📄 অপরের প্রতি নিবিড় মনোযোগ স্থাপন
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আলাপচারিতার ক্ষেত্রে অপর কথকের কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করতেন; এমনকি যদি তার কথা দীর্ঘ হতো তবুও। মুয়াবিয়া ইবনুল হাকাম আস-সুলামি থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে নামাজ পড়ছিলাম। তখন উপস্থিত লোকদের মধ্য হতে কেউ একজন হাঁচি দিলে আমি বললাম, ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন)। তখন উপস্থিত লোকেরা আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায়। আমি তাদেরকে বললাম, তোমাদের জন্য দুর্ভোগ! আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?
তখন তারা তাদের হাত দিয়ে রানে আঘাত করতে লাগল। যখন আমি বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে তখন আমি চুপ হয়ে গেলাম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাজ শেষ হলো। আমার পিতা-মাতা তার প্রতি উৎসর্গ হোক। আমি তার পূর্বে এবং পরবর্তীকালে তার চেয়ে উত্তম শিক্ষাদাতা কোনো শিক্ষক দেখিনি। আল্লাহর শপথ, তিনি আমাকে ধমক দেননি, প্রহার করেননি, তিরস্কারও করেননি।
তিনি শুধু এতটুকু বললেন, নামাজের মধ্যে মানুষের কথাবার্তা বলা ঠিক নয়। নামাজে শুধু তাসবিহ, তাকবির উচ্চারণ করা হয় এবং কুরআন তেলাওয়াত করা হয়।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, সবেমাত্র কিছুদিন হলো আমি জাহিলিয়্যাত থেকে প্রত্যাবর্তন করেছি। আল্লাহ তাআলা ইসলাম পাঠালেন, অথচ আমাদের মধ্যকার কিছু লোক এখনো গণকদের কাছে যায়।
তিনি বললেন, তাহলে তুমি তাদের কাছে যেয়ো না।
আমি বললাম, অনেকেই অশুভ ইঙ্গিত গ্রহণ করে।
তিনি বললেন, এটি এমন এক বিষয়, যা তারা তাদের অন্তরে উপলব্ধি করে। ফলে তা তাদেরকে বাধা দিতে পারে না। অপর বর্ণনায় আছে, তা যেন তোমাদেরকে বাধা দিতে না পারে।
তিনি বলেন, আমি বললাম, আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা রেখা অঙ্কন করে।
তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলার নবীগণের মধ্য হতে একজন নবী রেখা অঙ্কন করতেন। যদি তার সাথে মিলে যায় তাহলে ঠিক আছে।
বর্ণনাকারী বলেন, আমার একটি বাঁদি ছিল। সে উহুদ এবং জাওয়ানিয়া পাহাড়ে বকরি পাল চরাত। একদিন সে পাহাড়ে উঠে দেখে, এক নেকড়ে এসে তার পাল থেকে একটি বকরি নিয়ে গেছে। আমি একজন মানুষ। তাই মানুষের মতোই আফসোস করতে লাগলাম। তবে আমি তাকে কঠোর প্রহার করলাম। তারপর আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এলে তিনি এ কাজের জন্য আমাকে তিরস্কার করলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, তাহলে আমি তাকে মুক্ত করে দিই?
তিনি বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।
তখন আমি তাকে নিয়ে আসলাম। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ কোথায়?
বাঁদি বলল, ঊর্ধ্বাকাশে।
তিনি বললেন, আমি কে?
