📄 মহিলার সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে বেশি
আজকের দিনে পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের অতিরিক্ত মহিলা জনসংখ্যা। প্রাচ্যে এমনটি হয় নি। তার কারণ হলো মেয়ে শিশুর ভ্রুণ চিহ্নিত করে হত্যা করা। এ খারাপ চর্চাটি বন্ধ হলে প্রাচ্যেও এই সমস্যা দেখা দেবে। পবিত্র কুরআন এ সমস্যারও সমাধান দিয়েছে। সূরা নিসার ৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلُثَ وَرُبَعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةٌ .
অর্থ: তোমাদের পছন্দ মতো মেয়েকে বিয়ে কর দুজন, তিনজন বা চারজনকে। তবে যদি ন্যায়বিচার করতে না পার তবে মাত্র একজনকে বিয়ে কর।
সূরার ১২৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَنْ تَসْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلَا تَسِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ .
অর্থ: এটা অসম্ভব যে, তোমরা সব স্ত্রীকেই সমানভাবে দেখবে। তাদের কারো উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না।
এখানে আল-কুরআন বুঝাতে চাচ্ছে যে, এটা অসম্ভব সব স্ত্রীকে সমানভাবে ভালোবাসা। এমনকি একজন মা তার সন্তানদের ভালোবাসে। কিন্তু কোনো মা'ই বলবে না যে, আমি আমার সন্তানদের একই রকম ভালোবাসি। কম-বেশি হবেই। তবে সব মিলিয়ে কোনো অবিচার হবে না। তাই স্ত্রীদের অন্য সব ব্যাপারে যেমন টাকা-পয়সা, সময় ইত্যাদির ব্যাপারে ন্যায় বিচার করতে হবে। এক স্ত্রীকে বাড়ি কিনে দিলে অন্য স্ত্রীও যেন বাড়ি পায়। অনেকে মনে করে একাধিক বিয়ে করা ইসলামে বাধ্যতামূলক। এটি সম্পূর্ণ ভুল। ইসলামে পাঁচ প্রকার কাজের কথা বলা হয়েছে। ১. 'ফরজ' যার অর্থ হলো বাধ্যতামূলক, ২. 'মুস্তাহাব' বা উৎসাহ দেয়া হয়েছে, ৩. 'মুবাহ' অর্থাৎ ঐচ্ছিক, ৪. 'মাকরূহ' বা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে আর ৫. 'হারাম' অর্থাৎ নিষিদ্ধ।
একাধিক বিয়ে করার ব্যাপারটা হলো ঐচ্ছিক। তাহলে আসুন আমরা দেখি যে, কেন আল কুরআনে একাধিক বিয়ের অনুমতি দেয়া হলো।
পুরুষ ও নারীকে সমান অনুপাতে বানানো হয়েছে। তবে এই আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে যদি কোনো চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করেন, তিনি বলবেন যে, মেয়ে শিশুরা ছেলে শিশুদের চেয়ে ভালোভাবে রোগ-জীবাণু প্রতিরোধ করতে পারে। তাই মেয়ে শিশুর চেয়ে ছেলে শিশু বেশি মারা যায়। দুর্ঘটনা, ধূমপান, যুদ্ধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় পুরুষরা বেশি মারা যায়। আর তাই এখন পৃথিবীতে পুরুষদের চেয়ে নারীদের সংখ্যা বেশি। কেবল কয়েকটি দেশে, যেমন ভারতে পুরুষদের সংখ্যা নারীদের চেয়ে বেশি। এর কারণ অভিশপ্ত যৌতুক প্রথার কারণে জন্মের পূর্বে আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে মেয়ে শিশুর ভ্রূণ চিহ্নিত করে প্রত্যেক দিন তিন হাজারেরও বেশি মহিলার গর্ভপাত ঘটানো হয় কেবল ভারতেই। যখন তারা বুঝতে পারে যে সন্তানটা মেয়ে। অর্থাৎ বছরে দশ লক্ষের বেশি মহিলার গর্ভপাত ঘটানো হয় শুধু ভারতে। এ মেয়ে হত্যা বন্ধ হলে ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের ছাড়িয়ে যাবে।
এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু আমেরিকাতেই নারীরা সংখ্যায় ছেলেদের চেয়ে ৭৮ লক্ষ জন বেশি। শুধু নিউ ইয়র্কেই ১০ লক্ষ জন নারী বেশি পুরুষদের চেয়ে। নিউ ইয়র্কের অধিবাসীদের এক-তৃতীয়াংশ হল 'গে', 'গে' মানে হলো সমকামী। তার মানে পুরুষরা সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় পুরুষকে। আমেরিকায় আড়াই কোটির বেশি পুরুষ হলো 'গে'। এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক বিরাট সমস্যা। ইংল্যান্ডে মেয়েদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে ৪০ লক্ষ জন বেশি। জার্মানিতে ৬০ লক্ষ জন এবং রাশিয়াতে ৯০ লক্ষ জন নারী জনসংখ্যা বেশি পুরুষদের চেয়ে। আল্লাহ তাআলাই জানেন পুরো পৃথিবীতে নারীদের সংখ্যা ছেলেদের চেয়ে কতজন বেশি।
ধরুন, আমি পশ্চিমাদের দর্শন মেনে নিলাম যে, একজন লোক কেবল একটাই বিয়ে করতে পারবে। ধরেন, আমেরিকায় প্রত্যেক পুরুষ একটি করে মেয়েকে বিয়ে করল। তারপরও তিন কোটি নারী থাকবে যারা জীবন সঙ্গী পাবে না। বাকিরা তাহলে কী করবে? তাদের জন্য পথ খোলা থাকে একটা, তারা হয় এমন পুরুষদের বিয়ে করবে, যাদের স্ত্রী আছে। অথবা তারা হতে পারে জনগণের সম্পত্তি (গনিকা বা বেশ্যা)।
আপনারা হয়তো বলবেন জনগণের সম্পত্তি? ডা. জাকির এতো খারাপ শব্দ ব্যবহার করেছে? আমি বলব সবচেয়ে ভালো যে শব্দটি ব্যবহার করা যায়, তাহলো জনগণের সম্পত্তি। আমি একজন ইসলাম প্রচারকারী হওয়ার কারণে অন্য শব্দ ব্যবহার করতে পারছি না। জনগণের সম্পত্তি হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। আর যে কোনো ভদ্র মহিলা বলবেন, তিনি প্রথমটিই বেছে নেবেন। সবার সম্পত্তি হওয়ার চেয়ে এমন একজনকে বিয়ে করা ভালো যার স্ত্রী আছে। আপনারা জানেন, পশ্চিমা বিশ্বে মানুষ রক্ষিতা রাখে। এটি খুবই সাধারণ। আমেরিকায় গড়ে একজন মানুষের আটজন যৌনসঙ্গী থাকে। কাউকে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত সে তার জীবনসঙ্গী। কারো হয়তো কম। দুজন বা একজন। তবে গড়ে আটজন জীবনসঙ্গী থাকে একজনকে বিয়ে করে সংসার পাতার আগ পর্যন্ত। রক্ষিতা রাখলে কোনো দায়িত্ব থাকে না। আপনি একজন, দশজন, বিশজন যা খুশি রাখেন। সমস্যা নেই। কিন্তু যদি মহিলা রক্ষিতা হয়, তার কোনো সম্মান থাকে না। সে ছোট হয়ে যায়। যদি রক্ষিতাকে সেই মহিলার সাথে তুলনা করেন যে, মহিলা কোনো লোকের দ্বিতীয় স্ত্রী, তবে দেখবেন সে সম্মান পায়, সবাই শ্রদ্ধা করে। তার আইনসঙ্গত অধিকারও থাকে। আমরা ইসলামে মহিলাদের উপযুক্ত সম্মান দিই। রক্ষিতার কোন সামাজিক সম্মান নেই।
📄 সমস্যার বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী সমাধান
ইসলামে মানব জাতির সব সমস্যার সমাধান আছে। আপনি যদি ভালোভাবে দেখেন, বেশির ভাগ ধর্মই ভালো কথা বলে। ডাকাতি করো না, ঠকিয়েও না ইত্যাদি। ইসলামও একই কথা বলে। তবে ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের মধ্যে পার্থক্য হল- ইসলাম ঐ কথাগুলো বলার পাশাপাশি আপনাকে পথ দেখাবে কীভাবে সেগুলো বর্জন করা যায়।
উদাহরণস্বরূপ, সব প্রধান ধর্ম বলে যে, কোনো মানুষের ডাকাতি করা উচিত না। আমেরিকার সংবিধানে আছে, কোনো নাগরিকের ডাকাতি করা উচিত নয়। তার প্রতিকারের জন্য বিধান থাকলেও তা খুব সামান্য।
