📘 কেন এ জীবন 📄 মানব-জীবন সম্বন্ধে ধারণা

📄 মানব-জীবন সম্বন্ধে ধারণা


মানুষ এ পৃথিবীতে আসে এবং চলে যায়। কিন্তু সে কি নিজের ইচ্ছায় আসে? সে কি নিজের ইচ্ছাতে জন্মগ্রহণ করে? তাহলে তো সে আরো ভালো অবস্থা নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারত।
তাহলে কি সে আপনা-আপনিই সৃষ্টি হয়ে গেছে? তার মানে কি তার কোনও সৃষ্টিকর্তা নেই?
এমন ধারণা কেবল নাস্তিকরাই ক'রে থাকে।
মানুষের জন্ম ও জীবন কয়টা? মরণ বলে একটি জিনিস আছে, তা তো সারা মানবকুল বিশ্বাস করে। কিন্তু এ পার্থিব জীবনের আগে-পরেও কি কোন জীবন আছে? এ নিয়ে নানা মানুষের নানা মত, নানা ধারণা।
এক শ্রেণীর মানুষ ধারণা রাখে, পার্থিব জীবনই জীবন, এর আগে-পরে কোন জীবন নেই।
মহান আল্লাহ বলেন, وَقَالُوا أَئِذَا كُنَّا عِظَاماً وَرُفَاتاً أَئِنَّا لَمَبْعُوثُونَ خَلْقاً جَدِيداً (٤٩) "তারা বলে, 'আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?"
মহান স্রষ্টা তাদের খন্ডন ক'রে বলেছেন, قُلْ كُونُوا حِجَارَةً أَوْ حَدِيداً (٥٠) أَوْ خَلْقاً مِمَّا يَكْبُرُ فِي صُدُورِكُمْ فَسَيَقُولُونَ مَنْ يُعِيدُنَا قُلْ الَّذِي فَطَرَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ فَسَيُنْغِضُونَ إِلَيْكَ رُءُوسَهُمْ وَيَقُولُونَ مَتَى هُوَ قُلْ عَسَى أَنْ يَكُونَ قريباً (٥١) يَوْمَ يَدْعُوكُمْ فَتَسْتَجِيبُونَ بِحَمْدِهِ وَتَظُنُّونَ إِنْ لَبِثْتُمْ إِلَّا قَلِيلاً (٥٢) "বল, 'তোমরা হয়ে যাও পাথর অথবা লোহা। অথবা এমন কোন সৃষ্টি যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন।' তারা বলবে, 'কে আমাদেরকে পুনরুত্থিত করবে?' বল, 'তিনিই যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন।' অতঃপর তারা তোমার সামনে মাথা নাড়বে ও বলবে, 'ওটা কবে?' বল, 'সম্ভবতঃ তা নিকটেই।' যেদিন তিনি তোমাদেরকে আহবান করবেন এবং তোমরা প্রশংসার সাথে তাঁর আহবানে সাড়া দেবে এবং তোমরা মনে করবে, তোমরা অল্পকালই অবস্থান করেছিলে?” (বানী ইস্রাঈল: ৪৯-৫২)
এই শ্রেণীর মানুষের ব্যাপারে মহান সৃষ্টিকর্তা আরো বলেছেন, وَضَرَبَ لَنَا مَثَلاً وَنَسِيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِ الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ (۷۸) "মানুষ আমার ব্যাপারে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; এবং বলে, 'অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে; যখন তা পচে-গলে যাবে?” (ইয়াসীনঃ ৭৮)
এর প্রত্যুত্তরে মহান স্রষ্টা বলেছেন, قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ (۷۹) الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ مِنْ الشَّجَرِ الْأَخْضَرِ نَاراً فَإِذَا أَنْتُمْ مِنْهُ تُوقِدُونَ (۸۰) أَوَلَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ بِقَادِرِ عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ بَلَى وَهُوَ الْخَلاقُ الْعَلِيمُ (۸۱) إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ (۸۲) فَسُبْحَانَ الَّذِي بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (۸۳)
"বল, তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। তিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ হতে অগ্নি উৎপাদন করেন এবং তোমরা তা হতে অগ্নি প্রজ্বলিত কর। যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি কি ওদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সমর্থ নন? অবশ্যই, আর তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। তাঁর ব্যাপার তো এই যে, তিনি যখন কোন কিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তিনি কেবল বলেন, 'হও'; ফলে তা হয়ে যায়। অতএব পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি প্রত্যেক বিষয়ের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (ইয়াসীনঃ ৭৯-৮৩)
তিনি এদের ব্যাপারে অন্যত্র বলেছেন, ق وَالْقُرْآنِ الْمَجِيدِ (۱) بَلْ عَجِبُوا أَنْ جَاءَهُمْ مُنْذِرٌ مِنْهُمْ فَقَالَ الْكَافِرُونَ هَذَا شَيْءٌ عَجِيبٌ (۲) أَئِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَاباً ذَلِكَ رَجْعٌ بَعِيدٌ (۳)
“ক্বাফ, শপথ গৌরবান্বিত কুরআনের। কিন্তু অবিশ্বাসীরা তাদের মধ্য হতে একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হতে দেখে বিস্ময়বোধ করে ও বলে, 'এটা তো এক আশ্চর্য ব্যাপার। আমাদের মৃত্যু হলে এবং আমরা মাটিতে পরিণত হলে (আমরা কি পুনরুজ্জীবিত হব?) সে প্রত্যাবর্তন তো সুদূর পরাহত!” (ক্বাফঃ ১-৩)
মহান স্রষ্টা তাদের ধারণার খন্ডন ক’রে বলেছেন, قَدْ عَلِمْنَا مَا تَنْقُصُ الْأَرْضُ مِنْهُمْ وَعِنْدَنَا كِتَابٌ حَفِيظٌ (٤) بَلْ كَذَّبُوا بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُمْ فَهُمْ فِي أَمْرٍ مَرِيجٍ (٥) أَفَلَمْ يَنْظُرُوا إِلَى السَّمَاءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا وَمَا لَهَا مِنْ فُرُوجِ (٦) وَالْأَرْضَ مَدَدْنَاهَا وَأَلْقَيْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ (۷) تَبْصِرَةً وَذِكْرَى لِكُلِّ عَبْدٍ مُنِيبٍ (۸) وَنَزَّلْنَا مِنْ السَّمَاءِ مَاءً مُبَارَكاً فَأَنْبَتْنَا بِهِ جَنَّاتٍ وَحَبَّ الْحَصِيدِ (۹) وَالنَّخْلَ بَاسِقَاتِ لَهَا طَلْعٌ نَضِيدٌ (۱۰) رِزْقاً لِلْعِبَادِ وَأَحْيَيْنَا بِهِ بَلْدَةً مَيْتًا كَذَلِكَ الْخُرُوجُ (۱۱) كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ وَأَصْحَابُ الرَّسِّ وَثَمُودُ (۱۲) وَعَادٌ وَفِرْعَوْنُ وَإِخْوَانُ لُوطٍ (١٣) وَأَصْحَابُ الأَيْكَةِ وَقَوْمُ تُبَّع كُلُّ كَذَّبَ الرُّسُلَ فَحَقَّ وَعِيدِ (١٤) أَفَعَيِينَا بِالْخَلْقِ الأَوَّلِ بَلْ هُمْ فِي لَبْس مِنْ خَلْق جَدِيدٍ (١٥) سورة ق
"মাটি তাদের কতটুকু ক্ষয় করে আমি অবশ্যই তা জানি এবং আমার নিকট আছে সংরক্ষিত কিতাব। বস্তুতঃ তাদের নিকট সত্য আসার পর তারা তা মিথ্যা মনে করেছে। ফলে তারা সংশয়ে দোদুল্যমান। তারা কি তাদের উপরিস্থিত আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে না যে, আমি কীভাবে ওটা নির্মাণ করেছি ও তাকে সুশোভিত করেছি এবং ওতে কোন ফাটলও নেই? আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি এবং তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং ওতে উদ্গত করেছি চোখ-জুড়ানো নানা প্রকার উদ্ভিদ। (আল্লাহ) অভিমুখী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ। আকাশ হতে আমি বর্ষণ করি কল্যাণকর বৃষ্টি এবং তার দ্বারা আমি সৃষ্টি করি বহু বাগান ও পরিপক্ক শস্যরাজি, আর উঁচু উঁচু খেজুর বৃক্ষ; যাতে আছে কাঁদি কাঁদি খেজুর --- (আমার) দাসদের জীবিকাস্বরূপ। আর বৃষ্টি দ্বারা আমি সঞ্জীবিত করি মৃত ভূমিকে, এভাবে পুনরুত্থান ঘটবে। তাদের পূর্বেও মিথ্যাজ্ঞান করেছিল নূহ এর সম্প্রদায়, রাস্ ও সামুদ সম্প্রদায়, আ'দ, ফিরআউন ও লুত সম্প্রদায় এবং আয়কার অধিবাসী ও তুব্বা' সম্প্রদায়, তারা সবাই রসূলদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছিল, ফলে তাদের উপর আমার শাস্তির প্রতিশ্রুতি সত্য হয়েছে। আমি কি প্রথমবার সৃষ্টি করেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি? বরং পুনঃসৃষ্টি বিষয়ে তারা সন্দিহান।” (ক্বাফ: ৪-১৫)
এদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ আরো বলেছেন, وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا هَلْ تَدُلُّكُمْ عَلَى رَجُلٍ يُنَبِّئُكُمْ إِذَا مُزِقْتُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّكُمْ لَفِي خَلْقِ جَدِيدٍ (۷) أَفْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِباً أَمْ بِهِ جِنَّةٌ بَلْ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالآخِرَةِ فِي الْعَذَابِ والضَّلال الْبَعِيدِ (۸) سورة سبأ
"অবিশ্বাসীরা বলে, 'আমরা কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যক্তির সন্ধান দেব, যে তোমাদেরকে বলে যে, তোমাদের দেহ সম্পূর্ণ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও তোমরা নতুন সৃষ্টিরূপে উত্থিত হবে? সে কি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে অথবা সে উন্মাদ?' বস্তুতঃ যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তারা শাস্তি এবং ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে।” (সাবা': ৭-৮)
এই শ্রেণীর লোকেরাই তো বলে থাকে, 'দুনিয়াটা মস্ত বড়, খাও-দাও ফুর্তি কর--- আগামী কাল বাঁচবে কি না বলতে পার?'
