📘 কেন এ জীবন 📄 মানবজাতি আসলে দাস

📄 মানবজাতি আসলে দাস


মানবজাতি আসলেই কারো না কারো দাস। জানতে বা অজানতে মানুষ কারো না কারো দাসত্ব করে। অনেকে স্বেচ্ছায় করে, অনেকে অনিচ্ছায় করে। শুধু মানুষই না, এ জগতে সকল সৃষ্টি মহান স্রষ্টার দাসত্ব করে, তাঁর ইবাদত করে। মহান প্রতিপালক সে কথা তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন।
{أَفَغَيْرَ دِينِ اللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ} (۸۳) سورة آل عمران
"তারা কি আল্লাহর ধর্মের পরিবর্তে অন্য ধর্ম চায়? অথচ আকাশে ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে সমস্তই স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্ম-সমর্পণ করেছে! এবং তাঁরই কাছে তারা ফিরে যাবে।” (আলে ইমরান: ৮৩)
{وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَظِلالُهُم بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ} (১৫)
"আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত হয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় এবং তাদের ছায়াগুলিও সকাল ও সন্ধ্যায়।” (রা'দঃ ১৫)
{أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالطَّيْرُ صَافَّاتٍ كُلٌّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَفْعَلُونَ} (৪১) সূরা আন-নূর
"তুমি কি দেখ না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা এবং উড়ন্ত পাখীদল আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? সকলেই তাঁর প্রশংসা এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি জানে। আর ওরা যা করে, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত।” (নূর: ৪১)
{أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَن يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِن مُّكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاء} (১৮) সূরা আল-হাজ্জ
"তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যারা আছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে; সিজদা করে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমন্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু, এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে; আর অনেকের প্রতি অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে হেয় করেন তার সম্মানদাতা কেউই নেই; নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।” (হাজ্জঃ ১৮)
মানুষের মধ্যে অনেকে, যারা বিশ্বাসী, তারা মহান প্রতিপালকের ইবাদত করে। মহান প্রতিপালকের বিধান মেনে নিয়ে যথানিয়মে তাঁর দাসত্ব ও উপাসনা ক'রে থাকে।
কিছু আংশিক বিশ্বাসীও অবিশ্বাসীদের মতো মহান প্রতিপালকের ইবাদত করে। কিন্তু তাঁর সাথে অন্যেরও ইবাদত করে।
বহু মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করলেও তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যের উপাসনা করে। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন,
{إِنَّمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ أَوْتَانًا وَتَخْلُقُونَ إِفْكًا إِنَّ الَّذِينَ تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ لَكُمْ رِزْقًا فَابْتَغُوا عِندَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ} (১৭)
"তোমরা তো আল্লাহ ব্যতীত কেবল প্রতিমার উপাসনা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ; তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা কর, তারা তোমাদের রুযী দানে অক্ষম। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিকটেই রুযী কামনা কর এবং তাঁর উপাসনা ও কৃতজ্ঞতা কর। তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।” (আনকাবৃতঃ ১৭)
বহু মানুষ জানতে-অজানতে শয়তানের উপাসনা করে। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ يَا بَنِي آدَمَ أَن لَّا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ} (٦٠) يس
"হে আদম সন্তান-সন্ততিগণ! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দিইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করো না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (ইয়াসীন: ৬০)
ইব্রাহীম নবী নিজ পিতাকে বলেছিলেন,
{يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمَن عَصِيًّا } (٤٤) سورة مريم
"হে আমার পিতা! শয়তানের উপাসনা করো না; নিশ্চয় শয়তান পরম দয়াময়ের অবাধ্য।” (মারয়ামঃ ৪৪)
যারা আল্লাহ ব্যতিরেকে অন্যের উপাসনা করে, প্রকৃত প্রস্তাবে তারা শয়তানেরই উপাসনা করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِن يَدْعُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَّرِيدًا } (۱۱۷) سورة النساء
"তাঁর (আল্লাহর) পরিবর্তে তারা কেবল নারীদেরকে (দেবীদেরকে) আহবান করে এবং তারা কেবল বিদ্রোহী শয়তানের পূজা করে।” (নিসাঃ ১১৭)
