📄 পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য
যাদের পরকালে বিশ্বাস নেই, তারা তো পার্থিব এই জীবনকেই সব কিছু ও শেষ ধারণা করে। সুতরাং তারা যে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝতে সক্ষম হয়েছে, তা অবশ্যই নয়। এ কথা তাদের কথাবার্তা ও আচরণে স্পষ্ট। যেমন তারা বলে,
'দুনিয়াটা মস্ত বড় খাও-দাও ফুর্তি কর আগামী কাল বাঁচবে কি না বলতে পারো?'
তারা বলে,
'এই বেলা ভাই মদ খেয়ে নাও কাল নিশিথের ভরসা কই, চাঁদনী জাগিবে যুগ-যুগ ধরে আমরা তো আর রব না সই!' 'মিশ্ব ধুলায় তার আগেতে সময়টুকুর সদ্-ব্যভার, স্ফূর্তি ক'রে নাই করি কেন দিন কয়েকেই সব কাবার?'
কিন্তু যারা মরণের পরপারের জীবনকে বিশ্বাস করে, তাদেরও অধিকাংশই পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেয়। ফলে সুমহান প্রভুর দাসত্বের মর্যাদা লাভে বাধাপ্রাপ্ত হয় তারা। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়, তারা যেন এই পৃথিবীতে চিরকাল জীবিত থাকবে।
সুমহান স্রষ্টা মানুষের সেই অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন কুরআনে। হুদ নবী তাঁর জাতি আদকে বলেছিলেন,
{ أَتَبْنُونَ بِكُلِّ رِيعٍ آيَةً تَعْبَثُونَ (۱۲۸) وَتَتَّخِدُّونَ مَصَانِعَ لَعَلَّكُمْ تَخْلُدُونَ (۱۲۹) وَإِذَا بَطَشْتُمْ بَطَشْتُمْ جَبَّارِينَ} (۱۳۰) سورة الشعراء
"তোমরা তো প্রতিটি উচ্চস্থানে অযথা ইমারত (স্তম্ভ) নির্মাণ করছ (পথিকের সাথে হাসি-তামাশা করার জন্য); তোমরা প্রাসাদ নির্মাণ করছ এ মনে করে যে, তোমরা (পৃথিবীতে) চিরস্থায়ী হবে। আর যখন তোমরা আঘাত হানো, তখন নিষ্ঠুরভাবে আঘাত হেনে থাক।” (শুআ'রাঃ ১২৮-১৩০)
মহান আল্লাহ বলেছেন,
"বরং তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে থাক।” (আ'লাঃ ১৬)
{بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا} (١٦) سورة الأعلى
{يَحْسَبُ أَنَّ مَالَهُ أَخْلَدَهُ) (۳) سورة الهمزة
"সে ধারণা করে যে, তার অর্থ তাকে অমর ক'রে রাখবে।” (হুমাযাহঃ ৩)
{كَلَّا بَلْ تُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ} (٢٠) سورة القيامة
“না, তোমরা বরং ত্বরান্বিত (পার্থিব) জীবনকে ভালবাসা।” (ক্বিয়ামাহ : ২০)
{وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمَا} (২০) سورة الفجر
“তোমরা ধন-সম্পদকে অত্যধিক ভালোবেসে থাক।” (ফাজর: ২০)
{وَإِنَّهُ لِحُبِّ الْخَيْرِ لَشَدِيدٌ) (৮) سورة العاديات
“অবশ্যই সে ধন-সম্পদের আসক্তিতে অত্যন্ত প্রবল।” (আদিয়াত: ৮)
{إِنَّ هَؤُلَاءِ يُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ وَيَذَرُونَ وَرَاءهُمْ يَوْمًا ثَقِيلًا} (২৭) سورة الإنسان
“নিশ্চয় তারা ত্বরান্বিত (পার্থিব) জীবনকে ভালবাসে এবং তারা পরবর্তী কঠিন দিবসকে উপেক্ষা ক'রে চলে।” (দাহরঃ ২৭)
প্রত্যেক মানুষের কাম্য পার্থিব সুখ-সমৃদ্ধি, আর্থিক ঋদ্ধি-বৃদ্ধি। কিন্তু অনেকে তাতে হালাল-হারামের তমীয ও তোয়াক্কাই করে না। যেহেতু দুনিয়াতে তাদেরকে প্রতিষ্ঠা লাভ করতেই হবে।
অনেকে চায় নেতৃত্ব, যশ, খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি, যার মাধ্যমে তারা পৃথিবীতে পুরস্কৃত হয় এবং মানুষের মাঝে সম্যক প্রতিষ্ঠা লাভে সফল হয়।
অভিনয়, খেলাধূলা, গান-বাজনাকে মাধ্যম বানিয়েও পার্থিব সুখ ও বিলাসিতা লাভের আশা করে অনেকে। বৈধতা-অবৈধতার খেয়াল রাখা হয় না সেখানে।
পার্থিব সুখের একটি চাবিকাঠি হল একটি মনোমতো সঙ্গী। সেই সঙ্গী নির্বাচন তথা বিবাহের সময়ও দুনিয়াকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।
যেখানে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عريض)).
"তোমাদের নিকট যখন এমন ব্যক্তি (বিবাহের পয়গাম নিয়ে) আসে; যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা মুগ্ধ তখন তার সাথে (মেয়ের) বিবাহ দাও। যদি তা না কর তাহলে পৃথিবীতে ফিৎনা ও মহাফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যাবে।” (তিরমিযী ১০৮-৪, ইবনে মাজাহ ১৯৬৭, মিশকাত ৩০৯০, সিঃ সহীহাহ ১০২২নং)
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأَرْبَعِ لِمَالِهَا وَلِحَسَبهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ».
"মহিলার চারটি জিনিস দেখে বিবাহ করা হয়; তার সম্পদ, উচ্চ বংশ, রূপ ও দ্বীন দেখে। তুমি দ্বীনদার মহিলা পেতে সফল হও, তোমার হাত ধূলিধূসরিত হোক।” (বুখারী ৫০৯০, মুসলিম ৩৭০৮-নং)
সেখানে অনেক মানুষের বাস্তবতা তার বিপরীত। দ্বীনহীন অর্থশালী পাত্র পছন্দ করে এবং প্রতিবাদ করলে বা উপদেশ দিলে বলে, 'পরে দ্বীনদার হয়ে যাবে।'
বেনামাযী হলে বলে, 'পরে নামায ধরবে।'
পক্ষান্তরে দ্বীনদার গরীব পাত্র পছন্দ ক'রে এ কথা বলে না যে, 'পরে ধনী হয়ে যাবে।' মোটকথা, পছন্দের ক্ষেত্রে পার্থিব বিষয়কেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। আর অভিভাবকের সাথে অধিকাংশ তরুণীর বাস্তবতা বলে, 'রসের নাগর, রূপের সাগর, যদি ধন পাই, আদর ক'রে করি তারে বাপের জামাই।'
সন্তান প্রতিপালনে আমাদের প্রবণতা দুনিয়াদারি। ইসলামী শিক্ষাকে গুরুত্ব ও প্রাধান্য না দিয়ে পার্থিব সুখের খোঁজে সন্তানকে স্কুল-কলেজে পাঠাই।
অনেকে সউদী আরবে পড়তে পাঠাতে চায় দুনিয়ার জন্যই। আবার অনেকে সউদিয়ায় বসবাস ক'রে এম্বেসি স্কুলে অথবা দেশে পাঠিয়ে পড়াতে চায় সেই দুনিয়ার জন্যই।
সরকারী স্কুল ছেড়ে বেসরকারী মিশন বা স্কুলে পড়াতে চায়, বিলেতে পড়াতে চায় একই কারণে।
এমনকি দ্বীনী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসায় পড়াতে চায় সেই দুনিয়ার জন্যই।
কওমী মাদ্রাসায় পড়ে সরকারী চাকরী পাওয়া যায় না বলে অনেকে পড়তে চায় না, সেই দুনিয়ার জন্যই। বুখারী পড়াতে পড়াতে সরকারী চাকরী পেলে কায়দা পড়াতে চলে যান অনেক শিক্ষক, সেই দুনিয়ার জন্যই।
এই জন্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অনেকানেক শিক্ষিত তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু মানুষ তৈরি হয় নেহাতই কম, সেই পার্থিব জীবনের ভোগ-বিলাসকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য।
শিশুর প্রাথমিক জীবনের ভাবনা নিয়ে একজন কবি কত সুন্দরই না বলেছেন,
'বাবার ইচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার মায়ের ইচ্ছে ডাক্তারি, দাদুর ইচ্ছে উকীল হব নানুর ইচ্ছে মাস্টারি। ইচ্ছেগুলি কেমন যেন ভেবেই আমি থ, কেউই আমায় বলল না তো 'খোকা মানুষ হ'।'
অধিকাংশ মানুষের মন যেন নগদ পাওয়ার পক্ষপাতী। দুনিয়ার সত্বর লাভকে প্রাধান্য দিতে অভ্যস্ত প্রায় সবাই। তাদের অবস্থার জিভ যেন বলে,
'নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকীর খাতা শূন্য থাক, দূরের আওয়াজ লাভ কি শুনে মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক।'
মানুষের দুনিয়াদারির বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে এক কবি বলেছেন,
'মুনির চিন্তা চিন্তামণি নাই অন্য আশা, নিষ্কর্মা লোকের চিন্তা তাস আর পাশা। ধনীর চিন্তা ধন আর নিরানব্বয়ের ধাক্কা, যোগীর চিন্তা জগন্নাথ, ফকীরের চিন্তা মক্কা। গৃহস্থের চিন্তা বজায় রাখতে চারি চালের ঠাট্টা, শিশুর চিন্তা সদাই মা-কে, পশুর চিন্তা পেটটা।'
পার্থিব সুখ-সম্ভোগই মানুষের অভীষ্ট। যথাসাধ্য পরিপূর্ণরূপে দুনিয়ার সুখ ভোগ করতেই হবে। তাতে সাধুতা-সততা না থাকলেও বাধা নেই, অপরকে দুঃখ-কষ্ট দিয়ে হলেও কোন সমস্যা নেই!
