📄 পার্থিব প্রতিদ্বন্দ্বিতা
পার্থিব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বা পার্থিব কোন বিষয়ে অপরকে টেক্কা ও পাল্লা দেওয়ায় একটা নেশা আছে, যার ফলশ্রুতিতে মানুষ জীবনের মূল লক্ষ্য বিস্মৃত হতে পারে। ও ধনী হয়েছে, আমি কীভাবে হব? ওর বাড়ি-গাড়ি হয়েছে, আমার কীভাবে হবে? ওর এসি হয়েছে, আমার কীভাবে হবে? ওর ২টি দোকান হয়েছে, আমার কীভাবে হবে? ও অমুক পদ পেয়েছে, আমি ঐ পদ কীভাবে পাব? আমি ওর থেকে উন্নত হব, আমি জিতব, আমি ওকে হারাব, আমিই হব অগ্রগামী। পার্থিব সুখ-সম্ভারের জন্য এই শ্রেণীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় মানুষকে জীবনের আসল উদ্দেশ্য সম্বন্ধে উদাস ক'রে ফেলে। বরং অনেক সময় এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নিজেকে ধ্বংস ক'রে ফেলে।
আম্র ইবনে আউফ আনসারী থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ একবার আবু উবাইদাহ ইবনে জারাহকে জিযিয়া (ট্যাক্স) আদায় করার জন্য বাহরাইন পাঠালেন। অতঃপর তিনি বাহরাইন থেকে (প্রচুর) মাল নিয়ে এলেন। আনসারগণ তাঁর আগমনের সংবাদ শুনে ফজরের নামাযে রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে শরীক হলেন। যখন তিনি নামায পড়ে (নিজ বাড়ি) ফিরে যেতে লাগলেন, তখন তারা তাঁর সামনে এলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁদেরকে দেখে হেসে বললেন,
(( أَظُنُّكُمْ سَمِعْتُمْ أَنَّ أَبَا عُبَيْدَةَ قَدِمَ بِشَيْءٍ مِنَ الْبَحْرَيْنِ ؟ ))
"আমার মনে হয়, আবু উবাইদাহ বাহরাইন থেকে কিছু (মাল) নিয়ে এসেছে, তোমরা তা শুনেছ।” তারা বলল, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন,
(( أَبْشِرُوا وَأَمِّلُوا مَا يَسُرُّكُمْ، فَوَاللَّهُ مَا الفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ ، وَلَكِنِّي أَخْشَى أَنْ تُبْسَط الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا ، فَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أهْلَكتُهُمْ )).
"সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং তোমরা সেই আশা রাখ, যা তোমাদেরকে আনন্দিত করবে। তবে আল্লাহর কসম! তোমাদের উপর দারিদ্র্য আসবে আমি এ আশংকা করছি না। বরং আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের ন্যায় তোমাদেরও পার্থিব জীবনে প্রশস্ততা আসবে। আর তাতে তোমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যেমন তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। অতঃপর তা তোমাদেরকে ধ্বংস ক'রে দেবে, যেমন তাদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছিল।” (বুখারী ৪০১৫, মুসলিম ২৯৬১নং)
উকুবাহ ইবনে আমের থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (একবার) উহুদের শহীদদের (কবরস্থানের) দিকে বের হলেন এবং যেন জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদেরকে বিদায় জানাবার উদ্দেশ্যে আট বছর পর তাঁদের উপর জানাযা পড়লেন (অর্থাৎ তাঁদের জন্য দুআ করলেন)। তারপর মিম্বরে চড়ে বললেন,
(( إِنِّي بَيْنَ أَيْدِيكُمْ فَرَطٌ وَأَنَا شَهِيدٌ عَلَيْكُمْ وَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الحَوْضُ ، وَإِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَيْهِ مِنْ مَقَامِي هَذَا ، أَلَا وَإِنِّي لَسْتُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا ، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوهَا )) .
