📄 বিশেষ করে জনসম্মুখে
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সামর্থ্যের অমর্যাদা করতেন না। তাদের মন্দ দিক এবং অপরাধের কথা উল্লেখ করে তাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেন না। যেমনটি ঘটেছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হিন্দা বিনতে উতবার মধ্যে। মক্কা বিজয়ের পর নারীদের কাছ থেকে বাইআত গ্রহণ করার সময় এ ঘটনা ঘটে। তার আগে আমাদের হিন্দা বিনতে উতবার পরিচয় এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তার কী ঘটনা ঘটেছিল, তা জেনে নেওয়া অত্যাবশ্যক। হিন্দা হলেন কুরাইশ এবং পুরো মক্কা মুকাররমার একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা রবী'আর মেয়ে। তার ভাই আবু হুযাইফা ইবনে উতবাহ আগেই ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণে তার পরিবারের কুফরির মূলে ধ্বস নেমে আসে। তারা ইসলামের এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিপক্ষে শত্রুতায় নেমে পড়ে। বিশেষ করে হিন্দার অন্তরে ইসলাম এবং রাসুল-বিদ্বেষ লালিত হতে থাকে। আর মক্কার অন্যতম নেতা এবং বদর যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কুরাইশদের প্রধানতম নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের স্ত্রী হওয়া তার এই শত্রুতাকে আরও দৃঢ় করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বদর যুদ্ধের সময়ের কথা। যুদ্ধের শুরুতেই হিন্দার পিতা উতবা, তার চাচা শাইবা ইবনে রবী'আ এবং তার ভাই ওলীদ ইবনে উতবা মল্লযুদ্ধের জন্য এগিয়ে যায়। হামজা, আলি এবং উবাইদা ইবনুল হারিস রাযি. তাদের মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন। হামজা হিন্দার পিতাকে হত্যা করেন। আলি তার ভাইকে হত্যা করেন। আর উবাইদার সাথে শাইবার দুইবার তলোয়ারের আঘাত বিনিময় হয়। পরবর্তীতে হামজা এবং আলির সাহায্যে তাকেও হত্যা করা হয়।
হিন্দা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হামযা রাযি.-এর কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়ে তার ক্রোধ প্রশমিত করার লক্ষ্যে উহুদ যুদ্ধের পূর্বে একটি দাস ক্রয় করে। সেই দাসের নাম ছিল ওয়াহশি। সে তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়, যদি সে হামযাকে হত্যা করতে পারে তাহলে তাকে স্বাধীন করে দেওয়া হবে এবং অনেক সম্পদ দেওয়া হবে। ইবনে ইসহাক বলেন, হিন্দা বিনতে উতবা এবং তার সাথের নারীরা যুদ্ধে নিহত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিগণের অঙ্গহানি করতে শুরু করে। তারা তাদের নাক ও কান কর্তন করতে থাকে। এমনকি হিন্দা লোকদের কান এবং নাক থেকে দুল এবং হার খুলে নিয়ে সেই দুল, হার এবং আংটিগুলোকে জুবাইর ইবনে মুত'ইমের গোলাম ওয়াহশিকে দিয়ে দেয়। সে হিংস্রতার সাথে হামযা রাযি.-এর কলিজা বিচ্ছিন্ন করে। তারপর দাঁত দিয়ে চাবিয়ে তা বিকৃত করতে না পেরে অবশেষে গিলে ফেলে।
হিন্দা এভাবেই তার অন্তরে শত্রুতা লালন করে যেতে থাকে। এরই মধ্যে মক্কা বিজয়ের সময় চলে আসে। আবু সুফিয়ান মক্কায় প্রবেশ করে কুরাইশদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য আহ্বান করতে লাগলে হিন্দা তাকে তিরস্কার করা শুরু করে।
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, আবু সুফিয়ান যখন মক্কায় ফিরে আসলেন তখন উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার দিয়ে বললেন, হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, এই তো মুহাম্মদ তোমাদের নিকটে চলে এসেছেন। তোমাদের ব্যাপারে তার কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে।
এ কথা শুনে হিন্দা বিনতে উতবা তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার গোঁফ টেনে ধরল। তারপর বলল, ওই থলের মতো, তৈলাক্ত এবং মাংসলদেহীকে হত্যা করো, পুরো গোত্র যার নিন্দা করেছে।
আবু সুফিয়ান বললেন, তোমাদের জন্য আফসোস! তোমাদের অন্তরের এ প্ররোচনা যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে। তিনি তোমাদের কাছে চলে এসেছেন এবং তোমাদের ব্যাপারে তার কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ।
তারা বলল, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। তোমার গৃহ আমাদের কী কাজে আসবে?
