📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 মানুষ যা বুঝবে এবং অনুধাবন করতে পারবে তা-ই বলা

📄 মানুষ যা বুঝবে এবং অনুধাবন করতে পারবে তা-ই বলা


মানুষের পরস্পরের কথোপকথনের উদ্দেশ্য হচ্ছে যোগাযোগ স্থাপন। আর যোগাযোগ রক্ষার দাবি হচ্ছে, প্রতিটি পক্ষ এমন কথাবার্তা বলবে, যা অপর পক্ষ বুঝতে সক্ষম হবে। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোগাযোগ রক্ষায় বিঘ্নতা ঘটায়-এমন সব বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। যেমন, এমনভাবে কথা বলা, যা শ্রোতা বুঝতে সক্ষম হয় না। অথবা অতিরিক্ত কথা বলা, যা শ্রোতাকে বিরক্ত করে। অথবা এমন কথা বলা, যার মাধ্যমে লোকদের সামনে অহংকার প্রদর্শন করা হয়।
জাবের রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য হতে কিয়ামত দিবসে তারাই আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী এবং সবচেয়ে প্রিয় হবে যাদের চরিত্র সর্বোত্তম হবে। আর তারাই সবচেয়ে দূরবর্তী এবং ঘৃণিত হবে, যারা বাচাল, যারা মানুষের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা প্যাঁচায় এবং যারা অহংকার করে।
কখনো এমন হতো যে, কোনো মুসলমানের বুঝতে অসুবিধা হতো এবং তিনি এর সমাধান খুঁজে পেতেন না আর তার মস্তিষ্ক সমাধান পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষমও হয়ে উঠত না। সে ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তিনি তার কথার মাঝেই তাকে এমন সমাধান বলে দিতেন, যা তার বোধগম্য হয় এবং মস্তিষ্ক যা ধারণে সক্ষম হয়। যেমন, আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে,
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এক বেদুইন ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার স্ত্রী একটি কৃষ্ণকায় ছেলে জন্ম দিয়েছে (আমি তো কালো নই)।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কি কোনো উট আছে?
লোকটি বলল, হ্যাঁ, আছে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেগুলো কী রঙয়ের?
লোকটি বলল, লাল রঙয়ের।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাতে কি মেটে রঙেরও উট আছে?
লোকটি বলল, হ্যাঁ, আছে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই মেটে রঙ তাহলে কোথা থেকে আসল?
লোকটি বলল, সম্ভবত পূর্বের বংশধারা থেকে এসেছে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে সম্ভবত তোমার এই পুত্রও তার পূর্ববর্তী বংশধরের থেকেই এই রঙ নিয়ে এসেছে।
এ ছিল কোনো মুসলিম পরিবারের ওপর ধেয়ে আসা এক ভয়াবহ বিপর্যয়। লোকটি তার সন্তানকে তার দিকে সম্বন্ধ করা নিয়ে সন্দিহান ছিল। আর এর কারণ ছিল সন্তানের গায়ের রঙ তার গায়ের রঙ থেকে আলাদা হওয়া। এটি তার পরিবারকে ধ্বংসের দিকে এবং স্ত্রী ও সন্তানকে লাঞ্ছনার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। অথচ তাদের কোনো দোষ ছিল না। আর এসব কিছু হচ্ছিল শুধুই সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ভঙ্গিমায় কথোপকথন করলেন, যা মরুভূমি থেকে আগত বেদুইনের মস্তিষ্ক বুঝতে সক্ষম হবে। তাকে তিনি অত্যন্ত সহজভাবে বংশাধারা-সংক্রান্ত নিয়ম বুঝিয়ে দিলেন। লোকটি মরুভূমির পরিবেশে যা দেখেছে এবং যা জেনেছে, তার মাধ্যমে এবং উটের বংশধারার জিন-সংক্রান্ত উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সন্তানের অবস্থাকে উটের অবস্থার সাথে সাদৃশ্য দিলেন এবং বোঝালেন যে, তার গাত্রবর্ণ বংশীয় পূর্বপুরুষদের মধ্য হতে কারও জিন থেকে এসেছে অথবা তার নিকটাত্মীয় কারও জিন থেকে এসেছে। এভাবে বলাতে লোকটি বুঝতে সক্ষম হয় এবং শান্ত হয়, বাড়ির ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয় এবং স্ত্রীর প্রতি তার আস্থা ফিরে আসে।

