📄 অপরের মত গ্রহণ এবং দীর্ঘ সংলাপে না যাওয়া
পরামর্শসভার সবাই মিলে যে বিষয়ের ওপর একমত হতেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা-ই বাস্তবায়ন করতেন এবং চালু রাখতেন। তাদের সিদ্ধান্ত যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতের বিপরীত হতো তবুও। উহুদ যুদ্ধের কিছু সময় পূর্বে এমনটি ঘটেছিল। কুরাইশদের আগমন-সংবাদ জেনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করছিলেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি এক সুরক্ষিত বর্ম পরিহিত অবস্থায় আছি। আর দেখলাম, একটি ছাগল কুরবানি দেওয়া হচ্ছে। আমি এর ব্যাখ্যা করলাম এভাবে যে, সেই সুরক্ষিত বর্ম হচ্ছে মদিনা মুনাওয়ারা আর ছাগল হচ্ছে আমার উম্মত। আল্লাহই ভালো জানেন।"
জাবের রাযি. বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিগণকে বললেন, "আমরা মদিনাতে অবস্থান নিলে যদি তারা আমাদের সীমানায় প্রবেশ করে তাহলে সেখানেই আমরা তাদের সাথে লড়াই করব।”
সাহাবিগণ বললেন, “তারা তো জাহেলি যুগেই আমাদের এখানে প্রবেশ করতে পারেনি। তাহলে ইসলাম গ্রহণের পর প্রবেশ করতে দিই কীভাবে?”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “ও তোমাদের এই ব্যাপার!” এ কথা বলেই তিনি বর্ম পরিধান করলেন।
জাবের রাযি. বলেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে আনসারদের বক্তব্য হলো, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিতে চাইলাম। ফলে তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কথাই থাক।
কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “কোনো নবী যখন বর্ম পরিধান করে ফেলেন তখন তার জন্য লড়াই করা ব্যতীত তা খুলে ফেলা শোভনীয় নয়।”
সে সময়ে এমন ঘটনা ছিল খুবই বিরল; বরং আমরা বলতে পারি, সে সময়ে এমন ঘটনা ছিল অসম্ভব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশের মতের ওপর সাড়া দিলেন; যা তার মতের একেবারেই বিপরীত ছিল। যখন সাহাবিগণ তার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাইলেন তখন তিনি তাদের এ কথা বলে ফিরিয়ে দিলেন যে, আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুযায়ী অধিকাংশের মতকে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। আর সকলের উচিত সেই মত মেনে নেওয়া। এ ক্ষেত্রে শাসক থাকবে সকলের অগ্রগামী; চাই সে নবীই হোক না কেন।
এমনিভাবে খন্দকের যুদ্ধ এবং মুশরিকদের দ্বারা মদিনা মুনাওয়ারা অবরোধের সময়ও এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল। সে যুদ্ধে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৃঢ় প্রতিরোধকারীরূপে দাঁড়িয়ে যান। মুশরিকরাও প্রায় একমাসের মতো সময় তাঁকে অবরোধ করে রাখে। এ সময়ে তাদের মাঝে তির নিক্ষেপ ব্যতীত অন্য কোনো সংঘর্ষ হয়নি।
যখন লোকদের জন্য বিপদ তীব্র আকার ধারণ করল তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উয়াইনা ইবনে হিসন ইবনে হুযায়ফা ইবনে বদর এবং হারেস ইবনে আউফ ইবনে আবি হারেসা আল-মুররির কাছে সংবাদ পাঠালেন। তারা উভয়েই ছিল গাতফান গোত্রের সেনাপতি। তিনি তাদেরকে মদিনার ফল-ফলাদির তিন ভাগের এক ভাগ প্রদান করলেন; যাতে করে তারা তাদের অনুগত সৈন্যদলকে নিয়ে চলে যায়। তাদের মাঝে সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হতে থাকে। এমনকি তারা চুক্তি লিপিবদ্ধও করে ফেলে। তবে তাদের মাঝে কোনো সাক্ষী রাখা হয়নি এবং চুক্তি দৃঢ়ও করা হয়নি। বরং শুধু সাধারণ একটি চুক্তি হয়।
এ কাজ পরিপূর্ণরূপে সম্পন্ন করার সময় এলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ ইবনে মুয়াজ ও সাদ ইবনে উবাদাহ রাযি.-কে ডেকে পাঠান এবং তাদের কাছে এ ব্যাপারে পরামর্শ কামনা করেন। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, এটি কি এমন কোনো বিষয়, যা আপনার নিকট পছন্দনীয়? তাহলে তা আমরা করতে রাজি আছি। নাকি এমন কোনো বিষয়, যে সম্পর্কে আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক? নাকি এমন কোনো বিষয়, যা আপনি আমাদের ভালোর জন্য করতে চাচ্ছেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “বরং এটি আমি তোমাদের ভালোর জন্য করতে চাচ্ছি। আল্লাহর শপথ, আমি এ কাজ এ জন্যই করছি যে, আমি দেখতে পাচ্ছি, আরবরা তোমাদেরকে এক ধনুকে বিদ্ধ করে ফেলেছে এবং তোমাদেরকে সকল দিক থেকে ঘিরে ধরেছে। তাই আমি যেকোনো উপায়ে তোমাদের কাছ থেকে তাদের শক্তিমত্তা দূরীভূত করতে চাচ্ছি।”