বাঁদি বলল, আপনি হলেন আল্লাহ তাআলার রাসুল।
এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে মুক্ত করে দাও। কারণ, সে ঈমানদার নারী।
আমরা এই কথোপকথনে সাহাবি মুয়াবিয়া ইবনুল হাকাম আস-সুলামির দীর্ঘ আলাপচারিতা এবং প্রশ্ন দেখতে পেলাম। তিনি এমনটি করেছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদার মানসিকতা এবং বিরক্তিমুক্তভাবে মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা দেখে।
টিকাঃ
১৪ মুসলিম: পরিচ্ছেদ মসজিদ এবং নামাজের স্থান, অধ্যায়: নামাজের মধ্যে কথা বলা হারাম হওয়া এবং পূর্বের বৈধতা রহিত হওয়া সম্পর্কিত, হাদিস নং ৫৩৭। আবু দাউদ, হাদিস নং ৯৩০। নাসায়ি, হাদিস নং ১১৪১। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৩৮১৬। ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ২২৪৭।
📄 কথোপকথনের সময় মুচকি হাসা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চরম বিপদ এবং রাগের মুহূর্তেও মুচকি হাসতেন। উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তার স্ত্রীগণের কাছ থেকে এক মাস অথবা ২৯ দিন পৃথক থাকার হাদিস বর্ণনা করেছেন। হাদিসের মধ্যে তিনি বলেন,
“আমরা আলোচনা করছিলাম যে, গাসসানের অধিবাসীরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ঘোড়া প্রস্তুত করছে। আমার সঙ্গী তার পালার দিন থেকে গেল। সেদিন রাতে সে ফিরে এসে আমার দরজায় সজোরে আঘাত করল এবং জিজ্ঞেস করল, উমর কি ঘুমিয়ে গেছেন? আমি ভয় পেয়ে গেলাম, বের হয়ে তার কাছে যেতেই সে বলল, এক বিরাট কাণ্ড ঘটে গেছে! আমি বললাম, কী হয়েছে? গাসসানীরা কি এসে পড়েছে? সে বলল, না, তা নয়; বরং এর চাইতেও বিরাট কাণ্ড। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীগণকে বিচ্ছিন্ন করেছেন।
উমর রাযি. বললেন, হাফসা ক্ষতিগ্রস্ত এবং বঞ্চিত হোক। আমি আগেই ধারণা করেছিলাম, এমনটি ঘটবে। তারপর আমি আমার কাপড় পরিধান করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ফজর নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক উঁচু কামরায় প্রবেশ করে নিভৃতে চলে গেলেন। আমি হাফসার কাছে গিয়ে দেখলাম, সে ক্রন্দনরত অবস্থায় আছে। আমি বললাম, এখন কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে আগেই সতর্ক করিনি? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদেরকে তালাক দিয়েছেন?
হাফসা বলল, আমি জানি না। তিনি এভাবেই উঁচু কামরায় অবস্থান করছেন। আমি সেখান থেকে বের হয়ে মসজিদের মিম্বারের নিকটে গেলাম। দেখতে পেলাম, মিম্বারের আশপাশে একদল সাহাবি অবস্থান করছেন। তাদের মধ্য হতে কেউ কেউ কান্না করছেন। আমি তাদের সাথে অল্প কিছুক্ষণ বসলাম। কিন্তু আমার ভেতরের চিন্তা আমাকে পরাজিত করল। তাই আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে উঁচু কামরায় অবস্থান করছিলেন সেখানে গেলাম। তার এক কৃষ্ণ গোলামকে বললাম, উমরের জন্য প্রবেশের অনুমতি চাও। সে কামরায় প্রবেশ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলে আবার বের হয়ে আসল । এসে বলল, আমি তাঁর কাছে আপনার কথা উল্লেখ করেছি। তিনি নীরবতা অবলম্বন করেছেন। আমি ফিরে এসে মিম্বারের পাশে উপবিষ্ট সাহাবাদের সাথে বসলাম। তারপর আমার ভেতরের চিন্তা আবার আমাকে পরাজিত করল। আমি আবার সেখানে গেলাম। গোলামটি আগেরবারের মতো একই কথা বলল। আমি আবার মিম্বারের পাশে থাকা দলটির সঙ্গে বসলাম। আবার ভেতরের চিন্তা প্রবল হলো। আমি গোলামের কাছে এসে বললাম, উমরের জন্য অনুমতি চাও। সে আগেরবারের মতো একই কথা বলল।