বহু মানুষ নিজের মনের পূজা করে। মনোমতো চলে, মনোমতো বিশ্বাস করে। যারা নাস্তিক তারাও আসলে দাস। তারা নিজেদের মনের খেয়াল-খুশীর ও অনুমানের দাসত্ব করে।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{أَرَأَيْتَ مَن اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا} (٤٣) سورة الفرقان
"তুমি কি দেখ না তাকে, যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার কর্মবিধায়ক হবে।” (ফুরক্বানঃ ৪৩)
{أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ) (۲۳) سورة الجاثية
"তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজের উপাস্য ক'রে নিয়েছে? আল্লাহ জেনেশুনেই ওদের বিভ্রান্ত করেছেন এবং ওর কর্ণ ও হৃদয় মোহর ক'রে দিয়েছেন এবং ওর চোখের ওপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহ মানুষকে বিভ্রান্ত করার পর কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” (জাছিয়াহঃ ২৩)
{فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} (٥٠) سورة القصص
“অতঃপর ওরা যদি তোমার আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে জানবে ওরা তো কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অমান্য ক'রে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে? নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না।” (ক্বাস্বাস্বঃ ৫০)
মোটের উপর কথা হল, এ বিশ্বের সকল সৃষ্টিই উপাসক, সকল কিছুই দাস। দাসত্বের প্রকৃতি প্রক্ষিপ্ত আছে প্রত্যেক জীব ও অজীবের মাঝে।
গায়রুল্লাহর ইবাদতের অর্থ হল পূজা করা। অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে নানা পূজায় জড়িত। জনৈক কবি বলেছেন,
'অপূজ্য পূজিত হয় বিশ্বপতি ছাড়া, জীব-শ্রেষ্ঠ নর হয় সত্য জ্ঞান-হারা।
চলিছে পূজার স্রোত দিবায় নিশায়, দ্বীন ও ঈমান-ত্যাগী স্রষ্টা বিধাতায়।
রিপুর পূজক কেহ শক্তি উপাসক, লোভের পূজারী কেহ ইন্দ্রিয় সেবক,
গাছের পূজারী কেহ, কেহ পাথরের, কবর-পূজক কেহ লোভী মানতের।
ইচ্ছার পূজক কেহ আত্মসুখ প্রয়াসী, বিলাস-ব্যসনে কেহ মত্ত দিবানিশি।
শঠ ব্যবসায়ী কেহ নামের পূজক, যশান্বেষী কেহ, কেহ প্রাধান্য সাধক।
ছবি মূর্তি পূজে কেহ ভক্তি অর্থ দানে, জড় ও জীবে পূজে কেহ সভয় জ্ঞানে,
দেশের পূজক কেহ দেশ নায়কের, কেহ পূজে প্রাণ ভয়ে যুক্তি অপরের।'

📘 কেন এ জীবন 📄 ফেরেশতাগণ তো ইবাদত করছিলেন, তাহলে আবার মানুষ কেন?

📄 ফেরেশতাগণ তো ইবাদত করছিলেন, তাহলে আবার মানুষ কেন?


নূরের তৈরি ফিরিস্তাগণ তো মহান আল্লাহর ইবাদত করছিলেন, তাহলে আবার মানুষকে ইবাদতের জন্য তিনি সৃষ্টি করলেন কেন?
ফিরিস্তামন্ডলী সদা-সর্বদা মহান আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে মশগুল থাকেন, তাঁর হুকুম তামীল ও আদেশ পালনে তৎপর থাকেন। আর তাতে তাঁরা মানুষের মতো কোন প্রকারের আলস্য বা ক্লান্তি অনুভব করেন না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَلَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ عِندَهُ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ (۱۹) يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ} (۲۰) سورة الأنبياء
অর্থাৎ, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা তাঁরই মালিকানাধীন। আর তাঁর সান্নিধ্যে যারা আছে, তারা তাঁর উপাসনা করতে অহংকার করে না এবং ক্লান্তি বোধও করে না। তারা দিবা-রাত্রি তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; তারা শৈথিল্য করে না। (আম্বিয়াঃ ১৯-২০)
উক্ত আয়াতকে ভিত্তি করে উলামাগণ বলেন, ফিরিস্তাবর্গ নিদ্রাভিভূত হন না। (আল-হাবাইক ২৬৪পৃঃ)
{فَإِنِ اسْتَكْبَرُوا فَالَّذِينَ عِندَ رَبِّكَ يُسَبِّحُونَ لَهُ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَهُمْ لَا يَسْأَمُونَ }
অর্থাৎ, ওরা অহংকার করলেও যারা তোমার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে রয়েছে, তারা তো দিন-রাত তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং তারা ক্লান্তিবোধ করে না। (হা-মীম সাজদাহঃ ৩৮)
ফিরিস্তাগণ প্রকৃতিগতভাবে আল্লাহর আনুগত্যে রত থাকেন। তাঁদের অবাধ্যতা করার ক্ষমতাই নেই। যেহেতু তাঁদের মাঝে অবাধ্যতার প্রকৃতিই প্রক্ষিপ্ত হয়নি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ} (٦) سورة التحريم
অর্থাৎ, তারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। (তাহরীমঃ ৬)
বলা বাহুল্য, তাঁদের অবাধ্যাচরণ না করা এবং আনুগত্য করা তাঁদের প্রকৃতিগত স্বাভাবিক ব্যাপার। এ ব্যাপারে তাঁদেরকে যৎ সামান্যও প্রচেষ্টা ও শ্রম ব্যয় করতে হয় না। যেহেতু তাঁদের কুপ্রবৃত্তি ও ইন্দ্রিয়লালসা নেই এবং তাঁদের পশ্চাতে শয়তানও নেই।
সাহাবী হাকীম বিন হিযাম বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণের মাঝে ছিলেন। অকস্মাৎ তিনি বলে উঠলেন, "তোমরা কি তা শুনতে পাচ্ছ, যা আমি শুনতে পাচ্ছি?” সকলে বলল, 'আমরা তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না।' তিনি বললেন,
(إِنِّي لأَسْمَعُ أَطِيطَ السَّمَاءِ وما تُلامُ أن تَئِطٌ وما فيها موضعُ شِبْرٍ إِلَّا وَعَلَيْهِ مَلَكٌ سَاجِدٌ أَوْ قائم ).
