📄 স্রষ্টার সৃষ্টির উদ্দেশ্য
এখন প্রশ্ন হল, কী সেই উদ্দেশ্য, যার জন্য সুমহান স্রষ্টা বিশ্বজাহান সৃষ্টি করেছেন?
তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য বিশ্ব রচনা করেছেন। মানুষের প্রকৃত সুখের জীবন প্রস্তুত রেখেছেন তার মরণের পরে। আর ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর এই জীবনকে তিনি পরীক্ষার সময়-কাল নির্ধারিত করেছেন।
তিনি মানব-দানবকে পরীক্ষা করতে চান এবং সে পরীক্ষায় যে পাস করবে কেবল তাকেই প্রকৃত সুখী জীবন চিরকালের জন্য দান করতে চান।
পরীক্ষার ফলাফল তিনি জানেন। তবুও তিনি তাদেরকে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে পরীক্ষা নিয়ে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম করতে চান। মহান স্রষ্টা বলেছেন,
{إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن نُّطْفَةٍ أَمْشَاجِ نَّبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا (٢) إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا} (৩) سورة الإنسان
“নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু হতে, যাতে আমি তাকে পরীক্ষা করি, এই জন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। নিশ্চয় আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি; হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে।” (দাহর: ২-৩)
হ্যাঁ, মানুষকে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। সুতরাং সে নিজের ইচ্ছায় ভালো বা মন্দ পথ গ্রহণ করতে পারে। সৎ বা অসৎ পথ বেছে নিতে পারে। ইচ্ছা করলে নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করতে পারে অথবা নিজ বিবেক ও বুদ্ধিভিত্তিক কর্ম করতে পারে অথবা সুমহান স্রষ্টার নির্দেশিত পথ অবলম্বন করতে পারে। ইচ্ছা করলে সে মু'মিন হতে পারে। ইচ্ছা করলে সে কাফের হতে পারে। সে নিজ ইচ্ছায় সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি হতে পারে অথবা সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টিও হতে পারে। মানুষকে দেওয়া হয়েছে ইচ্ছাশক্তি ও এখতিয়ার-ক্ষমতা। সে নিজে ভালোমন্দ নির্বাচন ও গ্রহণ করতে পারে।
এ দুনিয়া হল তার পরীক্ষাগার। সে পরীক্ষার্থী। মহান স্রষ্টা পরীক্ষক। পরীক্ষার সময় সাবালক হওয়ার পর থেকে সজ্ঞান থাকা পর্যন্ত। ফল প্রকাশ পরকালে। এ হল পরীক্ষকের ইচ্ছা। এ দুনিয়া হবে পরীক্ষা ক্ষেত্র। আর আখেরাত হবে তার ফলাফল ভোগের ক্ষেত্র।
তিনি পরীক্ষা করবেন, কে তাঁর আনুগত্য করছে এবং কে তাঁর অবাধ্যাচরণ করছে?
পৃথিবীর এ কর্মক্ষেত্রে কে সবচেয়ে ভালো কর্ম করছে এবং কে মন্দ কর্ম করছে? কে বিনিময় স্বরূপ চিরসুখ ভোগের উপযুক্ত এবং কে শাস্তিস্বরূপ চির কষ্ট ভোগের উপযুক্ত? তিনি বলেছেন,
{ وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً وَلَئِن قُلْتَ إِنَّكُم مَّبْعُوثُونَ مِن بَعْدِ الْمَوْتِ لَيَقُولَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ) (৭) سورة هود
"আর তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছ দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই সময় তাঁর আরশ পানির উপরে ছিল; যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা ক'রে নেন, তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম কে? আর যদি তুমি বল, 'নিশ্চয়ই তোমাদেরকে মৃত্যুর পর জীবিত করা হবে', তাহলে যারা অবিশ্বাসী তারা অবশ্যই বলবে, 'এটা তো সুস্পষ্ট যাদু।” (হৃদঃ ৭)
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ} (২) الملك "যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য; কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম? আর তিনি পরাক্রমশালী, বড় ক্ষমাশীল।” (মুলকঃ ২)
{إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا } (৭) সূরা কাহাফ "পৃথিবীর উপর যা কিছু আছে আমি সেগুলিকে ওর শোভা করেছি মানুষকে এই পরীক্ষা করবার জন্য যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম।” (কাহফঃ ৭)
মহানবী বলেছেন, ((إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ، وَإِنَّ اللَّهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُونَ)). "নিশ্চয় দুনিয়া মিষ্ট ও সবুজ (সুন্দর আকর্ষণীয়)। আর নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে এর প্রতিনিধি নিয়োজিত ক'রে দেখবেন যে, তোমরা কীভাবে কর্ম করছ?” (মুসলিম ৭১২৪নং)
