📄 নেক লোকদের নিকট বিপদ আপদে আশ্রয় প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করা শির্ক
[এ কথা সাব্যস্ত করা যে, নেক লোকদের নিকট বিপদে আপদে আশ্রয় প্রার্থনা করা শির্ক এবং যারা একথা অস্বীকার করে তাদেরকে সেটা মেনে নিতে বাধ্য করা]
যদি সে বলে : আমি আল্লাহর সঙ্গে কোনো বস্তুকেই শরীক করি না- কিছুতেই নয়, কক্ষণও নয়। তবে নেক লোকদের নিকট বিপদে আপদে আশ্রয় প্রার্থনা করা শির্ক নয়।
এর জওয়াবে তাকে বল, যখন তুমি স্বীকার করে নিয়েছ যে, ব্যভিচার অপেক্ষা শির্ককে আল্লাহ তা'আলা অধিক গুরুতর হারাম বলে নির্দেশিত করেছেন, আর এ কথাও মেনে নিয়েছ যে, আল্লাহ তা'আলা এই মহা পাপ ক্ষমা করেন না, তাহলে (তুমি বল) সেটা কি বস্তু যা তিনি হারাম করেছেন এবং বলে দিয়েছেন যে, তিনি তা ক্ষমা করবেন না? কিন্তু এ বিষয়ের উত্তর সে জানে না।
তখন তাকে তুমি বল, তুমি শির্ক কী তা জানলে না, তখন তা থেকে আত্মরক্ষা কীভাবে করবে? অথবা একথাও জানলে না যে, কেন আল্লাহ তোমার উপর শির্ক হারাম করেছেন আর বলে দিয়েছেন যে, তিনি ঐ পাপ মা'ফ করবেন না। আর তুমি এ বিষয়ে কিছুই জানলে না এবং সেটা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাও করলে না। তুমি কি ধারণ করে বসে আছ যে, আল্লাহ এটাকে হারাম করেছেন আর তিনি সেটাকে বর্ণনা ব্যতীতই ছেড়ে দিবেন?
যদি সে বলে, শির্ক হচ্ছে মূর্তিপূজা, আর আমরা তো মূর্তিপূজা করছি না, তবে তাকে বল, মূর্তিপূজা কাকে বলে? তুমি কি মনে কর যে, মুশরিকগণ এই বিশ্বাস পোষণ করত যে এসব কাঠ ও পাথর (নির্মিত মূর্তিগুলো) যারা তাদেরকে আহ্বান করে তাদেরকে সৃষ্টি, রেযেক প্রদান কিংবা তাদের সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে সক্ষম? একথা তো কুরআন মিথ্যা বলে ঘোষণা করেছে।
যদি সে বলে, শির্ক হচ্ছে যারা কাঠ ও পাথর নির্মিত মূতি বা কবরের উপর নির্মিত সৌধ ইত্যাদিকে লক্ষ্য করে নিজেদের প্রয়োজন মিটানোর জন্য এদের প্রতি আহ্বান জানায়, এদের উদ্দেশ্যে বলীদান করে এবং বলে যে, এরা সুপারিশ করে আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে নিয়ে যাবে, আর এদের বরকতে আল্লাহ আমাদের বিপদ-আপদ দূর করবেন বা আল্লাহ এদের বরকতে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। তবে তাকে বল : হ্যাঁ, তুমি সত্য কথাই বলেছ, আর এটাই তো তোমাদের কর্মকান্ড যা পাথর, কবরের সৌধ প্রভৃতির নিকটে তোমরা করে থাক। ফলত: সে স্বীকার করছে যে, তাদের এই কাজগুলোই হচ্ছে মুর্তিপূজা, আর এটাই তো আমরা চাই।
তাকে একথাও বলা যেতে পারে, তুমি বলছ শির্ক হচ্ছে মূর্তিপূজা, তবে কি তুমি বলতে চাও যে, শুধু মূর্তিপূজার মধ্যেই শির্ক সীমিত, অর্থাৎ এর বাইরে কোনো শির্ক নেই? “নেক লোকদের প্রতি ভরসা করা আর তাদেরকে আহ্বান করা শির্কের মধ্যে কি গণ্য নয়?” (যদি তুমি এরূপ দাবী কর, তবে) তোমার এ দাবী তো আল্লাহ তাঁর কুরআনে খণ্ডন করেছেন; কারণ যারা ফেরেশতা, ঈসা এবং নেক-লোকদের সাথে নিজেদেরকে যুক্ত করেছে, তাদেরকে তিনি কুফরি করেছে বলে বর্ণনা করেছেন। ফলে অবশ্যম্ভাবীরূপেই সে তোমার কাছে এ সত্য স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদতে কোনো নেক বান্দাকে শরীক করে তার সেই কাজকেই কুরআনে শির্ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এইটিই তো আমার উদ্দেশ্য।
