📘 কেমন ছিল প্রিয়নবীর আলাপচারিতা > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


[সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর সাথে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথন]
শিক্ষাব্যবস্থা এবং যোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যম আবিষ্কৃত হওয়ার আগ থেকেই মানুষের মাঝে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষার মৌলিক মাধ্যম ছিল পরস্পরে কথা বিনিময় করা। মানুষ একটি সামাজিক জীব। তারা সাধারণত দলবদ্ধভাবেই বসবাস করে। তাই দলবদ্ধভাবে জীবনযাপনে সক্ষম হতে এবং নিজের মৌলিক প্রয়োজনাদি ব্যক্ত করতে পরস্পর কথোপকথন অত্যাবশ্যকীয়। তাই একটি শিশু পর্যন্তও পিতা-মাতার কাছ থেকে তার প্রয়োজনীয় বস্তু চেয়ে নেয়।
যারা ইনসাফের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন নিয়ে গবেষণা করেন, তারা সকলেই জানেন যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন সত্যিকারের রাসুল, প্রকৃত নবী। কেননা, কোনো মানুষের পক্ষেই তার জীবনযাপনে এবং আচার-ব্যবহারে মানবিক শ্রেষ্ঠত্বের সারনির্যাসের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব নয়। আর মানুষের সাথে আচার-ব্যবহারে যে সকল মানবিক মাধ্যম রয়েছে, সেগুলোর উচ্চাঙ্গের বৈশিষ্ট্য কেবল ওহিপ্রাপ্ত নবীগণই অর্জন করতে পারেন।
নিশ্চয়ই প্রত্যেক গবেষক এবং বিশেষজ্ঞ তার অবস্থান থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের যেকোনো নির্দিষ্ট দিক সম্পর্কে জানতে পারবে। তাই একজন খাঁটি দ্বীনের পথে আহ্বানকারী যেমন পাবেন তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু, তেমনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও শিখতে পারবেন পরিপূর্ণ পাঠ। সেনা পরিচালক অর্জন করতে পারবেন তার উদ্দেশ্য। এমনিভাবে শারীরিক চিকিৎসকও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে অবশ্যই শিক্ষা লাভ করতে পারবেন। কেনই বা পারবেন না?
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন—
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَن كَانَ يَرْجُوا اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللهَ كَثِيرًا
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ; যারা আল্লাহ এবং আখেরাত দিবসের প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহ তাআলাকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে, তাদের জন্য।” [সুরা আহযাব: ২১]
এদিক বিবেচনায়, স্বাভাবিকভাবেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনের দিক দিয়েও সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তিনি কথোপকথনের নিয়মকানুন, উপকারিতা, পদ্ধতিসমূহ, শিষ্টাচার এবং রীতি-নীতি শিখিয়েছেন। তিনি তার সারা জীবনব্যাপী সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতিতে কথাবার্তা বিনিময় করেছেন। এ ক্ষেত্রে মুসলিম-কাফের, পুরুষ-নারী, শিশু-বৃদ্ধ সকলের সাথেই সমান আচরণ করেছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরদের সাথে যোগাযোগ এবং সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে কথোপকথনের সেবা গ্রহণ করেছেন। পারস্পরিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের বিরাটতম এক দায়িত্ব। প্রত্যেক রাসুলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলিগ। পাশের মানুষদের সাথে কথোপকথন ব্যতীত এ দায়িত্ব সম্পাদন কিছুতেই সম্ভব নয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ﴾
“হে রাসুল, আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে, আপনি তা পৌঁছে দিন। আর যদি আপনি এরূপ না করেন তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না।” [সুরা মায়িদাহ: ৬৭]
একজন রাসুলের জন্য কখনোই অন্তর্মুখী এবং বিচ্ছিন্ন হওয়া ঠিক নয়। কঠোর স্বভাবের হওয়া তো দূরের কথা, তার জন্য মানুষের সাথে কথা না বলা এবং ওঠাবসা না করাও দূষণীয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نَفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ﴾
“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয়ের হতেন তাহলে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে গিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে যেত।” [সুরা আলে-ইমরান: ১৫৯]
সুতরাং পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতিতে তাবলিগের দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া এবং মানবঅন্তরের সাথে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার কাজ কথোপকথনের ওপর নির্ভরতার সাথে সম্পৃক্ত। এটিই পরস্পর যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যম।
এমনিভাবে যদি প্রশ্ন করা হয়, কথোপকথন পরস্পর দয়া প্রতিষ্ঠার মাধ্যম কি?