"আমি পূর্বে গমনকারী তোমাদের জন্য সুব্যবস্থাপক এবং সাক্ষীও। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান হওযে (কাউসার)। আমি অবশ্যই ওটাকে আমার এই স্থান থেকে দেখতে পাচ্ছি। শোনো! তোমাদের ব্যাপারে আমার এ আশংকা নেই যে, তোমরা শির্ক করবে। তবে তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।”
(সাহাবী বলেন,) 'এটাই আমার শেষ দৃষ্টি ছিল যা আমি নবী -এর প্রতি নিবদ্ধ করেছিলাম (অর্থাৎ, এরপর তিনি দেহত্যাগ করেন)।' (বুখারী ৪০৪২, মুসলিম ৬১১৭)
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে,
(( وَلَكِنِّي أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوا فِيهَا ، وَتَقْتَتِلُوا فَتَهْلِكُوا كَمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ )) .
“কিন্তু তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং সে জন্য পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এবং (পরিণামে) তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে।” উকুবা বলেন, 'মিম্বরের উপরে রাসূলুল্লাহ -কে এটাই ছিল আমার শেষ দর্শন।'
অপর এক বর্ণনায় আছে,
(( إِنِّي فَرَطٌ لَكُمْ وَأَنَا شَهِيدٌ عَلَيْكُمْ وَإِنِّي وَاللَّهِ لأَنْظُرُ إِلَى حَوْضِي الْآنَ، وَإِنِّي أُعْطِيتُ مَفَاتِيحَ خَزَائِنِ الْأَرْضِ، أَوْ مَفَاتِيحَ الأَرْضِ ، وَإِنِّي وَاللَّهِ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا بَعْدِي ، وَلَكِنْ أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تَنَافَسُوا فِيهَا )) .
"আমি তোমাদের অগ্রদূত এবং তোমাদের জন্য সাক্ষী। আল্লাহর শপথ! আমি এই মুহূর্তে আমার হাওয (হওযে কাওসার) দেখছি। আমাকে পৃথিবীর ভান্ডারসমূহের চাবিগুচ্ছ প্রদান করা হয়েছে। আর আমি তোমাদের ব্যাপারে এ জন্য শংকিত নই যে, তোমরা আমার (তিরোধানের) পর শির্ক করবে; বরং এ আশংকা বোধ করছি যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদের ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।”
পার্থিব বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এক প্রকার জুয়া খেলার মতো। প্রত্যেক দানেই জুয়ারী মনে করে, এবার সে জিতবে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, জুয়ারী নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফেরে।
এক দ্বীনী ভাইয়ের কাহিনী। অন্যান্য ভাইদেরকে বিদেশ এসে বড়লোক হতে দেখে সে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামল। এজেন্টের মাধ্যমে টাকা জমা ক'রে প্রতারণার ফাঁদে পা দিল। ফলে তার টাকাও গেল, বিদেশও আসা হল না।
আর এক ভাই তার অযোগ্য ভিসাতে বিদেশ গিয়ে ২/৩ মাস পরে ফিরে এল। অন্যান্যদের মতো অর্থোপার্জনের স্বপ্ন তার স্বপ্নই থেকে গেল। বরং তার কোমর ভেঙ্গে গেল উক্তরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে ছুটতে গিয়ে।
হ্যাঁ, এমনটাই হয়।
'বাণিজ্য করিতে গেল দরিয়ার কূল, কেউ করল দুনো লাভ কেউ হারাল মূল।'
অবশ্যই ভাগ ও ভাগ্য। কিন্তু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হিংসা ও অতিলোভ থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই মূল হারিয়ে কূল হারিয়ে যায়। হাতির মতো লাদদে চাইলে মহিষের কী দশা হয়, তা তো অনুমেয়। 'পরের দেখে তুলো হাঁই, যা আছে তাও নাই।' সুতরাং এ ক্ষেত্রে মহানবী-এর বাণী মনে রাখা দরকার। তিনি বলেছেন,
((انْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ ، فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ
"(দুনিয়ার ধন-দৌলত ইত্যাদির দিক দিয়ে) তোমাদের মধ্যে যে নীচে তোমরা তার দিকে তাকাও এবং যে তোমাদের উপরে তার দিকে তাকায়ো না। যেহেতু সেটাই হবে উৎকৃষ্ট পন্থা যে, তোমাদের প্রতি যে আল্লাহর নিয়ামত রয়েছে তা তুচ্ছ মনে করবে না।” (মুসলিম ৭৬১৯নং)
বুখারীর বর্ণনায় আছে,
((إِذَا نَظَرَ أَحَدُكُمْ إِلَى مَنْ فُضْلَ عَلَيْهِ فِي الْمَالِ وَالْخَلْقِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْهُ
"তোমাদের কেউ যখন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যাকে সম্পদে ও দৈহিক গঠনে তার থেকে বেশি শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে, তখন সে যেন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে এ বিষয়ে তার চেয়ে নিম্নস্তরের।” (বুখারী ৬৪৯০নং)
ক্ষণস্থায়ী এই সংসারে অবৈধ প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা! অন্যায়ভাবে পরকে টেক্কা দেওয়া, তাকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা করা, তাকে পিছে ফেলার মানসিকতা নিয়ে ময়দানে দৌড় দেওয়া আল্লাহর দাসদের কাজ হতে পারে না।
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ'স বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। এমতাবস্থায় যে, আমরা আমাদের একটি কুঁড়েঘর সংস্কার করছিলাম। তিনি বললেন, "এটা কী?” আমরা বললাম, 'কুঁড়ে ঘরটি দুর্বল হয়ে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, তাই আমরা তা মেরামত করছি।' তিনি বললেন,
(( مَا أَرَى الأَمْرَ إِلَّا أَعْجَلَ مِنْ ذَلِكَ ))
"আমি ব্যাপারটিকে (মৃত্যুকে) এর চাইতেও নিকটবর্তী ভাবছি।” (আবু দাউদ ৫২৩৮, তিরমিযী ২৩৩৫নং)
হ্যাঁ, মানুষের জীবন আসলেই সংক্ষিপ্ত। তবুও ভালোরূপে থাকতে হয়। তবে তার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সংক্ষিপ্ত যাত্রার জন্য যেমন কোন কোন যাত্রী গাড়িতে উঠে সিট নিয়ে কলহ করে। কারো পাশে বসলে তার সাথে নানা অসুবিধায় খুটখাট করে। অথচ একটু পরেই তাকে সিট ছেড়ে নেমে যেতে হয়।
একটি গল্প পড়েছিলাম। বাসের একটি সিটে একটি মহিলা বসে ছিল। ঐ সিটে দুইজন যাত্রী বসা যায়। সামনের স্টপেজে একজন মহিলা যাত্রী বাসে উঠলে সে তার পাশে বসল। তার সাথে কিছু ব্যাগ-পত্র বেশি ছিল। তাতে আগের মহিলা কষ্ট পেতে লাগল। বসার শ্রীও ছিল বিশ্রী। বাসে একজন পরিচিত পুরুষ ছিল। সে তার হয়ে প্রতিবাদ করলে সে তাকে বলল, 'ছাড়ো না। সংক্ষিপ্ত যাত্রা। আমি আগের স্টপেজে নেমে যাব।'
'সংক্ষিপ্ত যাত্রা' কথাটি স্বর্ণাক্ষরে লেখার উপযুক্ত। প্রত্যেকটি মানুষ যদি এই ছোট্ট কথাটি নিজের মনের মণিকোঠায় স্থান দেয়, তাহলে নিশ্চয় সে কোন বিষয়ে কারো প্রতি হিংসা করবে না, কারো অভব্য আচরণে ধৈর্যচ্যুত হবে না, তুচ্ছ ব্যাপারে অন্যের অন্যায়াচরণে কলহ করবে না, প্রতিবেশীর এক ফুট জায়গা, শিশু-কলহ, অথবা হাস-মুরগী নিয়ে ঝগড়া করবে না।
