📄 স্পষ্টতা এবং সংশয়হীনতা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন স্পষ্টভাষী। তিনি তার আকিদা-বিশ্বাস এবং যার মাধ্যমে ইসলামের বিজয় হয়—এমন বিষয় প্রকাশে কোনো সংশয় এবং দ্বিধাবোধ করতেন না।
আদি ইবনে হাতিম রাযি. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যথাসময়ে নবুয়ত প্রদান করা হলো। তখন আমি তার চেয়ে বেশি আর কাউকে অপছন্দ করতাম না।
এরপরের দিনগুলো খুব দ্রুতই কেটে গেল। মক্কা বিজয় হলো। হাওয়াযিন গোত্র ইসলাম গ্রহণ করল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাযিরায়ে আরবে স্থাপিত মূর্তিগুলো ধ্বংস করার জন্য বিভিন্ন দল প্রেরণ করলেন। তারা মানুষের মন ও মস্তিষ্কে প্রভাব বিস্তার করল। এ সমস্ত অভিযানসমূহের মধ্য হতে একটি ছিল আলি রাযি.-এর অভিযান। তাকে তাঈ গোত্রের ফালস মূর্তি ধ্বংসকল্পে প্রেরণ করা হয়েছিল। তাঈ গোত্র তার বিরুদ্ধে প্রবল মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যায়। এরপর তাদের একটি দল পালিয়ে যায়। আদি ইবনে হাতিম তার স্ত্রী এবং সন্তানসন্ততি নিয়ে তাদের মিত্র শাম দেশে পালিয়ে যান। কিন্তু তার বোন সাফফানা বিনতে হাতিম মুসলমানদের হাতে বন্দী হন।
এ সময়েই মদিনায় সাফফানা এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে কথোপকথন হয়। এ কথোপকথনটি থেকে স্পষ্ট ভাবে জানা গেছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুক্তিপণ ছাড়াই সাফফানার ওপর অনুগ্রহ করে তাকে ছেড়ে দিয়েছেন।
এরপর সাফফানা তার ভাইকে তিরস্কারের উদ্দেশ্যে শামের দিকে রওনা হন। তাকে গিয়ে বলেন, তিনি এমন এক কাজ করেছেন যা তোমার পিতাও করতেন না। তুমি তার প্রতি আগ্রহী হয়ে অথবা তার ভয়ে ভীত হয়ে তার কাছে যাও।
আদি ইবনে হাতিম রাযি. বলেন, এরপর আমার অবস্থানের জায়গাটিকে আমার কাছে অপছন্দনীয় মনে হতে লাগল, এমনকি আমি যাকে ঘৃণা করে এসেছি, তারচেয়েও বেশি অপছন্দ করলাম।
এরপর বললাম, আমি অবশ্যই এই লোকটির কাছে যাব। আল্লাহর শপথ, যদি তিনি সত্যবাদী হয়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই আমি তার কথা শুনব। আর যদি তিনি মিথ্যা বলেন তাহলে তা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
এরপর আদি মদিনায় আগমন করলেন। তিনি স্বীয় তাঈ গোত্রের একজন নেতা ছিলেন। তার পিতা হাতিম তাঈ দানশীলতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাই লোকেরা তার আগমনের কথা আলোচনা করতে লাগল। এরপর আদি ইবনে হাতিম রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে আসলেন। এমতাবস্থায় আদি ইবনে হাতিম রাযি.-এর গলায় রূপার ক্রুশ ছিল। এ দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেলাওয়াত করলেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ
“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের নেতৃবৃন্দ এবং যাজকদেরকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে।” [সুরা তাওবাহ: ৩১]
আদি ইবনে হাতিম রাযি. বলেন, আমি বললাম, তারা তাদের উপাসনা করেনি।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তা ঠিক আছে। তবে নেতৃবৃন্দ এবং যাজকরা তাদের (খ্রিষ্টানদের) ওপর হালালকে হারাম বানিয়েছে, হারামকে হালাল বানিয়েছে আর তারা তাদের অনুসরণ করেছে। এর মাধ্যমে তাদেরই উপাসনা করা হলো।”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বললেন, হে আদি, তোমার কী মত? আল্লাহকে সবচেয়ে বড় ঘোষণা করা থেকে কোন বস্তু তোমাকে বারণ করছে? তুমি কি আল্লাহর চেয়ে বড় কিছু সম্পর্কে জানো? তাহলে কী তোমাকে বাধা দিচ্ছে? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা থেকে কোন বস্তু তোমাকে ফিরিয়ে রাখছে? তাহলে তুমি কি আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো উপাস্য সম্পর্কে জানো?
এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে আদি ইবনে হাতিম, ইসলাম গ্রহণ করো, শান্তি লাভ করবে।” এভাবে তিনবার বললেন।
আমি বললাম, আমি অপর এক ধর্ম মেনে চলি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমার ধর্ম সম্পর্কে তোমার চেয়ে বেশি জানি।
আমি বললাম, কী আশ্চর্য, আপনি আমার ধর্ম সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জানেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তুমি কি রুকুসিয়্যাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে না? তুমি কি তোমার জাতির যুদ্ধলব্ধ অংশের এক চতুর্থাংশ আত্মসাৎ করোনি?
আমি বললাম, হ্যাঁ, তা করেছি।
তিনি বললেন, তোমার ধর্ম অনুযায়ী নিশ্চয়ই এটি বৈধ নয়।
আদি ইবনে হাতিম রাযি. বলেন, তিনি এ কথা বলার সাথে সাথেই আমি তার কাছে নতি স্বীকার করলাম।
তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি ভেবেছ, তোমাকে কোন বিষয়টি ইসলাম গ্রহণে বাধা দিচ্ছে, তা আমি জানি না? জানি তুমি বলবে যে, এ ধর্মের অনুসরণকারী সকলে হচ্ছে দুর্বল, যাদের কোনো শক্তি নেই। আর আরবরা তাদের কোণঠাসা করে রেখেছে।
তুমি কি হিরাত শহর চেনো?
আমি বললাম, দেখিনি, তবে সেই শহর সম্পর্কে শুনেছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহ তাআলা এই ধর্মকে এমন পরিপূর্ণ করবেন যে, হিরাত থেকে এক অভিযাত্রী মহিলা সফরের উদ্দেশ্যে বের হবে এবং কারও সাহচর্য ছাড়াই বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। আর অচিরেই আল্লাহ তাআলা কিসরা ইবনে হুরমুজের খনিসমূহ বিজিত করে দেবেন।
আমি বললাম, কিসরা ইবনে হুরমুজ!
তিনি বললেন, হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হুরমুজ। আর সম্পদের এতই প্রাচুর্য হবে যে কেউ তা গ্রহণ করতে চাইবে না।
পরবর্তী সময়ে আদি ইবনে হাতিম রাযি. বলেছেন, হিরাতের সেই অভিযাত্রী মহিলা কারও সাহচর্য ছাড়াই বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেছিল। আর যারা কিসরা ইবনে হুরমুজের খনিসমূহ বিজয় করেছে, আমি তাদের দলভুক্ত ছিলাম। সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, অচিরেই তৃতীয়টিও ঘটবে। কেননা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বলে দিয়েছেন।
পারস্য তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম একটি সাম্রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে আদি ইবনে হাতিম রাযি.-এর কাছে নির্দ্বিধায় ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়েছেন। কোনো কিছুই তাকে বাধা দিতে পারেনি। তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রত্যয়ী। অচিরেই যা ঘটবে, সে সম্পর্কে তিনি निःসংশয়ে বলে দিয়েছেন। কেননা তিনি প্রভুর প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে ছিলেন নিশ্চিন্ত।
টিকাঃ
৪৬ বুখারি, পরিচ্ছেদ: ইলম, অধ্যায়: জ্ঞানার্জনে লজ্জাবোধ করা, হাদিস নং ১৩১। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের হুকুম, অধ্যায়: মুমিনের দৃষ্টান্ত খেজুর গাছের ন্যায়, হাদিস নং ২৮১১।
৪৭ ইবনে আসাকির রচিত তারিখে দিমাশক, তাহকিক আমর ইবনে গারামাহ আল-আমরাওয়ি, দারুল ফিকর, ১৪১৫ হিজরি/১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ, ৪০/৭৪। ইবনুল আসির রচিত উসদুল গাবাহ, ৩/৫০৪। ইমাম যাহাবি রচিত তারিখুল ইসলাম-ওফাইয়াতুল মাশাহিরি ওয়াল আ'লাম, তাহকিক : উমর আবদুস সালাম আত-তাদামুরি, দারুল কিতাবিল আরবি-বৈরুত, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪১৩ হিজরি/১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ, ২/৬৮৮, ৫/১৮৩।
