📄 পার্থিব কর্মসমূহকে কীভাবে ইবাদত বানাবেন?
ইবাদত তো ইবাদতই, কিন্তু আপনার দৈনন্দিন জীবনের সাংসারিক কাজকর্মকে কীভাবে ইবাদতে পরিণত করতে পারেন, তা জেনে রাখা দরকার।
যে কোনও বৈধ সাংসারিক কাজ, যেমন ব্যবসা করা, চাষ করা, চাকরি করা, রান্না করা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া, পানাহার করা, সহবাস করা ইত্যাদি ইবাদতে পরিণত হতে পারে; যদি আপনিঃ-
প্রথমতঃ মু'মিন হন।
দ্বিতীয়তঃ তাতে সওয়াবের আশা রাখেন অথবা তার পশ্চাতে সুমহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য থাকে।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ} (١٦٢) سورة الأنعام
"বল, 'নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার উপাসনা (কুরবানী), আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।” (আনআমঃ ১৬২)
বলা বাহুল্য, আপনার জীবনের সকল কর্ম যেন সুমহান প্রতিপালকের জন্য হয়। আর তা করতে হবে আমাদের সকলকে। যেহেতু আমরা সকলেই তাঁর বান্দা এবং তাঁরই দেওয়া দানের উপর জীবনধারণ করছি।
ব্যবসা বা চাকরির মাধ্যমে অর্থোপার্জনের কথা ধরা যাক। তাতে যদি নিয়ত হয় উপার্জিত টাকা পেয়ে হারাম থেকে বাঁচব, আল্লাহর পথে ব্যয় করব, পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণ করব ইত্যাদি, তাহলে তাতে মহান আল্লাহ খুশি হবেন এবং তা হয়ে যাবে ইবাদত।
সা'দ বিন আবী অক্কাস , যে দশজন সাহাবীকে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল ইনি তাঁদের মধ্যে একজন, তিনি বলেন, বিদায় হজ্জ্বের বছর রাসূলুল্লাহ আমার রুগ্ন অবস্থায় আমাকে দেখা করতে এলেন। সে সময় আমার শরীরে চরম ব্যথা ছিল। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার (দৈহিক) জ্বালা-যন্ত্রণা কঠিন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে---যা আপনি স্বচক্ষে দেখছেন। আর আমি একজন ধনী মানুষ; কিন্তু আমার উত্তরাধিকারী বলতে আমার একমাত্র কন্যা। তাহলে আমি কি আমার মাল-সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ দান ক'রে দেব?' তিনি বললেন, "না।” আমি বললাম, 'তাহলে অর্ধেক মাল হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "না।” আমি বললাম, 'তাহলে কি এক তৃতীয়াংশ দান করতে পারি?' তিনি বললেন,
((الثلث والثلث كثيرٌ - أو كبيرٌ - إِنَّكَ إِنْ تَدْرُ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيرٌ مِنْ أَنْ تَدْرَهُمْ عَالَةً يتَكَفَّفُونَ النَّاسَ ، وَإِنَّكَ لَنْ تُنفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فِي امْرَأَتِكَ)).
"এক তৃতীয়াংশ (দান করতে পার), তবে এক তৃতীয়াংশও অনেক। কারণ এই যে, তুমি যদি তোমার উত্তরাধিকারীদের ধনবান অবস্থায় ছেড়ে যাও, তাহলে তা এর থেকে ভাল যে, তুমি তাদেরকে কাঙ্গাল করে ছেড়ে যাবে এবং তারা লোকের কাছে হাত পাতবে। (মনে রাখ,) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তুমি যা ব্যয় করবে তোমাকে তার বিনিময় দেওয়া হবে। এমনকি তুমি যে গ্রাস তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও তারও তুমি বিনিময় পাবে।”
আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি কি আমার সঙ্গীদের ছেড়ে পিছনে (মক্কায়) থেকে যাব?' তিনি বললেন,
(( إِنَّكَ لَنْ تُخَلَّفَ فَتَعْمِلَ عَمَلاً تَبْتَغِي بِهِ وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا ازْدَدتَ بِهِ دَرَجَةً ورِفعَةً ، وَلَعَلَّكَ أَنْ تُخَلَّفَ حَتَّى يَنتَفِعَ بِكَ أَقْوَامٌ وَيُضَرَّ بِكَ آخرون ....)