বিশাল এই পরীক্ষাগারে কোন্ জিনিস দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করা হবে? পৃথিবীর সব কিছু দিয়ে। খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান, জমি-জায়গা, ফল-ফসল, সুন্দর দৃশ্য, সুমধুর শব্দ, সোনা-চাঁদি, টাকা-পয়সা, গৃহপালিত পশু-পক্ষী ইত্যাদি যাবতীয় আকর্ষণীয় ও লোভনীয় জিনিস দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করা হবে।
মহান আল্লাহ বলেছেন, زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاء وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَابِ} (১৪) সূরা আলে ইমরান "নারী, সন্তান-সন্ততি, জমাকৃত সোনা-রূপার ভান্ডার, পছন্দসই (চিহ্নিত) ঘোড়া, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট লোভনীয় করা হয়েছে। এ সব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর নিকটেই উত্তম আশ্রয়স্থল রয়েছে।” (আলে ইমরানঃ ১৪)
পরীক্ষার নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঘন্টা বাজবে মানুষের জ্ঞানশূন্য হওয়া অথবা মৃত্যু হওয়ার পূর্বে। কবর থেকেই প্রকাশ হতে শুরু হবে পরীক্ষার রিজাল্ট। সব শেষে পরীক্ষার অনির্বায ফলাফল ভোগ করতে হবে জান্নাতে অথবা জাহান্নামে。
পরীক্ষা নেওয়া হবে যাবতীয় পার্থিব সৌন্দর্যের বিষয়ে। তাতে কি মানুষ সুমহান স্রষ্টার হালাল-হারামের বিধান মান্য করেছে? তাতে কি সে তাঁর রসূলের আদেশ-নিষেধ পালন করেছে?
দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের ক্ষেত্রে কি সে আমানতের খিয়ানত করেছে? চুক্তি ভঙ্গ করেছে? অধিকার নষ্ট করেছে? কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছে?
সামাজিক জীব হিসাবে সৃষ্ট জীব কি বন্য পশুর মতো অথবা সামুদ্রিক প্রাণীর মতো সবল দুর্বলকে ভক্ষণ করেছে?
মানুষ প্রত্যহ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। বরং প্রত্যেক পদে পদে তার পরীক্ষা নেওয়া হয়। তার দারিদ্র্য-ধনবত্তা, ধন-মাল ও পরিবার-পরিজনে পরীক্ষা দিতে হয়।
সুমহান স্রষ্টা বলেছেন, {وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ} (۲۸) سورة الأنفال "আর জেনে রাখ যে, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষার বস্তু এবং নিশ্চয় আল্লাহর নিকটে রয়েছে মহা পুরস্কার।” (আনফালঃ ২৮)
{إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللَّهُ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ} (١٥) سورة التغابن "তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। আর আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহা পুরস্কার।” (তাগাবুনঃ ১৫)
বরং প্রত্যেক ভালো-মন্দে তাকে পরীক্ষা দিতে হয়। আর পরীক্ষার শেষে ফিরে যেতে হয় ফল পাওয়ার জায়গায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ} (٣٥) الأنبياء "জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা ক'রে থাকি। আর আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (আম্বিয়া: ৩৫)
লোভ দেখিয়ে সংবরণ করতে বলা হয়েছে, পাপ-প্রবণতায় সংযত হতে বলা হয়েছে, ভোগ-বিলাসে সংযমশীল হতে বলা হয়েছে, স্রষ্টার সঙ্গে ব্যবসায় লাভবান হতে বলা হয়েছে। পার্থিব সৌন্দর্যে মোহগ্রস্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে ইত্যাদি।
সুমহান স্রষ্টা মানুষকে নেক আমল (সৎকর্ম) করার জন্য এ নশ্বর পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন; যেমন পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। তবে প্রণিধানযোগ্য যে, তিনি এটা চাননি যে, মানুষ বেশি বেশি আমল করুক। বরং তিনি চেয়েছেন, মানুষ বেশি উত্তম আমল করুন। আমলের প্রাচুর্য মহান আল্লাহর নিকট বিচার্য নয়, বরং আমলের উৎকৃষ্টতাই তাঁর নিকট বিচার্য।
নিশ্চয়ই এক মণ লোহার চাইতে এক কিলো স্বর্ণের মূল্য অনেক। মানিকের খানিক ভালো। যে কর্ম মহান প্রতিপালকের নিকট পছন্দনীয়, তার সামান্য হলেও তা মূল্যবান। অন্যথা তাঁর অপছন্দনীয় কোন আমলের তাঁর নিকট কোন মূল্য নেই। পরন্তু তার বিপরীত ফল আছে, যা আমলকারীকে ভোগ করতে হবে।
বিশাল এই পরীক্ষায় প্রমাণ করতে হবে আমলের উৎকৃষ্টতা।
পরীক্ষায় নানা প্রতিকূলতা রয়েছে। কুপ্রবৃত্তি ও মনের খেয়াল-খুশি রয়েছে। তার উপর রয়েছে শয়তানের প্রলোভন। আদি পিতামাতা আদম-হাওয়ার মতো পরীক্ষা রয়েছে সকল মানুষের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে। রয়েছে,
{يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَّا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا} “হে আদম তুমি তোমার স্ত্রীসহ বেহেশতে বসবাস কর এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা আহার কর।” (বাক্বারাহঃ ৩৫)