তখন সাদ ইবনে মুয়াজ রাযি. তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা এবং সেই সম্প্রদায় আল্লাহ তাআলার সাথে অংশীদার স্থাপন এবং মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলাম। আমরা আল্লাহ তাআলার উপাসনা করতাম না এবং তার পরিচয় জানতাম না। আর তারা আতিথেয়তা অথবা ক্রয় ব্যতীত মদিনার কোনো খেজুর খেতে পারত না। এরপর আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন, আমাদেরকে তার দিকে পথপ্রদর্শন করেছেন এবং আমাদেরকে আপনার মাধ্যমে সমুন্নত করেছেন। আর আমরাই কিনা তাদেরকে আমাদের সম্পদ দিয়ে দেবো? আল্লাহর শপথ, আমাদের এর কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তাআলা তাদের মাঝে আর আমাদের মাঝে কোনো ফায়সালা করার আগ পর্যন্ত আমরা তাদেরকে শুধু তরবারির আঘাত প্রদান করতেই রাজি আছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তোমার কথাই থাকুক। এরপর চুক্তিনামাটি সাদ ইবনে মুয়াজ রাযি.-এর হস্তগত হলে তিনি তাতে যা কিছু লেখা হয়েছে, তা সব মুছে ফেলেন। এরপর বলেন, তারা যেন আমাদের সাথে লড়াই করে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুক্তি সম্পাদনের পথে একধাপ এগিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি সুনির্দিষ্ট মত গ্রহণ করেছেন। অন্যথায় তিনি যদি অন্য কোনো সিদ্ধান্তকে ভালো মনে করতেন তাহলে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধাপ্রদানকারী কেউ ছিল না।
টিকাঃ
১৫ বুখারি, পরিচ্ছেদ: অত্যাচার, অধ্যায়: ছাদে বা অন্যান্য স্থানে উঁচু কামরা নির্মাণ সম্পর্কিত, হাদিস নং ২৩৩৬। (তাহকিক প্রয়োজন) মুসলিম, পরিচ্ছেদ: তালাক, অধ্যায়: স্ত্রীদের কাছ থেকে ইলা করা এবং বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং তাদের ইখতিয়ার প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার বাণী : وان تظاهرا﴿ ]সুরা তাহরিম : ৪] সম্পর্কিত, হাদিস নং ১৪৭৯।
১৬ মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৪৮২৯। শু'আইব আরনাউত বলেন, হাদিসটি মুসলিম রহ.-এর শর্ত অনুযায়ী সহিহ লি গাইরিহি। সুনানে দারেমি, হাদিস নং ২১৫৯, তাহকিক: ফাওয়ায আহমাদ যামরালি এবং খালেদ আস-সাবউল ইলমি, দারুল কিতাবিল আরাবিয়্যাহ-বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪০৭ হিজরি। মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস নং ৯৭৩৫, তাহকিক : হাবিবুর রহমান আযমি, আল-মাকতাবুল ইসলামি-বৈরুত, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪০৩ হিজরি। ইমাম হায়সামি বলেন, আহমাদ রহ. হাদিসটি এনেছেন এবং এর প্রত্যেক বর্ণনাকারীগণই সহিহ। দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৬/১০৬, হাদিস নং ১০০৫৬। আলবানি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যা দিয়েছেন। দেখুন, আসসিলসিলাতুস সহিহাহ, হাদিস নং ১১০০।
📄 অপর পক্ষের বিরক্তির ওপর ধৈর্যধারণ
কথোপকথনের সময় কখনো কখনো অপর পক্ষে অভদ্র, কঠোর এবং মুনাফিক প্রকৃতির লোক থাকত। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিরক্ত করত এবং কষ্ট দিত। আবু সাইদ রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনিমতের মাল বণ্টন করছিলেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনে যুল খুওয়াইসির এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করুন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি ধ্বংস হও, আমি যদি ন্যায়-ইনসাফ না করি তাহলে আর কে করবে?"
উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. বললেন, আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। কেননা তার এমন কিছু সঙ্গী রয়েছে যারা তোমাদের তুচ্ছ মনে করে। তোমাদের নামাজ ও রোজাকে তাদের নামাজ-রোজা অপেক্ষা সাধারণ মনে করে। যেভাবে ধনুক থেকে তির বেরিয়ে যায়, সেভাবে তারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা তিরের পালকে তাকাবে, সেখানে কিছুই পাবে না। তিরের লোহায় তাকাবে, সেখানেও কিছু পাবে না। এরপর তিরের ফলায় তাকাবে, সেখানেও কিছু পাবে না। এরপর ধনুকের ডালের দিকে তাকাবে, সেখানেও কিছু পাবে না। এমনকি তিরে মল এবং রক্তের দাগও লাগবে না। তাদের নিদর্শন হচ্ছে, তাদের মধ্যকার এক লোকের একটি হাত (অথবা তিনি বলেছেন,) তার একটি স্তন মহিলাদের স্তনের মতো হবে, (অথবা বলেছেন,) একটি গোশতের টুকরোর মতো হবে, যা ওঠানামা করতে থাকবে। লোকদের মধ্যে বিরোধের সময় তাদের আবির্ভাব ঘটবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন যে, এই লোকটিই হবে খারেজিদের মূল। তা সত্ত্বেও তিনি অন্যায় অপবাদের জন্য তাকে তিরস্কার করেই ক্ষান্ত থেকেছেন এবং উমর রাযি.-কে তাকে শাসানো অথবা হত্যা করা থেকে নিবৃত্ত রেখেছেন। এটি হচ্ছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুন্নত বৈশিষ্ট্যাবলির মধ্য হতে অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি তার প্রতিটি আলাপচারিতায়ই ছিলেন অনন্য।
টিকাঃ
১৭ আসসিয়ারুন নববিয়্যাহ-ইবনে হিশাম, তাহকিক: মুস্তফা আস-সাফা এবং অন্যন্যগণ, মুস্তফা আল-বাবি আল-জালবি এবং তার সন্তানদের প্রকাশনা হতে প্রকাশিত, মিসর, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৭৫ হিজরি/১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ, ২/২১৪, ২২৩। মু'জামুল কাবির-তাবারানি, হাদিস নং ৫৪১৬, তাহকিক হামদি বিন আবদুল মাজিদ আস-সালাফি, মাকতাবাতুল উলুমি ওয়াল হিকাম-মসুল, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪০৪ হিজরি; ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ। ইমাম হায়ছামি বলেন, এই হাদিসটি ইমাম বাযযার এবং তাবারানি উভয়েই বর্ণনা করেছেন। উভয়ের সনদেই মুহাম্মদ ইবনে আমর নামক একজন রাবি আছেন। শুধু তার হাদিসগুলো হাসান পর্যায়ের। আর সনদের অন্যান্য রাবিগণ সকলেই সিকাহ। দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ওয়া মামবাউল ফাওয়ায়েদ, ৬/১৩২।
১৮ বুখারি, পরিচ্ছেদ: আল্লাহদ্রোহী এবং ধর্মত্যাগীদের ধর্মের পথে আহ্বান করা এবং তাদের সাথে যুদ্ধ সম্পর্কিত, অধ্যায়: যারা মনোতুষ্টির জন্য এবং লোকেরা যেন তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ না করে সেদিকে লক্ষ করে খারেজিদের সাথে যুদ্ধ ত্যাগ করে তাদের সম্পর্কিত, হাদিস নং ৬৫৩৪। মুসলিম, কিতাবুয যাকাত, খারেজি এবং তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত অধ্যায়। হাদিস নং ১০৬৪।
📄 মহৎ হৃদয় এবং অপর পক্ষের মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্নে বিরক্তি প্রকাশ না করা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সহনশীল এবং মহৎ হৃদয়ের অধিকারী। যদি কেউ প্রশ্ন করতে গিয়ে বাড়াবাড়িও করত তবুও তিনি বিরক্ত হতেন না। কিছু কিছু লোক তার কাছে এসে প্রশ্নোত্তর এবং সংলাপকে দীর্ঘায়িত করত। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্য এবং সহনশীলতার সাথে তাদের উত্তর দিতেন। কোনো প্রকার বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। আবু যর রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, সর্বোত্তম আমল কোনটি?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং তার রাস্তায় জিহাদ করা।"
তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কোন গোলাম মুক্ত করা সর্বোত্তম?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মনিবের নিকট অধিক প্রিয় এবং অধিক মূল্যবান গোলাম।
তিনি বলেন, আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, আমি যদি এমনটি না করতে পারি তাহলে কী উপায়?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে কোনো শ্রমিককে সাহায্য করবে অথবা কোনো প্রতিবন্ধীকে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, আমি আবারও জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, যদি আমি কাজ করতেও অক্ষম হই, তাহলে কী উপায়?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে মানুষকে তোমার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ রাখবে। কেননা, এটি তোমার নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি সদকাস্বরূপ।
এমনিভাবে ওই ব্যক্তির ঘটনা, যিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উত্তম আচরণের অধিক উপযুক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক আগন্তুক আসল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে উপযুক্ত কে?
