📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 পরিচিত হওয়া

📄 পরিচিত হওয়া


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনের মাধ্যমে অপরের সাথে পরিচিত হতেন। মুহাম্মদ ইবনে কা'ব আল কুরজি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তায়েফ সফর এবং তার সাথে সাকিফ গোত্রের আচরণের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
'তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রবি'আ ইবনে আব্দুশ শামসের দুই পুত্র উতবা এবং শাইবার বাগানে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। উতবা এবং শাইবা সেখানেই ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি আঙুর বৃক্ষের ছায়ায় বসলেন। রবি'আর দুই পুত্র তাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। তায়েফের গর্দভরা রাসুলের সাথে যে আচরণ করেছে, তারা তা-ও দেখেছিল। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য তাদের মনে দয়ার উদ্রেক হলো। তারা তাদের এক খ্রিষ্টান গোলামকে ডাক দিলো। তার নাম ছিল আদ্দাস। তারা আদ্দাসকে বলল, এখান থেকে আঙুরের একটি গুচ্ছ নিয়ে ওই লোকটির সামনে রাখো। আদ্দাস তাদের কথামতো আঙুরের গুচ্ছ নিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখল এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেখান থেকে খেতে আহ্বান জানাল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম “বিসমিল্লাহ” বলে আঙুরের পাত্রে হাত রাখলেন। এরপর সেখান থেকে খেলেন।
আদ্দাস রাসুলের চেহারার দিকে তাকিয়ে বলল, আল্লাহর কসম, এ অঞ্চলের লোকেরা কখনো এমন কথা বলে না!
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কোন দেশের অধিবাসী আদ্দাস? তোমার ধর্ম কী?
সে বলল, আমি খ্রিষ্টান। নিনুয়ার (ইরাক) অধিবাসী।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সৎ লোক ইউনুস ইবনে মাত্তার এলাকার অধিবাসী?
আদ্দাস বলল, আপনি কী করে ইউনুসের কথা জানলেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি আমার ভাই। তিনি নবী ছিলেন। আমিও নবী।
এ কথা শুনে আদ্দাস নিশ্চিত হয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথায়, হাতে এবং পায়ে চুম্বনের জন্য এগিয়ে গেল।
বর্ণনাকারী বলেন, তখন রবি'আর এক পুত্র তার অপর ভাইকে বলছিল, তোমার গোলামকে তোমার সম্মুখে সে বিপথগামী করে দিলো! আদ্দাস তাদের নিকটে এলে তারা তাকে বলল, হে আদ্দাস, তুমি ধ্বংস হও। তুমি এই লোকের মাথায় এবং হাতে চুম্বন করলে কেন?
আদ্দাস বলল, হে আমার মনিব, পৃথিবীতে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দ্বিতীয়টি নেই।
তারা বলল, তোমার জন্য দুর্ভোগ হে আদ্দাস! সে যেন তোমাকে তোমার ধর্ম থেকে ফিরিয়ে নিতে না পারে। কেননা, তোমার ধর্ম তার ধর্ম থেকে উত্তম।'
এভাবেই আমরা দেখতে পাই, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন সংকটময় অবস্থায় এবং এমন কষ্ট ও ক্লান্তির মাঝেও তার সাথে সাক্ষাৎকারীর পরিচয় লাভে আগ্রহী ছিলেন; যদিও সে ছিল একজন দাস এবং সেবক। সুতরাং একজন মুসলমানের জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে পরস্পরের পরিচয় লাভ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষকে বিভিন্ন গোত্র এবং দলে বিভক্ত করার এটিও অন্যতম উদ্দেশ্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللهِ أَتْقَكُمْ إِنَّ اللهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
'হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।' [সুরা হুজুরাত : ১৩]
এই ঘটনার মতোই আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরেক অপরিচিত ব্যক্তির সাথে পরিচিত হতে দেখেছি। তিনি হলেন সম্মানিত সাহাবি আবু যর রাযি.; যা পরবর্তীতে আবু যর রাযি.-এর ইসলাম গ্রহণ এবং তার গোত্রের নিকটে ইসলামের দাঈ হিসেবে গমনের কারণ হয়েছিল। আবু যর রাযি. বর্ণনা করেন,
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলেন এবং হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করলেন। এরপর তিনি এবং তার সাথি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করে নামাজ আদায় করলেন। আবু যর রাযি. বলেন, যখন তিনি সালাম ফেরালেন তখন আমিই ছিলাম প্রথম ব্যক্তি, যে তাঁকে ইসলামি সম্ভাষণে সম্ভাষিত করেছিল। তিনি বলেন,
আমি তাকে বললাম, আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ (হে আল্লাহর রাসুল, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওয়া আলাইকা ওয়া রাহমাতুল্লাহ (তোমার ওপরও শান্তি এবং আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)।
এরপর জিজ্ঞাসা করলেন, কে তুমি?
