📄 অনুবাদকের কথা
আমাদের প্রতিটি কথাই যেন হয় সাওয়াবের উদ্দেশ্যে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ مِنَ البَيان لسحرًا ، أَوْ إِنَّ بَعْضَ البَيانِ سِحْر
“নিশ্চয়ই কিছু কিছু কথায় রয়েছে জাদু (অথবা বলেছেন,) কোনো কোনো কথাই হচ্ছে জাদু।”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সংক্ষিপ্ত হাদিসটি জানিয়ে দিচ্ছে কথার গুরুত্ব। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তু হচ্ছে কথা। আমাদের প্রাত্যহিক প্রয়োজন মেটাতে কথা বলার বিকল্প নেই। তাই মানুষের জীবনে কথার অপরিসীম গুরুত্ব স্পষ্টভাবেই বুঝে আসে। তবে আমাদের প্রায় কথাগুলোই হয় অনর্থক। আমরা শুধু সময় কাটানোর লক্ষ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে কাটিয়ে দিই। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আমাদের অনর্থক কথাবার্তাগুলো ডেকে আনে ঝগড়া-বিবাদ।
একটু ভাবুন তো, আমরা প্রতিদিন যে এত কথা বলি, যদি প্রতিটি কথার বিনিময়ে সাওয়াব পাওয়া যেত তাহলে কেমন হতো? নিশ্চয়ই আমাদের আমলনামায় যোগ হতো নেকির এক বিরাট অংশ। মুমিনের জীবনে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তু হচ্ছে নেকি। ভাবছেন, প্রতিটি কথার মাধ্যমে সাওয়াব কীভাবে পাবেন? আপনার মনে উদিত হওয়া সকল প্রশ্নের জবাব দিতেই আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দ শ বছর পূর্বে আল্লাহ তাআলা ধরার বুকে প্রেরিত করেছিলেন তার প্রিয় বান্দা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। আর পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করে দিয়েছেন—
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” [সুরা আহযাব: ২১]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি কাজেই ছিলেন উম্মাহর আদর্শ। প্রত্যেক ব্যক্তিই তার নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন হতে উপকার লাভ করতে পারবে। তিনি তার প্রতিটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপেই আমাদের জন্য আদর্শের বীজ বপন করে গেছেন। এমনকি তার কোনো কথাই আদর্শ থেকে খালি নয়। তার প্রতিটি কথায় লুকিয়ে আছে হাজারো মণি-মুক্তোর সৌন্দর্য।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথোপকথনের সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন সাহাবায়ে কেরামকে। কতই না উত্তম সঙ্গী ছিলেন তারা! তাইতো তাদের মধ্যকার কথোপকথন ছিল সবচেয়ে সুন্দর কথোপকথন।
বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে এই গ্রন্থটি যে অতি চমৎকার এক পরিবেশনা-তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক ড. রাগিব সারজানি তার কলমের ডগায় তুলে এনেছেন এক অতি চমৎকার বিষয়বস্তু। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার বৈশিষ্ট্যগুলোকে তুলে ধরেছেন আমাদের সামনে। অথচ কখনো ভাবিইনি যে, কথারও বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তিনি ব্যক্ত করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি কথার পেছনেই ছিল মহৎ উদ্দেশ্য। তার প্রতিটি কথায় ছিল উপস্থাপনাগত চমৎকারিতা, ভাষাগত উৎকর্ষ।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোনো কথায় পাষাণ হৃদয়কে মোমের মতো গলিয়ে দিয়েছিলেন। তার আন্তরিক কথোপকথনে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন আবু যর গিফারী রাযি.। ইসলামের প্রতি চরম বিদ্বেষ লালনকারী হিন্দা বিনতে উতবা হয়ে গিয়েছিলেন ইসলামের তরে জীবন উৎসর্গকারী।