টিকাঃ
২৮ তিরমিযি, হাদিস নং ২০১৮, ইমাম তিরমিযি হাদিসটিকে হাসানুন সহিহুন আখ্যা দিয়েছেন। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৭৭৬৭, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি হাসান লিগাইরিহি। ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৮২।
২৯ বুখারি, পরিচ্ছেদ: মুরতাদ এবং কাফেরদের মধ্য হতে যারা যুদ্ধ করতে আসে তাদের সম্পর্কিত, অধ্যায়: তা'রিজ অর্থাৎ তিরস্কার সম্পর্কিত, হাদিস নং ৬৪৫৫। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: লি'আন, হাদিস নং ১৫০০।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশ্ন অনুযায়ী সীমাবদ্ধতা, প্রশ্নকারীর আগ্রহের ওপর নির্ভর করে উত্তরে সংযুক্তি আর কখনো কখনো উপহার হিসেবে সামান্য পরিমাণ বৃদ্ধি করা

📄 উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশ্ন অনুযায়ী সীমাবদ্ধতা, প্রশ্নকারীর আগ্রহের ওপর নির্ভর করে উত্তরে সংযুক্তি আর কখনো কখনো উপহার হিসেবে সামান্য পরিমাণ বৃদ্ধি করা


আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলো, কোন আমল সর্বোত্তম?
তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনয়ন করা।
আবার প্রশ্ন করা হলো, তারপর কোনটি?
তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলার রাস্তায় জিহাদ করা।
আবার প্রশ্ন করা হলো, তারপর কোনটি?
তিনি বললেন, কবুলকৃত হজ।
কখনো কখনো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনকারীর অস্থিরতা দূর করতে উত্তর বৃদ্ধি করতেন এবং তাকে সেই উত্তরের মাধ্যমে প্রশান্তি দিতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. হতে বর্ণিত আছে,
এক ব্যক্তি এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করল, কোন আমল সর্বোত্তম?
তিনি বললেন, সময়মতো নামাজ পড়া, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, তারপর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।
কখনো কখনো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনকারীর জন্য উপহারস্বরূপ এবং কোনো বিষয়ে উৎসাহ প্রদানের জন্য উত্তর বৃদ্ধি করতেন।
উবাই ইবনে কা'ব রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
রাতের দুই তৃতীয়াংশ প্রহর অতিবাহিত হয়ে গেলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং বলতেন, "হে লোকসকল, তোমরা আল্লাহ তাআলার জিকির করো। আল্লাহ তাআলার জিকির করো। প্রথম ফুঁৎকারের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তার পরেই দ্বিতীয় ফুঁৎকার আসবে। তাতে রয়েছে মৃত্যুর ভয়াবহতা। তাতে রয়েছে মৃত্যুর ভয়াবহতা।”
উবাই রাযি. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার ওপর বেশি বেশি দুরুদ পাঠ করি। তাই আমি আপনার ওপর দুরুদ পাঠ করার জন্য কতটুকু সময় খরচ করব?
তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা হয়।
উবাই রাযি. বলেন, আমি বললাম, এক চতুর্থাংশ?
তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা, যদি বৃদ্ধি করো তাহলে তোমার জন্যই কল্যাণকর।
আমি বললাম, অর্ধেক?
তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা, যদি বৃদ্ধি করো তাহলে তোমার জন্যই কল্যাণকর।
আমি বললাম, তাহলে দুই তৃতীয়াংশ?
তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা, যদি বৃদ্ধি করো তাহলে তোমার জন্য কল্যাণকর।
আমি বললাম, তাহলে আমি পুরোটা সময় আপনার জন্যই দুরুদ পাঠ করব।
তিনি বললেন, তাহলে তা তোমার দুশ্চিন্তা দূর হওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই রাযি.-এর কাছে স্পষ্ট করে দিলেন যে, সকল দুয়ায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দুরুদ পাঠ করা হলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলার কাছে বিশাল সওয়াব লাভ করবে। আর এটি তার সকল দুশ্চিন্তা দূরীকরণে এবং সকল অপরাধ হতে ক্ষমা লাভে যথেষ্ট হবে। এ কথা বলে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি বেশি বেশি দুরুদ পাঠে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে মু'আয ইবনে জাবাল রাযি. হতেও হাদিস বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
আমি এক সফরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। একদিন চলতি পথে আমি তার নিকটে পৌঁছে গেলাম।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি কাজের সংবাদ দিন, যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছ। তবে আল্লাহ তাআলা যার জন্য সহজ করে দেন, নিশ্চয়ই তা তার জন্য সহজ হবে। তুমি আল্লাহ তাআলার ইবাদত করবে এবং তার সাথে কোনো বস্তুকে শরিক করবে না। নামাজ আদায় করবে। জাকাত দেবে। রমজানের রোজা রাখবে এবং বাইতুল্লার হজ করবে।
এরপর তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে কল্যাণের দুয়ার সম্বন্ধে অবহিত করব না? রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ। আর দান-সদকা করা এবং কোনো ব্যক্তি মধ্যরাতে নামাজ আদায় করা পাপকে এমনভাবে নির্বাপিত করে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নির্বাপিত করে দেয়। মুয়াজ ইবনে জাবাল রাযি. বলেন, এরপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
تتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ
"তাদের পিঠ বিছানা থেকে পৃথক থাকে।"
এখান থেকে নিয়ে "يَعْمَلُونَ" পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন। [সূরা সেজদা: ১৬, ১৭]
তারপর বললেন, আমি কি তোমাকে সমস্ত আমলের মূল, স্তম্ভ এবং সর্বোচ্চ শিখর সম্পর্কে অবহিত করব না?
আমি বললাম, অবশ্যই, ইয়া রাসুলাল্লাহ।
তিনি বললেন, সকল আমলের মূল হচ্ছে ইসলাম। তার স্তম্ভ হচ্ছে নামাজ। আর সর্বোচ্চ চূড়া হচ্ছে জিহাদ।
তারপর বললেন, আমি কি তোমাকে এসব কিছুর সারনির্যাস সম্পর্কে অবহিত করব না?
আমি বললাম, অবশ্যই ইয়া রাসুলাল্লাহ।
তিনি বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জিহ্বা ধরে বললেন, তুমি এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী, আমরা যে কথাবার্তা বলি, এ ব্যাপারেও কি আমাদেরকে পাকড়াও করা হবে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মু'আয, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক, মানুষকে শুধু তার জিহ্বার উপার্জনের কারণেই নিজ চেহারায় ভর করিয়ে অথবা নাকের ডগায় ভর করিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
আমরা দেখতে পেলাম যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু'আযের প্রশ্নের তুলনায় তার উত্তর বৃদ্ধি করেই যাচ্ছেন। যাতে করে তাকে কিছু উপকারী বিষয় শিক্ষা দিতে পারেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি না জানাতেন তাহলে তিনি তা কখনোই জানতেন না।