"তুমি যদি তোমার সঙ্গীদের মরার পর জীবিত থাক এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোন কাজ কর, তাহলে তার ফলে তোমার মর্যাদা ও সম্মান বর্ধন হবে। আর সম্ভবতঃ তুমি বেঁচে থাকবে। এমনকি তোমার দ্বারা কিছু লোক (মু'মিনরা) উপকৃত হবে। আর কিছু লোক (কাফেররা) ক্ষতিগ্রস্ত হবে।---" (বুখারী ১২৯৫, ৩৯৩৬, মুসলিম ৪২৯৬নং)
বরং অর্থোপার্জন আল্লাহর পথে জিহাদের সমতুল্য হতে পারে। আবু হুরাইরা বলেন, একদা আমরা আল্লাহর রসূল ﷺ-এর সাথে ছিলাম। এমন সময় পাহাড়ের পাদদেশ থেকে একজন (সুস্বাস্থ্যবান) যুবক বের হয়ে এল। আমরা যখন তাকে দেখলাম এবং তার প্রতি দৃষ্টি ফেলে রাখলাম, তখন বললাম, যদি এই যুবক তার যৌবন, উদ্যম ও শক্তিকে আল্লাহর পথে (জিহাদে) ব্যয় করত! (তাহলে কতই না উত্তম হতো।) আল্লাহর রসূল ﷺ আমাদের এ কথা শুনে বললেন,
وَمَا سَبِيلُ اللَّهِ إِلَّا مَنْ قُتِلَ؟ مَنْ سَعَى عَلَى وَالِدَيْهِ فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَنْ سَعَى عَلَى عِيَالِهِ فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَنْ سَعَى عَلَى نَفْسِهِ لِيُعِفَّهَا فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَنْ سَعَى عَلَى التَّكَاثُرِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ الشَّيْطَانِ ..
"(যুদ্ধে) খুন হওয়া ছাড়া কি আর আল্লাহর পথ (জিহাদ) নেই? যে ব্যক্তি নিজ পিতার জন্য রুযী-সন্ধান করে, তার কাজ আল্লাহর পথে, যে ব্যক্তি নিজ ছেলেমেয়ের জন্য রুযী-সন্ধান করে, তার কাজ আল্লাহর পথে এবং যে ব্যক্তি নিজেকে সৎ রাখার জন্য রুযী-সন্ধান করে, তার কাজও আল্লাহর পথে। কিন্তু যে ব্যক্তি ধনবৃদ্ধিতে গর্ব করার জন্য কর্ম করে, তার কাজ তাগূত অথবা শয়তানের পথে।” (বায্যার, বাইহাকী ১৮-২৮০, প্রমুখ, সিলসিলাহ সহীহাহ ২২৩২নং)
আমরা যে পানাহার করি, ঘুমাই ও স্বামী-স্ত্রী মিলন করি, তাতেও সওয়াব রয়েছে। কেবল নিয়তটাকে সঠিক ক'রে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। এর মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহর ইবাদতে সহযোগিতা গ্রহণ করব। স্বাস্থ্য ও মন ভালো রেখে আল্লাহর ইবাদতে বেশি মনোযোগী হব এবং অনেক হারাম থেকে রক্ষা পাব।
আবু যার বলেন, কিছু সাহাবা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ধনীরাই তো বেশী নেকীর অধিকারী হয়ে গেল। তারা নামায পড়ছে যেমন আমরা নামায পড়ছি, তারা রোযা রাখছে যেমন আমরা রাখছি এবং (আমাদের চেয়ে তারা অতিরিক্ত কাজ এই করছে যে,) নিজেদের প্রয়োজন-অতিরিক্ত মাল থেকে তারা সাদকাহ করছে।' তিনি বললেন,
(( أَوْلَيسَ قَدْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلَّ تَكْبِيرة صَدَقَةً ، وَكُلَّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهِي عَن الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ ، وفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ (( قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرُ ؟ قَالَ : (( أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرُ ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا في الحلال كَانَ لَهُ أَجْرٌ )).