ইসলামও বলে, আপনি ডাকাতি করবেন না। তবে ইসলামের কাছে কিছু বাস্তব সমাধান আছে। ইসলাম দেখায় কীভাবে সেই অবস্থা অর্জন করবেন, যেখানে মানুষ ডাকাতি করবে না। ইসলাম ধর্মে যাকাতের ব্যবস্থা আছে। সেই ধনী লোকদের জন্য যাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আছে। ৮৫ গ্রাম স্বর্ণের আড়াই শতাংশ দান করবে প্রতি চান্দ্র বছরে। যদি প্রত্যেকে ধনী লোক যাকাত দেয়, পৃথিবীতে দারিদ্র বলে কিছুই থাকবে না। পবিত্র কুরআনে সূরা মায়েদার ৩৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
অর্থ: যে কোনো পুরুষ চোর এবং নারী চোর, তাদের হাত কেটে দাও। এটা তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আদর্শ দণ্ড। পশ্চিমারা বলবে, হাত কেটে ফেলা এটা বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা। তারা মনে করে, সৌদি আরবে, যেখানে এই আইন প্রচলিত আছে, সেখানে প্রতি দুজনের মধ্যে একজনের হাত কাটা। আমি সৌদি আরবে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। আমি এমন একজন মানুষকেও দেখি নি যার হাত কাটা।
অবশ্য খুব সামান্য কিছু লোক থাকবে, যারা এ শাস্তি পেয়েছে। তবে পশ্চিমারা যে রকম মনে করে আর প্রচার করে, ব্যাপারটা তেমন মোটেই না। তারা বলে, যদি কেউ ডাকাতি করে, আর যদি তার হাত কেটে ফেলা হয়, তার পরিবারের কী হবে? তার সন্তানের কী হবে? এটা খুব নিষ্ঠুর কাজ। আমি বলব ইসলামই সে ব্যবস্থা করবে। যদি কারো সমস্যা থাকে। ইসলামি সরকার তার পরিবারের দেখাশোনা করবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কতজন মানুষের হাত কাটা হবে? আইনের কারণে কেউ ডাকাতির সাহসই পাবে না। তাহলে শাস্তিটা দেয়া হবে কাকে? অন্যায়ই যেখানে থাকবে না, সেখানে শাস্তি প্রয়োগ করার কথাই কেন আসবে?
আমেরিকা বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোর একটি। আপনি কি জানেন আমেরিকায় অপরাধের হারও বেশি? আমার প্রশ্ন হল, আমেরিকায় যদি ইসলামি শরিয়ার প্রচলন করা হয় যেখানে সব ধনী লোক যাকাত দেবে। এরপরও কেউ চুরি করলে তার হাত কেটে ফেলা হবে শাস্তি হিসেবে। এতে করে কি আমেরিকায় সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতির হার বেড়ে যাবে? একই রকম থাকবে? নাকি কমে যাবে? আর এটাই কার্যকর আইন। ইসলামি শরিয়া প্রয়োগ করলে তার ফলও পাওয়া যাবে। সে জন্যই বলেছিলাম, ইসলাম ভালো কথা বলার পাশাপাশি সেগুলো বাস্তবায়নের পথও দেখায়।
আর এ কারণেই পশ্চিমাদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করছে। আপনাকে একটি উদাহরণ দিই, বেশির ভাগ দর্শন, ধর্ম এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সংবিধানও বলে যে, আপনি মহিলাদের উত্যক্ত করবেন না, তাদের ধর্ষণ করবেন না। ইসলামও একই কথা বলে। তবে ইসলাম আপনাকে পথ দেখায় কীভাবে এ অবস্থা অর্জন করবেন। যেখানে লোকজন মেয়েদের উত্যক্ত করবে না অথবা মেয়েদের ধর্ষণ করবে না।
📄 পর্দা পুরুষ-মহিলা উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য
ইসলামে পর্দা হিসেবে হিজাবের বিধান রয়েছে। সাধারণত ইসলামি বক্তারা সব সময় মহিলাদের হিজাবের কথা বলে। কিন্তু আল্লাহ পবিত্র কুরআনে প্রথমে বলেছেন পুরুষের হিজাবের কথা, তারপর নারীদের হিজাব। সূরা নূরের ৩০ নং আয়াতে আছে-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ .
অর্থ: মুমিনদেরকে বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে হেফাযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে।
যখনই কোনো পুরুষ কোনো মহিলার দিকে তাকাবে, যদি তার মনে কোনো খারাপ চিন্তা আসে, আল-কুরআন বলছে যে, তার দৃষ্টি নিচু করবে। আমার একজন বন্ধু একটা মেয়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, তুমি কী করছ? ইসলাম এটার অনুমোদন দেয় না। সে আমাকে বলল, রাসূল বলেছেন, “প্রথম দৃষ্টিটার অনুমতি আছে, দ্বিতীয় দৃষ্টি নিষিদ্ধ।” আমি আমার প্রথম দৃষ্টির অর্ধেকও পূরণ করি নি। আমাদের নবী করীম কি বুঝিয়েছেন যে, প্রথম দৃষ্টির অনুমতি আছে, দ্বিতীয় দৃষ্টি নিষিদ্ধ? এর মানে এই না যে, আপনি একজন মহিলার দিকে তাকাবেন আর দশ মিনিট ধরে তাকিয়ে থাকবেন। চোখের পলক না ফেলে। আমাদের নবী করীম যা বলেছেন তা হলো, যদি কোনো মহিলার দিকে হঠাৎ করে নজর পড়ে গেল, তৎক্ষণাত দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন এবং তার দিকে আর দ্বিতীয়বার স্বেচ্ছায় তাকাবেন না।
এর পরের আয়াত অর্থাৎ সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতে আছে-
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّبِعِينَ غَيْرِ أُولِي الإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ التِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُখْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ .
অর্থ: হে নবী, মুমিন স্ত্রীলোকদের বলেন, তারা যেন নিজেদের চোখকে নিম্নগামী রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হেফাযত করে ও নিজেদের সাজ-সজ্জা না দেখায়। কেবল সেসব জিনিস ছাড়া যা আপনা হতে প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের বক্ষদেশের ওপর ওড়নার আঁচল ফেলে রাখে। আর নিজেদের সাজ-সজ্জা প্রকাশ করবে না; কিন্তু কেবল এ লোকদের সামনে, তাদের স্বামী, পিতা, স্বামীদের পিতা, নিজেদের পুত্র, স্বামীদের পুত্র, নিজেদের ভাই, ভাইদের পুত্র, বোনদের পুত্র, নিজেদের মেলামেশার স্ত্রীলোক, নিজেদের দাসী, সেসব অধীনস্থ পুরুষ যাদের অন্য কোনো রকম গরয নেই। আর সেসব বালক যারা স্ত্রীলোকদের গোপন বিষয়াদি সম্পর্কে এখনো ওয়াকিফহাল হয় নি। তারা নিজেদের পা জমিনের ওপর মেরে চলাফেরা করবে না, এভাবে যে, নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা গোপন করে রেখেছে লোকেরা তা জানতে পারে। হে মুমিন লোকেরা! তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর নিকট তওবা কর, আশা করা যায় তোমরা কল্যাণ লাভ করবে।
হিজাবের নিয়ম-কানুন আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসে উল্লেখ আছে। প্রধানত নিয়ম ছয়টি।
১. পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকতে হবে। মেয়েদের জন্য মুখ আর হাতের কব্জি ব্যতীত সমস্ত শরীর ঢাকতে হবে। অন্য পাঁচটি নিয়ম পুরুষ ও মহিলার জন্য একই।
২. তারা যে পোশাক পরবে সেটা এ রকম আঁটসাঁট হবে না যে, তাদের দেহের গঠন বোঝা যাবে।
৩. পোশাক এমন স্বচ্ছ হবে না, যাতে ভেতর দিকে দেখা যায়।
৪. পোশাক এরকম আকর্ষণীয় হবে না যা বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করে।
