📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 মহৎ হৃদয় এবং অপর পক্ষের মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্নে বিরক্তি প্রকাশ না করা

📄 মহৎ হৃদয় এবং অপর পক্ষের মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্নে বিরক্তি প্রকাশ না করা


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সহনশীল এবং মহৎ হৃদয়ের অধিকারী। যদি কেউ প্রশ্ন করতে গিয়ে বাড়াবাড়িও করত তবুও তিনি বিরক্ত হতেন না। কিছু কিছু লোক তার কাছে এসে প্রশ্নোত্তর এবং সংলাপকে দীর্ঘায়িত করত। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্য এবং সহনশীলতার সাথে তাদের উত্তর দিতেন। কোনো প্রকার বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। আবু যর রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, সর্বোত্তম আমল কোনটি?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং তার রাস্তায় জিহাদ করা।"
তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কোন গোলাম মুক্ত করা সর্বোত্তম?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মনিবের নিকট অধিক প্রিয় এবং অধিক মূল্যবান গোলাম।
তিনি বলেন, আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, আমি যদি এমনটি না করতে পারি তাহলে কী উপায়?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে কোনো শ্রমিককে সাহায্য করবে অথবা কোনো প্রতিবন্ধীকে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, আমি আবারও জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, যদি আমি কাজ করতেও অক্ষম হই, তাহলে কী উপায়?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে মানুষকে তোমার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ রাখবে। কেননা, এটি তোমার নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি সদকাস্বরূপ।
এমনিভাবে ওই ব্যক্তির ঘটনা, যিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উত্তম আচরণের অধিক উপযুক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক আগন্তুক আসল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে উপযুক্ত কে?
তিনি বললেন, তোমার মা।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে?
তিনি বললেন, তারপর তোমার মা।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি আবার বললেন, তারপর তোমার মা।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি এবার বললেন, তারপর তোমার বাবা।

টিকাঃ
১৯ বুখারি, পরিচ্ছেদ: গোলাম আজাদ করা, অধ্যায়: কোন গোলাম আজাদ করা সর্বোত্তম? হাদিস নং ২৩৮২। মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, অধ্যায়: আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা সর্বোত্তম আমল হওয়ার বিবরণ, হাদিস নং ৮৪, হাদিসের বাক্য তার বর্ণনা থেকেই চয়িত।
২০ বুখারি, পরিচ্ছেদ: শিষ্টাচার, অধ্যায়: উত্তম আচরণের অধিক উপযুক্ত কে? হাদিস নং ৫৬২৬। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তা রক্ষা এবং শিষ্টাচার, অধ্যায়: পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার এবং তারাই এর অধিক উপযুক্ত হওয়ার বিবরণ।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 অপর পক্ষের মানসিক অবস্থা নির্ণয়

📄 অপর পক্ষের মানসিক অবস্থা নির্ণয়


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যথার্থ সম্মান করা সত্ত্বেও কখনো কখনো কোনো কোনো সাহাবির মানসিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে থাকত না। ফলে তিনি অনুচিত পন্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলতেন। কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সাহাবির পরিস্থিতি মেনে নিতেন এবং সহনশীলতা অবলম্বন করতেন। তার থেকে যে আচরণ প্রকাশ পেল সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। হুদায়বিয়া সন্ধির পরবর্তী সময়ে প্রসিদ্ধ ও সম্মানিত সাহাবি উমর রাযি.-এর কাছ থেকে এরূপ আচরণ প্রকাশ পেয়েছিল। তিনি দেখছিলেন যে, সন্ধিচুক্তির শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অন্যায্য। বিশেষ করে তিনি যখন দেখলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু জান্দাল ইবনে সুহাইল ইবনে আমরকে কুরাইশের প্রতিনিধিদলের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, অথচ আবু জান্দাল মুসলিম হয়ে এসেছিল, তখন তিনি ব্যাপারটি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি দেখলেন যে, এর মাধ্যমে মুসলমানদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। তাই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে গিয়ে বললেন, আপনি কি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে প্রেরিত নবী নন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই।
তিনি বলেন, আমি বললাম, আমরা সত্যের ওপর আর আমাদের শত্রুরা কি বাতিলের ওপর নয়?
তিনি বললেন, অবশ্যই।
আমি বললাম, তাহলে আমরা আমাদের ধর্মকে অপমানিত হতে দিচ্ছি কেন?
তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ তাআলার রাসুল এবং আমি তার নাফরমানি করব না। তিনিই আমার সাহায্যকারী।
আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলতেন না যে, আমরা অচিরেই বাইতুল্লায় যাব এবং তাওয়াফ করব?
তিনি বললেন, অবশ্যই, তবে আমি কি তোমাকে এ কথা বলেছি যে, আমরা এ বছরেই সেখানে যাব?
তিনি বলেন, আমি বললাম, না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার বললেন, তুমি নিশ্চয়ই বাইতুল্লার কাছে যাবে এবং তা তাওয়াফ করবে।
এখানে আমরা দেখতে পেলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-এর পরিস্থিতি এবং দ্বীনের প্রতি তার চেতনা বুঝে নিয়েছিলেন। আর উমর রাযি.-এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল তার শক্তিমত্তা, চেতনা এবং অগ্রগামিতা। তাই তিনি এখানে বিশাল অর্জন আদায়ের জন্য সামান্য অপদস্থতা মেনে নিতে পারেননি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-এর ইতিহাস এবং ইসলামের জন্য তার ত্যাগের কথা জানতেন। তিনি এ-ও জানতেন যে, উমর প্রথমবারের মতো এরকম আচরণ করছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এভাবে কথা বলা তার স্বভাবের মধ্যে নেই। এ সমস্ত কারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-এর এই আচরণের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করেননি।