আমি যখন ফেরার পথ ধরেছি তখন শুনতে পেলাম, গোলামটি আমাকে ডাকছে। সে বলল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন।
তখন আমি তার নিকটে প্রবেশ করলাম। দেখতে পেলাম তিনি এক ধূলোমলিন চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছেন। তার এবং চাটাইয়ের মাঝখানে কোনো বিছানা নেই। ধূলিকণা তার পিঠে চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। তিনি হেলান দিয়ে আছেন চামড়ার একটি বালিশে, যার ভেতরে খেজুর পাতা ভর্তি। আমি তাকে সালাম দিলাম। তারপর দাঁড়ানো অবস্থায়ই জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি আপনার স্ত্রীগণকে তালাক দিয়েছেন? তিনি আমার দিকে চোখ উঁচিয়ে তাকালেন এবং বললেন, না।
আমি দণ্ডায়মান অবস্থাতেই আবার বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করুন। আপনি যদি আমার প্রতি লক্ষ করেন তাহলে দেখবেন, আমরা ছিলাম কুরাইশের একটি দল। আমরা নারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতাম। কিন্তু যখন থেকে আমরা এমন জাতির নিকটে এলাম, যাদেরকে তাদের নারীরা দমিয়ে রাখে (তখন থেকে এই দুরাবস্থা হলো)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে মুচকি হাসলেন। এরপর আমি বললাম, আপনি যদি লক্ষ করেন তাহলে দেখবেন, আমি হাফসার কাছে গিয়ে তাকে বলেছি-যদি তোমার প্রতিবেশিনী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তোমার চেয়ে অধিক প্রিয় হয় তাহলে তা যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। (প্রতিবেশিনী শব্দ দিয়ে আয়েশা রাযি.-এর দিকে ইঙ্গিত করেছেন)। এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকবার মুচকি হাসলেন। আমি তাকে মুচকি হাসতে দেখে বসে গেলাম। এরপর আমি তার ঘরের দিকে তাকালাম। আল্লাহর শপথ, আমি তাতে তিনটি চামড়ার থলে ছাড়া আর কোনো আকর্ষণীয় বস্তু দেখিনি, যা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। তখন আমি বললাম, আল্লাহ তাআলার কাছে দুয়া করুন, যেন তিনি আপনার উম্মতের জন্য প্রশস্ততার পথ খুলে দেন। কারণ, পারস্য এবং রোমীয়দেরকে প্রশস্ততা ও পার্থিব সমৃদ্ধি দেওয়া হয়েছে; অথচ তারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেলান দেওয়া ছিলেন। তিনি বললেন, “হে খাত্তাবের পুত্র, তুমি কি সংশয়ে নিপতিত? তারা হচ্ছে এমন সম্প্রদায়, যাদের জন্য পার্থিব জীবনেই সকল ভোগ-বিলাস ত্বরান্বিত করা হয়েছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।”
📄 অপরের মত গ্রহণ এবং দীর্ঘ সংলাপে না যাওয়া
পরামর্শসভার সবাই মিলে যে বিষয়ের ওপর একমত হতেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা-ই বাস্তবায়ন করতেন এবং চালু রাখতেন। তাদের সিদ্ধান্ত যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতের বিপরীত হতো তবুও। উহুদ যুদ্ধের কিছু সময় পূর্বে এমনটি ঘটেছিল। কুরাইশদের আগমন-সংবাদ জেনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করছিলেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি এক সুরক্ষিত বর্ম পরিহিত অবস্থায় আছি। আর দেখলাম, একটি ছাগল কুরবানি দেওয়া হচ্ছে। আমি এর ব্যাখ্যা করলাম এভাবে যে, সেই সুরক্ষিত বর্ম হচ্ছে মদিনা মুনাওয়ারা আর ছাগল হচ্ছে আমার উম্মত। আল্লাহই ভালো জানেন।"
জাবের রাযি. বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিগণকে বললেন, "আমরা মদিনাতে অবস্থান নিলে যদি তারা আমাদের সীমানায় প্রবেশ করে তাহলে সেখানেই আমরা তাদের সাথে লড়াই করব।”