আবার রয়েছে,
{وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ} (٣٥) سورة البقرة “কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না; হলে তোমরা অনাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (বাক্বারাহঃ ৩৫)
তার উপরে রয়েছে শয়তানী কুমন্ত্রণা,
{مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْن أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ} (۲۰) "পাছে তোমরা উভয়ে ফিরিস্তা হয়ে যাও কিংবা তোমরা (জান্নাতে) চিরস্থায়ী হও, এ জন্যই তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন।" (আ'রাফঃ ২০)
বলা বাহুল্য, এ পরীক্ষায় ভুল তো হতেই পারে। আর তার জন্য রয়েছে মহান আল্লাহর দয়া ও ক্ষমাশীলতা। যার ফলে তিনি নাম নিয়েছেন ‘আর-রাহমান’ (পরম দয়াময়), ‘আর-রাহীম’ (অতি দয়াবান), ‘আল-গাফুর, আল-গাফফার, আল-আফুউ’ (মহাক্ষমাশীল), ‘আত-তাওয়াব’ (তওবা গ্রহণকারী)। পরীক্ষাতে রয়েছে বহু আদেশ ও বহু নিষেধ। তাঁর প্রধান আদেশ হল,
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (۲۱) البقرة "হে মানুষ সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের উপাসনা কর, যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে সৃষ্টি করেছেন; যাতে তোমরা পরহেযগার (ধর্মভীরু) হতে পার।" (বাক্বারাহঃ ২১)
আর নিষেধ হল,
{الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشاً وَالسَّمَاء بِنَاء وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاء مَاء فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقاً لَّكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَاداً وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ} (۲۲) سورة البقرة "যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আকাশকে ছাদ স্বরূপ সৃষ্টি করেছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ ক'রে তার দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মূল উৎপাদন করেছেন। সুতরাং জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করো না।” (বাক্বারাহঃ ২২)
আর তিনি পরিষ্কার করেই বলেছেন,
{وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون} (৫৬) সূরা যারিয়াত অর্থাৎ, আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। (যারিয়াতঃ ৫৬)
সুতরাং এটাই হল তাঁর বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য। তিনি অন্য কোন উদ্দেশ্যে এ বিশ্বজাহান রচনা করেননি। যেমন সাধারণত: মানুষের কোন আবিষ্কারের পশ্চাতে উদ্দেশ্য থাকে অর্থোপার্জন, অন্নসংস্থান, রুযী-রুটীর সন্ধান ইত্যাদি। তাই তিনি পরবর্তী আয়াতে বলেছেন,
{مَا أُرِيدُ مِنْهُم مِّن رِّزْقِ وَمَا أُرِيدُ أَن يُطْعِمُونَ (৫٧) إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ} (৫৮) সূরা যারিয়াত
“আমি তাদের নিকট হতে জীবিকা চাই না এবং এও চাই না যে, তারা আমার আহার্য যোগাবে। নিশ্চয় আল্লাহ; তিনিই রুযীদাতা প্রবল, পরাক্রান্ত।” (যারিয়াতঃ ৫৭-৫৮)
বলা বাহুল্য, 'কেন এ জীবন? আপনি কেন সৃষ্ট হয়েছেন? আপনার জন্ম কেন? এ পার্থিব জীবনের আসল উদ্দেশ্য কী?' এ সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর হল উক্ত আয়াত।
উমার বিন আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর জীবনের সর্বশেষ খুতবায় বলেছিলেন, 'হে লোক সকল! তোমরা অনর্থক সৃষ্ট হওনি এবং তোমাদেরকে কখনই নিরর্থক ছেড়ে দেওয়া হবে না। তোমাদের একটি প্রত্যাবর্তনস্থল ও কাল রয়েছে, যখন মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাগণের বিচারের জন্য উপস্থিত হবেন। আর তখন ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই ব্যক্তি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সেই করুণা থেকে বহিষ্কৃত হবে, যে করুণা তাঁর সকল বস্তুতে পরিব্যপ্ত এবং সেই জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে, যার পরিধি আকাশ-পৃথিবীর সমান।
কাল কেবল সেই ব্যক্তি সুরক্ষা পাবে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করেছে এবং সংযমের পথ অবলম্বন করেছে। অল্পকে বিস্তরের বিনিময়ে, নশ্বরকে অবিনশ্বরের বিনিময়ে এবং দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যের বিনিময়ে বিক্রয় করেছে।
তোমরা কি ভেবে দেখ না যে, তোমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত লোকেদের ঔরসে ছিলে। অতঃপর অবশিষ্টরা তার উত্তরাধিকারী হবে। পরিশেষে সকলেই সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী (আল্লাহর) প্রতি প্রত্যাবর্তিত হবে।