টিকাঃ
২১ বুখারি, পরিচ্ছেদ : শর্তাবলি, অধ্যায় : জিহাদ এবং শত্রুপক্ষের সাথে সন্ধিচুক্তি করা এবং তা লিপিবদ্ধ করার শর্তসমূহ, হাদিস নং ২৫৮১।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 অপর পক্ষকে সাহায্য করা এবং তার সাহস বাড়ানোর প্রতি আগ্রহী হওয়া

📄 অপর পক্ষকে সাহায্য করা এবং তার সাহস বাড়ানোর প্রতি আগ্রহী হওয়া


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কখনো কখনো ভীষণ বিপদাগ্রস্ত লোক এসে সাহায্য এবং সমাধান চাইত। যেমন বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা রাযি. এক ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে উপবিষ্ট ছিলাম। ইত্যবসরে তার কাছে এক আগন্তুকের আগমন ঘটে। সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কী হয়েছে?
সে বলল, আমি রোজা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেলেছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কি গোলাম আজাদ করার মতো সাধ্য আছে?
লোকটি বলল, না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি কি ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোজা রাখতে পারবে?
লোকটি বলল, না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি কি ৬০ জন অসহায় ব্যক্তির মেহমানদারি করতে পারবে?
লোকটি বলল, না।
আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেমে গেলেন। এমতাবস্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে খেজুরের একটি পাত্র নিয়ে আসা হলো।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রশ্নকারী কোথায়?
লোকটি বলল, জি, আমিই হুজুর।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা নাও এবং পুরোটা দান করে দাও।
লোকটি বলল, কাকে দান করব? আমার চেয়েও দরিদ্র লোক কি আছে? আল্লাহ তাআলার শপথ, আরবের মরুভূমির দুই প্রান্তে আমার পরিবারের চেয়ে দরিদ্র কোনো পরিবার নেই।
এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। এমনকি তাঁর দন্তপাটি দৃশ্যমান হয়ে গেল। এরপর বললেন, যাও, এগুলো তোমার পরিবারকে আহার করাও।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 বিশেষ করে জনসম্মুখে