৫. এ পোশাক এমন হবে না, যা অবিশ্বসীদের মতো, যেমন: খ্রিস্টানদের মতো ক্রস পরতে পারবে না। আর
৬. এমন পোশাক পরা যাবে না, যা বিপরীত লিঙ্গের পোশাকের মতো।
হিজাব বলতে শুধু পোশাক বোঝায় না। মানুষের আচরণ, ব্যবহার, দৃষ্টিভঙ্গি এমনকি অভিপ্রায়কেও বুঝায়। পোশাকের পাশাপাশি চোখ, মন, চিন্তা এমনকি হৃদয়েরও হিজাব থাকবে।
সূরা আহজাবের ৫৯ নং আয়াতে মেয়েদের হিজাবের কারণের কথা বলা হয়েছে-
يٰأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنٰتِكَ وَنِسَآءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيْبِهِنَّ ذٰلِكَ أَدْنٰى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ
অর্থ: হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে ও মুমিন নারীগণকে বলো, তারা যেন নিজেদের ওপর চাদরের আঁচল ঝুলিয়ে দেয়। ফলে তাদেরকে চিনতে পারা যাবে এবং উত্যক্ত করা হবে না।
ধরুন, কুয়ালামপুরের রাস্তায় দুজন সহদর বোন হাঁটছে। একজন ইসলামিক হিজাব পরে আছে- পুরো শরীর ঢাকা শুধু মুখ ও হাতের কব্জি বাদে। আর অন্য বোনটি পোশাক পরে আছে আধুনিক স্টাইলে স্কার্ট আর মিনি। তারা দু'জনেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। রাস্তায় বখাটে মাস্তান দাঁড়িয়ে আছে উত্যক্ত করার জন্য, শিকারের আশায়। এবার বলুন বোনদের মধ্যে কোনো বোনকে সে উত্যক্ত করবে? এটাই স্বাভাবিক যে, সে মিনি স্কার্ট পরা মেয়েটাকে উত্যক্ত করবে।
📄 ধর্ষণের শাস্তি কেন মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত
এরপর পবিত্র কুরআনে বলছে, যদি কোনো লোক কোনো মহিলাকে ধর্ষণ করে, এর শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। পশ্চিমারা বলবে, মৃত্যুদণ্ড......? ইসলাম একটা বর্বরসুলভ ধর্ম। কিন্তু আমি অনেক পশ্চিমাকে জিজ্ঞেস করেছি। ধরুন, আল্লাহ না করুন, কেউ একজন আপনার স্ত্রী অথবা মাকে অথবা বোনকে ধর্ষণ করে। আর আপনিই সেখানে বিচারক। ধর্ষককে আপনার সামনে নিয়ে আসা হলে আপনি তাকে কী শাস্তি দেবেন? বিশ্বাস করুন, তারা সবাই বলেছে, তারা সেই ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দিবে।
কেউ কেউ এটাও বলেছে, তারা তাকে প্রচণ্ড কষ্ট দিয়ে মারবে। তারা এমন বলে কেন? কেন এই দুমুখো নীতি? অন্য কারো স্ত্রী বা মাকে ধর্ষণ করা হলে বলে, ওহ! মৃত্যুদণ্ড একটা বর্বরসুলভ আইন। আর আপনার স্ত্রীকে ধর্ষণ করলে তাকে আপনারা মৃত্যুদণ্ড দিতে চান। কেন এই দুমুখো নীতি? মাত্র একজন লোক, এখন পর্যন্ত মাত্র একজন পশ্চিমাবাসী আমাকে অন্য রকম উত্তর দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন যে, "প্রথমে যদি কেউ আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে তাহলে আমি তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিব। আর এরপর যদি আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে, তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিব।” ওখানে অনেক স্মার্ট লোক আছে যারা এভাবে উত্তর দেয়।