তারা এই পার্থিব জীবনকেই একমাত্র জীবন ধারণা করে এবং তাই তারা যা কিছু করে, তা এই জীবনেরই সুখ-সমৃদ্ধির জন্য করে এবং এই জীবনেই সব কিছু নিঃশেষ ক'রে থাকে। পুনরুত্থান বা পরকালে বিশ্বাস নেই বলেই তারা বলে, 'এই বেলা ভাই মদ খেয়ে নাও কাল নিশিথের ভরসা কই, চাঁদনী জাগিবে যুগ-যুগ ধরে আমরা তো আর রব না সই!' 'মিশ্ব ধুলায় তার আগেতে সময়টুকুর সদ্‌-ব্যভার, সস্ফূর্তি ক'রে নাই করি কেন দিন কয়েকেই সব কাবার?' (ওমর খৈয়াম)
অনেক মানুষের ধারণা, পার্থিব জীবনই জীবন, মরণের পরে আবার এ পৃথিবীতেই পুনর্জন্ম ঘটে। জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী এমন মানুষেরা অনেক সময় বলে থাকে, 'এবার মলে সুতো হব, তাঁতির ঘরে জন্ম নেব---।' 'আর না হবে মোর মানব জনম পাষাণে কুটিলে মাথা রে---।' 'পরজনমে দেখা হবে প্রিয়---।' 'আগের জন্মে তুই আমার কেউ ছিলি।' ইত্যাদি।
এই বিশ্বাসের মানুষ বর্তমানে আছে এবং অতীতেও ছিল। কোন এক নবীর জাতির ব্যাপারে কুরআন বলে, { وَقَالَ الْمَلأُ مِنْ قَوْمِهِ الَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِلِقَاءِ الْآخِرَةِ وَأَتْرَفْنَاهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يَأْكُلُ مِمَّا تَأْكُلُونَ مِنْهُ وَيَشْرَبُ مِمَّا تَشْرَبُونَ (۳۳) وَلَئِنْ أَطَعْتُمْ بَشَرًا مِثْلَكُمْ إِنَّكُمْ إِذَا لَخَاسِرُونَ (٣٤) أَيَعِدُكُمْ أَنَّكُمْ إِذَا مِتُّمْ وَكُنْتُمْ تُرَابًا وَعِظَامًا أَنَّكُمْ مُخْرَجُونَ (٣٥) هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ لِمَا تُوعَدُونَ (٣٦) إِنْ هِيَ إِلا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ (۳۷) إِنْ هُوَ إِلَّا رَجُلٌ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا وَمَا نَحْنُ لَهُ بِمُؤْمِنِينَ (۳۸) المؤمنون
"তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যারা অবিশ্বাস করেছিল ও পরকালের সাক্ষাৎকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল এবং যাদেরকে আমি দিয়েছিলাম পার্থিব জীবনে প্রচুর ভোগ- সম্ভার, তারা বলেছিল, 'এ তো তোমাদেরই মত একজন মানুষ; তোমরা যা আহার কর, সেও তো তা-ই আহার করে এবং তোমরা যা পান কর, সেও তাই পান করে। যদি তোমরা তোমাদেরই মত এক জন মানুষের আনুগত্য কর, তাহলে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে কি তোমাদেরকে এই প্রতিশ্রুতিই দেয় যে, তোমাদের মৃত্যু হলে এবং তোমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হলেও তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? অসম্ভব, তোমাদেরকে যে বিষয়ে প্রতিশ্রুতিই দেয়া হয়েছে তা অসম্ভব। একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা মরি-বাঁচি এখানেই এবং আমরা পুনরুত্থিত হব না? সে তো এমন ব্যক্তি যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে এবং আমরা তাকে বিশ্বাস করবার নই।" (মু'মিনুনঃ ৩৩-৩৮)
এই শ্রেণীর খেয়াল-খুশীর অনুসারী ভ্রষ্ট মানুষদের ব্যাপারে সুমহান স্রষ্টা বলেছেন, {وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ وَمَا لَهُم بِذَلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ} (٢٤) سورة الجاثية
"ওরা বলে, 'একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, এখানেই আমরা মরি ও বাঁচি; মহাকাল-ই আমাদেরকে ধ্বংস করে।' বস্তুতঃ এ ব্যাপারে ওদের কোন জ্ঞান নেই, ওরা তো কেবল ধারণা করে মাত্র।” (জাষিয়াহঃ ২৪)
এই আত্মপ্রতারিত বোকা মানুষেরা ভাবে, তাদের মরণের পর পুনরায় তারা পৃথিবীতে ফিরে আসবে! মহান আল্লাহ তাদের সেই অমূলক ধারণার খন্ডন ক'রে বলেছেন, {أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُم مِّنْ الْقُرُونِ أَنَّهُمْ إِلَيْهِمْ لَا يَرْجِعُونَ} (۳۱) يس
"ওরা কি লক্ষ্য করে না, ওদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠীকে আমি ধ্বংস করেছি, যারা ওদের মধ্যে ফিরে আসবে না।” (ইয়াসীনঃ ৩১)
পক্ষান্তরে মু'মিনের বিশ্বাস হল সঠিক বিশ্বাস, যা জানিয়েছেন খোদ সৃষ্টিকর্তা। सर्वप्रथम মানুষের আদি পিতা আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁর থেকে তাঁর সঙ্গিনী হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে সকল মানুষের রূহকে। সুতরাং মানুষ সর্বপ্রথম থাকে আত্মর জগতে।
তারপর নির্ধারিত সময়ে আসে গর্ভ-জগতে।
তারপর নির্ধারিত সময়ে আসে পার্থিব-জগতে।
তারপর নির্ধারিত সময়ে চলে যায় কবরের (বারযাখী) জগতে।
তারপর নির্ধারিত সময়ে সে পুনরুত্থিত হয়ে উপস্থিত হবে কিয়ামতে।
তারপর সে অনন্ত কালের জন্য প্রবেশ করবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম-জগতে। অনেকে জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ ক'রে চিরকালের জন্য প্রবেশ করবে চিরসুখময় স্থান জান্নাতের জগতে।
মরণের পর রয়েছে পুনরুত্থানের জীবন, এ মর্মে আল-কুরআনে ভূরিভূরি প্রমাণ রয়েছে। তার কিছু নিম্নে উদ্ধৃত হল।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَن لَّن يُبْعَثُوا قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ} (۷) سورة التغابن
"অবিশ্বাসীরা ধারণা করে যে, তারা কখনোই পুনরুত্থিত হবে না। তুমি বল, 'অবশ্যই হবে, আমার প্রতিপালকের কসম! তোমরা অবশ্য-অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে, তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। আর এটা আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ।” (তাগাবুনঃ ৭)
{وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لا يَبْعَثُ اللَّهُ مَن يَمُوتُ بَلَى وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ} (৩৮) সূরা নাহল
"তারা দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর শপথ ক'রে বলে, 'যার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাকে পুনর্জীবিত করবেন না।' অবশ্যই! তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেনই; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়।” (নাহল: ৩৮)
{وَيَسْتَنبِئُونَكَ أَحَقٌّ هُوَ قُلْ إِي وَرَبِّي إِنَّهُ لَحَقٌّ وَمَا أَنتُمْ بِمُعْجِزِينَ} (৫৩) ইউনুস
"তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে, 'তা (শাস্তি) কি সত্য?' তুমি বল, 'হ্যাঁ, আমার প্রতিপালকের কসম! তা অবশ্যই সত্য; আর তোমরা কিছুতেই ব্যর্থ করতে পারবে না।” (ইউনুসঃ ৫৩)
{وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَأْتِينَا السَّاعَةُ قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتَأْتِيَنَّكُمْ عَالِمُ الْغَيْبِ لَا يَعْزُبُ عَنْهُ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَلَا أَصْغَرُ مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْبَرُ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ}
"অবিশ্বাসীরা বলে, 'আমরা কিয়ামতের সম্মুখীন হব না।' বল, 'অবশ্যই তোমাদেরকে তার সম্মুখীন হতেই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ; যিনি অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তার থেকে ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ কিছু তাঁর অগোচর নয়; ওর প্রত্যেকটি সুস্পষ্ট গ্রন্থে লিপিবদ্ধ।” (সাবা': ৩)
{وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةً لَّا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَن فِي الْقُبُورِ} (৭) সূরা হাজ্জ
"আর কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, এতে কোন সন্দেহ নেই। আর অবশ্যই আল্লাহ কবরে যারা আছে তাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন।” (হাজ্জঃ ৭)
{يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا أَحْصَاهُ اللَّهُ وَنَسُوهُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ} (৬) সূরা মুজাদালাহ
"যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে একত্রে পুনরুত্থিত করবেন এবং তাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা তারা করত; আল্লাহ ওর হিসাব রেখেছেন, আর তারা তা ভুলে গেছে। আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা।” (মুজাদালাহঃ ৬)
إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ (১) وَإِذَا النُّجُومُ انكَدَرَتْ (২) وَإِذَا الْجِبَالُ سُيِّرَتْ (৩) وَإِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْ (٤) وَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ (٥) وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ (٦) وَإِذَا النُّفُوسُ زُوجَتْ (۷) وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ (۸) بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ (۹) وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ (۱۰) وَإِذَا السَّمَاءُ كُشِطَتْ (۱۱) وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعَرَتْ (۱۲) وَإِذَا الْجَنَّةُ أُزْلِفَتْ (۱۳) عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ (١٤) سورة التكوير
"সূর্য যখন নিষ্প্রভ (দীপ্তিহীন) হবে, যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে, পর্বতসমূহকে যখন চালিত করা হবে, যখন পূর্ণ-গর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিতা হবে, যখন বন্য পশুগুলিকে একত্রিত করা হবে এবং সমুদ্রগুলিকে যখন উদ্বেলিত করা হবে; যখন আত্মসমূহকে (স্ব-স্ব দেহে) পুনঃসংযোজিত করা হবে, যখন জীবন্ত-প্রোথিতা কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? যখন আমলনামাকে উন্মোচিত করা হবে। যখন আকাশের আবরণকে অপসারিত করা হবে। জাহান্নামের অগ্নিকে যখন প্রজ্বলিত করা হবে এবং জান্নাতকে যখন নিকটবর্তী করা হবে। তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানবে, সে কি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।” (তাকভীরঃ ১-১৪)
إِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ (1) وَإِذَا الْكَوَاكِبُ انْتَثَرَتْ (۲) وَإِذَا الْبِحَارُ فُجِّرَتْ (۳) وَإِذَا الْقُبُورُ بُعْثِرَتْ (٤) عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ وَأَخَّرَتْ (٥)
"আকাশ যখন বিদীর্ণ হবে। যখন নক্ষত্ররাজি বিক্ষিপ্তভাবে ঝরে পড়বে, যখন সমুদ্রগুলি উদ্বেলিত হবে এবং যখন কবরসমূহ উন্মোচিত হবে; তখন প্রত্যেকেই জানতে পারবে সে পূর্বে যা প্রেরণ করেছে এবং পশ্চাতে কি ছেড়ে এসেছে।” (ইনফিত্বারঃ ১-৫)
কিন্তু মানুষ সেই দিন সম্বন্ধে উদাসীন। আর নিজ সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক সম্বন্ধে আত্মপ্রতারিত। সুতরাং উক্ত সূরাতেই তিনি মানুষকে তার কারণ সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছেন,
يَا أَيُّهَا الإِنسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ (٦) الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ (۷) فِي أَيِّ صُورَةٍ مَا شَاءَ رَكَّبَكَ (۸)
"হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম প্রতিপালক হতে প্রতারিত করল? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং তারপর সুসমঞ্জস করেছেন। যে আকৃতিতে চেয়েছেন তিনি তোমাকে গঠন করেছেন।” (ইনফিত্বার: ৬-৮)
মানুষ আর কী উত্তর দেবে? সুমহান স্রষ্টাই মানুষের রোগ উল্লেখ ক'রে বলেছেন, كَلَّا بَلْ تُكَذِّبُونَ بِالدِّينِ (1) وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ (۱۰) كِرَاماً كَاتِبِينَ (۱۱) يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ (١٢) إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ (١٣) وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ (١٤) الانفطار
"না কখনই না, বরং তোমরা শেষ বিচারকে মিথ্যা মনে করে থাক; অবশ্যই তোমাদের উপর (নিযুক্ত আছে) সংরক্ষকগণ; সম্মানিত (আমল) লেখকবর্গ (ফিরিশ্তা); তারা জানে, যা তোমরা ক'রে থাক। পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে এবং পাপাচারীরা থাকবে (জাহীম) জাহান্নামে।” (ইনফিত্বারঃ ৯-১৪)
অধিকাংশ মানুষই জানে না, তাদের জন্ম ও জীবনের কথা। অনেকেই ধারণা করে, মরণের পর আর কোন জীবন নেই। এই পার্থিব জীবনই শেষ জীবন।
মরণের পরবর্তী জীবন নিয়ে মানুষের বিশ্বাস ও অনুমান কেমন হয়ে থাকে, তার কল্পনায় Dr. Wayne Dyer একটি চমৎকার কথোপকথন উল্লেখ করেছেন। পাঠকের সুবিধার্থে তা নেট থেকে উদ্ধৃত করছি,
একটি মাতৃগর্ভে দুটি জমজ শিশুর মধ্যে কথোপকথন শুরু হল।
প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞাসা করল, 'তুমি কি প্রসব পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস কর?'
দ্বিতীয়জন বলল, 'অবশ্যই করি। নিশ্চয়ই প্রসব পরবর্তী জীবন বলে কিছু আছে। হয়তো সেই জীবনের প্রস্তুতির জন্যই আজ আমরা এখানে রয়েছি।'
প্রথমজন বলল, 'আরে বোকা! প্রসব পরবর্তী জীবন বলে কিছুই নেই। আচ্ছা বল তো দেখি, তোমার সেই কাল্পনিক জগৎ কেমন হতে পারে?'
দ্বিতীয়জন বলল, 'আমি ঠিক জানি না। তবে হতে পারে সেখানে উজ্জ্বল আলো হবে। হতে পারে সেখানে আমরা আমাদের পা দিয়ে হাঁটতে পারব। আমাদের মুখ দিয়ে নিজেরাই খাবার খেতে পারব। হয়তো সে জগতে আমাদের অন্যান্য ইন্দ্রিয় থাকবে, যা আমরা এখন কল্পনা করতে পারছি না।'
প্রথমজন বলল, 'এটা নিছক কল্পনা বৈ কিছু নয়। পা দিয়ে হাঁটাহাঁটি? অসম্ভব। মুখ দিয়ে খাবার খাওয়া? অলীক কল্পনা! আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি আসে এই নাড়ির মাধ্যমে। কিন্তু নাড়ির এই স্বল্প দৈর্ঘ্য কখনই প্রসব পরবর্তী জীবনের পক্ষে যুক্তি হতে পারে না। আসলে প্রসব পরবর্তী জীবন বলে আদৌ কিছু নেই। এটা বাতুলতা।
দ্বিতীয়জন বলল, 'আমি মনে করি, প্রসব পরবর্তী জীবন বলে কিছু আছে এবং সেটা এই মাতৃগর্ভের জীবনের চাইতে ভিন্ন। হতে পারে সেখানে বাঁচার জন্য আমাদের এই নাড়ির দরকার হবে না।'
প্রথমজন উত্তর দিল, 'হাঁদারাম! প্রসব পরবর্তী জীবন বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেই জীবন থেকে কখনো কেউ এ জীবনে ফিরে আসে না কেন? আসলে প্রসবের পরের জীবন বলতে কিছু নেই। প্রসবই হচ্ছে (ধ্বংস ও) জীবনের শেষ। এরপর আর কিছু নেই। আছে কেবল অন্ধকার আর শূন্যতা।'
দ্বিতীয়জন বলল, 'আমি ঠিক জানি না। তবে আমার মনে হয়, সে জগতে হয়তো আমাদের মায়ের সাথে দেখা হবে। মা হয়তো সে জগতে আমাদের দেখাশোনা করবেন।'
প্রথমজন হাসতে লাগল আর বলল, 'মা? তুমি মা-তে বিশ্বাস কর? এটা সত্যিই হাস্যকর। যদি মা বলে কেউ থেকে থাকে, তাহলে সে এখন কোথায়?'
দ্বিতীয়জন বলল, 'মা, তাকে ছাড়া এই জগৎ অসম্ভব। এই পৃথিবী অসম্ভব।'
প্রথমজন বলল, 'যেহেতু আমরা মা বলে কাউকে দেখি না, অনুভব করি بدی না, সেহেতু এর যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা এই যে, আসলে মা বলে কেউ নেই।
দ্বিতীয়জন মুচকি হেসে বলল, 'মাঝে মাঝে যখন তুমি নীরব থাকো, তখন মনোযোগ সহকারে যদি খেয়াল কর, তাহলে তুমি তাঁর বিদ্যমানতা টের পাবে। তুমি তাঁর শব্দ শুনতে পাবে। বুঝতে পারবে, তিনি তাঁর দরদভরা মধুর কণ্ঠে উপর থেকে আমাদেরকে ডাকছেন।'
অবশ্যই অবিশ্বাসী নাস্তিকরা মায়ের সে বিদ্যমানতা, সে মমতা, সে ডাক শুনতে পায় না। তারা সত্যিই মায়ের হতভাগা সন্তান।

📘 কেন এ জীবন 📄 সৃষ্টি সৃষ্ট কেন?

📄 সৃষ্টি সৃষ্ট কেন?


কেন এই আকাশ-বাতাস? কেন এই পৃথিবী, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, সমুদ্র, নদী, পর্বত, বৃক্ষলতা-বন-বনানী, পশু-পক্ষী? কেন সৃষ্টি হয়েছে এ সকল সৃষ্টি?
মানুষের জন্য? মানুষের খিদমতের জন্য? হ্যাঁ মানুষের খিদমতের জন্যই। মহান আল্লাহ বলেছেন, {هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الأَرْضِ جَمِيعاً ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ} (২৯) سورة البقرة
"তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং তাকে (আকাশকে) সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন। তিনি সকল বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” (বাক্বারাহঃ ২৯)
এ বিশ্বের সব কিছু মানুষের উপকারের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে? কিন্তু মানুষ কী জন্য সৃষ্টি হয়েছে?
যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, 'কলম কী জন্য সৃষ্ট?' উত্তরে নিশ্চয় আপনি বলবেন, 'তা দিয়ে লেখার জন্য।' 'কাগজ কী জন্য সৃষ্ট?' 'তার উপর লেখার জন্য।' 'জুতা কী জন্য সৃষ্ট?' 'পায়ের হিফাযতের জন্য।' কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় যে, 'আপনি কি জন্য সৃষ্ট?' তাহলে আপনার উত্তর কী? 'আপনার চোখ কী জন্য সৃষ্ট?' 'দেখার জন্য।' 'নাক কী জন্য সৃষ্ট?' 'শোঁকার জন্য।' 'জিভ কী জন্য সৃষ্ট?' 'স্বাদ গ্রহণের জন্য।' 'হাত কী জন্য সৃষ্ট?' 'ধারণ করার জন্য।' 'পা কী জন্য সৃষ্ট?' 'চলার জন্য।' কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় যে, 'আপনি কি জন্য সৃষ্ট?' তাহলে আপনার উত্তর কী? আপনার সৃষ্টির পশ্চাতে কি স্রষ্টার কোন হিকমত নেই? কোন কারণ ও যুক্তি নেই? নাকি আপনি বলবেন, 'এসেছি, তবে জানি না আমি এসেছি কোথা হতে, চোখের সামনে পথ দেখেছি চলিতেছি সেই পথে। এমনি ভাবে চলতে র'ব ইচ্ছে আমার যত, কোথায় যাব তাও জানিনে পথই বা আর কত?' উদ্দেশ্য বিহীন কাজ পাগলের, নিয়তবিহীন কাজ পন্ড। আপনি কি ধারণা করেন, আপনার সৃষ্টির পিছনে কোন হিকমত নেই, কোনও উদ্দেশ্য নেই? আপনি গাড়ি নিয়ে পথে বের হয়েছেন। যেতে যেতে এক জায়গায় ট্রাফিক পুলিশ আপনাকে জিজ্ঞাসা করল, 'আপনি কোথা থেকে আসছেন?' আপনি উত্তরে বললেন, 'জানি না।' সে জিজ্ঞাসা করল, 'কোথায় যাবেন?' আপনি বললেন, 'জানি না।' পুনরায় সে আপনাকে জিজ্ঞাসা করল, 'কেন এসেছেন বা এদিকে কী জন্য যাবেন?' আপনি বললেন, 'কী জানি?' সে বলল, 'কেন জানেন না?' আপনি বললেন, 'তাও জানি না!'
তাহলে পুলিশ কি আপনার খাতির করবে? সেই পুলিশকর্মীর নিকট থেকে আপনি কোন্ শ্রেণীর আচরণ আশা করতে পারেন? নিশ্চয় ভালো আচরণ নয়। আপনি আপনার জীবনের মর্ম জানেন না। আপনার জীবনের উদ্দেশ্য কী তা উপলব্ধি করেন না। তাহলে আপনার সাথে স্রষ্টার কী আচরণ হতে পারে, তা কি অনুমান করতে পারেন?
আপনি নাস্তিক হলে, আপনার সাথে কথা নেই। কিন্তু আস্তিক হলে বলুন, আপনার মানব-জন্ম কীসের জন্য?
আপনি বলতে পারেন, 'আমি সফল মানব হব। বড় বিজ্ঞানী হব, ডাক্তার হব, রাষ্ট্রনেতা হব, শিল্পপতি হব, ধনপতি হব ইত্যাদি। কিন্তু এ তো পার্থিব জীবনের জন্য। মরণ-পরবর্তী জীবনের জন্য আপনি কী হতে চান?
মহান স্রষ্টা জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। হ্যাঁ, সেটাও আপনার জন্য? আপনি কি মরণের পরবর্তী জীবনে সুখময় স্থান জান্নাত লাভ করতে চান? নাকি পার্থিব সুখই আপনার কাম্য, পার্থিব জীবনের সুখই আপনার সর্বশেষ প্রাপ্তি? মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ اللَّهَ يُدْخِلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُونَ وَيَأْكُلُونَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَّهُمْ} (১২) سورة محمد
"যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত। কিন্তু যারা অবিশ্বাস করে তারা ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকে এবং জন্তু-জানোয়ারের মত উদর-পূর্তি করে। আর তাদের নিবাস হল জাহান্নাম।” (মুহাম্মাদঃ ১২)
{وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنَّ وَالإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا أُوْلَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ}
"আর আমি তো বহু জ্বিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি; তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দর্শন করে না এবং তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবণ করে না। এরা চতুস্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত! তারাই হল উদাসীন।" (আ'রাফঃ ১৭৯)
আপনি নিশ্চয় জীবশ্রেষ্ঠ মানব। আর এ কথাও নিশ্চিতরূপে জানেন যে, স্রষ্টার প্রতি পূর্ণ ঈমান ছাড়া মানবের মানবতা পরিপূর্ণতা লাভ করে না। আর ভোগবাদী অবিশ্বাসীদের ভোগবিলাস মানবতার কোন কল্যাণ সাধন করতে পারে না। এ জন্যই মহান স্রষ্টা তাদেরকে ধমক দিয়ে বলেছেন,
كُلُوا وَتَمَتَّعُوا قَلِيلًا إِنَّكُم مُّجْرِمُونَ (٤٦) وَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِّلْمُكَذِّبِينَ (٤٧) وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ ارْكَعُوا لَا يَرْكَعُونَ} (٤٨) سورة المرسلات
"তোমরা অল্প কিছুদিন পানাহার ও ভোগ ক'রে নাও; তোমরা তো অপরাধী। সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যাজ্ঞানকারীদের জন্য। যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা আল্লাহর জন্য রুকু কর (নামায পড়), তখন তারা রুকু করে না (নামায পড়ে না)।” (মুরসালাতঃ ৪৮)
{ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ} (৩) سورة الحجر
"তাদেরকে ছেড়ে দাও তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং আশা ওদেরকে মোহাচ্ছন্ন ক'রে রাখুক, অচিরেই তারা বুঝবে।” (হিঃ ৩) তারা মনে করে, এ দুনিয়ার সাফল্যই মহাসাফল্য। এ পৃথিবীর সুখই পরম সুখ। 'খাও-দাও ফুর্তি কর'ই হল তাদের শ্লোগান।
কিন্তু তারা বেখবর অথবা উদাস যে, মরণের পর তারা কোথায় যাবে? তাদের দেহ ধূলায় মিশবে ঠিকই, কিন্তু তাদের আত্মা কোথায় যাবে? মহান স্রষ্টা কি কেবল ভোগ-বিলাসের জন্যই তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন? তিনি কি তাদেরকে বেকার ও ফালতু সৃষ্টি করেছেন? তিনি কি তাদের কোন হিসাব নেবেন না? তিনি কি তাদের মরে মাটি হওয়ার পর পুনরায় তাদেরকে জীবিত করতে সক্ষম নন? তিনি যেমন তাদেরকে ইহকালে জীবন ও দেহ দান করেছেন, তেমনি পরকালে জীবন ও দেহ দান করতে পারেন না? সৃষ্টিকর্তা বলেছেন,
{أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَن يُتْرَكَ سُدًى (٣٦) أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِنْ مَنِي يُمْنَى (۳۷) ثُمَّ كَانَ عَلَقَةً فَخَلَقَ فَسَوَّى (۳۸) فَجَعَلَ مِنْهُ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالأُنثَى (۳۹) أَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتَى} (٤٠) سورة القيامة
"মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেওয়া হবে? সে কি স্খলিত শুক্রবিন্দু ছিল না? অতঃপর সে রক্তপিন্ডে পরিণত হয়। তারপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেন এবং সুঠাম বানান। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন জোড়া জোড়া নর ও নারী। সেই স্রষ্টা কি মৃতকে পুনর্জীবিত করতে সক্ষম নন?” (ক্বিয়ামাহ : ৩৬-৪০)
{أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ (١١٥) فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيم} (١١٦) سورة المؤمنون
"তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না? মহিমান্বিত আল্লাহ; যিনি প্রকৃত মালিক, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই; সম্মানিত (সুন্দর) আরশের অধিপতি তিনি।” (মু'মিনূনঃ ১১৫-১১৬)
মহান স্রষ্টা এ সকল সৃষ্টি বেকার সৃষ্টি করেছেন, এ ধারণা কেবল কাফেররাই করতে পারে। তারাই মনে করে যে, মরণের পর কোন জীবন নেই। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا ذَلِكَ ظَنُّ الَّذِينَ كَفَرُوا فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ كَفَرُوا مِنَ النَّارِ} (২৭) সূরা সা’দ
"আমি আকাশ, পৃথিবী এবং উভয়ের অন্তর্বর্তী কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি; এ তো অবিশ্বাসীদের ধারণা। সুতরাং অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ।” (স্বাদঃ ২৭)
আপনি কি ভাবেন, আপনাকে এ জগতে প্রতিষ্ঠা দানের পশ্চাতে সুমহান প্রতিপালকের কোন উদ্দেশ্য নেই? যদি তাই ভাবেন, তাহলে তা বাস্তব নয়। আপনি বাস্তবকে অস্বীকার ও সত্যকে প্রত্যাখ্যান করছেন। আপনি অবিশ্বাস করছেন যে, আপনাকে আপনার অবিশ্বাসের জন্য কোন প্রতিফল ভোগ করতে হবে না?
নিশ্চয় হবে। কারণ আপনি ফালতু সৃষ্টি নন। আপনাকে বেকার সৃষ্টি করা হয়নি। সুমহান স্রষ্টার সৃষ্টি অযৌক্তিক নয়। তিনি অকারণে সৃষ্টিজগৎ রচনা করেননি। ভাবনা-চিন্তা ক'রে দেখুন। জ্ঞানী মানুষ ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِّأُوْلِي الْأَلْبَابِ (۱۹۰) الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ} (১৯১) সূরা আল ইমরান
"নিশ্চয় আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানী লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে এবং (বলে,) 'হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এ নিরর্থক সৃষ্টি কর নি। তুমি পবিত্র। তুমি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা কর।" (আলে ইমরানঃ ১৯০-১৯১)
শুধু জ্ঞানী নয়, বহু বিজ্ঞানীও এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, এ বিশ্বের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। আপনিও যদি আপনার সুস্থ জ্ঞান ও বিবেক নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেন, তাহলে আপনিও বলতে বাধ্য হবেন,
{رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ} (১৯১) সূরা আলে ইমরান
“হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এ নিরর্থক সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র। তুমি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা কর।” (আলে ইমরান: ১৯১)
পৃথিবীর মাঝে নানা জীব-জন্তু ও নানা পদার্থের সৃষ্টি নিয়ে, মহাশূন্যের চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র ও নিহারিকাপুঞ্জ নিয়ে, দিবারাত্রি ও ঋতুর পরিবর্তন নিয়ে, ঝড়-তুফান, প্লাবন, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি প্রভৃতি নিয়ে যদি একটু ভাবনা-চিন্তা করেন, তাহলে অবশ্যই আপনি বলতে বাধ্য হবেন, 'হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এ নিরর্থক সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র।' তুমি নিরর্থক ও ফালতু কিছু সৃষ্টি করবে, এ থেকে পবিত্র। অবিশ্বাসীরা যে ধারণা করে যে, এ সকল সৃষ্টি ফালতু, এ থেকে তুমি পবিত্র। আর তুমি আমাকে যে নিরর্থক সৃষ্টি করনি, তাও আমি বুঝতে সক্ষম।
অবিশ্বাসীরা কি পরীক্ষার পর পরীক্ষা চালিয়ে কোন আবিষ্কারকে নিরর্থক বলতে পারে? কোন বিরাট অপারেশন ক'রে রোগীকে সুস্থ ক'রে তোলাকে কি ফালতু কাজ বলতে পারে? ব্রেন অপারেশন ক'রে, হার্ট অপারেশন ক'রে অথবা আরো কোন বড় অপারেশন ক'রে মানুষকে সুস্থ জীবন দান করা কি নিরর্থক কাজ হতে পারে? তা যদি না হয়, তাহলে ব্রেন, হার্ট, চোখ ইত্যাদি সৃষ্টি করা কীভাবে নিরর্থক বলে মনে হতে পারে?