তোমরা প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর দিকে যাত্রীর (জানাযার) অনুগমন করছ। যে তার কর্তব্য পূর্ণরূপে সমাধা করেছে এবং নিজ নির্ধারিত সময়কাল অতিক্রম করেছে। সুতরাং তোমরা তাকে এমন এক মাটিতে রেখে আসছ, যেখানে না আছে বালিশ, আর না আছে বিছানা। যে হয়ে পড়েছে গত্যন্তরহীন। সঙ্গ ছেড়েছে বন্ধু-পরিজনদের। বসবাস শুরু করেছে মাটির ঘরে। সম্মুখীন হয়েছে হিসাবের। অমুখাপেক্ষী হয়েছে পার্থিব সম্পদের। মুখাপেক্ষী হয়েছে নেক আমলের।
সুতরাং হে আল্লাহর বান্দাগণ! মৃত্যু আসার পূর্বে এবং সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আল্লাহকে ভয় কর।
আর আমি তোমাদেরকে এ সব কথা বলছি, অথচ আমি অবশ্যই জানি যে, সবার চাইতে আমার পাপই বেশি। তাই আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা ও তওবা করছি।' (তফসীর ইবনে কাষীর ৩/৩১৬, তারীখে দিমাশ্ক ৪৫/১৭৩)
আবু আব্দুল্লাহ তিরমিযী হাকীম বলেছেন, 'নিশ্চয় মহান আল্লাহ সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন (আবেদ) দাসরূপে, যাতে তারা তাঁর (ইবাদত) দাসত্ব করে। সুতরাং তিনি তাঁর সেই ইবাদত ও দাসত্বের বিনিময় প্রদান করবেন এবং তা ত্যাগ করার শাস্তি দান করবেন। অতএব তারা যদি আজ তাঁর ইবাদত ও দাসত্ব করে, তাহলে তারা দুনিয়ার দাসত্ব থেকে মুক্ত সম্মানিত স্বাধীন দাস এবং পরকালে তারা রাজা। আর যদি তারা দাসত্ব করতে অস্বীকার করে, তাহলে তারা পালিয়ে যাওয়া নিকৃষ্ট ও হীন দাস এবং আগামী কাল জাহান্নামের আগুনের কারাগারে (আল্লাহর) দুশমন।' (তফসীর কুরতুবী ১২/১৫৬)
আরবী কবি বলেছেন,
ولو أنا إذا متنا تركنا لكان الموت غاية كل حي ولكنا إذا متنا بعثنا ونسأل عن كل شيء
অর্থাৎ, যদি মরণের পর আমাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হত, তাহলে মরণই প্রত্যেক জীবের জন্য আরামদায়ক হত।
কিন্তু মরণের পর আমাদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে এবং প্রত্যেক জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
মহানবী বলেছেন,
(( لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَومَ القِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ ؟ وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَ فَعَلَ فِيهِ ؟ وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ ؟ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ ؟ وَعَنْ جَسمِهِ فِيمَ أَبلاهُ ؟ )).
"কিয়ামতের দিন বান্দার পা দু'খানি সরবে না। (অর্থাৎ আল্লাহর দরবার থেকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।) যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হবে; তার আয়ু সম্পর্কে, সে তা কিসে ক্ষয় করেছে? তার ইল্ম (বিদ্যা) সম্পর্কে, সে তাতে কী আমল করেছে? তার মাল সম্পর্কে, কী উপায়ে তা উপার্জন করেছে এবং তা কোন্ পথে ব্যয় করেছে? আর তার দেহ সম্পর্কে, কোন্ কাজে সে তা ক্ষয় করেছে?” (তিরমিযী ২৪১৬, সহীহ তারগীব ১২ ১নং)
এই প্রশ্নগুলির উত্তর যদি মহান আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতভিত্তিক হয়, তাহলেই রেহাই। নচেৎ ফল যে ভালো হবে না, তা অতি সহজেই অনুমেয়।
📄 একটি প্রচলিত ভুল সংশোধন
আমরা জানতে পারলাম, মহান আল্লাহ মুখাপেক্ষাহীন স্বয়ংসম্পূর্ণ বাদশা। তিনি নিজের ইবাদতের জন্য বিশ্ব-রচনা করেছেন, জ্বিন-ইনসান সৃষ্টি করেছেন, রসূল পাঠিয়েছেন, কিতাব অবতীর্ণ করেছেন ইত্যাদি।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون} (৫৬) سورة الذاريات অর্থাৎ, আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। (যারিয়াতঃ ৫৬)
তিনি রসূল প্রেরণের কারণ বর্ণনা করে বলেছেন, {رُّسُلاً مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا} سورة النساء অর্থাৎ, আমি সুসংবাদবাহী ও সতর্ককারী রসূল প্রেরণ করেছি; যাতে রসূল (আসার) পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আর আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী। (নিসাঃ ১৬৫)
নবুঅত অথবা সুসংবাদ দান ও ভীতি-প্রদর্শনের ধারাকে এই জন্যেই অব্যাহত রেখেছেন, যাতে শেষ বিচারের দিনে কেউ এ ওজর পেশ করতে না পারে যে, আমাদের নিকট তোমার কোন বার্তা পৌঁছেনি। যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَوْ أَنَّا أَهْلَكْنَاهُم بِعَذَابٍ مِّن قَبْلِهِ لَقَالُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَتَتَّبِعَ آيَاتِكَ مِن قَبْلِ أَن نَّذِلَّ وَنَخْزَى} (১৩৪) سورة طه অর্থাৎ, যদি আমি ওদেরকে তার পূর্বে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম তাহলে ওরা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের নিকট একজন রসূল প্রেরণ করলে না কেন? করলে আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার পূর্বেই তোমার নিদর্শন মেনে নিতাম। (ত্বা-হাঃ ১৩৪)