এই বিষয়ের গোপন রহস্য হচ্ছে, যখন সে বলে, আমি আল্লাহর সঙ্গে (কাউকে) শরীক করি না, তখন তুমি তাকে বল, আল্লাহর সঙ্গে শির্কের অর্থ কি? তুমি তার ব্য্যাখ্যা দাও। যদি সে এর ব্যাখ্যায় বলে, তা হচ্ছে মূর্তিপূজা, তখন তুমি তাকে আবার প্রশ্ন কর, মূর্তি পূজার মানে কি? তুমি আমাকে তার ব্যাখ্যা প্রদান কর। যদি সে উত্তরে বলে, আমি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করি না, তখন তাকে আবার প্রশ্ন কর, একমাত্র আল্লাহর ইবাদতেরই বা অর্থ কি? এর ব্যাখ্যা দাও। উত্তরে যদি সে কুরআন যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছে সেই ব্যাখ্যাই দেয় তবেতো আমাদের দাবীই সাব্যস্ত হচ্ছে, আর এটাই আমাদের উদ্দেশ্য। আর যদি সে তা না জানে, তবে সে কেমন করে এমন বস্তুর দাবী করছে যা সে জানে, তবে সে কেনম করে এমন বস্তুর দাবী করছে যা সে জানে না?
আর যদি সে তার এমন ব্যাখ্যা প্রদান করে যা তার প্রকৃত অর্থ নয়, তখন তুমি তার নিকটে আল্লাহর সঙ্গে শির্ক এবং মূর্তিপূজা সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলো বর্ণনা করে দাও। আরও বর্ণনা করে দাও যে এ কাজটিই হুবহু করে চলেছে এ যুগের মুশরিকগণ। আরও বর্ণনা কর যে, শরীকবিহীন একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের বিষয়টিই তো তারা আমাদের কাছ থেকে মেনে নিতে অস্বীকার করছে এবং শোরগোল করছে, যেমন তাদের পূর্বসূরীরা করেছিল এবং বলেছিল,
أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ ) [ ص: ٥]
“এই লোকটি কি বহু উপাস্যকে এক উপাস্যে পরিণত করছে? এ তো ভারী এক আশচর্য্য ব্যাপার!” (সূরা সাদ : ৫)
অতঃপর সে যদি বলে, ফেরেশতা ও আম্বিয়াদের ডাকার কারণে তাদেরকে তো কাফের বলা হয় নি; বরং ফেরেশতাদেরকে যারা আল্লাহর কন্যা বলেছিল তাদেরকেই কাফের বলা হয়েছিল। আমরা তো আবদুল কাদের বা অন্যদেরকে আল্লাহর পুত্র বলি না। তার উত্তর হচ্ছে এই যে, (ফেরেশতা ও আম্বিয়াদেরকে ডাকা অবশ্যই শির্ক। সেটা বিভিন্ন আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো আয়াতে আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করাকে কুফরী বলা হয়েছে; কারণ) সন্তানকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করাটাই স্বয়ং আলাদা কুফরী। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ * اللَّهُ الصَّمَدُ * ﴾ [الاخلاص: ١، ٢]
“বল, তিনিই একক আল্লাহ (তিনি ব্যতীত আল্লাহ আর কেউ নেই) আল্লাহ অমুখাপেক্ষী” (সূরা ইখলাস : ১-২ আয়াত]
“আহাদ” এর অর্থ হ'ল, তিনি একক এবং তার সমতুল্য কেউই নেই। আর “সামাদ” এর অর্থ হচ্ছে, প্রয়োজনে একমাত্র যার স্মরণ নেয়া হয়। অতএব যে এটাকে অস্বীকার করবে, সে কাফের হয়ে যাবে -যদিও সে সূরাটিকে অস্বীকার করে না।
আর আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ ﴾ [المؤمنون: ٩١]
“আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি, আর তাঁর সঙ্গে অপর কোনো ইলাহ্ (উপাস্য) নেই।” (মুমিনুন : ৯১) এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কুফরীর দুটি প্রকরণের উল্লেখ করেছেন, আর তিনি এতদোভয়কেই পৃথক ভাবে কুফরি সাব্যস্ত করেছেন।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَجَعَلُوا لِلَّهِ شُرَكَاءَ الْجِنَّ وَخَلَقَهُمْ وَخَرَقُواْ لَهُ بَنِينَ وَبَنَاتٍ بِغَيْرِ عِلْمٍ ) [الانعام: ١٠٠]
“আর এই (অজ্ঞ) লোকগুলো জিনকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিয়েছে অথচ ঐ গুলোকে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন, আর তাঁর জন্য তারা কতকগুলো পুত্র-কন্যাও উদ্ভাবন করে নিয়েছে কোন জ্ঞান ব্যতিরেকে-কোন যুক্তি প্রমাণ ছাড়া।” (আন'আম :১০০) এ আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা দুই প্রকারের কুফরীকে পৃথক ভাবে উল্লেখ করেছেন।
এর প্রমাণ এটাও হতে পারে যে, যারা লাতকে আহ্বান করে কাফের হয়ে গিয়েছিল, যদিও লাত ছিল একজন সৎলোক। তারা তাকে আল্লাহর ছেলেও বলেনি। অনুরূপভাবে যারা জিনদের পূজা করে কাফের হয়ে গিয়েছিল তারাও তাদেরকে আল্লাহর ছেলে বলে নি.।
তদ্রূপ “মুরতাদ” (যারা ঈমান আনার পর কাফের হয়ে যায় তাদের) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে চার মাযহাবের আলেমগণ বলেছেন যে, মুসলিম যদি ধারণা রাখে যে, আল্লাহর ছেলে রয়েছে তবে সে “মুরতাদ” হয়ে গেল। তারাও উক্ত দুই প্রকারের কুফরীর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। এটা তো খুবই স্পষ্ট।
আর যদি সে আল্লাহর এই কালাম পেশ করে :
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴾ [يونس: ٦٢]
“সাবধান, আল্লাহর ওলী যারা, কোনো আশঙ্কা নেই তাদের এবং কখনো চিন্তাগ্রস্তও হবে না তারা।” (ইউনুস : ৬২)
তবে তুমি বল : হ্যাঁ, একথা তো অভ্রান্ত সত্য, কিন্তু তাই বলে তাদের পূজা করা চলবে না।
আর আমরা কেবল আল্লাহর সঙ্গে অপর কারো পূজা এবং তার সঙ্গে শির্কের কথাই উল্লেখ (করে তা অস্বীকার) করছি। নচেৎ আওলিয়াদের প্রতি ভালোবাসা রাখা ও তাদের অনুসরণ করা এবং তাদের কারামতগুলোকে স্বীকার করা আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর আওলিয়াদের কারামতকে বিদ'আতী ও বাতিলপন্থীগণ ছাড়া কেউ অস্বীকার করে না।
আল্লাহর দ্বীন দুই প্রান্ত সীমার (অতিরঞ্জন ও কমতি করার) মধ্যস্থলে, আর বিপরীতমুখী ভ্রষ্টতার মাঝখানে হেদায়াত এবং দুই বাতিলের মধ্যপথে অবস্থিত হক।
টিকাঃ
১৩. অর্থাৎ কুরআন তো বলছে যে তৎকালীন আরবের মুশরিকরা কখনও এসব কাঠ, পাথর ইত্যাদিকে সৃষ্টি, রিযিক কিংবা নিয়ন্ত্রক দাবী করত না। তাহলে তোমার দাবী কুরআনের ঘোষণার বিপরীত হচ্ছে, সুতরাং তোমার কথা মিথ্যা।
১৪. অর্থাৎ তোমরা নিজেরাই তোমাদের কথায় আমাদের বক্তব্য প্রকারান্তরে মেনে নিলে যে তোমরা শির্ক করে যাচ্ছ। আর এভাবেই আমাদের উদ্দেশ্য সাব্যস্ত হচ্ছে, সেটা হচ্ছে, তার কাছ থেকে হকের স্বীকৃতি আদায় করা। তার সন্দেহ দূর করা, আমাদের উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে তার সন্দেহ দূরীভূত হলো, তার প্রমাণাদি খণ্ডিত হলো, তার ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতা প্রকাশিত হয়ে পড়ল। [মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলে আশ-শাইখ, শারহু কাশফিশ শুবহাত, পৃ.৭৯]