আর যারা উক্ত অভীষ্ট লাভে সক্ষম হয় না, তারা ভাবে, তারা স্রষ্টা কর্তৃক অত্যাচারিত। তারা জানে না তাদের জীবনে উদ্দেশ্য কী? সুখ-সম্ভোগ ছাড়া বুঝে না তাদের কর্তব্য কী? তবে তারা প্রধান শত্রু মৃত্যুকে ভয় করে। কিন্তু মরণের পরপারে কী হবে তার ধারণা, বিশ্বাস বা তোয়াক্কা রাখে না।
পার্থিব জীবনের নানা সমস্যা আমাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী?
সাংসারিক, রাজনৈতিক ও রুযীরুটির নানা বিষয় অনেককে জীবনের উদ্দেশ্য বোঝার তওফীক থেকে বঞ্চিত রেখেছে।
মানুষ যে পার্থিব বিষয়াবলীকে প্রাধান্য দিয়ে পরকালের বিষয়াবলীকে ভুলে আছে এবং সুমহান প্রভুর দাসত্ব থেকে দূরে সরে আছে, সে কথা স্বয়ং প্রভুই বলেছেন। আর বাস্তব এই যে, মানুষ পার্থিব সৌন্দর্য দর্শন ক'রে পরকালের জীবনকে বিস্মৃত হয়েছে। তাই সেই বাস্তবতা আল-কুরআনের বহু জায়গায় উল্লিখিত হয়েছে। আমি কেবল কিছু আয়াত উল্লেখ ক'রে পাঠকের বিবেক ও বিচারের কাছে সেগুলির বক্তব্য অনুধাবন করার আবেদন জানাব।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاء وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَابِ}
"নারী, সন্তান-সন্ততি, জমাকৃত সোনা-রূপার ভান্ডার, পছন্দসই (চিহ্নিত) ঘোড়া, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট লোভনীয় করা হয়েছে। এ সব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর নিকটেই উত্তম আশ্রয়স্থল রয়েছে।" (আলে ইমরানঃ ১৪)
{وَذْرِ الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَهُمْ لَعِبًا وَلَهْوًا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَذَكِّرْ بِهِ أَن تُبْسَلَ نَفْسٌ بِمَا كَسَبَتْ لَيْسَ لَهَا مِن دُونِ اللَّهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ وَإِن تَعْدِلْ كُلَّ عَدْلٍ لَّا يُؤْخَذْ مِنْهَا أُوْلَئِكَ الَّذِينَ أُبْسِلُوا بِمَا كَسَبُوا لَهُمْ شَرَابٌ مِّنْ حَمِيمٍ وَعَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْفُرُونَ} (৭০)
"যারা তাদের ধর্মকে ক্রীড়াকৌতুকরূপে গ্রহণ করে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে প্রতারিত করে, তুমি তাদের সঙ্গ বর্জন কর এবং এ (কুরআন) দ্বারা তাদের উপদেশ দাও, যাতে কেউ নিজ কৃতকর্মের জন্য ধ্বংস না হয়, যখন আল্লাহ ব্যতীত তার কোন অভিভাবক ও সুপারিশকারী থাকবে না এবং বিনিময়ে সব কিছু দিলেও তা গৃহীত হবে না। এরাই নিজ কৃতকার্যের জন্য ধ্বংস হবে। তাদের অবিশ্বাস হেতু তাদের জন্য রয়েছে উত্তপ্ত পানীয় ও মর্মন্তুদ শাস্তি।” (আনআমঃ ৭০)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ اثَّاقَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ أَرَضِيتُم بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنَ الآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ} (৩৮)
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের কী হলো যে, যখন তোমাদেরকে আল্লাহর পথে (জিহাদে) বের হতে বলা হয়, তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে মাটিতে বসে পড়। তবে কি তোমরা পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন নিয়ে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? বস্তুতঃ পার্থিব জীবনের ভোগবিলাস তো পরকালের তুলনায় অতি সামান্য।” (তাওবাহঃ ৩৮)
{فَلَمَّا أَنجَاهُمْ إِذَا هُمْ يَبْغُونَ فِي الأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا بَغْيُكُمْ عَلَى أَنفُسِكُم مَّتَاعَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ثُمَّ إِلَيْنَا مَرْجِعُكُمْ فَتُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (২৩) সূরা ইউনুস
"অতঃপর যখনই আল্লাহ তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করতে থাকে। হে লোক সকল! (শুনে রাখ) তোমাদের বিদ্রোহাচরণ তোমাদেরই (জন্য ক্ষতিকর) হবে, (এ হল) পার্থিব জীবনের উপভোগ্য, তারপর আমারই দিকে তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের যাবতীয় কৃতকর্ম জানিয়ে দেব।” (ইউনুসঃ ২৩)
{اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاء وَيَقْدِرُ وَفَرِحُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلا مَتَاعٌ} (২৬) সূরা আর রাদ
"আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন, তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং সংকুচিত করেন। কিন্তু তারা পার্থিব জীবন নিয়েই উল্লসিত; অথচ ইহজীবন তো পরজীবনের তুলনায় নগণ্য ভোগ মাত্র।” (রা'দঃ ২৬)
{الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا} (৪৬) সূরা আল কাহফ
"ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা। আর সৎকার্য, যার ফল স্থায়ী ওটা তোমার প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং আশা প্রাপ্তির ব্যাপারেও উৎকৃষ্ট।” (কাহফঃ ৪৬)
{وَمَا أُوتِيتُم مِّن شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا وَمَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى أَفَلَا تَعْقِلُونَ} (৬০) سورة القصص
“তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও সৌন্দর্য এবং যা আল্লাহর নিকট আছে, তা উত্তম এবং স্থায়ী। তোমরা কি অনুধাবন করবে না?” (ক্বাস্বাস্বঃ ৬০)
{فَمَا أُوتِيتُم مِّن شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى لِلَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ} (৩৬) سورة الشورى
"বস্তুতঃ তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা পার্থিব জীবনের ভোগ; কিন্তু আল্লাহর নিকট যা আছে, তা উত্তম ও চিরস্থায়ী তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে ও তাদের প্রতিপালকের ওপর নির্ভর করে।" (শূরাঃ ৩৬)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( مَا الدُّنْيَا فِي الآخِرَةِ إِلَّا مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ أَصْبُعَهُ فِي اليَمِّ ، فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ )).
"আখেরাতের মুকাবেলায় দুনিয়ার দৃষ্টান্ত ঐরূপ, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে আঙ্গুল ডুবায় এবং (তা বের ক'রে) দেখে যে, আঙ্গুলটি সমুদ্রের কতটুকু পানি নিয়ে ফিরছে।” (মুসলিম ৭৩৭৬নং)
পরকালের জীবন, অনন্ত কালের জীবন। মানুষ পৃথিবীর এই ৬০/৭০/১০০ বছরের জীবন পেয়ে সেই অনন্ত কালের জীবনকে ভুলে বসেছে। বিস্মৃত হয়েছে এ জীবনের প্রকৃতত্ব সম্বন্ধে।
এ দুনিয়ার যে কোন মূল্য নেই, তা অনেকেরই ধারণা নেই। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ الله جَنَاحَ بَعُوضَةٍ ، مَا سَقَى كَافِراً مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ )).
"যদি আল্লাহর নিকট মশার ডানার সমান দুনিয়ার (মূল্য বা ওজন) থাকত, তাহলে তিনি কোন কাফেরকে তার (দুনিয়ার) এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।” (তিরমিযী ২৩২০, ইবনে মাজাহ ৪১১০, মিশকাত ৫১৭৭ নং)
এ দুনিয়া যে অভিশপ্ত, তা হয়তো অনেকের জানা নেই। মহানবী বলেছেন,
أَلا إِنَّ الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ ، مَلْعُونَ مَا فِيهَا ، إِلَّا ذِكْرَ اللهِ تَعَالَى، وَمَا وَالاهُ، وَعَالِماً وَمُتَعَلِّماً)).
“শোনো! নিঃসন্দেহে দুনিয়া অভিশপ্ত। অভিশপ্ত তার মধ্যে যা কিছু আছে (সবই)। তবে আল্লাহর যিক্র এবং তার সাথে সম্পৃক্ত জিনিস, আলেম ও তালেবে-ইলম নয়।” (তিরমিযী ২৩২২, ইবনে মাজাহ ৪১১২, বাইহাকী, সহীহ তারগীব ৭০নং)
((الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ مَلْعُونٌ ما فيها إلا ما ابتغي به وجه الله عز وجل)).
"পৃথিবী অভিশপ্ত এবং অভিশপ্ত তার মধ্যে যা কিছু আছে সে সকল (পার্থিব বিষয় ও) বস্তুও। তবে সেই বস্তু (বা কর্ম) নয় যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আশা করা হয়।” (ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব ৯নং)
অনেকে হয়তো জানে না, দুনিয়ার এ জীবন হল সুখ-দুঃখ মিশ্রিত ঘোলা পানির মতো। আর পরকালের জীবন হল দুঃখ-কষ্টহীন স্বচ্ছ পানির মতো। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((إنَّ اللهَ تَعالى جَعَلَ الدُّنْيَا كُلها قليلاً وما بَقِي منها إلا القَلِيلُ كَالتَّعْبِ شُرِبَ صَفْوهُ وبَقِي كَدَرُهُ)).