তাই আর দেরি না করে চলুন প্রবেশ করি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথনের সৌন্দর্যের ভুবনে। আমাদের প্রতিটি কথায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করে আমাদের প্রতিটি কথাকেই সাওয়াবসমৃদ্ধ করে তুলি আর অর্জন করে নিই পরকালে বিচার দিবসের অমূল্য পাথেয়। হয়তো আপনার একটি কথাই হতে পারে পরকালে নাজাতের ওসিলা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন।
মাহদি হাসান
সিরাজদিখান, মুন্সীগঞ্জ।
টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি, পরিচ্ছেদ: চিকিৎসা, অধ্যায়: নিশ্চয়ই কোনো কোনো কথায় রয়েছে জাদু, হাদিস নং-৫৭৬৭
📄 পরিশিষ্ট
নিশ্চয়ই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি কাজেই ছিলেন আদর্শস্বরূপ। তার সুবাসিত জীবনচরিত অধ্যয়ন করে আমরা তা জেনেছি। আমরা আরও জেনেছি, তিনি কথোপকথনের ক্ষেত্রেও ছিলেন আদর্শ। তাই আমাদের তা শেখা উচিত।
বর্তমান ক্রমবর্ধমান উন্নতি এবং নানা ব্যস্ততার এ যুগে আমরা দেখতে পাই যে, মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের বাঁধনগুলো ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর বদলে বহু হৃদয়েই স্থান করে নিয়েছে বিদ্বেষ এবং শত্রুতা। মানুষের মধ্যকার কথোপকথন বিচ্ছিন্ন অথবা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কোথাও দু'জনকে কথা বলতে দেখলে দেখা যাবে, তারা কথা বলছে উচ্চৈঃস্বরে। তাদের কথাবার্তায় ইসলামি বৈশিষ্ট্যের ছিটেফোঁটাও নেই। প্রায় সময়েই তাদের কথোপকথনের পরিণতি হয় দ্বন্দ, আত্মীয়তা ছিন্নতা এবং ঝগড়া।
এতে করেই বোঝা যায়ে যে, সারা বিশ্ব এখন চরিত্র, শিষ্টাচার এবং কথোপকথনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মুখাপেক্ষী- লক্ষ্যগত, উপস্থাপনাগত, শাস্ত্রগত এবং আচরণগত সকল ক্ষেত্রে।
এখন এই বইটি থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথনের উপস্থাপনাগত সৌন্দর্য এবং উদ্দেশ্যগত সৌন্দর্য সম্পর্কে জানার পর মুসলমানদের কী করণীয়?
তাদের করণীয় হচ্ছে :
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ শিক্ষার মাধ্যমে উদ্দীপ্ত হওয়া এবং কথোপকথনের ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য এবং মাধ্যমগুলোকে আঁকড়ে ধরা। এভাবেই আমাদের কথোপকথনের মাঝে ইসলামের শাশ্বত বৈশিষ্ট্য ফিরে আসবে।
বর্তমান স্যাটেলাইট টিভিগুলোতে যে মিডিয়া যুদ্ধ দৃশ্যমান এবং আবহাওয়ায় যে দখলদারিত্বের ঘ্রাণ মুসলমানদের দূষিত করছে, এর মোকাবিলায় এটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে।
এমনিভাবে তাদের জন্য আরও আবশ্যক হচ্ছে, মানুষের কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথনের আদবসমূহের প্রচার করা এবং তাদেরকে তা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া; যাতে করে প্রত্যেকেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুন্নত অবস্থান এবং প্রতিটি কাজে তার উচ্চশিখরে আরোহণের কথা জানতে পারে।
সবশেষে বলব যে, এখানে বিশাল সমুদ্র থেকে সামান্য কিছু অংশ উপস্থাপন করা হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উৎকৃষ্টতাময় এবং উন্নত কথোপকথনসমূহের যৎসামান্যই এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো করে এ সকল বৈশিষ্ট্য আঁকড়ে ধরার এবং প্রতিটি কাজে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করার তাওফিক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি এর অভিভাবক এবং এর ওপর ক্ষমতাবান।
নিশ্চয়ই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি কাজেই ছিলেন আদর্শস্বরূপ। তার সুবাসিত জীবনচরিত অধ্যয়ন করে আমরা তা জেনেছি। আমরা আরও জেনেছি, তিনি কথোপকথনের ক্ষেত্রেও ছিলেন আদর্শ। তাই আমাদের তা শেখা উচিত।