রসূল প্রেরণের কারণ বর্ণনা করে মহান আল্লাহ আরো বলেন, {كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ} (২১৩) سورة البقرة অর্থাৎ, মানুষ (আদিতে) একই জাতিভুক্ত ছিল। (পরে মানুষেরাই বিভেদ সৃষ্টি করে।) অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন; এবং মানুষের মধ্যে যে বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল, তার মীমাংসার জন্য তিনি তাদের সাথে সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেন। (বাক্বারাহঃ ২১৩)
{لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ} (٢٥)
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও তুলাদন্ড (ন্যায়-নীতি); যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। (হাদীদঃ ২৫)
কিন্তু কুরআনী বয়ানের বিপরীত বর্ণনা দিয়ে থাকে অতিরঞ্জনকারী হাদীস-নির্মাতারা। তারা বলে, 'ফুল বাগানে ফুটল নবীন ফুল। সে ফুল যদি না ফুটিত কিছুই পয়দা না হইত, না করিত আরশ-কুসী জলীল রব্বুল। ফুল বাগানে ফুটল নবীন ফুল।'
তারা বলে, 'শুধুমাত্র বরের জন্য যেমন বিয়ে-বাড়ির সমস্ত আয়োজন, তেমনি মুহাম্মাদ-এর জন্য এ বিশ্বের সকল আয়োজন।' তারা হাদীস বর্ণনা করে,
لوْلَاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ
অর্থাৎ, যদি তুমি না হতে, আমি আসমান-যমীন কিছুই সৃষ্টি করতাম না। অথচ এ মর্মে কোন হাদীস সহীহ নয়। (মাউযুআত ৭৮নং, সিঃ যয়ীফাহ ২৮-২নং, মুরশিদুল হায়ের ১০পৃঃ)
📄 মানবজাতি আসলে দাস
মানবজাতি আসলেই কারো না কারো দাস। জানতে বা অজানতে মানুষ কারো না কারো দাসত্ব করে। অনেকে স্বেচ্ছায় করে, অনেকে অনিচ্ছায় করে। শুধু মানুষই না, এ জগতে সকল সৃষ্টি মহান স্রষ্টার দাসত্ব করে, তাঁর ইবাদত করে। মহান প্রতিপালক সে কথা তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন।
{أَفَغَيْرَ دِينِ اللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ} (۸۳) سورة آل عمران
"তারা কি আল্লাহর ধর্মের পরিবর্তে অন্য ধর্ম চায়? অথচ আকাশে ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে সমস্তই স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্ম-সমর্পণ করেছে! এবং তাঁরই কাছে তারা ফিরে যাবে।” (আলে ইমরান: ৮৩)
{وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَظِلالُهُم بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ} (১৫)
"আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত হয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় এবং তাদের ছায়াগুলিও সকাল ও সন্ধ্যায়।” (রা'দঃ ১৫)
{أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالطَّيْرُ صَافَّاتٍ كُلٌّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَفْعَلُونَ} (৪১) সূরা আন-নূর
"তুমি কি দেখ না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা এবং উড়ন্ত পাখীদল আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? সকলেই তাঁর প্রশংসা এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি জানে। আর ওরা যা করে, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত।” (নূর: ৪১)
{أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَن يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِن مُّكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاء} (১৮) সূরা আল-হাজ্জ
"তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যারা আছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে; সিজদা করে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমন্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু, এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে; আর অনেকের প্রতি অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে হেয় করেন তার সম্মানদাতা কেউই নেই; নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।” (হাজ্জঃ ১৮)
মানুষের মধ্যে অনেকে, যারা বিশ্বাসী, তারা মহান প্রতিপালকের ইবাদত করে। মহান প্রতিপালকের বিধান মেনে নিয়ে যথানিয়মে তাঁর দাসত্ব ও উপাসনা ক'রে থাকে।
কিছু আংশিক বিশ্বাসীও অবিশ্বাসীদের মতো মহান প্রতিপালকের ইবাদত করে। কিন্তু তাঁর সাথে অন্যেরও ইবাদত করে।