১৫. অর্থাৎ আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা প্রমাণ করা যে, সৎলোকদেরকে আহ্বান করা, তাদের উপর ভরসা করাও শির্ক, কারণ তা কুরআন তা বর্ণনা করেছে; আর তোমার কথা দ্বারা তা প্রমাণিত হয়েছে। ফলে তার সন্দেহ দূরীভূত হলো, তার প্রমাণাদি খণ্ডিত হলো। [মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলে আশ-শাইখ, শারহু কাশফিশ শুবহাত, পৃ.৮০]
১৬. অর্থাৎ অপর কারও ইবাদত করা যাবে না, কাউকে ডাকা যাবে না, কারও উপর ভরসা করা যাবে না ইত্যাদি।
১৭. অর্থাৎ শির্ক কী? মুশরিক কে? মূর্তিপূজা কী, মূর্তিপূজা ও অন্যকিছুর মধ্যে পার্থক্য না জানে তবে তো সে অজ্ঞ, তার সাথে তর্ক না করে তাকে জ্ঞান দিতে হবে। বর্তমান কালের অধিকাংশ মানুষ এ শ্রেণির। [মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলে আশ-শাইখ, শারহু কাশফিশ শুবহাত, পৃ.৮১]
১৮. সুতরাং তার সন্তান সাব্যস্ত করা হবে, তখন সেটার প্রতি আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে। সুতরাং আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করা কুফরী। কারণ এটি 'সামাদ' এর বিপরীত।
১৯. অর্থাৎ আল্লাহর সামাদ বা সন্তান থেকে অমুখাপেক্ষীতা অস্বীকার করবে, সে কাফের হয়ে যাবে।
২০. অর্থাৎ আল্লাহ তাদেরকে কাফের বলেছেন, অথচ তারা আল্লাহর জন্য পুত্র কিংবা সন্তান সাব্যস্ত করেনি। সুতরাং তোমাদের পূর্বোক্ত দাবী অসার, যাতে তোমরা দাবী করেছিলে যে, তাদেরকে সন্তান সাব্যস্ত করার জন্যই কেবল কাফের বলা হয়েছে, সৎলোকদের আহ্বানের জন্য নয়। বস্তুত: যারা লাতকে আহ্বান করে কাফের হয়েছিল কিংবা জিনদের ইবাদত করে কাফের হয়েছে, তারা তো আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত না করেও কাফের হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং সন্তান সাব্যস্ত করলে যেমন কুফরী করা হয়, তেমনি আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকে আশ্রয়ের জন্য আহ্বানও কুফরিতে নিমজ্জিত করে। [সম্পাদক]
📄 আমাদের যুগের লোকদের শির্ক ছিল অপেক্ষাকৃত হালকা
[আমাদের যুগে লোকদের শির্ক অপেক্ষা পূর্ববর্তী লোকদের শির্ক ছিল অপেক্ষাকৃত হালকা (দু'দিক থেকে)]
তুমি যখন বুঝতে পারলে যে, যে বিষয়টিকে আমাদের যুগের মুশরিকগণ নাম দিয়েছেন ই'তেকাদ'- (ভক্তি মিশ্রিত বিশ্বাস) সেটাই হচ্ছে সেই শির্ক; যার বিরুদ্ধে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূল যার কারণে লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছেন। তখন তুমি জেনে রাখ যে, পূর্ববর্তী লোকদের শির্ক ছিল বর্তমান যুগের লোকদের শির্ক অপেক্ষা অধিকতর হালকা বা লঘুতর। আর তার কারণ হচ্ছে দু'টি:
এক. পূর্ববর্তী লোকগণ কেবল সুখ স্বাচ্ছন্দের সময়েই আল্লাহর সঙ্গে অপরকে শরীক করতো এবং ফেরেশতা আওলিয়া ও ঠাকুর- দেবতাদেরকে আহবান জানাতো, কিন্তু বিপদ আপদের সময় একমাত্র আল্লাহকেই ডাকতো, সে ডাক হ'ত সম্পূর্ণ নির্ভেজাল। যেমন আল্লাহ তাঁর পাক কুরআনে বলেছেন:
وَإِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِي الْبَحْرِ ضَلَّ مَن تَدْعُونَ إِلَّا إِيَّاهُ فَلَمَّا نَجَنكُمْ إِلَى الْبَرِّ أَعْرَضْتُمْ وَكَانَ الْإِنسَانُ كَفُورًا ﴾ [الاسراء : ٦٧]