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।” সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন, “কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে।” (মুসলিম ২৩৭৬নং)
আল্লাহু আকবার! করুণাময় প্রতিপালক কতভাবে আমাদের প্রতি করুণা ক'রে থাকেন! আমরা আমাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যক্তিগত কাজ করব, তাতেও রয়েছে সদকার সওয়াব! সেটাও ইবাদতে পরিণত হবে, কেবল নিয়তটাকে সহীহ ক'রে নিতে হবে।
মুআয বিন জাবাল রা. বলেছেন,
(أَمَّا أَنَا فَأَنَامُ وَأَقُومُ، فَأَحْتَسِبُ نَوْمَتِي كَمَا أَحْتَسِبُ قَوْمَتِي).
'আমি কিন্তু ঘুমাই এবং কিয়াম করি। সুতরাং আমি আমার ঘুমের মধ্যে সওয়াবের আশা রাখি, যেমন আমি আমার কিয়ামের মধ্যে সওয়াবের আশা রাখি।' (বুখারী ৪৩৪১, ৪৩৪৪, মুসলিম ৪৮-২২নং)
আমাদের প্রয়োজন আছে নিয়ত শুদ্ধ করার। পার্থিব কাজের ভিতরেও নিয়তে মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি কামনা করা।
এরপর রয়েছে মহান আল্লাহর যিকর। পার্থিব কাজ শুরু করার আগে যেখানে যে যিক্র ও দুআ আছে, তা পড়লে তো ইবাদতই হয়। পানাহার, মলমূত্র ত্যাগ, সহবাস, সওয়ারীতে সওয়ার, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির সময় ঠিক-ঠিক যিকর করা এবং শরয়ী নিয়মে তা সম্পাদন করলে সব ইবাদতে পরিণত হয়।
মহান আল্লাহ এমন ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করেছেন কুরআনে, যারা ব্যবসা-কর্মে ব্যস্ত থেকেও সুমহান প্রতিপালকের যিক্র থেকে উদাসীন হয় না। তিনি বলেছেন,
{فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَن تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ (٣٦) رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلُّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ} (۳۷) سورة النور
"সে সব গৃহে---যাকে আল্লাহ সমুন্নত করতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন---সকাল ও সন্ধ্যায় তাতে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, এমন সব লোক যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং নামায কায়েম ও যাকাত প্রদান করা হতে বিরত রাখে না, তারা ভয় করে সেদিনকে, যেদিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি ভীতি বিহ্বল হয়ে পড়বে।” (নূর : ৩৬-৩৭)
ঠিক তিনি এই নির্দেশই দিয়েছেন কুরআনে। তিনি বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِي لِلصَّلاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنتُمْ تَعْلَمُونَ (۹) فَإِذَا قُضِيَتْ الصَّلاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيراً لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۱۰) وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً أَوْ لَهُوا انفَضُّوا إِلَيْهَا وَتَرَكُوكَ قَائِماً قُلْ مَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ مِنْ اللَّهْوِ وَمِنْ التَّجَارَةِ وَاللَّهُ خَيْرُ الرَّازِقِينَ} (۱۱)
“হে বিশ্বাসিগণ! জুমুআর দিনে যখন নামাযের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের জন্য ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর। অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর ও আল্লাহকে অধিকরূপে সস্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও। যখন তারা কোন ব্যবসা বা খেল-তামাশা দেখে, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে ওর দিকে ছুটে যায়। বল, ‘আল্লাহর নিকট যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আর আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ রুযীদাতা।” (জুমুআহঃ ৯-১১)
শ্রমিক নিজ কর্মক্ষেত্রে, চাষী নিজ চাষ-কর্মে, গৃহবধূ নিজ গৃহস্থালি কাজকর্মে থেকে নিয়ত সঠিক রেখে সকল কর্মকে ইবাদতে পরিণত করতে পারে।
