📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বগ্রহণ
যুদ্ধের একপর্যায়ে সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা শাহাদাতবরণ করেন। স্বভাবতই সেনাদের মনোবল ভেঙে পড়ার কথা। তখন সাবিত ইবনু আকরাম ইবনু সালাবা রা. মুসলিমবাহিনীর পতাকা অবনমিত হতে দেখে এগিয়ে গিয়ে তা ধারণ করেন এবং চিৎকার দিয়ে ঘোষণা করেন, 'হে মুসলিমরা, তোমরা কাউকে নেতা নির্বাচিত করে নাও।' সবাই চিৎকার করে বলতে থাকেন, 'আপনি আমাদের আমির।' উত্তরে তিনি বলেন, 'আমি এর যোগ্য নই।' তারপর সর্বসম্মতিক্রমে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে নেতা নির্বাচিত করা হয়।
ভয়াবহ এ পরিস্থিতিতে মুসলিমবাহিনীকে বিশাল বিপর্যয় থেকে বের করে আনাই ছিল খালিদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি তখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও তার সম্ভাব্য ফল নিয়ে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান-এই মুহূর্তে যুদ্ধ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়াই হবে সর্বোত্তম কাজ। কারণ, শত্রুবাহিনী তাঁদের চেয়ে ৬৬ গুণ বেশি। তারপর নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেসব পদক্ষেপ নেন :
* মুসলিম ও রোমান সেনাদের মধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেন নিরাপদে যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করা সম্ভব হয়।
* পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শত্রুপক্ষকে এই বিভ্রান্তিতে ফেলতে হবে যে, আমাদের কাছে এখনো রিজার্ভ বাহিনী প্রস্তুত আছে, যাতে বিভ্রান্ত শত্রুপক্ষের আক্রমণ কিছুটা হালকা হয়ে আসে এবং সুযোগ বুঝে মুসলিমরা যুদ্ধের ময়দান থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে পারেন।
* পরিকল্পনা বাস্তবায়নে খালিদ রা. বিকাল পর্যন্ত মুসলিমবাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ় রাখেন। এরপর রাতের আঁধারে বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলেন। ডান দিকের সেনাদের বাম দিকে আর বাম দিকের সেনাদের ডান দিকে সন্নিবেশিত করেন। এভাবে সামনের সেনাদের পেছন দিকে আর পেছনের সেনাদের সামনে নিয়ে আসেন। সেনাবাহিনীর অবস্থান পরিবর্তনকালে জোরে তাকবিরধ্বনির মাধ্যমে ময়দানজুড়ে এক উত্তাল পরিস্থিতির আবহ তৈরি করেন। ফজরের সালাতের পরপরই শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অব্যাহত আক্রমণের মাধ্যমে তাঁরা শত্রুবাহিনীকে এ কথা জানান দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন যে, আমাদের সাহায্যে ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ নতুন তাজাদম বাহিনী এসে পৌঁছেছে!
খালিদের কৌশল সফল হয়। সকাল হতেই নতুন পতাকাবাহী ও চেহারার যোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধে নামতে দেখে শত্রুবাহিনী এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয় যে, মুসলিমদের কাছে নতুন সাহায্যকারী বাহিনী এসে পৌঁছেছে; আর এ জন্যই তাঁরা আজ এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মুসলিমদের দুঃসাহসী আক্রমণ শত্রুবাহিনীকে হতোদ্যম করে দেয়। তারা এটা ধরে নেয় যে, মুসলিমদের নিশ্চিত পরাজিত করার যে পরিকল্পনা তারা করে এসেছিল, তা ভেস্তে যেতে চলেছে। খালিদের অভূতপূর্ব সেনাবিন্যাস তাদের মনোবল ভেঙে দেয়। তারা আগের সাহস ও উদ্যম হারিয়ে ফেলে। ফলে মুসলিমবাহিনীর ওপর তাদের আক্রমণ ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।
এদিকে খালিদ কৌশলে মুসলিমবাহিনীকে পেছনে সরিয়ে আনা শুরু করেন। মুতার যুদ্ধ থেকে তাঁর এমন সফল প্রত্যাবর্তন বিশ্বজনীন যুদ্ধ-ইতিহাসে অভিজ্ঞ সমরনীতির এক অনন্য নিদর্শন। পরিস্থিতির আলোকে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপ যৌক্তিক ও সফল বিবেচিত হয়। তিনি প্রথমে মধ্যভাগের সেনাদের সহযোগিতায় বাম দিকের সেনাদের ডান দিকে পেছনে সরিয়ে আনেন। এরপর উভয় দিকের সেনাদের নিরাপত্তা-বেষ্টনীতে মধ্যভাগের সেনাদেরও সরিয়ে নিয়ে আসেন। এভাবেই পুরো বাহিনী শত্রুদের আক্রমণের আওতা থেকে বেরিয়ে আসে।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভয়াবহ যুদ্ধে মুসলিমবাহিনীর মাত্র ১২ জন শহিদ হন। খালিদ নিজে বলেন, মুতার যুদ্ধে আমার হাতে নয়টা তরবারি ভাঙে। শেষপর্যন্ত আমার কাছে শুধু ইয়ামেনি একটা খঞ্জর অক্ষত ছিল!