প্রত্যেক তুচ্ছ বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং অপরের সাথে বাদানুবাদে লিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
আমাদের প্রত্যেকেই যদি সতর্ক হয় যে, আমরা আসলে সফরের যাত্রী এবং আমাদের যাত্রা অতি সংক্ষিপ্ত, তাহলে আমাদের কেউ কারো প্রতি যুলুম করবে না, কলহ-বিবাদ করবে না। অন্যের অসদাচরণে ক্ষমাশীলতা প্রদর্শন করবে। সহমর্মিতা ও সৌজন্যবোধ প্রয়োগ করবে। চরিত্রবান হতে সচেষ্ট হবে। অল্পে তুষ্ট হবে এবং যা পেয়েছে তার কৃতজ্ঞতা আদায়ে প্রয়াসী হবে। আর তাহলেই আমরা ভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাব।
কেউ আপনার মন ভেঙ্গেছে? প্রকৃতিস্থ থাকুন। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
কেউ আপনার খিয়ানত করেছে? কেউ আপনার সাথে প্রতারণা করেছে? কেউ আপনাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছে? উত্তেজিত হবেন না। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
কেউ আপনার প্রতি যুলুম করেছে? যুলুম যত বড়ই হোক না, আপনি ধৈর্যশীল হন। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
কেউ আপনার প্রতি নেমকহারামি করেছে? আপনি প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
কেউ আপনার অধিকার হরণ করেছে? কেউ আপনার অসম্মান ও অপমান করেছে? দুঃখিত হবেন না। উদার হন। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
ক্ষমাশীলতা ও সৌজন্যবোধ চরিত্রবানদের গুণ। অসদাচারীদের আচরণে মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
'যাত্রা অতি সংক্ষিপ্ত।' আর এর পরে আর কেউ এখানে যাত্রী হতে আসবে না। কেউ জানে না, তার যাত্রার সময় কতটুক? যাত্রা তো অবশ্যই শেষ হবে। সুতরাং মানুষের উচিত, পরস্পরের জন্য ধৈর্যধারণ করা, ক্রোধ সংবরণ করা, সহিষ্ণুতা অবলম্বন করা, উদারতা ও ক্ষমাশীলতা প্রয়োগ করা। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।' সকলকেই মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
প্রত্যেক মানুষের মনে বিশ্বকবির এই অনুভূতি থাকা প্রয়োজন,
'যাত্রী আমি ওরে পারবে না কেউ রাখতে আমায় ধরে। দুঃখসুখের বাঁধন সবই মিছে বাঁধা এ ঘর রইবে কোথায় পিছে--- বিষয়-বোঝা টানে আমায় নীচে, ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে যাবে পড়ে।'
ক্ষণস্থায়ী এ সংসারে প্রতিদ্বন্দ্বী মন রেখে লাভ কী হবে? সংক্ষিপ্ত এ যাত্রা শেষ হলে তরী ছেড়ে নেমে যেতে হবে যথা সময়ে।
'যাত্রী আছে নানা। নানা ঘাটে যাবে তারা, কেউ কারো নয় জানা। তুমিও গো ক্ষনেক-তরে বসবে আমার তরী-'পরে যাত্রা যখন ফুরিয়ে যাবে মানবে না মোর মানা। এলে যদি তুমিও এসো। যাত্রী আছে নানা।।'
তবে হ্যাঁ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা করুন ভালোর জন্য; বরং হিংসা করুন তাতে দোষ নেই। মহানবী বলেছেন,
(لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ : رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالاً ، فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الحَقِّ ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ حِكْمَةً ، فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا )).