দুনিয়ায় জীবনধারণ করতে হলে জীবনোপকরণ প্রয়োজন। ইবাদত করতে হলে সুস্থভাবে জীবনযাপন প্রয়োজন। সম্ভবতঃ সেই জন্যই মহান আল্লাহ মানব-দানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য উল্লেখের পর-পরই জীবিকা বা রুযীর কথা উল্লেখ করেছেন।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونَ (٥٦) مَا أُريدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقِ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُون (৫৭) إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ (٥٨)
"আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। আমি তাদের নিকট হতে জীবিকা চাই না এবং এও চাই না যে, তারা আমার আহার্য যোগাবে। নিশ্চয় আল্লাহ; তিনিই রুযী দাতা প্রবল, পরাক্রান্ত।” (যারিয়াত: ৫৬-৫৮)
মানব-দানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হল: মহান আল্লাহর ইবাদত করা।
তিনি মানব-দানবের নিকট থেকে কোন উপকার নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদেরকে সৃষ্টি করেননি। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন; বরং সারা সৃষ্টি তাঁরই মুখাপেক্ষী। তাঁর কোন জীবিকা বা খাদ্যের প্রয়োজন পড়ে না। বরং তিনিই সকলের জীবিকা ও খাদ্যের ব্যবস্থা ক'রে থাকেন।
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
{وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ} (۲۲) سورة الذاريات "আকাশে রয়েছে তোমাদের রুযী ও প্রতিশ্রুত সবকিছু।” (যারিয়াতঃ ২২)
{وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مبين} (٦) سورة هود
"আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী কোন এমন প্রাণী নেই যে, তার রুযী আল্লাহর দায়িত্বে নেই। আর তিনি প্রত্যেকের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন; সবই সুস্পষ্ট গ্রন্থে (লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ) রয়েছে।” (হৃদঃ ৬)
{أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضًا سُخْرِيًّا وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ} (৩২)
"এরা কি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ বন্টন করে! আমিই ওদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করেছি ওদের পার্থিব জীবনে এবং এককে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছি; যাতে ওরা একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে এবং ওরা যা জমা করে, তা হতে তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ উৎকৃষ্টতর।” (যুখরুফঃ ৩২)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوماً نُّطْفَةً ، ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ ، ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذلِكَ ، ثُمَّ يُرْسَلُ المَلَكُ ، فَيَنْفُخُ فِيهِ الرُّوحَ ، وَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ : يكتب رِزْقِهِ وَأَجَلِهِ وَعَمَلِهِ وَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ ....))
"তোমাদের এক জনের সৃষ্টির উপাদান মায়ের গর্ভে চল্লিশ দিন যাবৎ বীর্যের আকারে থাকে। অতঃপর তা অনুরূপভাবে চল্লিশ দিনে জমাটবদ্ধ রক্তপিন্ডের রূপ নেয়। পুনরায় তদ্রূপ চল্লিশ দিনে গোস্তের টুকরায় রূপান্তরিত হয়। অতঃপর তার নিকট ফিরিস্তা পাঠানো হয়। সুতরাং তার মাঝে 'রূহ' স্থাপন করা হয় এবং চারটি কথা লিখার আদেশ দেওয়া হয়; তার রুযী, মৃত্যু, আমল এবং পাপিষ্ঠ না পুণ্যবান হবে, তা লিখা হয়।---" (বুখারী ৩২০৮, মুসলিম ৬৮-৯৩নং)
لا تَسْتَبْطِئُوا الرِّزْقَ فَإِنَّهُ لَمْ يَكُنْ عَبْدٌ يَمُوتُ حَتَّى يَبْلُغَهُ آخِرُ رِزْقَ هُوَ لَهُ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ مِنَ الْحَلَالِ وَتَرْكِ الْحَرَامِ ..