সুমহান স্রষ্টা পবিত্র। তিনি নিরর্থক কোন কাজ করবেন, এটা ভাবাই যায় পণ্ডিত না। মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না। মহান স্রষ্টাই সব কিছু সৃষ্টি করেছেন।
{بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنَّى يَكُونُ لَهُ وَلَدٌ وَلَمْ تَكُن لَّهُ صَاحِبَةٌ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ (১০১) ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ فَاعْبُدُوهُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ} (১০২) সূরা আল-আনআম
“তিনি আকাশমণ্ডলী ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবনকর্তা, তাঁর সন্তান হবে কীরূপে? তাঁর তো কোন স্ত্রী নেই, তিনিই তো সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক বস্তু সম্বন্ধে তিনিই সবিশেষ অবহিত। এই তো আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক! তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনিই সব কিছুরই স্রষ্টা। সুতরাং তোমরা তাঁর উপাসনা কর। তিনি সব কিছুরই তত্ত্বাবধায়ক।” (আনআমঃ ১০১-১০২)
{ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ} (৬২) সূরা গাফির
“তিনিই তো আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক, সব কিছুর স্রষ্টা, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, সুতরাং তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ?” (মু'মিনঃ ৬২)
{الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا} (۲) سورة الفرقان
"আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই। তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌম ক্ষমতায় তাঁর কোন অংশী নেই। তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত আকৃতি দান করেছেন।" (ফুরক্বান: ২)
মানুষ আবিষ্কার করে। আর মানুষ যেটা আবিষ্কার করে, সেটা কোন এক উদ্দেশ্য নিয়ে করে। তার সুবিদিত পরিকল্পনা থাকে। তার আবিষ্কার সফল হওয়ার পশ্চাতে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকে। তাহলে মানুষের কেন মনে হয় যে, মহান স্রষ্টার সৃষ্টির পশ্চাতে কোন উদ্দেশ্য নেই, কোন যুক্তি নেই?
মানুষ যা কিছু আবিষ্কার করে, তার পিছনে পরিকল্পনা, যুক্তি ও উদ্দেশ্য থাকে, আর স্রষ্টা যে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তার পিছনে কোন পরিকল্পনা, যুক্তি ও উদ্দেশ্য নেই---এ কেমন পরস্পর-বিরোধী চিন্তাধারা?
মানুষ যেটা আবিষ্কার করে, সেটা পরিচালনা করার, অক্ষত রাখার, সক্রিয় রাখার, দীর্ঘস্থায়ী করার নানা ব্যবস্থা ও নির্দেশনা দিয়ে থাকে। প্রত্যেক যন্ত্রের সাথে ম্যানুয়েল থাকে, পরিচালন-পদ্ধতি থাকে। আর মহান আল্লাহ সম্মানিত সৃষ্টি মানুষকে ক্ষণস্থায়ী জীবন দিয়ে এ নশ্বর জগতে প্রেরণ করলেন, তার ক্ষেত্রেও যে তিনি ম্যানুয়েল বা পরিচালন-পদ্ধতির ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করেছেন, তা কি অবিশ্বাস্য হতে পারে?
পক্ষান্তরে সে ব্যবস্থাপনাকে অবিশ্বাস করলে, অগ্রাহ্য ও প্রত্যাখ্যান করলে মানব-জীবন যে কী ভীষণভাবে বিকল ও অচল হতে পারে, তা সহজে অনুমেয়।
আমরা ছোট থেকে বড় হই 'বড়' কিছু হওয়ার আশায়। 'বড়' বলতে যাতে বড় মাপের অর্থ সঞ্চয় করা যায়। বড় পদ ও পজিশন লাভ হয়। সামাজিক বিশাল মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা লাভ হয়। এটাই অনেকের সর্বশেষ আশা, সর্বশেষ পাওয়া। এটাই তাদের অভীষ্ট ও উদ্দেশ্য। এরই ভিত্তিতে ছেলে-মেয়েদেরকে লেখাপড়া করায়, মেয়েদের বিবাহ দেয়। কিন্তু এ হল ক্ষণস্থায়ী সংসারের সাময়িক পরিকল্পনা। এ আশা ও উদ্দেশ্য কেবল মরণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
পূর্বে মানুষ হাতে পাখা ঘুরিয়ে হাওয়া খেতো, এখনও অনেকে খায়। তারপর বিদ্যুতের সাহায্যে পাখা ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছি, বাড়ির শীত ও তাপ নিয়ন্ত্রণ করছি। বিদ্যুতও কিছু ঘুরিয়ে তৈরি করতে হয়। যা দিয়ে ঘুরানো হচ্ছে তাও একদিন শেষ হবে। সব শেষ হয়ে যাবে। পার্থিব সকল সুখ-সম্ভোগ পৃথিবীতেই শেষ হয়ে যাবে।
তার আগে মানুষ মৃত্যুবরণ করলেই সকল সুখ দুনিয়ার মধ্যেই পড়ে থাকবে।
এ সংসারে কত শত ভালো লোক তার ভালো কাজের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার কত শত মন্দ লোক তার মন্দ কাজের প্রতিফল থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। এরা কি বিচার পাবে না? এরা কি নিজেদের কাজের বদলা পাবে না?
তাহলে নিশ্চয় এর পরবর্তী কোন এক সময় আছে, যে সময়ে প্রত্যেকে তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। কারো কর্ম নিরর্থক নয়, কারো জন্ম বিফল নয়।
'ভিটেন গাঙে যেতে ভালো, পুঁজি ভেঙ্গে খেতে ভালো, যত কষ্ট উজুতে আর বুঝতে।' কী ভাবছেন, ভবের বাজারে এসে কেবল পুঁজি ভেঙ্গে খেয়ে যাবেন, আর তার কোন হিসাব বুঝাতে হবে না?
বিশাল এক বিস্ফোরণের মাঝে এ বিশ্ব রচিত হয়েছে। কত শত বছর এ পৃথিবী অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। আবার কত শত বছর তার উপর বৃষ্টিপাত হয়েছে। অতঃপর তাতে নানা জীব সৃষ্টি হয়েছে। সুন্দর ক'রে সাজিয়ে মানুষের বাসোপযোগী করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, "আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি এবং তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং ওতে উদ্গত করেছি চোখ-জুড়ানো নানা প্রকার উদ্ভিদ। (আল্লাহ) অভিমুখী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ। আকাশ হতে আমি বর্ষণ করি কল্যাণকর বৃষ্টি এবং তার দ্বারা আমি সৃষ্টি করি বহু বাগান ও পরিপক্ব শস্যরাজি, আর উঁচু উঁচু খেজুর বৃক্ষ; যাতে আছে কাঁদি কাঁদি খেজুর --- (আমার) দাসদের জীবিকাস্বরূপ। আর বৃষ্টি দ্বারা আমি সঞ্জীবিত করি মৃত ভূমিকে, এভাবে পুনরুত্থান ঘটবে।” (ক্বাফঃ ৭-১১)
মানুষ কীভাবে ধারণা করল যে, তাকে এমনি-এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে? তাকে এমনি-এমনি সৃষ্টি করা হয়েছে।
তাকে কোন অপরাধের হিসাব লাগবে না। কোন সৎকর্মের সুফল প্রদান করা হবে না।
আসলে সে পুনরুত্থানে অবিশ্বাস করে। পরকালে অবিশ্বাস করে। আল্লাহ তাকে পুনর্জীবিত করতে পারবেন না।
মহান আল্লাহ বলেন,
{أَيَحْسَبُ الإِنسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى (٣٦) أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِنْ مَنِي يُمْنَى (۳۷) ثُمَّ كَانَ عَلَقَةً فَخَلَقَ فَسَوَّى (۳۸) فَجَعَلَ مِنْهُ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالأُنثَى (۳۹) أَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتَى} (٤٠) سورة القيامة
"মানুষ কি মনে করে যে, তাকে নিরর্থক ছেড়ে দেওয়া হবে? সে কি স্খলিত শুক্রবিন্দু ছিল না? অতঃপর সে রক্তপিন্ডে পরিণত হয়। তারপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেন এবং সুঠাম বানান। অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন জোড়া জোড়া নর ও নারী। সেই স্রষ্টা কি মৃতকে পুনর্জীবিত করতে সক্ষম নন?” (ক্বিয়ামাহ : ৩৬-৪০)
সুনিশ্চিত যে, তিনি মানুষকে পুনর্জীবন দান করতে সক্ষম। আর তা তাঁর জন্য খুবই সহজ। যার নানা উদাহরণ মানুষের কাছে সুবিদিত। সুতরাং নিশ্চিত যে, মানুষকে ফালতু সৃষ্টি করা হয়নি।
কোন মানুষ কি একটি বিশাল বাড়ি নির্মাণ ক'রে, তা সুসজ্জিত ক'রে খামোখা ভেঙ্গে ফেলবে?
