📄 দাসত্বের মর্যাদা
স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টির দাসত্বে লাঞ্ছনা আছে। হীনতা আছে। তবুও যে যত বড় মানুষের দাস, তার হীনতা তুলনামূলক কম।
কিন্তু সবচেয়ে মহান প্রভুর দাস হওয়ার যোগ্যতা হল বিশাল মর্যাদা। আর জীবনের উদ্দেশ্যে রয়েছে মানবের বিশাল মর্যাদা। বিশাল প্রভুর দাসত্বের মর্যাদা। সৃষ্টির সেরা মানুষ ছিলেন সুমহান স্রষ্টার সম্মানিত দাস।
মহান আল্লাহ মহানবী -কে ‘আব্দ’, ‘দাস’ বা ‘বান্দা’ বলে সম্মান দিয়েছেন, নাম না নিয়ে ‘আব্দ’, ‘দাস’ বা ‘বান্দা’ বলেছেন, যেহেতু এতে রয়েছে বিশাল মর্যাদা। কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় তার নজীর পাওয়া যায়। যেমনঃ-
{سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ} (১) সূরা ইসরা।
"পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতারাতি ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মাসজিদুল হারাম হতে (ফিলিস্তীনের) মাসজিদুল আক্বসায়, যার পরিবেশকে আমি করেছি বর্কতময়, যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই; নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (বানী ইস্রাঈল : ১)
{الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنزَلَ عَلَى عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَل لَّهُ عِوَجًا} (১) سورة الكهف
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি তাঁর বান্দার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে তিনি কোন প্রকার বক্রতা রাখেননি।” (কাহফঃ ১)
{تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا} (১) سورة الفرقان
"কত প্রাচুর্যময় তিনি যিনি তাঁর দাসের প্রতি ফুরক্বান (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে।" (ফুরক্বানঃ ১)
{فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى} (১০) سورة النجم
"তখন আল্লাহ তাঁর দাসের প্রতি যা অহী করার তা অহী করলেন।” (নাজমঃ ১০)
{هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَإِنَّ اللَّهَ بِكُمْ لَرَؤُوفٌ رَّحِيمٌ} (۹) سورة الحديد
"তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে সমস্ত প্রকার অন্ধকার হতে আলোকে আনার জন্য। আর নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু।” (হাদীদঃ ৯)
{وَأَنَّهُ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللَّهِ يَدْعُوهُ كَادُوا يَكُونُونَ عَلَيْهِ لِبَدًا} (۱۹) سورة الجن
"আর এই যে, যখন আল্লাহর দাস (আব্দুল্লাহ) তাঁকে ডাকবার জন্য দণ্ডায়মান হল, তখন তারা তার নিকট ভিড় জমাল।” (জ্বিনঃ ১৯)
কোন মানুষ যখন সুমহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ ক'রে তাঁর দাসত্বের মর্যাদা লাভ করতে চায়, তখন তাকে সাক্ষ্য দিতে হয়। অতঃপর প্রত্যেক নামাযের তাশাহহুদে তাকে সাক্ষ্য দিয়ে বলতে হয়,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ.
আমি সাক্ষি দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই এবং আরো সাক্ষি দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (স.) তাঁর দাস ও প্রেরিত রসূল। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৯০৯নং)
সুমহান স্রষ্টার দাস হতে পারলে মানুষ সুন্দর জীবন পায়। ধনের ধনী না হতে পারলেও মনের ধনী আসল ধনী হয়ে যায়। পার্থিব সুখের বিলাসসামগ্রী অর্জন না করতে পারলেও প্রকৃত সুখের স্বাদ অনুভব করতে পারে। এ হল সেই প্রভুর ওয়াদা তাঁর দাসের জন্য,
{ مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرَ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ} (۹۷) سورة النحل
"পুরুষ ও নারী যে কেউই বিশ্বাসী হয়ে সৎকর্ম করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই সুখী জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।" (নাহলঃ ৯৭)
পরকালের আগেই ইহকালে তার প্রতিদান পায়। প্রকৃত দাসত্ব করতে পারলে দুনিয়ার নেতৃত্ব পায়। সারা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতিরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মানব জাতির উপরে সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ উন্নয়ন অর্জন হয়। হীনমন্যতা ও নীচতার অনুভূতি থেকে মুক্ত হয়ে সারা পৃথিবীর সর্বোপরি আসন লাভ হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ } (۱۳۹) سورة آل عمران
"আর তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপরি (বিজয়ী); যদি তোমরা মু'মিন হও।" (আলে ইমরানঃ ১৩৯)
বলা বাহুল্য, জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্যে রয়েছে মহান স্রষ্টার দাসত্ব করা। তাঁর একটি অনুগত দাস হয়ে প্রতিষ্ঠালাভ করা। সুতরাং ধনী-গরীব---যাই হোক না কেন দাসত্বের সেই সুশৃঙ্খল জীবন পেয়ে সে ধন্য হয়। যে দাস পরিপূর্ণ গর্বের সাথে বলে,
{إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (١٦২) لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ } (١৬৩) সূরা আল-আনআম
“নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার উপাসনা (কুরবানী), আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোন অংশী নেই এবং আমি এ সম্বন্ধেই আদিষ্ট হয়েছি। আর আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) দের মধ্যে আমিই প্রথম।” (আনআমঃ ১৬২-১৬৩)
ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর সকলের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, ঐ দাসত্বের শৃঙ্খলে নিজকে আবদ্ধ করা। কিন্তু মানুষের নিকট জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য অজানা থাকে বলে, জীবনের প্রকৃত সাফল্য কী, তা সে জানতে অক্ষম হয় বলে, পার্থিব অসফলতায় বিমর্ষ হয়। বিপদে-আপদে হতাশ হয়ে ভেঙ্গে পড়ে। ধৈর্যহারা হয়ে আত্মহত্যা করে! মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে ভববন্ধন থেকে মুক্তি লাভের জন্য গণ- আত্মহত্যা করে!
অথচ জীবনের উদ্দেশ্য পার্থিব সফলতা নয়। যশ, খ্যাতি বা প্রসিদ্ধি লাভ নয়। ধন, পদ ও পদবী লাভ নয়। প্রকৃত সাফল্য পরকালের সাফল্য। আর যে উভয় সাফল্য লাভ করে, সে বড় সৌভাগ্য। আর প্রকৃত সাফল্য লাভ হয় একমাত্র সেই দাসের, যে কেবল সুমহান প্রভুর দাসত্বের মর্যাদা অর্জন করে।
জীবনে পার্থিব্য সাফল্য জরুরী নয়। আর গায়রুল্লাহর দাসত্ব ক'রে যে সাফল্য লাভ হয়, তা প্রকৃত সাফল্য নয়। আসলে প্রকৃত সাফল্য হল পরকালের সাফল্য। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَاعْبُدُوا مَا شِئْتُم مِّن دُونِهِ قُلْ إِنَّ الْخَاسِرِينَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ وَأَهْلِيهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَلَا ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ} (১৫) সূরা আয-যুমার
"অতএব তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইচ্ছা তার ইবাদত (দাসত্ব) কর।' বল, 'আসল ক্ষতিগ্রস্ত তো তারাই; যারা কিয়ামতের দিন নিজেদেরকে ও নিজেদের পরিজনবর্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জেনে রাখ, এটিই সুস্পষ্ট ক্ষতি।” (যুমার: ১৫)
সুমহান আল্লাহর কাছে মর্যাদা লাভই হল জীবনের মূল লক্ষ্য, প্রত্যেক অনুগত দাসের অভীষ্ট। দুনিয়ার মানুষের কাছে আপনার কোন পজিশন না থাকলেও কোন ক্ষতি নেই। সমাজে আপনার কোন প্রতিষ্ঠা না থাকলে কোনও হানি নেই। যদি সুমহান প্রতিপালকের নিকট আপনার কোনও পজিশন ও প্রতিষ্ঠা থাকে, তাহলে আবার কী?
মানুষের কাছে যার মূল্য নেই, কোন সম্মান নেই, কিন্তু সুমহান আল্লাহর কাছে তার মূল্য ও সম্মান আছে, তাহলে তাতে ক্ষতি কী?
