📄 অপর পক্ষ হতে তুচ্ছ কোনো ভুল প্রকাশ পেলে দ্রুততার সাথে মৃদু তিরস্কার করে শুধরে দেওয়া
আবু সাইদ ইবনে মুয়াল্লা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করা অবস্থায় তাকে ডাক দিলেন। তখন তিনি নামাজ পড়ছিলেন।
তিনি বলেন, নামাজ পড়া শেষ করে আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলাম।
তিনি বললেন, কোন বস্তু সাথে সাথে আমার কাছে আসা থেকে তোমাকে বিরত রাখল?
আবু সাইদ বললেন, আমি নামাজ পড়ছিলাম।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা কি বলেননি-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ
“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদেরকে এমন কাজের প্রতি আহ্বান করেন, যা তোমাদের প্রাণ সঞ্চার করবে।" [সুরা আনফাল: ২৪]
অবশ্যই মসজিদ থেকে বের হওয়ার পূর্বে আমি তোমাকে কুরআনের সবচেয়ে মহান সুরাটি শেখাব।
তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কথাই শিরোধার্য।
তিনি বললেন, “الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ” তথা সুরা ফাতিহা হচ্ছে সেই আস-সাবউল মাসানি (অর্থাৎ বারংবার পঠিত সাতটি আয়াত) এবং মহান কুরআন, যা শুধু আমাকেই দান করা হয়েছে।
এখানে দেখতে পেলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার একজন সাহাবিকে ডাক দিয়েছেন। কিন্তু সাহাবি অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আর সাহাবি জানতেন যে, শরিয়ত অসমর্থিত কোনো কারণে নামাজের মধ্যে কথা বলা এবং নামাজের বাইরে যাওয়া তার জন্য বৈধ হবে না। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নের ভঙ্গিমায় কোমলভাবে তাকে তিরস্কৃত করে বললেন, কোন বস্তু তোমাকে আমার কাছে আসা থেকে বিরত রাখল? এর বেশি কিছু বললেন না। তিনি তাকে শিখিয়ে দিলেন যে, আল্লাহর রাসুলের ডাকে তার সাড়া দেওয়া উচিত, যদিও তিনি নামাজের মধ্যে থাকেন। এটি শরয়ি হুকুম থেকে পৃথক।
টিকাঃ
৩৯ বুখারি, পরিচ্ছেদ: তাফসির, অধ্যায়: সুরায়ে ফাতিহা, হাদিস নং ৪২০৪। আবু দাউদ, হাদিস নং ১৪৫৮।
📄 সত্যের প্রতি জোর দেওয়া
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বজনবিদিত কোমলতা এবং দয়া কোনোভাবেই সত্যের প্রতি তার দুর্বলতা এবং শিথিলতা বোঝাত না। তিনি সত্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। এতে কোনো প্রকার ছাড় দিতেন না এবং শিথিলতা করতেন না। এমনকি তার নিকটাত্মীয় এবং প্রিয় ব্যক্তিগণের ব্যাপারে হলেও তিনি এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিতেন না।
আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, মাখযুমি গোত্রের যে মহিলাটি চুরি করেছিল, তার বিষয়টি কুরাইশদের চিন্তিত করে তুলল। তারা বলল, ওই মহিলার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কে কথা বলতে যাবে? তখন সবাই বলল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়ভাজন উসামা ইবনে যায়েদ রাযি. ব্যতীত আর কেউ এ দুঃসাহস করতে পারবে না। তাই উসামা রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বললেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি আল্লাহ তাআলার হদ তথা বিচারের ব্যাপারে সুপারিশ করছ?
তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বলতে লাগলেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ জন্যই ধ্বংস হয়েছে যে, যখন তাদের মধ্যে অভিজাত কেউ চুরি করত তখন তারা ক্ষমা করে দিত। আর তাদের মধ্য হতে দুর্বল কেউ চুরি করলে তার বিচার করত। আল্লাহর শপথ, যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করত তাহলে আমি তার হাত কর্তন করতাম।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগেও অপর এক ঘটনায় এই একই সাহাবির সাথে কঠোর আচরণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে উসামা ইবনে যায়েদ রাযি. হতে বর্ণিত আছে, এ হাদিসটি ইবনে আবি শায়বা থেকে বর্ণিত হয়েছে।
উসামা রাযি. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এক যুদ্ধে পাঠালেন। আমরা প্রত্যুষে জুহাইনা গোত্রের শাখা গোত্র আল-হুরাকার ওপর আক্রমণ করলাম। এ সময় আমি একজন লোককে ধরে ফেললাম, সে বলে উঠল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তবুও আমি তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করলাম। কিন্তু এ ঘটনার জন্য আমার মনে সংশয়ের উদ্রেক হলো। তাই আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সেই ঘটনা উল্লেখ করলাম।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লোকটি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে আর তুমি তাকে হত্যা করে ফেলেছ?
তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, সে তো অস্ত্রের আঘাতের ভয়ে এ কথা বলেছে!
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার হৃদয় চিড়ে দেখতে পারলে না? তাহলে জেনে যেতে, সে সত্যি সত্যিই বলেছে কি না।
তিনি বারবার আমার কাছে এ কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। এমনকি আমি মনে মনে অনুশোচনা করতে লাগলাম, হায়, আমি যদি আজই ইসলাম গ্রহণ করতাম!
বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি. বললেন, আল্লাহর কসম, আমি কখনো কোনো মুসলিমকে এভাবে হত্যা করব না, যেভাবে এই ভুঁড়িওয়ালা অর্থাৎ উসামা হত্যা করেছে।
বর্ণনাকারী বলেন, তখন এক ব্যক্তি বলে উঠল, আল্লাহ তাআলা কি এ কথা বলেননি যে-
وَقْتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ ﴾
“তোমরা তাদের সাথে লড়াই করো যতক্ষণ পর্যন্ত ফিতনা দূরীভূত না হয় এবং দ্বীন সম্পূর্ণ আল্লাহর জন্য না হয়।" [সুরা আনফাল: ৩৯]
জবাবে সাদ রাযি. বললেন, আমরা লড়াই করেছি যাতে করে ফিতনা দূরীভূত হয়, কিন্তু তুমি এবং তোমার সাথিরা লড়াই করেছ যাতে করে ফিতনা সৃষ্টি হয়।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এ দুটি ঘটনা একই সাহাবির সাথে ঘটেছে। তিনি হলেন, উসামা ইবনে যায়েদ রাযি.। হয়তো এতে আল্লাহ তাআলারই কোনো উদ্দেশ্য ছিল। কেননা, উসামা রাযি. হিব্ব ইবনুল হিব্ব অর্থাৎ প্রিয়র ছেলে প্রিয় নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি নিজে ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন প্রিয় পাত্র এবং ছিলেন আরেক প্রিয় পাত্র সম্মানিত সাহাবি যায়েদ বিন হারেসা রাযি.-এর পুত্র। যিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আজাদকৃত গোলাম ছিলেন। পিতার সাথে গিয়ে স্বাধীন হওয়ার তুলনায় যিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোলাম হিসেবে থাকাকেই পছন্দ করেছিলেন। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আজাদ করে দিয়েছিলেন এবং কুরাইশের সামনে তাকে নিজের পুত্র বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর কুরআনে পালকপুত্রকে নিজের পুত্র হিসেবে অভিহিত করাকে নিষেধ করা হয়। যায়েদের এ অবস্থান তার পুত্র উসামার কাছে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। আর শুধু তার সাথেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কঠোরতার চিত্র দেখতে পাওয়া গভীর একটি অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে। এতে করে বোঝা যায় যে, ইসলাম কোনো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব অবলম্বন করে না এবং এতে কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করে না। চাই তা প্রসিদ্ধ এবং বিরাট কোনো ব্যক্তিত্বের সাথেই হোক না কেন।
টিকাঃ
৪০ বুখারি, পরিচ্ছেদ: নবীগণ, অধ্যায় : أَمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَبَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ﴿ ]সুরা কাহাফ : ৯[ হাদিস নং ৩২৮৮। মুসলিম, পরিচ্ছেদ : হদ-সংক্রান্ত, অধ্যায় : অভিজাত এবং অন্যান্য চোরের হাত কাটা এবং হদ-সংক্রান্ত বিষয়ে সুপারিশ করা থেকে নিষেধ করা, হাদিস নং: ১৬৮৮ ।
৪১ বুখারি, পরিচ্ছেদ: মাগাযি (যুদ্ধাভিযানসমূহ), অধ্যায়: উসামা রাযি.-কে জুহাইনা গোত্রের আল-হুরাকায় প্রেরণ, হাদিস নং ৪০২১। মুসলিম, পরিচ্ছেদ : ঈমান, অধ্যায়: কাফের কর্তৃক লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পর তাকে হত্যা করা হারাম হওয়া, হাদিস নং ৯৬। হাদিসটি তার বর্ণনা থেকেই চয়িত।
📄 গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করা এবং অনর্থক বিষয়ে প্রবেশ না করা
কখনো কখনো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কোনো মুসলিম আসত। সে এসে এমন প্রশ্ন করত, যা তার বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন যে, এগুলো গুরুত্বপূর্ণ কিছুই নয়। কখনো কখনো গুরুত্বহীন বিষয়েও তারা প্রশ্ন করে বসত। প্রশ্নকারী তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যেত এবং সে সম্পর্কে প্রশ্ন না করে অন্য ব্যাপারে প্রশ্ন করত। এমতাবস্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই ব্যক্তির জন্য গুরুত্ববহ হয় এমন বিষয়ের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করতেন এবং তার অনর্থক প্রশ্নের জবাব দেওয়া হতে বিরত থাকতেন। আনাস রাযি. হতে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রশ্ন করলেন, কিয়ামত কবে হবে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?