“সাগর বক্ষে যখন কোন বিপদ তোমাদেরকে স্পর্শ করে, আল্লাহ ব্যতীত আর যাদেরকে ডেকে থাক তোমরা, তারা সকলেই তো তখন (মন হ'তে দূরে) সরে যায়, কিন্তু আল্লাহ যখন তোমাদেরকে স্থলভাগে পৌঁছিয়ে উদ্ধার করেন, তখন তোমরা অন্যদিকে ফিরে যাও; নিশ্চয় মানুষ হচ্ছে অতিশয় না অকৃতজ্ঞ।” (বনী ইসরাঈল : ৬৭)
আল্লাহ এ কথাও বলেছেন:
قُلْ أَرَعَيْتَكُمْ إِنْ أَتَيْكُمْ عَذَابُ اللَّهِ أَوْ أَتَتْكُمُ السَّاعَةُ أَغَيْرَ اللَّهِ تَدْعُونَ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ * بَلْ إِيَّاهُ تَدْعُونَ فَيَكْشِفُ مَا تَدْعُونَ إِلَيْهِ إِن شَاءَ وَتَنسَوْنَ مَا تُشْرِكُونَ ﴾ [الانعام: ٤٠، ٤١]
“বল, তোমরা নিজেদের সম্বন্ধে বিবেচনা করে দেখ। তোমাদের প্রতি আল্লাহর কোন আযাব যদি আপতিত হয় অথবা কিয়ামত দিবস যদি এসে পড়ে তখন কি তোমরা আহ্বান করবে আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকেও? (উত্তর দাও) যদি তোমরা সত্যবাদী হও। কখনই না, বরং তোমরা আহ্বান করবে তাঁকে, অতঃপর যে আপদের কারণে তাঁকে আহ্বান করছ, ইচ্ছা করলে তিনি সেই আপদগুলো দূর করে দিবেন। (আহ্বানের কারণস্বরূপ আপদগুলো মোচন করে দিবেন) আর তোমরা যা কিছুকে আল্লাহর শরীক করছ তাদেরকে তোমরা তখন ভূলে যাবে।” (আন'আম :৪০-৪১)
আল্লাহ তা'আলা একথাও বলেছেন:
وَإِذَا مَسَّ الْإِنسَانَ ضُرٌّ دَعَا رَبَّهُ مُنِيبًا إِلَيْهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُ نِعْمَةً مِّنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُوا إِلَيْهِ مِن قَبْلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَندَادًا لِّيُضِلَّ عَن سَبِيلِهِ قُلْ تَمَتَّعْ بِكُفْرِكَ قَلِيلًا إِنَّكَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ ﴾ [الزمر: ۸]
“যখন কোন দুঃখ কষ্ট আপতিত হয় মানুষের উপর তখন সে নিজ রবকে ডাকতে থাকে তদ্দ্গতভাবে, অতঃপর যখন তিনি তাকে কোনো নেয়ামতের দ্বারা অনুগৃহীত করেন, তখন সে ভুলে যায় সেই বস্তুকে যার জন্য সে পূর্বে প্রার্থনা করেছিল এবং আল্লাহর বহু সদৃশ ও শরীক বানিয়ে নেয়; তাঁর পথ থেকে (লোকদেরকে) ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে। বল, কিছুকাল তুমি নিজের কুফরজনিত সুখ সুবিধা ভোগ করলেও, নিশ্চয় তুমি হচ্ছ জাহান্নামের অধিবাসীদের একজন।” (যুমার : ৮)
আর আল্লাহর এই বাণী :
وَإِذَا غَشِيَهُم مَّوْجٌ كَالظُّلَلِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ) [لقمان: ٣٢]
“যখন পর্বতের ন্যায় তরঙ্গমালা তাদের উপর ভেঙ্গে পড়ে, তখন তারা আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ-চিত্ত হয়ে তাঁকে ডাকতে থাকে।” (সূরা লোকমান: ৩২)