তিনি বললেন, তোমার মা।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে?
তিনি বললেন, তারপর তোমার মা।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি আবার বললেন, তারপর তোমার মা।
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি এবার বললেন, তারপর তোমার বাবা।
টিকাঃ
১৯ বুখারি, পরিচ্ছেদ: গোলাম আজাদ করা, অধ্যায়: কোন গোলাম আজাদ করা সর্বোত্তম? হাদিস নং ২৩৮২। মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, অধ্যায়: আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা সর্বোত্তম আমল হওয়ার বিবরণ, হাদিস নং ৮৪, হাদিসের বাক্য তার বর্ণনা থেকেই চয়িত।
২০ বুখারি, পরিচ্ছেদ: শিষ্টাচার, অধ্যায়: উত্তম আচরণের অধিক উপযুক্ত কে? হাদিস নং ৫৬২৬। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তা রক্ষা এবং শিষ্টাচার, অধ্যায়: পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার এবং তারাই এর অধিক উপযুক্ত হওয়ার বিবরণ।
📄 অপর পক্ষের মানসিক অবস্থা নির্ণয়
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যথার্থ সম্মান করা সত্ত্বেও কখনো কখনো কোনো কোনো সাহাবির মানসিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে থাকত না। ফলে তিনি অনুচিত পন্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলতেন। কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সাহাবির পরিস্থিতি মেনে নিতেন এবং সহনশীলতা অবলম্বন করতেন। তার থেকে যে আচরণ প্রকাশ পেল সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। হুদায়বিয়া সন্ধির পরবর্তী সময়ে প্রসিদ্ধ ও সম্মানিত সাহাবি উমর রাযি.-এর কাছ থেকে এরূপ আচরণ প্রকাশ পেয়েছিল। তিনি দেখছিলেন যে, সন্ধিচুক্তির শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অন্যায্য। বিশেষ করে তিনি যখন দেখলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু জান্দাল ইবনে সুহাইল ইবনে আমরকে কুরাইশের প্রতিনিধিদলের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, অথচ আবু জান্দাল মুসলিম হয়ে এসেছিল, তখন তিনি ব্যাপারটি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি দেখলেন যে, এর মাধ্যমে মুসলমানদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। তাই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে গিয়ে বললেন, আপনি কি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে প্রেরিত নবী নন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই।
তিনি বলেন, আমি বললাম, আমরা সত্যের ওপর আর আমাদের শত্রুরা কি বাতিলের ওপর নয়?
তিনি বললেন, অবশ্যই।
আমি বললাম, তাহলে আমরা আমাদের ধর্মকে অপমানিত হতে দিচ্ছি কেন?
তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ তাআলার রাসুল এবং আমি তার নাফরমানি করব না। তিনিই আমার সাহায্যকারী।
আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলতেন না যে, আমরা অচিরেই বাইতুল্লায় যাব এবং তাওয়াফ করব?
তিনি বললেন, অবশ্যই, তবে আমি কি তোমাকে এ কথা বলেছি যে, আমরা এ বছরেই সেখানে যাব?
তিনি বলেন, আমি বললাম, না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার বললেন, তুমি নিশ্চয়ই বাইতুল্লার কাছে যাবে এবং তা তাওয়াফ করবে।
এখানে আমরা দেখতে পেলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-এর পরিস্থিতি এবং দ্বীনের প্রতি তার চেতনা বুঝে নিয়েছিলেন। আর উমর রাযি.-এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল তার শক্তিমত্তা, চেতনা এবং অগ্রগামিতা। তাই তিনি এখানে বিশাল অর্জন আদায়ের জন্য সামান্য অপদস্থতা মেনে নিতে পারেননি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-এর ইতিহাস এবং ইসলামের জন্য তার ত্যাগের কথা জানতেন। তিনি এ-ও জানতেন যে, উমর প্রথমবারের মতো এরকম আচরণ করছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এভাবে কথা বলা তার স্বভাবের মধ্যে নেই। এ সমস্ত কারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর রাযি.-এর এই আচরণের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করেননি।
টিকাঃ
২১ বুখারি, পরিচ্ছেদ : শর্তাবলি, অধ্যায় : জিহাদ এবং শত্রুপক্ষের সাথে সন্ধিচুক্তি করা এবং তা লিপিবদ্ধ করার শর্তসমূহ, হাদিস নং ২৫৮১।