📄 মহান আল্লাহ কি কারো ইবাদতের মুখাপেক্ষী?
আমরা জানি, সুমহান স্রষ্টা কারো বা কোন কিছুরই মুখাপেক্ষী নন। কেউ তাঁর প্রতি অবিশ্বাস করলে, তাঁকে অমান্য করলেও তিনি কোন পরোয়া করেন না। সারা সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী এবং তিনিই অভাবমুক্ত, অমুখাপেক্ষী স্বয়ংসম্পূর্ণ বাদশা। তিনি বলেছেন,
{وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ} (৯৭) سورة آل عمران
"মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্জ করা তার (পক্ষে) অবশ্য কর্তব্য। আর যে অস্বীকার করবে (সে জেনে রাখুক যে), আল্লাহ জগতের প্রতি অমুখাপেক্ষী।” (আলে ইমরান: ৯৭)
{وَإِن تَكْفُرُوا فَإِنَّ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ وَكَانَ اللَّهُ غَنِيًّا حَمِيدًا} (১৩১)
"তোমরা অবিশ্বাস করলেও আকাশমন্ডল ও ভূ-মন্ডলে যা কিছু আছে, সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসাভাজন।” (নিসাঃ ১৩১)
{وَرَبُّكَ الْغَنِيُّ ذُو الرَّحْمَةِ إِن يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَسْتَخْلِفْ مِن بَعْدِكُم مَّا يَشَاء كَمَا أَنشَأَكُم مِّن ذُرِّيَّةِ قَوْم آخَرينَ} (১৩৩) سورة الأنعام
"তোমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত, দয়াশীল। তিনি ইচ্ছা করলে, তোমাদেরকে অপসারিত করতে এবং তোমাদের পরে যাকে ইচ্ছা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন; যেমন তোমাদেরকে তিনি অন্য এক সম্প্রদায়ের বংশ হতে সৃষ্টি করেছেন।” (আনআমঃ ১৩৩)
{وَقَالَ مُوسَى إِن تَكْفُرُوا أَنتُمْ وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا فَإِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ حَمِيدٌ} (৮)
"মুসা বলেছিল, 'তোমরা এবং পৃথিবীর সকলেই যদি অকৃতজ্ঞ (কাফের) হও; তবুও নিঃসন্দেহে আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং সর্বপ্রশংসিত।” (ইব্রাহীমঃ ৮)
{وَمَن جَاهَدَ فَإِنَّمَا يُجَاهِدُ لِنَفْسِهِ إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ} (৬) سورة العنكبوت
"যে কেউ সংগ্রাম করে, সে তো নিজের জন্যই সংগ্রাম করে; আল্লাহ অবশ্যই বিশ্বজগতের ওপর নির্ভরশীল নন।" (আনকাবূতঃ ৬)
{ وَمَن يَشْكُرْ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ} (১২) سورة لقمان
"যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তো তা নিজেরই জন্য করে এবং কেউ অকৃতজ্ঞতা করলে, নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।” (লুকুমানঃ ১২)
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاء إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ} (১৫) سورة فاطر
"হে মানুষ! তোমরা তো আল্লাহর মুখাপেক্ষী, কিন্তু আল্লাহ; তিনিই অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।” (ফাত্বিরঃ ১৫)
{إِن تَكْفُرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنكُمْ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَإِن تَشْكُرُوا يَرْضَهُ لَكُمْ} (৭)
"তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে জেনে রাখ, আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তাঁর দাসদের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে তিনি তোমাদের কৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন।” (যুমার: ৭)
{وَمَن يَبْخَلْ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَن نَّفْسِهِ وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنتُمُ الْفُقَرَاءِ وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُمْ} (৩৮) سورة محمد
"তোমরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে বলা হচ্ছে অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করছে। যারা কার্পণ্য করে, তারা তো কার্পণ্য করে নিজেদের প্রতি। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা বিমুখ হও, তাহলে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন; অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।" (মুহাম্মাদ: ৩৮)
{الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَمَن يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ} (٢٤)
"যারা কার্পণ্য করে এবং মানুষকে কার্পণ্যের নির্দেশ দেয়; যে মুখ ফিরিয়ে নেয় (সে জেনে রাখুক যে), নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।” (হাদীদঃ ২৪)
{لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيهِمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَمَن يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ} (٦) سورة الممتحنة
"নিশ্চয়ই তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রত্যাশা কর, তাদের জন্য তাদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।” (মুমতাহিনাহঃ ৬)
{ذلِكَ بِأَنَّهُ كَانَت تَأْتِيهِمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالُوا أَبَشَرٌ يَهْدُونَنَا فَكَفَرُوا وَتَوَلَّوا وَاسْتَغْنَى اللَّهُ وَاللَّهُ غَنِيٌّ حَمِيدٌ} (٦) سورة التغابن
"তা এ জন্য যে, তাদের নিকট তাদের রসূলগণ স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ আসত, তখন তারা বলত, 'মানুষই কি আমাদেরকে পথের সন্ধান দিবে?' অতঃপর তারা অবিশ্বাস করল ও মুখ ফিরিয়ে নিল এবং আল্লাহও কোন পরোয়া করলেন না। আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।” (তাগাবুনঃ ৬)
আবু যার জুন্দুব বিন জুনাদাহ হতে বর্ণিত, নবী তাঁর সুমহান প্রভু হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (আল্লাহ) বলেছেন,
((يَا عِبَادِي ! إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُم مُحَرَّماً فَلَا تَظَالَمُوا . يَا عِبادِي ! كُلُّكُمْ ضَالَ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ فَاسْتَهْدُونِي أَهْدِكُمْ . يَا عِبَادِي ! كُلُّكُمْ جَائِعٌ إِلَّا مَنْ أَطْعَمْتُهُ فَاسْتَطْعِمُونِي أَطْعِمْكُمْ ، يَا عِبَادِي ! كُلُّكُمْ عَارِ إِلَّا مَنْ كَسَوْتُهُ فَاسْتَكْسُونِي أَكْسُكُمْ . يَا عِبَادِي ! إِنَّكُمْ تُخْطِئُونَ بِاللَّيلِ وَالنَّهارِ وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعاً فَاسْتَغْفِرُونِي أَغْفِرْ لَكُمْ . يَا عِبَادِي ! إِنَّكُمْ لَنْ تَبْلُغُوا ضُرِّي فَتَضُرُّوني ، وَلَنْ تَبْلُغُوا نَفْعِي فَتَنْفَعُونِي . يَا عِبَادِي ! لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ كَانُوا عَلَى أَتْقَى قَلْبِ رَجُل وَاحِدٍ مِنْكُمْ مَا زَادَ ذلِكَ فِي مُلكي شيئاً . يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ كَانُوا عَلَى أفْجَر قَلْبِ رَجُل وَاحِدٍ مِنْكُمْ مَا نَقَصَ ذلك من ملكي شيئاً. يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ قَامُوا فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ فَسَأَلُونِي فَأَعْطَيتُ كُلَّ إِنْسَانِ مَسْأَلَتَهُ مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِمَّا عِنْدِي إِلَّا كَمَا يَنْقِصُ المِخْيَطُ إِذَا أُدْخِلَ البَحْرَ . يَا عِبَادِي ! إِنَّمَا هِيَ أَعْمَالُكُمْ أَحْصِيهَا لَكُمْ ثُمَّ أُوَفِّيكُمْ إِيَّاهَا ، فَمَنْ وَجَدَ خَيْراً فَلْيَحْمَدِ اللَّهِ، وَمَنْ وَجَدَ غَيْرَ ذَلِكَ فَلَا يَلُومَنَّ إِلَّا نَفْسَهُ)).