বহু মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করলেও তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যের উপাসনা করে। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন,
{إِنَّمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ أَوْتَانًا وَتَخْلُقُونَ إِفْكًا إِنَّ الَّذِينَ تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ لَكُمْ رِزْقًا فَابْتَغُوا عِندَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ} (১৭)
"তোমরা তো আল্লাহ ব্যতীত কেবল প্রতিমার উপাসনা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ; তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা কর, তারা তোমাদের রুযী দানে অক্ষম। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিকটেই রুযী কামনা কর এবং তাঁর উপাসনা ও কৃতজ্ঞতা কর। তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।” (আনকাবৃতঃ ১৭)
বহু মানুষ জানতে-অজানতে শয়তানের উপাসনা করে। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ يَا بَنِي آدَمَ أَن لَّا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ} (٦٠) يس
"হে আদম সন্তান-সন্ততিগণ! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দিইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করো না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (ইয়াসীন: ৬০)
ইব্রাহীম নবী নিজ পিতাকে বলেছিলেন,
{يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمَن عَصِيًّا } (٤٤) سورة مريم
"হে আমার পিতা! শয়তানের উপাসনা করো না; নিশ্চয় শয়তান পরম দয়াময়ের অবাধ্য।” (মারয়ামঃ ৪৪)
যারা আল্লাহ ব্যতিরেকে অন্যের উপাসনা করে, প্রকৃত প্রস্তাবে তারা শয়তানেরই উপাসনা করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِن يَدْعُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَّرِيدًا } (۱۱۷) سورة النساء
"তাঁর (আল্লাহর) পরিবর্তে তারা কেবল নারীদেরকে (দেবীদেরকে) আহবান করে এবং তারা কেবল বিদ্রোহী শয়তানের পূজা করে।” (নিসাঃ ১১৭)
বহু মানুষ নিজের মনের পূজা করে। মনোমতো চলে, মনোমতো বিশ্বাস করে। যারা নাস্তিক তারাও আসলে দাস। তারা নিজেদের মনের খেয়াল-খুশীর ও অনুমানের দাসত্ব করে।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{أَرَأَيْتَ مَن اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا} (٤٣) سورة الفرقان
"তুমি কি দেখ না তাকে, যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার কর্মবিধায়ক হবে।” (ফুরক্বানঃ ৪৩)
{أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ) (۲۳) سورة الجاثية
"তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজের উপাস্য ক'রে নিয়েছে? আল্লাহ জেনেশুনেই ওদের বিভ্রান্ত করেছেন এবং ওর কর্ণ ও হৃদয় মোহর ক'রে দিয়েছেন এবং ওর চোখের ওপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহ মানুষকে বিভ্রান্ত করার পর কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” (জাছিয়াহঃ ২৩)
{فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} (٥٠) سورة القصص
“অতঃপর ওরা যদি তোমার আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে জানবে ওরা তো কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অমান্য ক'রে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে? নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না।” (ক্বাস্বাস্বঃ ৫০)
মোটের উপর কথা হল, এ বিশ্বের সকল সৃষ্টিই উপাসক, সকল কিছুই দাস। দাসত্বের প্রকৃতি প্রক্ষিপ্ত আছে প্রত্যেক জীব ও অজীবের মাঝে।
গায়রুল্লাহর ইবাদতের অর্থ হল পূজা করা। অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে নানা পূজায় জড়িত। জনৈক কবি বলেছেন,
'অপূজ্য পূজিত হয় বিশ্বপতি ছাড়া, জীব-শ্রেষ্ঠ নর হয় সত্য জ্ঞান-হারা।
চলিছে পূজার স্রোত দিবায় নিশায়, দ্বীন ও ঈমান-ত্যাগী স্রষ্টা বিধাতায়।
রিপুর পূজক কেহ শক্তি উপাসক, লোভের পূজারী কেহ ইন্দ্রিয় সেবক,
গাছের পূজারী কেহ, কেহ পাথরের, কবর-পূজক কেহ লোভী মানতের।
ইচ্ছার পূজক কেহ আত্মসুখ প্রয়াসী, বিলাস-ব্যসনে কেহ মত্ত দিবানিশি।
শঠ ব্যবসায়ী কেহ নামের পূজক, যশান্বেষী কেহ, কেহ প্রাধান্য সাধক।
ছবি মূর্তি পূজে কেহ ভক্তি অর্থ দানে, জড় ও জীবে পূজে কেহ সভয় জ্ঞানে,
দেশের পূজক কেহ দেশ নায়কের, কেহ পূজে প্রাণ ভয়ে যুক্তি অপরের।'
📄 ফেরেশতাগণ তো ইবাদত করছিলেন, তাহলে আবার মানুষ কেন?