"তোমরা রুজী সন্ধানের ব্যাপারে জলদিবাজি করো না। পৃথিবীতে কোন বান্দাই তার ভাগ্যে নির্ধারিত সর্বশেষ রুযী অর্জন না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রুযী সন্ধানে মধ্যবর্তী পন্থা (সুন্দর ও স্বাভাবিক বৈধ পথ) অবলম্বন কর। হালাল উপায় গ্রহণ কর এবং হারাম উপায় বর্জন কর।” (ইবনে মাজাহ ২১৪৪, হাকেম ২১৩৫, বাইহাকী ১০৭০৭, তাবারানীর আওসাত্ব ৩১০৯, সহীহুল জামে' ৭৩২৩নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
((إِنَّ رُوحَ القُدُسِ نَفَتَ فِي رُوعِي أَن نَفْساً لنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ أَجَلَهَا وَتَسْتَوْعِبَ رِزْقَهَا فَاتَّقُوا الله وأجْمِلُوا في الطلب ولا يَحْمِلُنَّ أَحَدَكُمُ اسْتِبْطاءُ الرِّزْقِ أَنْ يَطْلُبَهُ بِمَعْصِيَةِ الله فإنّ الله تعالى لا يُنالُ مَا عِنْدَهُ إِلا بِطَاعَتِهِ)).
“জিবরীল আমার হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত করেছেন যে, কোন আত্মাই তার ভাগ্যে নির্ধারিত সর্বশেষ আয়ু ও রুযী পূর্ণ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রুজী সন্ধানে মধ্যবর্তী পন্থা (সুন্দর ও স্বাভাবিক বৈধ পথ) অবলম্বন কর। রুযী আসতে দেরী দেখে তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তার সন্ধানে উদ্বুদ্ধ না হয়। যেহেতু (রুযী আল্লাহর হাতে আর) তা তাঁর বাধ্য না হয়ে অর্জন করা যায় না।” (হিল্যাহ ১০২৭, সহীহুল জামে' ২০৮৫নং)
সুতরাং প্রত্যেক জীবের জীবিকা বন্টিত ও বিতড়িত আছে। রুযীর মালিক আল্লাহ। তিনিই রুযী দেবেন। অতএব তাঁর উপরেই ভরসা রাখতে হবে।
তবে তার মানে এই নয় যে, পরিশ্রম ও চেষ্টার প্রয়োজন নেই, আপনা-আপনিই রুযী আসতে থাকবে।
অবশ্যই রুযী-সন্ধানে রুযীদাতা আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে। সেই সাথে পরিশ্রম ও চেষ্টা চালিয়ে জীবিকার উপায় অবলম্বন করতে হবে। পরিশ্রম, চেষ্টা ও উপায় সৎ ও বৈধ হতে হবে।
তাহলেই তা ইবাদত ও আল্লাহর পথে জিহাদে পরিণত হবে। অন্যথায় মহানবী বলেছেন,
إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ ذُلا لَا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ ..
"যখন তোমরা 'ঈনাহ' ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।" (আহমাদ ৫৫৬২, আবু দাউদ ৩৪৬৪, বাইহাকী ১০৪৮-৪নং)
দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করার অর্থ বড় প্রশস্ত। তবে রুযী সন্ধানের ব্যাপারে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, তা দ্বীনের অনুমোদিত হালাল ও বৈধ উপায়ে হতে হবে। নচেৎ হারাম উপার্জিত জীবিকা গ্রহণ করলে মুসলিমের দুআই কবুল হবে না। আর দুআ হল প্রধান ইবাদত।
যেমন জীবিকা উপার্জনের পথ হালাল হলেও এমন হওয়া উচিত নয় যে, মুসলিম তারই পশ্চাতে দৌড় দিতে গিয়ে দুনিয়ার দাস হয়ে যাবে। বরং দুই দিক বজায় রাখলে তবেই আসবে সাফল্য।
আল্লাহর রসূল বলেছেন, يقول ربكم تبارك وتعالى : يا ابن آدم تفرغ لعبادتي أملأ قلبك غنى، وأملأ يديك رزقا ، یا ابن آدم لا تباعد مني فأملأ قلبك فقرا، وأملأ يديك شغلاً)).