খালিদের কৌশলী পরিকল্পনায় আল্লাহ নিশ্চিত পরাজয় থেকে মুসলিমদের বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। পরিস্থিতির আলোকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজেদের এভাবে নিরাপদে বের করে আনতে পারাই মুসলিমদের জন্য বড় বিজয় বিবেচিত হয়। ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কৌশলী পদক্ষেপে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজেদের গুটিয়ে আনতে পারা নিঃসন্দেহে মুসলিমবাহিনীর জন্য ছিল বড় ধরনের একটা সফলতা।
টিকাঃ
৪৯. সিরাতু ইবনি হিশাম: ৪/২৮。
৫০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৭৬৪。
৫১. মাআরিকু খালিদ ইবনিল ওয়ালিদ: ১৭৩。
৫২. সহিহ বুখারি: ৪২৬৬。
৫৩. মাআরিকু খালিদ ইবনিল ওয়ালিদ: ১৭৫।
📄 মুতার যুদ্ধে খালিদের বীরত্ব
মুসলিমবাহিনী শত্রুর সংখ্যাধিক্যের ব্যাপারে আলোচনার জন্য মাআন প্রান্তরে অবস্থান করছিল। সাজসরঞ্জাম বিবেচনায় তাঁরা যুদ্ধে এগোনোর যথেষ্ট সাহস পাচ্ছিলেন না; কিন্তু তা সত্ত্বেও ইমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের মানসিকতা ছিল; যেহেতু শাহাদাতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়েছি, তাই লক্ষ্য সামনে দেখেও কেন যুদ্ধের ময়দান থেকে পিছপা হব!
জায়েদ ইবনু আরকাম রা. বলেন, আমি ইয়াতিম অবস্থায় আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হচ্ছিলাম। যুদ্ধযাত্রার সময় তিনি আমাকে তাঁর বাহনে বসিয়ে নিয়েছিলেন। রাতে যখন বাহন চলছিল, তখন তিনি গুনগুনিয়ে আবৃত্তি করছিলেন,
এরপর মুসলিমরা এল এবং আমাকে সিরিয়ায় এমন ভূমিতে রেখে গেল, যেখানে স্থায়ী হতে আমি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলাম।
আমি এই কবিতা শুনে কান্না শুরু করি। তিনি চাবুক দিয়ে মৃদু আঘাত করে বলেন, 'এই ভীতু, যদি আল্লাহ আমাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করেন, তাতে তোমার কী সমস্যা? স্বাধীনভাবে তুমি বাহনে চড়ে নিজের বাসস্থানে ফিরে যাবে!'
মুতাযুদ্ধের দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে এ বিষয়টা স্পষ্ট হয় যে, মুসলিমবাহিনী যদি প্রযুক্তিশূন্যও হয়; আর শত্রুর কাছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকে, তবে এটা কখনো মুসলিমদের পরাজয়ের কারণ হতে পারে না; বরং ইমান ও আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে পারাই বিজয়ী হওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম। ইবনু কাসির রাহ. এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করতে হয়-দুটি ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে। একদল আল্লাহর রাহে নিজেদের উৎসর্গ করছে, যাঁদের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার। আর অপরদিকে প্রতিপক্ষের সদস্যসংখ্যা ২ লাখ। ১ লাখ রোমান ও ১ লাখ খ্রিষ্টান আরব। সম্মুখযুদ্ধে নামার পরও মুসলিমদের মাত্র ১২ জন শহিদ হন; আর অসংখ্য কাফির মারা পড়ে।
এই যুদ্ধের এক সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বর্ণনা করেন, 'যুদ্ধে আমার হাতে নয়টা তলোয়ার ভাঙে! শেষপর্যন্ত শুধু ইয়ামেনি ছোট একটা খঞ্জরই অক্ষত ছিল!' চিন্তা করুন, তিনি তাঁর এসব তরবারির মাধ্যমে সেদিন কতজন খ্রিষ্টান সেনাকে মৃত্যুর উপত্যকায় পৌঁছে দিয়েছিলেন! অন্যদের আলোচনা নাহয় বাদ থাকুক, এই সংখ্যাটাই-বা কম কীসে? কুরআনের অন্য ধারকবাহকরাও তাঁদের সাধ্য-সামর্থ্য অনুযায়ী বহু খ্রিষ্টান সেনাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন, তা তো স্বাভাবিকই।
টিকাঃ
৫৪. সিরাতু ইবনি হিশাম: ৪/২৪-২৫。
৫৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫৯।
📄 ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি লাভ
মুতার যুদ্ধের ব্যাপারে রাসুলের পক্ষ থেকে একটি মুজিজা ঘটনা প্রকাশ পেয়েছিল। যুদ্ধের সংবাদ মদিনায় পৌঁছার আগেই খালিদ মদিনাবাসীর কাছে জায়েদ, জাফর ইবনু আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে দেন। ফলে সেনাবাহিনীর অবস্থা নিয়ে রাসুল বিচলিত হয়ে পড়েন। তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। তখন তিনি মদিনাবাসীর সামনে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পতাকাগ্রহণ ও সাহাবিদের বিজয়ের সংবাদ জানিয়ে তাঁকে 'সাইফুল্লাহ' উপাধিতে ভূষিত করেন। নবিজি সাহাবিদের এ সংবাদ জানানোর কিছুক্ষণ পরই সংবাদবাহক যুদ্ধের খবর নিয়ে মদিনায় আসে। রাসুলের দেওয়া সংবাদই যেন সে মানুষের সামনে পুনঃপেশ করে। সুবহানাল্লাহ!