"হে আমার বান্দারা! আমি অত্যাচারকে আমার নিজের জন্য হারাম করে দিয়েছি এবং আমি তা তোমাদের মাঝেও হারাম করলাম। সুতরাং তোমরাও একে অপরের প্রতি অত্যাচার করো না। হে আমার বান্দারা! তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট; কিন্তু সে নয় যাকে আমি সঠিক পথ দেখিয়েছি। অতএব তোমরা আমার নিকট সঠিক পথ চাও আমি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখাব। হে আমার বান্দারা! তোমরা সকলেই ক্ষুধার্ত, কিন্তু সে নয় যাকে আমি খাবার দিই। সুতরাং তোমরা আমার কাছে খাবার চাও, আমি তোমাদেরকে খাবার দেব। হে আমার বান্দারা! তোমরা সকলেই বস্ত্রহীন; কিন্তু সে নয় যাকে আমি বস্ত্র দান করেছি। সুতরাং তোমরা আমার কাছে বস্ত্র চাও, আমি তোমাদেরকে বস্ত্রদান করব। হে আমার বান্দারা! তোমরা দিন-রাত পাপ ক'রে থাক, আর আমি সমস্ত পাপ ক্ষমা ক'রে থাকি। সুতরাং তোমরা আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা ক'রে দেব। হে আমার বান্দারা! তোমরা কখনো আমার অপকার করতে পারবে না এবং কখনো আমার উপকারও করতে পারবে না। হে আমার বান্দারা! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ ও জ্বিন সকলেই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় একজন পরহেযগার ব্যক্তির হৃদয়ের মত হৃদয়বান হয়ে যায়, তাহলে এটা আমার রাজত্বের কোন কিছু বৃদ্ধি করতে পারবে না। হে আমার বান্দারা! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ ও জ্বিন সকলেই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় একজন পাপীর হৃদয়ের মত হৃদয়ের অধিকারী হয়ে যায়, তাহলে এটা আমার রাজত্বের কোন কিছুই কমাতে পারবে না। হে আমার বান্দারা! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ তোমাদের মানুষ ও জ্বিন সকলেই একটি খোলা ময়দানে একত্রিত হয়ে আমার কাছে প্রার্থনা করে, আর আমি তাদের প্রত্যেককে তার প্রার্থিত জিনিস দান করি, তাহলে (এ দান) আমার কাছে যে ভাণ্ডার আছে, তা হতে ততটাই কম করতে পারবে, যতটা সুচ কোন সমুদ্রে ডুবালে তার পানি কমিয়ে থাকে। হে আমার বান্দারা! আমি তোমাদের কর্মসমূহ তোমাদের জন্য গুনে রাখছি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তার পূর্ণ বিনিময় দেব। সুতরাং যে কল্যাণ পাবে, সে আল্লাহর প্রশংসা করুক। আর যে ব্যক্তি অন্য কিছু (অর্থাৎ অকল্যাণ) পাবে, সে যেন নিজেকেই তিরস্কার করে।” (মুসলিম ৬৭৩৭নং)
কিন্তু বহু অবুঝ মানুষ প্রশ্ন তোলে, তাহলে তিনি ইবাদতের জন্য মানব-দানব সৃষ্টি করলেন কেন?
প্রথমতঃ সুমহান স্রষ্টা ইচ্ছাময়। তাঁর কাজে তাঁকে প্রশ্ন করার অধিকার কোন সৃষ্টির নেই। তাঁর কর্মের হিকমত বুঝতে পারলে তো ভালো, না পারলে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ করা মু'মিনের উচিত নয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ} (۲۳) سورة الأنبياء "তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না; বরং ওদেরকেই প্রশ্ন করা হবে।” (আম্বিয়া: ২৩)
{أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَأْتِي الْأَرْضِ نَنقُصُهَا مِنْ أَطْرَافِهَا وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ} (٤١) سورة الرعد "তারা কি দেখে না যে, আমি (তাদের দেশ) পৃথিবীকে চারদিক হতে সংকুচিত ক'রে আনছি? আল্লাহ আদেশ করেন। তাঁর আদেশের সমালোচনা (পুনর্বিবেচনা) করার কেউ নেই এবং তিনি হিসাব গ্রহণে তৎপর।” (রা'দঃ ৪১)
দ্বিতীয়তঃ তিনি মানব-দানবের ইবাদতের মুখাপেক্ষী নন। তবে তিনি চেয়েছেন যে, মানব-দানব একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে। আর তার উপর তিনি তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। তিনি তাঁর আবেদ বান্দাগণকে চির সুখময় স্থান জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তিনি বলেছেন,
{يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ (۲۷) فَادْخُلِي فِي عِبَادِي (۲۹) وَادْخُلِي جَنَّتِي} (۳۰) "হে উদ্বেগশূন্য চিত্ত! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে এস সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। সুতরাং তুমি আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।" (ফাঃ ২৭-৩০)
আর কারো কিছু প্রয়োজন হলেই কি মানুষ তাকে দিয়ে থাকে? বিনিময় বা উপহার হিসাবে দেওয়া কি মানুষের রীতি নয়?