📄 বিশেষ করে জনসম্মুখে


নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সামর্থ্যের অমর্যাদা করতেন না। তাদের মন্দ দিক এবং অপরাধের কথা উল্লেখ করে তাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেন না। যেমনটি ঘটেছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হিন্দা বিনতে উতবার মধ্যে। মক্কা বিজয়ের পর নারীদের কাছ থেকে বাইআত গ্রহণ করার সময় এ ঘটনা ঘটে। তার আগে আমাদের হিন্দা বিনতে উতবার পরিচয় এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তার কী ঘটনা ঘটেছিল, তা জেনে নেওয়া অত্যাবশ্যক। হিন্দা হলেন কুরাইশ এবং পুরো মক্কা মুকাররমার একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা রবী'আর মেয়ে। তার ভাই আবু হুযাইফা ইবনে উতবাহ আগেই ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণে তার পরিবারের কুফরির মূলে ধ্বস নেমে আসে। তারা ইসলামের এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিপক্ষে শত্রুতায় নেমে পড়ে। বিশেষ করে হিন্দার অন্তরে ইসলাম এবং রাসুল-বিদ্বেষ লালিত হতে থাকে। আর মক্কার অন্যতম নেতা এবং বদর যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কুরাইশদের প্রধানতম নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের স্ত্রী হওয়া তার এই শত্রুতাকে আরও দৃঢ় করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বদর যুদ্ধের সময়ের কথা। যুদ্ধের শুরুতেই হিন্দার পিতা উতবা, তার চাচা শাইবা ইবনে রবী'আ এবং তার ভাই ওলীদ ইবনে উতবা মল্লযুদ্ধের জন্য এগিয়ে যায়। হামজা, আলি এবং উবাইদা ইবনুল হারিস রাযি. তাদের মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন। হামজা হিন্দার পিতাকে হত্যা করেন। আলি তার ভাইকে হত্যা করেন। আর উবাইদার সাথে শাইবার দুইবার তলোয়ারের আঘাত বিনিময় হয়। পরবর্তীতে হামজা এবং আলির সাহায্যে তাকেও হত্যা করা হয়।
হিন্দা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হামযা রাযি.-এর কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়ে তার ক্রোধ প্রশমিত করার লক্ষ্যে উহুদ যুদ্ধের পূর্বে একটি দাস ক্রয় করে। সেই দাসের নাম ছিল ওয়াহশি। সে তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়, যদি সে হামযাকে হত্যা করতে পারে তাহলে তাকে স্বাধীন করে দেওয়া হবে এবং অনেক সম্পদ দেওয়া হবে। ইবনে ইসহাক বলেন, হিন্দা বিনতে উতবা এবং তার সাথের নারীরা যুদ্ধে নিহত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিগণের অঙ্গহানি করতে শুরু করে। তারা তাদের নাক ও কান কর্তন করতে থাকে। এমনকি হিন্দা লোকদের কান এবং নাক থেকে দুল এবং হার খুলে নিয়ে সেই দুল, হার এবং আংটিগুলোকে জুবাইর ইবনে মুত'ইমের গোলাম ওয়াহশিকে দিয়ে দেয়। সে হিংস্রতার সাথে হামযা রাযি.-এর কলিজা বিচ্ছিন্ন করে। তারপর দাঁত দিয়ে চাবিয়ে তা বিকৃত করতে না পেরে অবশেষে গিলে ফেলে।
হিন্দা এভাবেই তার অন্তরে শত্রুতা লালন করে যেতে থাকে। এরই মধ্যে মক্কা বিজয়ের সময় চলে আসে। আবু সুফিয়ান মক্কায় প্রবেশ করে কুরাইশদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য আহ্বান করতে লাগলে হিন্দা তাকে তিরস্কার করা শুরু করে।
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, আবু সুফিয়ান যখন মক্কায় ফিরে আসলেন তখন উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার দিয়ে বললেন, হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, এই তো মুহাম্মদ তোমাদের নিকটে চলে এসেছেন। তোমাদের ব্যাপারে তার কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে।
এ কথা শুনে হিন্দা বিনতে উতবা তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার গোঁফ টেনে ধরল। তারপর বলল, ওই থলের মতো, তৈলাক্ত এবং মাংসলদেহীকে হত্যা করো, পুরো গোত্র যার নিন্দা করেছে।
আবু সুফিয়ান বললেন, তোমাদের জন্য আফসোস! তোমাদের অন্তরের এ প্ররোচনা যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে। তিনি তোমাদের কাছে চলে এসেছেন এবং তোমাদের ব্যাপারে তার কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ।
তারা বলল, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। তোমার গৃহ আমাদের কী কাজে আসবে?
আবু সুফিয়ান বললেন, যে ব্যক্তি তার গৃহের দরজা বন্ধ করে দেবে, সে নিরাপদ। যে মসজিদে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। তখন মানুষ বিভক্ত হয়ে তাদের গৃহ এবং মসজিদের দিকে ছুটে গেল। এ সকল চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হিন্দার অন্তরে ইসলাম তার পথ তৈরি করে নেয়। পুরুষদের বাইআত গ্রহণ শেষ হলে অন্যান্য মহিলাদের সাথে হিন্দাও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বাইআত নিতে আসে। তাদের বাইআত গ্রহণ শুরু হলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমরা আমার কাছে এই মর্মে বাইআত গ্রহণ করো যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কোনো বস্তুকে শরিক করবে না।
তখন হিন্দা নেকাব পরিহিতা ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিনতে পারছিলেন না। সে বলে উঠল, আল্লাহর শপথ, আপনি আমাদের থেকে এমন অঙ্গীকার নিচ্ছেন, যা পুরুষদের কাছ থেকে গ্রহণ করেননি।
কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আপত্তির দিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না এবং “তোমরা চুরি করবে না” বলে তার বাক্য সমাপ্ত করলেন।
তখন হিন্দা বলা শুরু করল, হে আল্লাহর রাসুল, আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ লোক। সে আমাকে আমার এবং আমার সন্তানাদির প্রয়োজনীয় খরচাপাতি প্রদান করে না। তাই আমি যদি তার অজ্ঞাতে তার সম্পদ থেকে কিছু গ্রহণ করি তাহলে কি অপরাধ হবে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপনার এবং সন্তানাদির জন্য যতটুকু যথেষ্ট হবে, তা ইনসাফের সাথে নেবেন।
এরপরপরই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারলেন যে, তিনি এতক্ষণ আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা এর সাথে কথা বলছিলেন।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আপনি হিন্দা বিনতে উতবা?
সে বলল, হ্যাঁ, আমি হিন্দা বিনতে উতবা। অতএব আমার অতীতে যা প্রকাশ পেয়েছে, তা ক্ষমা করে দিন। আল্লাহও আপনাকে ক্ষমা করবেন। নিশ্চয়ই সেটা ছিল হিন্দা বিনতে উতবার জীবনের একটি ঘৃণিত অধ্যায়।
প্রিয় পাঠক, হয়তো আপনারা মনে মনে ভাবছেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিন্দার দীর্ঘ ইতিহাস, হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের স্মৃতি এবং হিন্দা তার সাথে যা করেছিল সেগুলো মনে করে হিন্দার সাথে বিরূপ আচরণ করতে পারেন।
কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় ক্ষমা করে দিতেন এবং উপেক্ষা করতেন। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু সেই দুঃখজনক অধ্যায় স্মরণ করে হিন্দাকে একটি কথাও বলেননি। বরং তিনি তার প্রতিটি হক থেকে সরে এসেছেন এবং উদারতার সাথে হিন্দার ইসলাম গ্রহণ মেনে নিয়েছেন। তারপর মহিলাদের বাইআত গ্রহণ পূর্ণ করার প্রতি মনোযোগী হয়েছেন। মনে হয়েছিল, যেন তার মাঝে কখনো কোনো প্রতিক্রিয়াই ঘটেনি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর বললেন, "আরও অঙ্গীকার করো যে, তোমরা ব্যভিচার করবে না"।
হিন্দা তার আপত্তি উত্থাপন থেকে বিরত হলো না। সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, কোনো স্বাধীন মহিলা কি ব্যভিচার করতে পারে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থামলেন না। বরং তিনি তার বাক্য পূর্ণ করলেন। বললেন, “আরও অঙ্গীকার করো যে, তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।”
হিন্দা বলে উঠল, আমরা শৈশবে তাদেরকে লালনপালন করেছি আর যুবক অবস্থায় আপনি তাদেরকে হত্যা করেছেন। আপনি কি আমাদের জন্য এমন কোনো সন্তান অবশিষ্ট রেখেছেন, যাকে আপনি বদর যুদ্ধের দিন হত্যা করেননি?
বদরের দিন আপনি তাদের পিতাদেরকে হত্যা করলেন। আর এখন আপনি আমাদেরকে তাদের সন্তানদের ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছেন!
রাসুল সাল্লাল্লাহু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। তিনি হিন্দাকে এ কথা বলতে পারতেন যে, বদরের যুদ্ধে আমরা তাদেরকে কেন হত্যা করেছি? তা কি আমাদের জন্য সংগত ছিল না? কারণ, মুশরিকরা-তাদের মধ্যে তোমার পিতা, চাচা, ভাই এবং ছেলেও আছে—আমাদেরকে আমাদের ধর্ম থেকে হটিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে। তারা আমাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করেছে এবং আমাদের ঘর-বাড়ি ও সম্পদের ওপর হামলা করেছে।
কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব কিছুই বললেন না। বরং তার জবাব ছিল খুবই আশ্চর্য ধরনের।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন এবং তিনি নীরব থাকলেন। তিনি বিষয়টিকে উদারতার সাথে গ্রহণ করলেন এবং হিন্দা বিনতে উতবার পরিস্থিতি মেনে নিলেন। তার ওপর থেকে ইসলামের কাঠিন্যকে সরিয়ে দিলেন। এরপর বললেন, “তোমরা আরও অঙ্গীকার করো যে, তোমাদের পশ্চাতে এবং সম্মুখে কোনো অপবাদ রটাবে না।”
হিন্দা বলে উঠল, আল্লাহর শপথ, নিশ্চয়ই অপবাদ রটানো নিন্দনীয় কাজ।
তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা আরও অঙ্গীকার করো যে, সৎকাজে আমার অবাধ্যাচারণ করবে না।"
হিন্দা বলে উঠল, আল্লাহর শপথ, আমরা সৎকাজে আপনার অবাধ্যতা করার কথা আমাদের অন্তরে লালন করে এখানে বসিনি।
এরপর সে বলল, এমন এক সময় ছিল যখন পৃথিবীতে আপনাদের অপদস্থ হওয়া ছিল আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়। তবে আজ এমন অবস্থা এসে দাঁড়িয়েছে যে, আমার কাছে আপনাদের সম্মানিত হওয়া ব্যতীত অধিক প্রিয় কোনো বিষয় নেই।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, আপনাকেও এর উত্তম প্রতিদান দেওয়া হবে।
পরবর্তীকালে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ধর্মের নতুন কোনো নিয়ম প্রবর্তিত হলে হিন্দাকে এর দীক্ষা দিয়েছেন। এভাবেই হিন্দা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার পরিবারবর্গের প্রতি অধিক ভালোবাসা পোষণকারীদের দলভুক্ত হয়ে যায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে কথোপকথনের ক্ষেত্রে যে উত্তম পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, তা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

টিকাঃ
২২ বুখারি, পরিচ্ছেদ: রোজা, অধ্যায়: যদি কেউ রমজানে স্ত্রী মিলন করে এবং কাফফারা আদায় করার মতো সম্পদ তার কাছে না থাকে তাহলে তাকে সদকা দেওয়া হলে সে যেন তার মাধ্যমে কাফফারা আদায় করে, হাদিস নং ১৮৩৪। হাদিসের বাক্য তার বর্ণনা থেকে চয়িত। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: রোজা, অধ্যায়: রমজানের দিবস কালে রোজাদারের উপর স্ত্রী মিলন হারাম হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ এবং কাফফারা ওয়াজিব হওয়া, হাদিস নং ১১১১।
২৩ দেখুন: ইবনে কাসির রহ. রচিত আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, তাহকিক: মুস্তফা আবদুল ওয়াহেদ, দারুল মা'রেফা-বৈরুত, ১৩৯২ হিজরি; ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ, ২/৪২৩। ইবনু সাইয়িদিন্নাস রহ. রচিত উয়ুনুল আসরি ফি ফুনুনিল মাগাযি ওয়াশ শামায়িলি ওয়াস সিয়ারি, তালিক তথা সংযুক্তি: ইবরাহিম মুহাম্মদ রমজান, দারুল কলম-বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪১৪ হিজরি; ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ, ১/৩৮১। ইমাম তবারি রহ. রচিত তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, দারুল মা'আরিফ-কায়রো, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৮৭ হিজরি; ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ, ২/২২।
২৪ ইবনে হিশাম রচিত আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ২/৯১। ইবনে কাসির রচিত আস-সিরাতুন নববিয়‍্যাহ, ৩/৭৪। তবারি রচিত তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ২/৫২৪। ইবনুল আসির রচিত আল-কামিল ফিত তারিখ, দারু ইহইয়ায়িত তোরাসিল আরবি-বৈরুত, ২/৪৮।
২৫ দেখুন ইবনে কাসির রচিত আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/৬০৩, ৬০৪। ইমাম তবারি রচিত- রচিত তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক ৩/৬১, ৬২'।
২৬ এর অর্থ হচ্ছে: অচিরেই আপনাকে এর চেয়ে বেশি দান করা হবে, আপনার অন্তরে ঈমানকে গেঁথে দেওয়া হবে, আল্লাহ এবং তার রাসুলের জন্য আপনার ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের ঘৃণা থেকে আপনার প্রত্যাবর্তন সুদৃঢ় হবে। মুসলিম পরিচ্ছেদ: বিচার-বিধান, অধ্যায়: হিন্দা বিনতে উতবার বিচার, হাদিস নং ১৭১৪।
২৭ বুখারি: পরিচ্ছেদ: সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের মর্যাদা, অধ্যায়: হিন্দা বিনতে উতবার আলোচনা, হাদিস নং ৩৬১৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00