তিনি বলেন, আমি উত্তর দিলাম-আমি গিফার গোত্রের লোক।
এ কথা শুনে তিনি তার কপালে হাত রাখলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, তিনি হয়তো আমার গিফার গোত্রীয় হওয়াকে অপছন্দ করেছেন। তাই আমি তার হাত ধরতে গেলে তার সঙ্গী আমাকে নিবৃত্ত করেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জানেন।
এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাথা উঠিয়ে বললেন, তুমি কখন এখানে এসেছ?
আমি বললাম, আমি এখানে ৩০ দিন ৩০ রাত যাবৎ অবস্থান করছি।
তিনি বললেন, তাহলে তোমার খাবার কে দেয়?
আমি বললাম, জমজমের পানি ব্যতীত আমি আর অন্য কোনো খাদ্য নিইনি। এর ফলে আমি স্থূলকায় হয়ে গেছি। এমনকি আমার পাকস্থলী ভাঁজযুক্ত এবং সংকুচিত হয়ে গেছে। অথচ আমি আমার কলিজায় ক্ষুধার তীব্রতাও অনুভব করি না।
তিনি বললেন, নিশ্চয়ই তা বরকতময়। নিশ্চয়ই তা শ্রেষ্ঠ খাবার।
তখন আবু বকর রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আজ রাতে তার মেহমানদারি করার জন্য আমাকে অনুমতি দিন।
এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকর রাযি. হাঁটতে থাকলেন। আমিও তাদের সাথে হাঁটতে লাগলাম। আবু বকর রাযি. একটি দরজা খুললেন এবং আমাদের জন্য তায়েফের কিশমিশ নিতে থাকলেন। এটিই ছিল সেখানে আমার জন্য প্রথম খাবার। এরপর সেখানে আরও কিছুক্ষণ অবস্থান করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে গেলাম।
তিনি বললেন, আমাকে খেজুরবিশিষ্ট এক ভূখণ্ড দেখানো হয়েছে। আমি মনে করি, এটি ইয়াসরিব ছাড়া অন্য কোনো ভূখণ্ড নয়। তাই তুমি কি আমার পক্ষ থেকে তোমার জাতির কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেবে? যেন আল্লাহ তাআলা তোমার মাধ্যমে তাদেরকে উপকৃত করেন এবং এর বিনিময়ে তোমাকে উত্তম প্রতিদান দেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু যর রাযি.-এর সাথে কথোপকথন চালিয়ে গেছেন। আবু যর রাযি. যে সময় ভেবেছিলেন যে, তার গিফার গোত্রীয় হওয়াকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করেছেন, সে সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবছিলেন আবু যর রাযি-এর প্রতি তার দায়িত্ব এবং ৩০ দিন যাবৎ তার উপবাস যাপনের কথা। আল্লাহ তাআলা এই মহৎ হৃদয় এবং দয়ার উৎসের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।

টিকাঃ
২ ইবনুল আসির, উসদুল গাবাহ ফি মা'রিফাতিস সাহাবাহ, তাহকিক: আলি মুহাম্মদ মুয়াওয়িজ এবং আদিল আহমাদ আবদুল মাওজুদ। দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ: ১৪১৫ হিজরি মোতাবেক ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ, ৪/৪। সুয়ানি বলেন, এই হাদিসটি মুরসাল। ইবনে ইসহাক এই হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন, আমার কাছে এই হাদিসটি ইয়াজিদ বর্ণনা করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে কা'ব আল কুরজির কাছ থেকে। ইয়াজিদ একজন সিকাহ তথা নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। আর কুরজি তাবেয়ি ও বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী। কিন্তু তিনি এখানে তার শায়েখ থেকে বর্ণনা করেননি। তবে এই হাদিসটি ইমাম জুহরি এবং উরওয়া ইবনে জুবায়ের থেকেও মুরসাল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাদের হাদিসে উক্ত হাদিসে বর্ণিত দুয়ার অংশটুকু নেই। তাবারানিতে এর সমর্থনে একটি বর্ণনা রয়েছে। দেখুন : আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ কামা জায়াত ফিল আহাদিসিস সহিহাহ, কিরাআতে জাদিদাহ, মাকতাবাতুল উবাইকান, ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দ, ১/১৮১। হায়সামি বলেন, এই হাদিসের বর্ণনাকারীগণ সকলেই সিকাহ তথা নির্ভরযোগ্য। তবে সনদের মধ্যে ইবনে ইসহাক মুদাল্লিস সিকাহ। দেখুন: মাজমাউয যাওয়ায়েদ ওয়া মামবাউল ফাওয়ায়েদ, তাহকিক : হুসামুদ্দিন আল-কাদিসি, মাকতাবাতুল কাদিসি, কায়রো। ১৪১৪ হিজরি মোতাবেক ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ, ৬/৩৫।
৩ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: সাহাবিগণের মর্যাদা, অধ্যায়: আবু যর রাযি.-এর মর্যাদা, হাদিস নং ২৪৭৩। মুসলিম, তাহকিক: মুহাম্মদ ফুয়াদ আবদুল বাকি, দারু ইহইয়ায়িত তোরাসিল আরবি-বৈরুত। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২১৫৬৫, মুওয়াসসাসাতু কুরতুবা-কায়রো।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 বিভিন্ন মামলা-মোকাদ্দমা সম্পর্কে অনুসন্ধান এবং রায় প্রদান

📄 বিভিন্ন মামলা-মোকাদ্দমা সম্পর্কে অনুসন্ধান এবং রায় প্রদান


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চরম বিপদ এবং রাগের মুহূর্তেও মুচকি হাসতেন। উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তার স্ত্রীগণের কাছ থেকে এক মাস অথবা ২৯ দিন পৃথক থাকার হাদিস বর্ণনা করেছেন। হাদিসের মধ্যে তিনি বলেন,
“আমরা আলোচনা করছিলাম যে, গাসসানের অধিবাসীরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ঘোড়া প্রস্তুত করছে। আমার সঙ্গী তার পালার দিন থেকে গেল। সেদিন রাতে সে ফিরে এসে আমার দরজায় সজোরে আঘাত করল এবং জিজ্ঞেস করল, উমর কি ঘুমিয়ে গেছেন? আমি ভয় পেয়ে গেলাম, বের হয়ে তার কাছে যেতেই সে বলল, এক বিরাট কাণ্ড ঘটে গেছে! আমি বললাম, কী হয়েছে? গাসসানীরা কি এসে পড়েছে? সে বলল, না, তা নয়; বরং এর চাইতেও বিরাট কাণ্ড। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীগণকে বিচ্ছিন্ন করেছেন।
উমর রাযি. বললেন, হাফসা ক্ষতিগ্রস্ত এবং বঞ্চিত হোক। আমি আগেই ধারণা করেছিলাম, এমনটি ঘটবে। তারপর আমি আমার কাপড় পরিধান করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ফজর নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক উঁচু কামরায় প্রবেশ করে নিভৃতে চলে গেলেন। আমি হাফসার কাছে গিয়ে দেখলাম, সে ক্রন্দনরত অবস্থায় আছে। আমি বললাম, এখন কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে আগেই সতর্ক করিনি? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদেরকে তালাক দিয়েছেন?