আবু সুফিয়ান বললেন, যে ব্যক্তি তার গৃহের দরজা বন্ধ করে দেবে, সে নিরাপদ। যে মসজিদে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। তখন মানুষ বিভক্ত হয়ে তাদের গৃহ এবং মসজিদের দিকে ছুটে গেল। এ সকল চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হিন্দার অন্তরে ইসলাম তার পথ তৈরি করে নেয়। পুরুষদের বাইআত গ্রহণ শেষ হলে অন্যান্য মহিলাদের সাথে হিন্দাও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বাইআত নিতে আসে। তাদের বাইআত গ্রহণ শুরু হলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমরা আমার কাছে এই মর্মে বাইআত গ্রহণ করো যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কোনো বস্তুকে শরিক করবে না।
তখন হিন্দা নেকাব পরিহিতা ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিনতে পারছিলেন না। সে বলে উঠল, আল্লাহর শপথ, আপনি আমাদের থেকে এমন অঙ্গীকার নিচ্ছেন, যা পুরুষদের কাছ থেকে গ্রহণ করেননি।
কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আপত্তির দিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না এবং “তোমরা চুরি করবে না” বলে তার বাক্য সমাপ্ত করলেন।
তখন হিন্দা বলা শুরু করল, হে আল্লাহর রাসুল, আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ লোক। সে আমাকে আমার এবং আমার সন্তানাদির প্রয়োজনীয় খরচাপাতি প্রদান করে না। তাই আমি যদি তার অজ্ঞাতে তার সম্পদ থেকে কিছু গ্রহণ করি তাহলে কি অপরাধ হবে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপনার এবং সন্তানাদির জন্য যতটুকু যথেষ্ট হবে, তা ইনসাফের সাথে নেবেন।
এরপরপরই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারলেন যে, তিনি এতক্ষণ আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা এর সাথে কথা বলছিলেন।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আপনি হিন্দা বিনতে উতবা?
সে বলল, হ্যাঁ, আমি হিন্দা বিনতে উতবা। অতএব আমার অতীতে যা প্রকাশ পেয়েছে, তা ক্ষমা করে দিন। আল্লাহও আপনাকে ক্ষমা করবেন। নিশ্চয়ই সেটা ছিল হিন্দা বিনতে উতবার জীবনের একটি ঘৃণিত অধ্যায়।
প্রিয় পাঠক, হয়তো আপনারা মনে মনে ভাবছেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিন্দার দীর্ঘ ইতিহাস, হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের স্মৃতি এবং হিন্দা তার সাথে যা করেছিল সেগুলো মনে করে হিন্দার সাথে বিরূপ আচরণ করতে পারেন।
কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় ক্ষমা করে দিতেন এবং উপেক্ষা করতেন। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু সেই দুঃখজনক অধ্যায় স্মরণ করে হিন্দাকে একটি কথাও বলেননি। বরং তিনি তার প্রতিটি হক থেকে সরে এসেছেন এবং উদারতার সাথে হিন্দার ইসলাম গ্রহণ মেনে নিয়েছেন। তারপর মহিলাদের বাইআত গ্রহণ পূর্ণ করার প্রতি মনোযোগী হয়েছেন। মনে হয়েছিল, যেন তার মাঝে কখনো কোনো প্রতিক্রিয়াই ঘটেনি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর বললেন, "আরও অঙ্গীকার করো যে, তোমরা ব্যভিচার করবে না"।
হিন্দা তার আপত্তি উত্থাপন থেকে বিরত হলো না। সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, কোনো স্বাধীন মহিলা কি ব্যভিচার করতে পারে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থামলেন না। বরং তিনি তার বাক্য পূর্ণ করলেন। বললেন, “আরও অঙ্গীকার করো যে, তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।”
হিন্দা বলে উঠল, আমরা শৈশবে তাদেরকে লালনপালন করেছি আর যুবক অবস্থায় আপনি তাদেরকে হত্যা করেছেন। আপনি কি আমাদের জন্য এমন কোনো সন্তান অবশিষ্ট রেখেছেন, যাকে আপনি বদর যুদ্ধের দিন হত্যা করেননি?
