📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 কারও সাধারণ ভুল-ত্রুটি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা

📄 কারও সাধারণ ভুল-ত্রুটি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা


মানুষ অন্যের সাথে কথা বলতে গেলে সাধারণত যা ঘটে তা হচ্ছে, কেউ যদি অনিচ্ছাকৃত সাধারণ কোনো ভুল-ত্রুটি করে ফেলে তাহলে তারা তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুরু করে। এটি একটি গর্হিত কাজ। চাই সে ভুল কোনো জ্ঞানী লোক অথবা কোনো সরল লোক থেকে প্রকাশ পাক, তা নিয়ে ঠাট্টা করা যাবে না। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা আমাদেরকে অন্যের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ
“হে মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিনী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে।” [সুরা হুজুরাত : ১১]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করায় কখনোই আগ্রহী ছিলেন না। যেমন ওই বেদুইনের কথাই ধরুন, যে মসজিদে এসে প্রস্রাব করে দিয়েছিল, তার সাথে রাসুল কী আচরণ করেছিলেন?
এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
এক বেদুইন ব্যক্তি মসজিদে আসল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন। তারপর লোকটি নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষ করে সে দুয়া করল, হে আল্লাহ, আপনি শুধু আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দয়া করুন। আমাদের সাথে আর কারও প্রতি দয়া করবেন না।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো প্রশস্ত রহমতকে সংকীর্ণ করে দিলে।
এর অব্যবহিত পর লোকটি মসজিদের অভ্যন্তরে প্রস্রাব করে দিলো। লোকেরা দৌড়ে তার দিকে ছুটে এলো।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার ওপর এক মশক পানি ঢেলে দাও অথবা বলেছেন, এক বালতি পানি ঢেলে দাও।
তারপর আবার বললেন, নিশ্চয়ই তোমাদেরকে পাঠানো হয়েছে সহজ পন্থা বা কোমলতা প্রদর্শন করার জন্য; কঠিনতা বা কঠোরতা করার জন্য নয়।
এখানে বেদুইন ব্যক্তির দুইটি ভুল হয়েছে। প্রথম ভুলটি হয়েছে দুয়া করতে গিয়ে। কারণ, সে বাকি মুসলমানদের বাদ দিয়ে শুধু তার জন্য এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য রহমতের প্রার্থনা করেছে। আর দ্বিতীয় ভুলটি হচ্ছে, সে মসজিদে প্রস্রাব করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শুধু বলেছেন, “তুমি তো প্রশস্ত রহমতকে সংকীর্ণ করে ফেললে।” অর্থাৎ আল্লাহর রহমতের পরিধি আরও অনেক বড়। মাত্র দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে তুমি তা সংকীর্ণ করতে চাচ্ছ! আর দ্বিতীয় ভুলের সময় তার প্রস্রাব-আক্রান্ত স্থান ধৌত করতে বলেই ক্ষান্ত হয়েছেন। মুসলিম শরিফে উল্লেখিত অপর এক সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বেদুইন ব্যক্তিটিকে ডেকে বললেন, নিশ্চয়ই মসজিদ এমন প্রস্রাব ও নোংরা বস্তুর জন্য নয়। নিশ্চয়ই মসজিদ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার জিকির, নামাজ এবং কুরআন তেলাওয়াত করার জন্য।
এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো ধরনের ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেননি।

টিকাঃ
৩৪ তিরমিযি, হাদিস নং ১৪৭। আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৮০। মুসনাদে আহমাদ ৭২৫৪, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি শাইখাইনের শর্ত অনুযায়ী সহিহ। আলবানি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যা দিয়েছেন। দেখুন, সুনানে আবি দাউদ, মুওয়াসসাসাতু গারাস- কুয়েত, প্রথম সংস্করণ, ১৪২৩ হিজরি/২০০২ খ্রিষ্টাব্দ, ২/২২৯।
৩৫ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: পবিত্রতা, অধ্যায়: মসজিদ অথবা অন্যান্য স্থানে প্রস্রাব ও অন্যান্য নাপাকি পাওয়া গেলে তা ধৌত করা আবশ্যক হওয়া, হাদিস নং ২৮৫।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 মিথ্যাচার এবং তোষামোদ বর্জিত প্রশংসা