নূরের তৈরি ফিরিস্তাগণ তো মহান আল্লাহর ইবাদত করছিলেন, তাহলে আবার মানুষকে ইবাদতের জন্য তিনি সৃষ্টি করলেন কেন?
ফিরিস্তামন্ডলী সদা-সর্বদা মহান আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে মশগুল থাকেন, তাঁর হুকুম তামীল ও আদেশ পালনে তৎপর থাকেন। আর তাতে তাঁরা মানুষের মতো কোন প্রকারের আলস্য বা ক্লান্তি অনুভব করেন না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَلَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ عِندَهُ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ (۱۹) يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ} (۲۰) سورة الأنبياء
অর্থাৎ, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা তাঁরই মালিকানাধীন। আর তাঁর সান্নিধ্যে যারা আছে, তারা তাঁর উপাসনা করতে অহংকার করে না এবং ক্লান্তি বোধও করে না। তারা দিবা-রাত্রি তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; তারা শৈথিল্য করে না। (আম্বিয়াঃ ১৯-২০)
উক্ত আয়াতকে ভিত্তি করে উলামাগণ বলেন, ফিরিস্তাবর্গ নিদ্রাভিভূত হন না। (আল-হাবাইক ২৬৪পৃঃ)
{فَإِنِ اسْتَكْبَرُوا فَالَّذِينَ عِندَ رَبِّكَ يُسَبِّحُونَ لَهُ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَهُمْ لَا يَسْأَمُونَ }
অর্থাৎ, ওরা অহংকার করলেও যারা তোমার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে রয়েছে, তারা তো দিন-রাত তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং তারা ক্লান্তিবোধ করে না। (হা-মীম সাজদাহঃ ৩৮)
ফিরিস্তাগণ প্রকৃতিগতভাবে আল্লাহর আনুগত্যে রত থাকেন। তাঁদের অবাধ্যতা করার ক্ষমতাই নেই। যেহেতু তাঁদের মাঝে অবাধ্যতার প্রকৃতিই প্রক্ষিপ্ত হয়নি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ} (٦) سورة التحريم
অর্থাৎ, তারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। (তাহরীমঃ ৬)
বলা বাহুল্য, তাঁদের অবাধ্যাচরণ না করা এবং আনুগত্য করা তাঁদের প্রকৃতিগত স্বাভাবিক ব্যাপার। এ ব্যাপারে তাঁদেরকে যৎ সামান্যও প্রচেষ্টা ও শ্রম ব্যয় করতে হয় না। যেহেতু তাঁদের কুপ্রবৃত্তি ও ইন্দ্রিয়লালসা নেই এবং তাঁদের পশ্চাতে শয়তানও নেই।
সাহাবী হাকীম বিন হিযাম বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণের মাঝে ছিলেন। অকস্মাৎ তিনি বলে উঠলেন, "তোমরা কি তা শুনতে পাচ্ছ, যা আমি শুনতে পাচ্ছি?” সকলে বলল, 'আমরা তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না।' তিনি বললেন,
(إِنِّي لأَسْمَعُ أَطِيطَ السَّمَاءِ وما تُلامُ أن تَئِطٌ وما فيها موضعُ شِبْرٍ إِلَّا وَعَلَيْهِ مَلَكٌ سَاجِدٌ أَوْ قائم ).