উত্তরে বলব, হ্যাঁ, এটি পরস্পর দয়া প্রতিষ্ঠারও মাধ্যম।
কেননা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন দয়ালু এবং ভালোবাসার মূর্তপ্রতীক। তার দয়া ছিল এক সামগ্রিক উপাদান; যা তার প্রতিটি কথোপকথন থেকেই উদ্ভাসিত হতো।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন এবং কাফেরদের সাথে কথাবার্তা বলেছেন। প্রত্যেকের সাথে কথোপকথনেই দয়া, উদারতা এবং কোমলতার প্রকাশ থাকত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই কারও প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করেননি। কোনো ব্যক্তি যতই ছোট হোক এবং মানুষের মাঝে তার অবস্থান যতই তুচ্ছ হোক, তিনি কারও সাথে দুর্ব্যবহার করেননি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বলতেন কোমলতা এবং দয়া ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, মানুষকে শিক্ষা এবং শিষ্টাচার প্রদানের জন্য, উদারতার বার্তা বিলিয়ে দেওয়ার জন্য কিংবা প্রতিবেশীর সাথে সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করার জন্য। আর এ সকল বৈশিষ্ট্যের জন্য দয়ার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
আল্লাহ তাআলা যথার্থই বলেছেন-
وَمَا أَرْسَلْنَكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَلَمِينَ
"আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” [সুরা আম্বিয়া: ১০৭]
এতসত্ত্বেও অনেক মুসলমান পশ্চিমা বইপত্রে কথোপকথন এবং অপরের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার রীতি-নীতি খুঁজে বেড়ায়। অথচ লেখক এবং রচয়িতাগণ তাদের দক্ষতা সত্ত্বেও কথোপকথন এবং পারস্পরিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দক্ষতা এবং যোগ্যতার ধারেকাছেও পৌঁছুতে পারবে না।
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে আমরা সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথন সম্পর্কে আলোচনা করব। যদিও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক দলের মানুষ তথা মুসলিম-কাফের, পুরুষ-নারী এবং স্বাধীন-দাসদের সাথে অনেক পদ্ধতিতে কথা বলেছেন। জীবনের প্রতিটি পর্যায় তথা পরিচিতি থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রদান, দান-সদকা এবং অন্যের সাথে কথা বলা প্রভৃতি কাজে তিনি বিভিন্ন আঙ্গিকে কথোপকথন করেছেন। তবুও বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে আমরা এর কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করার চেষ্টা করব। যদিও তা সম্পূর্ণরূপে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব ব্যাপার।
এই গ্রন্থটি তুলে ধরবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরামের সাথে তার কথোপকথনের বিভিন্ন পর্যায়। যাতে করে প্রকৃতপক্ষে এই উপকারিতা সাব্যস্ত করা যায় যে, নিশ্চয়ই কথোপকথন ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনব্যবস্থার অন্যতম একটি শিক্ষণীয় উপকরণ। আকস্মিক অবস্থাতেও তা কোনো অনর্থক কথাবার্তা ছিল না।
কেননা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ডিক্টেটর তথা একনায়ক ছিলেন না যে, তিনি শুধু আদেশ-নিষেধ প্রদান করেই ক্ষান্ত থাকবেন। অধিকাংশ মানুষ তাদের গৃহে অথবা অধিকাংশ শাসক তাদের রাজত্বে অন্যের সিদ্ধান্ত শ্রবণের ধৈর্য রাখে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মতো ছিলেন না। বরং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরের সাথে যথেষ্ট পরিমাণে কথোপকথন করতেন আর তিনি ছিলেন চমৎকার শ্রোতা। এই গ্রন্থে অচিরেই তা প্রমাণিত হবে। সে জন্য আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00