"তোমাদের প্রতিপালক বলেন, 'হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতে নিরত হও, আমি তোমার হৃদয়কে ধনবত্তায় এবং উভয় হাতকে রুযীতে ভরে দেব। হে আদম সন্তান! আমার নিকট থেকে দূরে সরে যেয়ো না। নচেৎ তোমার হৃদয়কে অভাব দিয়ে এবং উভয় হাতকে কর্মব্যস্ততা দিয়ে ভরে দেব।” (হাকেম ৭۹২৬, ত্বাবারানী ১৬৮৯৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৩৫৯নং)
من كانت الدنيا همه فرق الله عليه أمره، وجعل فقره بين عينيه، ولم يأته من الدنيا إلا ما كتب له. ومن كانت الآخرة نيته، جمع الله له أمره، وجعل غناه في قلبه ، وأتته الدنيا وهي راغمة».
"যে ব্যক্তির প্রধান চিন্তা (লক্ষ্য) ইহলৌকিক সুখভোগ (দুনিয়াদারীই) হয়, আল্লাহ তার প্রচেষ্টাকে তার প্রতিকূলে বিক্ষিপ্ত করে দেন, তার দারিদ্রকে তার দুই চক্ষুর সামনে করে দেন, আর দুনিয়ার সুখসামগ্রী তার ততটুকুই লাভ হয় যতটুকু তার ভাগ্যে লিখা থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য (ও পরম লক্ষ্য) পারলৌকিক সুখভোগ (আখেরাতই) হয়, আল্লাহ তার প্রচেষ্টাকে তার অনুকূলে ঐকান্তিক করে দেন। তার অন্তরে অমুখাপেক্ষিতা (ধনবত্তা) ভরে দেন। আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুনিয়ার (সুখসামগ্রী) তার নিকট এসে উপস্থিত হয়।” (ইবনে মাজাহ ৪১০৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯৫০ নং)
যেমন ইবাদতের জন্য সংসার ত্যাগী হতে হবে না। 'বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয় অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ--।'
এই হল ইসলামের বিধান। ইসলামের বিধানে দুনিয়া ও আখেরাতের মাঝে সামঞ্জস্য ও ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে এবং কোন ব্যাপারেই অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করা যাবে না।
এ ব্যাপারে কয়েকটি হাদীস প্রণিধানযোগ্য।
আবু জুহাইফা অহব ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন যে, নবী (হিজরতের পর মদীনায়) সালমান ও আবু দার্দার মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন। অতঃপর সালমান (একদিন তাঁর দ্বীনী ভাই) আবু দার্দার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে (তাঁর বাড়ী) গেলেন। তিনি (আবু দার্দার স্ত্রী) উম্মে দার্দাকে দেখলেন, তিনি মলিন কাপড় পরে আছেন। সুতরাং তিনি তাঁকে বললেন, 'তোমার এ অবস্থা কেন?' তিনি বললেন, 'তোমার ভাই আবু দার্দার দুনিয়ার কোন প্রয়োজনই নেই।' (ইতিমধ্যে) আবু দার্দাও এসে গেলেন এবং তিনি তাঁর জন্য খাবার তৈরী করলেন। অতঃপর তাঁকে বললেন, 'তুমি খাও। কেননা, আমি রোযা রেখেছি।' তিনি বললেন, 'যতক্ষণ না তুমি খাবে, আমি খাব না।' সুতরাং আবু দার্দাও (নফল রোযা ভেঙ্গে দিয়ে তাঁর সঙ্গে) খেলেন।
অতঃপর যখন রাত এল, তখন (শুরু রাতেই) আবু দার্দা নফল নামায পড়তে গেলেন। সালমান তাঁকে বললেন, '(এখন) শুয়ে যাও।' সুতরাং তিনি শুয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার তিনি (বিছানা থেকে) উঠে নফল নামায পড়তে গেলেন। আবার সালমান বললেন, 'শুয়ে যাও।' অতঃপর যখন রাতের শেষাংশ এসে পৌঁছল, তখন তিনি বললেন, 'এবার উঠে নফল নামায পড়।' সুতরাং তাঁরা দু'জনে একত্রে নামায পড়লেন। অতঃপর সালমান তাঁকে বললেন, 'নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার রয়েছে। তোমার প্রতি তোমার আত্মারও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান কর।' অতঃপর তিনি নবী -এর নিকট এসে তাঁকে সমস্ত ঘটনা শুনালেন। নবী বললেন, "সালমান ঠিকই বলেছে।” (বুখারী ১৯৬৮, ৬১৩৯নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, মহানবী আব্দুল্লাহ বিন আম্র বিন আস-কে বলেছিলেন,
(( أَلَمْ أَخْبَرُ أَنَّكَ تَصُومُ النَّهَارَ وتَقُومُ اللَّيْلَ ..... فَلَا تَفْعَلْ : صُمْ وَأَفْطِرُ ، وَلَمْ وَقُمْ ، فَإِنَّ لِجَسَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا ، وَإِنَّ لِعَيْنَيكَ عَلَيْكَ حَقًّاً ، وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا ، وَإِنَّ لِزَوْرِكَ عَلَيْكَ حَقًّا.....