অর্থাৎ, আমি তো আকাশের কটকট শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর এ শব্দ করায় তার দোষ নেই। তার মাঝে অর্ধ হাত পরিমাণ এমন জায়গা নেই, যাতে কোন ফিরিস্তা সিজদা অথবা কিয়াম অবস্থায় নেই। (ত্বাবারানীর কাবীর ৩১২২, সিঃ সহীহাহ ৮৫২নং)
পরন্ত মানুষ হল অশান্তি সৃষ্টিকারী পাপী। তাহলে ইবাদতের জন্য আবার সেই মানুষ কেন? এ প্রশ্ন জেগেছিল সদা ইবাদতরত ফিরিস্তাদের মনেও।
মহান আল্লাহ বলেন,
{وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاء وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ } (٣٠) البقرة
"আর (স্মরণ কর) যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশাদেরকে বললেন, 'আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি।' তারা বলল, 'আপনি কি সেখানে এমন কাউকেও সৃষ্টি করবেন, যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? অথচ আমরাই তো আপনার সপ্রশংস মহিমা কীর্তন ও পবিত্রতা ঘোষণা করি।' তিনি বললেন, 'নিশ্চয়ই আমি যা জানি তা তোমরা জান না।" (বাক্বারাহঃ ৩০)
হ্যাঁ, তাঁর সকল হিকমত সবাই জানতে পারবে, তা জরুরী নয়। আসলে তিনি চাইলেন এমন এক সৃষ্টি, যে তাঁর ইবাদত করবে এবং অবাধ্য হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে। আর ক্ষমাপ্রার্থনাও একটি ইবাদত। তাই তিনি পাপ দিয়ে তাদেরকে তাঁর ইবাদতে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যেই পাপী-তাপী মানুষ সৃষ্টি করলেন। যে মানুষ ভুল করবে, আবার তার জন্য অনুতপ্ত হবে। যে তাঁর দরবার ছেড়ে পালিয়ে যাবে, আবার ফিরে এলে তিনি খুশী হবেন।
বলাই বাহুল্য যে, পাপ ঘটে যাওয়ার পর তওবা করা অন্যতম ইবাদত। যে ইবাদতে মহান আল্লাহ অনেকানেক খুশী হন।
মহানবী বলেছেন, اللَّهُ أَشَدُّ فَرَحاً بِتَوبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ، فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابَهُ فَأَيسَ مِنْهَا ، فَأَتَى شَجَرَةً فَاصْطَجَعَ فِي ظِلُّهَا وقد أيس مِنْ رَاحِلَتِهِ ، فَبَينَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ هُوَ بِها قَائِمَةً عِندَهُ ، فَأَخَدَ بخِطَامِهَا، ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الفَرَحِ : اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وأنا رَبُّكَ ! أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الفَرَحِ)).
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তওবায় যখন সে তওবা করে তোমাদের সেই ব্যক্তির চেয়ে বেশী খুশী হন, যে তার বাহনের উপর চড়ে কোন মরুভূমি বা জনহীন প্রান্তর অতিক্রমকালে বাহনটি তার নিকট থেকে পালিয়ে যায়। আর খাদ্য ও পানীয় সব ওর পিঠের উপর থাকে। অতঃপর বহু খোঁজাখুঁজির পর নিরাশ হয়ে সে একটি গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে বাহনটি হঠাৎ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে যায়। সে তার লাগাম ধরে খুশীর চোটে বলে ওঠে, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার দাস, আর আমি তোমার প্রভু!' সীমাহীন খুশীর কারণে সে ভুল ক'রে ফেলে।” (বুখারী ৬৩০৯, মুসলিম ৭১৩১-৭১৩৭নং)
পরন্তু মানুষ যদি ফিরিপ্তার মতোই কেবল ইবাদতই করত এবং পাপ না করত, তাহলে মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কেবল আবেদদের সংখ্যাবৃদ্ধিই হতো। কিন্তু তিনি চেয়েছেন এমন এক সৃষ্টি, যে পাপ করেও ইবাদত করবে। তিনি চাইলেন, তিনি কেবল মা'বুদ হবেন না; বরং ক্ষমাশীল মা'বুদ হবেন। মহানবী বলেছেন,
(( وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا ، لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ ، وَجَاءَ بِقَومٍ يُذْنِبُونَ ، فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ تَعَالَى ، فَيَغْفِرُ لَهُمْ )).
"সেই মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! যদি তোমরা পাপ না কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে অপসারিত করবেন এবং এমন জাতির আবির্ভাব ঘটাবেন যারা পাপ করবে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইবে। আর তিনি তাদেরকে ক্ষমা ক'রে দেবেন।” (মুসলিম ৭১৪১নং)
অবশ্য তার মানে এই নয় যে, তিনি পাপ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আসলে উদ্বুদ্ধ করেছেন একটি বিশেষ ইবাদতে। আর তা হল তওবা ও ইস্তিগফার। আর এই বিশেষ ইবাদতটি ফিরিস্তাগণ করেন না। অর্থাৎ, তাঁরা নিজেদের ভুল-ত্রুটি বা পাপের জন্য ক্ষমা চান না। যেহেতু তাঁরা নিষ্পাপ সৃষ্টি। অবশ্য তাঁরা পৃথিবীবাসী মু'মিনদের জন্য ইস্তিগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনা ক'রে থাকেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ} (۷) سورة غافر
"যারা আরশ ধারণ ক'রে আছে এবং যারা এর চারিপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা প্রশংসার সাথে ঘোষণা করে এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ক'রে বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী; অতএব যারা তওবা করে ও তোমার পথ অবলম্বন করে, তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা কর।” (মু'মিনঃ ৭)
{تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِن فَوْقِهِنَّ وَالْمَلَائِكَةُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِمَن فِي الْأَرْضِ أَلَا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ} (৫) سورة الشورى
"আকাশমন্ডলী উর্ধ্বদেশ হতে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় এবং ফিরিশতা তাদের প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং পৃথিবীর বাসিন্দার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (শূরাঃ ৫)

📘 কেন এ জীবন 📄 মহান আল্লাহ কি কারো ইবাদতের মুখাপেক্ষী?

