📄 ইবাদতের উপকারিতা
ইবাদতের ফলে মানুষ পাপ-পঙ্কিলতা থেকে বিরত থাকতে পারে এবং যাবতীয় সুন্দর কর্ম করতে পারে।
ইবাদতের ফলে মানুষ প্রকৃত ‘মানুষ’ রূপে গড়ে ওঠে। ইবাদতের ফলে মানুষের আত্মা ও চরিত্র সুন্দর হয়। ইবাদতের ফলে মানুষের পার্থিব জীবন সুখের হয়। মহান স্রষ্টা বলেছেন, {مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ} (۹۷) سورة النحل
"পুরুষ ও নারী যে কেউই বিশ্বাসী হয়ে সৎকর্ম করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই সুখী জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।” (নাহল: ৯৭)
ইবাদতের ফলে সুমহান স্রষ্টা সন্তুষ্ট হন। ইবাদতের ফলে মানুষের পরকালের জীবন চির সুখের হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {مَنْ عَمِلَ سَيِّئَةً فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا وَمَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُوْلَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ يُرْزَقُونَ فِيهَا بِغَيْرِ حِسَابٍ} (٤٠) سورة غافر
"কেউ মন্দ কাজ করলে সে কেবল তার কর্মের অনুরূপ শাস্তি পাবে এবং স্ত্রী কিংবা পুরুষের মধ্যে যারা বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করে, তারা প্রবেশ করবে জান্নাতে, সেখানে তাদেরকে অপরিমিত রুযী দান করা হবে।” (মু'মিনঃ ৪০)
পক্ষান্তরে ইবাদত না করার ফলে এর বিপরীত ফল দেখা যায়। মানব-জীবন বিষময় হয়ে ওঠে। সমাজে পাপ ও অপরাধ সমানে বেড়ে চলে। নিরাপত্তার অভাবে মানুষ সুখের স্বাদ গ্রহণ করার সুযোগ পায় না। কোন কোন মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলে আত্মহত্যার পথই সহজ পথ হয়।
মহান প্রতিপালক বলেছেন, {فَمَنْ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلا يَشْقَى (۱۲۳) وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى} (١٢٤) سورة طه
"যে আমার পথনির্দেশ অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না এবং দুঃখ-কষ্টও পাবে না। যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার হবে সংকীর্ণতাময় জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।” (ত্বা-হাঃ ১২৩-১২৪)
বলা বাহুল্য, ইবাদত ও দাসত্বের জীবনই হল ইহ-পরকালে সাফল্য লাভের জীবন। যে আল্লাহর দাস হবে, যে 'প্রাক্টিসিং মুসলিম' হবে, সে ইহ-পরকালে সফল হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ}
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা রুকু কর, সিজদা কর এবং তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর ও সৎকর্ম কর; যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (হাজ্জঃ ৭৭)
📄 ইবাদতের রুকন (স্তম্ভ)
ইবাদত ৩টি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনটির একটি স্তম্ভ বাদ পড়লে ইবাদতের ইমারত ভেঙ্গে পড়ে তথা ইবাদত শুদ্ধ হয় না। আর তা হল ভালোবাসা, ভয় ও আশা।
এক: ভালোবাসা
সুতরাং আল্লাহকে কেবল ভয় ক'রে বা তাঁর শাস্তি ও জাহান্নামের ভয় ক'রে ইবাদত করলে এবং তাঁর কাছে সওয়াবের আশা ও জান্নাতের লোভ ক'রে ইবাদত করলে ইবাদত শুদ্ধ হবে না। অবশ্যই সেই সাথে ভালোবাসা থাকতে হবে। সুমহান মা'বুদকে ভালোবেসে ইবাদত করতে হবে।
মহান আল্লাহর ভালোবাসা একটি বড় নিয়ামত। মহান প্রতিপালক বান্দাকে ভালোবাসবেন এবং বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে, এই ভালোবাসার কোন বিকল্প নেই, কোন তুলনা নেই। পৃথিবীর বুকে যত রকমের ভালোবাসা আছে, সকল ভালোবাসার উর্ধ্বে হল এই শ্রদ্ধা, ভক্তি ও সমীহ সম্বলিত ভালোবাসা।
এই ভালোবাসার অধিকারী হয় আল্লাহর মু'মিন বান্দা। মু'মিন বান্দা তার নিজ বন্দেগীতে অনুভব ক'রে থাকে এই ভালোবাসার মধুরতা। প্রত্যেক দাসই তার নিজ দাসত্বে আস্বাদন ক'রে থাকে এই ভালোবাসার মিষ্টতা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا } (৯৬) সূরা মরিয়ম
"যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, পরম দয়াময় তাদের জন্য (পারস্পরিক) সম্প্রীতি সৃষ্টি করবেন।” (মারয়্যাম: ৯৬)
দাসের দাসত্বে যে ভালোবাসা থাকে, সেই অতুলনীয় ভালোবাসা সকল ভালোবাসার উপর প্রাধান্য পায়। এ হল শরয়ী ভালোবাসা, যা প্রকৃতিগত ভালোবাসার অনেক ঊর্ধ্বে।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (٢٤) سورة التوبة
"বল, তোমাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, স্ত্রী ও আত্মীয়গণ, অর্জিত ধনরাশি এবং সেই ব্যবসা-বাণিজ্য তোমরা যার অচল হওয়ার ভয় কর এবং প্রিয় বাসস্থানসমূহ যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর আদেশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। বস্তুতঃ আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।” (তাওবাহঃ ২৪)
মহানবী বলেছেন,
ثَلاثَ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الإِيمَان مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَدْهُ اللَّهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ ..