অর্থাৎ, আমি তো আকাশের কটকট শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর এ শব্দ করায় তার দোষ নেই। তার মাঝে অর্ধ হাত পরিমাণ এমন জায়গা নেই, যাতে কোন ফিরিস্তা সিজদা অথবা কিয়াম অবস্থায় নেই। (ত্বাবারানীর কাবীর ৩১২২, সিঃ সহীহাহ ৮৫২নং)
পরন্ত মানুষ হল অশান্তি সৃষ্টিকারী পাপী। তাহলে ইবাদতের জন্য আবার সেই মানুষ কেন? এ প্রশ্ন জেগেছিল সদা ইবাদতরত ফিরিস্তাদের মনেও।
মহান আল্লাহ বলেন,
{وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاء وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ } (٣٠) البقرة
"আর (স্মরণ কর) যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশাদেরকে বললেন, 'আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি।' তারা বলল, 'আপনি কি সেখানে এমন কাউকেও সৃষ্টি করবেন, যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? অথচ আমরাই তো আপনার সপ্রশংস মহিমা কীর্তন ও পবিত্রতা ঘোষণা করি।' তিনি বললেন, 'নিশ্চয়ই আমি যা জানি তা তোমরা জান না।" (বাক্বারাহঃ ৩০)
হ্যাঁ, তাঁর সকল হিকমত সবাই জানতে পারবে, তা জরুরী নয়। আসলে তিনি চাইলেন এমন এক সৃষ্টি, যে তাঁর ইবাদত করবে এবং অবাধ্য হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে। আর ক্ষমাপ্রার্থনাও একটি ইবাদত। তাই তিনি পাপ দিয়ে তাদেরকে তাঁর ইবাদতে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যেই পাপী-তাপী মানুষ সৃষ্টি করলেন। যে মানুষ ভুল করবে, আবার তার জন্য অনুতপ্ত হবে। যে তাঁর দরবার ছেড়ে পালিয়ে যাবে, আবার ফিরে এলে তিনি খুশী হবেন।
বলাই বাহুল্য যে, পাপ ঘটে যাওয়ার পর তওবা করা অন্যতম ইবাদত। যে ইবাদতে মহান আল্লাহ অনেকানেক খুশী হন।
মহানবী বলেছেন, اللَّهُ أَشَدُّ فَرَحاً بِتَوبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ، فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابَهُ فَأَيسَ مِنْهَا ، فَأَتَى شَجَرَةً فَاصْطَجَعَ فِي ظِلُّهَا وقد أيس مِنْ رَاحِلَتِهِ ، فَبَينَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ هُوَ بِها قَائِمَةً عِندَهُ ، فَأَخَدَ بخِطَامِهَا، ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الفَرَحِ : اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وأنا رَبُّكَ ! أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الفَرَحِ)).
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তওবায় যখন সে তওবা করে তোমাদের সেই ব্যক্তির চেয়ে বেশী খুশী হন, যে তার বাহনের উপর চড়ে কোন মরুভূমি বা জনহীন প্রান্তর অতিক্রমকালে বাহনটি তার নিকট থেকে পালিয়ে যায়। আর খাদ্য ও পানীয় সব ওর পিঠের উপর থাকে। অতঃপর বহু খোঁজাখুঁজির পর নিরাশ হয়ে সে একটি গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে বাহনটি হঠাৎ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে যায়। সে তার লাগাম ধরে খুশীর চোটে বলে ওঠে, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার দাস, আর আমি তোমার প্রভু!' সীমাহীন খুশীর কারণে সে ভুল ক'রে ফেলে।” (বুখারী ৬৩০৯, মুসলিম ৭১৩১-৭১৩৭নং)
পরন্তু মানুষ যদি ফিরিপ্তার মতোই কেবল ইবাদতই করত এবং পাপ না করত, তাহলে মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কেবল আবেদদের সংখ্যাবৃদ্ধিই হতো। কিন্তু তিনি চেয়েছেন এমন এক সৃষ্টি, যে পাপ করেও ইবাদত করবে। তিনি চাইলেন, তিনি কেবল মা'বুদ হবেন না; বরং ক্ষমাশীল মা'বুদ হবেন। মহানবী বলেছেন,
(( وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا ، لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ ، وَجَاءَ بِقَومٍ يُذْنِبُونَ ، فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ تَعَالَى ، فَيَغْفِرُ لَهُمْ )).
"সেই মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! যদি তোমরা পাপ না কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে অপসারিত করবেন এবং এমন জাতির আবির্ভাব ঘটাবেন যারা পাপ করবে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইবে। আর তিনি তাদেরকে ক্ষমা ক'রে দেবেন।” (মুসলিম ৭১৪১নং)
অবশ্য তার মানে এই নয় যে, তিনি পাপ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আসলে উদ্বুদ্ধ করেছেন একটি বিশেষ ইবাদতে। আর তা হল তওবা ও ইস্তিগফার। আর এই বিশেষ ইবাদতটি ফিরিস্তাগণ করেন না। অর্থাৎ, তাঁরা নিজেদের ভুল-ত্রুটি বা পাপের জন্য ক্ষমা চান না। যেহেতু তাঁরা নিষ্পাপ সৃষ্টি। অবশ্য তাঁরা পৃথিবীবাসী মু'মিনদের জন্য ইস্তিগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনা ক'রে থাকেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ} (۷) سورة غافر
"যারা আরশ ধারণ ক'রে আছে এবং যারা এর চারিপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা প্রশংসার সাথে ঘোষণা করে এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ক'রে বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী; অতএব যারা তওবা করে ও তোমার পথ অবলম্বন করে, তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা কর।” (মু'মিনঃ ৭)
{تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِن فَوْقِهِنَّ وَالْمَلَائِكَةُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِمَن فِي الْأَرْضِ أَلَا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ} (৫) سورة الشورى
"আকাশমন্ডলী উর্ধ্বদেশ হতে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় এবং ফিরিশতা তাদের প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং পৃথিবীর বাসিন্দার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (শূরাঃ ৫)