📄 মিথ্যাচার এবং তোষামোদ বর্জিত প্রশংসা


আমরা জানি যে, যারা সম্পদের লোভে অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে লোকদের মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করে তাদের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বোঝাপড়া রয়েছে।
হাম্মাম ইবনে হারেস থেকে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি উসমান রাযি.-এর প্রশংসা করতে শুরু করলে মিকদাদ রাযি. তার গর্দান চেপে ধরেন। মিকদাদ রাযি. ছিলেন বেশ স্বাস্থ্যবান লোক। তাই তিনি লোকটির চেহারা মাটির সাথে মিশাতে থাকেন। এ অবস্থা দেখে উসমান রাযি. তাকে বললেন, তোমার কী হয়েছে?
তিনি বললেন, নিশ্চয়ই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমরা তোষামুদে প্রশংসাকারীদের দেখতে পাবে তখন তাদের চেহারায় মাটি নিক্ষেপ করবে।
এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এসে অপর এক ব্যক্তির প্রশংসা করল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি ধ্বংস হও, তুমি তো তোমার সাথির গর্দান কর্তন করে ফেললে। এ কথা তিনি কয়েকবার বললেন।
তারপর বললেন, তোমাদের মধ্য হতে কেউ যদি তার অপর ভাইয়ের প্রশংসা করতে চায় তাহলে অবশ্যই সে যেন এ কথা বলে, আমি অমুকের ব্যাপারে এমন ধারণা রাখি। আল্লাহই তার ব্যাপারে ভালো জানেন। আমি আল্লাহর ওপর কাউকে পূত-পবিত্র মনে করি না। যদি আল্লাহ তাআলা জানেন তবেই আমি ওই ব্যক্তির ব্যাপারে এরূপ ধারণা রাখি।
এ দিকে লক্ষ করে প্রশংসা যাতে বৈধ হয়, সে জন্য তাতে কিছু শর্তারোপ করা উচিত। যেমন,
১. প্রশংসা বাস্তবধর্মী হওয়া। তাতে মিথ্যা এবং বাড়াবাড়ির আশ্রয় না নেওয়া।
২. তাতে কোনো লৌকিকতা এবং প্রশংসিত ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো প্রকার নির্দিষ্ট উপকার লাভের চেষ্টা না থাকা।
৩. প্রশংসিত ব্যক্তির তাকওয়া তথা খোদাভীতি সম্বন্ধে জ্ঞান থাকা, যাতে সে বিভ্রান্ত না হয়ে পড়ে।
উবাই ইবনে কা'ব রাযি.-এর সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমনটিই ঘটেছে। উবাই ইবনে কা'ব রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবু মুনযির, তুমি কি জানো, তোমার সাথে থাকা আল্লাহ তাআলার কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে বড়?
তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসুল ভালো জানেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, হে আবু মুনযির, তুমি কি জানো, তোমার সাথে থাকা আল্লাহ তাআলার কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে বড়?
তিনি বলেন, এবার আমি বললাম, “اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ অর্থাৎ আয়াতুল কুরসি।
উবাই ইবনে কা'ব রাযি. বলেন, তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে চাপড় দিয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ, হে আবু মুনযির, ইলমের জন্য তোমাকে অভিনন্দন।
এখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবনে কা'ব রাযি.-এর যথার্থ প্রশংসা করেছেন। আর তিনি জানতেন যে, উবাই ইবনে কা'ব রাযি. তার প্রশংসায় অহংকার প্রদর্শন করবেন না। এ জন্য তিনি তার প্রশংসায় কোনো দ্বিধাবোধ করেননি। এতে করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বোধশক্তি এবং তার সহচরগণের প্রতি সম্মান প্রদানের কথা বোঝা যায়।

টিকাঃ
৩৬ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: যুহদ এবং দুনিয়ার ব্যাপারে আকর্ষণহীনতা, অধ্যায়: অতিরিক্ত প্রশংসা এবং প্রশংসিত ব্যক্তির ফেতনায় পড়ার আশঙ্কা হলে প্রশংসা হতে নিষেধ করা সম্পর্কিত, হাদিস নং ৩০০২। আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৮০৪। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৫৬৮৪।
৩৭ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: যুহদ এবং দুনিয়ার ব্যাপারে আকর্ষণহীনতা, অধ্যায়: অতিরিক্ত প্রশংসা এবং প্রশংসিত ব্যক্তির ফেতনায় পড়ার আশঙ্কা হলে প্রশংসা হতে নিষেধ করা সম্পর্কিত, হাদিস নং ৩০০০।
৩৮ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: মুসাফিরের নামাজ এবং কসর করা, অধ্যায়: সুরায়ে কাহাফ এবং আয়াতুল কুরসির ফজিলত।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 অপর পক্ষ হতে তুচ্ছ কোনো ভুল প্রকাশ পেলে দ্রুততার সাথে মৃদু তিরস্কার করে শুধরে দেওয়া