তাহলে এ কথা কীভাবে কল্পনা করা যায় যে, মহান স্রষ্টা এত সুন্দর বিশ্ব রচনা ক'রে তা খামোখা ধ্বংস ক'রে ফেলবেন?
এটা তো হতে পারে না। সুমহান স্রষ্টা পবিত্র! তাঁর কোন কর্মই উদ্দেশ্যবিহীন নয়।
গ্রাম-গঞ্জের শিশুরা খেলাচ্ছলে ধূলাবালি দিয়ে ঘর বাঁধে এবং মিছা খেলায় ঘর- সংসারের অভিনয় ক'রে চিত্তবিনোদন করে। সুমহান স্রষ্টা কি সেই রকমভাবে এই বিশ্ব রচনা করেছেন? এ হতে সুমহান স্রষ্টা পবিত্র। তিনি বলেছেন,
{وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ (١٦) لَوْ أَرَدْنَا أَن نَّتَّخِذَ لَهْوًا لَّاتَّخَذْنَاهُ مِن لَّدُنَّا إِن كُنَّا فَاعِلِينَ} (۱۷) سورة الأنبياء
"আকাশ ও পৃথিবী এবং যা উভয়ের অন্তর্বর্তী তা আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। আমি যদি চিত্তবিনোদনের উপকরণ সৃষ্টি করতে চাইতাম, তবে আমি আমার নিকট যা আছে তা নিয়েই করতাম; যদি আমি তা করতামই। (আমি তা করিনি।) (আম্বিয়াঃ ১৬-১৭) তিনি আরো বলেছেন,
{وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ (۳۸) مَا خَلَقْنَاهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ} (۳۹) سورة الدخان
"আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং ওদের মধ্যে কোন কিছুই খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি; আমি এ দুটিকে যথার্থরূপেই সৃষ্টি করেছি; কিন্তু ওদের অধিকাংশই তা জানে না।” (দুখান: ৩৮-৩৯)
হ্যাঁ, অধিকাংশ মানুষই সৃষ্টির কারণ ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অজ্ঞ। সৃষ্টির যথার্থতা ও প্রকৃতত্ব সম্বন্ধে উদাসীন মানুষ পার্থিব ভোগবিলাসে মত্ত। অবিশ্বাস, কুবিশ্বাস ও অমূলক ধারণা নিয়ে সেই তত্ত্ব থেকে বহু ক্রোশ দূরে, যে তত্ত্ব রয়েছে বিশ্বজাহান ও মানুষ সৃষ্টির পশ্চাতে।
সুমহান স্রষ্টার ঘোষণা হল,
{وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَإِنَّ السَّاعَةَ لَآتِيَةٌ فَاصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ} (٨٥) سورة الحجر
"আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এই দুয়ের অন্তর্বর্তী কোন কিছুই আমি অযথা সৃষ্টি করিনি। আর কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী; সুতরাং তুমি পরম সৌজন্যের সাথে তাদেরকে ক্ষমা কর।” (হিজরঃ ৮৫)
{حم (১) تَنْزِيلُ الْكِتَابِ مِنْ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ (২) مَا خَلَقْنَا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُسَمًّى وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ) (৩) سورة الأحقاف
"হা- মীম। এ কিতাব পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যস্থিত সব কিছুই আমি যথাযথভাবে নির্দিষ্টকালের জন্য সৃষ্টি করেছি; কিন্তু অবিশ্বাসীরা তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে, তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।” (আহক্বাফঃ ১-৩) তিনি মহান আল্লাহ। তাঁর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলী。
{اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَهُ الْأَسْمَاءِ الْحُسْنَى} (৮) سورة طه "আল্লাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই, সমস্ত উত্তম নাম তাঁরই।” (ত্বা-হাঃ ৮)
{هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ (২২) هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ (۲۳) هُوَ اللهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الأَسْمَاءُ الْحُسْنَى يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ} (٢٤) سورة الحشر
"তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি অদৃশ্য এবং দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনিই অতি দয়াময়, পরম দয়ালু। তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তিনিই অধিপতি, পবিত্র, নিরবদ্য, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রবল, গর্বের অধিকারী। যারা তার শরীক স্থির করে, আল্লাহ তা হতে পবিত্র মহান। তিনিই আল্লাহ সৃজনকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, রূপদাতা। সকল উত্তম নাম তাঁরই। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। আর তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (হাশরঃ ২২-২৪)
তাঁর একটি সুন্দর নাম হল 'আল-হাকীম'। এ নামের অর্থ প্রজ্ঞাময়, হিকমত-ওয়ালা। যাঁর প্রতি কথা ও কাজে হিকমত থাকে, যুক্তি থাকে, প্রজ্ঞা থাকে। যাঁর বিধান, আদেশ ও নিষেধ হিকমতে ভরপুর, যাঁর সকল কর্ম যুক্তিযুক্ত এবং সকল সৃষ্টি সুন্দর ও নিখুঁত নৈপুণ্যে পরিপূর্ণ। যাঁর কোন কাজ লীলা-খেলা হয় না।
তাঁর একটি নাম 'আর-রাহমান' ও আরো একটি নাম 'আর-রাহীম'। তার অর্থ হল পরম করুণাময় অতি দয়াবান। এ নামের প্রভাব ছড়িয়ে রয়েছে সারা বিশ্বজাহানে।
فَانظُرْ إِلَى آثَارِ رَحْمَتِ اللَّهِ كَيْفَ يُحْيِي الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا إِنَّ ذَلِكَ لَمُحْيِي الْمَوْتَى وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} (٥٠) سورة الروم
"সুতরাং তুমি আল্লাহর করুণার চিহ্ন লক্ষ্য কর, কীভাবে তিনি ভূমির মৃত্যুর পর একে পুনর্জীবিত করেন। নিঃসন্দেহে তিনি মৃতকে জীবিত করবেন এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (রুমঃ ৫০)
অনুরূপভাবে তাঁর নিরানব্বইয়ের অধিক নামের সার্থকতা মানুষ অনুভব করতে পারবে দুনিয়া ও আখেরাতে। 'আল-হাকীম' নামও সার্থক নাম, এতে কোন মু'মিনের সন্দেহ থাকতে পারেচ্ছ না এবং তাঁর সৃষ্টি ও নির্দেশও যে হিকমতে ভরপুর, তাতে তার মনে কোন সন্দেহ বাসা বাঁধতে পারে না।
মানুষও সৃষ্ট হয়েছে পরিপূর্ণ হিকমতের ভিত্তিতে। সেই হিকমত ও তার রহস্য খুঁজে বের করা মানুষের কর্তব্য। যদিও তা সুমহান স্রষ্টা নিজেই তার বর্ণনা দিয়েছেন। কিতাব ও রসূল পাঠিয়ে সতর্ক করেছেন মনুষ্য জাতিকে। তিনি জানিয়েছেন, মানুষকে তিনি বৃথা সৃষ্টি করেননি।
সুমহান স্রষ্টা কেবল পান-ভোজন ও যৌনক্ষুধা নিবারণের জন্য মানুষ সৃষ্টি করেননি। পান-ভোজন ও যৌনক্ষুধা নিবারণের সুব্যবস্থা ক'রে কেবল ভোগ- বিলাসে মত্ত থাকার জন্য তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেননি। নিশ্চয় তাঁর মানুষ সৃষ্টির পশ্চাতে উদ্দেশ্য আছে মহান।

📘 কেন এ জীবন 📄 স্রষ্টার সৃষ্টির উদ্দেশ্য

📄 স্রষ্টার সৃষ্টির উদ্দেশ্য


এখন প্রশ্ন হল, কী সেই উদ্দেশ্য, যার জন্য সুমহান স্রষ্টা বিশ্বজাহান সৃষ্টি করেছেন?
তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য বিশ্ব রচনা করেছেন। মানুষের প্রকৃত সুখের জীবন প্রস্তুত রেখেছেন তার মরণের পরে। আর ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর এই জীবনকে তিনি পরীক্ষার সময়-কাল নির্ধারিত করেছেন।
তিনি মানব-দানবকে পরীক্ষা করতে চান এবং সে পরীক্ষায় যে পাস করবে কেবল তাকেই প্রকৃত সুখী জীবন চিরকালের জন্য দান করতে চান।
পরীক্ষার ফলাফল তিনি জানেন। তবুও তিনি তাদেরকে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে পরীক্ষা নিয়ে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম করতে চান। মহান স্রষ্টা বলেছেন,
{إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن نُّطْفَةٍ أَمْشَاجِ نَّبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا (٢) إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا} (৩) سورة الإنسان
“নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু হতে, যাতে আমি তাকে পরীক্ষা করি, এই জন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। নিশ্চয় আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি; হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে।” (দাহর: ২-৩)
হ্যাঁ, মানুষকে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। সুতরাং সে নিজের ইচ্ছায় ভালো বা মন্দ পথ গ্রহণ করতে পারে। সৎ বা অসৎ পথ বেছে নিতে পারে। ইচ্ছা করলে নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করতে পারে অথবা নিজ বিবেক ও বুদ্ধিভিত্তিক কর্ম করতে পারে অথবা সুমহান স্রষ্টার নির্দেশিত পথ অবলম্বন করতে পারে। ইচ্ছা করলে সে মু'মিন হতে পারে। ইচ্ছা করলে সে কাফের হতে পারে। সে নিজ ইচ্ছায় সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি হতে পারে অথবা সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টিও হতে পারে। মানুষকে দেওয়া হয়েছে ইচ্ছাশক্তি ও এখতিয়ার-ক্ষমতা। সে নিজে ভালোমন্দ নির্বাচন ও গ্রহণ করতে পারে।
এ দুনিয়া হল তার পরীক্ষাগার। সে পরীক্ষার্থী। মহান স্রষ্টা পরীক্ষক। পরীক্ষার সময় সাবালক হওয়ার পর থেকে সজ্ঞান থাকা পর্যন্ত। ফল প্রকাশ পরকালে। এ হল পরীক্ষকের ইচ্ছা। এ দুনিয়া হবে পরীক্ষা ক্ষেত্র। আর আখেরাত হবে তার ফলাফল ভোগের ক্ষেত্র।
তিনি পরীক্ষা করবেন, কে তাঁর আনুগত্য করছে এবং কে তাঁর অবাধ্যাচরণ করছে?