বদরের দিন আপনি তাদের পিতাদেরকে হত্যা করলেন। আর এখন আপনি আমাদেরকে তাদের সন্তানদের ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছেন!
রাসুল সাল্লাল্লাহু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। তিনি হিন্দাকে এ কথা বলতে পারতেন যে, বদরের যুদ্ধে আমরা তাদেরকে কেন হত্যা করেছি? তা কি আমাদের জন্য সংগত ছিল না? কারণ, মুশরিকরা-তাদের মধ্যে তোমার পিতা, চাচা, ভাই এবং ছেলেও আছে—আমাদেরকে আমাদের ধর্ম থেকে হটিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে। তারা আমাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করেছে এবং আমাদের ঘর-বাড়ি ও সম্পদের ওপর হামলা করেছে।
কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব কিছুই বললেন না। বরং তার জবাব ছিল খুবই আশ্চর্য ধরনের।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন এবং তিনি নীরব থাকলেন। তিনি বিষয়টিকে উদারতার সাথে গ্রহণ করলেন এবং হিন্দা বিনতে উতবার পরিস্থিতি মেনে নিলেন। তার ওপর থেকে ইসলামের কাঠিন্যকে সরিয়ে দিলেন। এরপর বললেন, “তোমরা আরও অঙ্গীকার করো যে, তোমাদের পশ্চাতে এবং সম্মুখে কোনো অপবাদ রটাবে না।”
হিন্দা বলে উঠল, আল্লাহর শপথ, নিশ্চয়ই অপবাদ রটানো নিন্দনীয় কাজ।
তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা আরও অঙ্গীকার করো যে, সৎকাজে আমার অবাধ্যাচারণ করবে না।"
হিন্দা বলে উঠল, আল্লাহর শপথ, আমরা সৎকাজে আপনার অবাধ্যতা করার কথা আমাদের অন্তরে লালন করে এখানে বসিনি।
এরপর সে বলল, এমন এক সময় ছিল যখন পৃথিবীতে আপনাদের অপদস্থ হওয়া ছিল আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়। তবে আজ এমন অবস্থা এসে দাঁড়িয়েছে যে, আমার কাছে আপনাদের সম্মানিত হওয়া ব্যতীত অধিক প্রিয় কোনো বিষয় নেই।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, আপনাকেও এর উত্তম প্রতিদান দেওয়া হবে।
পরবর্তীকালে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ধর্মের নতুন কোনো নিয়ম প্রবর্তিত হলে হিন্দাকে এর দীক্ষা দিয়েছেন। এভাবেই হিন্দা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার পরিবারবর্গের প্রতি অধিক ভালোবাসা পোষণকারীদের দলভুক্ত হয়ে যায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে কথোপকথনের ক্ষেত্রে যে উত্তম পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, তা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
টিকাঃ
২২ বুখারি, পরিচ্ছেদ: রোজা, অধ্যায়: যদি কেউ রমজানে স্ত্রী মিলন করে এবং কাফফারা আদায় করার মতো সম্পদ তার কাছে না থাকে তাহলে তাকে সদকা দেওয়া হলে সে যেন তার মাধ্যমে কাফফারা আদায় করে, হাদিস নং ১৮৩৪। হাদিসের বাক্য তার বর্ণনা থেকে চয়িত। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: রোজা, অধ্যায়: রমজানের দিবস কালে রোজাদারের উপর স্ত্রী মিলন হারাম হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ এবং কাফফারা ওয়াজিব হওয়া, হাদিস নং ১১১১।
২৩ দেখুন: ইবনে কাসির রহ. রচিত আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, তাহকিক: মুস্তফা আবদুল ওয়াহেদ, দারুল মা'রেফা-বৈরুত, ১৩৯২ হিজরি; ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ, ২/৪২৩। ইবনু সাইয়িদিন্নাস রহ. রচিত উয়ুনুল আসরি ফি ফুনুনিল মাগাযি ওয়াশ শামায়িলি ওয়াস সিয়ারি, তালিক তথা সংযুক্তি: ইবরাহিম মুহাম্মদ রমজান, দারুল কলম-বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪১৪ হিজরি; ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ, ১/৩৮১। ইমাম তবারি রহ. রচিত তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, দারুল মা'আরিফ-কায়রো, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৮৭ হিজরি; ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ, ২/২২।
