📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 সাথির প্রতি নমনীয়তার চিহ্ন

📄 সাথির প্রতি নমনীয়তার চিহ্ন


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাঝে এবং সাহাবায়ে কেরামের মাঝে উষ্ণ যোগাযোগ সৃষ্টির জন্য কথোপকথনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং তাদের সমস্ত আচার-ব্যবহারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান এবং শ্রদ্ধার প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন; যদিও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাদের প্রতি দয়ার্দ্রতা এবং উদারতা প্রদর্শন করতেন-যেন তারা প্রশান্তিময় অবস্থায় বিরাজ করতে পারে। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক যুদ্ধে শরিক ছিলাম। ফিরতি পথে আমরা যখন মদিনার নিকটে এসে উপনীত হলাম তখন আমি আমার ধীরগতির উট নিয়ে তাড়াহুড়া করতে লাগলাম। আমার পেছনের এক আরোহী এসে আমাকে ধরে ফেলল এবং তার সাথে থাকা লাঠি দিয়ে আমার উটকে আঘাত করল। ফলে আমার উটটি স্বাভাবিক উটের তুলনায় দ্রুতগতিতে চলতে লাগল। পেছনে ফিরে দেখলাম আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অবস্থান করছি।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি সদ্য যৌবনে উপনীত এক যুবক।
তিনি বললেন, তুমি কি বিয়ে করেছ?
আমি বললাম, জি।
তিনি বললেন, কুমারী নাকি বিধবা?
আমি বললাম, বিধবা নারী বিয়ে করেছি।
তিনি বললেন, কুমারী কেন বিয়ে করলে না? তুমিও তার সঙ্গ উপভোগ করতে আর সেও তোমার সঙ্গ উপভোগ করত।
মদিনায় পৌঁছে গেলে আমি ঘরে প্রবেশের জন্য উদ্যত হলাম। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, খানিক বিলম্ব করে সন্ধ্যার দিকে প্রবেশ কর। যেন উশকোখুশকো চুলবিশিষ্ট নারী চুল আঁচড়ে নিতে পারে এবং স্বামী অনুপস্থিত নারী ক্ষুর ব্যবহার করতে পারে।
এভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনের মাধ্যমে সাহাবিগণের জীবনের বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে খোঁজখবর নিতেন; যেন তিনি তাদের ব্যাপারে মনোযোগী এবং নিশ্চিন্ত হতে পারেন। মুসলিম শরীফে জাবের রাযি.-এর উল্লিখিত বর্ণনায় কিছু অংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জাবের রাযি. বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার ছোট ছোট ভাই-বোন আছে। তাই আমি আশঙ্কা করেছি (কুমারী বিয়ে করলে) সে আমার আর তাদের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বললেন, তাহলে ঠিক আছে। নিশ্চয়ই একজন নারীকে তার ধার্মিকতা, সম্পদ এবং সৌন্দর্য দেখে বিয়ে করা হয়। তোমার জন্য আবশ্যক হচ্ছে ধার্মিকতার দিককে প্রাধান্য দেয়া। নচেৎ, তোমার উভয় হাত ধূলোয় ধুসরিত হোক।"
এর অনুরূপ ঘটনা আনাস রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযি. মদিনায় আগমন করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাঝে এবং সাদ ইবনে রবী'আ আনসারীর মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে দিলেন। তাই সাদ রাযি. তাকে সমুদয় সম্পদ এবং পরিবারে অর্ধাঅর্ধি হারে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। আব্দুর রহমান রাযি. বললেন, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি বরকত অবতীর্ণ করুন। আপনি আমাকে বাজারের পথ দেখিয়ে দিন। তারপর তিনি সামান্য পরিমাণ মুনাফা অর্জন করলেন। কিছুদিন পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হলুদ চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখতে পেলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কী ব্যাপার, আবদুর রহমান!
তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আনসারি এক মহিলাকে বিয়ে করেছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাতে কী মোহর দিয়েছ?
তিনি বললেন, খেজুরের দানা সমপরিমাণ স্বর্ণ।
তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “একটি ছাগলের মাধ্যমে হলেও ওলিমার আয়োজন করো।"