"যার মধ্যে তিনটি বস্তু পাওয়া যাবে, সে ঐ তিন বস্তুর মাধ্যমে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করবে। (১) আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তার নিকট সর্বাধিক প্রিয়তম হবে, (২) কোন ব্যক্তিকে সে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভাল বাসবে এবং (৩) সে (মুসলমান হওয়ার পর) পুনরায় কুফরীতে ফিরে যেতে এমন অপছন্দ করবে, যেমন সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।” (বুখারী ১৬, মুসলিম ১৭৪নং)
আর ভালোবাসা হল অন্তরের কাজ। যা মুখেও স্বীকার ও প্রকাশ করতে হয়। তবে কাজে প্রকাশ না হলে সে ভালোবাসার কোন মূল্য থাকে না। ভালোবাসার বিশুদ্ধতা ও আন্তরিকতার পরীক্ষা হয় কার্যক্ষেত্রে ও আমলের ময়দানে। সুমহান প্রতিপালক বলেছেন,
{قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ}
"বল, 'তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (আলে ইমরান: ৩১)
উক্ত ভালোবাসা, যে বিশেষ ভালোবাসা ও ভক্তি বান্দা তার সুমহান প্রতিপালকের জন্য নিজ অন্তরে স্থান দিয়ে থাকে, তা কোন সৃষ্টির জন্য দেওয়া যাবে না। কোন জ্বিন-ইনসান বা অন্য সৃষ্টি সে ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যই নয়। আর যদি কোন বান্দা অনুরূপ ভালোবাসা কোন সৃষ্টিকে নিবেদন ক'রে থাকে, সে মুশরিক হয়ে যায়।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَاداً يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لله} (١٦٥) سورة البقرة
"আর কোন কোন লোক আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যকে (আল্লাহর) সমকক্ষ বলে মনে করে এবং তাদেরকে আল্লাহকে ভালোবাসার মত ভালবাসে, কিন্তু যারা বিশ্বাস করেছে, তারা আল্লাহর ভালবাসায় দৃঢ়তর।” (বাক্বারাহঃ ১৬৫)
দুইঃ ভয়
মহান আল্লাহর ইবাদতে ভয়ও থাকতে হবে। কেবল ভালোবাসা ও আশা থাকলে দাসের দাসত্ব পরিপূর্ণ হবে না। বরং সেই সাথে তাঁর ভীতি অন্তরে থাকতে হবে। তাঁর আযাব ও জাহান্নামের ভয় থাকতে হবে। ইবাদত কবুল হচ্ছে কি না, তার ভয় থাকতে হবে।
মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাগণের গুণ বর্ণনায় বলেছেন, {تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ}
"তারা শয্যা ত্যাগ করে আকাঙ্ক্ষা ও আশংকার সাথে তাদের প্রতিপালককে ডাকে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী প্রদান করেছি, তা হতে তারা দান করে।” (সাজদাহঃ ১৬)
{وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ} (٦٠) سورة المؤمنون
"যারা তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে, এই বিশ্বাসে তাদের যা দান করবার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে।” (মু'মিনুনঃ ৬০)
মা আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) আল্লাহর রসূল -কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এ (ভীত-কম্পিত) কি সেই ব্যক্তি, যে ব্যভিচার করে, চুরি করে ও মদ পান করে?' উত্তরে তিনি বললেন, لَا يَا بِنْتَ أَبِي بَكْرِ يَا بِنْتَ الصِّدِّيقِ ، وَلَكِنَّهُ الَّذِي يُصَلِّي وَيَصُومُ وَيَتَصَدَّقُ وَهُوَ يَخَافُ أَنْ لَا يُقْبَلَ مِنْهُ.
