ঘোষণা
অস্ত্রসমর্পণ সমাপ্ত হলে খালিদের আদেশে তাদের জড়ো করা হয়। তিনি তাদের ইসলামের প্রতি আহ্বান জানালে তারা খোশমেজাজে 'ইসলামগ্রহণ করেছি' না বলে বলছিল, 'আমরা ধর্মত্যাগ করেছি'। এ কথা শুনে খালিদ তাদের বন্দি ও হত্যা শুরু করেন। তবে তাঁর সহযোদ্ধাদের কেউ কেউ তাতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। তিনি বন্দিদের সবার মধ্যে বণ্টন করে দেন। পরদিন প্রত্যেককে যার যার বন্দিকে হত্যার নির্দেশ জারি করেন। অনেকে তাঁর আদেশ বাস্তবায়ন করলেও আবদুল্লাহ ইবনু উমরসহ কেউ কেউ বন্দিদের হত্যা করা থেকে বিরত থাকেন। নবিজির কাছে এ মর্মে সংবাদ পৌঁছানো হলে তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হন এবং আকাশের দিকে হাত তুলে বলেন, 'আল্লাহ, খালিদের কৃতকর্ম থেকে আমি নিজেকে দায়মুক্ত ঘোষণা করছি।'
৮. খালিদ ও আবদুর রাহমান ইবনু আওফের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
এদিকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ও আবদুর রাহমান ইবনু আওফের মধ্যে এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। ইবনু আওফের ধারণা ছিল; হয়তো খালিদ জাহিলি যুগে জাজিমার হাতে তাঁর চাচা ফাকিহ ইবনু মুগিরার হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তাঁদের এ বাক্যবিনিময়ের ব্যাপারে সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় আছে, 'একবার খালিদ ও আবদুর রাহমানের মধ্যে কোনো ব্যাপারে দ্বন্দ্ব লেগে যায়। এতে খালিদ আবদুর রাহমানকে কিছু মন্দ কথা বললে রাসুল বলেন, 'তোমরা আমার কোনো সাহাবিকে মন্দ বলো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও আল্লাহর রাস্তায় দান করে, তবু তা আমার কোনো সাহাবির সামান্য দান-সাদাকার সমান হবে না।'
রাসুল আলি রা.-কে তাদের রক্তপণ ও মনস্তুষ্টির জন্য অতিরিক্ত আরও সম্পদ দিয়ে আসার আদেশ দেন। এই মানবিক ও আন্তরিক আচরণের মাধ্যমে নবিজি বনু জাজিমার ভালোবাসা অর্জন করেন। তাদের অন্তর থেকে দুঃখ দূর করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন।
রাসুল যেহেতু এই ব্যাপারে খালিদ রা.-কে কোনো তিরস্কার বা শাস্তি দেননি; তাই এ কথা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটা খালিদের ইজতিহাদি একটা ভুল ছিল।
টিকাঃ
৬৬. প্রাগুক্ত: ৩৮৯।
৬৭. সহিহ মুসলিম: ১৭৮০।
৬৮. মক্কার গোরস্থানের পার্শ্ববর্তী প্রসিদ্ধ একটি জায়গা
৬৯. মুয়িনুস সিরাহ: ৩৯০।
৭০. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নাবাবি ফিল-মাদিনা: ৩৯৭।
৭১. কিয়াদাতুর রাসুল আস-সিয়াসিয়া ওয়াল আসকারিয়া: ১২২-১২৩।
৭২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৯৫।
৭৩. দিরাসাহ ফিস-সিরাহ: ২৪৫।
৭৪. আবু সুফিয়ানকে তাঁর স্থূলতার কারণে মটকার সঙ্গে তুলনা করে তিনি এ কথা বলেছিলেন।
৭৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৯০।
৭৬. মাগাজি, ওয়াকিদি: ২/৮৩১।
৭৭. আস-সারায়া ওয়াল বুয়ুসিন নাবাবিয়া: ২৪৮।
৭৮. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া, আবু শাহবা: ২/৪৬৪।
৭৯. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া ফি জুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়া: ৫৭৯।
৮০. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া, আবু শাহবা: ২/৫৭৯।
৮১. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া ফি জুয়িল মাসাদিরিল আসলিয়া : ৫৭৯。