যে ব্যক্তি এই বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হ'ল যা আল্লাহ তাঁর কেতাবে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন- যার সারৎসার হচ্ছে এই যে, যে মুশরিকদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধে করেছিলেন তারা তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার সময়ে আল্লাহকেও ডাকতো আবার আল্লাহ ছাড়া অন্যকেও ডাকতো, কিন্তু বিপদ-বিপর্যয়ের সময় তারা একক ও লা শরীক আল্লাহ ছাড়া অপর কাউকেই ডাকতো না, তারা বরং সে সময় অন্য সব মাননীয় ব্যক্তি ও পূজ্য সত্তাদের ভুলে যেতো, সেই ব্যক্তির নিকট পূর্ব যামানার লোকদের শির্ক এবং আমাদের বর্তমান যুগের লোকদের শির্কের পার্থক্যটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এমন লোক কোথায় পাওয়া যাবে যার হৃদয় এই বিষয়টি উত্তমরূপে ও গভীর ভাবে উপলব্ধি করবে ? একমাত্র আল্লাহই আমাদের সহায় !
(দুই) পূর্ব যামানার লোকগণ আল্লাহর সঙ্গে এমন ব্যক্তিদের আহ্বান করতো যারা ছিল আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত, তারা হয় নবী- রাসূলগণ, নয় তো ওলী-আওলীয়া, নতুবা ফেরেশতাগণ। এছাড়া তারা হয়তো পূজা করতো এমন বৃক্ষ অথবা পাথরের যারা আল্লাহর একান্ত বাধ্য ও হুকুমবরদার, কোনোক্রমেই তারা অবাধ্য নয়, আল্লাহর হুকুম অমান্যকারী নয়।
কিন্তু আমাদের এই যুগের লোকেরা আল্লাহর সঙ্গে এমন লোকদের ডাকে এবং তাদের নিকট প্রার্থনা জানায় যারা নিকৃষ্টতম অনাচারী (ফাসেক), আর যারা তাদের নিকট ধর্ণা দেয় ও প্রার্থনা জানায় তারাই তাদের অনাচারগুলোর কথা ফাঁস করে দেয়, সে অনাচারগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যভিচার, চুরি এবং নামায পরিত্যাগের মত গর্হিত কাজসমূহ। আর যারা নেক লোকদের প্রতি আস্থা রেখে তাদের পূজা করে বা এমন বস্তুর পূজা করে যেগুলো কোন পাপ করে না- যেমন : গাছ, পাথর ইত্যাদি, তারা ঐ সব লোকদের থেকে নিশ্চয় লঘুতর পাপী যারা ঐ লোকদের পূজা করে যাদের অনাচার ও পাপাচারগুলোকে তারা স্বয়ং দর্শন করে থাকে এবং তার সাক্ষ্যও প্রদান করে থাকে।
টিকাঃ
২১. অর্থাৎ তারা ওলি, কবর, মাযার বা পীরদের সম্পর্কে বাড়াবাড়ি বা ওসীলা গ্রহণের যে বিশ্বাস পোষণ করে থাকে। [সম্পাদক]
২২. তবে এটা সত্য যে উভয়টিই শির্ক। উভয় গোষ্ঠীই জাহান্নামের অধিবাসী, যদি না তাওবাহ করে, এখানে গ্রন্থকার শুধু দু'যুগের শির্কের পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। [সম্পাদক]
📄 ফরয-ওয়াজেব হয় না- এই ভ্রান্তধারণার নিরসন
['যে ব্যক্তি দ্বীনের কতিপয় ফরয ওযাজেব অর্থাৎ অবশ্যকরণীয় কর্তব্য পালন করে, সে তাওহীদ বিরোধী কোন কাজ করে ফেললেও কাফের হয়ে যায় না।' যারা এই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে, তাদের ভ্রান্তির নিরসন এবং তার বিস্তারিত প্রমাণপঞ্জি[]]
উপরের আলোচনায় একথা সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, যাদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিহাদ করেছেন তারা এদের (আজকের দিনে শির্কী কাজে লিপ্ত নামধারী মুসলিমদের) চাইতে ঢের বেশী বুদ্ধিমান ছিল এবং তাদের শির্ক অপেক্ষাকৃত লঘু ছিল।
অতঃপর একথাও তুমি জেনে রাখো যে, এরা আমাদের বক্তব্যের ব্যাপারে একটি সংশয় উপস্থাপন করে, যা তাদের অন্যতম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ। অতএব এই ভ্রান্তির অপনোদন ও সন্দেহের অবসানকল্পে নিম্নের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোন।