📄 মহান আল্লাহ কি কারো ইবাদতের মুখাপেক্ষী?


আমরা জানি, সুমহান স্রষ্টা কারো বা কোন কিছুরই মুখাপেক্ষী নন। কেউ তাঁর প্রতি অবিশ্বাস করলে, তাঁকে অমান্য করলেও তিনি কোন পরোয়া করেন না। সারা সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী এবং তিনিই অভাবমুক্ত, অমুখাপেক্ষী স্বয়ংসম্পূর্ণ বাদশা। তিনি বলেছেন,
{وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ} (৯৭) سورة آل عمران
"মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্জ করা তার (পক্ষে) অবশ্য কর্তব্য। আর যে অস্বীকার করবে (সে জেনে রাখুক যে), আল্লাহ জগতের প্রতি অমুখাপেক্ষী।” (আলে ইমরান: ৯৭)
{وَإِن تَكْفُرُوا فَإِنَّ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ وَكَانَ اللَّهُ غَنِيًّا حَمِيدًا} (১৩১)
"তোমরা অবিশ্বাস করলেও আকাশমন্ডল ও ভূ-মন্ডলে যা কিছু আছে, সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসাভাজন।” (নিসাঃ ১৩১)
{وَرَبُّكَ الْغَنِيُّ ذُو الرَّحْمَةِ إِن يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَسْتَخْلِفْ مِن بَعْدِكُم مَّا يَشَاء كَمَا أَنشَأَكُم مِّن ذُرِّيَّةِ قَوْم آخَرينَ} (১৩৩) سورة الأنعام
"তোমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত, দয়াশীল। তিনি ইচ্ছা করলে, তোমাদেরকে অপসারিত করতে এবং তোমাদের পরে যাকে ইচ্ছা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন; যেমন তোমাদেরকে তিনি অন্য এক সম্প্রদায়ের বংশ হতে সৃষ্টি করেছেন।” (আনআমঃ ১৩৩)
{وَقَالَ مُوسَى إِن تَكْفُرُوا أَنتُمْ وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا فَإِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ حَمِيدٌ} (৮)
"মুসা বলেছিল, 'তোমরা এবং পৃথিবীর সকলেই যদি অকৃতজ্ঞ (কাফের) হও; তবুও নিঃসন্দেহে আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং সর্বপ্রশংসিত।” (ইব্রাহীমঃ ৮)
{وَمَن جَاهَدَ فَإِنَّمَا يُجَاهِدُ لِنَفْسِهِ إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ} (৬) سورة العنكبوت
"যে কেউ সংগ্রাম করে, সে তো নিজের জন্যই সংগ্রাম করে; আল্লাহ অবশ্যই বিশ্বজগতের ওপর নির্ভরশীল নন।" (আনকাবূতঃ ৬)
{ وَمَن يَشْكُرْ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ} (১২) سورة لقمان
"যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তো তা নিজেরই জন্য করে এবং কেউ অকৃতজ্ঞতা করলে, নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।” (লুকুমানঃ ১২)
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاء إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ} (১৫) سورة فاطر
"হে মানুষ! তোমরা তো আল্লাহর মুখাপেক্ষী, কিন্তু আল্লাহ; তিনিই অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।” (ফাত্বিরঃ ১৫)
{إِن تَكْفُرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنكُمْ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَإِن تَشْكُرُوا يَرْضَهُ لَكُمْ} (৭)
"তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে জেনে রাখ, আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তাঁর দাসদের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে তিনি তোমাদের কৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন।” (যুমার: ৭)
{وَمَن يَبْخَلْ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَن نَّفْسِهِ وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنتُمُ الْفُقَرَاءِ وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُمْ} (৩৮) سورة محمد
"তোমরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে বলা হচ্ছে অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করছে। যারা কার্পণ্য করে, তারা তো কার্পণ্য করে নিজেদের প্রতি। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা বিমুখ হও, তাহলে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন; অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।" (মুহাম্মাদ: ৩৮)
{الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَمَن يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ} (٢٤)
"যারা কার্পণ্য করে এবং মানুষকে কার্পণ্যের নির্দেশ দেয়; যে মুখ ফিরিয়ে নেয় (সে জেনে রাখুক যে), নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।” (হাদীদঃ ২৪)
{لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيهِمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَمَن يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ} (٦) سورة الممتحنة
"নিশ্চয়ই তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রত্যাশা কর, তাদের জন্য তাদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।” (মুমতাহিনাহঃ ৬)