যে সুমহান স্রষ্টা আমাকে সুন্দতরতম অবয়ব দিয়ে শ্রেষ্ঠ জীবরূপে সৃষ্টি করলেন, রুযী দিলেন, চির সুখময় জান্নাত দেবেন, সেই সুমহান স্রষ্টার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কিছু করা কি আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় না?
অন্নদাতার দাসত্ব কি মানুষ করে না? কেউ উপকার করলে মানুষ কি উপকারীর দাস হয়ে যায় না? কারো নেমক খেলে কি নেমকহালালি করতে হয় না? তাহলে কেন সুমহান প্রতিপালকের প্রতি দাসত্বের শৃঙ্খল ছিঁড়ে এ অকৃতজ্ঞতা ও নেমকহারামি?
অসুস্থতার সময় অক্সিজেন ক্রয় করতে হয়, আলো ও পানির বিল মিটাতে হয়। ভেবে দেখুন, আপনি তাঁর কত অক্সিজেন, কত আলো ও কত পানি ব্যবহার করছেন এবং এইভাবে তাঁর কত শত নিয়ামত কাজে লাগাচ্ছেন। তাহলে সে সবের বিল কি মিটানো উচিত নয় ভাবছেন?
📄 ইবাদত কাকে বলে?
ইবাদতের আভিধানিক অর্থ হল, বশ্যতা স্বীকার, বিনতি প্রকাশ, হীনতা প্রকাশ, দাসত্ব করা ইত্যাদি।
এর কর্তাকে বলে দাস। ফারসীতে এর অর্থ করা হয় বন্দেগী। এর কর্তাকে বলা হয় বান্দা।
পারিভাষিক অর্থে 'ইবাদত' প্রত্যেক সেই গুপ্ত ও প্রকাশ্য কথা ও কর্ম, যা মহান আল্লাহ পছন্দ করেন এবং যাতে সন্তুষ্ট হন।
অথবা প্রত্যেক সেই গুপ্ত ও প্রকাশ্য কথা ও কর্ম, যার মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করা যায়।
সুমহান স্রষ্টার কাছে মানুষ কত তুচ্ছ! পদে-পদে সে তাঁর মুখাপেক্ষী। তাঁর করুণার আশাধারী। আর তাই সে তাঁকে ভালোবাসে, তাঁর নিকট হীনতা ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করে, সদা-সর্বদা তাঁর দয়া ও ক্ষমার ভিখারী থাকে, তাই সকল কাজে সে তাঁর দাসত্ব ও আনুগত্য করে এবং তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করা থেকে বিরত থাকে।
এইভাবে মানুষ তার জীবনের প্রত্যেক কর্মকে ইবাদতে পরিণত করতে পারে। যাঁর দয়ায় সে জীবন ধারণ করছে, তাঁর দাসত্বে সে কালাতিপাত করতে পারে। যাঁর হাতে তার প্রাণ আছে, তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করতে পারে। মহান প্রতিপালক বলেছেন,
{قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (١٦٢) لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ} (١٦٣) سورة الأنعام
"বল, 'নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার উপাসনা (কুরবানী), আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোন অংশী নেই এবং আমি এ সম্বন্ধেই আদিষ্ট হয়েছি। আর আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) দের মধ্যে আমিই প্রথম।” (আনআমঃ ১৬২-১৬৩)
মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি, সে হবে আল্লাহরই জন্য। তার সব কিছু, তার জীবন-মরণ হবে তাঁরই জন্য। সে হবে তাঁর নিকট আত্মসমর্পণকারী দাস, নিবেদিত-প্রাণ ভক্ত।
উক্ত আয়াতে শেষ নবী মুহাম্মাদ দ্বারা ঘোষণা করানো হচ্ছে যে, "আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি আত্মসমর্পণকারী মুসলিমদের প্রথম।" নূহ ও একই ঘোষণা দিয়েছেন,
وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ} অর্থাৎ, আমাকে হুকুম করা হয়েছে যে, আমি যেন আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) দের অন্তর্ভুক্ত থাকি। (সূরা ইউনুস ৭২)
ইব্রাহীম সম্পর্কে এসেছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বললেন, (أَسْلِمٌ) (আত্মসমর্পণ কর)। তখন তিনি বললেন, }أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ{ বিশ্ব-জগতের প্রতিপালকের কাছে আমি আত্মসমর্পণ করলাম।” (সূরা বাক্বারাহ ১৩১)
ইব্রাহীম এবং ইয়াকুব আলাইহিমাস সালাম তাঁদের সন্তানদের অসিয়ত করেছিলেন, فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُّسْلِمُونَ} অর্থাৎ, আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) না হয়ে তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা বাক্বারাহ ১৩২)
ইউসুফ দোয়া করেছিলেন, }تَوَفَّنِي مُسْلِماً{ অর্থাৎ, তুমি আমাকে আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হিসাবে মৃত্যু দান করো। (সূরা ইউসুফ ১০১) মুসা তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُّسْلِمِينَ} অর্থাৎ, তাঁরই উপর ভরসা কর; যদি তোমরা মুসলিম হও। (সুরা ইউনুস ৪-৮) ঈসা -এর সহচররা বলেছিলেন, {وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ}
অর্থাৎ, তুমি সাক্ষী থাক যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)। (মাইদাহঃ ১১১) এই 'ইসলাম' তথা আত্মসমর্পণই হল ইবাদত, দাসত্ব ও আনুগত্য। প্রভুর সকল আদেশ-নিষেধ পালন করা, তাঁর যাবতীয় নির্দেশ মেনে নেওয়া, তাঁর সকল কথা বিশ্বাস করা, তাঁর সকল বিধান বাস্তবায়ন করাই হল দাসের কর্তব্য। এই জন্য 'ইসলাম' শব্দের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, هو الاستسلام لله بالتوحيد والانقياد له بالطاعة والبراءة من الشرك وأهله.