টিকাঃ
৩০ বুখারি, পরিচ্ছেদ: ঈমান, অধ্যায়: যারা বলে ঈমানই হচ্ছে আমল, হাদিস নং ২২। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: ঈমান, অধ্যায়: আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনা সর্বোত্তম আমল হওয়ার বিবরণ।
৩১ বুখারি, পরিচ্ছেদ: তাওহিদ, অধ্যায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাজকে আমল হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পাঠ করবে না তার নামাজ সম্পূর্ণ হবে না। হাদিস নং ৭০৯৬। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: ঈমান, অধ্যায় ঈমান সর্বোত্তম আমল, হাদিস নং ৮৫।
৩২ তিরমিযি, হাদিস নং ২৪৫৭, হাদিসটিকে তিরমিযি রহ. হাসানুন সহিহুন আখ্যা দিয়েছেন। মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৩৫৭৮, তাহকিক : মুস্তফা আবদুল কাদির আতা, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ-বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪১১ হিজরি, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ, তিনি বলেছেন, এই হাদিসটির সনদ সহিহ তবে বুখারি ও মুসলিম রহ. তা আনেননি। ইমাম ইবনে হাজার হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। দেখুন, নাতায়িজুল আফকার ফি তাখরিজি আহাদিসিল আযকার, তাহকিক : হামদি আবদুল মাজিদ আস-সালাফি, দারু ইবনে কাসির, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪২৯ হিজরি, ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ, ৪/১৬।
৩৩ তিরমিযি, হাদিস নং ২৬১৬, ইমাম তিরমিযি রহ. হাদিসটিকে হাসানুন সহিহুন আখ্যা দিয়েছেন। সুনানুন নাসায়ি, হাদিস নং ১১৩৯৪। সুনানে ইবনে মাজাহ, ৩৯৭৩, তাহকিক : মুহাম্মদ ফুয়াদ আব্দুল বাকি, দারুল ফিকর-বৈরুত। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২১২১, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি তার সনদ এবং শাহেদ হাদিসের ভিত্তিতে বিশুদ্ধ। মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৩৫৪৮, হাকিম বলেন, শাইখাইন তথা ইমাম বুখারি এবং মুসলিম রহ.-এর শর্ত অনুযায়ী হাদিসটি সহিহ। কিন্তু তারা হাদিসটি বর্ণনা করেননি। ইমাম যাহাবি তার সাথে একমত পোষণ করেছেন।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 কারও সাধারণ ভুল-ত্রুটি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা

📄 কারও সাধারণ ভুল-ত্রুটি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা


মানুষ অন্যের সাথে কথা বলতে গেলে সাধারণত যা ঘটে তা হচ্ছে, কেউ যদি অনিচ্ছাকৃত সাধারণ কোনো ভুল-ত্রুটি করে ফেলে তাহলে তারা তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুরু করে। এটি একটি গর্হিত কাজ। চাই সে ভুল কোনো জ্ঞানী লোক অথবা কোনো সরল লোক থেকে প্রকাশ পাক, তা নিয়ে ঠাট্টা করা যাবে না। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা আমাদেরকে অন্যের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ
“হে মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিনী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে।” [সুরা হুজুরাত : ১১]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করায় কখনোই আগ্রহী ছিলেন না। যেমন ওই বেদুইনের কথাই ধরুন, যে মসজিদে এসে প্রস্রাব করে দিয়েছিল, তার সাথে রাসুল কী আচরণ করেছিলেন?
এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
এক বেদুইন ব্যক্তি মসজিদে আসল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন। তারপর লোকটি নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষ করে সে দুয়া করল, হে আল্লাহ, আপনি শুধু আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দয়া করুন। আমাদের সাথে আর কারও প্রতি দয়া করবেন না।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো প্রশস্ত রহমতকে সংকীর্ণ করে দিলে।
এর অব্যবহিত পর লোকটি মসজিদের অভ্যন্তরে প্রস্রাব করে দিলো। লোকেরা দৌড়ে তার দিকে ছুটে এলো।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার ওপর এক মশক পানি ঢেলে দাও অথবা বলেছেন, এক বালতি পানি ঢেলে দাও।
তারপর আবার বললেন, নিশ্চয়ই তোমাদেরকে পাঠানো হয়েছে সহজ পন্থা বা কোমলতা প্রদর্শন করার জন্য; কঠিনতা বা কঠোরতা করার জন্য নয়।
এখানে বেদুইন ব্যক্তির দুইটি ভুল হয়েছে। প্রথম ভুলটি হয়েছে দুয়া করতে গিয়ে। কারণ, সে বাকি মুসলমানদের বাদ দিয়ে শুধু তার জন্য এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য রহমতের প্রার্থনা করেছে। আর দ্বিতীয় ভুলটি হচ্ছে, সে মসজিদে প্রস্রাব করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শুধু বলেছেন, “তুমি তো প্রশস্ত রহমতকে সংকীর্ণ করে ফেললে।” অর্থাৎ আল্লাহর রহমতের পরিধি আরও অনেক বড়। মাত্র দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে তুমি তা সংকীর্ণ করতে চাচ্ছ! আর দ্বিতীয় ভুলের সময় তার প্রস্রাব-আক্রান্ত স্থান ধৌত করতে বলেই ক্ষান্ত হয়েছেন। মুসলিম শরিফে উল্লেখিত অপর এক সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বেদুইন ব্যক্তিটিকে ডেকে বললেন, নিশ্চয়ই মসজিদ এমন প্রস্রাব ও নোংরা বস্তুর জন্য নয়। নিশ্চয়ই মসজিদ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার জিকির, নামাজ এবং কুরআন তেলাওয়াত করার জন্য।
এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো ধরনের ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেননি।

টিকাঃ
৩৪ তিরমিযি, হাদিস নং ১৪৭। আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৮০। মুসনাদে আহমাদ ৭২৫৪, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি শাইখাইনের শর্ত অনুযায়ী সহিহ। আলবানি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যা দিয়েছেন। দেখুন, সুনানে আবি দাউদ, মুওয়াসসাসাতু গারাস- কুয়েত, প্রথম সংস্করণ, ১৪২৩ হিজরি/২০০২ খ্রিষ্টাব্দ, ২/২২৯।
৩৫ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: পবিত্রতা, অধ্যায়: মসজিদ অথবা অন্যান্য স্থানে প্রস্রাব ও অন্যান্য নাপাকি পাওয়া গেলে তা ধৌত করা আবশ্যক হওয়া, হাদিস নং ২৮৫।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 মিথ্যাচার এবং তোষামোদ বর্জিত প্রশংসা