"মহান আল্লাহ সমগ্র দুনিয়াকেই বানিয়েছেন সামান্য। আর দুনিয়ার যা অবশিষ্ট আছে তা সামান্য। তা হলো সেই পুকুরের মতো, যার স্বচ্ছ পানিটুকু পান করা হয়েছে এবং ঘোলা পানিটুকু অবশিষ্ট রয়েছে।” (হাকেম ৭৯০৪, সিঃ সহীহাঃ ১৬২৫ সহীহুল জামে' ১৭৩৭, বুখারী ২৯৬৪নং)
দুনিয়ার সৃষ্টিকর্তা দুনিয়ার জীবনের উপমা পেশ করেছেন। এ জীবন হল সবুজ ফসলের মতো, যা সাময়িক নয়নাভিরাম থাকে। অতঃপর পেকে হলুদ হলে নষ্ট হয়ে যায় অথবা কেটে নেওয়া হয়। তিনি বলেছেন,
{إِنَّمَا مَثَلُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاء أَنزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاء فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ مِمَّا يَأْكُلُ النَّاسُ وَالْأَنْعَامُ حَتَّى إِذَا أَخَذَتِ الأَرْضُ زُخْرُفَهَا وَازَّيَّنَتْ وَظَنَّ أَهْلُهَا أَنَّهُمْ قَادِرُونَ عَلَيْهَا أَتَاهَا أَمْرُنَا لَيْلاً أَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنَاهَا حَصِيدًا كَأَن لَّمْ تَغْنَ بِالأَمْسِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ} (২৪) سورة يونس
"বস্তুতঃ পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত তো বৃষ্টির মত, যা আমি আসমান হতে বর্ষণ করি। অতঃপর তার দ্বারা উৎপন্ন হয় ভূপৃষ্ঠের উদ্ভিদগুলো অতিশয় ঘন হয়ে, যা হতে মানুষ ও পশুরা ভক্ষণ করে। অতঃপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে এবং তার মালিকরা মনে করে যে, তারা এখন তার পূর্ণ অধিকারী, তখন দিনে অথবা রাতে তার উপর আমার (আযাবের) আদেশ এসে পড়ে, সুতরাং আমি তা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিই, যেন গতকাল তার অস্তিত্বই ছিল না। এরূপেই আয়াতগুলোকে আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বিশদরূপে বর্ণনা ক'রে থাকি।” (ইউনুসঃ ২৪)
{وَاضْرِبْ لَّهُم مَّثَلَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاء أَنزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاء فَٱخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ فَأَصْبَحَ هَشِيمًا تَذْرُوهُ الرِّيَاحُ وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ مُّقْتَدِرًا} (٤٥) سورة الكهف
"তাদের কাছে পেশ কর উপমা পার্থিব জীবনের; এটা পানির ন্যায় যা আমি বর্ষণ করি আকাশ হতে, যার দ্বারা ভূমির উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদ্গত হয়। অতঃপর তা বিশুষ্ক হয়ে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস ওকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।” (কাহফঃ ৪৫)
দুনিয়ার এ জীবন হল ধোঁকাবাজ প্রতারক। ছলনাময় সুখ-সম্ভোগ। তিনি বলেছেন,
{كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُور} (١٨٥) سورة آل عمران
"জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় প্রদান করা হবে। সুতরাং যাকে আগুন (দোযখ) থেকে দূরে রাখা হবে এবং (যে) বেহেস্তে প্রবেশলাভ করবে, সেই হবে সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (আলে ইমরানঃ ১৮৫)
পার্থিব এ জীবন হল এক প্রকার খেলা। খেলা শেষ হলে যেমন ঘরে ফিরতে হয়, তেমনি এ জীবন শেষ হলে আমাদের আসল ঘরে ফিরতে হবে। তিনি বলেছেন,
{وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَالدَّارُ الآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ} (۳۲)
"আর পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক বই আর কিছুই নয় এবং যারা সাবধানতা অবলম্বন করে, তাদের জন্য পরকালের আবাসই শ্রেয়, তোমরা কি (তা) অনুধাবন কর না?” (আনআমঃ ৩২)
{وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ}
"এ পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। আর পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন; যদি ওরা জানত।” (আনকাবুতঃ ৬৪)
{إِنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَإِن تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا يُؤْتِكُمْ أُجُورَكُمْ وَلَا يَسْأَلُكُمْ أَمْوَالَكُمْ}
"পার্থিব জীবন তো শুধু খেল-তামাশা মাত্র। যদি তোমরা বিশ্বাস কর ও আল্লাহ-ভীরুতা অবলম্বন কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে পুরস্কার দেবেন। আর তিনি তোমাদের ধন-সম্পদ চান না।” (মুহাম্মাদঃ ৩৬)
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُور (২০) سورة الحديد
"তোমরা জেনে রেখো যে, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব প্রকাশ, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। এর উপমা বৃষ্টি; যার দ্বারা উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা টুকরা-টুকরা (খড়-কুটায়) পরিণত হয় এবং পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (হাদীদঃ ২০)
এ দুনিয়া মহান স্রষ্টার নিকট মৃত ছাগল-ছানা অপেক্ষা মূল্যহীন, তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট। জাবের বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ বাজারের পাশ দিয়ে গেলেন। এমতাবস্থায় যে, তাঁর দুই পাশে লোকজন ছিল। অতঃপর তিনি ছোট কানবিশিষ্ট একটি মৃত ছাগল ছানার পাশ দিয়ে গেলেন। তিনি তার কান ধরে বললেন, "তোমাদের কেউ কি এক দিরহামের পরিবর্তে এটাকে নেওয়া পছন্দ করবে?” তাঁরা বললেন, 'আমরা কোন জিনিসের বিনিময়ে এটা নেওয়া পছন্দ করব না এবং আমরা এটা নিয়ে করবই বা কি?' তিনি বললেন, "তোমরা কি পছন্দ কর যে, (বিনামূল্যে) এটা তোমাদের হোক?” তাঁরা বললেন, 'আল্লাহর কসম! যদি এটা জীবিত থাকত তবুও সে ছোট কানের কারণে দোষযুক্ত ছিল। এখন তো সে মৃত (সেহেতু একে কে নেবে)?' তিনি বললেন,
(فَوَاللَّهِ لِلْدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ هَذَا عَلَيْكُمْ )).
"আল্লাহর কসম! তোমাদের নিকট এই মৃত ছাগল ছানাটা যতটা নিকৃষ্ট, দুনিয়া আল্লাহর নিকট তার চেয়ে বেশি নিকৃষ্ট।” (মুসলিম ৭৬০৭নং)
এ দুনিয়া হল মানুষের গু বা পায়খানার থেকেও নিকৃষ্ট। যাহহাক ইবনে সুফিয়ান আল-কিলাবী থেকে বর্ণিত যে, তাঁকে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “হে যাহহাক! তোমার খাদ্য কী?” তিনি বললেন, 'মাংস এবং দুধ।' রাসূল ﷺ বললেন, "(খাওয়ার পর) এর অবস্থা কী হয়?” তিনি বললেন, '(খাওয়ার পর) এর অবস্থা যা হয়, তা তো আপনি ভালোভাবেই জানেন।' তখন তিনি বললেন,
(فَإِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى ضَرَبَ مَا يَخْرُجُ مِنْ ابْنِ آدَمَ مَثَلًا لِلدُّنْيَا)).
"বরকতময় মহান আল্লাহ সেই জিনিসকে দুনিয়ার দৃষ্টান্ত হিসাবে বর্ণনা করেছেন যা আদম সন্তানদের (পেট) থেকে নির্গত হয়।” (আহমদ ১৫৭৪৭, সিঃ সহীহাহ ৩৮-২নং)
এ দুনিয়া হল ক্ষণস্থায়ী, মুসাফিরের জন্য একটি ছায়াদার গাছের মতো। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, রাসূলুল্লাহ একদা চাটাই-এর উপর শুলেন। অতঃপর তিনি এই অবস্থায় উঠলেন যে, তাঁর পার্শ্বদেশে তার দাগ পড়ে গিয়েছিল। আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! যদি (আপনার অনুমতি হয়, তাহলে) আমরা আপনার জন্য নরম গদি বানিয়ে দিই।' তিনি বললেন,
(( مَا لِي وَلِلدُّنْيَا ؟ مَا أَنَا فِي الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبِ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا )).
"দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? আমি তো (এ) জগতে ঐ সওয়ারের মত যে (ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রামের জন্য) গাছের ছায়ায় থামল। পুনরায় সে চলতে আরম্ভ করল এবং ঐ গাছটি ছেড়ে দিল।” (আহমাদ ২৭৪৪, তিরমিযী ২৩৭৭, ইবনে মাজাহ ৪১০৯, মিশকাত ৫ ১৮৮ নং)
বলাই বাহুল্য যে, দুনিয়ার উক্ত সকল প্রকৃতত্ব ও উদাহরণ জেনে অথবা না জেনে অনেকে তারই পশ্চাতে তার প্রেমে পাগল হওয়ার মতো ছুটে চলেছে। দুনিয়া হয়েছে তাদের শিক্ষার বিষয় ও উদ্দেশ্য। দুনিয়া হয়েছে তাদের কামনা ও বাসনা। দুনিয়াই তাদের একমাত্র সাফল্য। তাইতো তাদেরকে দেখতে পাবেন, তারা তারই বিলাস-সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। তারই ক্ষণস্থায়ী সুখলাভের পিছনে নিজের আয়ু ক্ষয় করছে। তারই প্রেমের শীরীন শারাব পান করার জন্য নিজের সকল প্রচেষ্টা ব্যয় করছে! আর ভুলে বসেছে জীবনের আসল উদ্দেশ্য। দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার পরিণাম নিশ্চয়ই শুভ নয়। আখেরাতে বিশ্বাস রেখেও যদি কেউ দুনিয়াকে তার উপর প্রাধান্য ও গুরুত্ব দেয়, তাহলে তার ফলাফল বড় অশুভ হয়।
দাম্ভিক কারুনের ইতিহাসে দেখুন, মহান আল্লাহ তাকে এত ধনভান্ডার দান করেছিলেন যে, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল!
{ فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ} (۷۹) سورة القصص
"সুতরাং কারুন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, 'আহা! কারূনকে যা দেওয়া হয়েছে, সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।” (ক্বাস্বাস্বঃ ৭৯)
এ ছিল পার্থিব জগৎকে প্রাধান্যদাতাদের দৃষ্টিভঙ্গি। পক্ষান্তরে জ্ঞানী মু'মিনদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। মহান আল্লাহ বলেন,
{ وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِّمَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ) (۸۰) سورة القصص
“আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, ‘ধিক্ তোমাদের! যারা ঈমান রাখে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।” (ক্বাস্বাস্বঃ ৮০)
পরিশেষে কারুনের পরিণতির ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
{فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارَهُ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِن فِئَةٍ يَنصُرُونَهُ مِن دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ} (৮১) সূরা আল কাসাস
“অতঃপর আমি কারুনকে ও তার প্রাসাদকে মাটিতে ধসিয়ে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না।” (ক্বাস্বাস্বঃ ৮১)
যারা পার্থিব জীবনকেই প্রাধান্য দেয়, তারা সুপথপ্রাপ্ত নয়, তারা বিশাল ভ্রষ্ট ও কাফের। মহান আল্লাহ বলেন,
{الَّذِينَ يَسْتَحِبُّونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجًا أُوْلَئِكَ فِي ضَلَال بَعِيدٍ} (৩) সূরা ইব্রাহীম
“যারা ইহজীবনকে পরজীবনের উপর প্রাধান্য দেয়, মানুষকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করে; তারাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে।” (ইব্রাহীমঃ ৩)
{ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ}
“এটা এ জন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দেয় এবং এই জন্য যে, আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।” (নাহলঃ ১০৭)
যে ব্যক্তি দুনিয়াকেই গুরুত্ব দেয় এবং দুনিয়াতেই সকল সুখ লুটতে চায়, তার পরিণতি জাহান্নামের ইন্ধন ছাড়া আর কী হতে পারে? মহান আল্লাহ বলেছেন,
{مَن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ (١٥) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌّ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ} (১৬) সূরা হুদ
“যারা শুধু পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা করে, আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মসমূহ (এর ফল) পৃথিবীতেই পরিপূর্ণরূপে প্রদান ক'রে দিই এবং সেখানে তাদের জন্য কিছুই কম করা হয় না। এরা এমন লোক যে, তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, আর তারা যা কিছু করেছে, তা সবই পরকালে নিষ্ফল হবে এবং যা কিছু করে থাকে, তাও নিরর্থক হবে।” (হুদঃ ১৫-১৬)
{مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيهَا مَا نَشَاء لِمَنْ نُرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ يَصْلاهَا مَدْمُومًا مَّدْحُورًا} (১৮) سورة الإسراء
"কেউ পার্থিব সুখ-সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে যা ইচ্ছা সত্বর দিয়ে থাকি, পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি; সেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত ও অনুগ্রহ হতে দূরীকৃত অবস্থায়।” (বানী ইস্রাঈলঃ ১৮)
{إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُونَ (۷) أُوْلَئِكَ مَأْوَاهُمْ النَّارُ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ} (۸) سورة يونس
"যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং পার্থিব জীবন নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকে এবং এতেই যারা নিশ্চিন্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে উদাসীন; এই লোকদের নিজেদের কৃতকর্মের ফলে ঠিকানা হবে জাহান্নাম।” (ইউনুসঃ ৭-৮)
{فَأَمَّا مَنْ طَغَى (۳۷) وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا (۳۸) فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى} (৩৯) النازعات
"সুতরাং যে সীমালংঘন করেছে এবং পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছে, জাহীম (জাহান্নাম) ই হবে তার আশ্রয়স্থল।” (না-যিআতঃ ৩৭-৩৯)
পার্থিব জীবনের চাকচিক্যে ধোঁকা খেয়ে যারা সুমহান প্রভুর দাসত্ব ভুলে বসে, তাদের পরিণাম জাহান্নাম ব্যতীত আর কী হতে পারে? কিয়ামতের দিন তিনি বলবেন,
{يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالإِنسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ يَقُصُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي وَيُنذِرُونَكُمْ لِقَاء يَوْمِكُمْ هَذَا قَالُوا شَهِدْنَا عَلَى أَنفُسِنَا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَشَهِدُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ أَنَّهُمْ كَانُوا كَافِرِينَ} (১৩০) سورة الأنعام
"(আমি ওদেরকে বলব,) 'হে জিন ও মানব-সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্য হতে কি রসূলগণ তোমাদের নিকট আসেনি, যারা আমার নিদর্শন তোমাদের নিকট বিবৃত করত এবং তোমাদেরকে এদিনের সম্মুখীন হওয়া সম্বন্ধে সতর্ক করত?' ওরা বলবে, 'আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করলাম।' বস্তুতঃ পার্থিব জীবন ওদেরকে প্রতারিত করেছিল। আর ওরা যে অবিশ্বাসী (কাফের) ছিল এটিও ওরা স্বীকার করবে।” (আনআমঃ ১৩০)
তিনি আরো বলেছেন,
{الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَهُمْ لَهْوًا وَلَعِبًا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فَالْيَوْمَ تَنسَاهُمْ كَمَا نَسُوا لِقَاء يَوْمِهِمْ هَذَا وَمَا كَانُوا بِآيَاتِنَا يَجْحَدُونَ} (৫১) سورة الأعراف
“যারা তাদের ধর্মকে ক্রীড়া-কৌতুকরূপে গ্রহণ করেছিল এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে প্রতারিত করেছিল। সুতরাং আজ আমি তাদেরকে বিস্মৃত হব, যেভাবে তারা তাদের এ দিনের সাক্ষাৎকে ভুলেছিল এবং যেভাবে তারা আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করেছিল।” (আ'রাফ: ৫১)
{وَقِيلَ الْيَوْمَ نَنسَاكُمْ كَمَا نَسِيتُمْ لِقَاء يَوْمِكُمْ هَذَا وَمَأْوَاكُمْ النَّارُ وَمَا لَكُم مِّن نَّاصِرِينَ (٣٤) ذَلِكُم بِأَنَّكُمُ اتَّخَذْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا وَغَرَّتْكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فَالْيَوْمَ لَا يُخْرَجُونَ مِنْهَا وَلَا هُمْ يُسْتَعْتَبُونَ} (٣٥) سورة الجاثية
“ওদেরকে বলা হবে, 'আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব, যেমন তোমরা এ দিনের সাক্ষাৎকারকে ভুলে গিয়েছিলে। তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।' এ জন্য যে, তোমরা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে নিয়ে বিদ্রূপ করেছিলে এবং পার্থিব জীবন তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিল। সুতরাং আজ ওদেরকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে না এবং তাদের ওজর-আপত্তিও গ্রহণযোগ্য হবে না।” (জাষিয়াহঃ ৩৪-৩৫)
{مَن كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ وَمَن كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِن نَّصِيبٍ} (۲۰) سورة الشورى
"যে ব্যক্তি পরলোকের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য পরলোকের ফসল বর্ধিত করে দিই এবং যে কেউ ইহলোকের ফসল কামনা করে, আমি তাকে তারই কিছু দিই, আর পরলোকে এদের জন্য কোন অংশ থাকবে না।" (শূরাঃ ২০)
আসলেই এ দুনিয়া হল আখেরাতের ক্ষেত স্বরূপ। আর ক্ষেতকে চাষী কখনও আপন বাড়ির সমতুল্য ভাবতে পারে না। দুনিয়ার ক্ষেত থেকে আখেরাতের ফসল সংগ্রহ করাই বান্দা চাষীর কর্তব্য। নচেৎ ক্ষেতকেই নিজ ঘর ধারণা করলে আসল ঘর থেকে সে বঞ্চিত হবে।
পার্থিব সংসারকে প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
((مَنْ جَعَلَ الْهُمُومَ هَمَّا وَاحِدًا هَمَّ الْمَعَادِ كَفَاهُ اللَّهُ هَمَّ دُنْيَاهُ وَمَنْ تَشَعَبَتْ بِهِ الْهُمُومُ فِي أَحْوَالَ الدُّنْيَا لَمْ يُبَالَ اللَّهُ فِي أَيِّ أَوْدِيَتِهِ هَلَكَ)).
"যে সমুদয় চিন্তারাশীকে একই চিন্তা ক'রে নেয়, কেবলমাত্র পরলোকের চিন্তা। আল্লাহ তার ইহলোকের চিন্তার জন্য যথেষ্ট হন। আর যার চিন্তারাজী ইহলৌকিক বিষয়ে শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট হয়, সে যে কোনও উপত্যকায় ধ্বংস হয় আল্লাহর তাতে কোন পরোয়া নেই।” (হাকেম ৩৬৫৮নং, ইবনে মাজাহ ৪১০৬নং)
কেবল 'দুনিয়া-দুনিয়া' চিন্তা করার ফলে তার পরিণতি হয় ধ্বংস। পরন্ত মহান প্রতিপালক এমন লালসাপূর্ণ চিন্তা থেকে তাঁর মু'মিন বান্দাকে রক্ষা করেন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((إِذَا أَحَبَّ اللَّهُ عَبْدًا حَمَاهُ الدُّنْيَا كَمَا يَظَلُّ أَحَدُكُمْ يَحْمِي سَقِيمَهُ الْمَاءَ)).
"যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে দুনিয়াদারী থেকে ঠিক সেইরূপ বাঁচিয়ে নেন; যেরূপ তোমাদের কেউ তার রোগী ব্যক্তিকে পানি থেকে সাবধানে রাখে।” (তিরমিযী ২০৩৬, হাকেম ৭৭৬৪, সহীহুল জামে' ২৮২ নং)
নিশ্চয়ই আল্লাহর দাস ও ধনদাস এক নয়। ঈমানদার ও দুনিয়াদার একাকার হতে পারে না। আর উভয়ের পরিণাম এক রকম হতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا أُوتِيتُم مِّن شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا وَمَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى أَفَلَا تَعْقِلُونَ (٦٠) أَفَمَن وَعَدْنَاهُ وَعْدًا حَسَنًا فَهُوَ لَاقِيهِ كَمَن مَّتَعْنَاهُ مَتَاعَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ثُمَّ هُوَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْمُحْصَرينَ} (٦١) سورة القصص
"তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও সৌন্দর্য এবং যা আল্লাহর নিকট আছে, তা উত্তম এবং স্থায়ী। তোমরা কি অনুধাবন করবে না? যাকে আমি উত্তম (পুরস্কারের) প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যা সে লাভ করবে, সে কি ঐ ব্যক্তির সমান যাকে আমি পার্থিব জীবনের ভোগসম্ভার দিয়েছি, যাকে পরে কিয়ামতের দিন (অপরাধীরূপে) উপস্থিত করা হবে?” (কাস্বাস্বঃ ৬০-৬১)
কেবল ধনদাস হলে আল্লাহর দাস হওয়া যায় না। দুনিয়ার লোভ থাকলে পরকালের লোভ মনে স্থান পায় না। একটি জিনিসের প্রেম যখন মনের মাঝে প্রবল থাকে, তখন অন্য কোন জিনিসের প্রেম সেই আসনে জায়গা লাভ করতে পারে না। তাই সুমহান প্রভু তাঁর দাস হতে নির্দেশ দেন এবং দুনিয়ার দাস হতে নিষেধ করেন। সদা সতর্ক করেন, যেন ঈমানদার মানুষ দুনিয়ার সুখ-সামগ্রীর প্রতি ঝুঁকে না পড়ে, দুনিয়ার প্রতি আসক্ত না হয়ে যায়। তিনি স্বীয় নবী -কে সতর্ক ক'রে বলেছেন,
{وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا } (۲۸) سورة الكهف
"তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখ, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে তাঁর মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে, তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না। আর তুমি তার আনুগত্য করো না, যার হৃদয়কে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী ক'রে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে।” (কাহফঃ ২৮)
{ وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى} (۱۳১) سورة طه
"আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য-স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি কখনোও তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না। তোমার প্রতিপালকের জীবিকাই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী।" (ত্বা-হাঃ ১৩১)
তিনি মু'মিনগণকে সতর্ক ক'রে বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُونَ عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فَعِندَ اللهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ كَذَلِكَ كُنتُم مِّن قَبْلُ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَتَبَيَّنُوا إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا} (٩٤) سورة النساء
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে বের হবে, তখন তদন্ত ক'রে নাও। আর কেউ তোমাদেরকে সালাম জানালে তাকে বলো না যে, 'তুমি বিশ্বাসী নও।' ইহজীবনের সম্পদ চাইলে আল্লাহর কাছে গনীমত (অনায়াসলভ্য সম্পদ) প্রচুর রয়েছে। তোমরা তো পূর্বে এরূপই ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। সুতরাং তোমরা পরীক্ষা ক'রে নাও। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” (নিসাঃ ৯৪)
তিনি সাবধান করেছেন, যেন দুনিয়ার সুখ-সৌন্দর্য তাদেরকে প্রতারিত না করে। তিনি বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ وَاخْشَوْا يَوْمًا لَّا يَجْزِي وَالِدٌ عَن وَلَدِهِ وَلَا مَوْلُودٌ هُوَ جَازٍ عَن وَالِدِهِ شَيْئًا إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلَا تَغْرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغْرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ} (۳۳)
"হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর এবং সেদিনকে ভয় কর, যেদিন পিতা সন্তানের কোন উপকারে আসবে না, সন্তানও তার পিতার কোন উপকারে আসবে না। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং শয়তান যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে।” (লুকুমানঃ ৩৩)
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغْرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ}
"হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; সুতরাং পার্থিব জীবন যেন কিছুতেই তোমাদেরকে প্রতারিত না করে এবং কোন প্রবঞ্চক যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে প্রবঞ্চিত না করে।” (ফাত্বিরঃ ৫)
প্রত্যেক মু'মিনের উচিত স্ব-স্ব জাতি-গোত্রকে সতর্ক করা,
{يَا قَوْمِ إِنَّمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ} (۳۹) سورة غافر
"হে আমার সম্প্রদায়! এ পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু। আর নিশ্চয় পরকাল হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস।” (মু'মিনঃ ৩৯)
মহান প্রতিপালক আল্লাহ-ভোলা দুনিয়া-ওয়ালা মানুষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেছেন,
{فَأَعْرِضْ عَن مَّن تَوَلَّى عَن ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا (۲۹) ذَلِكَ مَبْلَغُهُم مِّنَ الْعِلْمِ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اهْتَدَى} (۳۰) سورة النجم
"অতএব তাকে উপেক্ষা ক'রে চল, যে আমার স্মরণে বিমুখ এবং যে শুধু পার্থিব জীবনই কামনা করে। তাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্ত। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই ভাল জানেন, কে তাঁর পথ হতে বিচ্যুত এবং তিনিই ভাল জানেন, কে সৎপথপ্রাপ্ত।” (নাজমঃ ২৯-৩০)
মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ الله تَعَالَى مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا ، فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ، فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ )).
"দুনিয়া হচ্ছে সুমিষ্ট ও সবুজ শ্যামল এবং আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তাতে প্রতিনিধি করেছেন। অতঃপর তিনি দেখবেন যে, তোমরা কিভাবে কাজ কর। অতএব তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে সাবধান হও এবং সাবধান হও নারীজাতির ব্যাপারে।” (মুসলিম ৭১২৪নং)
সাহল ইবনে সা'দ বলেন, এক ব্যক্তি নবী-এর কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাকে এমন কর্ম বলে দিন, আমি তা করলে যেন আল্লাহ আমাকে ভালবাসেন এবং লোকেরাও আমাকে ভালবাসে।' তিনি বললেন,
(( ازْهَدْ فِي الدُّنْيَا يُحِبّك اللهُ ، وَازْهَدْ فِيمَا عِنْدَ النَّاسِ يُحِبِّكَ النَّاسُ )).
"দুনিয়ার প্রতি বিতৃষ্ণা আনো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালবাসবেন। আর লোকেদের ধন-সম্পদের প্রতি বিতৃষ্ণা আনো, তাহলে লোকেরা তোমাকে ভালবাসবে।” (ইবনে মাজাহ ৪১০২, প্রমুখ,, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯৪৪নং)
দুনিয়ার ধনমাল ও যশ-খ্যাতির লোভ দ্বীনদার মানুষের মনে স্থান পেতে পারে না। আর যদি স্থান পেয়ে যায়, তাহলে তার দ্বীনের প্রভূত ক্ষতি হয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( مَا ذِنْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلَا فِي غَنَم بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ المَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ)).
"ছাগলের পালে দু'টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছেড়ে দিলে ছাগলের যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে মানুষের সম্পদ ও সম্মানের প্রতি লোভ-লালসা তার দ্বীনের জন্য বেশী ক্ষতিকারক।” (তিরমিযী ২৩৭৬নং)
আলী ইবনে আবূ ত্বালিব বলেন,
ارْتَحَلَتْ الدُّنْيَا مُدْبِرَةً وَارْتَحَلَتْ الْآخِرَةُ مُقْبَلَةً وَلِكُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْهُمَا بَنُونَ فَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الْآخِرَةِ وَلَا تَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الدُّنْيَا فَإِنَّ الْيَوْمَ عَمَلٌ وَلَا حِسَابَ وَغَدًا حِسَابٍ وَلَا عَمَلُ.
"দুনিয়া পেছনের দিকে চলেছে এবং আখেরাত সামনের দিকে আসছে, আর দু'টি জায়গাই মানুষ একান্তভাবে কামনা করে। তবে তোমরা আখেরাতের কামনাকরী হয়ে যাও, দুনিয়ার কামনাকারী হয়ো না। কেননা, আজকের দিন (দুনিয়ায়) কর্ম আছে, হিসাব (গ্রহণ) নেই। আর কাল (আখেরাতে) হিসেব (গ্রহণ) থাকবে, কিন্তু কর্ম থাকবে না।” (বুখারী ৬৪১৭নং এর আগে)
রাসূলুল্লাহ পার্থিব সুখ-সম্ভোগে মত্ত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক ক'রে বলেছেন,
(( لَا تَتَّخِذُوا الضَّيْعَةَ فَتَرْغَبُوا فِي الدُّنْيَا)).
"তোমরা জমি-জায়গা, বাড়ি-বাগান ও শিল্প-ব্যবসায় বিভোর হয়ে পড়ো না। কেননা, (তাহলে) তোমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।” (তিরমিযী ২৩২৮নং)
আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র ইবনুল আ'স বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। এমতাবস্থায় যে, আমরা আমাদের একটি কুঁড়েঘর সংস্কার করছিলাম। তিনি বললেন, "এটা কী?” আমরা বললাম, 'কুঁড়ে ঘরটি দুর্বল হয়ে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, তাই আমরা তা মেরামত করছি।' তিনি বললেন,
(( مَا أَرَى الأَمْرَ إِلَّا أَعْجَلَ مِنْ ذَلِكَ )) .
"আমি ব্যাপারটিকে (মৃত্যুকে) এর চাইতেও নিকটবর্তী ভাবছি।” (আবু দাউদ ৫২৩৮, তিরমিযী ২৩৩৫নং)
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমার দুই কাঁধ ধরে বললেন,
(( كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ ، أَو عَابِرُ سَبِيل )) .
"তুমি এ দুনিয়াতে একজন মুসাফির অথবা পথচারীর মতো থাকো।”
আর ইবনে উমার বলতেন,
إذا أَمْسَيْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الصَّبَاحَ ، وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ المَسَاءَ ، وَخُذْ مِنْ صِحَتِكَ لِمَرَضِكَ ، وَمِنْ حَيَاتِكَ لِمَوْتِكَ .
‘তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হলে আর ভোরের অপেক্ষা করো না এবং ভোরে উপনীত হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। তোমরা সুস্থতার অবস্থায় তোমার পীড়িত অবস্থার জন্য কিছু সঞ্চয় কর এবং জীবিত অবস্থায় তোমার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর।’ (বুখারী ৬৪১৬, তিরমিযী, মিশকাত ১৬০৪নং)
তাহলে কি সংসার করাই যাবে না? অর্থোপার্জন করাই যাবে না? বাড়ি-ঘর বানানোই যাবে না? চাষ-চাকরি করাই যাবে না?