{ذلِكَ بِأَنَّهُ كَانَت تَأْتِيهِمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالُوا أَبَشَرٌ يَهْدُونَنَا فَكَفَرُوا وَتَوَلَّوا وَاسْتَغْنَى اللَّهُ وَاللَّهُ غَنِيٌّ حَمِيدٌ} (٦) سورة التغابن
"তা এ জন্য যে, তাদের নিকট তাদের রসূলগণ স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ আসত, তখন তারা বলত, 'মানুষই কি আমাদেরকে পথের সন্ধান দিবে?' অতঃপর তারা অবিশ্বাস করল ও মুখ ফিরিয়ে নিল এবং আল্লাহও কোন পরোয়া করলেন না। আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।” (তাগাবুনঃ ৬)
আবু যার জুন্দুব বিন জুনাদাহ হতে বর্ণিত, নবী তাঁর সুমহান প্রভু হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (আল্লাহ) বলেছেন,
((يَا عِبَادِي ! إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُم مُحَرَّماً فَلَا تَظَالَمُوا . يَا عِبادِي ! كُلُّكُمْ ضَالَ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ فَاسْتَهْدُونِي أَهْدِكُمْ . يَا عِبَادِي ! كُلُّكُمْ جَائِعٌ إِلَّا مَنْ أَطْعَمْتُهُ فَاسْتَطْعِمُونِي أَطْعِمْكُمْ ، يَا عِبَادِي ! كُلُّكُمْ عَارِ إِلَّا مَنْ كَسَوْتُهُ فَاسْتَكْسُونِي أَكْسُكُمْ . يَا عِبَادِي ! إِنَّكُمْ تُخْطِئُونَ بِاللَّيلِ وَالنَّهارِ وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعاً فَاسْتَغْفِرُونِي أَغْفِرْ لَكُمْ . يَا عِبَادِي ! إِنَّكُمْ لَنْ تَبْلُغُوا ضُرِّي فَتَضُرُّوني ، وَلَنْ تَبْلُغُوا نَفْعِي فَتَنْفَعُونِي . يَا عِبَادِي ! لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ كَانُوا عَلَى أَتْقَى قَلْبِ رَجُل وَاحِدٍ مِنْكُمْ مَا زَادَ ذلِكَ فِي مُلكي شيئاً . يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ كَانُوا عَلَى أفْجَر قَلْبِ رَجُل وَاحِدٍ مِنْكُمْ مَا نَقَصَ ذلك من ملكي شيئاً. يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ قَامُوا فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ فَسَأَلُونِي فَأَعْطَيتُ كُلَّ إِنْسَانِ مَسْأَلَتَهُ مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِمَّا عِنْدِي إِلَّا كَمَا يَنْقِصُ المِخْيَطُ إِذَا أُدْخِلَ البَحْرَ . يَا عِبَادِي ! إِنَّمَا هِيَ أَعْمَالُكُمْ أَحْصِيهَا لَكُمْ ثُمَّ أُوَفِّيكُمْ إِيَّاهَا ، فَمَنْ وَجَدَ خَيْراً فَلْيَحْمَدِ اللَّهِ، وَمَنْ وَجَدَ غَيْرَ ذَلِكَ فَلَا يَلُومَنَّ إِلَّا نَفْسَهُ)).
"হে আমার বান্দারা! আমি অত্যাচারকে আমার নিজের জন্য হারাম করে দিয়েছি এবং আমি তা তোমাদের মাঝেও হারাম করলাম। সুতরাং তোমরাও একে অপরের প্রতি অত্যাচার করো না। হে আমার বান্দারা! তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট; কিন্তু সে নয় যাকে আমি সঠিক পথ দেখিয়েছি। অতএব তোমরা আমার নিকট সঠিক পথ চাও আমি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখাব। হে আমার বান্দারা! তোমরা সকলেই ক্ষুধার্ত, কিন্তু সে নয় যাকে আমি খাবার দিই। সুতরাং তোমরা আমার কাছে খাবার চাও, আমি তোমাদেরকে খাবার দেব। হে আমার বান্দারা! তোমরা সকলেই বস্ত্রহীন; কিন্তু সে নয় যাকে আমি বস্ত্র দান করেছি। সুতরাং তোমরা আমার কাছে বস্ত্র চাও, আমি তোমাদেরকে বস্ত্রদান করব। হে আমার বান্দারা! তোমরা দিন-রাত পাপ ক'রে থাক, আর আমি সমস্ত পাপ ক্ষমা ক'রে থাকি। সুতরাং তোমরা আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা ক'রে দেব। হে আমার বান্দারা! তোমরা কখনো আমার অপকার করতে পারবে না এবং কখনো আমার উপকারও করতে পারবে না। হে আমার বান্দারা! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ ও জ্বিন সকলেই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় একজন পরহেযগার ব্যক্তির হৃদয়ের মত হৃদয়বান হয়ে যায়, তাহলে এটা আমার রাজত্বের কোন কিছু বৃদ্ধি করতে পারবে না। হে আমার বান্দারা! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ ও জ্বিন সকলেই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় একজন পাপীর হৃদয়ের মত হৃদয়ের অধিকারী হয়ে যায়, তাহলে এটা আমার রাজত্বের কোন কিছুই কমাতে পারবে না। হে আমার বান্দারা! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ তোমাদের মানুষ ও জ্বিন সকলেই একটি খোলা ময়দানে একত্রিত হয়ে আমার কাছে প্রার্থনা করে, আর আমি তাদের প্রত্যেককে তার প্রার্থিত জিনিস দান করি, তাহলে (এ দান) আমার কাছে যে ভাণ্ডার আছে, তা হতে ততটাই কম করতে পারবে, যতটা সুচ কোন সমুদ্রে ডুবালে তার পানি কমিয়ে থাকে। হে আমার বান্দারা! আমি তোমাদের কর্মসমূহ তোমাদের জন্য গুনে রাখছি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তার পূর্ণ বিনিময় দেব। সুতরাং যে কল্যাণ পাবে, সে আল্লাহর প্রশংসা করুক। আর যে ব্যক্তি অন্য কিছু (অর্থাৎ অকল্যাণ) পাবে, সে যেন নিজেকেই তিরস্কার করে।” (মুসলিম ৬৭৩৭নং)
কিন্তু বহু অবুঝ মানুষ প্রশ্ন তোলে, তাহলে তিনি ইবাদতের জন্য মানব-দানব সৃষ্টি করলেন কেন?