বর্তমান ক্রমবর্ধমান উন্নতি এবং নানা ব্যস্ততার এ যুগে আমরা দেখতে পাই যে, মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের বাঁধনগুলো ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর বদলে বহু হৃদয়েই স্থান করে নিয়েছে বিদ্বেষ এবং শত্রুতা। মানুষের মধ্যকার কথোপকথন বিচ্ছিন্ন অথবা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কোথাও দু'জনকে কথা বলতে দেখলে দেখা যাবে, তারা কথা বলছে উচ্চৈঃস্বরে। তাদের কথাবার্তায় ইসলামি বৈশিষ্ট্যের ছিটেফোঁটাও নেই। প্রায় সময়েই তাদের কথোপকথনের পরিণতি হয় দ্বন্দ, আত্মীয়তা ছিন্নতা এবং ঝগড়া।
এতে করেই বোঝা যায়ে যে, সারা বিশ্ব এখন চরিত্র, শিষ্টাচার এবং কথোপকথনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মুখাপেক্ষী- লক্ষ্যগত, উপস্থাপনাগত, শাস্ত্রগত এবং আচরণগত সকল ক্ষেত্রে।
এখন এই বইটি থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথনের উপস্থাপনাগত সৌন্দর্য এবং উদ্দেশ্যগত সৌন্দর্য সম্পর্কে জানার পর মুসলমানদের কী করণীয়?
তাদের করণীয় হচ্ছে :
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ শিক্ষার মাধ্যমে উদ্দীপ্ত হওয়া এবং কথোপকথনের ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য এবং মাধ্যমগুলোকে আঁকড়ে ধরা। এভাবেই আমাদের কথোপকথনের মাঝে ইসলামের শাশ্বত বৈশিষ্ট্য ফিরে আসবে।
বর্তমান স্যাটেলাইট টিভিগুলোতে যে মিডিয়া যুদ্ধ দৃশ্যমান এবং আবহাওয়ায় যে দখলদারিত্বের ঘ্রাণ মুসলমানদের দূষিত করছে, এর মোকাবিলায় এটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে।
এমনিভাবে তাদের জন্য আরও আবশ্যক হচ্ছে, মানুষের কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথনের আদবসমূহের প্রচার করা এবং তাদেরকে তা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া; যাতে করে প্রত্যেকেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুন্নত অবস্থান এবং প্রতিটি কাজে তার উচ্চশিখরে আরোহণের কথা জানতে পারে।
সবশেষে বলব যে, এখানে বিশাল সমুদ্র থেকে সামান্য কিছু অংশ উপস্থাপন করা হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উৎকৃষ্টতাময় এবং উন্নত কথোপকথনসমূহের যৎসামান্যই এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো করে এ সকল বৈশিষ্ট্য আঁকড়ে ধরার এবং প্রতিটি কাজে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করার তাওফিক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি এর অভিভাবক এবং এর ওপর ক্ষমতাবান।
📄 ভূমিকা
[সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর সাথে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথন]
শিক্ষাব্যবস্থা এবং যোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যম আবিষ্কৃত হওয়ার আগ থেকেই মানুষের মাঝে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষার মৌলিক মাধ্যম ছিল পরস্পরে কথা বিনিময় করা। মানুষ একটি সামাজিক জীব। তারা সাধারণত দলবদ্ধভাবেই বসবাস করে। তাই দলবদ্ধভাবে জীবনযাপনে সক্ষম হতে এবং নিজের মৌলিক প্রয়োজনাদি ব্যক্ত করতে পরস্পর কথোপকথন অত্যাবশ্যকীয়। তাই একটি শিশু পর্যন্তও পিতা-মাতার কাছ থেকে তার প্রয়োজনীয় বস্তু চেয়ে নেয়।
যারা ইনসাফের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন নিয়ে গবেষণা করেন, তারা সকলেই জানেন যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন সত্যিকারের রাসুল, প্রকৃত নবী। কেননা, কোনো মানুষের পক্ষেই তার জীবনযাপনে এবং আচার-ব্যবহারে মানবিক শ্রেষ্ঠত্বের সারনির্যাসের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব নয়। আর মানুষের সাথে আচার-ব্যবহারে যে সকল মানবিক মাধ্যম রয়েছে, সেগুলোর উচ্চাঙ্গের বৈশিষ্ট্য কেবল ওহিপ্রাপ্ত নবীগণই অর্জন করতে পারেন।