উলামাগণ বলেন, উক্ত বাণীসমূহের অর্থ হল, দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ো না এবং তাকে নিজের আসল ঠিকানা বানিয়ে নিয়ো না। মনে মনে এ ধারণা করো না যে, তুমি তাতে দীর্ঘজীবী হবে। তুমি তার প্রতি যত্নবান হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করো না। তার সাথে তোমার সম্পর্ক হবে ততটুক, যতটুক একজন প্রবাসী তার প্রবাসের সাথে রেখে থাকে। তাতে সেই বিষয়-বস্তু নিয়ে বিভোল হয়ে যেয়ো না, যে বিষয়-বস্তু নিয়ে সেই প্রবাসী ব্যক্তি হয় না, যে স্বদেশে নিজের পরিবারের নিকট ফিরে যেতে চায়। আর আল্লাহই তওফীক দাতা। (রিয়াযুস স্বালিহীন)
মহান আল্লাহ কারুনের ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন, তাকে তার সম্প্রদায়ের লোকে উপদেশ দিয়ে বলেছিল,
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ} (৭৭) سورة القصص
"আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর। আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।" (ক্বাস্বাস্বঃ ৭৭)
দুনিয়া মু'মিনের কাছে ব্রাত্য নয়। প্রয়োজনমতো দুনিয়ার দরকার অবশ্যই আছে। সমূলেই দুনিয়া বর্জনীয় নয়। মহান আল্লাহর দাস হওয়ার জন্য তিনি মানুষকে সংসারত্যাগী হতে আদেশ দেননি। দুই শ্রেণীর মানুষের চাহিদা ও প্রার্থনা উল্লেখ ক'রে তিনি বলেছেন,
{فَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا وَمَا لَهُ فِي الآخِرَةِ مِنْ خَلَاق (২০০) وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (২০১) أُولَئِكَ لَهُمْ نَصِيبٌ مِّمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ} (২০২) سورة البقرة
"এমন কিছু লোক আছে যারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে পৃথিবীতে (সওয়াব) দান কর।' বস্তুতঃ তাদের জন্য পরকালে কোন অংশ নেই। পক্ষান্তরে তাদের মধ্যে (এমন কিছু লোক আছে) যারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর। আর আমাদেরকে দোযখ-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।' তারা যা অর্জন করেছে, তার প্রাপ্ত অংশ তাদেরই। বস্তুতঃ আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।” (বাক্বারাহঃ ২০০-২০২)
📄 প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা
পার্থিব সুখ-সামগ্রীর প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা মানুষকে সুমহান প্রভুর দাস হওয়ার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত রাখে।
ওর প্রচুর ধনবল হয়েছে, আমার প্রচুর হতে হবে। ওর অনেক জনবল আছে, আমার প্রচুর হতে হবে।
এইভাবে 'ওর প্রচুর আছে, আমার প্রচুর হতে হবে'---এই প্রতিযোগিতা মানুষকে তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরিয়ে রাখে। সুমহান সৃষ্টিকর্তা পার্থিব জীবনের এই বাস্তবতার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন এবং বলেছেন,
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ} (۲۰) سورة الحديد
"তোমরা জেনে রেখো যে, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব প্রকাশ, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। এর উপমা বৃষ্টি; যার দ্বারা উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা টুকরা-টুকরা (খড়-কুটায়) পরিণত হয় এবং পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (হাদীদঃ ২০)
মানুষ উদাসীন, সে আল্লাহতে বিশ্বাস রাখে না। মানুষ মোহাচ্ছন্ন, সে সুমহান প্রভুর দাসত্ব করে না। মানুষ অনাগ্রহী, সে আল্লাহর ইবাদত করে না।
হে মানুষ! তোমাদেরকে কীসে উদাসীন করল? কোন্ ব্যস্ততা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করল? কোন্ কর্মাসক্তি তোমাদেরকে বিভোল ক'রে রাখল? সুমহান প্রভু নিজেই তার উত্তর দিয়ে বলেছেন,
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ} (1) سورة التكاثر
"প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন ক'রে রেখেছে।” (তাকাযুর: ১)
আব্দুল্লাহ ইবনে শিখীর বলেন, আমি নবী -এর নিকট এলাম, এমতাবস্থায় যে, তিনি 'আলহাকুমুত তাকাযুর' অর্থাৎ, প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন ক'রে রেখেছে। (সূরা তাকাযুর) পড়ছিলেন। তিনি বললেন,
(( يَقُولُ ابْنُ آدَمَ : مَالِي ، مالي ، وَهَلْ لَكَ يَا ابْنَ آدَمَ مِنْ مَالِكَ إِلَّا مَا أَكَلْتَ فَأَفْنَيْتَ ، أَو لَبِسْتَ فَأَبْلَيْتَ ، أَوْ تَصَدَّقْتَ فَأَمْضَيْتَ ؟! ))
"আদম সন্তান বলে, 'আমার মাল, আমার মাল।' অথচ হে আদম সন্তান! তোমার কি এ ছাড়া কোন মাল আছে, যা তুমি খেয়ে শেষ ক'রে দিয়েছ অথবা যা তুমি পরিধান ক'রে পুরাতন ক'রে দিয়েছ অথবা সাদকাহ ক'রে (পরকালের জন্য) জমা রেখেছ।” (মুসলিম ৭৬০৯নং)
মুসলিম শরীফেরই অপর এক বর্ণনায় এসেছে,
وَمَا سِوَى ذَلِكَ فَهُوَ ذَاهِبٌ وَتَارِكُهُ لِلنَّاسِ)).
"এ ছাড়া বাকী সব চলে যাবে এবং মানুষের জন্য রেখে যেতে হবে।” (মুসলিম ৭৬১১নং)
অন্যত্র আমরা জেনেছি যে, আদম সন্তানের পেট মাটি ছাড়া অন্য কিছুতে ভরবে না। সুতরাং সে যদি তার সকল আশা পূরণ করতে চায়, তাহলে পার্থিব প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ ক'রে দুনিয়ার দাস হয়ে যাবে, আর তার ফলে সুমহান প্রভুর দাস হওয়ার সুযোগ লাভ করা হতে চির বঞ্চিত থেকে যাবে।
📄 পার্থিব প্রতিদ্বন্দ্বিতা
পার্থিব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বা পার্থিব কোন বিষয়ে অপরকে টেক্কা ও পাল্লা দেওয়ায় একটা নেশা আছে, যার ফলশ্রুতিতে মানুষ জীবনের মূল লক্ষ্য বিস্মৃত হতে পারে। ও ধনী হয়েছে, আমি কীভাবে হব? ওর বাড়ি-গাড়ি হয়েছে, আমার কীভাবে হবে? ওর এসি হয়েছে, আমার কীভাবে হবে? ওর ২টি দোকান হয়েছে, আমার কীভাবে হবে? ও অমুক পদ পেয়েছে, আমি ঐ পদ কীভাবে পাব? আমি ওর থেকে উন্নত হব, আমি জিতব, আমি ওকে হারাব, আমিই হব অগ্রগামী। পার্থিব সুখ-সম্ভারের জন্য এই শ্রেণীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় মানুষকে জীবনের আসল উদ্দেশ্য সম্বন্ধে উদাস ক'রে ফেলে। বরং অনেক সময় এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নিজেকে ধ্বংস ক'রে ফেলে।
আম্র ইবনে আউফ আনসারী থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ একবার আবু উবাইদাহ ইবনে জারাহকে জিযিয়া (ট্যাক্স) আদায় করার জন্য বাহরাইন পাঠালেন। অতঃপর তিনি বাহরাইন থেকে (প্রচুর) মাল নিয়ে এলেন। আনসারগণ তাঁর আগমনের সংবাদ শুনে ফজরের নামাযে রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে শরীক হলেন। যখন তিনি নামায পড়ে (নিজ বাড়ি) ফিরে যেতে লাগলেন, তখন তারা তাঁর সামনে এলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁদেরকে দেখে হেসে বললেন,
(( أَظُنُّكُمْ سَمِعْتُمْ أَنَّ أَبَا عُبَيْدَةَ قَدِمَ بِشَيْءٍ مِنَ الْبَحْرَيْنِ ؟ ))
"আমার মনে হয়, আবু উবাইদাহ বাহরাইন থেকে কিছু (মাল) নিয়ে এসেছে, তোমরা তা শুনেছ।” তারা বলল, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন,
(( أَبْشِرُوا وَأَمِّلُوا مَا يَسُرُّكُمْ، فَوَاللَّهُ مَا الفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ ، وَلَكِنِّي أَخْشَى أَنْ تُبْسَط الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا ، فَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أهْلَكتُهُمْ )).
"সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং তোমরা সেই আশা রাখ, যা তোমাদেরকে আনন্দিত করবে। তবে আল্লাহর কসম! তোমাদের উপর দারিদ্র্য আসবে আমি এ আশংকা করছি না। বরং আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের ন্যায় তোমাদেরও পার্থিব জীবনে প্রশস্ততা আসবে। আর তাতে তোমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যেমন তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। অতঃপর তা তোমাদেরকে ধ্বংস ক'রে দেবে, যেমন তাদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছিল।” (বুখারী ৪০১৫, মুসলিম ২৯৬১নং)
উকুবাহ ইবনে আমের থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (একবার) উহুদের শহীদদের (কবরস্থানের) দিকে বের হলেন এবং যেন জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদেরকে বিদায় জানাবার উদ্দেশ্যে আট বছর পর তাঁদের উপর জানাযা পড়লেন (অর্থাৎ তাঁদের জন্য দুআ করলেন)। তারপর মিম্বরে চড়ে বললেন,
(( إِنِّي بَيْنَ أَيْدِيكُمْ فَرَطٌ وَأَنَا شَهِيدٌ عَلَيْكُمْ وَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الحَوْضُ ، وَإِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَيْهِ مِنْ مَقَامِي هَذَا ، أَلَا وَإِنِّي لَسْتُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا ، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوهَا )) .
"আমি পূর্বে গমনকারী তোমাদের জন্য সুব্যবস্থাপক এবং সাক্ষীও। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান হওযে (কাউসার)। আমি অবশ্যই ওটাকে আমার এই স্থান থেকে দেখতে পাচ্ছি। শোনো! তোমাদের ব্যাপারে আমার এ আশংকা নেই যে, তোমরা শির্ক করবে। তবে তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।”
(সাহাবী বলেন,) 'এটাই আমার শেষ দৃষ্টি ছিল যা আমি নবী -এর প্রতি নিবদ্ধ করেছিলাম (অর্থাৎ, এরপর তিনি দেহত্যাগ করেন)।' (বুখারী ৪০৪২, মুসলিম ৬১১৭)
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে,
(( وَلَكِنِّي أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوا فِيهَا ، وَتَقْتَتِلُوا فَتَهْلِكُوا كَمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ )) .