সাহাবিগণ বললেন, “তারা তো জাহেলি যুগেই আমাদের এখানে প্রবেশ করতে পারেনি। তাহলে ইসলাম গ্রহণের পর প্রবেশ করতে দিই কীভাবে?”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “ও তোমাদের এই ব্যাপার!” এ কথা বলেই তিনি বর্ম পরিধান করলেন।
জাবের রাযি. বলেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে আনসারদের বক্তব্য হলো, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিতে চাইলাম। ফলে তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কথাই থাক।
কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “কোনো নবী যখন বর্ম পরিধান করে ফেলেন তখন তার জন্য লড়াই করা ব্যতীত তা খুলে ফেলা শোভনীয় নয়।”
সে সময়ে এমন ঘটনা ছিল খুবই বিরল; বরং আমরা বলতে পারি, সে সময়ে এমন ঘটনা ছিল অসম্ভব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশের মতের ওপর সাড়া দিলেন; যা তার মতের একেবারেই বিপরীত ছিল। যখন সাহাবিগণ তার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাইলেন তখন তিনি তাদের এ কথা বলে ফিরিয়ে দিলেন যে, আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুযায়ী অধিকাংশের মতকে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। আর সকলের উচিত সেই মত মেনে নেওয়া। এ ক্ষেত্রে শাসক থাকবে সকলের অগ্রগামী; চাই সে নবীই হোক না কেন।
এমনিভাবে খন্দকের যুদ্ধ এবং মুশরিকদের দ্বারা মদিনা মুনাওয়ারা অবরোধের সময়ও এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল। সে যুদ্ধে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৃঢ় প্রতিরোধকারীরূপে দাঁড়িয়ে যান। মুশরিকরাও প্রায় একমাসের মতো সময় তাঁকে অবরোধ করে রাখে। এ সময়ে তাদের মাঝে তির নিক্ষেপ ব্যতীত অন্য কোনো সংঘর্ষ হয়নি।
যখন লোকদের জন্য বিপদ তীব্র আকার ধারণ করল তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উয়াইনা ইবনে হিসন ইবনে হুযায়ফা ইবনে বদর এবং হারেস ইবনে আউফ ইবনে আবি হারেসা আল-মুররির কাছে সংবাদ পাঠালেন। তারা উভয়েই ছিল গাতফান গোত্রের সেনাপতি। তিনি তাদেরকে মদিনার ফল-ফলাদির তিন ভাগের এক ভাগ প্রদান করলেন; যাতে করে তারা তাদের অনুগত সৈন্যদলকে নিয়ে চলে যায়। তাদের মাঝে সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হতে থাকে। এমনকি তারা চুক্তি লিপিবদ্ধও করে ফেলে। তবে তাদের মাঝে কোনো সাক্ষী রাখা হয়নি এবং চুক্তি দৃঢ়ও করা হয়নি। বরং শুধু সাধারণ একটি চুক্তি হয়।
এ কাজ পরিপূর্ণরূপে সম্পন্ন করার সময় এলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ ইবনে মুয়াজ ও সাদ ইবনে উবাদাহ রাযি.-কে ডেকে পাঠান এবং তাদের কাছে এ ব্যাপারে পরামর্শ কামনা করেন। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, এটি কি এমন কোনো বিষয়, যা আপনার নিকট পছন্দনীয়? তাহলে তা আমরা করতে রাজি আছি। নাকি এমন কোনো বিষয়, যে সম্পর্কে আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক? নাকি এমন কোনো বিষয়, যা আপনি আমাদের ভালোর জন্য করতে চাচ্ছেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “বরং এটি আমি তোমাদের ভালোর জন্য করতে চাচ্ছি। আল্লাহর শপথ, আমি এ কাজ এ জন্যই করছি যে, আমি দেখতে পাচ্ছি, আরবরা তোমাদেরকে এক ধনুকে বিদ্ধ করে ফেলেছে এবং তোমাদেরকে সকল দিক থেকে ঘিরে ধরেছে। তাই আমি যেকোনো উপায়ে তোমাদের কাছ থেকে তাদের শক্তিমত্তা দূরীভূত করতে চাচ্ছি।”