২৪ ইবনে হিশাম রচিত আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ২/৯১। ইবনে কাসির রচিত আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ৩/৭৪। তবারি রচিত তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ২/৫২৪। ইবনুল আসির রচিত আল-কামিল ফিত তারিখ, দারু ইহইয়ায়িত তোরাসিল আরবি-বৈরুত, ২/৪৮।
২৫ দেখুন ইবনে কাসির রচিত আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/৬০৩, ৬০৪। ইমাম তবারি রচিত- রচিত তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক ৩/৬১, ৬২'।
২৬ এর অর্থ হচ্ছে: অচিরেই আপনাকে এর চেয়ে বেশি দান করা হবে, আপনার অন্তরে ঈমানকে গেঁথে দেওয়া হবে, আল্লাহ এবং তার রাসুলের জন্য আপনার ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের ঘৃণা থেকে আপনার প্রত্যাবর্তন সুদৃঢ় হবে। মুসলিম পরিচ্ছেদ: বিচার-বিধান, অধ্যায়: হিন্দা বিনতে উতবার বিচার, হাদিস নং ১৭১৪।
২৭ বুখারি: পরিচ্ছেদ: সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের মর্যাদা, অধ্যায়: হিন্দা বিনতে উতবার আলোচনা, হাদিস নং ৩৬১৩।
📄 কোনো বস্তু সম্পর্কে অজ্ঞাত হলে সে ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা এবং কোনো বিষয়ে অজানা থাকলে সে ব্যাপারে ফতোয়া না দেওয়া
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে প্রেরিত একজন নবী হওয়া সত্ত্বেও কোনো সামান্য বিষয়ে তার জানা না থাকাকে দূষণীয় মনে করতেন না। কেননা আল্লাহ তাআলাই তাকে সে ব্যাপারে জানাননি। এ জন্য যখন তার কাছে এমন কোনো প্রশ্ন আসত, যে ব্যাপারে ইতিপূর্বে আল্লাহ তাআলা তাকে জানাননি তখন তিনি সেই ব্যাপারে ওহি অবতীর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত নীরবতা অবলম্বন করতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর নবী, আমি বাগানে এক মহিলাকে ধরে তার সাথে সঙ্গম ব্যতীত বাকি সব কিছু করেছি। তাকে চুমো দিয়েছি, জড়িয়ে ধরেছি। তবে এর বাইরে কিছু করিনি। তাই এখন আমার যে বিচার করতে চান, তা-ই করুন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছু বললেন না। লোকটি চলে গেল। তখন উমর রাযি. বললেন, সে যদি নিজের ব্যাপারে গোপনীয়তা অবলম্বন করত তাহলে আল্লাহ তাআলাও তার দোষ গোপন রাখতেন।
বর্ণনাকারী বলেন, সাথে সাথেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোখ খুললেন এবং বললেন, তাকে পুনরায় আমার কাছে নিয়ে এসো।
তাকে নিয়ে আসা হলে তিনি তার সম্মুখে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
وَأَقِمِ الصَّلوةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ الَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ
"আর দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের প্রান্তভাগে নামাজ আদায় করবে। নিশ্চয়ই পুণ্য কাজ পাপ দূর করে দেয়। যারা স্মরণ রাখে তাদের জন্য এটি এক মহা স্মারক।” [সুরা হুদ: ১১৪]
তখন মুয়াজ ইবনে জাবাল রাযি. বললেন, হে আল্লাহর নবী, এ হুকুম কি শুধু তার জন্য নাকি সমস্ত মানবজাতির জন্য?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বরং সমস্ত মানবজাতির জন্য।
লক্ষ করুন, এখানে লোকটির নিকৃষ্ট পাপ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লোকটির সাথে কঠোর ব্যবহার করায় উদ্বুদ্ধ করেনি। অথবা তাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করতেও উৎসাহ দেয়নি। বরং তিনি আল্লাহ তাআলার হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত চুপ থেকেছেন। এটাই বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি শিষ্টাচার। আমাদের এমন আচরণেরই অনুসরণ করা উচিত।
📄 মানুষ যা বুঝবে এবং অনুধাবন করতে পারবে তা-ই বলা
মানুষের পরস্পরের কথোপকথনের উদ্দেশ্য হচ্ছে যোগাযোগ স্থাপন। আর যোগাযোগ রক্ষার দাবি হচ্ছে, প্রতিটি পক্ষ এমন কথাবার্তা বলবে, যা অপর পক্ষ বুঝতে সক্ষম হবে। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোগাযোগ রক্ষায় বিঘ্নতা ঘটায়-এমন সব বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। যেমন, এমনভাবে কথা বলা, যা শ্রোতা বুঝতে সক্ষম হয় না। অথবা অতিরিক্ত কথা বলা, যা শ্রোতাকে বিরক্ত করে। অথবা এমন কথা বলা, যার মাধ্যমে লোকদের সামনে অহংকার প্রদর্শন করা হয়।