📄 অপর পক্ষ হতে তুচ্ছ কোনো ভুল প্রকাশ পেলে দ্রুততার সাথে মৃদু তিরস্কার করে শুধরে দেওয়া


আবু সাইদ ইবনে মুয়াল্লা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করা অবস্থায় তাকে ডাক দিলেন। তখন তিনি নামাজ পড়ছিলেন।
তিনি বলেন, নামাজ পড়া শেষ করে আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলাম।
তিনি বললেন, কোন বস্তু সাথে সাথে আমার কাছে আসা থেকে তোমাকে বিরত রাখল?
আবু সাইদ বললেন, আমি নামাজ পড়ছিলাম।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা কি বলেননি-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ
“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদেরকে এমন কাজের প্রতি আহ্বান করেন, যা তোমাদের প্রাণ সঞ্চার করবে।" [সুরা আনফাল: ২৪]
অবশ্যই মসজিদ থেকে বের হওয়ার পূর্বে আমি তোমাকে কুরআনের সবচেয়ে মহান সুরাটি শেখাব।
তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কথাই শিরোধার্য।
তিনি বললেন, “الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ” তথা সুরা ফাতিহা হচ্ছে সেই আস-সাবউল মাসানি (অর্থাৎ বারংবার পঠিত সাতটি আয়াত) এবং মহান কুরআন, যা শুধু আমাকেই দান করা হয়েছে।
এখানে দেখতে পেলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার একজন সাহাবিকে ডাক দিয়েছেন। কিন্তু সাহাবি অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আর সাহাবি জানতেন যে, শরিয়ত অসমর্থিত কোনো কারণে নামাজের মধ্যে কথা বলা এবং নামাজের বাইরে যাওয়া তার জন্য বৈধ হবে না। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নের ভঙ্গিমায় কোমলভাবে তাকে তিরস্কৃত করে বললেন, কোন বস্তু তোমাকে আমার কাছে আসা থেকে বিরত রাখল? এর বেশি কিছু বললেন না। তিনি তাকে শিখিয়ে দিলেন যে, আল্লাহর রাসুলের ডাকে তার সাড়া দেওয়া উচিত, যদিও তিনি নামাজের মধ্যে থাকেন। এটি শরয়ি হুকুম থেকে পৃথক।

টিকাঃ
৩৯ বুখারি, পরিচ্ছেদ: তাফসির, অধ্যায়: সুরায়ে ফাতিহা, হাদিস নং ৪২০৪। আবু দাউদ, হাদিস নং ১৪৫৮।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 সত্যের প্রতি জোর দেওয়া