মানুষের কাছে কিছু চাইলে যাকে কিছু দেওয়া হয় না। মানুষ তাকে 'দূর-দূর' ক'রে তাড়িয়ে দেয়, কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইলে তিনি তাকে তা দিয়ে সম্মানিত করেন। তাহলে কোন্ দাসত্ব গ্রহণ করবেন আপনি? রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
(( رُبَّ أَشْعَتَ أَغْبَرَ مَدْفُوع بِالْأَبْوَابِ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لأَبَرَّهُ.))
"বহু এমন লোকও আছে, যার মাথা উষ্কখুষ্ক ধুলোভরা, যাকে দরজা থেকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। (কিন্তু সে আল্লাহর নিকট এত প্রিয় যে,) সে যদি আল্লাহর উপর কসম খায়, তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ ক'রে দেন।” (মুসলিম ৬৮-৪৮, ৭৩৬৯নং)
তিনি আরো বলেছেন,
(( كَمْ مِنْ أَشْعَتَ أَغْبَرَ ذِي طِمْرَيْنِ لَا يُؤْبَهُ لَهُ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ، مِنْهُمُ الْبَرَاءُ بْنُ مَالِك)).
"কত এমন লোকও আছে, যার মাথা উষ্কখুষ্ক ধুলোভরা, দেহে পুরনো-ছেঁড়া কাপড়-পরা, যাকে তুচ্ছ করা হয়, (কিন্তু সে আল্লাহর নিকট এত প্রিয় যে,) সে যদি আল্লাহর উপর কসম খায়, তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ ক'রে দেন। তাদের মধ্যে একজন হল বারা' বিন মালেক।” (তিরমিযী ৩৮৫৪নং)
রুবাইয়ে' বিন্তে নায়ের একজন ক্রীতদাসীর সামনের দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছিল। সুতরাং দাসীর লোকজন তাদের নিকট ক্ষতিপূরণ চাইল। তারা নবী ﷺ-এর নিকট এলে তিনি 'ক্বিস্বাস' (অনুরূপ দাঁতের বদলে দাঁত ভাঙ্গা)র আদেশ দিলেন। আনাস বিন নাযর বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! রুবাইয়ে'র দাঁত ভাঙ্গা হবে? না, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন! ওর দাঁত ভাঙ্গা হবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "হে আনাস! আল্লাহর কিতাবের বিধান হল ক্বিস্বাস।” অতঃপর দাসীর পক্ষ রাযী হয়ে গেল এবং ক্বিস্বাস ক্ষমা ক'রে দিয়ে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করল। তখন নবী ﷺ বললেন,
((إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ.))
"আল্লাহর দাসদের মধ্যে এমন দাস আছে, সে যদি আল্লাহর উপর কসম খায়, তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ ক'রে দেন।” (বুখারী ২৭০৩নং)
সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী-এর পাশ দিয়ে পার হয়ে গেল, তখন তিনি তাঁর নিকট উপবিষ্ট একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, "এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার মন্তব্য কী?” সে বলল, 'এ ব্যক্তি তো এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক। আল্লাহর কসম! সে কোথাও বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে এবং কারো জন্য সুপারিশ করলে তা কবুল করা হবে।' তখন রাসূলুল্লাহ নীরব থাকলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আর এক ব্যক্তি পার হয়ে গেল। তিনি ঐ (উপবিষ্ট) লোকটিকে বললেন, "এ লোকটির ব্যাপারে তোমার অভিমত কী?” সে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! এ তো একজন গরীব মুসলমান। সে এমন ব্যক্তি যে, সে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না, কারো জন্য সুপারিশ করলে তা কবুল করা হবে না এবং সে কোন কথা বললে, তার কথা শ্রবণযোগ্য হবে না।' তখন রাসূলুল্লাহ বললেন,
(( هَذَا خَيْرٌ مِنْ مِلءِ الْأَرْضِ مِثْلَ هَذَا )).
"এ ব্যক্তি দুনিয়া ভর্তি ঐরূপ লোকদের চাইতে বহু উত্তম।” (বুখারী ৫০৯১, ৬৪৪৭, মুসলিম? ইবনে মাজাহ ৪১২০নং)
আবু হুরাইরাহ কর্তৃক বর্ণিত, নবী বলেছেন, (নবজাত শিশুদের মধ্যে) দোলনায় তিনজনই মাত্র কথা বলেছে; মারয়্যামের পুত্র ঈসা, আর (বনী ইস্রাঈলের) জুরাইজের (পবিত্রতার সাক্ষী) শিশু। ----আর (তৃতীয় হচ্ছে বনী ইস্রাঈলের) এক শিশু, যে তার মায়ের দুধ পান করছিল। এমন সময় তার পাশ দিয়ে উৎকৃষ্ট সওয়ারীতে আরোহী এক সুদর্শন পুরুষ চলে গেল। তার মা দুআ ক'রে বলল, 'হে আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে ওর মত করো।' শিশুটি তখনি মায়ের দুধ ছেড়ে দিয়ে সেই আরোহীর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, 'হে আল্লাহ আমাকে ওর মত করো না।' তারপর মায়ের দুধের দিকে ফিরে দুধ চুষতে লাগল। আবু হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ নিজের তর্জনী আঙ্গুলকে নিজ মুখে চুষে শিশুটির দুধ পান দেখাতে লাগলেন। আমি যেন তা এখনো দেখতে পাচ্ছি। পুনরায় (তাদের) পাশ দিয়ে একটি দাসীকে লোকেরা মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছিল। তারা বলছিল, 'তুই ব্যভিচার করেছিস, চুরি করেছিস!' আর দাসীটি বলছিল, 'হাসবিয়াল্লাহু অনি'মাল অকীল।' (আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট ও তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।) তা দেখে মহিলাটি দুআ করল, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে ওর মত করো না।' ছেলেটি সাথে সাথে মায়ের দুধ ছেড়ে দাসীটির দিকে তাকিয়ে বলল, 'হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো।' অতঃপর মা-বেটায় কথোপকথন করল। মা বলল, 'একটি সুন্দর আকৃতির লোক পার হলে আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে ওর মত করো। তখন তুমি বললে, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো না। আবার ওরা ঐ দাসীকে নিয়ে পার হলে আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে ওর মত করো না। কিন্তু তুমি বললে, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো! (এর কারণ কী?)' শিশুটি বলল, '(তুমি বাহির দেখে বলেছ, আর আমি ভিতর দেখে বলেছি।) ঐ লোকটি স্বৈরাচারী, তাই আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো না। আর ঐ দাসীটির জন্য ওরা বলছে, তুই ব্যভিচার করেছিস, চুরি করেছিস, অথচ ও এ সব কিছুই করেনি। তাই আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত করো।' (বুখারী ৩৪৩৬, ৬৬৭৩নং)
এক মরুবাসী সাহাবীর নাম ছিল যাহের বিন হারাম। তিনি মরু-অঞ্চল থেকে মহানবী -এর জন্য (ফলমূল, শাক-সব্জি) উপঢৌকন নিয়ে আসতেন। আর তাঁর মরু এলাকায় যাওয়ার সময় তিনিও তাঁকে শহরের কোন কোন জিনিস প্রস্তুত করে তাঁর উপঢৌকনের বিনিময় প্রদান করতেন। একদা তিনি তাঁকে বললেন, إِنَّ زَاهِرًا بَادِيَتُنَا وَنَحْنُ حَاضِرُوهُ.