অর্থাৎ, (ইসলাম হল,) তাওহীদের সাথে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্যের সাথে তাঁর অনুবর্তী হওয়া এবং শির্ক ও মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।
এই আত্মসমর্পণই হল সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ ছাড়া কেউ ধার্মিক হতে পারে না।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ الله وَهُوَ مُحْسِنٌ واتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً} (١٢٥) سورة النساء
"আর তার অপেক্ষা ধর্মে কে উত্তম, যে বিশুদ্ধ (তওহীদবাদী) হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে? আর আল্লাহ ইব্রাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।” (নিসাঃ ১২৫)
{وَمَن يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللَّهِ عَاقِبَةُ الأمور (۲۲) سورة لقمان
"যে কেউ সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে, সে আসলে এক মজবুত হাতল ধারণ করে। আর যাবতীয় কার্যের পরিণাম আল্লাহর অধীনে।" (লুকুমানঃ ২২)
{ وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ} (٣٤) سورة الحج
"আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম ক'রে দিয়েছি; যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলির উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। সুতরাং তোমরা তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ কর। আর সুসংবাদ দাও বিনীতগণকে।” (হাজ্জঃ ৩৪)
জীবনের সকল ক্ষেত্রে সুমহান প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ ক'রে চলার নামই ইবাদত। এই জন্য মুসলিমের সকল কর্ম হয় ইবাদত। ইবাদত কেবল আনুষ্ঠানিক কিছু আচরণ বা কর্মের নাম নয়। কেবল নামায, যাকাত, রোযা, হজ্জ ইত্যাদির মধ্যেই ইবাদত সীমাবদ্ধ নয়। প্রতীকী বা আনুষ্ঠানিক ইবাদতই কেবল ইবাদত নয়। বরং মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু ও বিছানা থেকে রাজ-সিংহাসন পর্যন্ত সকল স্তরের সকল কর্মেই রয়েছে এই আত্মসমর্পণ ও ইবাদত।
ইবাদত ইসলাম ও ঈমানের সাথে জড়িত। আর ঈমান হল তিনটি কর্মের সমষ্টির নাম: অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকার ও কর্মে বাস্তবায়ন। সুতরাং ঈমানের সাথে প্রত্যেক সেই কর্ম হল ইবাদত, যাতে মহান প্রতিপালক সন্তুষ্ট হন।
মহানবী বলেছেন,
الإِيمَانُ بَضْعُ وَسَبْعُونَ أَوْ يَضْعُ وَسِتُونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذِى عَن الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَان ».
"ঈমান সত্তর বা ষাটের অধিক শাখাবিশিষ্ট; যার উত্তম (ও প্রধান) শাখা 'লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই) বলা এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র শাখা পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্যতম শাখা।” (মুসলিম ১৬২নং)
দান-খয়রাত বা সাদকা করা ইবাদত। আর অর্থ-সম্পদ দান না করলেও সাদকা করা হয়। সুতরাং সেটাও হয় ইবাদত।
সাহাবী আবু যার বলেন, কিছু সাহাবা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ধনীরাই তো বেশী নেকীর অধিকারী হয়ে গেল। তারা নামায পড়ছে যেমন আমরা নামায পড়ছি, তারা রোযা রাখছে যেমন আমরা রাখছি এবং (আমাদের চেয়ে তারা অতিরিক্ত কাজ এই করছে যে,) নিজেদের প্রয়োজন-অতিরিক্ত মাল থেকে তারা সাদকাহ করছে।' তিনি বললেন,
(( أَوْلَيسَ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلُّ تَكْبِيرة صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بالمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهِي عَن المُنكَرِ صَدَقَةٌ ، وفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ ).
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।”
সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন, (( أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرام أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرُ ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ .
"কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে।” (মুসলিম ২৩৭৬নং)
মহানবী বলেছেন, (( كُلُّ مَعْرُوفِ صَدَقَةٌ وَإِنَّ مِنْ الْمَعْرُوفِ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ وَأَنْ تُفْرِغْ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَاءِ أَخِيكَ)).
"প্রত্যেক কল্যাণমূলক কর্মই হল সদকাহ (করার সমতুল্য)। আর তোমার ভাইয়ের সাথে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা এবং তোমার বালতির সাহায্যে (কুয়ো থেকে পানি তুলে) তোমার ভাইয়ের পাত্র (কলসী ইত্যাদি) ভরে দেওয়াও কল্যাণমূলক (সৎ) কর্মের পর্যায়ভুক্ত।” (আহমদ ১৪৮৭৭, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৫৫৭ নং)
(( كُلُّ سُلامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ : تَعْدِلُ بَينَ الاثْنَينِ صَدَقَةٌ ، وتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ ، فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا أَوْ تَرفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ ، وَالكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ ، وبكلِّ خَطْوَةٍ تمشيهَا إِلَى الصَّلاةِ صَدَقَةٌ ، وتُميطُ الأذى عن الطريق صَدَقَةٌ )).