তারা বলে থাকে: যাদের প্রতি সাক্ষাতভাবে কুরআন নাযিল হয়েছিল (অর্থাৎ মক্কার কাফির মুশরিকগণ) তারা 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা'বুদ নেই' একথার সাক্ষ্য প্রদান করে নি, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মিথ্যা বলেছিল, তারা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করেছিল, তারা কুরআনকে মিথ্যা বলেছিল এবং বলেছিল এটা একটা জাদু-মন্ত্র। কিন্তু আমরা তো সাক্ষ্য দিয়ে থাকি যে, আল্লাহ ছাড়া নেই কোনো মা'বুদ এবং (এ সাক্ষ্যও দেই যে,) নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রাসূল, আমরা কুরআনকে সত্য বলে জানি ও মানি আর পুনরুত্থান এর উপর বিশ্বাস রাখি, আমরা নামায পড়ি এবং রোযাও রাখি, তবু আমাদেরকে এদের (উক্ত বিষয়ে অবিশ্বাসী কাফেরদের) মত মনে কর কেন?
এর জওয়াব হচ্ছে এই যে, এ বিষয়ে সমগ্র 'আলেম সমাজ তথা শরী'আতের বিদ্বান মণ্ডলী একমত যে, একজন লোক যদি কোনো কোনো ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্য বলে মানে, আর কোনো কোনো বিষয়ে তাঁকে মিথ্যা বলে ভাবে, তবে সে নির্ঘাত কাফের, সে ইসলামে প্রবিষ্টই' হতে পারে না; এই একই কথা প্রযোজ্য হবে তার উপরেও যে ব্যক্তি কুরআনের কিছু অংশ বিশ্বাস করল, আর কতক অংশকে অস্বীকার করল, যেমন কেউ তাওহীদকে স্বীকার করল কিন্তু নামায যে ফরয তা মেনে নিল না। অথবা তাওহীদও স্বীকার করল, নামাযও পড়ল কিন্তু যাকাত যে ফরয তা মানল না; অথবা এগুলো সবই স্বীকার করল কিন্তু রোযাকে অস্বীকার করে বসল কিংবা ঐগুলো সবই স্বীকার করল কিন্তু একমাত্র হজ্বকে অস্বীকার করল, এরা সবাই হবে কাফের।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানায় কতক লোক হজ্বকে মেনে নিতে চায় নি বলে তাদেরকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ আয়াত নাযিল করলেন,
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ ﴾ [ال عمران: ۹۷]
“(পথের কষ্ট সহ্য করতে এবং) রাহা খরচ বহনে সক্ষম যে ব্যক্তি সে (শ্রেণির) সমস্ত মানুষের জন্য আল্লাহর উদ্দেশ্যে এই গৃহের (কা'বাতুল্লাহর) হজ্ব করা অবশ্য কর্তব্য, আর যে ব্যক্তি তা অমান্য করল (সে জেনে রাখুক যে,) আল্লাহ হচ্ছেন সমুদয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী” [আলে ইমরান: ৯৭]
কোনো ব্যক্তি যদি এগুলো সমস্তই (অর্থাৎ তাওহীদ, নামায, যাকাত, রামাযানের সিয়াম, হজ্ব) মেনে নেয়, কিন্তু পুনরুত্থানের কথা অস্বীকার করে, সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফের হয়ে যাবে। তার রক্ত এবং তার ধন-দৌলত সব হালাল হবে (অর্থাৎ তাকে হত্যা করা এবং তার ধন-মাল গ্রহণ করা আইন-সিদ্ধ হবে) যেমন আল্লাহ বলেছেন :
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ، وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْfُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُواْ بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا أُوْلَبِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا ﴾ [النساء: ١٥٠، ١٥١]