"যাহের আমাদের বেদুঈন। (অথবা যাহের আমাদেরকে মরু-অঞ্চল থেকে উপহার এনে দেয়।) আর আমরা তার শহুরে সাথী। (অথবা আমরা তাকে আমাদের শহরের প্রয়োজনীয় জিনিস উপহার দিই।)”
যাহেরকে মহানবী ভালোবাসতেন। (ফলে তাঁর সাথে রসিকতা করতেন।) যাহের দেখতে ছিলেন কুশ্রী। একদা তিনি নিজের পণ্য বিক্রি করছিলেন। এমতাবস্থায় নবী তাঁর কাছে এসে তাঁর পিছন থেকে বগলের নিচে হাত পার ক'রে জড়িয়ে ধরলেন। (অথবা তাঁর পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে তাঁর চোখ দুটিতে হাত রাখলেন।) যাতে তিনি দেখতে না পান।
যাহের বললেন, 'কে? আমাকে ছেড়ে দিন।' أرسلني من هذا
অতঃপর তিনি লক্ষ্য করলেন বা বুঝতে পারলেন, তিনি নবী। সুতরাং নিজের পিঠকে ভালোভাবে তাঁর (অপার স্নেহময়) বুকে লাগিয়ে দিলেন।
নবী বললেন, "কে গোলাম কিনবে?" من يشتري العبد ؟
يا رسول الله إذا والله تجدني كاسدا
'আল্লাহর কসম! আমাকে সস্তা পাবেন!'
নবী বললেন, .لكن عند الله لست بكاسد
"কিন্তু তুমি আল্লাহর কাছে সস্তা নও!"
(আহমাদ ১২৬৪৮, আবু য়্যালা ৩৪৫৬, শারহুস সুন্নাহ, মুখতাসার শামায়েল ২০৪, মিশকাত ৪৮৮৯নং)
এ কেমন দাস? সুমহান প্রভুর দাসত্বে তাঁর মর্যাদা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল!
এটাই হওয়া চাই মানুষের জীবনের অভীষ্ট।
একদা আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ আরাক গাছের ডাল ভেঙ্গে দাঁতন সংগ্রহ করছিলেন। তাঁর পায়ের রলা ছিল সরু সরু। বাতাসে তিনি দুলতে লাগলেন। তা দেখে লোকেরা হাসতে লাগল। রাসূলুল্লাহ বললেন, "তোমরা কী নিয়ে হাসছ?” লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর নবী! ওর সরু পায়ের রলা নিয়ে।' তিনি বললেন,
((وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَهُمَا أَثْقَلُ فِي الْمِيزَانِ مِنْ أُحُدٍ)).
"সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! অবশ্যই ঐ (সরু) গোছাদুটি (কিয়ামতের) মীযানে উহুদ (পাহাড়) অপেক্ষা বেশি ভারী!” (আহমদ ৩৯৯১, ত্বাবারানী ৮৩৭ ১, আবু য়্যা'লা ৫৩১০নং)
তিনি ছিলেন কপর্দকশূন্য একজন সাহাবী। তাঁর দেহ ছিল কৃশ। পার্থিব জীবনে তাঁর কোন খ্যাতি ছিল না। তিনি কোন নেতা ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন সুমহান আল্লাহর এমন দাস যে, তিনি তাঁর নিকট বিশাল মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলেন। ইল্ম ও আমলে তাঁর জীবন পরিপূর্ণ ছিল। মু'মিনদের মনে তাঁর প্রতি ভালোবাসার আধিক্য ছিল। তাই কিয়ামতের দাঁড়িপাল্লায় তাঁর পায়ের গোছা দুটি উহুদ পাহাড় থেকেও বেশি ভারী!
সুবহানাল্লাহ! এ কেমন সফলতা? এ কেমন কৃতকার্যতা?
হাকীম বিন হিযাম ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে এক বছর ইয়ামান গিয়েছিলেন। সেখানের এক বাজারে সেখানকার বাদশা যুল-য়্যাযানের সুন্দর এক জোড়া লেবাস পঞ্চাশ দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় ক'রে মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ-কে উপহার দিতে গেলেন। তিনি বললেন, "আমরা মুশরিকদের উপহার গ্রহণ করি না। তবে এটা আমাকে বিক্রয় করতে পার।” তিনি তা ক্রয় ক'রে নিলেন এবং জুমআর দিন পরিধান ক'রে খুতবা দিলেন। কিন্তু তিনি বিলাস পছন্দ করতেন না। তাই তিনি সেটাকে উসামা বিন যায়দ-কে উপহার স্বরূপ পরতে দিলেন। উসামা ছিলেন কৃষ্ণকায় কুশ্রী। তাঁর পিতা ছিলেন স্বাধীনকৃত ক্রীতদাস। বয়সেও ছিলেন ছোট। একদা তিনি তা পরে বাজারে গেলে হাকীম বিন হিযামের নজরে পড়ল। তিনি উসামাকে বললেন, 'তুমি বাদশা যুল-য়্যাযানের এই লেবাস পরেছ? (তুমি কি এই লেবাসের যোগ্য?!)'
প্রশ্ন শুনে উসামা নির্দ্বিধায় উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ। (আমি এর যোগ্য।) অবশ্যই আমি যুল-য়্যাযান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আমার পিতা তার পিতা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আমার মাতা তার মাতা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ!' (হাকেম ৬০৫০, তাবারানী ৩০২৪, ৩০৫৪নং)
একজন গোলামের বেটা বলে, 'আমি বাদশা থেকে শ্রেষ্ঠ! আমার পিতামাতা একজন রাজার পিতামাতা থেকে শ্রেষ্ঠ!' কীসের ভিত্তিতে? কীসের স্পর্ধায়?
কীসের জন্য এ গর্ব?
গোলামী ও দাসত্বের ভিত্তিতে। যেহেতু উসামা সুমহান প্রতিপালকের গোলাম ও দাস। আর যুল-য়্যাযান বাদশা হলেও, দুনিয়ার বাদশা। কিন্তু আখেরাতের মিসকীন। যেহেতু সে কাফের। যেহেতু সে অর্থের দাস। সুমহান স্রষ্টার দাস নয়।
হ্যাঁ। তাঁরাই বুঝেছিলেন জীবনের উদ্দেশ্য। আর সে উদ্দেশ্য তাঁদের সাধিত হয়েছে। এটাই হল পরিপূর্ণ সাফল্য। মানুষের চোখে গোলাম হয়েও সুমহান প্রতিপালকের গোলাম হতে পারা বিশাল মর্যাদার, বিশাল সম্মানের ব্যাপার।
আর এ নিয়ে গর্ব! কেবল আল্লাহর বান্দা, গোলাম বা দাস হতে পারলেই সেই গৌরব অর্জন হয়, যা নিয়ে মানুষ গর্ব করতে পারে। যেহেতু সে গৌরবময় সুমহান আল্লাহর দাস, যিনি সকল সম্মান ও গৌরবের অধিকারী।
আছে এ অনুভূতি বহু মুসলিমদের মাঝে? আছে এ অনুভূতি যে, সে সকল অবিশ্বাসী থেকে শ্রেষ্ঠ? সে যে কোন বর্ণ, জাতি, ভাষা, দেশ বা পরিবেশের হোক, তার জন্ম যে ভাবেই হোক, প্রতিপালন যেখানেই হোক, সামাজিক পজিশন যাই হোক, পেশা বা কর্ম যাই হোক, সে মুসলিম, সে সুমহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী দাস। সে কোন সৃষ্টির নয়, বরং স্রষ্টার গোলাম। সুতরাং সেই সর্বশ্রেষ্ঠ। আছে কি মনের মধ্যে সেই গর্ব ও আত্মমর্যাদা?
মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُوْلَئِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ} (۷) سورة البينة
"নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।” (বাইয়েনাহঃ ৭)
তাহলে 'মুসলিম' বলে পরিচয় দিতে দ্বিধা ও সংকোচ কেন? নিজের পরিচয় গোপন করার এ দুর্বলতা কেন? নিজেকে হেয় ও তুচ্ছজ্ঞান ক'রে অসম্মানীদের নিকট সম্মানের আশায় নিজের স্বকীয়তা বিক্রয় কেন? পার্থিব পদ বা সুখ লাভের জন্য? পৃথিবীতে সুখ্যাতি লাভের জন্য?
((تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَعَبْدُ الدَّرْهَم وَعَبْدُ الْخَمِيصَةِ إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ تَعِسَ وَانْتَكَسَ وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ، طُوبَى لِعَبْدِ آخِذِ بِعِنَانِ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَشْعَتَ رَأْسُهُ مُغْبَرَةٍ قَدَمَاهُ إِنْ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ وَإِنْ كَانَ فِي السَّاقَةِ كَانَ فِي السَّاقَةِ إِنْ اسْتَأْذِنَ لَمْ يُؤْذِنْ لَهُ وَإِنْ شَفَعَ لَمْ يُشَفَّعْ)).