“কেবলমাত্র দু'টি বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় (১) ঐ ব্যক্তির প্রতি যাকে মহান আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, অতঃপর তাকে হক পথে অকাতরে দান করার ক্ষমতা দান করেছেন এবং (২) ঐ ব্যক্তির প্রতি যাকে মহান আল্লাহ হিকমত দান করেছেন, অতঃপর সে তার দ্বারা ফায়সালা করে ও তা শিক্ষা দেয়।” (বুখারী ৭৩, মুসলিম ১৯৩০নং)
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন জান্নাতের মহলের জন্য, যার দেওয়াল স্বর্ণ-রৌপ্যের, যার উদ্যান নয়নাভিরাম।
দুনিয়ার রূপসী প্রেমিকার জন্য নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা করুন অনন্ত যৌবনা হুরীর জন্য, যার রূপ-সৌন্দর্য অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়।
মহান প্রতিপালক বলেছেন, {سَابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا كَعَرْض السَّمَاء وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاء وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ} (২১) سورة الحديد
"তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততার মত, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণে বিশ্বাসীদের জন্য। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে তা দান করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।” (হাদীদ : ২১)
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ} (১৩৩) سورة آل عمران
"তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং বেহেশতের জন্য, যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা ধর্মভীরুদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।" (আলে ইমরান : ১৩৩)
{إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ (۲۲) عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ (۲۳) تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ (٢٤) يُسْقَوْنَ مِنْ رَحِيقٍ مَخْتُومٍ (٢٥) خِتَامُهُ مِسْك وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ} (٢٦) سورة المطففين
"পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে। তারা সুসজ্জিত আসনে বসে দেখতে থাকবে। তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবে। তাদেরকে মোহর আঁটা বিশুদ্ধ মদিরা হতে পান করানো হবে। এর মোহর হচ্ছে কস্তুরীর। আর তা লাভের জন্যই প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক।” (মুত্বাফফিফীন : ২২-২৬)
📄 জীবনের নানা সমস্যা ও ব্যস্ততা
জীবনের নানা সমস্যা আমাদেরকে জীবনের উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দিয়েছে।
সাংসারিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা, রুযীরুটির ব্যস্ততা, রোগ-জ্বালার বিরক্তি ইত্যাদি অনেক মানুষকেই আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
অনেকে বলে, 'ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ধর্মের বাণী শুনাইয়ো না।' তাদের ধারণা, পেটে ক্ষুধা থাকলে ধর্ম পালন করতে হয় না। অথচ যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর সামনেও আল্লাহর ইবাদত মাফ নয়।
অনেকে বলে, 'সারা দিনটা খেটেখুটে মাইনের বেলায় দু-আনা, আল্লাহ বলে ডাকব কি ভাই সময় পেলাম না।' অথচ যথা সময়ে সময় না পেলেও পরবর্তী অবসর সময়েও ইবাদত কাযা করা যায়। সারা দিনটার চব্বিশ ঘন্টাই কেউ খাটাখাটনি করে না।
নামায পড়েন না কেন? বাপ! আমার উযু থাকে না গো। রোগের জ্বালায় নামায পড়া হয় না বাবা! নামায পড়ার সময় হয় না বাপধন!
রোযা রাখেন না কেন? ভাই! আমার গ্যাস আছে গো। রোযা রাখলে চাষ করতে পারব না। গতরে না খাটলে পেট চলবে না।
কোন ইবাদত যথা সময়ে পালন করতে কেউ অক্ষম হলে তার বিকল্প ব্যবস্থা ও পদ্ধতি আছে। তবুও উক্ত প্রকার কোন অজুহাত দিয়ে ইবাদত মাফ নয়। মানুষের জ্ঞান থাকতে ইবাদত থেকে অব্যাহতি নেই। ইবাদত মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য।
বলা বাহুল্য, পার্থিব নানা সমস্যা, কষ্ট বা কর্মব্যস্ততার মাঝেও ইবাদতের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। সুমহান স্রষ্টার দাস যারা, তারা খোঁড়া অজুহাত দেখাবে না। তিনি অন্তরের খবর জানেন, তিনি কারো অচল ছল-বাহানা ক্ষমা করবেন না। প্রণিধান করুন:-
{فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللهِ وَكَرِهُوا أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَالُوا لَا تَنفِرُوا فِي الْحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَّوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ} (৮১)
"যারা (তাবুক অভিযানে) পশ্চাতে রয়ে গেল, তারা রসূলের বিরুদ্ধাচরণ ক'রে বসে থাকতে আনন্দবোধ করল এবং তারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করাকে অপছন্দ করলো। অধিকন্তু বলতে লাগল, 'তোমরা গরমে (জিহাদে) বের হয়ো না।' তুমি বলে দাও, 'জাহান্নামের আগুন (এর চেয়ে) অধিকতর গরম'; যদি তারা বুঝতে পারত!” (তাওবাহঃ ৮১)
{يَعْتَذِرُونَ إِلَيْكُمْ إِذَا رَجَعْتُمْ إِلَيْهِمْ قُل لَّا تَعْتَذِرُوا لَن نُّؤْمِنَ لَكُمْ قَدْ نَبَّأَنَا اللَّهُ مِنْ أَخْبَارِكُمْ وَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (৯৪) سورة التوبة
"যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তারা তোমাদের কাছে অজুহাত পেশ করবে। তুমি বলে দাও, তোমরা অজুহাত পেশ করো না; আমরা কখনই তোমাদেরকে বিশ্বাস করব না। আল্লাহ আমাদেরকে তোমাদের খবর জানিয়ে দিয়েছেন। আর ভবিষ্যতেও আল্লাহ এবং তাঁর রসূল তোমাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে এমন সত্তার কাছে যিনি অদৃশ্য এবং প্রকাশ্য সকল বিষয়ই অবগত আছেন, অনন্তর তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে।” (তাওবাহঃ ৯৪)
{سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ شَغَلَتْنَا أَمْوَالُنَا وَأَهْلُونَا فَاسْتَغْفِرْ لَنَا يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ قُلْ فَمَن يَمْلِكُ لَكُم مِّنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ بِكُمْ ضَرًّا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ نَفْعًا بَلْ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا} (১১) سورة الفتح
"(যুদ্ধ থেকে) পশ্চাতে থাকা মরুবাসীরা তোমাকে বলবে, 'আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন আমাদেরকে ব্যস্ত রেখেছিল, অতএব আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।' তারা মুখে তা বলে, যা তাদের অন্তরে নেই। তাদেরকে বল, 'আল্লাহ তোমাদের কারো কোন ক্ষতি কিংবা মঙ্গল চাইলে কে তাঁকে নিবৃত্ত করতে পারে? বস্তুতঃ তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত।” (ফাতহঃ ১১)
{وَإِذْ قَالَت طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِن يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا} (۱۳) سورة الأحزاب
"ওদের একদল বলেছিল, 'হে ইয়াসরিব (মদীনা) বাসিগণ! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই; তোমরা ফিরে চল।' আর ওদের মধ্যে একদল নবীর নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা ক'রে বলেছিল, 'আমাদের বাড়ী-ঘর অরক্ষিত।' যদিও ওগুলি অরক্ষিত ছিল না। আসলে পলায়ন করাই ছিল ওদের উদ্দেশ্য।” (আহযাবঃ ১৩)
মহান সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির মনের খবর জানেন। আর অচল ওযর পেশকারী মানুষও মনের গোপন অন্তরালে জানে যে, সে আসলেই অপরাধী। তিনি বলেছেন,
{بَلِ الْإِنسَانُ عَلَى نَفْسِهِ بَصِيرَةٌ (١٤) وَلَوْ أَلْقَى مَعَاذِيرَهُ} (١٥) سورة القيامة
"বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত। যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে।” (ক্বিয়ামাহঃ ১৪-১৫)
সুতরাং নানা মিথ্যা অজুহাতে দাসত্ব ও আনুগত্য করতে ফাঁকি দেওয়া দাসকে যে শাস্তি পেতেই হবে, সে কথা অতি সহজে অনুমেয়।
কর্মব্যস্ততা আল্লাহর ইবাদতে বাধা সৃষ্টি করে। আবার আল্লাহর ইবাদতও ব্যস্ততাময় জীবনকে সহজ ক'রে দেয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ} (٤٠) سورة الحج
"আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন, যে তাঁকে (তাঁর দ্বীনকে) সাহায্য করে।" (হাজ্জঃ ৪০)
আল্লাহর রসূল বলেছেন,
((يقول ربكم تبارك وتعالى : يا ابن آدم تفرغ لعبادتي أملأ قلبك غنى، وأملأ يديك رزقا ، يا ابن آدم لا تباعد مني فأملأ قلبك فقرًا، وأملأ يديك شغلاً)).
“তোমাদের প্রতিপালক বলেন, 'হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতে নিরত হও, আমি তোমার হৃদয়কে ধনবত্তায় এবং উভয় হাতকে রুযীতে ভরে দেব। হে আদম সন্তান! আমার নিকট থেকে দূরে সরে যেয়ো না। নচেৎ তোমার হৃদয়কে অভাব দিয়ে এবং উভয় হাতকে কর্মব্যস্ততা দিয়ে ভরে দেব।” (হাকেম ৭৯২৬, ত্বাবারানী ১৬৮৯৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৩৫৯নং)