📄 অপর পক্ষের রূঢ় আচরণ অথবা তাদের থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যথাযোগ্য সম্মান প্রদান না করার ওপর ধৈর্যধারণ
আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا
"তোমরা রাসুলের আহ্বানকে তোমাদের একে অপরকে আহ্বানের মতো গণ্য করো না।" [সুরা নূর: ৬৩]
সাহাবায়ে কেরাম রাযি. বুঝেছিলেন যে, এখানে আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আহ্বান করা এবং তার সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মাঝেমধ্যে তাদের সাথে কথাবার্তা বলার সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অনিচ্ছাকৃত অভদ্র এবং রূঢ় আচরণের শিকার হতেন। তখন তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অনুচিত কথা বলত। আমরা দেখতে পেয়েছি, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থায় তাদের দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করেছেন এবং তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং প্রসিদ্ধ সাহাবি যিমাম ইবনে সা'লাবার মধ্যকার কথোপকথনের ঘটনা। যিনি রাসুলের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য মদিনা মুনাওয়ারায় এসেছিলেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসলামের রুকনসমূহ এবং ইবাদতসমূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, বকর ইবনে সা'দ গোত্রের লোকেরা যিমام ইবনে সা'লাবাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রেরণ করল। সে আমাদের কাছে আসল এবং তার উটকে মসজিদের দরজায় দাঁড় করিয়ে সেখানে বেঁধে রাখল। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেল। রাসুল তখন তার সাহাবিগণের সাথে মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন।
সে গিয়ে বলল, তোমাদের মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র কে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমিই আবদুল মুত্তালিবের পুত্র।
সে বলল, মুহাম্মাদ?
তিনি বললেন, হ্যাঁ।
সে বলল, হে মুহাম্মদ, নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব এবং প্রশ্ন করার ব্যাপারে আপনার সাথে কঠোরতা করব। আপনি কিন্তু আমার সাথে রাগ করতে পারবেন না। আর আমিও কোনো সংকোচবোধ করব না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপনার যেমন খুশি প্রশ্ন করুন।
সে বলল, আমি আপনাকে আপনার প্রভুর, আপনার পূর্ববর্তী লোকদের প্রভু এবং আপনার পরবর্তীতে বিদ্যমান লোকদের প্রভুর শপথ দিচ্ছি, সত্যিই কি আল্লাহ তাআলা আপনাকে আমাদের কাছে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই।
সে বলল, আমি আপনাকে আপনার প্রভুর, আপনার পূর্ববর্তী লোকদের প্রভু এবং আপনার পরবর্তীতে বিদ্যমান লোকদের প্রভুর শপথ দিচ্ছি, সত্যিই কি আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ দিয়েছেন, যেন আমরা তার উপাসনা করি, তার সাথে কাউকে শরিক না করি এবং আমাদের পিতৃপুরুষগণ যে সকল মূর্তির পূজা করত সেগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্ন করে ফেলি?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই।
এরপর সে ইসলামের ফরজসমূহ যেমন, নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ প্রভৃতি সম্পর্কে একটি একটি করে প্রশ্ন করতে লাগল এবং প্রতি প্রশ্নে আগের মতোই শপথ চালু রাখল। অবশেষে তার প্রশ্নের পালা শেষ হলে সে বলল, নিশ্চয়ই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহ তাআলার বান্দা এবং রাসুল। অবশ্যই আমি এই ফরজগুলো আদায় করব এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকব। এর থেকে বৃদ্ধিও করব না এবং কমতিও করব না।
এরপর সে তার উটের দিকে ফিরে গেল। সে চলে গেলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই দুই বেণীবিশিষ্ট লোক যদি সত্য বলে থাকে তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
📄 অপরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের মধ্যে ভালোবাসা এবং সম্প্রীতির চেতনা ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী ছিলেন এবং তিনি মুসলমানদেরকে এর প্রতি আদেশ দিয়েছেন।
আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটেই ছিলেন। তখন অপর এক ব্যক্তি তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল।
সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, নিশ্চয়ই আমি এই ব্যক্তিটিকে ভালোবাসি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি তাকে জানিয়েছ?
সে বলল, না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তাকে জানিয়ে দাও।
বর্ণনাকারী বলেন, তারপর লোকটি গিয়ে সেই লোকের সাথে সাক্ষাৎ করল এবং বলল, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।
লোকটি বলল, আমিও তোমাকে ভালোবাসি, যেভাবে তুমি আমাকে ভালোবাসো।
এ জন্যই আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও দেখেছি যে, তিনি কোনো কোনো সাহাবির উদ্দেশে তার এই ভালোবাসার ঘোষণা দিয়েছেন।
মু'আয ইবনে জাবাল রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরলেন এবং বললেন, হে মু'আয, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে ভালোবাসি।
তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমিও আপনাকে ভালোবাসি।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে প্রত্যেক নামাজে এই দুয়া করতে ভুলবে না—
رَبِّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَ شُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ “
হে প্রভু, আপনার জিকির, কৃতজ্ঞতা আদায় এবং উত্তম পন্থায় আপনার ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন。
এখানে দেখতে পেলাম যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু'আয রাযি.-কে ভালোবাসার কথা বলার পর তাকে এমন একটি নসিহত করলেন, যা আখেরাতে তার জন্য ফলপ্রসূ হবে। আর তাকে শিখিয়ে দিলেন জিকিরসমূহ হতে একটি জিকির。
টিকাঃ
৫৩ মুসনাদে আহমাদ, ২৩৮০, শু'আইব আল-আরনাউত হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। সুনানে দারেমি, হাদিস নং ৬৫২, হুসাইন সুলাইম আসাদ বলেছেন, হাদিসটি সহিহ। মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৪৩৮০, তিনি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যা দিয়েছেন, ইমাম যাহাবি তার সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। হায়সামি বলেন, ইমাম আহমদ এবং ইমাম তাবারানি মুজামুল কাবিরে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আহমদ রহ.-এর সনদের সকল বর্ণনাকারী বিশুদ্ধ। দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ২/১৬।
৫৪ আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১২৫। নাসায়ি, হাদিস নং ১০০১০। মুসনাদে আহমাদ-হাদিস নং ১২৪৫৩, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী হাদিসটি সহিহ।
৫৫ আবু দাউদ, হাদিস নং ১৫২২। নাসায়ি, হাদিস নং ১২২৬। মুসনাদে আহমাদ ২২১৭২, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, হাদিসের সনদ সহিহ।