📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 মুতার যুদ্ধে খালিদের বীরত্ব

📄 মুতার যুদ্ধে খালিদের বীরত্ব


মুসলিমবাহিনী শত্রুর সংখ্যাধিক্যের ব্যাপারে আলোচনার জন্য মাআন প্রান্তরে অবস্থান করছিল। সাজসরঞ্জাম বিবেচনায় তাঁরা যুদ্ধে এগোনোর যথেষ্ট সাহস পাচ্ছিলেন না; কিন্তু তা সত্ত্বেও ইমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের মানসিকতা ছিল; যেহেতু শাহাদাতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়েছি, তাই লক্ষ্য সামনে দেখেও কেন যুদ্ধের ময়দান থেকে পিছপা হব!

জায়েদ ইবনু আরকাম রা. বলেন, আমি ইয়াতিম অবস্থায় আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হচ্ছিলাম। যুদ্ধযাত্রার সময় তিনি আমাকে তাঁর বাহনে বসিয়ে নিয়েছিলেন। রাতে যখন বাহন চলছিল, তখন তিনি গুনগুনিয়ে আবৃত্তি করছিলেন,

এরপর মুসলিমরা এল এবং আমাকে সিরিয়ায় এমন ভূমিতে রেখে গেল, যেখানে স্থায়ী হতে আমি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলাম।
আমি এই কবিতা শুনে কান্না শুরু করি। তিনি চাবুক দিয়ে মৃদু আঘাত করে বলেন, 'এই ভীতু, যদি আল্লাহ আমাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করেন, তাতে তোমার কী সমস্যা? স্বাধীনভাবে তুমি বাহনে চড়ে নিজের বাসস্থানে ফিরে যাবে!'

মুতাযুদ্ধের দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে এ বিষয়টা স্পষ্ট হয় যে, মুসলিমবাহিনী যদি প্রযুক্তিশূন্যও হয়; আর শত্রুর কাছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকে, তবে এটা কখনো মুসলিমদের পরাজয়ের কারণ হতে পারে না; বরং ইমান ও আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে পারাই বিজয়ী হওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম। ইবনু কাসির রাহ. এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করতে হয়-দুটি ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে। একদল আল্লাহর রাহে নিজেদের উৎসর্গ করছে, যাঁদের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার। আর অপরদিকে প্রতিপক্ষের সদস্যসংখ্যা ২ লাখ। ১ লাখ রোমান ও ১ লাখ খ্রিষ্টান আরব। সম্মুখযুদ্ধে নামার পরও মুসলিমদের মাত্র ১২ জন শহিদ হন; আর অসংখ্য কাফির মারা পড়ে।

এই যুদ্ধের এক সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বর্ণনা করেন, 'যুদ্ধে আমার হাতে নয়টা তলোয়ার ভাঙে! শেষপর্যন্ত শুধু ইয়ামেনি ছোট একটা খঞ্জরই অক্ষত ছিল!' চিন্তা করুন, তিনি তাঁর এসব তরবারির মাধ্যমে সেদিন কতজন খ্রিষ্টান সেনাকে মৃত্যুর উপত্যকায় পৌঁছে দিয়েছিলেন! অন্যদের আলোচনা নাহয় বাদ থাকুক, এই সংখ্যাটাই-বা কম কীসে? কুরআনের অন্য ধারকবাহকরাও তাঁদের সাধ্য-সামর্থ্য অনুযায়ী বহু খ্রিষ্টান সেনাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন, তা তো স্বাভাবিকই।

টিকাঃ
৫৪. সিরাতু ইবনি হিশাম: ৪/২৪-২৫。
৫৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫৯।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি লাভ

📄 ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি লাভ


মুতার যুদ্ধের ব্যাপারে রাসুলের পক্ষ থেকে একটি মুজিজা ঘটনা প্রকাশ পেয়েছিল। যুদ্ধের সংবাদ মদিনায় পৌঁছার আগেই খালিদ মদিনাবাসীর কাছে জায়েদ, জাফর ইবনু আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে দেন। ফলে সেনাবাহিনীর অবস্থা নিয়ে রাসুল বিচলিত হয়ে পড়েন। তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। তখন তিনি মদিনাবাসীর সামনে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পতাকাগ্রহণ ও সাহাবিদের বিজয়ের সংবাদ জানিয়ে তাঁকে 'সাইফুল্লাহ' উপাধিতে ভূষিত করেন। নবিজি সাহাবিদের এ সংবাদ জানানোর কিছুক্ষণ পরই সংবাদবাহক যুদ্ধের খবর নিয়ে মদিনায় আসে। রাসুলের দেওয়া সংবাদই যেন সে মানুষের সামনে পুনঃপেশ করে। সুবহানাল্লাহ!

যুদ্ধফেরত বাহিনী মদিনার কাছাকাছি পৌঁছলে রাসুল সাহাবিদের নিয়ে তাঁদের স্বাগত জানাতে বেরিয়ে পড়েন। শিশু-কিশোররা দৌড়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে যায়। নবিজি সবাইকে নিয়ে বাহনে চড়ে এগিয়ে যান। তিনি বলেন, 'তোমরা শিশুদের বাহনে বসিয়ে নাও; আর জাফরের সন্তানকে আমার হাতে তুলে দাও।' আবদুল্লাহ ইবনু জাফরকে তাঁর কাছে আনা হলে তাঁকে নিজের বাহনে বসিয়ে নেন। লোকজন মুসলিমবাহিনীর দিকে মাটি নিক্ষেপ করে বলছিল, 'হে পলাতক বাহিনী, তোমরা আল্লাহর রাস্তা থেকে পালিয়ে এসেছ। রাসুল তাঁদের থামিয়ে বলেন, 'তাঁরা পলাতক নয়; বরং তাঁরা পুনরায় আক্রমণকারী প্রমাণিত হবে ইনশাআল্লাহ। '