"ধ্বংস হোক দীনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম ও উত্তম পোশাকের গোলাম (দুনিয়াদার)! যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। সে ধ্বংস হোক, লাঞ্ছিত হোক! তার পায়ে কাঁটা বিঁধলে তা বের করতে না পারুক।
ঐ বান্দার জন্য সুসংবাদ যে আল্লাহর পথে নিজের ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রস্তুত আছে। যার মাথার কেশ আলুথালু, যার পদযুগল ধূলিমলিন। তাকে পাহারার কাজে নিযুক্ত করলে, পাহারার কাজে নিযুক্ত থাকে। আর তাকে সৈন্যদলের পশ্চাতে (দেখাশোনার কাজে) নিয়োজিত করলে, সৈন্যদলের পশ্চাতে থাকে। যদি সে কারো সাক্ষাতের অনুমতি চায়, তাহলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয় না এবং কারো জন্য সুপারিশ করলে, তার সুপারিশ গ্রহণ করা হয় না।” (বুখারী ২৮৮৭, মিশকাত ৫১৬১নং)
সুসংবাদ মহান আল্লাহর সেই গোলামের জন্য, যে মানুষের কাছে নগন্য হলেও তাঁর কাছে নগন্য নয়। সমস্ত গোলাম থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ এ গোলাম। গর্ব তো হবেই। সে কার গোলাম দেখতে হবে না? সে যে বিশ্বাধিপতি সারা জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর গোলাম। নিগ্রো হলেও পৃথিবীর যে কোন অবিশ্বাসী সুদর্শন রাজপুত্র অপেক্ষা কোটিগুণে শ্রেষ্ঠ। অনুরূপ বিশ্বাসী আত্মত্মসমর্পণকারী কালো কুৎসিৎ নারী পৃথিবীর যে কোনও অবিশ্বাসী রাজকন্যা বা বিশ্বসুন্দরী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
মহান আল্লাহ বলেছেন, { وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُّؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِك وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُوْلَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُوَ إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ} (২২১)
“অংশীবাদী রমণী যে পর্যন্ত না (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাস করে, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না। অংশীবাদী নারী তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও নিশ্চয় (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাসী তার থেকেও উত্তম। (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাস না করা পর্যন্ত অংশীবাদী পুরুষের সাথে (তোমাদের কন্যার) বিবাহ দিও না। অংশীবাদী পুরুষ তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাস তার থেকেও উত্তম। কারণ, ওরা তোমাদের আগুনের দিকে আহবান করে এবং আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় ইচ্ছায় বেহেস্ত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। তিনি মানুষের জন্য স্বীয় নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।” (বাক্বারাহঃ ২২১)
যেহেতু বিশ্বাসী বান্দা-বান্দী সেই মহান সত্তার বন্দেগী ও গোলামী করে, যিনি সকল সম্মানের অধিকারী।
মহান আল্লাহ বলেছেন, سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ) (۱۸۰) سورة الصافات}
“ওরা যা আরোপ করে, তা হতে তোমার প্রতিপালক পবিত্র ও মহান, যিনি সকল সম্মানের অধিকারী।” (স্বাফ্ফাত: ১৮০)
পরন্ত আল্লাহর বান্দা-বান্দী কাফেরদের কোন অসম্মানজনক কথায় দুঃখ পায় না। কারণ তিনি বলেছেন, {وَلَا يَحْزُنكَ قَوْلُهُمْ إِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ} (٦٥) سورة يونس
"আর ওদের কথা যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়। নিশ্চয়ই যাবতীয় শক্তি-সম্মান আল্লাহরই জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।” (ইউনুস: ৬৫)
নামধারী অনেক কপট মুসলিম আছে, যারা ধারণা করে, মুসলিমদের তুলনায় কাফেরদের মর্যাদা বেশি। তারা কাফেরদের দুনিয়ার সুখ-সমৃদ্ধি ও আয়-উন্নতি দেখে তাদেরকেই প্রকৃত সম্মানী ও ইজ্জতদার মনে করে। নিজেদেরকে তথাকথিত সম্মানে সম্মানিত করার জন্য কাফেরদের তোষামদ করে। প্রকৃতপক্ষে মুনাফিকরাও কাফের এবং মুসলিমদের ইজ্জতের সাথে তাদের ইজ্জতের কোন তুলনাই হয় না।
মহান আল্লাহ বলেন, {وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ} (۸) سورة المنافقون
"বস্তুতঃ যাবতীয় সম্মান তো আল্লাহরই এবং তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীদের। কিন্তু মুনাফিক (কপট)রা তা জানে না।” (মুনাফিকুনঃ ৮)
{الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِندَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ العِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا} (۱۳۹) سورة النساء
"যারা বিশ্বাসীদের পরিবর্তে অবিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। তারা কি তাদের নিকট সম্মান অনুসন্ধান করে? অথচ সমস্ত সম্মান তো আল্লাহরই।” (নিসাঃ ১৩৯)
বলা বাহুল্য, দুনিয়ার মানুষ শোনো!
{مَن كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا} (۱۰) سورة فاطر
"কেউ ক্ষমতা (ইজ্জত-সম্মান) চাইলে (সে জেনে রাখুক) সকল ক্ষমতা (ইজ্জত-সম্মান) তো আল্লাহরই।" (ফাত্বিরঃ ১০)
সুমহান ইজ্জত-ওয়ালার গোলাম হয়ে যাও, তাহলে তুমিই হবে পৃথিবীর সবার চাইতে বেশি ইজ্জত-ওয়ালা সম্মানী, তোমারই মাথায় পরানো হবে সম্মানের মুকুট, যদিও তুমি ক্রীতদাস হও।
একদা খলীফা উমার ইবনে খাত্তাব-এর সাথে উসফান নামক জায়গায় নাফে' বিন আব্দুল হারেষের সাক্ষাৎ হল। তিনি খলীফার পক্ষ থেকে মক্কার শাসক ছিলেন। খলীফা তাঁকে প্রশ্ন করলেন, 'উপত্যকাবাসী (মক্কা)র লোকেদের জন্য কাকে শাসক বানিয়ে এলে?' তিনি বললেন, 'ইবনে আবযা কে।' খলীফা বললেন, 'ইবনে আবযা আবার কে?' তিনি বললেন, 'আমাদের একজন স্বাধীনকৃত ক্রীতদাস।' খলীফা বললেন, 'তুমি স্বাধীনকৃত ক্রীতদাসকে তাদের শাসক বানিয়ে এসেছ?' তিনি বললেন, 'তিনি আল্লাহর কিতাবের ক্বারী (হাফেয) এবং ফারায়েয বিষয়ে আলেম।' খলীফা বললেন, 'শোন! তোমাদের নবী-ই তো বলেছেন,
(( إِنَّ اللَّهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَاماً وَيَضَعُ بِهِ آخَرِينَ )).
"মহান আল্লাহ এই গ্রন্থ দ্বারা বহু জনগোষ্ঠীর উত্থান ঘটান এবং এরই দ্বারা অন্য বহু জনগোষ্ঠীর পতন সাধন করেন।” (মুসলিম ১৯৩৪নং)
লোকচক্ষে তুচ্ছ হওয়া সত্ত্বেও যে মহান আল্লাহর দাসত্বের ফলে মর্যাদাবান হওয়া যায়, তার একটি প্রমাণ আবু হুরাইরা-এর বর্ণিত এই হাদীস। তিনি বলেন, কালোবর্ণের একজন মহিলা অথবা যুবক মসজিদ ঝাড়ু দিত। রাসূলুল্লাহ তাকে (একদিন) দেখতে পেলেন না। সুতরাং তিনি তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সাহাবীগণ বললেন, 'সে মারা গেছে।' তিনি বললেন, "তোমরা আমাকে সংবাদ দিলে না কেন?" তাঁরা যেন তার ব্যাপারটাকে নগণ্য ভেবেছিলেন। তিনি বললেন, "আমাকে তার কবরটা দেখিয়ে দাও।” সুতরাং তাঁরা তার কবরটি দেখিয়ে দিলেন এবং তিনি তার উপর জানাযা পড়লেন। অতঃপর তিনি বললেন,
((إِنَّ هَذِهِ القُبُورَ مَمْلُوةٌ ظُلْمَةً عَلَى أَهْلِهَا ، وَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُنَوِّرُهَا لَهُمْ بِصَلَاتِي عَلَيْهِمْ)).