জাবের রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য হতে কিয়ামত দিবসে তারাই আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী এবং সবচেয়ে প্রিয় হবে যাদের চরিত্র সর্বোত্তম হবে। আর তারাই সবচেয়ে দূরবর্তী এবং ঘৃণিত হবে, যারা বাচাল, যারা মানুষের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা প্যাঁচায় এবং যারা অহংকার করে।
কখনো এমন হতো যে, কোনো মুসলমানের বুঝতে অসুবিধা হতো এবং তিনি এর সমাধান খুঁজে পেতেন না আর তার মস্তিষ্ক সমাধান পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষমও হয়ে উঠত না। সে ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তিনি তার কথার মাঝেই তাকে এমন সমাধান বলে দিতেন, যা তার বোধগম্য হয় এবং মস্তিষ্ক যা ধারণে সক্ষম হয়। যেমন, আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে,
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এক বেদুইন ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার স্ত্রী একটি কৃষ্ণকায় ছেলে জন্ম দিয়েছে (আমি তো কালো নই)।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কি কোনো উট আছে?
লোকটি বলল, হ্যাঁ, আছে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেগুলো কী রঙয়ের?
লোকটি বলল, লাল রঙয়ের।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাতে কি মেটে রঙেরও উট আছে?
লোকটি বলল, হ্যাঁ, আছে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই মেটে রঙ তাহলে কোথা থেকে আসল?
লোকটি বলল, সম্ভবত পূর্বের বংশধারা থেকে এসেছে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে সম্ভবত তোমার এই পুত্রও তার পূর্ববর্তী বংশধরের থেকেই এই রঙ নিয়ে এসেছে।
এ ছিল কোনো মুসলিম পরিবারের ওপর ধেয়ে আসা এক ভয়াবহ বিপর্যয়। লোকটি তার সন্তানকে তার দিকে সম্বন্ধ করা নিয়ে সন্দিহান ছিল। আর এর কারণ ছিল সন্তানের গায়ের রঙ তার গায়ের রঙ থেকে আলাদা হওয়া। এটি তার পরিবারকে ধ্বংসের দিকে এবং স্ত্রী ও সন্তানকে লাঞ্ছনার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। অথচ তাদের কোনো দোষ ছিল না। আর এসব কিছু হচ্ছিল শুধুই সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ভঙ্গিমায় কথোপকথন করলেন, যা মরুভূমি থেকে আগত বেদুইনের মস্তিষ্ক বুঝতে সক্ষম হবে। তাকে তিনি অত্যন্ত সহজভাবে বংশাধারা-সংক্রান্ত নিয়ম বুঝিয়ে দিলেন। লোকটি মরুভূমির পরিবেশে যা দেখেছে এবং যা জেনেছে, তার মাধ্যমে এবং উটের বংশধারার জিন-সংক্রান্ত উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সন্তানের অবস্থাকে উটের অবস্থার সাথে সাদৃশ্য দিলেন এবং বোঝালেন যে, তার গাত্রবর্ণ বংশীয় পূর্বপুরুষদের মধ্য হতে কারও জিন থেকে এসেছে অথবা তার নিকটাত্মীয় কারও জিন থেকে এসেছে। এভাবে বলাতে লোকটি বুঝতে সক্ষম হয় এবং শান্ত হয়, বাড়ির ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয় এবং স্ত্রীর প্রতি তার আস্থা ফিরে আসে।
টিকাঃ
২৮ তিরমিযি, হাদিস নং ২০১৮, ইমাম তিরমিযি হাদিসটিকে হাসানুন সহিহুন আখ্যা দিয়েছেন। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৭৭৬৭, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি হাসান লিগাইরিহি। ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৮২।
২৯ বুখারি, পরিচ্ছেদ: মুরতাদ এবং কাফেরদের মধ্য হতে যারা যুদ্ধ করতে আসে তাদের সম্পর্কিত, অধ্যায়: তা'রিজ অর্থাৎ তিরস্কার সম্পর্কিত, হাদিস নং ৬৪৫৫। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: লি'আন, হাদিস নং ১৫০০।
📄 উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশ্ন অনুযায়ী সীমাবদ্ধতা, প্রশ্নকারীর আগ্রহের ওপর নির্ভর করে উত্তরে সংযুক্তি আর কখনো কখনো উপহার হিসেবে সামান্য পরিমাণ বৃদ্ধি করা
আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলো, কোন আমল সর্বোত্তম?
তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনয়ন করা।
আবার প্রশ্ন করা হলো, তারপর কোনটি?
তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলার রাস্তায় জিহাদ করা।
আবার প্রশ্ন করা হলো, তারপর কোনটি?
তিনি বললেন, কবুলকৃত হজ।
কখনো কখনো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনকারীর অস্থিরতা দূর করতে উত্তর বৃদ্ধি করতেন এবং তাকে সেই উত্তরের মাধ্যমে প্রশান্তি দিতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. হতে বর্ণিত আছে,
এক ব্যক্তি এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করল, কোন আমল সর্বোত্তম?
তিনি বললেন, সময়মতো নামাজ পড়া, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, তারপর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।
কখনো কখনো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনকারীর জন্য উপহারস্বরূপ এবং কোনো বিষয়ে উৎসাহ প্রদানের জন্য উত্তর বৃদ্ধি করতেন।
উবাই ইবনে কা'ব রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
রাতের দুই তৃতীয়াংশ প্রহর অতিবাহিত হয়ে গেলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং বলতেন, "হে লোকসকল, তোমরা আল্লাহ তাআলার জিকির করো। আল্লাহ তাআলার জিকির করো। প্রথম ফুঁৎকারের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তার পরেই দ্বিতীয় ফুঁৎকার আসবে। তাতে রয়েছে মৃত্যুর ভয়াবহতা। তাতে রয়েছে মৃত্যুর ভয়াবহতা।”
উবাই রাযি. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার ওপর বেশি বেশি দুরুদ পাঠ করি। তাই আমি আপনার ওপর দুরুদ পাঠ করার জন্য কতটুকু সময় খরচ করব?
তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা হয়।
উবাই রাযি. বলেন, আমি বললাম, এক চতুর্থাংশ?
তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা, যদি বৃদ্ধি করো তাহলে তোমার জন্যই কল্যাণকর।
আমি বললাম, অর্ধেক?
তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা, যদি বৃদ্ধি করো তাহলে তোমার জন্যই কল্যাণকর।
আমি বললাম, তাহলে দুই তৃতীয়াংশ?
তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা, যদি বৃদ্ধি করো তাহলে তোমার জন্য কল্যাণকর।
আমি বললাম, তাহলে আমি পুরোটা সময় আপনার জন্যই দুরুদ পাঠ করব।
তিনি বললেন, তাহলে তা তোমার দুশ্চিন্তা দূর হওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই রাযি.-এর কাছে স্পষ্ট করে দিলেন যে, সকল দুয়ায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দুরুদ পাঠ করা হলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলার কাছে বিশাল সওয়াব লাভ করবে। আর এটি তার সকল দুশ্চিন্তা দূরীকরণে এবং সকল অপরাধ হতে ক্ষমা লাভে যথেষ্ট হবে। এ কথা বলে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি বেশি বেশি দুরুদ পাঠে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে মু'আয ইবনে জাবাল রাযি. হতেও হাদিস বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
আমি এক সফরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। একদিন চলতি পথে আমি তার নিকটে পৌঁছে গেলাম।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি কাজের সংবাদ দিন, যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছ। তবে আল্লাহ তাআলা যার জন্য সহজ করে দেন, নিশ্চয়ই তা তার জন্য সহজ হবে। তুমি আল্লাহ তাআলার ইবাদত করবে এবং তার সাথে কোনো বস্তুকে শরিক করবে না। নামাজ আদায় করবে। জাকাত দেবে। রমজানের রোজা রাখবে এবং বাইতুল্লার হজ করবে।
এরপর তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে কল্যাণের দুয়ার সম্বন্ধে অবহিত করব না? রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ। আর দান-সদকা করা এবং কোনো ব্যক্তি মধ্যরাতে নামাজ আদায় করা পাপকে এমনভাবে নির্বাপিত করে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নির্বাপিত করে দেয়। মুয়াজ ইবনে জাবাল রাযি. বলেন, এরপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
تتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ
"তাদের পিঠ বিছানা থেকে পৃথক থাকে।"
এখান থেকে নিয়ে "يَعْمَلُونَ" পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন। [সূরা সেজদা: ১৬, ১৭]
তারপর বললেন, আমি কি তোমাকে সমস্ত আমলের মূল, স্তম্ভ এবং সর্বোচ্চ শিখর সম্পর্কে অবহিত করব না?
আমি বললাম, অবশ্যই, ইয়া রাসুলাল্লাহ।
তিনি বললেন, সকল আমলের মূল হচ্ছে ইসলাম। তার স্তম্ভ হচ্ছে নামাজ। আর সর্বোচ্চ চূড়া হচ্ছে জিহাদ।
তারপর বললেন, আমি কি তোমাকে এসব কিছুর সারনির্যাস সম্পর্কে অবহিত করব না?
আমি বললাম, অবশ্যই ইয়া রাসুলাল্লাহ।
তিনি বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জিহ্বা ধরে বললেন, তুমি এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী, আমরা যে কথাবার্তা বলি, এ ব্যাপারেও কি আমাদেরকে পাকড়াও করা হবে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মু'আয, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক, মানুষকে শুধু তার জিহ্বার উপার্জনের কারণেই নিজ চেহারায় ভর করিয়ে অথবা নাকের ডগায় ভর করিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
আমরা দেখতে পেলাম যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু'আযের প্রশ্নের তুলনায় তার উত্তর বৃদ্ধি করেই যাচ্ছেন। যাতে করে তাকে কিছু উপকারী বিষয় শিক্ষা দিতে পারেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি না জানাতেন তাহলে তিনি তা কখনোই জানতেন না।
টিকাঃ
৩০ বুখারি, পরিচ্ছেদ: ঈমান, অধ্যায়: যারা বলে ঈমানই হচ্ছে আমল, হাদিস নং ২২। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: ঈমান, অধ্যায়: আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনা সর্বোত্তম আমল হওয়ার বিবরণ।
৩১ বুখারি, পরিচ্ছেদ: তাওহিদ, অধ্যায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাজকে আমল হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পাঠ করবে না তার নামাজ সম্পূর্ণ হবে না। হাদিস নং ৭০৯৬। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: ঈমান, অধ্যায় ঈমান সর্বোত্তম আমল, হাদিস নং ৮৫।
৩২ তিরমিযি, হাদিস নং ২৪৫৭, হাদিসটিকে তিরমিযি রহ. হাসানুন সহিহুন আখ্যা দিয়েছেন। মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৩৫৭৮, তাহকিক : মুস্তফা আবদুল কাদির আতা, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ-বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪১১ হিজরি, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ, তিনি বলেছেন, এই হাদিসটির সনদ সহিহ তবে বুখারি ও মুসলিম রহ. তা আনেননি। ইমাম ইবনে হাজার হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। দেখুন, নাতায়িজুল আফকার ফি তাখরিজি আহাদিসিল আযকার, তাহকিক : হামদি আবদুল মাজিদ আস-সালাফি, দারু ইবনে কাসির, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪২৯ হিজরি, ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ, ৪/১৬।
৩৩ তিরমিযি, হাদিস নং ২৬১৬, ইমাম তিরমিযি রহ. হাদিসটিকে হাসানুন সহিহুন আখ্যা দিয়েছেন। সুনানুন নাসায়ি, হাদিস নং ১১৩৯৪। সুনানে ইবনে মাজাহ, ৩৯৭৩, তাহকিক : মুহাম্মদ ফুয়াদ আব্দুল বাকি, দারুল ফিকর-বৈরুত। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২১২১, শু'আইব আল-আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি তার সনদ এবং শাহেদ হাদিসের ভিত্তিতে বিশুদ্ধ। মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৩৫৪৮, হাকিম বলেন, শাইখাইন তথা ইমাম বুখারি এবং মুসলিম রহ.-এর শর্ত অনুযায়ী হাদিসটি সহিহ। কিন্তু তারা হাদিসটি বর্ণনা করেননি। ইমাম যাহাবি তার সাথে একমত পোষণ করেছেন।