প্রথমতঃ সুমহান স্রষ্টা ইচ্ছাময়। তাঁর কাজে তাঁকে প্রশ্ন করার অধিকার কোন সৃষ্টির নেই। তাঁর কর্মের হিকমত বুঝতে পারলে তো ভালো, না পারলে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ করা মু'মিনের উচিত নয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ} (۲۳) سورة الأنبياء "তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না; বরং ওদেরকেই প্রশ্ন করা হবে।” (আম্বিয়া: ২৩)
{أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَأْتِي الْأَرْضِ نَنقُصُهَا مِنْ أَطْرَافِهَا وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ} (٤١) سورة الرعد "তারা কি দেখে না যে, আমি (তাদের দেশ) পৃথিবীকে চারদিক হতে সংকুচিত ক'রে আনছি? আল্লাহ আদেশ করেন। তাঁর আদেশের সমালোচনা (পুনর্বিবেচনা) করার কেউ নেই এবং তিনি হিসাব গ্রহণে তৎপর।” (রা'দঃ ৪১)
দ্বিতীয়তঃ তিনি মানব-দানবের ইবাদতের মুখাপেক্ষী নন। তবে তিনি চেয়েছেন যে, মানব-দানব একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে। আর তার উপর তিনি তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। তিনি তাঁর আবেদ বান্দাগণকে চির সুখময় স্থান জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তিনি বলেছেন,
{يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ (۲۷) فَادْخُلِي فِي عِبَادِي (۲۹) وَادْخُلِي جَنَّتِي} (۳۰) "হে উদ্বেগশূন্য চিত্ত! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে এস সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। সুতরাং তুমি আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।" (ফাঃ ২৭-৩০)
আর কারো কিছু প্রয়োজন হলেই কি মানুষ তাকে দিয়ে থাকে? বিনিময় বা উপহার হিসাবে দেওয়া কি মানুষের রীতি নয়?
যে সুমহান স্রষ্টা আমাকে সুন্দতরতম অবয়ব দিয়ে শ্রেষ্ঠ জীবরূপে সৃষ্টি করলেন, রুযী দিলেন, চির সুখময় জান্নাত দেবেন, সেই সুমহান স্রষ্টার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কিছু করা কি আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় না?
অন্নদাতার দাসত্ব কি মানুষ করে না? কেউ উপকার করলে মানুষ কি উপকারীর দাস হয়ে যায় না? কারো নেমক খেলে কি নেমকহালালি করতে হয় না? তাহলে কেন সুমহান প্রতিপালকের প্রতি দাসত্বের শৃঙ্খল ছিঁড়ে এ অকৃতজ্ঞতা ও নেমকহারামি?
অসুস্থতার সময় অক্সিজেন ক্রয় করতে হয়, আলো ও পানির বিল মিটাতে হয়। ভেবে দেখুন, আপনি তাঁর কত অক্সিজেন, কত আলো ও কত পানি ব্যবহার করছেন এবং এইভাবে তাঁর কত শত নিয়ামত কাজে লাগাচ্ছেন। তাহলে সে সবের বিল কি মিটানো উচিত নয় ভাবছেন?

📘 কেন এ জীবন 📄 ইবাদত কাকে বলে?

📄 ইবাদত কাকে বলে?


ইবাদতের আভিধানিক অর্থ হল, বশ্যতা স্বীকার, বিনতি প্রকাশ, হীনতা প্রকাশ, দাসত্ব করা ইত্যাদি।
এর কর্তাকে বলে দাস। ফারসীতে এর অর্থ করা হয় বন্দেগী। এর কর্তাকে বলা হয় বান্দা।
পারিভাষিক অর্থে 'ইবাদত' প্রত্যেক সেই গুপ্ত ও প্রকাশ্য কথা ও কর্ম, যা মহান আল্লাহ পছন্দ করেন এবং যাতে সন্তুষ্ট হন।
অথবা প্রত্যেক সেই গুপ্ত ও প্রকাশ্য কথা ও কর্ম, যার মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করা যায়।
সুমহান স্রষ্টার কাছে মানুষ কত তুচ্ছ! পদে-পদে সে তাঁর মুখাপেক্ষী। তাঁর করুণার আশাধারী। আর তাই সে তাঁকে ভালোবাসে, তাঁর নিকট হীনতা ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করে, সদা-সর্বদা তাঁর দয়া ও ক্ষমার ভিখারী থাকে, তাই সকল কাজে সে তাঁর দাসত্ব ও আনুগত্য করে এবং তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করা থেকে বিরত থাকে।
এইভাবে মানুষ তার জীবনের প্রত্যেক কর্মকে ইবাদতে পরিণত করতে পারে। যাঁর দয়ায় সে জীবন ধারণ করছে, তাঁর দাসত্বে সে কালাতিপাত করতে পারে। যাঁর হাতে তার প্রাণ আছে, তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করতে পারে। মহান প্রতিপালক বলেছেন,
{قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (١٦٢) لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ} (١٦٣) سورة الأنعام
"বল, 'নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার উপাসনা (কুরবানী), আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোন অংশী নেই এবং আমি এ সম্বন্ধেই আদিষ্ট হয়েছি। আর আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) দের মধ্যে আমিই প্রথম।” (আনআমঃ ১৬২-১৬৩)
মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি, সে হবে আল্লাহরই জন্য। তার সব কিছু, তার জীবন-মরণ হবে তাঁরই জন্য। সে হবে তাঁর নিকট আত্মসমর্পণকারী দাস, নিবেদিত-প্রাণ ভক্ত।