নিশ্চয়ই প্রত্যেক গবেষক এবং বিশেষজ্ঞ তার অবস্থান থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের যেকোনো নির্দিষ্ট দিক সম্পর্কে জানতে পারবে। তাই একজন খাঁটি দ্বীনের পথে আহ্বানকারী যেমন পাবেন তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু, তেমনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও শিখতে পারবেন পরিপূর্ণ পাঠ। সেনা পরিচালক অর্জন করতে পারবেন তার উদ্দেশ্য। এমনিভাবে শারীরিক চিকিৎসকও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে অবশ্যই শিক্ষা লাভ করতে পারবেন। কেনই বা পারবেন না?
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন—
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَن كَانَ يَرْجُوا اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللهَ كَثِيرًا
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ; যারা আল্লাহ এবং আখেরাত দিবসের প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহ তাআলাকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে, তাদের জন্য।” [সুরা আহযাব: ২১]
এদিক বিবেচনায়, স্বাভাবিকভাবেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথোপকথনের দিক দিয়েও সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তিনি কথোপকথনের নিয়মকানুন, উপকারিতা, পদ্ধতিসমূহ, শিষ্টাচার এবং রীতি-নীতি শিখিয়েছেন। তিনি তার সারা জীবনব্যাপী সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতিতে কথাবার্তা বিনিময় করেছেন। এ ক্ষেত্রে মুসলিম-কাফের, পুরুষ-নারী, শিশু-বৃদ্ধ সকলের সাথেই সমান আচরণ করেছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরদের সাথে যোগাযোগ এবং সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে কথোপকথনের সেবা গ্রহণ করেছেন। পারস্পরিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের বিরাটতম এক দায়িত্ব। প্রত্যেক রাসুলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলিগ। পাশের মানুষদের সাথে কথোপকথন ব্যতীত এ দায়িত্ব সম্পাদন কিছুতেই সম্ভব নয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ﴾
“হে রাসুল, আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে, আপনি তা পৌঁছে দিন। আর যদি আপনি এরূপ না করেন তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না।” [সুরা মায়িদাহ: ৬৭]
একজন রাসুলের জন্য কখনোই অন্তর্মুখী এবং বিচ্ছিন্ন হওয়া ঠিক নয়। কঠোর স্বভাবের হওয়া তো দূরের কথা, তার জন্য মানুষের সাথে কথা না বলা এবং ওঠাবসা না করাও দূষণীয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نَفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ﴾
“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয়ের হতেন তাহলে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে গিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে যেত।” [সুরা আলে-ইমরান: ১৫৯]
সুতরাং পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতিতে তাবলিগের দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া এবং মানবঅন্তরের সাথে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার কাজ কথোপকথনের ওপর নির্ভরতার সাথে সম্পৃক্ত। এটিই পরস্পর যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যম।
এমনিভাবে যদি প্রশ্ন করা হয়, কথোপকথন পরস্পর দয়া প্রতিষ্ঠার মাধ্যম কি?