টিকাঃ
৪ বুখারি, পরিচ্ছেদ: বিবাহ, অধ্যায়: বিধবা বিবাহ করা, হাদিস নং ৪৭৯১, তাহকিক : মুস্তফা দিব আল-বোগা, দারু ইবনি কাসির, ইয়ামামা-বৈরুত। তৃতীয় সংস্করণ, ১৪০৯ হিজরি/১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: দুধপান, অধ্যায়: কুমারী বিবাহ মুস্তাহাব হওয়া, হাদিস নং ৭১৫।
৫ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: দুধপান, অধ্যায়: ধার্মিক নারী বিবাহ করা, হাদিস নং ৭১৫।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 পরামর্শের মাধ্যমে সবচেয়ে সুন্দর মতের অনুসন্ধান

📄 পরামর্শের মাধ্যমে সবচেয়ে সুন্দর মতের অনুসন্ধান


নিশ্চয়ই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামি সাম্রাজ্যের রূপরেখা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে তা অনুসরণ করা এবং তাদের জীবনে এর থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা।
একটি ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা কখনোই নিপীড়ন, স্বৈরশাসন এবং একনায়কতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আর পরামর্শ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসমূহে সকলের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা একটি সফল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্ববহ স্তম্ভ। এ জন্যই আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার সাহাবিগণের সাথে পরামর্শ করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ
“তাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করুন।” [সুরা আলে ইমরান : ১৫৯]
তিনি মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন—
وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ
“আর তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শক্রমে সম্পন্ন হয়।” [সুরা শুরা : ৩৮]
যেহেতু পরামর্শ করা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য এবং এটিই আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত শাসনব্যবস্থার নীতি, তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবায়ে কেরামের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরণ করাটাই স্বাভাবিক। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই। সাহাবায়ে কেরামের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরামর্শের একটি নমুনা নিম্নরূপ, যা হযরত উমর রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে—
বদরের যুদ্ধের দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাগণের দিকে তাকালেন। দেখলেন তারা সংখ্যায় তিনশত-এর কিছু বেশি। মুশরিকদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তারা সংখ্যায় সহস্রাধিক। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবলামুখী হলেন এবং তার দু-হাত প্রসারিত করলেন। এ সময় তার পরনে ছিল চাদর এবং ইযার। এরপর তিনি দুয়া করলেন, “হে আল্লাহ, আপনি আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করুন। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছেন তা দান করুন। হে আল্লাহ, আপনি যদি ইসলামের এই দলকে ধ্বংস করে দেন তাহলে পৃথিবীতে আপনার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না।"
উমর রাযি. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং দুয়া করতেই থাকলেন; এমনকি তার চাদর পড়ে গেল। আবু বকর রাযি. এসে চাদরটি উঠিয়ে তাকে দিলেন। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে বসে থাকলেন। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ তাআলার কাছে আপনার প্রার্থনা যথেষ্ট হয়েছে। নিশ্চয়ই তিনি আপনার প্রতি তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন।
আর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করে দিলেন-
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنَّى هُمِدُّكُم بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلَبِكَةِ مُرْدِفِينَ
“যখন তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিলে তখন তিনি এই বলে সাড়া দিলেন যে, নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে ধারাবাহিকভাবে আগত সহস্র ফেরেশতার মাধ্যমে সাহায্য করব।” [সুরা আল-আনফাল : ৯]
যুদ্ধের দিন আসল এবং উভয় দল মুখোমুখি হলো। আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের পরাজিত করলেন। তাদের ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দি হলো। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর, উমর এবং আলি রাযি.-এর সাথে পরামর্শ করলেন।
আবু বকর রাযি. বললেন, হে আল্লাহর নবী, তারা সকলেই আমাদের চাচাত ভাই, পরিবার-পরিজন এবং সহোদর। তাই আমি মনে করি আপনি তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করুন। তাহলে আমরা তাদের কাছ থেকে যা গ্রহণ করব তা কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি সঞ্চার করবে। হয়তো এর বদৌলতে আল্লাহ তাআলা তাদের সুপথ দিয়েও দিতে পারেন। তখন তারা আমাদের জন্য বাহুবল হয়ে দাঁড়াবে।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
“হে খাত্তাবের পুত্র, তোমার কী মত?”
তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, আমি আবু বকরের সাথে ঐকমত্য পোষণ করতে পারছি না। তবে আমার অভিমত হচ্ছে, আপনি আমাকে অমুকের (উমর রাযি.-এর নিকটাত্মীয়) ব্যাপারে অধিকার প্রদান করবেন-আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। আলিকে সুযোগ দেবেন-সে আকিলের গর্দান উড়িয়ে দেবে। আর হামজাকে তার অমুক ভাইয়ের ব্যাপারে অধিকার প্রদান করবেন-সে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে; যেন আল্লাহ বুঝতে পারেন আমাদের অন্তরে মুশরিকদের জন্য এতটুকুও নমনীয়তা নেই। এরাই তাদের মুখ্য, নেতা এবং পরিচালক। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাযি.-এর মতকেই আমার মতের ওপর প্রাধান্য দিলেন। ফলে তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করলেন।
উমর রাযি. বলেন, পরদিন সকালেই আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে গিয়ে দেখলাম, তিনি এবং আবু বকর রাযি. বসে আছেন। তারা দুজনই ক্রন্দনরত অবস্থায় ছিলেন।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে বলুন আপনি এবং আপনার সঙ্গী কেন কাঁদছেন? তাতে যদি আমার কান্না আসে তাহলে আমিও কাঁদব আর যদি না আসে তাহলে আপনাদের দুজনের কান্নার কারণে আমিও কান্নার ভান করব।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি কাঁদছি তোমার সাথি-সঙ্গীরা আমাকে তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়ার কারণে। নিশ্চয়ই আমার কাছে বন্দিদের শাস্তি দেওয়ার প্রস্তাবকে এর তুলনায় তুচ্ছ করে উপস্থাপন করা হয়েছে”।
কিছুক্ষণ যেতেই আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করে দিলেন-
مَا كَانَ لِنَبِي أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللهُ يُرِيدُ الآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ لَّوْلَا كِتُبٌ مِّنَ اللهِ سَبَقَ لَمَشَكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
“কোনো নবীর জন্য উচিত নয় বন্দিদেরকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না তারা দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটায়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা করো, অথচ আল্লাহ চান আখিরাত। আর আল্লাহ তাআলা হচ্ছেন পরাক্রমশালী এবং প্রজ্ঞাবান। যদি পূর্ব থেকেই সিদ্ধান্ত নির্ধারিত না হতো তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ (অর্থাৎ তোমরা যে মুক্তিপণ গ্রহণ করেছ) সে জন্য বিরাট শাস্তির সম্মুখীন হতে।" [সুরা আনফাল: ৬৭, ৬৮]
এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের জন্য গনিমত অর্থাৎ যুদ্ধলদ্ধ সম্পদ বৈধ করে দেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এবং তার সম্মানিত পরিবার-পরিজনের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করতেন। ইফকের ঘটনার সময় সাহাবায়ে কেরামের মাঝে আয়েশা রাযি. সম্পর্কে অসৎ ধারণা ছড়িয়ে পড়লে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি রাযি. এবং উসামা ইবনে যায়েদ রাযি.-কে ডাকেন। তখন ওহির অবতরণ বন্ধ ছিল। তিনি তাদের কাছে তার স্ত্রী পরিত্যাগের ব্যাপারে পরামর্শ কামনা করেন।
উসামা রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণের নিষ্কলুষতার কথা জানতেন এবং তার অন্তরে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা বদ্ধমূল ছিল। তাই তিনি সে দিকে লক্ষ করেই বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, তারা আপনার পরিবারের সদস্য। আমরা তাদের ব্যাপারে ভালো ব্যতীত মন্দ কিছু জানি না।
কিন্তু আলি রাযি. চিন্তা করছিলেন, কীভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশান্তি লাভ করতে পারেন এবং লোকমুখে প্রচলিত এই মন্দ ধারণা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারেন। তাই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কোনো কিছু সংকীর্ণ করেননি। আর তারা ছাড়াও আরও অনেক নারী আছে। অর্থাৎ হে আল্লাহর রাসুল, আপনি তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে বাস্তবতা ও প্রকৃত অবস্থা জানতে চান। তাই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাস্তবতা সম্পর্কে জানার জন্য প্রায় কার্যকর একটি উপায় জানিয়ে দিলেন। তা হচ্ছে—আপনি বাঁদিকে জিজ্ঞাসা করুন, সে আপনার কাছে সত্য ঘটনা বলবে।
এই গেল এক ঘটনা। একই ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদেমা বারিরা রাযি.-এর সাথেও কথোপকথন করেছেন। বারিরা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, ওহে বারিরা, তুমি কি আয়েশার কাছ থেকে এমন কিছু দেখেছ, যা তোমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে?
বারিরা তাঁকে বললেন, সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য বাণী দিয়ে প্রেরণ করেছেন, আমি কখনোই এমন কিছু দেখিনি, যার মাধ্যমে আমি তাকে দোষী মনে করব। এর চেয়ে বড় কথা হলো, তিনি একজন অল্প বয়স্কা কিশোরী; যিনি তার পরিবারের জন্য বানানো ময়দার খামিরা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন, এরপর গৃহপালিত পশুরা এসে তা খেয়ে ফেলে।
সুতরাং আম্মাজান আয়েশা রাযি.-এর আচরণে সন্দেহজনক কিছুই ছিল না। খাদেমার কাছে যে ব্যাপারটি সমস্যা মনে হয়েছে তা হচ্ছে, তিনি অল্প বয়স্কা কিশোরী; যিনি ময়দার খামিরা বানাতে গিয়ে তা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন, এমনকি গৃহে আগমনকারী পশু-পাখি এসে তা খেয়ে ফেলে। আর এগুলো হচ্ছে অল্প বয়স্কা, নিষ্কলুষ এবং সরল মেয়েদের কাজ। এ কথার মাধ্যমেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আয়েশা রাযি.-এর প্রতিটি অপবাদ থেকে নির্দোষ হওয়ার কথা স্পষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট করে সুরা নুরের আয়াতসমূহের ওহি প্রেরণ করেছেন এবং যারা এই নিন্দা রটিয়েছে এবং প্রচার করেছে তাদের অপদস্থ করেছেন।