হাফসা বলল, আমি জানি না। তিনি এভাবেই উঁচু কামরায় অবস্থান করছেন। আমি সেখান থেকে বের হয়ে মসজিদের মিম্বারের নিকটে গেলাম। দেখতে পেলাম, মিম্বারের আশপাশে একদল সাহাবি অবস্থান করছেন। তাদের মধ্য হতে কেউ কেউ কান্না করছেন। আমি তাদের সাথে অল্প কিছুক্ষণ বসলাম। কিন্তু আমার ভেতরের চিন্তা আমাকে পরাজিত করল। তাই আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে উঁচু কামরায় অবস্থান করছিলেন সেখানে গেলাম। তার এক কৃষ্ণ গোলামকে বললাম, উমরের জন্য প্রবেশের অনুমতি চাও। সে কামরায় প্রবেশ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলে আবার বের হয়ে আসল । এসে বলল, আমি তাঁর কাছে আপনার কথা উল্লেখ করেছি। তিনি নীরবতা অবলম্বন করেছেন। আমি ফিরে এসে মিম্বারের পাশে উপবিষ্ট সাহাবাদের সাথে বসলাম। তারপর আমার ভেতরের চিন্তা আবার আমাকে পরাজিত করল। আমি আবার সেখানে গেলাম। গোলামটি আগেরবারের মতো একই কথা বলল। আমি আবার মিম্বারের পাশে থাকা দলটির সঙ্গে বসলাম। আবার ভেতরের চিন্তা প্রবল হলো। আমি গোলামের কাছে এসে বললাম, উমরের জন্য অনুমতি চাও। সে আগেরবারের মতো একই কথা বলল।
আমি যখন ফেরার পথ ধরেছি তখন শুনতে পেলাম, গোলামটি আমাকে ডাকছে। সে বলল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন।
তখন আমি তার নিকটে প্রবেশ করলাম। দেখতে পেলাম তিনি এক ধূলোমলিন চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছেন। তার এবং চাটাইয়ের মাঝখানে কোনো বিছানা নেই। ধূলিকণা তার পিঠে চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। তিনি হেলান দিয়ে আছেন চামড়ার একটি বালিশে, যার ভেতরে খেজুর পাতা ভর্তি। আমি তাকে সালাম দিলাম। তারপর দাঁড়ানো অবস্থায়ই জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি আপনার স্ত্রীগণকে তালাক দিয়েছেন? তিনি আমার দিকে চোখ উঁচিয়ে তাকালেন এবং বললেন, না।
আমি দণ্ডায়মান অবস্থাতেই আবার বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করুন। আপনি যদি আমার প্রতি লক্ষ করেন তাহলে দেখবেন, আমরা ছিলাম কুরাইশের একটি দল। আমরা নারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতাম। কিন্তু যখন থেকে আমরা এমন জাতির নিকটে এলাম, যাদেরকে তাদের নারীরা দমিয়ে রাখে (তখন থেকে এই দুরাবস্থা হলো)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে মুচকি হাসলেন। এরপর আমি বললাম, আপনি যদি লক্ষ করেন তাহলে দেখবেন, আমি হাফসার কাছে গিয়ে তাকে বলেছি-যদি তোমার প্রতিবেশিনী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তোমার চেয়ে অধিক প্রিয় হয় তাহলে তা যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। (প্রতিবেশিনী শব্দ দিয়ে আয়েশা রাযি.-এর দিকে ইঙ্গিত করেছেন)। এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকবার মুচকি হাসলেন। আমি তাকে মুচকি হাসতে দেখে বসে গেলাম। এরপর আমি তার ঘরের দিকে তাকালাম। আল্লাহর শপথ, আমি তাতে তিনটি চামড়ার থলে ছাড়া আর কোনো আকর্ষণীয় বস্তু দেখিনি, যা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। তখন আমি বললাম, আল্লাহ তাআলার কাছে দুয়া করুন, যেন তিনি আপনার উম্মতের জন্য প্রশস্ততার পথ খুলে দেন। কারণ, পারস্য এবং রোমীয়দেরকে প্রশস্ততা ও পার্থিব সমৃদ্ধি দেওয়া হয়েছে; অথচ তারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেলান দেওয়া ছিলেন। তিনি বললেন, “হে খাত্তাবের পুত্র, তুমি কি সংশয়ে নিপতিত? তারা হচ্ছে এমন সম্প্রদায়, যাদের জন্য পার্থিব জীবনেই সকল ভোগ-বিলাস ত্বরান্বিত করা হয়েছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।”