“কিন্তু তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং সে জন্য পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এবং (পরিণামে) তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে।” উকুবা বলেন, 'মিম্বরের উপরে রাসূলুল্লাহ -কে এটাই ছিল আমার শেষ দর্শন।'
অপর এক বর্ণনায় আছে,
(( إِنِّي فَرَطٌ لَكُمْ وَأَنَا شَهِيدٌ عَلَيْكُمْ وَإِنِّي وَاللَّهِ لأَنْظُرُ إِلَى حَوْضِي الْآنَ، وَإِنِّي أُعْطِيتُ مَفَاتِيحَ خَزَائِنِ الْأَرْضِ، أَوْ مَفَاتِيحَ الأَرْضِ ، وَإِنِّي وَاللَّهِ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا بَعْدِي ، وَلَكِنْ أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تَنَافَسُوا فِيهَا )) .
"আমি তোমাদের অগ্রদূত এবং তোমাদের জন্য সাক্ষী। আল্লাহর শপথ! আমি এই মুহূর্তে আমার হাওয (হওযে কাওসার) দেখছি। আমাকে পৃথিবীর ভান্ডারসমূহের চাবিগুচ্ছ প্রদান করা হয়েছে। আর আমি তোমাদের ব্যাপারে এ জন্য শংকিত নই যে, তোমরা আমার (তিরোধানের) পর শির্ক করবে; বরং এ আশংকা বোধ করছি যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদের ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।”
পার্থিব বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এক প্রকার জুয়া খেলার মতো। প্রত্যেক দানেই জুয়ারী মনে করে, এবার সে জিতবে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, জুয়ারী নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফেরে।
এক দ্বীনী ভাইয়ের কাহিনী। অন্যান্য ভাইদেরকে বিদেশ এসে বড়লোক হতে দেখে সে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামল। এজেন্টের মাধ্যমে টাকা জমা ক'রে প্রতারণার ফাঁদে পা দিল। ফলে তার টাকাও গেল, বিদেশও আসা হল না।
আর এক ভাই তার অযোগ্য ভিসাতে বিদেশ গিয়ে ২/৩ মাস পরে ফিরে এল। অন্যান্যদের মতো অর্থোপার্জনের স্বপ্ন তার স্বপ্নই থেকে গেল। বরং তার কোমর ভেঙ্গে গেল উক্তরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে ছুটতে গিয়ে।
হ্যাঁ, এমনটাই হয়।
'বাণিজ্য করিতে গেল দরিয়ার কূল, কেউ করল দুনো লাভ কেউ হারাল মূল।'
অবশ্যই ভাগ ও ভাগ্য। কিন্তু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হিংসা ও অতিলোভ থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই মূল হারিয়ে কূল হারিয়ে যায়। হাতির মতো লাদদে চাইলে মহিষের কী দশা হয়, তা তো অনুমেয়। 'পরের দেখে তুলো হাঁই, যা আছে তাও নাই।' সুতরাং এ ক্ষেত্রে মহানবী-এর বাণী মনে রাখা দরকার। তিনি বলেছেন,
((انْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ ، فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ
"(দুনিয়ার ধন-দৌলত ইত্যাদির দিক দিয়ে) তোমাদের মধ্যে যে নীচে তোমরা তার দিকে তাকাও এবং যে তোমাদের উপরে তার দিকে তাকায়ো না। যেহেতু সেটাই হবে উৎকৃষ্ট পন্থা যে, তোমাদের প্রতি যে আল্লাহর নিয়ামত রয়েছে তা তুচ্ছ মনে করবে না।” (মুসলিম ৭৬১৯নং)
বুখারীর বর্ণনায় আছে,
((إِذَا نَظَرَ أَحَدُكُمْ إِلَى مَنْ فُضْلَ عَلَيْهِ فِي الْمَالِ وَالْخَلْقِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْهُ
"তোমাদের কেউ যখন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যাকে সম্পদে ও দৈহিক গঠনে তার থেকে বেশি শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে, তখন সে যেন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে এ বিষয়ে তার চেয়ে নিম্নস্তরের।” (বুখারী ৬৪৯০নং)
ক্ষণস্থায়ী এই সংসারে অবৈধ প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা! অন্যায়ভাবে পরকে টেক্কা দেওয়া, তাকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা করা, তাকে পিছে ফেলার মানসিকতা নিয়ে ময়দানে দৌড় দেওয়া আল্লাহর দাসদের কাজ হতে পারে না।
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ'স বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। এমতাবস্থায় যে, আমরা আমাদের একটি কুঁড়েঘর সংস্কার করছিলাম। তিনি বললেন, "এটা কী?” আমরা বললাম, 'কুঁড়ে ঘরটি দুর্বল হয়ে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, তাই আমরা তা মেরামত করছি।' তিনি বললেন,
(( مَا أَرَى الأَمْرَ إِلَّا أَعْجَلَ مِنْ ذَلِكَ ))
"আমি ব্যাপারটিকে (মৃত্যুকে) এর চাইতেও নিকটবর্তী ভাবছি।” (আবু দাউদ ৫২৩৮, তিরমিযী ২৩৩৫নং)
হ্যাঁ, মানুষের জীবন আসলেই সংক্ষিপ্ত। তবুও ভালোরূপে থাকতে হয়। তবে তার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সংক্ষিপ্ত যাত্রার জন্য যেমন কোন কোন যাত্রী গাড়িতে উঠে সিট নিয়ে কলহ করে। কারো পাশে বসলে তার সাথে নানা অসুবিধায় খুটখাট করে। অথচ একটু পরেই তাকে সিট ছেড়ে নেমে যেতে হয়।
একটি গল্প পড়েছিলাম। বাসের একটি সিটে একটি মহিলা বসে ছিল। ঐ সিটে দুইজন যাত্রী বসা যায়। সামনের স্টপেজে একজন মহিলা যাত্রী বাসে উঠলে সে তার পাশে বসল। তার সাথে কিছু ব্যাগ-পত্র বেশি ছিল। তাতে আগের মহিলা কষ্ট পেতে লাগল। বসার শ্রীও ছিল বিশ্রী। বাসে একজন পরিচিত পুরুষ ছিল। সে তার হয়ে প্রতিবাদ করলে সে তাকে বলল, 'ছাড়ো না। সংক্ষিপ্ত যাত্রা। আমি আগের স্টপেজে নেমে যাব।'
'সংক্ষিপ্ত যাত্রা' কথাটি স্বর্ণাক্ষরে লেখার উপযুক্ত। প্রত্যেকটি মানুষ যদি এই ছোট্ট কথাটি নিজের মনের মণিকোঠায় স্থান দেয়, তাহলে নিশ্চয় সে কোন বিষয়ে কারো প্রতি হিংসা করবে না, কারো অভব্য আচরণে ধৈর্যচ্যুত হবে না, তুচ্ছ ব্যাপারে অন্যের অন্যায়াচরণে কলহ করবে না, প্রতিবেশীর এক ফুট জায়গা, শিশু-কলহ, অথবা হাস-মুরগী নিয়ে ঝগড়া করবে না।
প্রত্যেক তুচ্ছ বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং অপরের সাথে বাদানুবাদে লিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
আমাদের প্রত্যেকেই যদি সতর্ক হয় যে, আমরা আসলে সফরের যাত্রী এবং আমাদের যাত্রা অতি সংক্ষিপ্ত, তাহলে আমাদের কেউ কারো প্রতি যুলুম করবে না, কলহ-বিবাদ করবে না। অন্যের অসদাচরণে ক্ষমাশীলতা প্রদর্শন করবে। সহমর্মিতা ও সৌজন্যবোধ প্রয়োগ করবে। চরিত্রবান হতে সচেষ্ট হবে। অল্পে তুষ্ট হবে এবং যা পেয়েছে তার কৃতজ্ঞতা আদায়ে প্রয়াসী হবে। আর তাহলেই আমরা ভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাব।
কেউ আপনার মন ভেঙ্গেছে? প্রকৃতিস্থ থাকুন। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
কেউ আপনার খিয়ানত করেছে? কেউ আপনার সাথে প্রতারণা করেছে? কেউ আপনাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছে? উত্তেজিত হবেন না। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
কেউ আপনার প্রতি যুলুম করেছে? যুলুম যত বড়ই হোক না, আপনি ধৈর্যশীল হন। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
কেউ আপনার প্রতি নেমকহারামি করেছে? আপনি প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
কেউ আপনার অধিকার হরণ করেছে? কেউ আপনার অসম্মান ও অপমান করেছে? দুঃখিত হবেন না। উদার হন। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
ক্ষমাশীলতা ও সৌজন্যবোধ চরিত্রবানদের গুণ। অসদাচারীদের আচরণে মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।'
'যাত্রা অতি সংক্ষিপ্ত।' আর এর পরে আর কেউ এখানে যাত্রী হতে আসবে না। কেউ জানে না, তার যাত্রার সময় কতটুক? যাত্রা তো অবশ্যই শেষ হবে। সুতরাং মানুষের উচিত, পরস্পরের জন্য ধৈর্যধারণ করা, ক্রোধ সংবরণ করা, সহিষ্ণুতা অবলম্বন করা, উদারতা ও ক্ষমাশীলতা প্রয়োগ করা। যেহেতু 'যাত্রা সংক্ষিপ্ত।' সকলকেই মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
প্রত্যেক মানুষের মনে বিশ্বকবির এই অনুভূতি থাকা প্রয়োজন,
'যাত্রী আমি ওরে পারবে না কেউ রাখতে আমায় ধরে। দুঃখসুখের বাঁধন সবই মিছে বাঁধা এ ঘর রইবে কোথায় পিছে--- বিষয়-বোঝা টানে আমায় নীচে, ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে যাবে পড়ে।'
ক্ষণস্থায়ী এ সংসারে প্রতিদ্বন্দ্বী মন রেখে লাভ কী হবে? সংক্ষিপ্ত এ যাত্রা শেষ হলে তরী ছেড়ে নেমে যেতে হবে যথা সময়ে।
'যাত্রী আছে নানা। নানা ঘাটে যাবে তারা, কেউ কারো নয় জানা। তুমিও গো ক্ষনেক-তরে বসবে আমার তরী-'পরে যাত্রা যখন ফুরিয়ে যাবে মানবে না মোর মানা। এলে যদি তুমিও এসো। যাত্রী আছে নানা।।'
তবে হ্যাঁ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা করুন ভালোর জন্য; বরং হিংসা করুন তাতে দোষ নেই। মহানবী বলেছেন,
(لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ : رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالاً ، فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الحَقِّ ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ حِكْمَةً ، فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا )).
