📄 জীবনের নানা সমস্যা ও ব্যস্ততা
জীবনের নানা সমস্যা আমাদেরকে জীবনের উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দিয়েছে।
সাংসারিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা, রুযীরুটির ব্যস্ততা, রোগ-জ্বালার বিরক্তি ইত্যাদি অনেক মানুষকেই আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
অনেকে বলে, 'ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ধর্মের বাণী শুনাইয়ো না।' তাদের ধারণা, পেটে ক্ষুধা থাকলে ধর্ম পালন করতে হয় না। অথচ যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর সামনেও আল্লাহর ইবাদত মাফ নয়।
অনেকে বলে, 'সারা দিনটা খেটেখুটে মাইনের বেলায় দু-আনা, আল্লাহ বলে ডাকব কি ভাই সময় পেলাম না।' অথচ যথা সময়ে সময় না পেলেও পরবর্তী অবসর সময়েও ইবাদত কাযা করা যায়। সারা দিনটার চব্বিশ ঘন্টাই কেউ খাটাখাটনি করে না।
নামায পড়েন না কেন? বাপ! আমার উযু থাকে না গো। রোগের জ্বালায় নামায পড়া হয় না বাবা! নামায পড়ার সময় হয় না বাপধন!
রোযা রাখেন না কেন? ভাই! আমার গ্যাস আছে গো। রোযা রাখলে চাষ করতে পারব না। গতরে না খাটলে পেট চলবে না।
কোন ইবাদত যথা সময়ে পালন করতে কেউ অক্ষম হলে তার বিকল্প ব্যবস্থা ও পদ্ধতি আছে। তবুও উক্ত প্রকার কোন অজুহাত দিয়ে ইবাদত মাফ নয়। মানুষের জ্ঞান থাকতে ইবাদত থেকে অব্যাহতি নেই। ইবাদত মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য।
বলা বাহুল্য, পার্থিব নানা সমস্যা, কষ্ট বা কর্মব্যস্ততার মাঝেও ইবাদতের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। সুমহান স্রষ্টার দাস যারা, তারা খোঁড়া অজুহাত দেখাবে না। তিনি অন্তরের খবর জানেন, তিনি কারো অচল ছল-বাহানা ক্ষমা করবেন না। প্রণিধান করুন:-
{فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللهِ وَكَرِهُوا أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَالُوا لَا تَنفِرُوا فِي الْحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَّوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ} (৮১)
"যারা (তাবুক অভিযানে) পশ্চাতে রয়ে গেল, তারা রসূলের বিরুদ্ধাচরণ ক'রে বসে থাকতে আনন্দবোধ করল এবং তারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করাকে অপছন্দ করলো। অধিকন্তু বলতে লাগল, 'তোমরা গরমে (জিহাদে) বের হয়ো না।' তুমি বলে দাও, 'জাহান্নামের আগুন (এর চেয়ে) অধিকতর গরম'; যদি তারা বুঝতে পারত!” (তাওবাহঃ ৮১)
{يَعْتَذِرُونَ إِلَيْكُمْ إِذَا رَجَعْتُمْ إِلَيْهِمْ قُل لَّا تَعْتَذِرُوا لَن نُّؤْمِنَ لَكُمْ قَدْ نَبَّأَنَا اللَّهُ مِنْ أَخْبَارِكُمْ وَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (৯৪) سورة التوبة
"যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তারা তোমাদের কাছে অজুহাত পেশ করবে। তুমি বলে দাও, তোমরা অজুহাত পেশ করো না; আমরা কখনই তোমাদেরকে বিশ্বাস করব না। আল্লাহ আমাদেরকে তোমাদের খবর জানিয়ে দিয়েছেন। আর ভবিষ্যতেও আল্লাহ এবং তাঁর রসূল তোমাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে এমন সত্তার কাছে যিনি অদৃশ্য এবং প্রকাশ্য সকল বিষয়ই অবগত আছেন, অনন্তর তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে।” (তাওবাহঃ ৯৪)
{سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ شَغَلَتْنَا أَمْوَالُنَا وَأَهْلُونَا فَاسْتَغْفِرْ لَنَا يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ قُلْ فَمَن يَمْلِكُ لَكُم مِّنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ بِكُمْ ضَرًّا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ نَفْعًا بَلْ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا} (১১) سورة الفتح
"(যুদ্ধ থেকে) পশ্চাতে থাকা মরুবাসীরা তোমাকে বলবে, 'আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন আমাদেরকে ব্যস্ত রেখেছিল, অতএব আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।' তারা মুখে তা বলে, যা তাদের অন্তরে নেই। তাদেরকে বল, 'আল্লাহ তোমাদের কারো কোন ক্ষতি কিংবা মঙ্গল চাইলে কে তাঁকে নিবৃত্ত করতে পারে? বস্তুতঃ তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত।” (ফাতহঃ ১১)
{وَإِذْ قَالَت طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِن يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا} (۱۳) سورة الأحزاب
"ওদের একদল বলেছিল, 'হে ইয়াসরিব (মদীনা) বাসিগণ! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই; তোমরা ফিরে চল।' আর ওদের মধ্যে একদল নবীর নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা ক'রে বলেছিল, 'আমাদের বাড়ী-ঘর অরক্ষিত।' যদিও ওগুলি অরক্ষিত ছিল না। আসলে পলায়ন করাই ছিল ওদের উদ্দেশ্য।” (আহযাবঃ ১৩)
মহান সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির মনের খবর জানেন। আর অচল ওযর পেশকারী মানুষও মনের গোপন অন্তরালে জানে যে, সে আসলেই অপরাধী। তিনি বলেছেন,
{بَلِ الْإِنسَانُ عَلَى نَفْسِهِ بَصِيرَةٌ (١٤) وَلَوْ أَلْقَى مَعَاذِيرَهُ} (١٥) سورة القيامة
"বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত। যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে।” (ক্বিয়ামাহঃ ১৪-১৫)
সুতরাং নানা মিথ্যা অজুহাতে দাসত্ব ও আনুগত্য করতে ফাঁকি দেওয়া দাসকে যে শাস্তি পেতেই হবে, সে কথা অতি সহজে অনুমেয়।
কর্মব্যস্ততা আল্লাহর ইবাদতে বাধা সৃষ্টি করে। আবার আল্লাহর ইবাদতও ব্যস্ততাময় জীবনকে সহজ ক'রে দেয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ} (٤٠) سورة الحج
"আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন, যে তাঁকে (তাঁর দ্বীনকে) সাহায্য করে।" (হাজ্জঃ ৪০)
আল্লাহর রসূল বলেছেন,
((يقول ربكم تبارك وتعالى : يا ابن آدم تفرغ لعبادتي أملأ قلبك غنى، وأملأ يديك رزقا ، يا ابن آدم لا تباعد مني فأملأ قلبك فقرًا، وأملأ يديك شغلاً)).
“তোমাদের প্রতিপালক বলেন, 'হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতে নিরত হও, আমি তোমার হৃদয়কে ধনবত্তায় এবং উভয় হাতকে রুযীতে ভরে দেব। হে আদম সন্তান! আমার নিকট থেকে দূরে সরে যেয়ো না। নচেৎ তোমার হৃদয়কে অভাব দিয়ে এবং উভয় হাতকে কর্মব্যস্ততা দিয়ে ভরে দেব।” (হাকেম ৭৯২৬, ত্বাবারানী ১৬৮৯৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৩৫৯নং)