৪৮ মুসনাদে আহমাদে বর্ণনাটি সংক্ষিপ্ত আকারে আছে, হাদিস নং ১৯৪০০। সহিহ ইবনে হিব্বান ৭২০৬। হায়সামি বলেন, আহমদ রহ. এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, তার বর্ণনাকারীগণের প্রত্যেকেই সহিহের বর্ণনাকারী, তবে আব্বাদ ইবনে হুবাইশ ব্যতীত, তিনি একজন সাধারণ সিকাহ পর্যায়ের বর্ণনাকারী। দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ওয়া মামবাউল ফাওয়ায়েদ: ৫/৩৩৫।
৪৯ ইমাম তবারি রচিত তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ২/১৮৭। ইবনে কাসির রচিত আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ৪/১২৭। ইমাম যাহাবি রচিত তারিখুল ইসলাম, ২/৬৮৭।
৫০ মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৯৩৯৭। শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, এটি একটি হাসান পর্যায়ের সনদ। মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৮৫৮২, হাকিম বলেছেন, এই হাদিসটি শাইখাইনের শর্ত অনুযায়ী সহিহ, কিন্তু তারা বর্ণনা করেননি। সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৬৬৭৯। ইমাম বুখারি এ হাদিসের একটি অংশ বর্ণনা করেছেন, তা হচ্ছে আদিকে হিরাত এবং কাসরার খনি সম্পর্কে এবং সম্পদ ও সম্মানের প্রাচুর্যের সুসংবাদ সম্পর্কিত, অধ্যায়: নবুয়তের আলামত, হাদিস নং ৩৪০০।
৫১ তাফসিরে ইবনে কাসির, তাহকিক সামি ইবনে মুহাম্মদ সালামাহ, দারু তয়্যিবাহ, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪২০ হিজরি; ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ, ৪/১৩৫।
৫২ মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৮২৮৬, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, হাদিসটির কিছু অংশ সহিহ তথা বিশুদ্ধ, তবে এই সনদটি হাসান পর্যায়ের। ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৬৬৭৯।
📄 অপর পক্ষের রূঢ় আচরণ অথবা তাদের থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যথাযোগ্য সম্মান প্রদান না করার ওপর ধৈর্যধারণ
আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا
"তোমরা রাসুলের আহ্বানকে তোমাদের একে অপরকে আহ্বানের মতো গণ্য করো না।" [সুরা নূর: ৬৩]
সাহাবায়ে কেরাম রাযি. বুঝেছিলেন যে, এখানে আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আহ্বান করা এবং তার সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মাঝেমধ্যে তাদের সাথে কথাবার্তা বলার সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অনিচ্ছাকৃত অভদ্র এবং রূঢ় আচরণের শিকার হতেন। তখন তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অনুচিত কথা বলত। আমরা দেখতে পেয়েছি, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থায় তাদের দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করেছেন এবং তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং প্রসিদ্ধ সাহাবি যিমাম ইবনে সা'লাবার মধ্যকার কথোপকথনের ঘটনা। যিনি রাসুলের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য মদিনা মুনাওয়ারায় এসেছিলেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসলামের রুকনসমূহ এবং ইবাদতসমূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, বকর ইবনে সা'দ গোত্রের লোকেরা যিমام ইবনে সা'লাবাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রেরণ করল। সে আমাদের কাছে আসল এবং তার উটকে মসজিদের দরজায় দাঁড় করিয়ে সেখানে বেঁধে রাখল। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেল। রাসুল তখন তার সাহাবিগণের সাথে মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন।
সে গিয়ে বলল, তোমাদের মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র কে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমিই আবদুল মুত্তালিবের পুত্র।
সে বলল, মুহাম্মাদ?