উক্ত আয়াতে শেষ নবী মুহাম্মাদ দ্বারা ঘোষণা করানো হচ্ছে যে, "আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি আত্মসমর্পণকারী মুসলিমদের প্রথম।" নূহ ও একই ঘোষণা দিয়েছেন,
وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ} অর্থাৎ, আমাকে হুকুম করা হয়েছে যে, আমি যেন আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) দের অন্তর্ভুক্ত থাকি। (সূরা ইউনুস ৭২)
ইব্রাহীম সম্পর্কে এসেছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বললেন, (أَسْلِمٌ) (আত্মসমর্পণ কর)। তখন তিনি বললেন, }أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ{ বিশ্ব-জগতের প্রতিপালকের কাছে আমি আত্মসমর্পণ করলাম।” (সূরা বাক্বারাহ ১৩১)
ইব্রাহীম এবং ইয়াকুব আলাইহিমাস সালাম তাঁদের সন্তানদের অসিয়ত করেছিলেন, فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُّسْلِمُونَ} অর্থাৎ, আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) না হয়ে তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা বাক্বারাহ ১৩২)
ইউসুফ দোয়া করেছিলেন, }تَوَفَّنِي مُسْلِماً{ অর্থাৎ, তুমি আমাকে আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হিসাবে মৃত্যু দান করো। (সূরা ইউসুফ ১০১) মুসা তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُّسْلِمِينَ} অর্থাৎ, তাঁরই উপর ভরসা কর; যদি তোমরা মুসলিম হও। (সুরা ইউনুস ৪-৮) ঈসা -এর সহচররা বলেছিলেন, {وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ}
অর্থাৎ, তুমি সাক্ষী থাক যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)। (মাইদাহঃ ১১১) এই 'ইসলাম' তথা আত্মসমর্পণই হল ইবাদত, দাসত্ব ও আনুগত্য। প্রভুর সকল আদেশ-নিষেধ পালন করা, তাঁর যাবতীয় নির্দেশ মেনে নেওয়া, তাঁর সকল কথা বিশ্বাস করা, তাঁর সকল বিধান বাস্তবায়ন করাই হল দাসের কর্তব্য। এই জন্য 'ইসলাম' শব্দের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, هو الاستسلام لله بالتوحيد والانقياد له بالطاعة والبراءة من الشرك وأهله.
অর্থাৎ, (ইসলাম হল,) তাওহীদের সাথে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্যের সাথে তাঁর অনুবর্তী হওয়া এবং শির্ক ও মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।
এই আত্মসমর্পণই হল সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ ছাড়া কেউ ধার্মিক হতে পারে না।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ الله وَهُوَ مُحْسِنٌ واتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً} (١٢٥) سورة النساء
"আর তার অপেক্ষা ধর্মে কে উত্তম, যে বিশুদ্ধ (তওহীদবাদী) হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে? আর আল্লাহ ইব্রাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।” (নিসাঃ ১২৫)
{وَمَن يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللَّهِ عَاقِبَةُ الأمور (۲۲) سورة لقمان
"যে কেউ সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে, সে আসলে এক মজবুত হাতল ধারণ করে। আর যাবতীয় কার্যের পরিণাম আল্লাহর অধীনে।" (লুকুমানঃ ২২)
{ وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ} (٣٤) سورة الحج
"আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম ক'রে দিয়েছি; যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলির উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। সুতরাং তোমরা তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ কর। আর সুসংবাদ দাও বিনীতগণকে।” (হাজ্জঃ ৩৪)
জীবনের সকল ক্ষেত্রে সুমহান প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ ক'রে চলার নামই ইবাদত। এই জন্য মুসলিমের সকল কর্ম হয় ইবাদত। ইবাদত কেবল আনুষ্ঠানিক কিছু আচরণ বা কর্মের নাম নয়। কেবল নামায, যাকাত, রোযা, হজ্জ ইত্যাদির মধ্যেই ইবাদত সীমাবদ্ধ নয়। প্রতীকী বা আনুষ্ঠানিক ইবাদতই কেবল ইবাদত নয়। বরং মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু ও বিছানা থেকে রাজ-সিংহাসন পর্যন্ত সকল স্তরের সকল কর্মেই রয়েছে এই আত্মসমর্পণ ও ইবাদত।
ইবাদত ইসলাম ও ঈমানের সাথে জড়িত। আর ঈমান হল তিনটি কর্মের সমষ্টির নাম: অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকার ও কর্মে বাস্তবায়ন। সুতরাং ঈমানের সাথে প্রত্যেক সেই কর্ম হল ইবাদত, যাতে মহান প্রতিপালক সন্তুষ্ট হন।
মহানবী বলেছেন,
الإِيمَانُ بَضْعُ وَسَبْعُونَ أَوْ يَضْعُ وَسِتُونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذِى عَن الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَان ».