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 সাথির প্রতি নমনীয়তার চিহ্ন

📄 সাথির প্রতি নমনীয়তার চিহ্ন


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাঝে এবং সাহাবায়ে কেরামের মাঝে উষ্ণ যোগাযোগ সৃষ্টির জন্য কথোপকথনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং তাদের সমস্ত আচার-ব্যবহারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান এবং শ্রদ্ধার প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন; যদিও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাদের প্রতি দয়ার্দ্রতা এবং উদারতা প্রদর্শন করতেন-যেন তারা প্রশান্তিময় অবস্থায় বিরাজ করতে পারে। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক যুদ্ধে শরিক ছিলাম। ফিরতি পথে আমরা যখন মদিনার নিকটে এসে উপনীত হলাম তখন আমি আমার ধীরগতির উট নিয়ে তাড়াহুড়া করতে লাগলাম। আমার পেছনের এক আরোহী এসে আমাকে ধরে ফেলল এবং তার সাথে থাকা লাঠি দিয়ে আমার উটকে আঘাত করল। ফলে আমার উটটি স্বাভাবিক উটের তুলনায় দ্রুতগতিতে চলতে লাগল। পেছনে ফিরে দেখলাম আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অবস্থান করছি।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি সদ্য যৌবনে উপনীত এক যুবক।
তিনি বললেন, তুমি কি বিয়ে করেছ?
আমি বললাম, জি।
তিনি বললেন, কুমারী নাকি বিধবা?
আমি বললাম, বিধবা নারী বিয়ে করেছি।
তিনি বললেন, কুমারী কেন বিয়ে করলে না? তুমিও তার সঙ্গ উপভোগ করতে আর সেও তোমার সঙ্গ উপভোগ করত।
মদিনায় পৌঁছে গেলে আমি ঘরে প্রবেশের জন্য উদ্যত হলাম। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, খানিক বিলম্ব করে সন্ধ্যার দিকে প্রবেশ কর। যেন উশকোখুশকো চুলবিশিষ্ট নারী চুল আঁচড়ে নিতে পারে এবং স্বামী অনুপস্থিত নারী ক্ষুর ব্যবহার করতে পারে।
এভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনের মাধ্যমে সাহাবিগণের জীবনের বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে খোঁজখবর নিতেন; যেন তিনি তাদের ব্যাপারে মনোযোগী এবং নিশ্চিন্ত হতে পারেন। মুসলিম শরীফে জাবের রাযি.-এর উল্লিখিত বর্ণনায় কিছু অংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জাবের রাযি. বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার ছোট ছোট ভাই-বোন আছে। তাই আমি আশঙ্কা করেছি (কুমারী বিয়ে করলে) সে আমার আর তাদের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বললেন, তাহলে ঠিক আছে। নিশ্চয়ই একজন নারীকে তার ধার্মিকতা, সম্পদ এবং সৌন্দর্য দেখে বিয়ে করা হয়। তোমার জন্য আবশ্যক হচ্ছে ধার্মিকতার দিককে প্রাধান্য দেয়া। নচেৎ, তোমার উভয় হাত ধূলোয় ধুসরিত হোক।"
এর অনুরূপ ঘটনা আনাস রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযি. মদিনায় আগমন করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাঝে এবং সাদ ইবনে রবী'আ আনসারীর মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে দিলেন। তাই সাদ রাযি. তাকে সমুদয় সম্পদ এবং পরিবারে অর্ধাঅর্ধি হারে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। আব্দুর রহমান রাযি. বললেন, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি বরকত অবতীর্ণ করুন। আপনি আমাকে বাজারের পথ দেখিয়ে দিন। তারপর তিনি সামান্য পরিমাণ মুনাফা অর্জন করলেন। কিছুদিন পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হলুদ চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখতে পেলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কী ব্যাপার, আবদুর রহমান!
তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আনসারি এক মহিলাকে বিয়ে করেছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাতে কী মোহর দিয়েছ?
তিনি বললেন, খেজুরের দানা সমপরিমাণ স্বর্ণ।
তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “একটি ছাগলের মাধ্যমে হলেও ওলিমার আয়োজন করো।"

টিকাঃ
৪ বুখারি, পরিচ্ছেদ: বিবাহ, অধ্যায়: বিধবা বিবাহ করা, হাদিস নং ৪৭৯১, তাহকিক : মুস্তফা দিব আল-বোগা, দারু ইবনি কাসির, ইয়ামামা-বৈরুত। তৃতীয় সংস্করণ, ১৪০৯ হিজরি/১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: দুধপান, অধ্যায়: কুমারী বিবাহ মুস্তাহাব হওয়া, হাদিস নং ৭১৫।
৫ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: দুধপান, অধ্যায়: ধার্মিক নারী বিবাহ করা, হাদিস নং ৭১৫।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 পরামর্শের মাধ্যমে সবচেয়ে সুন্দর মতের অনুসন্ধান

📄 পরামর্শের মাধ্যমে সবচেয়ে সুন্দর মতের অনুসন্ধান


নিশ্চয়ই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামি সাম্রাজ্যের রূপরেখা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে তা অনুসরণ করা এবং তাদের জীবনে এর থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা।
একটি ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা কখনোই নিপীড়ন, স্বৈরশাসন এবং একনায়কতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আর পরামর্শ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসমূহে সকলের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা একটি সফল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্ববহ স্তম্ভ। এ জন্যই আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার সাহাবিগণের সাথে পরামর্শ করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ
“তাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করুন।” [সুরা আলে ইমরান : ১৫৯]
তিনি মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন—
وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ
“আর তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শক্রমে সম্পন্ন হয়।” [সুরা শুরা : ৩৮]
যেহেতু পরামর্শ করা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য এবং এটিই আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত শাসনব্যবস্থার নীতি, তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবায়ে কেরামের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরণ করাটাই স্বাভাবিক। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই। সাহাবায়ে কেরামের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরামর্শের একটি নমুনা নিম্নরূপ, যা হযরত উমর রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে—
বদরের যুদ্ধের দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাগণের দিকে তাকালেন। দেখলেন তারা সংখ্যায় তিনশত-এর কিছু বেশি। মুশরিকদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তারা সংখ্যায় সহস্রাধিক। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবলামুখী হলেন এবং তার দু-হাত প্রসারিত করলেন। এ সময় তার পরনে ছিল চাদর এবং ইযার। এরপর তিনি দুয়া করলেন, “হে আল্লাহ, আপনি আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করুন। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছেন তা দান করুন। হে আল্লাহ, আপনি যদি ইসলামের এই দলকে ধ্বংস করে দেন তাহলে পৃথিবীতে আপনার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না।"
উমর রাযি. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং দুয়া করতেই থাকলেন; এমনকি তার চাদর পড়ে গেল। আবু বকর রাযি. এসে চাদরটি উঠিয়ে তাকে দিলেন। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে বসে থাকলেন। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ তাআলার কাছে আপনার প্রার্থনা যথেষ্ট হয়েছে। নিশ্চয়ই তিনি আপনার প্রতি তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন।
আর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করে দিলেন-
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنَّى هُمِدُّكُم بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلَبِكَةِ مُرْدِفِينَ
“যখন তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিলে তখন তিনি এই বলে সাড়া দিলেন যে, নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে ধারাবাহিকভাবে আগত সহস্র ফেরেশতার মাধ্যমে সাহায্য করব।” [সুরা আল-আনফাল : ৯]
যুদ্ধের দিন আসল এবং উভয় দল মুখোমুখি হলো। আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের পরাজিত করলেন। তাদের ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দি হলো। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর, উমর এবং আলি রাযি.-এর সাথে পরামর্শ করলেন।
আবু বকর রাযি. বললেন, হে আল্লাহর নবী, তারা সকলেই আমাদের চাচাত ভাই, পরিবার-পরিজন এবং সহোদর। তাই আমি মনে করি আপনি তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করুন। তাহলে আমরা তাদের কাছ থেকে যা গ্রহণ করব তা কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি সঞ্চার করবে। হয়তো এর বদৌলতে আল্লাহ তাআলা তাদের সুপথ দিয়েও দিতে পারেন। তখন তারা আমাদের জন্য বাহুবল হয়ে দাঁড়াবে।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
“হে খাত্তাবের পুত্র, তোমার কী মত?”
তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, আমি আবু বকরের সাথে ঐকমত্য পোষণ করতে পারছি না। তবে আমার অভিমত হচ্ছে, আপনি আমাকে অমুকের (উমর রাযি.-এর নিকটাত্মীয়) ব্যাপারে অধিকার প্রদান করবেন-আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। আলিকে সুযোগ দেবেন-সে আকিলের গর্দান উড়িয়ে দেবে। আর হামজাকে তার অমুক ভাইয়ের ব্যাপারে অধিকার প্রদান করবেন-সে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে; যেন আল্লাহ বুঝতে পারেন আমাদের অন্তরে মুশরিকদের জন্য এতটুকুও নমনীয়তা নেই। এরাই তাদের মুখ্য, নেতা এবং পরিচালক। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাযি.-এর মতকেই আমার মতের ওপর প্রাধান্য দিলেন। ফলে তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করলেন।
উমর রাযি. বলেন, পরদিন সকালেই আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে গিয়ে দেখলাম, তিনি এবং আবু বকর রাযি. বসে আছেন। তারা দুজনই ক্রন্দনরত অবস্থায় ছিলেন।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে বলুন আপনি এবং আপনার সঙ্গী কেন কাঁদছেন? তাতে যদি আমার কান্না আসে তাহলে আমিও কাঁদব আর যদি না আসে তাহলে আপনাদের দুজনের কান্নার কারণে আমিও কান্নার ভান করব।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি কাঁদছি তোমার সাথি-সঙ্গীরা আমাকে তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়ার কারণে। নিশ্চয়ই আমার কাছে বন্দিদের শাস্তি দেওয়ার প্রস্তাবকে এর তুলনায় তুচ্ছ করে উপস্থাপন করা হয়েছে”।
কিছুক্ষণ যেতেই আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করে দিলেন-
مَا كَانَ لِنَبِي أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللهُ يُرِيدُ الآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ لَّوْلَا كِتُبٌ مِّنَ اللهِ سَبَقَ لَمَشَكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
“কোনো নবীর জন্য উচিত নয় বন্দিদেরকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না তারা দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটায়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা করো, অথচ আল্লাহ চান আখিরাত। আর আল্লাহ তাআলা হচ্ছেন পরাক্রমশালী এবং প্রজ্ঞাবান। যদি পূর্ব থেকেই সিদ্ধান্ত নির্ধারিত না হতো তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ (অর্থাৎ তোমরা যে মুক্তিপণ গ্রহণ করেছ) সে জন্য বিরাট শাস্তির সম্মুখীন হতে।" [সুরা আনফাল: ৬৭, ৬৮]
এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের জন্য গনিমত অর্থাৎ যুদ্ধলদ্ধ সম্পদ বৈধ করে দেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এবং তার সম্মানিত পরিবার-পরিজনের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করতেন। ইফকের ঘটনার সময় সাহাবায়ে কেরামের মাঝে আয়েশা রাযি. সম্পর্কে অসৎ ধারণা ছড়িয়ে পড়লে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি রাযি. এবং উসামা ইবনে যায়েদ রাযি.-কে ডাকেন। তখন ওহির অবতরণ বন্ধ ছিল। তিনি তাদের কাছে তার স্ত্রী পরিত্যাগের ব্যাপারে পরামর্শ কামনা করেন।