📄 সত্যের প্রতি জোর দেওয়া


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বজনবিদিত কোমলতা এবং দয়া কোনোভাবেই সত্যের প্রতি তার দুর্বলতা এবং শিথিলতা বোঝাত না। তিনি সত্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। এতে কোনো প্রকার ছাড় দিতেন না এবং শিথিলতা করতেন না। এমনকি তার নিকটাত্মীয় এবং প্রিয় ব্যক্তিগণের ব্যাপারে হলেও তিনি এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিতেন না।
আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, মাখযুমি গোত্রের যে মহিলাটি চুরি করেছিল, তার বিষয়টি কুরাইশদের চিন্তিত করে তুলল। তারা বলল, ওই মহিলার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কে কথা বলতে যাবে? তখন সবাই বলল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়ভাজন উসামা ইবনে যায়েদ রাযি. ব্যতীত আর কেউ এ দুঃসাহস করতে পারবে না। তাই উসামা রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বললেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি আল্লাহ তাআলার হদ তথা বিচারের ব্যাপারে সুপারিশ করছ?
তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বলতে লাগলেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ জন্যই ধ্বংস হয়েছে যে, যখন তাদের মধ্যে অভিজাত কেউ চুরি করত তখন তারা ক্ষমা করে দিত। আর তাদের মধ্য হতে দুর্বল কেউ চুরি করলে তার বিচার করত। আল্লাহর শপথ, যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করত তাহলে আমি তার হাত কর্তন করতাম।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগেও অপর এক ঘটনায় এই একই সাহাবির সাথে কঠোর আচরণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে উসামা ইবনে যায়েদ রাযি. হতে বর্ণিত আছে, এ হাদিসটি ইবনে আবি শায়বা থেকে বর্ণিত হয়েছে।
উসামা রাযি. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এক যুদ্ধে পাঠালেন। আমরা প্রত্যুষে জুহাইনা গোত্রের শাখা গোত্র আল-হুরাকার ওপর আক্রমণ করলাম। এ সময় আমি একজন লোককে ধরে ফেললাম, সে বলে উঠল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তবুও আমি তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করলাম। কিন্তু এ ঘটনার জন্য আমার মনে সংশয়ের উদ্রেক হলো। তাই আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সেই ঘটনা উল্লেখ করলাম।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লোকটি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে আর তুমি তাকে হত্যা করে ফেলেছ?
তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, সে তো অস্ত্রের আঘাতের ভয়ে এ কথা বলেছে!
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার হৃদয় চিড়ে দেখতে পারলে না? তাহলে জেনে যেতে, সে সত্যি সত্যিই বলেছে কি না।
তিনি বারবার আমার কাছে এ কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। এমনকি আমি মনে মনে অনুশোচনা করতে লাগলাম, হায়, আমি যদি আজই ইসলাম গ্রহণ করতাম!
বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি. বললেন, আল্লাহর কসম, আমি কখনো কোনো মুসলিমকে এভাবে হত্যা করব না, যেভাবে এই ভুঁড়িওয়ালা অর্থাৎ উসামা হত্যা করেছে।
বর্ণনাকারী বলেন, তখন এক ব্যক্তি বলে উঠল, আল্লাহ তাআলা কি এ কথা বলেননি যে-
وَقْتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ ﴾
“তোমরা তাদের সাথে লড়াই করো যতক্ষণ পর্যন্ত ফিতনা দূরীভূত না হয় এবং দ্বীন সম্পূর্ণ আল্লাহর জন্য না হয়।" [সুরা আনফাল: ৩৯]
জবাবে সাদ রাযি. বললেন, আমরা লড়াই করেছি যাতে করে ফিতনা দূরীভূত হয়, কিন্তু তুমি এবং তোমার সাথিরা লড়াই করেছ যাতে করে ফিতনা সৃষ্টি হয়।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এ দুটি ঘটনা একই সাহাবির সাথে ঘটেছে। তিনি হলেন, উসামা ইবনে যায়েদ রাযি.। হয়তো এতে আল্লাহ তাআলারই কোনো উদ্দেশ্য ছিল। কেননা, উসামা রাযি. হিব্ব ইবনুল হিব্ব অর্থাৎ প্রিয়র ছেলে প্রিয় নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি নিজে ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন প্রিয় পাত্র এবং ছিলেন আরেক প্রিয় পাত্র সম্মানিত সাহাবি যায়েদ বিন হারেসা রাযি.-এর পুত্র। যিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আজাদকৃত গোলাম ছিলেন। পিতার সাথে গিয়ে স্বাধীন হওয়ার তুলনায় যিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোলাম হিসেবে থাকাকেই পছন্দ করেছিলেন। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আজাদ করে দিয়েছিলেন এবং কুরাইশের সামনে তাকে নিজের পুত্র বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর কুরআনে পালকপুত্রকে নিজের পুত্র হিসেবে অভিহিত করাকে নিষেধ করা হয়। যায়েদের এ অবস্থান তার পুত্র উসামার কাছে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। আর শুধু তার সাথেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কঠোরতার চিত্র দেখতে পাওয়া গভীর একটি অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে। এতে করে বোঝা যায় যে, ইসলাম কোনো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব অবলম্বন করে না এবং এতে কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করে না। চাই তা প্রসিদ্ধ এবং বিরাট কোনো ব্যক্তিত্বের সাথেই হোক না কেন।

টিকাঃ
৪০ বুখারি, পরিচ্ছেদ: নবীগণ, অধ্যায় : أَمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَبَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ﴿ ]সুরা কাহাফ : ৯[ হাদিস নং ৩২৮৮। মুসলিম, পরিচ্ছেদ : হদ-সংক্রান্ত, অধ্যায় : অভিজাত এবং অন্যান্য চোরের হাত কাটা এবং হদ-সংক্রান্ত বিষয়ে সুপারিশ করা থেকে নিষেধ করা, হাদিস নং: ১৬৮৮ ।
৪১ বুখারি, পরিচ্ছেদ: মাগাযি (যুদ্ধাভিযানসমূহ), অধ্যায়: উসামা রাযি.-কে জুহাইনা গোত্রের আল-হুরাকায় প্রেরণ, হাদিস নং ৪০২১। মুসলিম, পরিচ্ছেদ : ঈমান, অধ্যায়: কাফের কর্তৃক লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পর তাকে হত্যা করা হারাম হওয়া, হাদিস নং ৯৬। হাদিসটি তার বর্ণনা থেকেই চয়িত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00