"আমি কি এই সংবাদ পাইনি যে, তুমি দিনে রোযা রাখছ এবং রাতে নফল নামায পড়ছ? --- পুনরায় এ কাজ করো না। তুমি রোযাও রাখ এবং (কখনো) ছেড়েও দাও। নিদ্রাও যাও এবং নামাযও পড়। কারণ তোমার উপর তোমার দেহের অধিকার আছে। তোমার উপর তোমার চক্ষুদ্বয়ের অধিকার আছে। তোমার উপর তোমার স্ত্রীর অধিকার আছে এবং তোমার উপর তোমার অতিথির অধিকার আছে।---"
আয়েশা ও সা'দ কর্তৃক বর্ণিত, উষমান বিন মাযউন আবেগময় ইবাদত শুরু করেছিলেন। সংসার-বিরাগী হয়ে সব ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতে মন দিয়েছিলেন। মহানবী তাঁকে বলেছিলেন,
يَا عُثْمَانُ إني لم أومر بالرهبانية) أَرَغِبْتَ عَنْ سُنَّتِي ..
"হে উষমান! আমাকে সন্ন্যাসবাদে আদেশ দেওয়া হয়নি। তুমি কি আমার তরীকা থেকে বিমুখ হয়েছ?”
উষমান বললেন, 'না হে আল্লাহর রসুল! আমি তো আপনার তরীকাই অনুসন্ধান করছি।' তিনি বললেন (তাহলে শোন),
) فَإِنِّى أَنَامُ وَأَصَلَّى وَأَصُومُ وَأَفْطِرُ وَأَنْكِحُ النِّسَاءَ فَاتَّقِ اللَّهَ يَا عُثْمَانُ فَإِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِضَيْفِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَصُمْ وَأَفْطِرْ وَصَلَّ وَنَمْ ».
"আমার তরীকা হল, আমি (রাতে) নামায পড়ি এবং ঘুমাই, (কোনদিন) রোযা রাখি এবং (কোনদিন) রাখি না, বিবাহ করি ও তালাক দিই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার তরীকা থেকে বিমুখ হবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। হে উষমান! নিশ্চয় তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হক আছে, তোমার উপর তোমার নিজের হক আছে, তোমার উপর তোমার মেহমানের হক আছে....।" (আবু দাউদ ১৩৭১, দারেমী ২১৬৯নং, প্রমুখ)
আনাস রা. বলেন, তিন ব্যক্তি নবী-এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী -এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল, তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, 'আমাদের সঙ্গে নবী -এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক'রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।' সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন,
) أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا ؟ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ لِلهِ ، وَأَتْقَاكُمْ لَهُ ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي )).
"তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তাঁর ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখি এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (বুখারী ৫০৬৩, মুসলিম ৩৪৬৯নং)
সর্বশেষ কথা, জীবনের মূল উদ্দেশ্য হল আল্লাহর দাসত্ব। মূল লক্ষ্য দুনিয়া নয়; বরং আখেরাত। দুনিয়ায় হারলাম বা জিতলাম, তা আসল দেখার নয়; আসল হল, আখেরাতের জিত। পরকালের সাফল্যই হল প্রকৃত সাফল্য। আর সুমহান প্রভুর প্রকৃত দাস হতে পারলেই সেই সাফল্য লাভে ধন্য হওয়া যাবে। তিনি আমাদেরকে তওফীক দিন। আমীন।
📄 সমাপ্ত
وصلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. সমাপ্ত