পৃথিবীর এ কর্মক্ষেত্রে কে সবচেয়ে ভালো কর্ম করছে এবং কে মন্দ কর্ম করছে? কে বিনিময় স্বরূপ চিরসুখ ভোগের উপযুক্ত এবং কে শাস্তিস্বরূপ চির কষ্ট ভোগের উপযুক্ত? তিনি বলেছেন,
{ وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً وَلَئِن قُلْتَ إِنَّكُم مَّبْعُوثُونَ مِن بَعْدِ الْمَوْتِ لَيَقُولَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ) (৭) سورة هود
"আর তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছ দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই সময় তাঁর আরশ পানির উপরে ছিল; যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা ক'রে নেন, তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম কে? আর যদি তুমি বল, 'নিশ্চয়ই তোমাদেরকে মৃত্যুর পর জীবিত করা হবে', তাহলে যারা অবিশ্বাসী তারা অবশ্যই বলবে, 'এটা তো সুস্পষ্ট যাদু।” (হৃদঃ ৭)
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ} (২) الملك "যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য; কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম? আর তিনি পরাক্রমশালী, বড় ক্ষমাশীল।” (মুলকঃ ২)
{إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا } (৭) সূরা কাহাফ "পৃথিবীর উপর যা কিছু আছে আমি সেগুলিকে ওর শোভা করেছি মানুষকে এই পরীক্ষা করবার জন্য যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম।” (কাহফঃ ৭)
মহানবী বলেছেন, ((إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ، وَإِنَّ اللَّهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُونَ)). "নিশ্চয় দুনিয়া মিষ্ট ও সবুজ (সুন্দর আকর্ষণীয়)। আর নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে এর প্রতিনিধি নিয়োজিত ক'রে দেখবেন যে, তোমরা কীভাবে কর্ম করছ?” (মুসলিম ৭১২৪নং)
বিশাল এই পরীক্ষাগারে কোন্ জিনিস দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করা হবে? পৃথিবীর সব কিছু দিয়ে। খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান, জমি-জায়গা, ফল-ফসল, সুন্দর দৃশ্য, সুমধুর শব্দ, সোনা-চাঁদি, টাকা-পয়সা, গৃহপালিত পশু-পক্ষী ইত্যাদি যাবতীয় আকর্ষণীয় ও লোভনীয় জিনিস দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করা হবে।
মহান আল্লাহ বলেছেন, زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاء وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَابِ} (১৪) সূরা আলে ইমরান "নারী, সন্তান-সন্ততি, জমাকৃত সোনা-রূপার ভান্ডার, পছন্দসই (চিহ্নিত) ঘোড়া, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট লোভনীয় করা হয়েছে। এ সব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর নিকটেই উত্তম আশ্রয়স্থল রয়েছে।” (আলে ইমরানঃ ১৪)
পরীক্ষার নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঘন্টা বাজবে মানুষের জ্ঞানশূন্য হওয়া অথবা মৃত্যু হওয়ার পূর্বে। কবর থেকেই প্রকাশ হতে শুরু হবে পরীক্ষার রিজাল্ট। সব শেষে পরীক্ষার অনির্বায ফলাফল ভোগ করতে হবে জান্নাতে অথবা জাহান্নামে。
পরীক্ষা নেওয়া হবে যাবতীয় পার্থিব সৌন্দর্যের বিষয়ে। তাতে কি মানুষ সুমহান স্রষ্টার হালাল-হারামের বিধান মান্য করেছে? তাতে কি সে তাঁর রসূলের আদেশ-নিষেধ পালন করেছে?
দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের ক্ষেত্রে কি সে আমানতের খিয়ানত করেছে? চুক্তি ভঙ্গ করেছে? অধিকার নষ্ট করেছে? কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছে?
সামাজিক জীব হিসাবে সৃষ্ট জীব কি বন্য পশুর মতো অথবা সামুদ্রিক প্রাণীর মতো সবল দুর্বলকে ভক্ষণ করেছে?
মানুষ প্রত্যহ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। বরং প্রত্যেক পদে পদে তার পরীক্ষা নেওয়া হয়। তার দারিদ্র্য-ধনবত্তা, ধন-মাল ও পরিবার-পরিজনে পরীক্ষা দিতে হয়।
সুমহান স্রষ্টা বলেছেন, {وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ} (۲۸) سورة الأنفال "আর জেনে রাখ যে, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষার বস্তু এবং নিশ্চয় আল্লাহর নিকটে রয়েছে মহা পুরস্কার।” (আনফালঃ ২৮)
{إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللَّهُ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ} (١٥) سورة التغابن "তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। আর আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহা পুরস্কার।” (তাগাবুনঃ ১৫)
বরং প্রত্যেক ভালো-মন্দে তাকে পরীক্ষা দিতে হয়। আর পরীক্ষার শেষে ফিরে যেতে হয় ফল পাওয়ার জায়গায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, {كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ} (٣٥) الأنبياء "জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা ক'রে থাকি। আর আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (আম্বিয়া: ৩৫)
লোভ দেখিয়ে সংবরণ করতে বলা হয়েছে, পাপ-প্রবণতায় সংযত হতে বলা হয়েছে, ভোগ-বিলাসে সংযমশীল হতে বলা হয়েছে, স্রষ্টার সঙ্গে ব্যবসায় লাভবান হতে বলা হয়েছে। পার্থিব সৌন্দর্যে মোহগ্রস্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে ইত্যাদি।
সুমহান স্রষ্টা মানুষকে নেক আমল (সৎকর্ম) করার জন্য এ নশ্বর পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন; যেমন পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। তবে প্রণিধানযোগ্য যে, তিনি এটা চাননি যে, মানুষ বেশি বেশি আমল করুক। বরং তিনি চেয়েছেন, মানুষ বেশি উত্তম আমল করুন। আমলের প্রাচুর্য মহান আল্লাহর নিকট বিচার্য নয়, বরং আমলের উৎকৃষ্টতাই তাঁর নিকট বিচার্য।
নিশ্চয়ই এক মণ লোহার চাইতে এক কিলো স্বর্ণের মূল্য অনেক। মানিকের খানিক ভালো। যে কর্ম মহান প্রতিপালকের নিকট পছন্দনীয়, তার সামান্য হলেও তা মূল্যবান। অন্যথা তাঁর অপছন্দনীয় কোন আমলের তাঁর নিকট কোন মূল্য নেই। পরন্তু তার বিপরীত ফল আছে, যা আমলকারীকে ভোগ করতে হবে।
বিশাল এই পরীক্ষায় প্রমাণ করতে হবে আমলের উৎকৃষ্টতা।
পরীক্ষায় নানা প্রতিকূলতা রয়েছে। কুপ্রবৃত্তি ও মনের খেয়াল-খুশি রয়েছে। তার উপর রয়েছে শয়তানের প্রলোভন। আদি পিতামাতা আদম-হাওয়ার মতো পরীক্ষা রয়েছে সকল মানুষের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে। রয়েছে,
{يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَّا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا} “হে আদম তুমি তোমার স্ত্রীসহ বেহেশতে বসবাস কর এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা আহার কর।” (বাক্বারাহঃ ৩৫)
আবার রয়েছে,
{وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ} (٣٥) سورة البقرة “কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না; হলে তোমরা অনাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (বাক্বারাহঃ ৩৫)
তার উপরে রয়েছে শয়তানী কুমন্ত্রণা,
{مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْن أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ} (۲۰) "পাছে তোমরা উভয়ে ফিরিস্তা হয়ে যাও কিংবা তোমরা (জান্নাতে) চিরস্থায়ী হও, এ জন্যই তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন।" (আ'রাফঃ ২০)
বলা বাহুল্য, এ পরীক্ষায় ভুল তো হতেই পারে। আর তার জন্য রয়েছে মহান আল্লাহর দয়া ও ক্ষমাশীলতা। যার ফলে তিনি নাম নিয়েছেন ‘আর-রাহমান’ (পরম দয়াময়), ‘আর-রাহীম’ (অতি দয়াবান), ‘আল-গাফুর, আল-গাফফার, আল-আফুউ’ (মহাক্ষমাশীল), ‘আত-তাওয়াব’ (তওবা গ্রহণকারী)। পরীক্ষাতে রয়েছে বহু আদেশ ও বহু নিষেধ। তাঁর প্রধান আদেশ হল,
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (۲۱) البقرة "হে মানুষ সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের উপাসনা কর, যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে সৃষ্টি করেছেন; যাতে তোমরা পরহেযগার (ধর্মভীরু) হতে পার।" (বাক্বারাহঃ ২১)
আর নিষেধ হল,
{الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشاً وَالسَّمَاء بِنَاء وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاء مَاء فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقاً لَّكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَاداً وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ} (۲۲) سورة البقرة "যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আকাশকে ছাদ স্বরূপ সৃষ্টি করেছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ ক'রে তার দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মূল উৎপাদন করেছেন। সুতরাং জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করো না।” (বাক্বারাহঃ ২২)
আর তিনি পরিষ্কার করেই বলেছেন,
{وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون} (৫৬) সূরা যারিয়াত অর্থাৎ, আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। (যারিয়াতঃ ৫৬)
সুতরাং এটাই হল তাঁর বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য। তিনি অন্য কোন উদ্দেশ্যে এ বিশ্বজাহান রচনা করেননি। যেমন সাধারণত: মানুষের কোন আবিষ্কারের পশ্চাতে উদ্দেশ্য থাকে অর্থোপার্জন, অন্নসংস্থান, রুযী-রুটীর সন্ধান ইত্যাদি। তাই তিনি পরবর্তী আয়াতে বলেছেন,
{مَا أُرِيدُ مِنْهُم مِّن رِّزْقِ وَمَا أُرِيدُ أَن يُطْعِمُونَ (৫٧) إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ} (৫৮) সূরা যারিয়াত
“আমি তাদের নিকট হতে জীবিকা চাই না এবং এও চাই না যে, তারা আমার আহার্য যোগাবে। নিশ্চয় আল্লাহ; তিনিই রুযীদাতা প্রবল, পরাক্রান্ত।” (যারিয়াতঃ ৫৭-৫৮)
বলা বাহুল্য, 'কেন এ জীবন? আপনি কেন সৃষ্ট হয়েছেন? আপনার জন্ম কেন? এ পার্থিব জীবনের আসল উদ্দেশ্য কী?' এ সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর হল উক্ত আয়াত।
উমার বিন আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর জীবনের সর্বশেষ খুতবায় বলেছিলেন, 'হে লোক সকল! তোমরা অনর্থক সৃষ্ট হওনি এবং তোমাদেরকে কখনই নিরর্থক ছেড়ে দেওয়া হবে না। তোমাদের একটি প্রত্যাবর্তনস্থল ও কাল রয়েছে, যখন মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাগণের বিচারের জন্য উপস্থিত হবেন। আর তখন ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই ব্যক্তি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সেই করুণা থেকে বহিষ্কৃত হবে, যে করুণা তাঁর সকল বস্তুতে পরিব্যপ্ত এবং সেই জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে, যার পরিধি আকাশ-পৃথিবীর সমান।
কাল কেবল সেই ব্যক্তি সুরক্ষা পাবে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করেছে এবং সংযমের পথ অবলম্বন করেছে। অল্পকে বিস্তরের বিনিময়ে, নশ্বরকে অবিনশ্বরের বিনিময়ে এবং দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যের বিনিময়ে বিক্রয় করেছে।
তোমরা কি ভেবে দেখ না যে, তোমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত লোকেদের ঔরসে ছিলে। অতঃপর অবশিষ্টরা তার উত্তরাধিকারী হবে। পরিশেষে সকলেই সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী (আল্লাহর) প্রতি প্রত্যাবর্তিত হবে।
তোমরা প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর দিকে যাত্রীর (জানাযার) অনুগমন করছ। যে তার কর্তব্য পূর্ণরূপে সমাধা করেছে এবং নিজ নির্ধারিত সময়কাল অতিক্রম করেছে। সুতরাং তোমরা তাকে এমন এক মাটিতে রেখে আসছ, যেখানে না আছে বালিশ, আর না আছে বিছানা। যে হয়ে পড়েছে গত্যন্তরহীন। সঙ্গ ছেড়েছে বন্ধু-পরিজনদের। বসবাস শুরু করেছে মাটির ঘরে। সম্মুখীন হয়েছে হিসাবের। অমুখাপেক্ষী হয়েছে পার্থিব সম্পদের। মুখাপেক্ষী হয়েছে নেক আমলের।
সুতরাং হে আল্লাহর বান্দাগণ! মৃত্যু আসার পূর্বে এবং সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আল্লাহকে ভয় কর।
আর আমি তোমাদেরকে এ সব কথা বলছি, অথচ আমি অবশ্যই জানি যে, সবার চাইতে আমার পাপই বেশি। তাই আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা ও তওবা করছি।' (তফসীর ইবনে কাষীর ৩/৩১৬, তারীখে দিমাশ্ক ৪৫/১৭৩)
আবু আব্দুল্লাহ তিরমিযী হাকীম বলেছেন, 'নিশ্চয় মহান আল্লাহ সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন (আবেদ) দাসরূপে, যাতে তারা তাঁর (ইবাদত) দাসত্ব করে। সুতরাং তিনি তাঁর সেই ইবাদত ও দাসত্বের বিনিময় প্রদান করবেন এবং তা ত্যাগ করার শাস্তি দান করবেন। অতএব তারা যদি আজ তাঁর ইবাদত ও দাসত্ব করে, তাহলে তারা দুনিয়ার দাসত্ব থেকে মুক্ত সম্মানিত স্বাধীন দাস এবং পরকালে তারা রাজা। আর যদি তারা দাসত্ব করতে অস্বীকার করে, তাহলে তারা পালিয়ে যাওয়া নিকৃষ্ট ও হীন দাস এবং আগামী কাল জাহান্নামের আগুনের কারাগারে (আল্লাহর) দুশমন।' (তফসীর কুরতুবী ১২/১৫৬)
আরবী কবি বলেছেন,
ولو أنا إذا متنا تركنا لكان الموت غاية كل حي ولكنا إذا متنا بعثنا ونسأل عن كل شيء
অর্থাৎ, যদি মরণের পর আমাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হত, তাহলে মরণই প্রত্যেক জীবের জন্য আরামদায়ক হত।
কিন্তু মরণের পর আমাদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে এবং প্রত্যেক জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
মহানবী বলেছেন,
(( لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَومَ القِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ ؟ وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَ فَعَلَ فِيهِ ؟ وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ ؟ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ ؟ وَعَنْ جَسمِهِ فِيمَ أَبلاهُ ؟ )).
"কিয়ামতের দিন বান্দার পা দু'খানি সরবে না। (অর্থাৎ আল্লাহর দরবার থেকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।) যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হবে; তার আয়ু সম্পর্কে, সে তা কিসে ক্ষয় করেছে? তার ইল্ম (বিদ্যা) সম্পর্কে, সে তাতে কী আমল করেছে? তার মাল সম্পর্কে, কী উপায়ে তা উপার্জন করেছে এবং তা কোন্ পথে ব্যয় করেছে? আর তার দেহ সম্পর্কে, কোন্ কাজে সে তা ক্ষয় করেছে?” (তিরমিযী ২৪১৬, সহীহ তারগীব ১২ ১নং)
এই প্রশ্নগুলির উত্তর যদি মহান আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতভিত্তিক হয়, তাহলেই রেহাই। নচেৎ ফল যে ভালো হবে না, তা অতি সহজেই অনুমেয়।

📘 কেন এ জীবন 📄 একটি প্রচলিত ভুল সংশোধন

📄 একটি প্রচলিত ভুল সংশোধন


আমরা জানতে পারলাম, মহান আল্লাহ মুখাপেক্ষাহীন স্বয়ংসম্পূর্ণ বাদশা। তিনি নিজের ইবাদতের জন্য বিশ্ব-রচনা করেছেন, জ্বিন-ইনসান সৃষ্টি করেছেন, রসূল পাঠিয়েছেন, কিতাব অবতীর্ণ করেছেন ইত্যাদি।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون} (৫৬) سورة الذاريات অর্থাৎ, আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। (যারিয়াতঃ ৫৬)
তিনি রসূল প্রেরণের কারণ বর্ণনা করে বলেছেন, {رُّسُلاً مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا} سورة النساء অর্থাৎ, আমি সুসংবাদবাহী ও সতর্ককারী রসূল প্রেরণ করেছি; যাতে রসূল (আসার) পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আর আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী। (নিসাঃ ১৬৫)
নবুঅত অথবা সুসংবাদ দান ও ভীতি-প্রদর্শনের ধারাকে এই জন্যেই অব্যাহত রেখেছেন, যাতে শেষ বিচারের দিনে কেউ এ ওজর পেশ করতে না পারে যে, আমাদের নিকট তোমার কোন বার্তা পৌঁছেনি। যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَوْ أَنَّا أَهْلَكْنَاهُم بِعَذَابٍ مِّن قَبْلِهِ لَقَالُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَتَتَّبِعَ آيَاتِكَ مِن قَبْلِ أَن نَّذِلَّ وَنَخْزَى} (১৩৪) سورة طه অর্থাৎ, যদি আমি ওদেরকে তার পূর্বে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম তাহলে ওরা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের নিকট একজন রসূল প্রেরণ করলে না কেন? করলে আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার পূর্বেই তোমার নিদর্শন মেনে নিতাম। (ত্বা-হাঃ ১৩৪)
রসূল প্রেরণের কারণ বর্ণনা করে মহান আল্লাহ আরো বলেন, {كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ} (২১৩) سورة البقرة অর্থাৎ, মানুষ (আদিতে) একই জাতিভুক্ত ছিল। (পরে মানুষেরাই বিভেদ সৃষ্টি করে।) অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন; এবং মানুষের মধ্যে যে বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল, তার মীমাংসার জন্য তিনি তাদের সাথে সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেন। (বাক্বারাহঃ ২১৩)
{لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ} (٢٥)
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও তুলাদন্ড (ন্যায়-নীতি); যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। (হাদীদঃ ২৫)
কিন্তু কুরআনী বয়ানের বিপরীত বর্ণনা দিয়ে থাকে অতিরঞ্জনকারী হাদীস-নির্মাতারা। তারা বলে, 'ফুল বাগানে ফুটল নবীন ফুল। সে ফুল যদি না ফুটিত কিছুই পয়দা না হইত, না করিত আরশ-কুসী জলীল রব্বুল। ফুল বাগানে ফুটল নবীন ফুল।'
তারা বলে, 'শুধুমাত্র বরের জন্য যেমন বিয়ে-বাড়ির সমস্ত আয়োজন, তেমনি মুহাম্মাদ-এর জন্য এ বিশ্বের সকল আয়োজন।' তারা হাদীস বর্ণনা করে,
لوْلَاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ
অর্থাৎ, যদি তুমি না হতে, আমি আসমান-যমীন কিছুই সৃষ্টি করতাম না। অথচ এ মর্মে কোন হাদীস সহীহ নয়। (মাউযুআত ৭৮নং, সিঃ যয়ীফাহ ২৮-২নং, মুরশিদুল হায়ের ১০পৃঃ)

ফন্ট সাইজ
15px
17px