“প্রতিদিন যাতে সূর্য উদয় হয় (অর্থাৎ প্রত্যেক দিন) মানুষের প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে প্রদেয় একটি ক'রে সাদকাহ রয়েছে। (আর সাদকাহ শুধু মাল খরচ করাকেই বলে না; বরং) দু'জন মানুষের মধ্যে তোমার মীমাংসা ক'রে দেওয়াটাও সাদকাহ, কোন মানুষকে নিজ সওয়ারীর উপর বসানো অথবা তার উপর তার সামান উঠিয়ে নিয়ে সাহায্য করাও সাদকাহ, ভাল কথা বলা সাদকাহ, নামাযের জন্য কৃত প্রত্যেক পদক্ষেপ সাদকাহ এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূরীভূত করাও সাদকাহ।” (বুখারী ২৯৮৯, মুসলিম ২৩৭৭, ২৩৮২নং)
বলাই বাহুল্য যে, ইবাদত কেবল অনুষ্ঠান, বাড়ি ও মসজিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা হয় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে।
ইবাদত হল সুমহান প্রতিপালকের আনুগত্য। তাঁর আদেশ ও নিষেধের পুঙ্খানুপুঙ্খরূপ পালন। কুরআন ও সুন্নাহ যা করতে আদেশ করে, তা পালন করা এবং যা করতে নিষেধ করে, তা হতে বিরত থাকার নাম ইবাদত।
রাষ্ট্রনেতা শরয়ী বিধান অনুযায়ী দেশ চালিয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন। বিচারক শরয়ী আইন অনুযায়ী বিচার ক'রে আল্লাহর ইবাদত করেন। পিতা-মাতা ইসলামী নির্দেশ অনুসারে সংসার চালিয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন। সন্তান পিতা-মাতার বাধ্য থেকে আল্লাহর ইবাদত করে। স্বামী স্ত্রীর প্রতি শরয়ী কর্তব্য পালন ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। স্ত্রী স্বামীর আনুগত্য ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। মহিলা পর্দা মেনে আল্লাহর ইবাদত করে। ব্যবসায়ী সৎ ও হালাল উপায়ে ব্যবসা ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। কর্মচারী শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী কর্ম ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। সৈনিক শরয়ী নির্দেশ অনুসরণ ক'রে যুদ্ধ ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। ইবাদতের সহায়ক কাজ ক'রেও ইবাদত হয়। ইবাদতের জন্য বিশ্রাম নেওয়া ও ঘুমানোও ইবাদত হয়।
এইভাবে প্রত্যেক মুসলিম যে কাজ মহান আল্লাহকে রাযি-খুশি করার জন্য করে, তার মাধ্যমে সে আল্লাহর ইবাদত করে। তার ধ্যানে থাকে, সে যেন মহান আল্লাহকে দেখছে। তার মনে থাকে, তাকে মহান আল্লাহ দেখছেন।
📄 ইবাদতের প্রকারভেদ
জীবনের সকল ক্ষেত্রে রয়েছে ইবাদত। আর সেই দিক দিয়ে ইবাদতকে নানাভাবে ভাগ করেছেন উলামাগণ। যেমনঃ- একঃ ইবাদত দুই প্রকার
(ক) আচরণ ও ব্যবহারগত ইবাদত। আর তা হল মানুষের সাথে সচ্চরিত্রতা, সত্যবাদিতা ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে যা করা হয়।
(খ) প্রতীকী ইবাদত। আর তা হল নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে যে সকল ফরয ও নফল নামায, যাকাত, রোযা, হজ্জ ইত্যাদি পালনের মাধ্যমে যা করা হয়। দুইঃ ইবাদতের উপকারিতার দিক থেকে ইবাদত দুই প্রকার:
(ক) আত্মকেন্দ্রিক উপকারী ইবাদত। যেমন নামায, কুরআন পাঠ, যিক্র ইত্যাদি।
(খ) পরকেন্দ্রিক উপকারী ইবাদত। যেমন যাকাত, দান-খয়রাত, পরোপকার ইত্যাদি। তিনঃ ইবাদতের উপকরণের দিক দিয়ে তা ৪ প্রকারঃ
(ক) আন্তরিক ইবাদত। যেমন তওহীদ, ইখলাস, ইহসান ইত্যাদি।
(খ) শারীরিক ইবাদত। যেমন নামায, রোযা ইত্যাদি।
(গ) আর্থিক ইবাদত। যেমন যাকাত, দান-খয়রাত ইত্যাদি।
(ঘ) শারীরিক-আর্থিক ইবাদত। যেমন হজ্জ, জিহাদ ইত্যাদি। চারঃ করা না করার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ক্ষেত্রে ইবাদত ২ প্রকার:
(ক) সৃষ্টিগত ইবাদত। অর্থাৎ অনিচ্ছা সত্ত্বেও যে ইবাদত করতে মানুষ বাধ্য। স্রষ্টার যে দাসত্ব না ক'রে মানুষের কোন উপায় থাকে না। আর এমন ইবাদত আস্তিক-নাস্তিক এবং মু'মিন-কাফের সকলেই করে, করতে বাধ্য। সুমহান স্রষ্টার প্রকৃতি ও তকদীরের বাইরে কারো যাবার ক্ষমতা নেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا} (۹۳) سورة مريم "আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে পরম দয়াময়ের নিকট দাসরূপে উপস্থিত হবে না।” (মারয়্যামঃ৯৩)
(খ) শরীয়তগত ইবাদত। এ ইবাদতে মানুষের এখতিয়ার আছে। তা না ক'রে তাঁর অবাধ্য হতে পারে। আবার ইচ্ছা করলে মহান স্রষ্টার প্রতি ঈমান এনে তাঁর শরীয়তের প্রতি বিশ্বাস রেখে তাঁর যথা নিয়মে ইবাদত ও দাসত্ব করার সৌভাগ্য লাভ করতে পারে। আর সে ক্ষেত্রে সে মহান প্রতিপালকের শরীয়তের বিধান পালন ক'রে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ সূরা ফুরক্বানের শেষের দিকে তাঁর দাসদের গুণ-বর্ণনায় বলেছেন,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا} (٦٣)
“তারাই পরম দয়াময়ের দাস, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, 'সালাম'।” (ফুরক্বানঃ ৬৩)
রহমানের বান্দাগণের আরো গুণের কথা রয়েছে সূরাটির ৭৪নং আয়াত পর্যন্ত।
📄 ইসলামে ইবাদতের বৈশিষ্ট্যবলী
ইসলামী শরীয়তে ইবাদতের নানা বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য আছে। তার কতিপয় এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে。
১। ইসলামের ইবাদত মুসলিমের সারা জীবনে পরিব্যপ্ত। ইসলামের ইবাদত যেমন তার পরকালের জীবন সুখী করে, তেমনই তার ইহকালের জীবনও সুন্দর ক'রে তোলে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ} (৯৭) সূরা নাহল "পুরুষ ও নারী যে কেউই বিশ্বাসী হয়ে সৎকর্ম করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই সুখী জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।" (নাহল: ৯৭)
ইসলামের ইবাদত কিছু আছে যা সুমহান মা'বুদের সাথে সম্পৃক্ত। আর কিছু আছে সৃষ্টির সাথে সম্পৃক্ত।