"নিশ্চয় এ কবরসমূহ কবরবাসীদের জন্য অন্ধকারময়। আর আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য আমার জানাযা পড়ার কারণে তা আলোময় ক'রে দেন।” (বুখারী ৪৫৮, মুসলিম ২২৫৯নং)
মহান আল্লাহর দাস হতে পারলে ক্রীতদাসেরও মর্যাদা যে কত বৃদ্ধি পেতে পারে, তার প্রমাণে আরও একটি হাদীস প্রণিধান করুন।
বায়আতে রিযওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের একজন (সাহাবী) আবু হুবাইরাহ আইয ইবনে আম্র মুযানী বলেন, (হুদাইবিয়ার সন্ধি ও বায়আতের পর) আবু সুফিয়ান (কাফের অবস্থায়) সালমান, সুহাইব ও বিলালের নিকট এল। সেখানে আরো কিছু সাহাবা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা (আবু সুফিয়ানের প্রতি ইঙ্গিত ক'রে) বললেন, 'আল্লাহর তরবারিগুলো আল্লাহর শত্রুর হক আদায় করেনি।' (এ কথা শুনে) আবু বাকর বললেন, 'তোমরা এ কথা কুরাইশের বয়োবৃদ্ধ ও তাদের নেতার সম্পর্কে বলছ?' অতঃপর আবু বাক্স নবী-এর নিকট এলেন এবং (এর) সংবাদ দিলেন। নবী বললেন,
(( يَا أَبَا بَكْرٍ ، لَعَلَّكَ أَغْضَبْتَهُمْ ؟ لَئِنْ كُنْتَ أَغْضَبْتَهُمْ لَقَدْ أَغْضَبْتَ رَبَّكَ )).
"হে আবু বাকর! সম্ভবতঃ তুমি তাদেরকে (অর্থাৎ সালমান, সুহাইব ও বেলালকে) অসন্তুষ্ট করেছ। তুমি যদি তাদেরকে অসন্তুষ্ট করেছ, তাহলে তুমি আসলে তোমার প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করেছ।” সুতরাং আবু বাক্ তাঁদের নিকট এসে বললেন, ‘ভাইয়েরা! আমি কি তোমাদেরকে অসন্তুষ্ট করেছি?’ তাঁরা বললেন, ‘না। আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুক ভাইজান!’ (মুসলিম ৬৫৬৮-নং)
আল্লাহু আকবার! এ কোন্ মর্যাদা! এ কোন্ আত্মসমর্পণকারীদের ধর্ম! মানুষের দাসরাও সুমহান প্রতিপালকের প্রকৃত দাস হয়ে এত বিশাল সম্মানে ভূষিত হতে পারে!
মুসলিমদের সকলেই চেনে কৃষ্ণকায় বেলাল -কে। তিনি ছিলেন মদীনার মসজিদের রাসূলুল্লাহ -এর মুআযযিন। জীবনের মর্ম তাঁরা বুঝে ছিলেন, তাই দাসত্বের শৃঙ্খল পরা অবস্থায় কালাতিপাত করেও সুমহান প্রভুর প্রকৃত দাস হয়ে গর্বিত ও ধন্য হয়েছেন।
ومما زادني فخراً وتيها وكدت بأخمصي أطأ الثريا دخولي تحت قولك يا عبادي وأن أرسلت أحمد لي نبيا
(হে আল্লাহ!) যে সকল জিনিস আমার গর্ব ও ফখর বৃদ্ধি করেছে এবং তার ফলে আমার পদতল দিয়ে তারকাপুঞ্জ দলন করার উপক্রম হয়েছি, তা এই যে, আমি তোমার বাণী, ‘হে আমার দাসগণ!’---এর অন্তর্ভুক্ত। আর তুমি আমার জন্য আহমাদ (স.) কে নবীরূপে প্রেরণ করেছ।
📄 পার্থিব কর্মসমূহকে কীভাবে ইবাদত বানাবেন?
ইবাদত তো ইবাদতই, কিন্তু আপনার দৈনন্দিন জীবনের সাংসারিক কাজকর্মকে কীভাবে ইবাদতে পরিণত করতে পারেন, তা জেনে রাখা দরকার।
যে কোনও বৈধ সাংসারিক কাজ, যেমন ব্যবসা করা, চাষ করা, চাকরি করা, রান্না করা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া, পানাহার করা, সহবাস করা ইত্যাদি ইবাদতে পরিণত হতে পারে; যদি আপনিঃ-
প্রথমতঃ মু'মিন হন।
দ্বিতীয়তঃ তাতে সওয়াবের আশা রাখেন অথবা তার পশ্চাতে সুমহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য থাকে।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ} (١٦٢) سورة الأنعام
"বল, 'নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার উপাসনা (কুরবানী), আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।” (আনআমঃ ১৬২)
বলা বাহুল্য, আপনার জীবনের সকল কর্ম যেন সুমহান প্রতিপালকের জন্য হয়। আর তা করতে হবে আমাদের সকলকে। যেহেতু আমরা সকলেই তাঁর বান্দা এবং তাঁরই দেওয়া দানের উপর জীবনধারণ করছি।
ব্যবসা বা চাকরির মাধ্যমে অর্থোপার্জনের কথা ধরা যাক। তাতে যদি নিয়ত হয় উপার্জিত টাকা পেয়ে হারাম থেকে বাঁচব, আল্লাহর পথে ব্যয় করব, পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণ করব ইত্যাদি, তাহলে তাতে মহান আল্লাহ খুশি হবেন এবং তা হয়ে যাবে ইবাদত।
সা'দ বিন আবী অক্কাস , যে দশজন সাহাবীকে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল ইনি তাঁদের মধ্যে একজন, তিনি বলেন, বিদায় হজ্জ্বের বছর রাসূলুল্লাহ আমার রুগ্ন অবস্থায় আমাকে দেখা করতে এলেন। সে সময় আমার শরীরে চরম ব্যথা ছিল। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার (দৈহিক) জ্বালা-যন্ত্রণা কঠিন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে---যা আপনি স্বচক্ষে দেখছেন। আর আমি একজন ধনী মানুষ; কিন্তু আমার উত্তরাধিকারী বলতে আমার একমাত্র কন্যা। তাহলে আমি কি আমার মাল-সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ দান ক'রে দেব?' তিনি বললেন, "না।” আমি বললাম, 'তাহলে অর্ধেক মাল হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "না।” আমি বললাম, 'তাহলে কি এক তৃতীয়াংশ দান করতে পারি?' তিনি বললেন,
((الثلث والثلث كثيرٌ - أو كبيرٌ - إِنَّكَ إِنْ تَدْرُ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيرٌ مِنْ أَنْ تَدْرَهُمْ عَالَةً يتَكَفَّفُونَ النَّاسَ ، وَإِنَّكَ لَنْ تُنفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فِي امْرَأَتِكَ)).
"এক তৃতীয়াংশ (দান করতে পার), তবে এক তৃতীয়াংশও অনেক। কারণ এই যে, তুমি যদি তোমার উত্তরাধিকারীদের ধনবান অবস্থায় ছেড়ে যাও, তাহলে তা এর থেকে ভাল যে, তুমি তাদেরকে কাঙ্গাল করে ছেড়ে যাবে এবং তারা লোকের কাছে হাত পাতবে। (মনে রাখ,) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তুমি যা ব্যয় করবে তোমাকে তার বিনিময় দেওয়া হবে। এমনকি তুমি যে গ্রাস তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও তারও তুমি বিনিময় পাবে।”
আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি কি আমার সঙ্গীদের ছেড়ে পিছনে (মক্কায়) থেকে যাব?' তিনি বললেন,
(( إِنَّكَ لَنْ تُخَلَّفَ فَتَعْمِلَ عَمَلاً تَبْتَغِي بِهِ وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا ازْدَدتَ بِهِ دَرَجَةً ورِفعَةً ، وَلَعَلَّكَ أَنْ تُخَلَّفَ حَتَّى يَنتَفِعَ بِكَ أَقْوَامٌ وَيُضَرَّ بِكَ آخرون ....)