"ঈমান সত্তর বা ষাটের অধিক শাখাবিশিষ্ট; যার উত্তম (ও প্রধান) শাখা 'লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই) বলা এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র শাখা পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্যতম শাখা।” (মুসলিম ১৬২নং)
দান-খয়রাত বা সাদকা করা ইবাদত। আর অর্থ-সম্পদ দান না করলেও সাদকা করা হয়। সুতরাং সেটাও হয় ইবাদত।
সাহাবী আবু যার বলেন, কিছু সাহাবা বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ধনীরাই তো বেশী নেকীর অধিকারী হয়ে গেল। তারা নামায পড়ছে যেমন আমরা নামায পড়ছি, তারা রোযা রাখছে যেমন আমরা রাখছি এবং (আমাদের চেয়ে তারা অতিরিক্ত কাজ এই করছে যে,) নিজেদের প্রয়োজন-অতিরিক্ত মাল থেকে তারা সাদকাহ করছে।' তিনি বললেন,
(( أَوْلَيسَ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ مَا تَصَدَّقُونَ بِهِ : إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلُّ تَكْبِيرة صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً ، وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً ، وَأَمْرُ بالمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ ، وَنَهِي عَن المُنكَرِ صَدَقَةٌ ، وفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ ).
"আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।”
সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক'রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, তবে এতেও কি তার পুণ্য হবে?' তিনি বললেন, (( أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرام أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرُ ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ .
"কী রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয় হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তাহলে তাতে তার পুণ্য হবে।” (মুসলিম ২৩৭৬নং)
মহানবী বলেছেন, (( كُلُّ مَعْرُوفِ صَدَقَةٌ وَإِنَّ مِنْ الْمَعْرُوفِ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ وَأَنْ تُفْرِغْ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَاءِ أَخِيكَ)).
"প্রত্যেক কল্যাণমূলক কর্মই হল সদকাহ (করার সমতুল্য)। আর তোমার ভাইয়ের সাথে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা এবং তোমার বালতির সাহায্যে (কুয়ো থেকে পানি তুলে) তোমার ভাইয়ের পাত্র (কলসী ইত্যাদি) ভরে দেওয়াও কল্যাণমূলক (সৎ) কর্মের পর্যায়ভুক্ত।” (আহমদ ১৪৮৭৭, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৪৫৫৭ নং)
(( كُلُّ سُلامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ : تَعْدِلُ بَينَ الاثْنَينِ صَدَقَةٌ ، وتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ ، فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا أَوْ تَرفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ ، وَالكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ ، وبكلِّ خَطْوَةٍ تمشيهَا إِلَى الصَّلاةِ صَدَقَةٌ ، وتُميطُ الأذى عن الطريق صَدَقَةٌ )).
“প্রতিদিন যাতে সূর্য উদয় হয় (অর্থাৎ প্রত্যেক দিন) মানুষের প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে প্রদেয় একটি ক'রে সাদকাহ রয়েছে। (আর সাদকাহ শুধু মাল খরচ করাকেই বলে না; বরং) দু'জন মানুষের মধ্যে তোমার মীমাংসা ক'রে দেওয়াটাও সাদকাহ, কোন মানুষকে নিজ সওয়ারীর উপর বসানো অথবা তার উপর তার সামান উঠিয়ে নিয়ে সাহায্য করাও সাদকাহ, ভাল কথা বলা সাদকাহ, নামাযের জন্য কৃত প্রত্যেক পদক্ষেপ সাদকাহ এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূরীভূত করাও সাদকাহ।” (বুখারী ২৯৮৯, মুসলিম ২৩৭৭, ২৩৮২নং)
বলাই বাহুল্য যে, ইবাদত কেবল অনুষ্ঠান, বাড়ি ও মসজিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা হয় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে।
ইবাদত হল সুমহান প্রতিপালকের আনুগত্য। তাঁর আদেশ ও নিষেধের পুঙ্খানুপুঙ্খরূপ পালন। কুরআন ও সুন্নাহ যা করতে আদেশ করে, তা পালন করা এবং যা করতে নিষেধ করে, তা হতে বিরত থাকার নাম ইবাদত।
রাষ্ট্রনেতা শরয়ী বিধান অনুযায়ী দেশ চালিয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন। বিচারক শরয়ী আইন অনুযায়ী বিচার ক'রে আল্লাহর ইবাদত করেন। পিতা-মাতা ইসলামী নির্দেশ অনুসারে সংসার চালিয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন। সন্তান পিতা-মাতার বাধ্য থেকে আল্লাহর ইবাদত করে। স্বামী স্ত্রীর প্রতি শরয়ী কর্তব্য পালন ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। স্ত্রী স্বামীর আনুগত্য ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। মহিলা পর্দা মেনে আল্লাহর ইবাদত করে। ব্যবসায়ী সৎ ও হালাল উপায়ে ব্যবসা ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। কর্মচারী শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী কর্ম ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। সৈনিক শরয়ী নির্দেশ অনুসরণ ক'রে যুদ্ধ ক'রে আল্লাহর ইবাদত করে। ইবাদতের সহায়ক কাজ ক'রেও ইবাদত হয়। ইবাদতের জন্য বিশ্রাম নেওয়া ও ঘুমানোও ইবাদত হয়।
এইভাবে প্রত্যেক মুসলিম যে কাজ মহান আল্লাহকে রাযি-খুশি করার জন্য করে, তার মাধ্যমে সে আল্লাহর ইবাদত করে। তার ধ্যানে থাকে, সে যেন মহান আল্লাহকে দেখছে। তার মনে থাকে, তাকে মহান আল্লাহ দেখছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px