ইসলামের ইবাদত আবেদের হৃদয়ে হয়, জিহ্বায় হয়, অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে হয়, উপার্জিত অর্থে হয়। তা কেবল বাহ্যিক প্রতীকে বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ইসলামের ইবাদত সমাজের সকল শ্রেণী ও সকল স্তরের মানুষের মাঝে পরিব্যপ্ত। এমন নয় যে, কোন এক প্রকার ইবাদত বিশেষ কোন সম্প্রদায় করতে পারবে না। লক্ষণীয় যে, ইসলামের ইবাদতে রয়েছে মা'বুদের সাথে খাস সম্পর্ক, রয়েছে মানুষের নিজের সাথে সম্পর্ক; যেমন ব্যক্তিগত পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, জীবন-যাপনের নানা পদ্ধতি, ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ, যৌনক্ষুধা নিবারণ, প্রস্রাব-পায়খানা করা ও লেবাস-পোশাক ব্যবহার ও সাজসজ্জা গ্রহণ করার নানা পদ্ধতি। ইবাদতে রয়েছে ঘর-সংসার ও সমাজের সাথে সম্পৃক্ত নানা বিধি-বিধান। রয়েছে অর্থনীতি ও রাজনীতির নানা রীতি-নীতি। রয়েছে অবিশ্বাসীদের সাথে ব্যবহারের নানা পদ্ধতি এবং জীবজগতের অন্যান্য প্রাণী ইত্যাদির সাথে ব্যবহারের নানা আচার-আচরণ।
ইসলামের ইবাদত মূল থেকে শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত। যেমন মহানবী বলেছেন, الإِيمَانُ بِضْعُ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعُ وَسِتُونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ .. “ঈমান সত্তর বা ষাটের অধিক শাখাবিশিষ্ট; যার উত্তম (ও প্রধান) শাখা ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই) বলা এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র শাখা পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্যতম শাখা।” (মুসলিম ১৬২নং)
ইসলামের ইবাদত জীবনের একাংশকে অন্য অংশের সাথে জুড়ে রাখে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইবাদত জুড়ে আছে, তখন কোন ক্ষেত্রে কোন অংশকে বাদ দেওয়ার উপায় নেই কারো। কিছু পালন করব, আর কিছু করব না---এমন স্বেচ্ছাচারিতা ও এখতিয়ার কারো নেই।
মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী জাতি সম্বন্ধে বলেছেন, {أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاء مَن يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدَّ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (৮৫) أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالآخِرَةِ فَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ} (৮৬) البقرة “তবে কি তোমরা ধর্মগ্রন্থের কিছু অংশে বিশ্বাস আর কিছু অংশকে অবিশ্বাস কর? অতএব তোমাদের যেসব লোক এমন কাজ করে, তাদের প্রতিফল পার্থিক জীবনে লাঞ্ছনাভোগ ছাড়া আর কি হতে পারে? আর কিয়ামতের (শেষ বিচারের) দিন কঠিনতম শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা যা করে, সে সম্বন্ধে আল্লাহ অনবহিত নন। তারাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে, সুতরাং তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং তারা কোন সাহায্যও পাবে না।” (বাক্বারাহঃ ৮৫-৮৬)
পক্ষান্তরে মুসলিমদেরকে উক্ত বিষয়ে সতর্ক করেছেন এবং দ্বীনের মূল ও শাখাবিশিষ্ট সকল বিষয়কে মেনে নিয়ে তাঁর আনুগত্য ও দাসত্ব করতে আদেশ দিয়েছেন। পরন্ত কোন বিষয়ে তাঁর দাসত্ব করা এবং কোন বিষয়ে না করা তথা দ্বীনকে পুরোপুরিরূপে গ্রহণ না করাকে চির শত্রু শয়তানের অনুসরণ করা বলে আখ্যায়ন করেছেন। সুতরাং তিনি বলেছেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السَّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ) (২০৮) سورة البقرة “হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (বাক্বারাহঃ ২০৮)
ইসলামের ইবাদত রয়েছে দ্বীন ও দুনিয়ার সকল বিষয়ে পরিব্যাপ্ত। ইসলামের ইবাদত দেহ ও আত্মা, দুনিয়া ও আখেরাত, ব্যক্তি ও সমাজ, সংসার ও পরিবেশ, জাতি ও দেশ ইত্যাদি সকল বিষয়ে জড়িত রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لَيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاء والضَّرَّاء وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ} (۱۷۷) سورة البقرة
"পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোন পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে আল্লাহ, পরকাল, ফিরিস্তাগণ, সমস্ত কিতাব এবং নবীগণকে বিশ্বাস করলে এবং অর্থের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, (এতীম-মিসকীন) মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী (ভিক্ষুক)গণকে এবং দাস মুক্তির জন্য দান করলে, নামায যথাযথভাবে পড়লে ও যাকাত প্রদান করলে, প্রতিশ্রুতি পালন করলে এবং দুঃখ-দৈন্য, রোগ-বালা ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণ করলে। এরাই তারা যারা সত্যপরায়ণ এবং ধর্মভীরু।” (বাক্বারাহঃ ১৭৭)
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا} (٣٦) سورة النساء
"তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ আত্মম্ভরী দাম্ভিককে ভালবাসেন না।” (নিসাঃ ৩৬)
ইবাদতের সুফল কেবল আবেদের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পরার্থপরতা, পরহিতৈষণা, পরোপকারিতা ইত্যাদি সৃষ্টির সেবাও ইসলামে ইবাদতরূপে গণ্য হয়। ঘর-পর সকল অধিকারীর অধিকার আদায় করলে মহান স্রষ্টার দাসত্ব হয়। যেমন মহানবী বলেছেন,
تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَة، وَأَمْرُكَ بِالْمَعْرُوفِ وَنَهْيُكَ عَنْ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ، وَإِرْشَادُكَ الرَّجُلَ فِي أَرْضِ الضَّلَالَ لَكَ صَدَقَةٌ، وَبَصَرُكَ لِلرَّجُلِ الرَّدِيءِ الْبَصَرِ لَكَ صَدَقَةٌ، وَإِمَاطَتُكَ الْحَجَرَ وَالشَّوْكَةَ وَالْعَظْمَ عَنْ الطَّرِيق لَكَ صَدَقَةٌ، وَإِفْرَاغُكَ مِنْ دَلُّوكَ فِي دَلْو أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ)).
"তোমার ভাইয়ের সামনে তোমার মুচকি হাসি তোমার জন্য সাদকা স্বরূপ। তোমার সৎকাজে আদেশ ও মন্দকাজে বাধা দেওয়া তোমার জন্য সাদকা স্বরূপ। তোমার লোককে হারিয়ে যাওয়ার জায়গাতে পথ বাতলে দেওয়া তোমার জন্য সাদকা স্বরূপ। তোমার ভালো দেখতে পায় না এমন ব্যক্তির (পথ ইত্যাদি) দেখে দেওয়া তোমার জন্য সাদকা স্বরূপ। তোমার পথ থেকে পাথর, কাঁটা ও হাড্ডি সরিয়ে ফেলা তোমার জন্য সাদকা স্বরূপ। তোমার বালতি দিয়ে তোমার ভাইয়ের বালতি ভরে দেওয়া তোমার জন্য সাদকা স্বরূপ।” (তিরমিযী ১৯৫৬, সিঃ সহীহাহ ৫৭২নং)
বরং পরোপকার হল মহান প্রতিপালকের সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় কর্ম। আর যা তিনি পছন্দ করেন, তা হল ইবাদত। মহানবী বলেছেন,
أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ ، وَأَحَبُّ الأَعْمَالَ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ ، أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً ، أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنَا ، أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا، وَلَأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَحْ فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ - يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ - شَهْرًا ، وَمَن كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ ، وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَلَوْ شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلأَ اللَّهُ قَلْبَهُ رَجَاءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيهِ فِي حَاجَةٍ حَتَّى يُثْبِتَهَا لَهُ أَثْبَتَ اللَّهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُولُ الأَقْدَامِ وَإِنَّ سُوء الْخُلُقِ لَيُفْسِدُ الْعَمَلَ كَمَا يُفْسِدُ الْخَلَ الْعَسَلَ].
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম লোক হল সেই ব্যক্তি যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল হল, একজন মুসলিমের হৃদয়কে খুশীতে পরিপূর্ণ করা অথবা তার কোন কষ্ট দূর করে দেওয়া অথবা তার তরফ থেকে তার ঋণ আদায় করে দেওয়া অথবা (কাপড় দান করে তার ইজ্জত ঢেকে দেওয়া অথবা) তার নিকট থেকে তার ক্ষুধা দূর করে দেওয়া। মসজিদে একমাস ধরে ই'তিকাফ করার চাইতে আমার মুসলিম ভাইয়ের কোন প্রয়োজন মিটাতে যাওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি নিজ ক্রোধ সংবরণ করে নেবে, আল্লাহ তার দোষ গোপন করে নেবেন। যে ব্যক্তি নিজ রাগ সামলে নেবে; অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, সে ব্যক্তির হৃদয়কে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যাবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যেদিন পদযুগল পিছল কাটবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে, যেমন সির্কা মধুকে নষ্ট ক'রে ফেলে।” (ত্বাবারানী ১৩৪৬৮, ইবনে আবিদ দুনয়া, সহীহ তারগীব ২০৯০, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯০৬নং, সহীহুল জামে' ১৭৬নং)
তামীম বিন আওস দারী বলেন, একদা নবী বললেন, "দ্বীন হল কল্যাণ কামনা করার নাম।” আমরা বললাম, 'কার জন্য?' তিনি বললেন,
لِلهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ)).
"আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রসূলের জন্য, মুসলিমদের শাসকদের জন্য এবং মুসলিম জনসাধারণের জন্য। (মুসলিম ২০৫নং)
আবেদের ইবাদতের সুফল পশু-পক্ষীও ভোগ করতে পারে। পশু-পক্ষীর প্রতি দায় প্রদর্শন করলেও ইবাদত হয়, তাতে সওয়াব হয়। মহানবী বলেছেন,
(( لَا يَغْرِسُ مُسْلِمٌ غَرْساً ، وَلَا يَزْرَعُ زَرعاً ، فَيَأْكُلَ مِنْهُ إِنْسَانُ وَلَا دَابَةٌ وَلَا شَيْءٌ ، إِلَّا كَانَتْ لَهُ صَدَقَةٌ )).
"মুসলিম যে গাছ লাগায় এবং ফসল বোনে অতঃপর তা থেকে কোন মানুষ, কোন জন্তু অথবা অন্য কিছু খায়, তবে তা তার জন্য সাদকাহ হয়ে যায়।” (মুসলিম ৪০৫০-৪০৫৩নং)
আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত, একদা আল্লাহর রসূল বললেন,
بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بطريق اشْتَدَّ عَلَيْهِ الْعَطَشِ فَوَجَدَ بِثْرًا فَنَزَلَ فِيهَا فَشَرِبَ ثُمَّ خَرَجَ فَإِذَا كَلْبٌ يَلْهَثْ يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ الْعَطَشَ فَقَالَ الرَّجُلُ لَقَدْ بَلَغَ هَذَا الْكَلْبَ مِنَ الْعَطَشِ مِثْلُ الَّذِي كَانَ بَلَغَ مِنِّي، فَنَزَلَ الْبِئْرَ فَمَلأَ خُفَّهُ مَاءً ثُمَّ أَمْسَكَهُ بِفِيهِ حَتَّى رَقِيَ فَسَقَى الْكَلْبَ فَشَكَرَ اللَّهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ . .
"এক ব্যক্তি এক কুয়ার নিকটবর্তী হয়ে তাতে অবতরণ করে পানি পান করল। অতঃপর উঠে দেখল, কুয়ার পাশে একটি কুকুর (পিপাসায়) জিহ্বা বের করে হাঁপাচ্ছে। তার প্রতি লোকটির দয়া হল। সে তার পায়ের একটি (চর্মনির্মিত) মোজা খুলে (কুয়াতে নেমে তাতে পানি ভরে এনে) কুকুরটিকে পান করাল। ফলে আল্লাহ তার এই কাজের প্রতিদান স্বরূপ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।" তখন লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! জীব-জন্তুর প্রতি দয়াপ্রদর্শনেও কি আমাদের সওয়াব আছে? তিনি বললেন,
في كُلِّ كَبَدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ .. "প্রত্যেক সজীব প্রাণবিশিষ্ট জীবের (প্রতি দয়াপ্রদর্শনে) সওয়াব বিদ্যমান।” (বুখারী ২৩৬৩, ২৪৬৬, মুসলিম ৫৯৯৬নং)
২। ইসলামের ইবাদতের অন্য এক বৈশিষ্ট্য হল ইখলাস। অর্থাৎ, এই ইবাদত হতে হবে খাঁটি ও বিশুদ্ধভাবে সুমহান প্রতিপালকের জন্য। কেবল তাঁরই সন্তুষ্টি কামনা ক'রে ইবাদত করতে হবে。
তাতে অন্য কোন সৃষ্টির তুষ্টিবিধান উদ্দেশ্য হলে হবে না। কাউকে দেখাবার উদ্দেশ্যে ইবাদত করলে তা শুদ্ধ হবে না। কাউকে শোনাবার উদ্দেশ্যে ইবাদত করলে তা শুদ্ধ হবে না। সুনাম বা প্রশংসা নেওয়ার উদ্দেশ্যে ইবাদত করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। অর্থ, পদ ইত্যাদি পার্থিব কোন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ইবাদত করলে তা কবুল হবে না।
মহান আল্লাহ বলেন, {وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاء وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ } (৫) سورة البيئة "তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে এবং নামায কায়েম করতে ও যাকাত প্রদান করতে। আর এটাই সঠিক ধর্ম।” (বাইয়িনাহঃ ৫)
৩। ইসলামে ইবাদতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, তার প্রত্যেকটি প্রমাণসাপেক্ষ্য। অর্থাৎ, মানুষ মনগড়াভাবে কোন ইবাদত করতে পারে না। বরং ইসলামী শরীয়াতে (কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে) যা প্রমাণিত, তাই করতে হবে। যে স্থান, কাল, পদ্ধতি ও সংখ্যা নির্ধারিত আছে, কেবল সেই অনুযায়ী তা করতে হবে। নচেৎ ইবাদত বিদআতে পরিগণিত হবে。
মহানবী বলেছেন, (( مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ)). "যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল---যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (বুখারী ২৬৯৭, মুসলিম ৪৫৮৯নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, (( مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ)). "যে ব্যক্তি এমন কাজ করল, যে ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই তা বর্জনীয়।” (মুসলিম ৪৫৯০নং)
৪। ইসলামের ইবাদতে কোন অসীলা বা মাধ্যম লাগে না। বরং প্রত্যেক স্তরের মানুষ সরাসরি সুমহান স্রষ্টার ইবাদত করতে পারে। তিনি সরাসরি সকলের ইবাদত কবুল করেন, সকলের প্রার্থনা শ্রবণ করেন。
মহান আল্লাহ বলেন, {وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ} (১৮৬) سورة البقرة "আর আমার দাসগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন তুমি বল, আমি তো কাছেই আছি। যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই। অতএব তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমাতে বিশ্বাস স্থাপন করুক, যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে।” (বাক্বারাহঃ ১৮৬)
যারা আল্লাহ ও নিজেদের মাঝে মাধ্যম বা সুপারিশকারী আছে ধারণা ক'রে তার পূজা করে, তাদের ধারণা কুরআন খন্ডন করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلاء شُفَعَاؤُنَا عِندَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ}
"আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর উপাসনা করে, যা তাদের কোন অপকারও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। অথচ তারা বলে, এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বলে দাও, 'তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ, যা তিনি অবগত নন, না আকাশসমূহে, আর না পৃথিবীতে? তিনি পবিত্র এবং তারা যে অংশী করে, তা হতে তিনি উর্ধ্বে।” (ইউনুসঃ ১৮)
{أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ}
"জেনে রাখ, খাঁটি আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা বলে, 'আমরা এদের পূজা এ জন্যই করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।' ওরা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে, আল্লাহ তার ফায়সালা ক'রে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না, যে মিথ্যাবাদী অবিশ্বাসী।” (যুমার: ৩)
৫। ইসলামের ইবাদতে মানুষের প্রকৃতি, সামর্থ্য ও অপারগতার কথা খেয়াল করা হয়েছে। সাধ্যের অতীত কোন ভারার্পণ তার উপর করা হয়নি。
{وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَا تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ) (٤٢) سورة الأعراف
"আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তারাই হবে জান্নাতবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” (আ'রাফঃ ৪২)
{وَلَا تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا وَلَدَيْنَا كِتَابٌ يَنطِقُ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ} (٦২) المؤمنون
"আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পণ করি না এবং আমার নিকট আছে এক গ্রন্থ; যা সত্য ব্যক্ত করে এবং তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।" (মু'মিনুনঃ ৬২)
বলা বাহুল্য, ইবাদত কখনো আবশ্যিক কিছু করার মাধ্যমে হয়, কখনো উত্তম কিছু করার মাধ্যমে। আবার কখনো অবৈধ কিছু ত্যাগ করার মাধ্যমে, কখনো অনুত্তম কিছু বর্জন করার মাধ্যমে।
আর উক্ত বৈশিষ্ট্যের কারণেই আবেদের জন্য ইবাদত পালন করা অতি সহজ হয়ে যায়।
যেমন পবিত্রতার বিধানে পানি ব্যবহার করতে সক্ষম না হলে মাটি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা যায়। নামায দাঁড়িয়ে পড়তে না পারলে বসে, বসে না পারলে শুয়ে পড়া যায়। অসুস্থ বা সফর অবস্থায় রোযা কাযা করা যায়। ইত্যাদি। মহানবী বলেছেন, (( إِنَّ الدِّينَ يُسْرُ ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينُ إِلَّا غَلَبَهُ ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا ، وَاسْتَعِينُوا بِالغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَيْءٍ مِنَ الدُّلْجَةِ )). (سَدِّدُوا وَقَارِبُوا ، وَاغْدُوا وَرُوحُوا ، وَشَيْءٌ مِنَ الدُّلْجَةِ ، القَصْدَ القَصْدَ تَبْلُغُوا)). "নিশ্চয় দ্বীন সহজ। যে ব্যক্তি অহেতুক দ্বীনকে কঠিন বানাবে, তার উপর দ্বীন জয়ী হয়ে যাবে। (অর্থাৎ মানুষ পরাজিত হয়ে আমল ছেড়ে দিবে।) সুতরাং তোমরা সোজা পথে থাক এবং (ইবাদতে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা সুসংবাদ নাও। আর সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশে ইবাদত করার মাধ্যমে সাহায্য নাও।”
অন্য এক বর্ণনায় আছে, "তোমরা সরল পথে থাকো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, সকাল-সন্ধ্যায় চল (ইবাদত কর) এবং রাতের কিছু অংশে। আর তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তাহলেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে।” (বুখারী ৩৯, ৬৩৬৩নং)
৬। ইসলামের ইবাদত মানব-জীবনে নিরবচ্ছিন্নভাবে করে যেতে হয়। নাবালক থাকতে তার অনুশীলন শুরু হয় এবং সাবালক হওয়ার সাথে সাথে তা অনিবার্য হয়ে যায়। অতঃপর মরণের আগে (জ্ঞান বর্তমান থাকা) পর্যন্ত তা পালন করতে হয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ} (৯৯) সূরা আল-হিজর "আর তোমার মৃত্যু উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত কর।” (হিজরঃ ৯৯)