"না, হে আবু বাকরের বেটি, হে সিদ্দীকের বেটি! সে হল সেই ব্যক্তি, যে রোযা রাখে, দান করে ও নামায পড়ে, কিন্তু ভয় করে যে, তা হয়তো কবুল হবে না।" (আহমাদ ২৫৭০৫, তিরমিযী ৩১৭৫, ইবনে মাজাহ ৪১৯৮, হাকেম ৩৪৮-৬নং)
মহান আল্লাহর নির্দেশ হল, {وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ} (٥٦) سورة الأعراف
“পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর ওতে বিপর্যয় ঘটায়ো না এবং তাঁকে ভয় ও আশার সঙ্গে আহবান কর। নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মপরায়ণদের নিকটবর্তী।” (আ'রাফ: ৫৬)
বলাই বাহুল্য যে, এ ভয় কোন প্রকৃতিগত ভয় নয়। এ ভয় কোন শত্রু, বাঘ বা বিপদকে ভয় করার মতো নয়। এ এক বিশেষ ভয় ও সমীহ, শ্রদ্ধামিশ্রিত ভীতি, শরয়ী ভয়। যে ভয় আল্লাহকে করা হয়, সে ভয় অন্য কাউকে করা যাবে না। নচেৎ তা শির্কে পরিণত হয়ে যাবে।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ} (١٧٥)
"ঐ (বক্তা) তো শয়তান; যে (তোমাদেরকে) তার (কাফের) বন্ধুদের ভয় দেখায়; সুতরাং যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তাহলে তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর।" (আলে ইমরানঃ ১৭৫)
{وَحَاجَهُ قَوْمُهُ قَالَ أَتُحَاجُّونَي فِي اللهِ وَقَدْ هَدَانِ وَلَا أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ إِلَّا أَن يَشَاء رَبِّي شَيْئًا وَسِعَ رَبِّي كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ (۸۰) وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُم بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالأَمْنِ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ} (۸۱) سورة الأنعام
"ইব্রাহীমের সম্প্রদায় তার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হল। সে বলল, 'তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। আমার প্রতিপালক অন্যবিধ ইচ্ছা না করলে তোমরা যাকে তাঁর অংশী কর, তাকে আমি ভয় করি না। সবকিছুই আমার প্রতিপালকের জ্ঞানায়ও। তবে কি তোমরা অনুধাবন কর না? তোমরা যাকে আল্লাহর অংশী কর, আমি তাকে কিরূপে ভয় করব? অথচ তোমরা ভয় কর না যে, তোমরা আল্লাহর সাথে এমন কিছুকে শরীক ক'রে চলছ, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদের নিকট কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। সুতরাং যদি তোমরা জান (তাহলে বল), দু'দলের মধ্যে কোন্ দলটি নিরাপত্তালাভের অধিকারী?' (আনআমঃ৮০-৮১)
বান্দা যখন মা'বুদকে ভয় করবে, তখন নিশ্চয় সে তার প্রতি নিতান্ত বিনয়ী হবে। পরিপূর্ণ কাকুতি-মিনতির সাথে তাঁর ইবাদত করবে।
তার মনে ঔদ্ধত্য থাকবে না, অমুখাপেক্ষিতা থাকবে না。
তিনঃ আশা
বান্দার বন্দেগীতে ও দাসের দাসত্বে আশা ও লোভ থাকতে হবে। বান্দার মনে থাকবে মহান প্রতিপালকের পুরস্কার, প্রতিদান ও অনুগ্রহ পাওয়ার আশা।
জান্নাতের লোভে ও তার চির সুখের আশায় তাঁর দাসত্ব করতে হবে। মনে থাকবে তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষিতা, আস্থা ও ভরসা। অবশ্য সেই আশা, যে আশা অন্যের কাছে করা যায় না এবং যে আশা কর্মযুক্ত থাকে। নচেৎ কর্ম না ক'রে কেবল কামনা করলে কিছু লাভ হবার নয়。
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاء رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا} (۱۱۰)
"সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে।” (কাহফঃ ১১০)
পূর্বের কিছু আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহর বান্দাগণের গুণ হল, তারা তাঁকে ভয় ও আশার সাথে আহবান করে, তাঁর নিকট প্রার্থনা করে।
কোন বান্দাই সঠিকভাবে, বাঞ্ছিত পদ্ধতিতে বন্দেগী করতে সক্ষম হয় না। তাতে কোন না কোন ত্রুটি থেকেই যায়। শয়তান ও মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে ইবাদত করতে হয়। আর সেই ক্ষেত্রে কাজ করে আশা।
মহান দয়াময় তাঁর দয়া হতে নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং বান্দার উচিত, আশাবাদী হয়ে যথাসাধ্য তাঁর আনুগত্য ক'রে যাওয়া।
মহানবী ﷺ বলেছেন,
(( لَا يَمُوتَنَ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ الظَّنَّ بِاللَّهِ - عَزَّ وَجَلَّ )).
"সুমহান আল্লাহর প্রতি সুধারণা না রেখে তোমাদের কেউ যেন অবশ্যই মৃত্যুবরণ না করে।” (মুসলিম ৭৪১২নং)
তিনি আরো বলেছেন,
(( قَالَ اللَّهُ - عَزَّ وَجَلَّ - : أَنَا عِنْدَ ظَنَّ عَبْدِي بِي ، وَأَنَا مَعَهُ حَيْثُ يَذْكُرُنِي )).