লোকটি বলল, কিছুই না, তবে আমি আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভালোবাসি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যাকে ভালোবাসো কিয়ামতের দিন তার সাথেই থাকবে।
আনাস রাযি. বলেন, “তুমি যাকে ভালোবাসো কিয়ামতের দিন তার সাথেই থাকবে"-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথায় আমরা যতটা আনন্দিত হলাম, এর আগে কখনো এমন আনন্দিত হইনি।
কিয়ামতের প্রতিশ্রুত সময় হচ্ছে এমন গোপনীয় বিষয়, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ব্যতীত আর কেউ জানে না। তাই এ ব্যাপারে প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই। তবে একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, কিয়ামতের দিনে হিসাবে উত্তীর্ণ হতে যা যা করা প্রয়োজন, তা নিয়ে ব্যস্ত থাকা।
অপর এক কথোপকথনে আমরা দেখতে পাই, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেক সাহাবিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করিয়ে দিয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সাহাবি এবং সমস্ত জাতিকে আমানতের খেয়ানত করা থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন।
আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মজলিশে উপস্থিত লোকদের সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় এক বেদুইন ব্যক্তির আগমন ঘটে। সে জিজ্ঞেস করে-কিয়ামত কবে হবে? কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জবাব না দিয়ে কথা চালিয়ে যেতে থাকেন। তখন উপস্থিত লোকদের মধ্য হতে কেউ কেউ বলল, রাসুল তার কথা শুনেছেন এবং অপছন্দ করেছেন। আবার কেউ বলল, রাসুল তার কথা শুনতেই পাননি। অবশেষে তাদের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলাপ শেষ হলো。
এবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী লোকটি কোথায়?
লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, এই তো আমি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন আমানতের খেয়ানত করা হবে তখন তুমি কিয়ামতের অপেক্ষা করতে পারো।
লোকটি বলল, খেয়ানত কীভাবে হবে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন কোনো কাজ অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে সমর্পণ করা হবে তখন তুমি কিয়ামতের অপেক্ষা করবে。
টিকাঃ
৪২ বুখারি, পরিচ্ছেদ সাহাবাগণের মর্যাদা, অধ্যায়: উমর ইবনুল খাত্তাব আবি হাফস আল-কুরাশি আল-আদাওয়ির ত্যাগ-তিতিক্ষা, হাদিস নং ৩৪৮৫। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তা রক্ষা এবং শিষ্টাচার, অধ্যায়: মানুষ যাকে ভালোবাসে কিয়ামতের দিন তার সাথেই থাকবে, হাদিস নং ২৬৩৯।
📄 বিরক্তি দূরীকরণ এবং দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতি আগ্রহী হওয়া
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে কথোপকথনকারীর দৃষ্টি আকর্ষণের উপায়গুলো গ্রহণ করতেন; যেন কথাগুলো তার আত্মায়, হৃদয়ে এবং মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। মু'আয ইবনে জাবাল রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একবার আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনেই ছিলাম। বাহনের পশ্চাৎভাগ ব্যতীত তার মাঝে আর আমার মাঝে অন্য কোনো দূরত্ব ছিল না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মু'আয ইবনে জাবাল।
আমি বললাম, আমি উপস্থিত, হে আল্লাহর রাসুল।
তারপর কিছুক্ষণ পথ চললেন। আবার বললেন, হে মু'আয ইবনে জাবাল।
আমি বললাম, আমি উপস্থিত, হে আল্লাহর রাসুল।
এরপর আরও কিছুক্ষণ পথ চলার পর আবারও ডাকলেন, হে মু'আয ইবনে জাবাল।
আমি বললাম, আমি উপস্থিত, হে আল্লাহর রাসুল।
তিনি এবার বললেন, তুমি কি জানো বান্দার ওপর আল্লাহ তাআলার কী অধিকার?
তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসুলই ভালো জানেন।
তিনি বললেন, নিশ্চয়ই বান্দার ওপর আল্লাহ তাআলার অধিকার হচ্ছে, বান্দারা তার ইবাদত করবে এবং তার সাথে অন্য কোনো বস্তুকে শরিক করবে না।
এরপর কিছুক্ষণ পথ চললেন। তারপর ডাকলেন, হে মু'আয ইবনে জাবাল।
আমি বললাম, আমি উপস্থিত, হে আল্লাহর রাসুল।
তিনি বললেন, বান্দারা যদি আল্লাহর ইবাদত করে তাহলে আল্লাহ তাআলার ওপর তাদের কী অধিকার জানো?
তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসুলই ভালো জানেন।
তিনি বললেন, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না।
এমনিভাবে আবদুর রহমান ইবনে আবি বকরার সূত্রে তার পিতা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদিনের কথা, সেদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উটের ওপর বসলেন এবং এক ব্যক্তি লাগাম টেনে ধরল।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি জানো, আজ কোন দিন?
তারা বলল, আল্লাহ এবং তার রাসulই ভালো জানেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম, তিনি হয়তো এ দিনের অন্য কোনো নাম দেবেন।
তিনি বললেন, এটা কি নাহর তথা কুরবানির দিন নয়?
আমরা বললাম, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসul।
তিনি এবার বললেন, এটা কোন মাস?
আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসulই ভালো জানেন।
তিনি বললেন, এটা কি জিলহজ মাস নয়?
আমরা বললাম, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসul।
তারপর বললেন, এটা কোন শহর?
আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসulই ভালো জানেন।
বর্ণনাকারী বলেন, এমনকি আমরা মনে করলাম যে, রাসul সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাম পাল্টে রাখবেন।
তিনি বললেন, এটা কি পবিত্র মক্কা নগরী নয়?
আমরা বললাম, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসul।
তিনি বললেন, আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই স্থান যেমন পবিত্র, তেমনিভাবে তোমাদের রক্ত, সম্পদ এবং সম্ভ্রমও তোমাদের জন্য পবিত্র। তাই উপস্থিত ব্যক্তিরা যেন অনুপস্থিতকে জানিয়ে দেয়।
কখনো কখনো রাসul সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মস্তিষ্ককে উর্বর করার জন্য এই পদ্ধতি গ্রহণ করতেন এবং তার সাথে কথোপকথনকারীকে অনেক ভাবাতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. হতে বর্ণিত আছে,
একবার রাসul সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই বৃক্ষসমূহ হতে এমন একটি বৃক্ষ আছে যার পাতা কখনো পতিত হয় না, মুসলমানের দৃষ্টান্ত হচ্ছে সেই বৃক্ষের মতো। এবার আমাকে বলো সেই গাছ কোনটি?
লোকেরা বন-জঙ্গলের গাছের কথা বলতে লাগল। আমি ভাবলাম যে, সেটি হচ্ছে খেজুর গাছ।
আবদুল্লাহ বলেন, কিন্তু আমি উত্তর বলতে সংকোচবোধ করলাম।
সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসul, আমাদেরকে সে সম্পর্কে জানিয়ে দিন।
রাসul সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হচ্ছে খেজুর গাছ।
আবদুল্লাহ রাযি. বলেন, আমি আমার পিতাকে আমার এ ভাবনা সম্পর্কে জানালাম। তখন তিনি বললেন, এত এত চিন্তার বদলে তুমি যদি উত্তর দিয়ে দিতে তাহলে সেটাই আমার জন্য প্রিয় হতো。
টিকাঃ
৪৩ বুখারি, পরিচ্ছেদ: ইলম তথা জ্ঞান, অধ্যায়: কোনো ব্যক্তিকে অন্য বিষয়ে কথা বলার সময়ে প্রশ্ন করা হলে সে ব্যক্তি কথা শেষ করে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্পর্কিত, হাদিস নং ৫৯। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮৭১৪, সুনানুল কুবরা-বায়হাকি, হাদিস নং ২০১৫০।
৪৪ বুখারি, পরিচ্ছেদ: পোশাক, অধ্যায় এক ব্যক্তির পেছনে আরেকজনকে বসানো, হাদিস নং ৫৬২২। মুসলিম, পরিচ্ছেদ ঈমান, অধ্যায়: যে ব্যক্তি তাওহিদের ওপর থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে সে যে নিশ্চিত রূপে জান্নাতে যাবে তার প্রমাণ, হাদিস নং ৩০, হাদিসের বাক্য তার বর্ণনা থেকেই চয়িত।
৪৫ বুখারি, পরিচ্ছেদ: হজ, অধ্যায় : মিনার দিনের খুতবা, হাদিস নং ১৬৫৪। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: কাসামাহ, যোদ্ধা, কিসাস এবং রক্তপণ-সংক্রান্ত, অধ্যায়: রক্ত, সম্ভ্রম এবং সম্পদ হারাম হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ, হাদিস নং ১৬৭৯। হাদিসের বাক্য তার বর্ণনা থেকেই চয়িত।