উত্তরে বলব, হ্যাঁ, এটি পরস্পর দয়া প্রতিষ্ঠারও মাধ্যম।
কেননা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন দয়ালু এবং ভালোবাসার মূর্তপ্রতীক। তার দয়া ছিল এক সামগ্রিক উপাদান; যা তার প্রতিটি কথোপকথন থেকেই উদ্ভাসিত হতো।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন এবং কাফেরদের সাথে কথাবার্তা বলেছেন। প্রত্যেকের সাথে কথোপকথনেই দয়া, উদারতা এবং কোমলতার প্রকাশ থাকত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই কারও প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করেননি। কোনো ব্যক্তি যতই ছোট হোক এবং মানুষের মাঝে তার অবস্থান যতই তুচ্ছ হোক, তিনি কারও সাথে দুর্ব্যবহার করেননি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বলতেন কোমলতা এবং দয়া ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, মানুষকে শিক্ষা এবং শিষ্টাচার প্রদানের জন্য, উদারতার বার্তা বিলিয়ে দেওয়ার জন্য কিংবা প্রতিবেশীর সাথে সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করার জন্য। আর এ সকল বৈশিষ্ট্যের জন্য দয়ার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
আল্লাহ তাআলা যথার্থই বলেছেন-
وَمَا أَرْسَلْنَكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَلَمِينَ
"আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” [সুরা আম্বিয়া: ১০৭]
এতসত্ত্বেও অনেক মুসলমান পশ্চিমা বইপত্রে কথোপকথন এবং অপরের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার রীতি-নীতি খুঁজে বেড়ায়। অথচ লেখক এবং রচয়িতাগণ তাদের দক্ষতা সত্ত্বেও কথোপকথন এবং পারস্পরিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দক্ষতা এবং যোগ্যতার ধারেকাছেও পৌঁছুতে পারবে না।
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে আমরা সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথন সম্পর্কে আলোচনা করব। যদিও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক দলের মানুষ তথা মুসলিম-কাফের, পুরুষ-নারী এবং স্বাধীন-দাসদের সাথে অনেক পদ্ধতিতে কথা বলেছেন। জীবনের প্রতিটি পর্যায় তথা পরিচিতি থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রদান, দান-সদকা এবং অন্যের সাথে কথা বলা প্রভৃতি কাজে তিনি বিভিন্ন আঙ্গিকে কথোপকথন করেছেন। তবুও বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে আমরা এর কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করার চেষ্টা করব। যদিও তা সম্পূর্ণরূপে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব ব্যাপার।
এই গ্রন্থটি তুলে ধরবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরামের সাথে তার কথোপকথনের বিভিন্ন পর্যায়। যাতে করে প্রকৃতপক্ষে এই উপকারিতা সাব্যস্ত করা যায় যে, নিশ্চয়ই কথোপকথন ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনব্যবস্থার অন্যতম একটি শিক্ষণীয় উপকরণ। আকস্মিক অবস্থাতেও তা কোনো অনর্থক কথাবার্তা ছিল না।
কেননা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ডিক্টেটর তথা একনায়ক ছিলেন না যে, তিনি শুধু আদেশ-নিষেধ প্রদান করেই ক্ষান্ত থাকবেন। অধিকাংশ মানুষ তাদের গৃহে অথবা অধিকাংশ শাসক তাদের রাজত্বে অন্যের সিদ্ধান্ত শ্রবণের ধৈর্য রাখে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মতো ছিলেন না। বরং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরের সাথে যথেষ্ট পরিমাণে কথোপকথন করতেন আর তিনি ছিলেন চমৎকার শ্রোতা। এই গ্রন্থে অচিরেই তা প্রমাণিত হবে। সে জন্য আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি।