📄 অপর পক্ষের বিরক্তির ওপর ধৈর্যধারণ
কথোপকথনের সময় কখনো কখনো অপর পক্ষে অভদ্র, কঠোর এবং মুনাফিক প্রকৃতির লোক থাকত। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিরক্ত করত এবং কষ্ট দিত। আবু সাইদ রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনিমতের মাল বণ্টন করছিলেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনে যুল খুওয়াইসির এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করুন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি ধ্বংস হও, আমি যদি ন্যায়-ইনসাফ না করি তাহলে আর কে করবে?"
উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. বললেন, আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। কেননা তার এমন কিছু সঙ্গী রয়েছে যারা তোমাদের তুচ্ছ মনে করে। তোমাদের নামাজ ও রোজাকে তাদের নামাজ-রোজা অপেক্ষা সাধারণ মনে করে। যেভাবে ধনুক থেকে তির বেরিয়ে যায়, সেভাবে তারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা তিরের পালকে তাকাবে, সেখানে কিছুই পাবে না। তিরের লোহায় তাকাবে, সেখানেও কিছু পাবে না। এরপর তিরের ফলায় তাকাবে, সেখানেও কিছু পাবে না। এরপর ধনুকের ডালের দিকে তাকাবে, সেখানেও কিছু পাবে না। এমনকি তিরে মল এবং রক্তের দাগও লাগবে না। তাদের নিদর্শন হচ্ছে, তাদের মধ্যকার এক লোকের একটি হাত (অথবা তিনি বলেছেন,) তার একটি স্তন মহিলাদের স্তনের মতো হবে, (অথবা বলেছেন,) একটি গোশতের টুকরোর মতো হবে, যা ওঠানামা করতে থাকবে। লোকদের মধ্যে বিরোধের সময় তাদের আবির্ভাব ঘটবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন যে, এই লোকটিই হবে খারেজিদের মূল। তা সত্ত্বেও তিনি অন্যায় অপবাদের জন্য তাকে তিরস্কার করেই ক্ষান্ত থেকেছেন এবং উমর রাযি.-কে তাকে শাসানো অথবা হত্যা করা থেকে নিবৃত্ত রেখেছেন। এটি হচ্ছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুন্নত বৈশিষ্ট্যাবলির মধ্য হতে অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি তার প্রতিটি আলাপচারিতায়ই ছিলেন অনন্য।
টিকাঃ
১৭ আসসিয়ারুন নববিয়্যাহ-ইবনে হিশাম, তাহকিক: মুস্তফা আস-সাফা এবং অন্যন্যগণ, মুস্তফা আল-বাবি আল-জালবি এবং তার সন্তানদের প্রকাশনা হতে প্রকাশিত, মিসর, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৭৫ হিজরি/১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ, ২/২১৪, ২২৩। মু'জামুল কাবির-তাবারানি, হাদিস নং ৫৪১৬, তাহকিক হামদি বিন আবদুল মাজিদ আস-সালাফি, মাকতাবাতুল উলুমি ওয়াল হিকাম-মসুল, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪০৪ হিজরি; ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ। ইমাম হায়ছামি বলেন, এই হাদিসটি ইমাম বাযযার এবং তাবারানি উভয়েই বর্ণনা করেছেন। উভয়ের সনদেই মুহাম্মদ ইবনে আমর নামক একজন রাবি আছেন। শুধু তার হাদিসগুলো হাসান পর্যায়ের। আর সনদের অন্যান্য রাবিগণ সকলেই সিকাহ। দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ওয়া মামবাউল ফাওয়ায়েদ, ৬/১৩২।
১৮ বুখারি, পরিচ্ছেদ: আল্লাহদ্রোহী এবং ধর্মত্যাগীদের ধর্মের পথে আহ্বান করা এবং তাদের সাথে যুদ্ধ সম্পর্কিত, অধ্যায়: যারা মনোতুষ্টির জন্য এবং লোকেরা যেন তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ না করে সেদিকে লক্ষ করে খারেজিদের সাথে যুদ্ধ ত্যাগ করে তাদের সম্পর্কিত, হাদিস নং ৬৫৩৪। মুসলিম, কিতাবুয যাকাত, খারেজি এবং তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত অধ্যায়। হাদিস নং ১০৬৪।
📄 মহৎ হৃদয় এবং অপর পক্ষের মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্নে বিরক্তি প্রকাশ না করা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সহনশীল এবং মহৎ হৃদয়ের অধিকারী। যদি কেউ প্রশ্ন করতে গিয়ে বাড়াবাড়িও করত তবুও তিনি বিরক্ত হতেন না। কিছু কিছু লোক তার কাছে এসে প্রশ্নোত্তর এবং সংলাপকে দীর্ঘায়িত করত। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্য এবং সহনশীলতার সাথে তাদের উত্তর দিতেন। কোনো প্রকার বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। আবু যর রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, সর্বোত্তম আমল কোনটি?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং তার রাস্তায় জিহাদ করা।"
তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কোন গোলাম মুক্ত করা সর্বোত্তম?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মনিবের নিকট অধিক প্রিয় এবং অধিক মূল্যবান গোলাম।
তিনি বলেন, আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, আমি যদি এমনটি না করতে পারি তাহলে কী উপায়?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে কোনো শ্রমিককে সাহায্য করবে অথবা কোনো প্রতিবন্ধীকে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, আমি আবারও জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, যদি আমি কাজ করতেও অক্ষম হই, তাহলে কী উপায়?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে মানুষকে তোমার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ রাখবে। কেননা, এটি তোমার নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি সদকাস্বরূপ।
এমনিভাবে ওই ব্যক্তির ঘটনা, যিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উত্তম আচরণের অধিক উপযুক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক আগন্তুক আসল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে উপযুক্ত কে?
তিনি বললেন, তোমার মা।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে?
তিনি বললেন, তারপর তোমার মা।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি আবার বললেন, তারপর তোমার মা।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি এবার বললেন, তারপর তোমার বাবা।
টিকাঃ
১৯ বুখারি, পরিচ্ছেদ: গোলাম আজাদ করা, অধ্যায়: কোন গোলাম আজাদ করা সর্বোত্তম? হাদিস নং ২৩৮২। মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, অধ্যায়: আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা সর্বোত্তম আমল হওয়ার বিবরণ, হাদিস নং ৮৪, হাদিসের বাক্য তার বর্ণনা থেকেই চয়িত।
২০ বুখারি, পরিচ্ছেদ: শিষ্টাচার, অধ্যায়: উত্তম আচরণের অধিক উপযুক্ত কে? হাদিস নং ৫৬২৬। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তা রক্ষা এবং শিষ্টাচার, অধ্যায়: পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার এবং তারাই এর অধিক উপযুক্ত হওয়ার বিবরণ।
📄 অপর পক্ষের মানসিক অবস্থা নির্ণয়
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যথার্থ সম্মান করা সত্ত্বেও কখনো কখনো কোনো কোনো সাহাবির মানসিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে থাকত না। ফলে তিনি অনুচিত পন্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলতেন। কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সাহাবির পরিস্থিতি মেনে নিতেন এবং সহনশীলতা অবলম্বন করতেন। তার থেকে যে আচরণ প্রকাশ পেল সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। হুদায়বিয়া সন্ধির পরবর্তী সময়ে প্রসিদ্ধ ও সম্মানিত সাহাবি উমর রাযি.-এর কাছ থেকে এরূপ আচরণ প্রকাশ পেয়েছিল। তিনি দেখছিলেন যে, সন্ধিচুক্তির শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অন্যায্য। বিশেষ করে তিনি যখন দেখলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু জান্দাল ইবনে সুহাইল ইবনে আমরকে কুরাইশের প্রতিনিধিদলের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, অথচ আবু জান্দাল মুসলিম হয়ে এসেছিল, তখন তিনি ব্যাপারটি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি দেখলেন যে, এর মাধ্যমে মুসলমানদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। তাই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে গিয়ে বললেন, আপনি কি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে প্রেরিত নবী নন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই।
তিনি বলেন, আমি বললাম, আমরা সত্যের ওপর আর আমাদের শত্রুরা কি বাতিলের ওপর নয়?
তিনি বললেন, অবশ্যই।
আমি বললাম, তাহলে আমরা আমাদের ধর্মকে অপমানিত হতে দিচ্ছি কেন?
তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ তাআলার রাসুল এবং আমি তার নাফরমানি করব না। তিনিই আমার সাহায্যকারী।
আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলতেন না যে, আমরা অচিরেই বাইতুল্লায় যাব এবং তাওয়াফ করব?
তিনি বললেন, অবশ্যই, তবে আমি কি তোমাকে এ কথা বলেছি যে, আমরা এ বছরেই সেখানে যাব?
তিনি বলেন, আমি বললাম, না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার বললেন, তুমি নিশ্চয়ই বাইতুল্লার কাছে যাবে এবং তা তাওয়াফ করবে।
এখানে আমরা দেখতে পেলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-এর পরিস্থিতি এবং দ্বীনের প্রতি তার চেতনা বুঝে নিয়েছিলেন। আর উমর রাযি.-এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল তার শক্তিমত্তা, চেতনা এবং অগ্রগামিতা। তাই তিনি এখানে বিশাল অর্জন আদায়ের জন্য সামান্য অপদস্থতা মেনে নিতে পারেননি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-এর ইতিহাস এবং ইসলামের জন্য তার ত্যাগের কথা জানতেন। তিনি এ-ও জানতেন যে, উমর প্রথমবারের মতো এরকম আচরণ করছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এভাবে কথা বলা তার স্বভাবের মধ্যে নেই। এ সমস্ত কারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-এর এই আচরণের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করেননি।
টিকাঃ
২১ বুখারি, পরিচ্ছেদ : শর্তাবলি, অধ্যায় : জিহাদ এবং শত্রুপক্ষের সাথে সন্ধিচুক্তি করা এবং তা লিপিবদ্ধ করার শর্তসমূহ, হাদিস নং ২৫৮১।
📄 অপর পক্ষকে সাহায্য করা এবং তার সাহস বাড়ানোর প্রতি আগ্রহী হওয়া
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কখনো কখনো ভীষণ বিপদাগ্রস্ত লোক এসে সাহায্য এবং সমাধান চাইত। যেমন বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা রাযি. এক ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে উপবিষ্ট ছিলাম। ইত্যবসরে তার কাছে এক আগন্তুকের আগমন ঘটে। সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কী হয়েছে?
সে বলল, আমি রোজা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেলেছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কি গোলাম আজাদ করার মতো সাধ্য আছে?
লোকটি বলল, না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি কি ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোজা রাখতে পারবে?
লোকটি বলল, না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি কি ৬০ জন অসহায় ব্যক্তির মেহমানদারি করতে পারবে?
লোকটি বলল, না।
আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেমে গেলেন। এমতাবস্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে খেজুরের একটি পাত্র নিয়ে আসা হলো।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রশ্নকারী কোথায়?
লোকটি বলল, জি, আমিই হুজুর।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা নাও এবং পুরোটা দান করে দাও।
লোকটি বলল, কাকে দান করব? আমার চেয়েও দরিদ্র লোক কি আছে? আল্লাহ তাআলার শপথ, আরবের মরুভূমির দুই প্রান্তে আমার পরিবারের চেয়ে দরিদ্র কোনো পরিবার নেই।
এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। এমনকি তাঁর দন্তপাটি দৃশ্যমান হয়ে গেল। এরপর বললেন, যাও, এগুলো তোমার পরিবারকে আহার করাও।