উসামা রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণের নিষ্কলুষতার কথা জানতেন এবং তার অন্তরে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা বদ্ধমূল ছিল। তাই তিনি সে দিকে লক্ষ করেই বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, তারা আপনার পরিবারের সদস্য। আমরা তাদের ব্যাপারে ভালো ব্যতীত মন্দ কিছু জানি না।
কিন্তু আলি রাযি. চিন্তা করছিলেন, কীভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশান্তি লাভ করতে পারেন এবং লোকমুখে প্রচলিত এই মন্দ ধারণা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারেন। তাই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কোনো কিছু সংকীর্ণ করেননি। আর তারা ছাড়াও আরও অনেক নারী আছে। অর্থাৎ হে আল্লাহর রাসুল, আপনি তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে বাস্তবতা ও প্রকৃত অবস্থা জানতে চান। তাই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাস্তবতা সম্পর্কে জানার জন্য প্রায় কার্যকর একটি উপায় জানিয়ে দিলেন। তা হচ্ছে—আপনি বাঁদিকে জিজ্ঞাসা করুন, সে আপনার কাছে সত্য ঘটনা বলবে।
এই গেল এক ঘটনা। একই ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদেমা বারিরা রাযি.-এর সাথেও কথোপকথন করেছেন। বারিরা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, ওহে বারিরা, তুমি কি আয়েশার কাছ থেকে এমন কিছু দেখেছ, যা তোমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে?
বারিরা তাঁকে বললেন, সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য বাণী দিয়ে প্রেরণ করেছেন, আমি কখনোই এমন কিছু দেখিনি, যার মাধ্যমে আমি তাকে দোষী মনে করব। এর চেয়ে বড় কথা হলো, তিনি একজন অল্প বয়স্কা কিশোরী; যিনি তার পরিবারের জন্য বানানো ময়দার খামিরা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন, এরপর গৃহপালিত পশুরা এসে তা খেয়ে ফেলে।
সুতরাং আম্মাজান আয়েশা রাযি.-এর আচরণে সন্দেহজনক কিছুই ছিল না। খাদেমার কাছে যে ব্যাপারটি সমস্যা মনে হয়েছে তা হচ্ছে, তিনি অল্প বয়স্কা কিশোরী; যিনি ময়দার খামিরা বানাতে গিয়ে তা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন, এমনকি গৃহে আগমনকারী পশু-পাখি এসে তা খেয়ে ফেলে। আর এগুলো হচ্ছে অল্প বয়স্কা, নিষ্কলুষ এবং সরল মেয়েদের কাজ। এ কথার মাধ্যমেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আয়েশা রাযি.-এর প্রতিটি অপবাদ থেকে নির্দোষ হওয়ার কথা স্পষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট করে সুরা নুরের আয়াতসমূহের ওহি প্রেরণ করেছেন এবং যারা এই নিন্দা রটিয়েছে এবং প্রচার করেছে তাদের অপদস্থ করেছেন।

টিকাঃ
১১ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: জিহাদ এবং যুদ্ধ, অধ্যায়: বদরের যুদ্ধে ফেরেশতার মাধ্যমে সাহায্য এবং গনিমতের সম্পদ বৈধকরণ সম্পর্কিত, হাদিস নং ১৭৬৩। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২০৮। সুনানুল কুবরা-ইমাম বায়হাকি, তাহকিক মুহাম্মদ আবদুল কাদির আতা, মাকতাবা দারুল বায, মক্কা মুকাররমা, ১৪১৪ হিজরি, ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ, হাদিস নং ১২৬২২।
১২ বুখারি: পরিচ্ছেদ: তাফসির, সুরা নুর, হাদিস নং ৪৪৭৩। মুসলিম পরিচ্ছেদ: তওবা, অধ্যায় : ইফকের ঘটনা এবং অপবাদ দাতার তওবা কবুল হওয়া সম্পর্কিত, হাদিস নং ২৭৭০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00