তখন সাদ ইবনে মুয়াজ রাযি. তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা এবং সেই সম্প্রদায় আল্লাহ তাআলার সাথে অংশীদার স্থাপন এবং মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলাম। আমরা আল্লাহ তাআলার উপাসনা করতাম না এবং তার পরিচয় জানতাম না। আর তারা আতিথেয়তা অথবা ক্রয় ব্যতীত মদিনার কোনো খেজুর খেতে পারত না। এরপর আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন, আমাদেরকে তার দিকে পথপ্রদর্শন করেছেন এবং আমাদেরকে আপনার মাধ্যমে সমুন্নত করেছেন। আর আমরাই কিনা তাদেরকে আমাদের সম্পদ দিয়ে দেবো? আল্লাহর শপথ, আমাদের এর কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তাআলা তাদের মাঝে আর আমাদের মাঝে কোনো ফায়সালা করার আগ পর্যন্ত আমরা তাদেরকে শুধু তরবারির আঘাত প্রদান করতেই রাজি আছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তোমার কথাই থাকুক। এরপর চুক্তিনামাটি সাদ ইবনে মুয়াজ রাযি.-এর হস্তগত হলে তিনি তাতে যা কিছু লেখা হয়েছে, তা সব মুছে ফেলেন। এরপর বলেন, তারা যেন আমাদের সাথে লড়াই করে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুক্তি সম্পাদনের পথে একধাপ এগিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি সুনির্দিষ্ট মত গ্রহণ করেছেন। অন্যথায় তিনি যদি অন্য কোনো সিদ্ধান্তকে ভালো মনে করতেন তাহলে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধাপ্রদানকারী কেউ ছিল না।
টিকাঃ
১৫ বুখারি, পরিচ্ছেদ: অত্যাচার, অধ্যায়: ছাদে বা অন্যান্য স্থানে উঁচু কামরা নির্মাণ সম্পর্কিত, হাদিস নং ২৩৩৬। (তাহকিক প্রয়োজন) মুসলিম, পরিচ্ছেদ: তালাক, অধ্যায়: স্ত্রীদের কাছ থেকে ইলা করা এবং বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং তাদের ইখতিয়ার প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার বাণী : وان تظاهرا﴿ ]সুরা তাহরিম : ৪] সম্পর্কিত, হাদিস নং ১৪৭৯।
১৬ মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৪৮২৯। শু'আইব আরনাউত বলেন, হাদিসটি মুসলিম রহ.-এর শর্ত অনুযায়ী সহিহ লি গাইরিহি। সুনানে দারেমি, হাদিস নং ২১৫৯, তাহকিক: ফাওয়ায আহমাদ যামরালি এবং খালেদ আস-সাবউল ইলমি, দারুল কিতাবিল আরাবিয়্যাহ-বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪০৭ হিজরি। মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস নং ৯৭৩৫, তাহকিক : হাবিবুর রহমান আযমি, আল-মাকতাবুল ইসলামি-বৈরুত, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪০৩ হিজরি। ইমাম হায়সামি বলেন, আহমাদ রহ. হাদিসটি এনেছেন এবং এর প্রত্যেক বর্ণনাকারীগণই সহিহ। দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৬/১০৬, হাদিস নং ১০০৫৬। আলবানি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যা দিয়েছেন। দেখুন, আসসিলসিলাতুস সহিহাহ, হাদিস নং ১১০০।
📄 অপর পক্ষের বিরক্তির ওপর ধৈর্যধারণ
কথোপকথনের সময় কখনো কখনো অপর পক্ষে অভদ্র, কঠোর এবং মুনাফিক প্রকৃতির লোক থাকত। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিরক্ত করত এবং কষ্ট দিত। আবু সাইদ রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনিমতের মাল বণ্টন করছিলেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনে যুল খুওয়াইসির এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করুন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি ধ্বংস হও, আমি যদি ন্যায়-ইনসাফ না করি তাহলে আর কে করবে?"
উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. বললেন, আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। কেননা তার এমন কিছু সঙ্গী রয়েছে যারা তোমাদের তুচ্ছ মনে করে। তোমাদের নামাজ ও রোজাকে তাদের নামাজ-রোজা অপেক্ষা সাধারণ মনে করে। যেভাবে ধনুক থেকে তির বেরিয়ে যায়, সেভাবে তারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা তিরের পালকে তাকাবে, সেখানে কিছুই পাবে না। তিরের লোহায় তাকাবে, সেখানেও কিছু পাবে না। এরপর তিরের ফলায় তাকাবে, সেখানেও কিছু পাবে না। এরপর ধনুকের ডালের দিকে তাকাবে, সেখানেও কিছু পাবে না। এমনকি তিরে মল এবং রক্তের দাগও লাগবে না। তাদের নিদর্শন হচ্ছে, তাদের মধ্যকার এক লোকের একটি হাত (অথবা তিনি বলেছেন,) তার একটি স্তন মহিলাদের স্তনের মতো হবে, (অথবা বলেছেন,) একটি গোশতের টুকরোর মতো হবে, যা ওঠানামা করতে থাকবে। লোকদের মধ্যে বিরোধের সময় তাদের আবির্ভাব ঘটবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন যে, এই লোকটিই হবে খারেজিদের মূল। তা সত্ত্বেও তিনি অন্যায় অপবাদের জন্য তাকে তিরস্কার করেই ক্ষান্ত থেকেছেন এবং উমর রাযি.-কে তাকে শাসানো অথবা হত্যা করা থেকে নিবৃত্ত রেখেছেন। এটি হচ্ছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুন্নত বৈশিষ্ট্যাবলির মধ্য হতে অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি তার প্রতিটি আলাপচারিতায়ই ছিলেন অনন্য।
টিকাঃ
১৭ আসসিয়ারুন নববিয়্যাহ-ইবনে হিশাম, তাহকিক: মুস্তফা আস-সাফা এবং অন্যন্যগণ, মুস্তফা আল-বাবি আল-জালবি এবং তার সন্তানদের প্রকাশনা হতে প্রকাশিত, মিসর, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৭৫ হিজরি/১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ, ২/২১৪, ২২৩। মু'জামুল কাবির-তাবারানি, হাদিস নং ৫৪১৬, তাহকিক হামদি বিন আবদুল মাজিদ আস-সালাফি, মাকতাবাতুল উলুমি ওয়াল হিকাম-মসুল, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪০৪ হিজরি; ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ। ইমাম হায়ছামি বলেন, এই হাদিসটি ইমাম বাযযার এবং তাবারানি উভয়েই বর্ণনা করেছেন। উভয়ের সনদেই মুহাম্মদ ইবনে আমর নামক একজন রাবি আছেন। শুধু তার হাদিসগুলো হাসান পর্যায়ের। আর সনদের অন্যান্য রাবিগণ সকলেই সিকাহ। দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ওয়া মামবাউল ফাওয়ায়েদ, ৬/১৩২।
১৮ বুখারি, পরিচ্ছেদ: আল্লাহদ্রোহী এবং ধর্মত্যাগীদের ধর্মের পথে আহ্বান করা এবং তাদের সাথে যুদ্ধ সম্পর্কিত, অধ্যায়: যারা মনোতুষ্টির জন্য এবং লোকেরা যেন তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ না করে সেদিকে লক্ষ করে খারেজিদের সাথে যুদ্ধ ত্যাগ করে তাদের সম্পর্কিত, হাদিস নং ৬৫৩৪। মুসলিম, কিতাবুয যাকাত, খারেজি এবং তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত অধ্যায়। হাদিস নং ১০৬৪।