“কেবলমাত্র দু'টি বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় (১) ঐ ব্যক্তির প্রতি যাকে মহান আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, অতঃপর তাকে হক পথে অকাতরে দান করার ক্ষমতা দান করেছেন এবং (২) ঐ ব্যক্তির প্রতি যাকে মহান আল্লাহ হিকমত দান করেছেন, অতঃপর সে তার দ্বারা ফায়সালা করে ও তা শিক্ষা দেয়।” (বুখারী ৭৩, মুসলিম ১৯৩০নং)
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন জান্নাতের মহলের জন্য, যার দেওয়াল স্বর্ণ-রৌপ্যের, যার উদ্যান নয়নাভিরাম।
দুনিয়ার রূপসী প্রেমিকার জন্য নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা করুন অনন্ত যৌবনা হুরীর জন্য, যার রূপ-সৌন্দর্য অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়।
মহান প্রতিপালক বলেছেন, {سَابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا كَعَرْض السَّمَاء وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاء وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ} (২১) سورة الحديد
"তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততার মত, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণে বিশ্বাসীদের জন্য। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে তা দান করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।” (হাদীদ : ২১)
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ} (১৩৩) سورة آل عمران
"তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং বেহেশতের জন্য, যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা ধর্মভীরুদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।" (আলে ইমরান : ১৩৩)
{إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ (۲۲) عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ (۲۳) تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ (٢٤) يُسْقَوْنَ مِنْ رَحِيقٍ مَخْتُومٍ (٢٥) خِتَامُهُ مِسْك وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ} (٢٦) سورة المطففين
"পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে। তারা সুসজ্জিত আসনে বসে দেখতে থাকবে। তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবে। তাদেরকে মোহর আঁটা বিশুদ্ধ মদিরা হতে পান করানো হবে। এর মোহর হচ্ছে কস্তুরীর। আর তা লাভের জন্যই প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক।” (মুত্বাফফিফীন : ২২-২৬)
📄 জীবনের নানা সমস্যা ও ব্যস্ততা
জীবনের নানা সমস্যা আমাদেরকে জীবনের উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দিয়েছে।
সাংসারিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা, রুযীরুটির ব্যস্ততা, রোগ-জ্বালার বিরক্তি ইত্যাদি অনেক মানুষকেই আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
অনেকে বলে, 'ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ধর্মের বাণী শুনাইয়ো না।' তাদের ধারণা, পেটে ক্ষুধা থাকলে ধর্ম পালন করতে হয় না। অথচ যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর সামনেও আল্লাহর ইবাদত মাফ নয়।
অনেকে বলে, 'সারা দিনটা খেটেখুটে মাইনের বেলায় দু-আনা, আল্লাহ বলে ডাকব কি ভাই সময় পেলাম না।' অথচ যথা সময়ে সময় না পেলেও পরবর্তী অবসর সময়েও ইবাদত কাযা করা যায়। সারা দিনটার চব্বিশ ঘন্টাই কেউ খাটাখাটনি করে না।
নামায পড়েন না কেন? বাপ! আমার উযু থাকে না গো। রোগের জ্বালায় নামায পড়া হয় না বাবা! নামায পড়ার সময় হয় না বাপধন!
রোযা রাখেন না কেন? ভাই! আমার গ্যাস আছে গো। রোযা রাখলে চাষ করতে পারব না। গতরে না খাটলে পেট চলবে না।
কোন ইবাদত যথা সময়ে পালন করতে কেউ অক্ষম হলে তার বিকল্প ব্যবস্থা ও পদ্ধতি আছে। তবুও উক্ত প্রকার কোন অজুহাত দিয়ে ইবাদত মাফ নয়। মানুষের জ্ঞান থাকতে ইবাদত থেকে অব্যাহতি নেই। ইবাদত মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য।
বলা বাহুল্য, পার্থিব নানা সমস্যা, কষ্ট বা কর্মব্যস্ততার মাঝেও ইবাদতের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। সুমহান স্রষ্টার দাস যারা, তারা খোঁড়া অজুহাত দেখাবে না। তিনি অন্তরের খবর জানেন, তিনি কারো অচল ছল-বাহানা ক্ষমা করবেন না। প্রণিধান করুন:-
{فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللهِ وَكَرِهُوا أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَالُوا لَا تَنفِرُوا فِي الْحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَّوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ} (৮১)
"যারা (তাবুক অভিযানে) পশ্চাতে রয়ে গেল, তারা রসূলের বিরুদ্ধাচরণ ক'রে বসে থাকতে আনন্দবোধ করল এবং তারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করাকে অপছন্দ করলো। অধিকন্তু বলতে লাগল, 'তোমরা গরমে (জিহাদে) বের হয়ো না।' তুমি বলে দাও, 'জাহান্নামের আগুন (এর চেয়ে) অধিকতর গরম'; যদি তারা বুঝতে পারত!” (তাওবাহঃ ৮১)
{يَعْتَذِرُونَ إِلَيْكُمْ إِذَا رَجَعْتُمْ إِلَيْهِمْ قُل لَّا تَعْتَذِرُوا لَن نُّؤْمِنَ لَكُمْ قَدْ نَبَّأَنَا اللَّهُ مِنْ أَخْبَارِكُمْ وَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (৯৪) سورة التوبة
"যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তারা তোমাদের কাছে অজুহাত পেশ করবে। তুমি বলে দাও, তোমরা অজুহাত পেশ করো না; আমরা কখনই তোমাদেরকে বিশ্বাস করব না। আল্লাহ আমাদেরকে তোমাদের খবর জানিয়ে দিয়েছেন। আর ভবিষ্যতেও আল্লাহ এবং তাঁর রসূল তোমাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে এমন সত্তার কাছে যিনি অদৃশ্য এবং প্রকাশ্য সকল বিষয়ই অবগত আছেন, অনন্তর তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে।” (তাওবাহঃ ৯৪)
{سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ شَغَلَتْنَا أَمْوَالُنَا وَأَهْلُونَا فَاسْتَغْفِرْ لَنَا يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ قُلْ فَمَن يَمْلِكُ لَكُم مِّنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ بِكُمْ ضَرًّا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ نَفْعًا بَلْ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا} (১১) سورة الفتح
"(যুদ্ধ থেকে) পশ্চাতে থাকা মরুবাসীরা তোমাকে বলবে, 'আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন আমাদেরকে ব্যস্ত রেখেছিল, অতএব আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।' তারা মুখে তা বলে, যা তাদের অন্তরে নেই। তাদেরকে বল, 'আল্লাহ তোমাদের কারো কোন ক্ষতি কিংবা মঙ্গল চাইলে কে তাঁকে নিবৃত্ত করতে পারে? বস্তুতঃ তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত।” (ফাতহঃ ১১)
{وَإِذْ قَالَت طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِن يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا} (۱۳) سورة الأحزاب
"ওদের একদল বলেছিল, 'হে ইয়াসরিব (মদীনা) বাসিগণ! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই; তোমরা ফিরে চল।' আর ওদের মধ্যে একদল নবীর নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা ক'রে বলেছিল, 'আমাদের বাড়ী-ঘর অরক্ষিত।' যদিও ওগুলি অরক্ষিত ছিল না। আসলে পলায়ন করাই ছিল ওদের উদ্দেশ্য।” (আহযাবঃ ১৩)
মহান সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির মনের খবর জানেন। আর অচল ওযর পেশকারী মানুষও মনের গোপন অন্তরালে জানে যে, সে আসলেই অপরাধী। তিনি বলেছেন,
{بَلِ الْإِنسَانُ عَلَى نَفْسِهِ بَصِيرَةٌ (١٤) وَلَوْ أَلْقَى مَعَاذِيرَهُ} (١٥) سورة القيامة
"বস্তুতঃ মানুষ নিজের সম্বন্ধে সম্যক অবগত। যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে।” (ক্বিয়ামাহঃ ১৪-১৫)
সুতরাং নানা মিথ্যা অজুহাতে দাসত্ব ও আনুগত্য করতে ফাঁকি দেওয়া দাসকে যে শাস্তি পেতেই হবে, সে কথা অতি সহজে অনুমেয়।
কর্মব্যস্ততা আল্লাহর ইবাদতে বাধা সৃষ্টি করে। আবার আল্লাহর ইবাদতও ব্যস্ততাময় জীবনকে সহজ ক'রে দেয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ} (٤٠) سورة الحج
"আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন, যে তাঁকে (তাঁর দ্বীনকে) সাহায্য করে।" (হাজ্জঃ ৪০)
আল্লাহর রসূল বলেছেন,
((يقول ربكم تبارك وتعالى : يا ابن آدم تفرغ لعبادتي أملأ قلبك غنى، وأملأ يديك رزقا ، يا ابن آدم لا تباعد مني فأملأ قلبك فقرًا، وأملأ يديك شغلاً)).
“তোমাদের প্রতিপালক বলেন, 'হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতে নিরত হও, আমি তোমার হৃদয়কে ধনবত্তায় এবং উভয় হাতকে রুযীতে ভরে দেব। হে আদম সন্তান! আমার নিকট থেকে দূরে সরে যেয়ো না। নচেৎ তোমার হৃদয়কে অভাব দিয়ে এবং উভয় হাতকে কর্মব্যস্ততা দিয়ে ভরে দেব।” (হাকেম ৭৯২৬, ত্বাবারানী ১৬৮৯৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৩৫৯নং)