"তুমি যদি তোমার সঙ্গীদের মরার পর জীবিত থাক এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোন কাজ কর, তাহলে তার ফলে তোমার মর্যাদা ও সম্মান বর্ধন হবে। আর সম্ভবতঃ তুমি বেঁচে থাকবে। এমনকি তোমার দ্বারা কিছু লোক (মু'মিনরা) উপকৃত হবে। আর কিছু লোক (কাফেররা) ক্ষতিগ্রস্ত হবে।---" (বুখারী ১২৯৫, ৩৯৩৬, মুসলিম ৪২৯৬নং)
বরং অর্থোপার্জন আল্লাহর পথে জিহাদের সমতুল্য হতে পারে। আবু হুরাইরা বলেন, একদা আমরা আল্লাহর রসূল ﷺ-এর সাথে ছিলাম। এমন সময় পাহাড়ের পাদদেশ থেকে একজন (সুস্বাস্থ্যবান) যুবক বের হয়ে এল। আমরা যখন তাকে দেখলাম এবং তার প্রতি দৃষ্টি ফেলে রাখলাম, তখন বললাম, যদি এই যুবক তার যৌবন, উদ্যম ও শক্তিকে আল্লাহর পথে (জিহাদে) ব্যয় করত! (তাহলে কতই না উত্তম হতো।) আল্লাহর রসূল ﷺ আমাদের এ কথা শুনে বললেন,
وَمَا سَبِيلُ اللَّهِ إِلَّا مَنْ قُتِلَ؟ مَنْ سَعَى عَلَى وَالِدَيْهِ فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَنْ سَعَى عَلَى عِيَالِهِ فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَنْ سَعَى عَلَى نَفْسِهِ لِيُعِفَّهَا فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَنْ سَعَى عَلَى التَّكَاثُرِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ الشَّيْطَانِ ..
"(যুদ্ধে) খুন হওয়া ছাড়া কি আর আল্লাহর পথ (জিহাদ) নেই? যে ব্যক্তি নিজ পিতার জন্য রুযী-সন্ধান করে, তার কাজ আল্লাহর পথে, যে ব্যক্তি নিজ ছেলেমেয়ের জন্য রুযী-সন্ধান করে, তার কাজ আল্লাহর পথে এবং যে ব্যক্তি নিজেকে সৎ রাখার জন্য রুযী-সন্ধান করে, তার কাজও আল্লাহর পথে। কিন্তু যে ব্যক্তি ধনবৃদ্ধিতে গর্ব করার জন্য কর্ম করে, তার কাজ তাগূত অথবা শয়তানের পথে।” (বায্যার, বাইহাকী ১৮-২৮০, প্রমুখ, সিলসিলাহ সহীহাহ ২২৩২নং)
আমরা যে পানাহার করি, ঘুমাই ও স্বামী-স্ত্রী মিলন করি, তাতেও সওয়াব রয়েছে। কেবল নিয়তটাকে সঠিক ক'রে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। এর মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহর ইবাদতে সহযোগিতা গ্রহণ করব। স্বাস্থ্য ও মন ভালো রেখে আল্লাহর ইবাদতে বেশি মনোযোগী হব এবং অনেক হারাম থেকে রক্ষা পাব।
আবু যার বলেন, কিছু সাহাবা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ধনীরাই তো বেশী নেকীর অধিকারী হয়ে গেল। তারা নামায পড়ছে যেমন আমরা নামায পড়ছি, তারা রোযা রাখছে যেমন আমরা রাখছি এবং (আমাদের চেয়ে তারা অতিরিক্ত কাজ এই করছে যে,) নিজেদের প্রয়োজন-অতিরিক্ত মাল থেকে তারা সাদকাহ করছে।' তিনি বললেন,
(( أَوْلَيسَ قَدْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلَّ تَكْبِيرة صَدَقَةً ، وَكُلَّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهِي عَن الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ ، وفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ (( قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرُ ؟ قَالَ : (( أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرُ ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا في الحلال كَانَ لَهُ أَجْرٌ )).
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।” সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন, “কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে।” (মুসলিম ২৩৭৬নং)
আল্লাহু আকবার! করুণাময় প্রতিপালক কতভাবে আমাদের প্রতি করুণা ক'রে থাকেন! আমরা আমাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যক্তিগত কাজ করব, তাতেও রয়েছে সদকার সওয়াব! সেটাও ইবাদতে পরিণত হবে, কেবল নিয়তটাকে সহীহ ক'রে নিতে হবে।
মুআয বিন জাবাল রা. বলেছেন,
(أَمَّا أَنَا فَأَنَامُ وَأَقُومُ، فَأَحْتَسِبُ نَوْمَتِي كَمَا أَحْتَسِبُ قَوْمَتِي).
'আমি কিন্তু ঘুমাই এবং কিয়াম করি। সুতরাং আমি আমার ঘুমের মধ্যে সওয়াবের আশা রাখি, যেমন আমি আমার কিয়ামের মধ্যে সওয়াবের আশা রাখি।' (বুখারী ৪৩৪১, ৪৩৪৪, মুসলিম ৪৮-২২নং)
আমাদের প্রয়োজন আছে নিয়ত শুদ্ধ করার। পার্থিব কাজের ভিতরেও নিয়তে মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি কামনা করা।
এরপর রয়েছে মহান আল্লাহর যিকর। পার্থিব কাজ শুরু করার আগে যেখানে যে যিক্র ও দুআ আছে, তা পড়লে তো ইবাদতই হয়। পানাহার, মলমূত্র ত্যাগ, সহবাস, সওয়ারীতে সওয়ার, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির সময় ঠিক-ঠিক যিকর করা এবং শরয়ী নিয়মে তা সম্পাদন করলে সব ইবাদতে পরিণত হয়।
মহান আল্লাহ এমন ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করেছেন কুরআনে, যারা ব্যবসা-কর্মে ব্যস্ত থেকেও সুমহান প্রতিপালকের যিক্র থেকে উদাসীন হয় না। তিনি বলেছেন,
{فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَن تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ (٣٦) رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلُّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ} (۳۷) سورة النور
"সে সব গৃহে---যাকে আল্লাহ সমুন্নত করতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন---সকাল ও সন্ধ্যায় তাতে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, এমন সব লোক যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং নামায কায়েম ও যাকাত প্রদান করা হতে বিরত রাখে না, তারা ভয় করে সেদিনকে, যেদিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি ভীতি বিহ্বল হয়ে পড়বে।” (নূর : ৩৬-৩৭)
ঠিক তিনি এই নির্দেশই দিয়েছেন কুরআনে। তিনি বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِي لِلصَّلاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنتُمْ تَعْلَمُونَ (۹) فَإِذَا قُضِيَتْ الصَّلاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيراً لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۱۰) وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً أَوْ لَهُوا انفَضُّوا إِلَيْهَا وَتَرَكُوكَ قَائِماً قُلْ مَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ مِنْ اللَّهْوِ وَمِنْ التَّجَارَةِ وَاللَّهُ خَيْرُ الرَّازِقِينَ} (۱۱)
“হে বিশ্বাসিগণ! জুমুআর দিনে যখন নামাযের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের জন্য ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর। অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর ও আল্লাহকে অধিকরূপে সস্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও। যখন তারা কোন ব্যবসা বা খেল-তামাশা দেখে, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে ওর দিকে ছুটে যায়। বল, ‘আল্লাহর নিকট যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আর আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ রুযীদাতা।” (জুমুআহঃ ৯-১১)
শ্রমিক নিজ কর্মক্ষেত্রে, চাষী নিজ চাষ-কর্মে, গৃহবধূ নিজ গৃহস্থালি কাজকর্মে থেকে নিয়ত সঠিক রেখে সকল কর্মকে ইবাদতে পরিণত করতে পারে।
দুনিয়ায় জীবনধারণ করতে হলে জীবনোপকরণ প্রয়োজন। ইবাদত করতে হলে সুস্থভাবে জীবনযাপন প্রয়োজন। সম্ভবতঃ সেই জন্যই মহান আল্লাহ মানব-দানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য উল্লেখের পর-পরই জীবিকা বা রুযীর কথা উল্লেখ করেছেন।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونَ (٥٦) مَا أُريدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقِ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُون (৫৭) إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ (٥٨)
"আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। আমি তাদের নিকট হতে জীবিকা চাই না এবং এও চাই না যে, তারা আমার আহার্য যোগাবে। নিশ্চয় আল্লাহ; তিনিই রুযী দাতা প্রবল, পরাক্রান্ত।” (যারিয়াত: ৫৬-৫৮)
মানব-দানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হল: মহান আল্লাহর ইবাদত করা।
তিনি মানব-দানবের নিকট থেকে কোন উপকার নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদেরকে সৃষ্টি করেননি। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন; বরং সারা সৃষ্টি তাঁরই মুখাপেক্ষী। তাঁর কোন জীবিকা বা খাদ্যের প্রয়োজন পড়ে না। বরং তিনিই সকলের জীবিকা ও খাদ্যের ব্যবস্থা ক'রে থাকেন।
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
{وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ} (۲۲) سورة الذاريات "আকাশে রয়েছে তোমাদের রুযী ও প্রতিশ্রুত সবকিছু।” (যারিয়াতঃ ২২)
{وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مبين} (٦) سورة هود
"আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী কোন এমন প্রাণী নেই যে, তার রুযী আল্লাহর দায়িত্বে নেই। আর তিনি প্রত্যেকের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন; সবই সুস্পষ্ট গ্রন্থে (লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ) রয়েছে।” (হৃদঃ ৬)
{أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضًا سُخْرِيًّا وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ} (৩২)
"এরা কি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ বন্টন করে! আমিই ওদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করেছি ওদের পার্থিব জীবনে এবং এককে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছি; যাতে ওরা একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে এবং ওরা যা জমা করে, তা হতে তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ উৎকৃষ্টতর।” (যুখরুফঃ ৩২)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوماً نُّطْفَةً ، ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ ، ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذلِكَ ، ثُمَّ يُرْسَلُ المَلَكُ ، فَيَنْفُخُ فِيهِ الرُّوحَ ، وَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ : يكتب رِزْقِهِ وَأَجَلِهِ وَعَمَلِهِ وَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ ....))
"তোমাদের এক জনের সৃষ্টির উপাদান মায়ের গর্ভে চল্লিশ দিন যাবৎ বীর্যের আকারে থাকে। অতঃপর তা অনুরূপভাবে চল্লিশ দিনে জমাটবদ্ধ রক্তপিন্ডের রূপ নেয়। পুনরায় তদ্রূপ চল্লিশ দিনে গোস্তের টুকরায় রূপান্তরিত হয়। অতঃপর তার নিকট ফিরিস্তা পাঠানো হয়। সুতরাং তার মাঝে 'রূহ' স্থাপন করা হয় এবং চারটি কথা লিখার আদেশ দেওয়া হয়; তার রুযী, মৃত্যু, আমল এবং পাপিষ্ঠ না পুণ্যবান হবে, তা লিখা হয়।---" (বুখারী ৩২০৮, মুসলিম ৬৮-৯৩নং)
لا تَسْتَبْطِئُوا الرِّزْقَ فَإِنَّهُ لَمْ يَكُنْ عَبْدٌ يَمُوتُ حَتَّى يَبْلُغَهُ آخِرُ رِزْقَ هُوَ لَهُ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ مِنَ الْحَلَالِ وَتَرْكِ الْحَرَامِ ..
"তোমরা রুজী সন্ধানের ব্যাপারে জলদিবাজি করো না। পৃথিবীতে কোন বান্দাই তার ভাগ্যে নির্ধারিত সর্বশেষ রুযী অর্জন না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রুযী সন্ধানে মধ্যবর্তী পন্থা (সুন্দর ও স্বাভাবিক বৈধ পথ) অবলম্বন কর। হালাল উপায় গ্রহণ কর এবং হারাম উপায় বর্জন কর।” (ইবনে মাজাহ ২১৪৪, হাকেম ২১৩৫, বাইহাকী ১০৭০৭, তাবারানীর আওসাত্ব ৩১০৯, সহীহুল জামে' ৭৩২৩নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
((إِنَّ رُوحَ القُدُسِ نَفَتَ فِي رُوعِي أَن نَفْساً لنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ أَجَلَهَا وَتَسْتَوْعِبَ رِزْقَهَا فَاتَّقُوا الله وأجْمِلُوا في الطلب ولا يَحْمِلُنَّ أَحَدَكُمُ اسْتِبْطاءُ الرِّزْقِ أَنْ يَطْلُبَهُ بِمَعْصِيَةِ الله فإنّ الله تعالى لا يُنالُ مَا عِنْدَهُ إِلا بِطَاعَتِهِ)).
“জিবরীল আমার হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত করেছেন যে, কোন আত্মাই তার ভাগ্যে নির্ধারিত সর্বশেষ আয়ু ও রুযী পূর্ণ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রুজী সন্ধানে মধ্যবর্তী পন্থা (সুন্দর ও স্বাভাবিক বৈধ পথ) অবলম্বন কর। রুযী আসতে দেরী দেখে তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তার সন্ধানে উদ্বুদ্ধ না হয়। যেহেতু (রুযী আল্লাহর হাতে আর) তা তাঁর বাধ্য না হয়ে অর্জন করা যায় না।” (হিল্যাহ ১০২৭, সহীহুল জামে' ২০৮৫নং)
সুতরাং প্রত্যেক জীবের জীবিকা বন্টিত ও বিতড়িত আছে। রুযীর মালিক আল্লাহ। তিনিই রুযী দেবেন। অতএব তাঁর উপরেই ভরসা রাখতে হবে।
তবে তার মানে এই নয় যে, পরিশ্রম ও চেষ্টার প্রয়োজন নেই, আপনা-আপনিই রুযী আসতে থাকবে।
অবশ্যই রুযী-সন্ধানে রুযীদাতা আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে। সেই সাথে পরিশ্রম ও চেষ্টা চালিয়ে জীবিকার উপায় অবলম্বন করতে হবে। পরিশ্রম, চেষ্টা ও উপায় সৎ ও বৈধ হতে হবে।
তাহলেই তা ইবাদত ও আল্লাহর পথে জিহাদে পরিণত হবে। অন্যথায় মহানবী বলেছেন,
إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ ذُلا لَا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ ..
"যখন তোমরা 'ঈনাহ' ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।" (আহমাদ ৫৫৬২, আবু দাউদ ৩৪৬৪, বাইহাকী ১০৪৮-৪নং)
দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করার অর্থ বড় প্রশস্ত। তবে রুযী সন্ধানের ব্যাপারে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, তা দ্বীনের অনুমোদিত হালাল ও বৈধ উপায়ে হতে হবে। নচেৎ হারাম উপার্জিত জীবিকা গ্রহণ করলে মুসলিমের দুআই কবুল হবে না। আর দুআ হল প্রধান ইবাদত।
যেমন জীবিকা উপার্জনের পথ হালাল হলেও এমন হওয়া উচিত নয় যে, মুসলিম তারই পশ্চাতে দৌড় দিতে গিয়ে দুনিয়ার দাস হয়ে যাবে। বরং দুই দিক বজায় রাখলে তবেই আসবে সাফল্য।
আল্লাহর রসূল বলেছেন, يقول ربكم تبارك وتعالى : يا ابن آدم تفرغ لعبادتي أملأ قلبك غنى، وأملأ يديك رزقا ، یا ابن آدم لا تباعد مني فأملأ قلبك فقرا، وأملأ يديك شغلاً)).
"তোমাদের প্রতিপালক বলেন, 'হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতে নিরত হও, আমি তোমার হৃদয়কে ধনবত্তায় এবং উভয় হাতকে রুযীতে ভরে দেব। হে আদম সন্তান! আমার নিকট থেকে দূরে সরে যেয়ো না। নচেৎ তোমার হৃদয়কে অভাব দিয়ে এবং উভয় হাতকে কর্মব্যস্ততা দিয়ে ভরে দেব।” (হাকেম ৭۹২৬, ত্বাবারানী ১৬৮৯৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৩৫৯নং)
من كانت الدنيا همه فرق الله عليه أمره، وجعل فقره بين عينيه، ولم يأته من الدنيا إلا ما كتب له. ومن كانت الآخرة نيته، جمع الله له أمره، وجعل غناه في قلبه ، وأتته الدنيا وهي راغمة».
"যে ব্যক্তির প্রধান চিন্তা (লক্ষ্য) ইহলৌকিক সুখভোগ (দুনিয়াদারীই) হয়, আল্লাহ তার প্রচেষ্টাকে তার প্রতিকূলে বিক্ষিপ্ত করে দেন, তার দারিদ্রকে তার দুই চক্ষুর সামনে করে দেন, আর দুনিয়ার সুখসামগ্রী তার ততটুকুই লাভ হয় যতটুকু তার ভাগ্যে লিখা থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য (ও পরম লক্ষ্য) পারলৌকিক সুখভোগ (আখেরাতই) হয়, আল্লাহ তার প্রচেষ্টাকে তার অনুকূলে ঐকান্তিক করে দেন। তার অন্তরে অমুখাপেক্ষিতা (ধনবত্তা) ভরে দেন। আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুনিয়ার (সুখসামগ্রী) তার নিকট এসে উপস্থিত হয়।” (ইবনে মাজাহ ৪১০৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯৫০ নং)
যেমন ইবাদতের জন্য সংসার ত্যাগী হতে হবে না। 'বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয় অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ--।'
এই হল ইসলামের বিধান। ইসলামের বিধানে দুনিয়া ও আখেরাতের মাঝে সামঞ্জস্য ও ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে এবং কোন ব্যাপারেই অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করা যাবে না।
এ ব্যাপারে কয়েকটি হাদীস প্রণিধানযোগ্য।
আবু জুহাইফা অহব ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন যে, নবী (হিজরতের পর মদীনায়) সালমান ও আবু দার্দার মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন। অতঃপর সালমান (একদিন তাঁর দ্বীনী ভাই) আবু দার্দার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে (তাঁর বাড়ী) গেলেন। তিনি (আবু দার্দার স্ত্রী) উম্মে দার্দাকে দেখলেন, তিনি মলিন কাপড় পরে আছেন। সুতরাং তিনি তাঁকে বললেন, 'তোমার এ অবস্থা কেন?' তিনি বললেন, 'তোমার ভাই আবু দার্দার দুনিয়ার কোন প্রয়োজনই নেই।' (ইতিমধ্যে) আবু দার্দাও এসে গেলেন এবং তিনি তাঁর জন্য খাবার তৈরী করলেন। অতঃপর তাঁকে বললেন, 'তুমি খাও। কেননা, আমি রোযা রেখেছি।' তিনি বললেন, 'যতক্ষণ না তুমি খাবে, আমি খাব না।' সুতরাং আবু দার্দাও (নফল রোযা ভেঙ্গে দিয়ে তাঁর সঙ্গে) খেলেন।
অতঃপর যখন রাত এল, তখন (শুরু রাতেই) আবু দার্দা নফল নামায পড়তে গেলেন। সালমান তাঁকে বললেন, '(এখন) শুয়ে যাও।' সুতরাং তিনি শুয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার তিনি (বিছানা থেকে) উঠে নফল নামায পড়তে গেলেন। আবার সালমান বললেন, 'শুয়ে যাও।' অতঃপর যখন রাতের শেষাংশ এসে পৌঁছল, তখন তিনি বললেন, 'এবার উঠে নফল নামায পড়।' সুতরাং তাঁরা দু'জনে একত্রে নামায পড়লেন। অতঃপর সালমান তাঁকে বললেন, 'নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার রয়েছে। তোমার প্রতি তোমার আত্মারও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান কর।' অতঃপর তিনি নবী -এর নিকট এসে তাঁকে সমস্ত ঘটনা শুনালেন। নবী বললেন, "সালমান ঠিকই বলেছে।” (বুখারী ১৯৬৮, ৬১৩৯নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, মহানবী আব্দুল্লাহ বিন আম্র বিন আস-কে বলেছিলেন,
(( أَلَمْ أَخْبَرُ أَنَّكَ تَصُومُ النَّهَارَ وتَقُومُ اللَّيْلَ ..... فَلَا تَفْعَلْ : صُمْ وَأَفْطِرُ ، وَلَمْ وَقُمْ ، فَإِنَّ لِجَسَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا ، وَإِنَّ لِعَيْنَيكَ عَلَيْكَ حَقًّاً ، وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا ، وَإِنَّ لِزَوْرِكَ عَلَيْكَ حَقًّا.....
"আমি কি এই সংবাদ পাইনি যে, তুমি দিনে রোযা রাখছ এবং রাতে নফল নামায পড়ছ? --- পুনরায় এ কাজ করো না। তুমি রোযাও রাখ এবং (কখনো) ছেড়েও দাও। নিদ্রাও যাও এবং নামাযও পড়। কারণ তোমার উপর তোমার দেহের অধিকার আছে। তোমার উপর তোমার চক্ষুদ্বয়ের অধিকার আছে। তোমার উপর তোমার স্ত্রীর অধিকার আছে এবং তোমার উপর তোমার অতিথির অধিকার আছে।---"
আয়েশা ও সা'দ কর্তৃক বর্ণিত, উষমান বিন মাযউন আবেগময় ইবাদত শুরু করেছিলেন। সংসার-বিরাগী হয়ে সব ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতে মন দিয়েছিলেন। মহানবী তাঁকে বলেছিলেন,
يَا عُثْمَانُ إني لم أومر بالرهبانية) أَرَغِبْتَ عَنْ سُنَّتِي ..
"হে উষমান! আমাকে সন্ন্যাসবাদে আদেশ দেওয়া হয়নি। তুমি কি আমার তরীকা থেকে বিমুখ হয়েছ?”
উষমান বললেন, 'না হে আল্লাহর রসুল! আমি তো আপনার তরীকাই অনুসন্ধান করছি।' তিনি বললেন (তাহলে শোন),
) فَإِنِّى أَنَامُ وَأَصَلَّى وَأَصُومُ وَأَفْطِرُ وَأَنْكِحُ النِّسَاءَ فَاتَّقِ اللَّهَ يَا عُثْمَانُ فَإِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِضَيْفِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَصُمْ وَأَفْطِرْ وَصَلَّ وَنَمْ ».
"আমার তরীকা হল, আমি (রাতে) নামায পড়ি এবং ঘুমাই, (কোনদিন) রোযা রাখি এবং (কোনদিন) রাখি না, বিবাহ করি ও তালাক দিই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার তরীকা থেকে বিমুখ হবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। হে উষমান! নিশ্চয় তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হক আছে, তোমার উপর তোমার নিজের হক আছে, তোমার উপর তোমার মেহমানের হক আছে....।" (আবু দাউদ ১৩৭১, দারেমী ২১৬৯নং, প্রমুখ)
আনাস রা. বলেন, তিন ব্যক্তি নবী-এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী -এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল, তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, 'আমাদের সঙ্গে নবী -এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক'রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।' সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন,
) أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا ؟ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ لِلهِ ، وَأَتْقَاكُمْ لَهُ ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي )).
"তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তাঁর ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখি এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (বুখারী ৫০৬৩, মুসলিম ৩৪৬৯নং)
সর্বশেষ কথা, জীবনের মূল উদ্দেশ্য হল আল্লাহর দাসত্ব। মূল লক্ষ্য দুনিয়া নয়; বরং আখেরাত। দুনিয়ায় হারলাম বা জিতলাম, তা আসল দেখার নয়; আসল হল, আখেরাতের জিত। পরকালের সাফল্যই হল প্রকৃত সাফল্য। আর সুমহান প্রভুর প্রকৃত দাস হতে পারলেই সেই সাফল্য লাভে ধন্য হওয়া যাবে। তিনি আমাদেরকে তওফীক দিন। আমীন।
📄 সমাপ্ত
وصلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. সমাপ্ত