আমি তখন তাকে বললাম, ভাই তুমি কি আমেরিকার পরিসংখ্যান জানো, যেটা আমরা জানি? যদি কেউ ধর্ষণ করার কারণে দোষী সাব্যস্ত হয়, আমেরিকার সরকার বলে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। কিন্তু পরিসংখ্যান আমাদের বলে যে, ধর্ষণের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীরা জেল খাটার পর যখন মুক্তি পায়, তাদের শতকরা ৯৫ জনই আবার ধর্ষণ করে। আমি সেই পশ্চিমাকে বলেছিলাম, যদি আপনি চান আপনার স্ত্রী আবার ধর্ষিতা হোক সেটা আপনার ব্যাপার। তাকে সাত বছর জেল দিয়ে আবার ধর্ষণ করার জন্য মুক্তি দেবেন? যদি আপনি চান আপনার স্ত্রী বারবার ধর্ষিতা হবে, তবে আপনি সেই আইন প্রয়োগ করুন। সে যখন এই পরিসংখ্যান শুনলো, তখন বলল, এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে আমি প্রথমবারেই মৃত্যুদণ্ড দিব।
আজকের দিনে, আমেরিকায়, এফ.বি.আই এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯০ সালে এক লক্ষ দুই হাজার পাঁচশো পঞ্চান্নটি ধর্ষণের কেস রিপোর্ট করা হয়েছে। আরো বলেছে যে, এ রিপোর্ট মোট ধর্ষণের ঘটনার মাত্র ১৬ ভাগ কেস রিপোর্ট করা হয়েছে। তার মানে ১৯৯০ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৬ লক্ষ ৪০ হাজার ৯ শত ৬৮টি। অর্থাৎ ১৯৯০ সালে গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৭ শত ৫৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯২-৯৩ সালে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৯ শতেরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ প্রতি ১.৩ মিনিটে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে একটা। আমরা এখানে আছি প্রায় ১ ঘণ্টা। এ সময়ে ৪০টিরও বেশি ধর্ষণ হয়েছে আমেরিকায়।
আবারও বলছি যতগুলো ঘটনা ঘটছে, তার কেস রিপোর্ট করা হয়েছে ১৬%। যতগুলো কেস রিপোর্ট করা হয়েছে তার ১০% অ্যারেস্ট হয়েছে। তার মানে ধর্ষকদের মাত্র ১.৬% এরেস্ট হয়েছে। যারা অ্যারেস্ট হয়েছে তাদের ৫০% মুক্তি পেয়েছে বিচার হওয়ার আগেই বিনা বিচারে। অর্থাৎ মাত্র ০.৮ শতাংশ ধর্ষকের বিচার হয়েছে। এর অর্থ হলো, যদি একজন মানুষ ১২৫টি ধর্ষণ করে, তার অ্যারেস্ট এবং বিচার হওয়ার সম্ভাবনাও মাত্র ১%। ১২৫টি ধর্ষণ করলেন আর মাত্র একবার শাস্তি পেলেন। কেউ ১২৫টি ধর্ষণ করবে আর সরকার তাকে শাস্তি দেবে এর সম্ভাবনা ১%, বেশ সুন্দর খেলা। আর যাদের বিচার হয়, তাদের ৫০% শাস্তি পায় ১ বছরের কম কারাদণ্ড। আইনে সাত বছরের কারাদণ্ড থাকলেও জজ বলে যে, সে প্রথমবার ধর্ষণ করেছে, শাস্তি একটু কমই দিই। একটু নরম হই।
১২৫টি ধর্ষণ করলে সে একবার বিচারের সম্মুখীন হয়। আর জজ বলে একটু নরম হই। প্রথমবার ধর্ষণ করেছে। এটা হলো আমেরিকার এফবিআই এরই পরিসংখ্যান। আমার প্রশ্ন হলো, যদি আমেরিকায় ইসলামিক শরিয়া প্রয়োগ করা হয়, যখনই কোনো পুরুষ কোনো মহিলাকে দেখবে সে দৃষ্টি নিচু করবে, মহিলারা হিজাব পরবে। পুরো শরীর ঢাকা মুখ আর হাতের কব্জি বাদে। তারপরও যদি কেউ ধর্ষণ করে, তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। তাহলে আমেরিকায় ধর্ষণের হার কি বেড়ে যাবে? নাকি একই রকম থাকবে? নাকি কমবে? নিশ্চয়ই কমবে। এটাই কার্যকর আইন। আপনি ইসলামি শরিয়া প্রয়োগ করলে হাতে হাতে ফল পাবেন। আলহামদুলিল্লাহ, আমি আগেও বলেছি, ইসলাম মানব জাতির সমস্যার সমাধান দেয়।