📄 মিথ্যাচার এবং তোষামোদ বর্জিত প্রশংসা


আমরা জানি যে, যারা সম্পদের লোভে অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে লোকদের মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করে তাদের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বোঝাপড়া রয়েছে।
হাম্মাম ইবনে হারেস থেকে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি উসমান রাযি.-এর প্রশংসা করতে শুরু করলে মিকদাদ রাযি. তার গর্দান চেপে ধরেন। মিকদাদ রাযি. ছিলেন বেশ স্বাস্থ্যবান লোক। তাই তিনি লোকটির চেহারা মাটির সাথে মিশাতে থাকেন। এ অবস্থা দেখে উসমান রাযি. তাকে বললেন, তোমার কী হয়েছে?
তিনি বললেন, নিশ্চয়ই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমরা তোষামুদে প্রশংসাকারীদের দেখতে পাবে তখন তাদের চেহারায় মাটি নিক্ষেপ করবে।
এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এসে অপর এক ব্যক্তির প্রশংসা করল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি ধ্বংস হও, তুমি তো তোমার সাথির গর্দান কর্তন করে ফেললে। এ কথা তিনি কয়েকবার বললেন।
তারপর বললেন, তোমাদের মধ্য হতে কেউ যদি তার অপর ভাইয়ের প্রশংসা করতে চায় তাহলে অবশ্যই সে যেন এ কথা বলে, আমি অমুকের ব্যাপারে এমন ধারণা রাখি। আল্লাহই তার ব্যাপারে ভালো জানেন। আমি আল্লাহর ওপর কাউকে পূত-পবিত্র মনে করি না। যদি আল্লাহ তাআলা জানেন তবেই আমি ওই ব্যক্তির ব্যাপারে এরূপ ধারণা রাখি।
এ দিকে লক্ষ করে প্রশংসা যাতে বৈধ হয়, সে জন্য তাতে কিছু শর্তারোপ করা উচিত। যেমন,
১. প্রশংসা বাস্তবধর্মী হওয়া। তাতে মিথ্যা এবং বাড়াবাড়ির আশ্রয় না নেওয়া।
২. তাতে কোনো লৌকিকতা এবং প্রশংসিত ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো প্রকার নির্দিষ্ট উপকার লাভের চেষ্টা না থাকা।
৩. প্রশংসিত ব্যক্তির তাকওয়া তথা খোদাভীতি সম্বন্ধে জ্ঞান থাকা, যাতে সে বিভ্রান্ত না হয়ে পড়ে।
উবাই ইবনে কা'ব রাযি.-এর সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমনটিই ঘটেছে। উবাই ইবনে কা'ব রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবু মুনযির, তুমি কি জানো, তোমার সাথে থাকা আল্লাহ তাআলার কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে বড়?
তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসুল ভালো জানেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, হে আবু মুনযির, তুমি কি জানো, তোমার সাথে থাকা আল্লাহ তাআলার কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে বড়?
তিনি বলেন, এবার আমি বললাম, “اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ অর্থাৎ আয়াতুল কুরসি।
উবাই ইবনে কা'ব রাযি. বলেন, তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে চাপড় দিয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ, হে আবু মুনযির, ইলমের জন্য তোমাকে অভিনন্দন।
এখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবনে কা'ব রাযি.-এর যথার্থ প্রশংসা করেছেন। আর তিনি জানতেন যে, উবাই ইবনে কা'ব রাযি. তার প্রশংসায় অহংকার প্রদর্শন করবেন না। এ জন্য তিনি তার প্রশংসায় কোনো দ্বিধাবোধ করেননি। এতে করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বোধশক্তি এবং তার সহচরগণের প্রতি সম্মান প্রদানের কথা বোঝা যায়।

টিকাঃ
৩৬ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: যুহদ এবং দুনিয়ার ব্যাপারে আকর্ষণহীনতা, অধ্যায়: অতিরিক্ত প্রশংসা এবং প্রশংসিত ব্যক্তির ফেতনায় পড়ার আশঙ্কা হলে প্রশংসা হতে নিষেধ করা সম্পর্কিত, হাদিস নং ৩০০২। আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৮০৪। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৫৬৮৪।
৩৭ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: যুহদ এবং দুনিয়ার ব্যাপারে আকর্ষণহীনতা, অধ্যায়: অতিরিক্ত প্রশংসা এবং প্রশংসিত ব্যক্তির ফেতনায় পড়ার আশঙ্কা হলে প্রশংসা হতে নিষেধ করা সম্পর্কিত, হাদিস নং ৩০০০।
৩৮ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: মুসাফিরের নামাজ এবং কসর করা, অধ্যায়: সুরায়ে কাহাফ এবং আয়াতুল কুরসির ফজিলত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00