লক্ষ করুন, কী মানসিকতা ছিল তখনকার মুসলিমদের। আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত ছাড়া ফিরে আসাকে মদিনার ছোট্ট শিশুরা পর্যন্ত পলায়ন বিবেচনা করছিল। তাঁদের মুখে মাটি ছিটয়ে প্রতিবাদ করছিল। আজ রাজপথের আমাদের উদ্ভ্রান্ত যুবকরা কোথায়? প্রথম যুগের সেই সোনালি উদাহরণ সামনে থাকার পরও তাদের অবস্থান কেমন? নববি আদর্শে অনুপ্রাণিত ইসলামি পদ্ধতিতে দীক্ষা পাওয়া ছাড়া শৌর্যবীর্যের উন্নত শিখরে ওঠা উম্মাহর পক্ষে কখনো সম্ভব হবে না।

টিকাঃ
৫৬. নাজরাতুন নায়িম: ১/৩৬০。
৫৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫৫。
৫৮. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া, আবুল হাসান আলি নদবি: ৩২৮。
৫৯. দুরস ও ইবার মিনাল জিহাদিন নাবাবি: ৩৫৮।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 রণাঙ্গনে যেভাবে সেনাপতির দায়িত্ব পান খালিদ

📄 রণাঙ্গনে যেভাবে সেনাপতির দায়িত্ব পান খালিদ


রাসুলের পক্ষ থেকে নির্ধারিত শেষ সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার শাহাদাতের পর সাবিত ইবনু আকরাম এগিয়ে এসে মুসলিমবাহিনীর পতাকা ধারণ করেন। একজন যোদ্ধা হিসেবে তাঁর যা করণীয় ছিল, তিনি তা করেছিলেন। তখন পতাকা ভূলুণ্ঠিত হওয়াকে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পরাজয় ধরে নেওয়া হতো। তাই তিনি পতাকা সমুন্নত রেখে উচ্চৈঃস্বরে মুসলিমদের ডেকে বলছিলেন, তাঁরা যেন তাঁদের নেতা নির্বাচিত করে নেন। যুদ্ধ চলাকালে তাঁকেই নেতৃত্বের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, 'আমি এ বোঝা বহনে অসমর্থ।' এরপর লোকেরা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে নির্বাচিত করে।

এক বর্ণনায় দেখা যায়, সাবিত রা. পতাকা উঠিয়ে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে চলে আসেন। খালিদ তাঁকে বলেন, 'আমি আপনার কাছ থেকে এ পতাকা নেব না। আপনিই তা বহনের অধিক হকদার।' উত্তরে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি তা আপনাকে দিতেই হাতে নিয়েছিলাম।'

ইমতাউল আসমা গ্রন্থে আছে, সাবিত ইবনু আকরাম রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে সম্বোধন করে বলেন, 'আবু সুলায়মান, আপনি পতাকা হাতে নিন।' খালিদ উত্তরে বলেন, 'আপনি আমার চেয়ে এই পতাকা বহনের বেশি উপযুক্ত। কেননা, একে তো আপনি বয়সে বড় ও অভিজ্ঞ; তার ওপর আপনি বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য অর্জনকারী।' উত্তরে সাবিত বলেন, 'আমি তো এই পতাকা শুধু আপনাকেই দিতেই হাতে উঠিয়েছি; সুতরাং আপনিই নিন।' এরপর খালিদ পতাকা নেন।

টিকাঃ
৬০. ইমতাউল আসমা: ১/৩৪৮-৩৪৯।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 নেতৃত্বের অধিকার

📄 নেতৃত্বের অধিকার


উভয় বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সাবিত রা. প্রথমে মুসলিমদের একত্রিত করেছিলেন এবং পতাকা খালিদের মতো যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির হাতে অর্পণ করেছিলেন। যদিও উপস্থিত সবাই বলেন, 'আপনি আমাদের নেতৃত্ব নিন।' কিন্তু তিনি নিজেকে এ পদের জন্য সমীচীন মনে করেননি। তিনি ভাবছিলেন, যেহেতু এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি উপস্থিত আছেন, তখন অযোগ্য ব্যক্তির কাছে নেতৃত্ব রাখা বা দেওয়া উচিত নয়। কোনো কাজ যখন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তখন সেখানে কোনো প্রকার মর্যাদা বা প্রতিপত্তির লোভ থাকে না।

সাবিত রা. মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বদানে অক্ষম ছিলেন না। তিনি বদরযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু তাঁর চেয়ে যোগ্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিনি তা নেওয়া সমীচীন মনে করেননি। যদিও তখন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণের বয়স ছিল মাত্র তিন মাস। এ ক্ষেত্রে মৌলিক লক্ষ্য থাকে আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও সমীচীন পন্থায় আদায়ের সক্ষমতা।

বর্তমানে মুসলিম নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে নেতৃত্ব চলে যাওয়ার আশঙ্কা, নিজের ওপর অত্যধিক আত্মবিশ্বাস এবং পার্থিব কামনা-বাসনার বাস্তবায়ন। সাবিত রা.-এর দেখানো উত্তম আদর্শ বর্তমানের নেতাদের সামনে উপদেশের ডালি নিয়ে উপস্থিত হয়; কিন্তু তা থেকে উপদেশ নেন কেবল তাঁরা, যাঁদের রয়েছে অনুধাবনের মতো আত্মা, শোনার মতো কান।

টিকাঃ
৬১. আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৭/১২৪。
৬২. মুয়িনুস সিরাহ: ৩৭৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00