যুদ্ধফেরত বাহিনী মদিনার কাছাকাছি পৌঁছলে রাসুল সাহাবিদের নিয়ে তাঁদের স্বাগত জানাতে বেরিয়ে পড়েন। শিশু-কিশোররা দৌড়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে যায়। নবিজি সবাইকে নিয়ে বাহনে চড়ে এগিয়ে যান। তিনি বলেন, 'তোমরা শিশুদের বাহনে বসিয়ে নাও; আর জাফরের সন্তানকে আমার হাতে তুলে দাও।' আবদুল্লাহ ইবনু জাফরকে তাঁর কাছে আনা হলে তাঁকে নিজের বাহনে বসিয়ে নেন। লোকজন মুসলিমবাহিনীর দিকে মাটি নিক্ষেপ করে বলছিল, 'হে পলাতক বাহিনী, তোমরা আল্লাহর রাস্তা থেকে পালিয়ে এসেছ। রাসুল তাঁদের থামিয়ে বলেন, 'তাঁরা পলাতক নয়; বরং তাঁরা পুনরায় আক্রমণকারী প্রমাণিত হবে ইনশাআল্লাহ। '
লক্ষ করুন, কী মানসিকতা ছিল তখনকার মুসলিমদের। আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত ছাড়া ফিরে আসাকে মদিনার ছোট্ট শিশুরা পর্যন্ত পলায়ন বিবেচনা করছিল। তাঁদের মুখে মাটি ছিটয়ে প্রতিবাদ করছিল। আজ রাজপথের আমাদের উদ্ভ্রান্ত যুবকরা কোথায়? প্রথম যুগের সেই সোনালি উদাহরণ সামনে থাকার পরও তাদের অবস্থান কেমন? নববি আদর্শে অনুপ্রাণিত ইসলামি পদ্ধতিতে দীক্ষা পাওয়া ছাড়া শৌর্যবীর্যের উন্নত শিখরে ওঠা উম্মাহর পক্ষে কখনো সম্ভব হবে না।
টিকাঃ
৫৬. নাজরাতুন নায়িম: ১/৩৬০。
৫৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৫৫。
৫৮. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া, আবুল হাসান আলি নদবি: ৩২৮。
৫৯. দুরস ও ইবার মিনাল জিহাদিন নাবাবি: ৩৫৮।
📄 রণাঙ্গনে যেভাবে সেনাপতির দায়িত্ব পান খালিদ
রাসুলের পক্ষ থেকে নির্ধারিত শেষ সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার শাহাদাতের পর সাবিত ইবনু আকরাম এগিয়ে এসে মুসলিমবাহিনীর পতাকা ধারণ করেন। একজন যোদ্ধা হিসেবে তাঁর যা করণীয় ছিল, তিনি তা করেছিলেন। তখন পতাকা ভূলুণ্ঠিত হওয়াকে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পরাজয় ধরে নেওয়া হতো। তাই তিনি পতাকা সমুন্নত রেখে উচ্চৈঃস্বরে মুসলিমদের ডেকে বলছিলেন, তাঁরা যেন তাঁদের নেতা নির্বাচিত করে নেন। যুদ্ধ চলাকালে তাঁকেই নেতৃত্বের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, 'আমি এ বোঝা বহনে অসমর্থ।' এরপর লোকেরা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে নির্বাচিত করে।
এক বর্ণনায় দেখা যায়, সাবিত রা. পতাকা উঠিয়ে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে চলে আসেন। খালিদ তাঁকে বলেন, 'আমি আপনার কাছ থেকে এ পতাকা নেব না। আপনিই তা বহনের অধিক হকদার।' উত্তরে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি তা আপনাকে দিতেই হাতে নিয়েছিলাম।'
ইমতাউল আসমা গ্রন্থে আছে, সাবিত ইবনু আকরাম রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে সম্বোধন করে বলেন, 'আবু সুলায়মান, আপনি পতাকা হাতে নিন।' খালিদ উত্তরে বলেন, 'আপনি আমার চেয়ে এই পতাকা বহনের বেশি উপযুক্ত। কেননা, একে তো আপনি বয়সে বড় ও অভিজ্ঞ; তার ওপর আপনি বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য অর্জনকারী।' উত্তরে সাবিত বলেন, 'আমি তো এই পতাকা শুধু আপনাকেই দিতেই হাতে উঠিয়েছি; সুতরাং আপনিই নিন।' এরপর খালিদ পতাকা নেন।
টিকাঃ
৬০. ইমতাউল আসমা: ১/৩৪৮-৩৪৯।