টিকাঃ
১১ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: জিহাদ এবং যুদ্ধ, অধ্যায়: বদরের যুদ্ধে ফেরেশতার মাধ্যমে সাহায্য এবং গনিমতের সম্পদ বৈধকরণ সম্পর্কিত, হাদিস নং ১৭৬৩। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২০৮। সুনানুল কুবরা-ইমাম বায়হাকি, তাহকিক মুহাম্মদ আবদুল কাদির আতা, মাকতাবা দারুল বায, মক্কা মুকাররমা, ১৪১৪ হিজরি, ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ, হাদিস নং ১২৬২২।
১২ বুখারি: পরিচ্ছেদ: তাফসির, সুরা নুর, হাদিস নং ৪৪৭৩। মুসলিম পরিচ্ছেদ: তওবা, অধ্যায় : ইফকের ঘটনা এবং অপবাদ দাতার তওবা কবুল হওয়া সম্পর্কিত, হাদিস নং ২৭৭০।

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 শিক্ষাপ্রদান

📄 শিক্ষাপ্রদান


কথোপকথনকে যারা শিক্ষাপ্রদানের জন্য ব্যবহার করেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যিনি তার উম্মতের জন্য সর্বোত্তম এবং সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষক ছিলেন। বরং তিনি সমস্ত মানবজাতির জন্য শিক্ষকস্বরূপ ছিলেন। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষণীয় কথোপকথনের ঘটনা অগণিত। যার কয়েকটি ঘটনা নিম্নরূপ :
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. কর্তৃক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবিগণের সাথে বসলেন। তখন তিনি সাহাবিগণকে বললেন, তোমরা কি জানো, মুফলিস (দেওলিয়া, অসহায়, নিঃস্ব) কে?
তারা বললেন, আমাদের মাঝে মুফলিস তথা অসহায় হচ্ছে, যার কোনো দিরহাম এবং সহায়-সম্বল নেই।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব হচ্ছে তারা, যারা কিয়ামত দিবসে নামাজ, রোজা এবং জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে। তবে এর সাথে সাথে কাউকে গালি দেওয়া, কারও নামে অপবাদ দেওয়া, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা, কারও রক্তপাত করা অথবা কাউকে আঘাত করার মতো অপরাধ নিয়েও উপস্থিত হবে। ফলে নিপীড়কের নেকি পীড়িতকে দিয়ে দেওয়া হবে। যদি তার অপরাধের হিসাব শেষ হওয়ার পূর্বেই তার নেকি নিঃশেষ হয়ে যায় তাহলে পীড়িতের অপরাধ তার কাঁধে চাপানো হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

টিকাঃ
৬ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তা রক্ষা এবং শিষ্টাচার, অধ্যায়: অত্যাচার হারাম হওয়া, হাদিস নং ২৫৮১। তিরমিযি, হাদিস নং ২৪১৮। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮০১৬। ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৪১১, সহিহ ইবনে হিব্বান বিতারতিবি ইবনি বালবান, তাহকিক :

📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 সন্দেহ দূরীকরণ

📄 সন্দেহ দূরীকরণ


যেমনিভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনের মাধ্যমে লোকদেরকে সঠিক শিক্ষা প্রদান করতেন, তেমনিভাবে তাদেরকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ানো সন্দেহ-সংশয়গুলোকেও দূরীভূত করতেন। আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কয়েকজন সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এসে বললেন, আমাদের অন্তরে এমন অনেক কুপ্রবৃত্তি সৃষ্টি হয়, যা প্রকাশ করাকে আমরা বেশ কঠিন মনে করি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা কি আসলেই তা উপলব্ধি করেছ?”
তারা বললেন, “জি, হ্যাঁ।”
তিনি বললেন, “এটিই ঈমানের স্পষ্ট নিদর্শন।”
এখানে আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পেলাম যে, তিনি ওই সকল সাহাবায়ে কেরামের ভয়কে নির্বাপিত করছেন, যাদের কাছে শয়তান আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সম্পর্কে বিভিন্ন সংশয় নিয়ে আসে। আর তাদের নিকটে বর্ণনা করেছেন যে, খাঁটি ঈমানের গুণাবলি তাদের মাঝে থাকার কারণেই এমনটি হয়েছে।
এমনিভাবে আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, এক লোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসে কাফিরদেরকে তাদের চেহারায় ভর করিয়ে কীভাবে সমবেত করবেন?”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “যিনি তাকে পৃথিবীতে দু-পায়ের উপর ভর করিয়ে চালিয়েছেন তিনি কি তাকে কিয়ামত দিবসে চেহারায় ভর করিয়ে চালিত করতে সক্ষম নন?”
কাতাদাহ বললেন, “অবশ্যই, আমার প্রভুর বড়ত্বের শপথ।"
এই ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে কাফিরদেরকে তাদের চেহারায় ভর করিয়ে চালিত করার বিষয়টি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করছিলেন, কাফেররা কি তাদের দুই পায়ে ভর করে চলতে সক্ষম নয়? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, এই ব্যাপারটি আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত; মানুষের ক্ষমতার সাথে নয়।

টikaḥ
৭ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: সদ্‌ব্যবহার, আত্মীয়তা রক্ষা এবং শিষ্টাচার, অধ্যায়: ক্রোধের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণের মর্যাদা এবং যে সকল বস্তুর মাধ্যমে ক্রোধ দূরীভূত হয় সে সম্পর্কিত, হাদিস নং ২৬০৮। আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৭৭৯, তাহকিক মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন আবদুল হামিদ, দারুল ফিকর। ইবনে হিব্বان, হাদিস নং ২৯৫০। মুসনাদে আবু ইয়া'লা, হাদিস নং ৫১৬২, তাহকিক : হুসাইন সুলাইম আসাদ, দারুল মামুন লিততোরাস-দামেশক, প্রথম সংস্করণ, ১৪০৪ হিজরি/১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ। ইমাম বায়হাকি রচিত শু'আবুল ঈমান, হাদিসের তাহকিক, নছ সম্পর্কে অনুসন্ধান এবং হাদিসের তাখরিজ করেছেন ড. আবদুল আলি আবদুল হামিদ হামেদ, মাকতাবাতুর রুশদ-মুম্বাই, ভারত, প্রথম সংস্করণ, ১৪২৩ হিজরি; ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দ, হাদিস নং ৮২৭৩।
৮ মুসলিম, পরিচ্ছেদ: ঈমান, অধ্যায় ঈমানের ক্ষেত্রে সংশয় পোষণ এবং যারা সংশয়ের স্বীকারোক্তি প্রদান করে সে সম্পর্কিত, হাদিস নং ১৩২।
৯ বুখারি, পরিচ্ছেদ: রিকাক, অধ্যায়: হাশর কীভাবে হবে সে সম্পর্কিত, হাদিস নং ৬১৫৮। মুসলিম, পরিচ্ছেদ: মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য এবং হুকুম, অধ্যায়: কাফেরদের চেহারায় ভর করিয়ে কীভাবে সমবেত করা হবে? এ সম্পর্কিত, হাদিস নং ২৮০৬। আর হাদিসের বাক্য এই সনদ থেকে চয়িত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00