তিনি বললেন, হ্যাঁ।
সে বলল, হে মুহাম্মদ, নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব এবং প্রশ্ন করার ব্যাপারে আপনার সাথে কঠোরতা করব। আপনি কিন্তু আমার সাথে রাগ করতে পারবেন না। আর আমিও কোনো সংকোচবোধ করব না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপনার যেমন খুশি প্রশ্ন করুন।
সে বলল, আমি আপনাকে আপনার প্রভুর, আপনার পূর্ববর্তী লোকদের প্রভু এবং আপনার পরবর্তীতে বিদ্যমান লোকদের প্রভুর শপথ দিচ্ছি, সত্যিই কি আল্লাহ তাআলা আপনাকে আমাদের কাছে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই।
সে বলল, আমি আপনাকে আপনার প্রভুর, আপনার পূর্ববর্তী লোকদের প্রভু এবং আপনার পরবর্তীতে বিদ্যমান লোকদের প্রভুর শপথ দিচ্ছি, সত্যিই কি আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ দিয়েছেন, যেন আমরা তার উপাসনা করি, তার সাথে কাউকে শরিক না করি এবং আমাদের পিতৃপুরুষগণ যে সকল মূর্তির পূজা করত সেগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্ন করে ফেলি?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই।
এরপর সে ইসলামের ফরজসমূহ যেমন, নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ প্রভৃতি সম্পর্কে একটি একটি করে প্রশ্ন করতে লাগল এবং প্রতি প্রশ্নে আগের মতোই শপথ চালু রাখল। অবশেষে তার প্রশ্নের পালা শেষ হলে সে বলল, নিশ্চয়ই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহ তাআলার বান্দা এবং রাসুল। অবশ্যই আমি এই ফরজগুলো আদায় করব এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকব। এর থেকে বৃদ্ধিও করব না এবং কমতিও করব না।
এরপর সে তার উটের দিকে ফিরে গেল। সে চলে গেলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই দুই বেণীবিশিষ্ট লোক যদি সত্য বলে থাকে তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
📄 অপরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের মধ্যে ভালোবাসা এবং সম্প্রীতির চেতনা ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী ছিলেন এবং তিনি মুসলমানদেরকে এর প্রতি আদেশ দিয়েছেন।
আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটেই ছিলেন। তখন অপর এক ব্যক্তি তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল।
সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, নিশ্চয়ই আমি এই ব্যক্তিটিকে ভালোবাসি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি তাকে জানিয়েছ?
সে বলল, না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তাকে জানিয়ে দাও।
বর্ণনাকারী বলেন, তারপর লোকটি গিয়ে সেই লোকের সাথে সাক্ষাৎ করল এবং বলল, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।
লোকটি বলল, আমিও তোমাকে ভালোবাসি, যেভাবে তুমি আমাকে ভালোবাসো।
এ জন্যই আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও দেখেছি যে, তিনি কোনো কোনো সাহাবির উদ্দেশে তার এই ভালোবাসার ঘোষণা দিয়েছেন।
মু'আয ইবনে জাবাল রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরলেন এবং বললেন, হে মু'আয, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে ভালোবাসি।
তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমিও আপনাকে ভালোবাসি।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে প্রত্যেক নামাজে এই দুয়া করতে ভুলবে না—
رَبِّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَ شُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ “
হে প্রভু, আপনার জিকির, কৃতজ্ঞতা আদায় এবং উত্তম পন্থায় আপনার ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন。
এখানে দেখতে পেলাম যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু'আয রাযি.-কে ভালোবাসার কথা বলার পর তাকে এমন একটি নসিহত করলেন, যা আখেরাতে তার জন্য ফলপ্রসূ হবে। আর তাকে শিখিয়ে দিলেন জিকিরসমূহ হতে একটি জিকির。
টিকাঃ
৫৩ মুসনাদে আহমাদ, ২৩৮০, শু'আইব আল-আরনাউত হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। সুনানে দারেমি, হাদিস নং ৬৫২, হুসাইন সুলাইম আসাদ বলেছেন, হাদিসটি সহিহ। মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৪৩৮০, তিনি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যা দিয়েছেন, ইমাম যাহাবি তার সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। হায়সামি বলেন, ইমাম আহমদ এবং ইমাম তাবারানি মুজামুল কাবিরে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আহমদ রহ.-এর সনদের সকল বর্ণনাকারী বিশুদ্ধ। দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ২/১৬।
৫৪ আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১২৫। নাসায়ি, হাদিস নং ১০০১০। মুসনাদে আহমাদ-হাদিস নং ১২৪৫৩, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী হাদিসটি সহিহ।
৫৫ আবু দাউদ, হাদিস নং ১৫২২। নাসায়ি, হাদিস নং ১২২৬। মুসনাদে আহমাদ ২২১৭২, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, হাদিসের সনদ সহিহ।