"আল্লাহ আয্যা অজাল্ল বলেন, 'আমি সেইরূপ, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি, যখন যে আমাকে স্মরণ করে।” (বুখারী ৭৪০৫ নং, মুসলিম ৭১২৮নং)
এই হল ইবাদতের তিনটি স্তম্ভ। যার একটি অচল হলে বাকি দুটিও অচল অকেজো। এ যেন একটি তিন চাকাবিশিষ্ট রিক্সার মতো। ভালোবাসা হল সামনের চাকা। অথবা একটি উড়ন্ত পাখির মতো। ভালোবাসা তার মাথা। আর ভীতি ও আশা তার দুই ডানা।
মহান আল্লাহ একটি আয়াতে দাসত্বের উক্ত তিনটি স্তম্ভের কথার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন,
أُولَئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا) (٥٧) سورة الإسراء
"তারা যাদেরকে আহবান করে, তারাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকট হতে পারে, তারা তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে; নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকের শাস্তি ভয়াবহ।” (বানী ইস্রাঈল: ৫৭)
"তারাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকট হতে পারে"---এতে আছে ভালোবাসা। যেহেতু ভালোবাসা নৈকট্য চায়।
"তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে"---এতে রয়েছে আশা। আর "তাঁর শাস্তিকে ভয় করে"---এতে রয়েছে ভয়। উক্ত ৩টি খুঁটি ছাড়া ইবাদতের ইমারত প্রতিষ্ঠিত থাকবে না।
বলাই বাহুল্য যে, কবির এ কথা সঠিক নয়, 'খোদার প্রেমের শারাব পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই প'ড়ে! ছেড়ে মসজিদ আমার মুর্শিদ এল যে এই পথ ধরে।। দুনিয়াদারীর শেষে আমার নামাজ রোজার বদলাতে চাই না বেহেস্ত খোদার কাছে নিত্য মোনাজাত ক'রে।' - নজরুল ইসলামী সঙ্গীত ৭৮ নং
📄 ইবাদত শুদ্ধ ও কবুল হওয়ার শর্তাবলী
ইবাদত করলেই হয় না, তা কবুলযোগ্য হতে হয়। আর তার জন্য তার নিয়ম-নীতি ও শর্তাবলী পালন করতে হয়।
মহান স্রষ্টার বিশ্বরচনার উদ্দেশ্য হল একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা, অন্য শব্দে 'তাওহীদ' প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং ইবাদতের মূল ভিত্তি হল তাওহীদ ও সহীহ আকীদা। আকীদা সহীহ না হলে ইবাদত কবুল হয় না। বলা বাহুল্য, কোন কাফের, মুনাফিক বা মুশরিকের ইবাদত মহান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না। বেনামাযী কাফের কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সে কাফের হলে তারও কোন ইবাদত কবুল হয় না।
প্রকাশ থাকে যে, যারা আটকী (জুমআহ), খাটকী, (জানাযা), তিনশ' ষাটকী (ঈদের) নামায পড়ে, এমন শুকুর আলী, রমযান আলী ও ঈদ আলীরাও আসলে বেনামাযী।
ইবাদত শুদ্ধ ও কবুল হওয়ার মৌলিক শর্ত হল দুটি:-
এক: ইখলাস
ইবাদতের বৈশিষ্ট্যাবলী উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, ইবাদতের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। এ ছাড়া যদি লোক-প্রদর্শন, সুনাম অর্জন বা পার্থিব স্বার্থ উদ্ধার ইত্যাদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তা শুদ্ধ নয়। বরং তা (ছোট) শির্কে পরিণত হয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّينَ) (২) سورة الزمر
"নিশ্চয় আমি তোমার নিকট এ গ্রন্থ যথাযথভাবে অবতীর্ণ করেছি; সুতরাং তুমি আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে তাঁর উপাসনা কর।” (যুমার: ২)
{ وَمَا أُمِرُوا إِلا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ } [ البيئة : ٥ ]
অর্থাৎ, তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে। (সূরা বাইয়িনাহ ৫ আয়াত)
তিনি আরো বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُواْ صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالأَذِى كَالَّذِي يُنفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ}
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে নষ্ট করে দিয়ো না; ঐ লোকের মত যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে। (সূরা বাক্বারাহ ২৬৪ আয়াত)
তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন, {إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاؤُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً} (১৪২) سورة النساء
অর্থাৎ, নিশ্চয় মুনাফিক (কপট) ব্যক্তিরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়। বস্তুতঃ তিনিও তাদেরকে প্রতারিত করে থাকেন এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে নিছক লোক-দেখানোর জন্য দাঁড়ায় এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে থাকে। (সূরা নিসা ১৪২)
মহানবী বলেছেন, ((إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنَّيَّةِ ، وَإِنَّمَا لِامْرِئ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ فَهَجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ ، وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ لِدُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ امْرَأَةٍ يَتَزَوَّجُهَا فَهَجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ)).
"যাবতীয় কার্য নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষের জন্য তাই প্রাপ্য হবে, যার সে নিয়ত করবে। অতএব যে ব্যক্তির হিজরত (স্বদেশত্যাগ) আল্লাহর (সন্তোষ লাভের) উদ্দেশ্যে ও তাঁর রসূলের জন্য হবে; তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্যই হবে। আর যে ব্যক্তির হিজরত পার্থিব সম্পদ অর্জন কিংবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যেই হবে, তার হিজরত যে সংকল্প নিয়ে করবে তারই জন্য হবে।” (বুখারী ১নং, মুসলিম ১৯০৭নং)
(( قَالَ الله تَعَالَى : أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ ، مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ )) .
"মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি (শিক) থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। কেউ যদি এমন কাজ করে, যাতে সে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করে, তাহলে আমি তাকে তার অংশীদারি (শির্ক) সহ বর্জন করি।” (অর্থাৎ তার আমলই নষ্ট করে দিই।) (মুসলিম ৭৬৬৬নং)
অন্য এক শব্দে এসেছে,
((قَالَ اللَّهُ ، عَزَّ وَجَلَّ : أَنَا خَيْرُ الشُّرَكَاءِ ، مَنْ عَمِلَ لِي عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ غَيْرِي ، فَأَنَا بَرِي مِنْهُ ، وَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ)).
"আল্লাহ আয্যা অজাল্ল বলেছেন, 'আমি সকল অংশীদার অপেক্ষা অধিক শির্ক (অংশীদারী) হতে বেপরোয়া। অতএব যে ব্যক্তি আমার জন্য কোন এমন আমল করবে, যাতে সে আমি ভিন্ন অন্য কাউকে অংশী করবে, আমি তার থেকে সম্পর্কহীন। আর সে আমল তার জন্য হবে যাকে সে শরীক করেছে।” (ইবনে মাজাহ ৪২০২, আহমাদ ৭৯৯৯নং)
মাহমূদ বিন লাবীদ হতে বর্ণিত, একদা আল্লাহর রসূল বললেন,
((إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ).
"তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে অধিক যে জিনিসের ভয় হয়, তা হল ছোট শির্ক।”
তখন সাহাবাগণ প্রশ্ন করলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ছোট শির্ক কী জিনিস?' উত্তরে তিনি বললেন,
((الرِّيَاءُ يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً)).
"রিয়া (লোকপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আমল)। আল্লাহ আয্যা অজাল্ল যখন (কিয়ামতে) লোকেদের আমলসমূহের বদলা দান করবেন তখন সকলের উদ্দেশ্যে বলবেন, 'তোমরা তাদের নিকট যাও, যাদেরকে প্রদর্শন করে দুনিয়াতে তোমরা আমল করেছিলে। অতঃপর দেখ, তাদের নিকট কোন প্রতিদান পাও কি না!" (আহমাদ ২৩৬৩০, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, বাইহাকীর যুহদ, সহীহ তারগীব ২৯ নং)
তিনি আরো বলেছেন,
(( إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَومَ القِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ ، فَأُتِيَ بِهِ ، فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ ، فَعَرَفَهَا ، قَالَ : فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ : قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ . قَالَ : كَذَبْتَ ، وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لأَنْ يُقَالَ : جَرِيءٌ ! فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ. وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ العِلْمَ وَعَلَّمَهُ ، وَقَرَأَ القُرآنَ ، فَأْتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا . قَالَ : فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ : تَعَلَّمْتُ العِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ ، وَقَرَأْتُ فِيكَ القُرآنَ ، قَالَ : كَذَبْتَ ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ لِيُقَالَ : عَالِمٌ : وَقَرَأْتَ القُرْآنَ لِيُقَالَ : هُوَ قَارِيٌّ ، فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ ، وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ ، وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ المال ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ ، فَعَرَفَهَا . قَالَ : فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ : مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيل تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ. قَالَ : كَذَبْتَ ، وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ : جَوَادٌ ! فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ )) .
"কিয়ামতের দিন অন্যান্য লোকেদের পূর্বে যে ব্যক্তির প্রথম বিচার হবে সে হচ্ছে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সুতরাং সে তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, 'ঐ নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল ক'রে এসেছ?' সে বলবে 'আমি তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করেছি এবং অবশেষে শহীদ হয়ে গেছি।' আল্লাহ বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে জিহাদ করেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে বলে, অমুক একজন বীর পুরুষ। সুতরাং তা-ই বলা হয়েছে।' অতঃপর (ফিরিশতাদেরকে) আদেশ করা হবে এবং তাকে উবুড় ক'রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
দ্বিতীয় হচ্ছে এমন ব্যক্তি, যে ইল্ম শিক্ষা করেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাকে (পৃথিবীতে প্রদত্ত) তাঁর সকল নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, 'এই সকল নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল ক'রে এসেছ?' সে বলবে, 'আমি ইল্ম শিখেছি, অপরকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টিলাভের জন্য কুরআন পাঠ করেছি।' আল্লাহ বলবেন, 'মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে ইল্ম শিখেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে আলেম বলে এবং এই উদ্দেশ্যে কুরআন পড়েছ, যাতে লোকেরা তোমাকে ক্বারী বলে। আর (দুনিয়াতে) তা বলা হয়েছে।' অতঃপর (ফিরিশাদেরকে) নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উবুড় ক'রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তৃতীয় হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার রুযীকে আল্লাহ প্রশস্ত করেছিলেন এবং সকল প্রকার ধন-দৌলত যাকে প্রদান করেছিলেন। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া সমস্ত নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, 'তুমি ঐ সকল নেয়ামতের বিনিময়ে কী আমল ক'রে এসেছ?' সে বলবে, 'যে সকল রাস্তায় দান করলে তুমি খুশী হও সে সকল রাস্তার মধ্যে কোনটিতেও তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে খরচ করতে ছাড়িনি।' তখন আল্লাহ বলবেন, 'মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এ জন্যই দান করেছিলে; যাতে লোকে তোমাকে দানবীর বলে। আর তা বলা হয়েছে।' অতঃপর (ফিরিশাবর্গকে) হুকুম করা হবে এবং তাকে উবুড় ক'রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম ১৯০৫ নং)
উল্লিখিত একাধিক আয়াত ও হাদীস থেকে বুঝা গেল যে, আল্লাহর ইবাদতের প্রথম শর্ত ইখলাসে ত্রুটি হলে সওয়াবের জায়গায় আযাব হবে। মেহনত বরবাদ যাবে, ইবাদত নষ্ট হবে, পরন্তু শান্তিও ভোগ করতে হবে।
আর স্পষ্ট যে, ইবাদতে ইখলাস নষ্ট হয় সাধারণতঃ তিনটি কারণে:-
১। 'রিয়া' হলে। অর্থাৎ, উদ্দেশ্য লোক দেখানো হলে। মানুষকে দেখিয়ে তার সন্তুষ্টি বা মুগ্ধতা কাম্য হলে।
২। 'সুমআহ' হলে। অর্থাৎ, উদ্দেশ্য লোক শোনানো হলে। প্রচার তথা প্রশংসা বা সুনাম অর্জন উদ্দেশ্য হলে।
৩। পার্থিব কোন স্বার্থ লাভ (অর্থ, সম্পদ, পদ ইত্যাদি) উদ্দেশ্য হলে。
দুইঃ মুহাম্মাদী তরীকা
ইবাদত কবুলের দ্বিতীয় শর্ত হল মুহাম্মাদী তরীকা। অর্থাৎ, যে ইবাদতটি সম্পাদন করা হবে, তা যেন সুমহান স্রষ্টার প্রেরিত দূত মহানবী -এর বাতলানো তরীকা ও পদ্ধতি অনুযায়ী হয়।
সুতরাং অন্য কারো পদ্ধতি অথবা নিজস্ব মনগড়া পদ্ধতিতে কোন ইবাদত করলে তা নব আবিষ্কৃত বিদআত হয়, যা করলে সওয়াবের জায়গায় গোনাহ হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
أَمْ لَهُمْ شُرَكَاء شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَن بِهِ اللَّهُ وَلَوْلَا كَلِمَةُ الْفَصْلِ لَقُضِيَ بَيْنَهُمْ وَإِنَّ الظَّالِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (۲۱) سورة الشورى
"এদের কি এমন কতকগুলি অংশী (উপাস্য) আছে, যারা এদের জন্য বিধান দিয়েছে এমন ধর্মের, যার অনুমতি আল্লাহ এদেরকে দেননি? চূড়ান্ত ঘোষণা না থাকলে এদের বিষয়ে তো ফায়সালা হয়েই যেত। নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারীদের জন্য কষ্টদায়ক শাস্তি রয়েছে।” (শূরাঃ ২১)
{فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} (৫০) سورة القصص
"অতঃপর ওরা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে জানবে ওরা তো কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অমান্য ক'রে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে? নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না।” (কাস্বাস্বঃ ৫০)
{وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ}
"আর রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।” (হাশ্রঃ ৭)
{ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا} (৬৫) سورة النساء
"কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা বিশ্বাসী (মু'মিন) হতে পারবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে, অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়।” (নিসাঃ ৬৫)
আর মহানবী বলেছেন---যেমন পূর্বেও উল্লিখিত হয়েছে,
(( مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ)).
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল---যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (বুখারী ২৬৯৭, মুসলিম ৪৫৮৯নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
(( مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ)).
"যে ব্যক্তি এমন কাজ করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই তা বর্জনীয়।" (মুসলিম ৪৫৯০নং)
ইতিপূর্বে আমরা জানতে পেরেছি যে, মহান আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে আমরা তাঁর ইবাদতে সবচেয়ে সুন্দর আমল করতে পারি; সবচেয়ে বেশি আমল নয়। কারণ আমল সুন্দর না হলে বেশি হয়ে কোন লাভ নেই। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ} (۲) الملك
"যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য; কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম? আর তিনি পরাক্রমশালী, বড় ক্ষমাশীল।” (মূলকঃ ২)
"কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম।” ফুযাইল বিন ইয়ায বলেছেন, ‘(তোমাদের কার কর্ম) সব চাইতে বেশি বিশুদ্ধ ও বেশি সঠিক।' লোকেরা বলল, 'হে আবু আলী! “সব চাইতে বেশি বিশুদ্ধ ও বেশি সঠিক" মানে কী?' তিনি বললেন, 'আমল যদি বিশুদ্ধ হয় এবং সঠিক না হয়, তাহলে তা কবুল হয় না। পক্ষান্তরে তা যদি সঠিক হয় এবং বিশুদ্ধ না হয়, তাহলে তাও কবুল হয় না; যে পর্যন্ত না বিশুদ্ধ ও সঠিক হয়। আর বিশুদ্ধ হয় তখন, যখন তা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য হয়। পক্ষান্তরে সঠিক হয় তখন, যখন তা সুন্নাহ মোতাবেক হয়।' (তাফসীর সা'দী ১/৩৭৭)
জেনে রাখা ভালো যে, ইবাদতে শরীয়ত বা সুন্নাহর অনুসরণ ততক্ষণ বাস্তবায়ন হবে না, যতক্ষণ না আমল ৬টি বিষয়ে শরীয়তের মোতাবেক হয়েছে:-
১। কারণ
যেমন, বৃষ্টি বর্ষণের কারণে দু'রাকআত নামায পড়া। নবী-দিবস, শবে-মি'রাজ ইত্যাদি পালন করা।
২। শ্রেণী
যেমন, ফিত্বরার যাকাতে টাকা দেওয়া। ঘোড়া কুরবানী দেওয়া।
৩। পরিমাণ
যেমন, ইচ্ছাকৃত মাগরিবের নামায ৪ রাকআত পড়া। ফরয নামাযের পর ৩৩/৩৪ এর জায়গায় ৩৫ বার ক'রে তসবীহাদি পড়া।
৪। পদ্ধতি
যেমন, ওযু করতে প্রথমে পা ও শেষে চেহারা ধোওয়া। নামাযে আগে সিজদা ও পরে রুকু করা। নেচে-নেচে বা সমস্বরে যিক্র করা। দরূদ বিশেষভাবে দাঁড়িয়ে পড়া।
৫। সময়
যেমন, রমযান মাসে কুরবানী দেওয়া। শা'বান মাসে ফরয রোযা রাখা। যুল-ক্বাদাহ মাসে হজ্জ করা। সূর্য ঢলার আগে যোহর পড়া। সূর্য ডোবার পরে (বিনা ওযরে) আসর পড়া।
৬। স্থান
যেমন, নিজ বাড়ি, মরুভূমি বা জঙ্গলে ই'তিকাফ করা। আরাফার দিনে মুযদালিফায় অবস্থান করা।
বলা বাহুল্য, শরীয়তের অনুসরণে উক্ত ৬টি শর্ত অবশ্যই পালনীয়। নচেৎ কবুল হওয়া তো দূরের কথা, ইবাদতের জায়গায় বিদআত হয়ে বসবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِن أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ} (۲۷) سورة المائدة
"আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হল এবং অন্য জনের কুরবানী কবুল হল না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবুল করে থাকেন।” (মায়িদাহঃ ২৭)
উক্ত আয়াতে 'মুত্তাক্বীন' বা সংযমী বলতে তাদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদের আমল হয় খাঁটিভাবে আল্লাহর জন্য এবং তারা তা সম্পাদনের পদ্ধতিতে নবীর সুন্নাহর অনুসরণ ক'রে থাকে। (তাফসীর সা'দী)
মহান আল্লাহ তাদেরই কুরবানী ও অন্যান্য আমল বা ইবাদত কবুল ক'রে থাকেন।
📄 কেবল আল্লাহর ইবাদত
মানুষ পৃথিবীতে এসে যখন জ্ঞানসম্পন্ন হয়, তখন পরিবেশ অনুযায়ী গড়ে ওঠে। নাস্তিক, নিরীশ্বরবাদী, বহীশ্বরবাদী, সর্বেশ্বরবাদীদের পরিমন্ডলে প্রতিপালিত ও শিক্ষিত হয়ে সঠিক পথ হারিয়ে ফেলে। সামনে বহু পথ রয়েছে। যে কোন একটা পথ ধরে চললেই হয় না। সঠিক গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হলে সঠিক পথের দিশা জানা অবশ্যই জরুরী। কিন্তু এত শত পথের মাঝে কোটা সঠিক সেটা জানব কীভাবে? নিশ্চয়ই অজানা-অচেনা পথে চলা জ্ঞানীর কাজ নয়। সুতরাং সঠিক পথ জানতে গাইড চাই। এ দুনিয়ায় বহু বাদ-মতবাদ রয়েছে, সঠিকটা চিনে নিতে হবে সেই গাইড রাহবারের মাধ্যমে। বলা বাহুল্য, জ্ঞানের উন্মেষ ঘটতেই মানুষের প্রথম তিনটি বিষয় জানা একান্ত জরুরী। ১। তার স্রষ্টা ও পালনকর্তা কে? ২। তার পথপ্রদর্শক নবী কে? ৩। তার দ্বীন কী হওয়া উচিত? যে মানুষের মন উদার, হৃদয় উন্মুক্ত এবং সুস্থ জ্ঞানের অধিকারী সে অবশ্যই উক্ত তিনটি বিষয়ের ব্যাপারে সত্বর জ্ঞান লাভ করবে। যেহেতু স্বয়ং সৃষ্টিকর্তারই ঘোষণা,
{شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ} (১৮) سورة آل عمران
"আল্লাহ সাক্ষ্য দেন এবং ফিরিস্তাগণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই; তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (আলে ইমরানঃ ১৮)
বলা বাহুল্য, জ্ঞানী মানুষ জ্ঞান করলেই এ কথা সহজেই অনুধাবন করবেন যে, মহান আল্লাহ আমাদেরকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং কেবল তাঁরই ইবাদত করতে হবে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে সবচেয়ে উত্তম কর্ম করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। আর কর্ম উত্তম ও সুন্দর তখনই হয়, যখন তা একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টিবিধানের উদ্দেশ্যে হয় এবং তাঁর প্রেরিত সর্বশেষ দূত নবী মুহাম্মাদ -এর তরীকা অনুযায়ী হয়। অন্যথা মানুষ যাকে নিজ ধারণাবশতঃ 'ভালো' বা 'উত্তম' বলে, সেটাই ভালো বা উত্তম হয় না।
মহান আল্লাহই আমাদের সৃষ্টিকর্তা, রুযীদাতা ইত্যাদি বলে অনেকেই বিশ্বাস করে ও মানে। কিন্তু যেটা মানে না, তা হল এই যে, তিনি একমাত্র উপাস্য ও ইবাদতের যোগ্য। আদম থেকে মুহাম্মাদ পর্যন্ত সকল নবী-রসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) কে এই ইবাদতের তওহীদই প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন,
{وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ} (٢٥)
"তোমার পূর্বে যে রসূলই আমি প্রেরণ করেছি, তাঁকে এই আদেশই করেছি যে, আমি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই। অতএব, তোমরা আমারই ইবাদত কর।" (সূরা আম্বিয়াঃ ২৫)
তাওহীদে উলুহিয়্যাত তথা আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত সকল নবীরা দিয়েছেন।
এইভাবে সকল নবী ও তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারীরা এই ইসলামকেই গ্রহণ করেছিল, যাতে তাওহীদে উলুহিয়্যাতই ছিল মৌলিক বিষয়, যদিও কোন কোন বিধি-বিধান একে অপর থেকে ভিন্ন ছিল।
উক্ত তওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্যই সকল কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে।
উক্ত তওহীদকেই অস্বীকার করার ফলে সংঘর্ষ বেধেছে। হকপন্থী ও বাতিলপন্থীর মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। কত বাতিলপন্থী জাতি ধ্বংসকবলিত হয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
তাওহীদে উলুহিয়্যাতই বান্দার উপর দ্বীনের সবচেয়ে বড় ফরয, যার ইলম ও আমল রাখা প্রত্যেক মানুষের জন্য আবশ্যক।
এই তওহীদই দ্বীনের প্রথম ও শেষ, প্রকাশ্য ও গুপ্ত বিষয়।
এই তওহীদের ভিত্তিতেই জান্নাতী ও জাহান্নামী নির্ধারিত হবে।
মহান আল্লাহ সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। সেই কুরআনের ভূমিকায় সর্বপ্রথম সূরার বক্তব্য হল ঐ তওহীদই,
{إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ} (৫) সূরা আল ফাতিহা
"আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই কাছে সাহায্য চাই।” (ফাতিহাঃ ৫)
সেই কুরআনের সর্বপ্রথম আদেশ হল,
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (২১) সূরা আল বাক্বারাহ
"হে মানুষ সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের উপাসনা কর, যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে সৃষ্টি করেছেন; যাতে তোমরা পরহেযগার (ধর্মভীরু) হতে পার।" (বাক্বারাহঃ ২১)
আর সর্বপ্রথম নিষেধ হল,
{الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضِ فِرَاشاً وَالسَّمَاء بِنَاء وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاء مَاء فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقاً لَّكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَاداً وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ} (২২) সূরা আল বাক্বারাহ
"যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আকাশকে ছাদ স্বরূপ সৃষ্টি করেছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ ক'রে তার দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মূল উৎপাদন করেছেন। সুতরাং জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করো না। (বাক্বারাহঃ ২২)
যার অর্থ দাঁড়ালো, ঐ তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'।
কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই প্রকৃতত্ব অধিকাংশ মানুষ মানে না যে, যিনি সৃষ্টিকর্তা-রুযীদাতা কেবল তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য মা'বুদ। বিধায় যারা সৃষ্টি করতে পারে না, রুযী দিতে পারে না, তারা ইবাদতের যোগ্যই নয়। তারা ইবাদত পাওয়ার অধিকারীই নয়।
মক্কার কুরাইশরা মহান আল্লাহকে সকল কিছুর স্রষ্টা, প্রতিপালক, রুযীদাতা, উদ্ধারকর্তা বলে মানত। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা তাদের বুঝে আসেনি যে, তিনিই একমাত্র ইবাদত পাওয়ার অধিকারী ও যোগ্য। সূরা কুরাইশের সারমর্মে তাদেরকে সেটাই বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لإيلافِ قُرَيْش (1) إيلافِهِمْ رِحْلَةَ الشَّتَاءِ وَالصَّيْفِ (۲) فَلْيَعْبُدُوا رَبَّ هَذَا الْبَيْتِ (۳) الَّذِي أَطْعَمَهُمْ مِنْ جُوعِ وَآمَنَهُمْ مِنْ خَوْفِ} (٤)
"যেহেতু কুরাইশের চিরাচরিত অভ্যাস আছে। অভ্যাস আছে তাদের শীত ও গ্রীষ্ম সফরের। অতএব তারা ইবাদত করুক এই গৃহের প্রতিপালকের। যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভয় হতে দিয়েছেন নিরাপত্তা।” (কুরাইশঃ ১-৪)
মহানবী -এর প্রতি যে অহী অবতীর্ণ হয়েছে, তারও সারনির্যাস হল, ঐ তওহীদই। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاء رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا} (۱۱۰) سورة الكهف
"তুমি বল, 'আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ; আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের উপাস্যই একমাত্র উপাস্য; সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে।” (কাহফঃ ১১০)
{قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (١٦٢) لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ} (١٦٣) سورة الأنعام
"বল, 'নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার উপাসনা (কুরবানী), আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোন অংশী নেই এবং আমি এ সম্বন্ধেই আদিষ্ট হয়েছি। আর আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)দের মধ্যে আমিই প্রথম।” (আনআমঃ ১৬২-১৬৩)
মহান আল্লাহ মানব জাতিকে সম্বোধন ক'রে বলেছেন,
{إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُون} (۹۲) سورة الأنبياء
"নিঃসন্দেহে তোমাদের এ জাতি, একই জাতি। আর আমিই তোমাদের প্রতিপালক। অতএব তোমরা আমার উপাসনা কর।" (আম্বিয়া: ৯২)
আল্লাহর বান্দাগণ যদি পৃথিবীর কোন এক জায়গায় তাঁর বন্দেগী করতে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং তাঁর সেই তওহীদ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ না হয়, তাহলে তার সমাধান দিয়ে তিনি বলেছেন,
{يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ أَرْضِي وَاسِعَةٌ فَإِيَّايَ فَاعْبُدُون } (٥٦) سورة العنكبوت
“হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! আমার পৃথিবী প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই উপাসনা কর।" (আনকাবুতঃ ৫৬)
বলাই বাহুল্য যে, মানুষ হবে একমাত্র আল্লাহর বান্দা। অন্যের বান্দা নয়। এমনকি সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নবী মুহাম্মাদ-এরও বান্দা নয়। নিজ মায়েরও বান্দা নয়। তাই তো মুসলিম মা-কে ভালোবাসে, মায়ের পায়ের তলায় জান্নাত আছে বলে জানে। কিন্তু তার বন্দেগী করতে পারে না এবং 'বন্দে মাতরম' বলতে পারে না।