“নিশ্চয় যারা আমান্য করে আল্লাহকে ও তাঁর রাসূলদেরকে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের (আনুগত্যের) মধ্যে প্রভেদ করতে চায়, আর বলে কতককে আমরা বিশ্বাস করি অপর কতককে অমান্য করি এবং তারা ঈমানের ও কুফরের মাঝামাঝি একটা পথ আবিষ্কার করে নিতে চায়— এই যে লোক সত্যই তারা হচ্ছে কাফের, বস্তুত কাফেরদের জন্য আমরা প্রস্তুত করে রেখেছি এক লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” (আন নিসা: ১৫০-১৫১)
সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যেহেতু তাঁর কালামে পাকে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, যে ব্যক্তি দ্বীনের কিছু অংশকে মানবে আর কিছু অংশকে অস্বীকার করবে, সে সত্যিকারের কাফের এবং তার প্রাপ্য হবে সেই বস্তু (শাস্তি) যা উপরে উল্লিখিত হয়েছে, সেহেতু এ সম্পর্কিত ভ্রান্তিরও অপনোদন ঘটেছে।
আর এ বিষয়টি জনৈক 'আহা'-বাসী আমার নিকট প্রেরিত তার পত্রে উল্লেখ করেছেন।
আর তাকে এ-কথাও বলা যাবে, তুমি যখন স্বীকার করছ যে, যে ব্যক্তি সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলকে সত্য জানবে আর কেবল নামাযের ফরয হওয়াকে অস্বীকার করবে, সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফের হবে, আর তার জান-মাল হালাল হবে; অনুরূপভাবে সব বিষয় মেনে নিয়ে যদি পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে তবুও সে কাফের হয়ে যাবে।
তদ্রূপ সে কাফের হয়ে যাবে যদি ঐ সমস্ত বস্তুর উপর ঈমান আনে, আর কেবলমাত্র রামযানের রোযাকে অস্বীকার করে। এতে কোনো মাযহাবেরই দ্বিমত নেই। আর কুরআনও এ কথাই বলেছে, যেমন আমরা ইতিপূর্বে বলেছি।
আর এটা জানা কথা যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সব ফরয কাজ নিয়ে এসেছিলেন তার মধ্যে তাওহীদ হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় এবং তা নামায, রোযা ও হজ্ব হতেও শ্রেষ্ঠতর। তাহলে যখন মানুষ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক আনীত ফরয, ওয়াজিবসমূহের সবগুলোকে মেনে নিয়ে ঐগুলোর একটি মাত্র অস্বীকার করে কাফের হয়ে যায় তখন কি করে সে কাফের না হয়ে পারে যদি সমস্ত রাসূলদের দ্বীনের মূলবস্তু তাওহীদকেই সে অস্বীকার করে বসে? সুবহানাল্লাহ ! কি বিস্ময়কর এই মুর্খতা!
তাকে এ কথাও বলা যায় যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ বানু হানীফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, অথচ তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তারা সাক্ষ্য প্রদান করেছিল যে, আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ্ নেই, আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল। এ ছাড়া তারা আযানও দিত এবং নামাযও পড়ত।
সে যদি বলে যে, তারা তো মুসায়লামা (কায্যাব)-কে একজন নবী বলে মেনেছিল। তবে তার উত্তরে বলবে : ঐটিই তো আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। কেননা যদি কেউ কোনো ব্যক্তিকে নবীর মর্যাদায় উন্নীত করার কারণে কাফের হয়ে যায় এবং তার জান মাল হালাল হয়ে যায়, এই অবস্থায় তার দু'টি সাক্ষ্য (প্রথম সাক্ষ্য: আল্লাহ ছাড়া নেই অপর কোনো সত্য ইলাহ, দ্বিতীয় সাক্ষ্য: মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল) তার কোনই উপকার সাধন করবে না। নামাযও তার কোনো উপকার করতে সক্ষম হবে না। অবস্থা যখন এই, তখন সেই ব্যক্তির পরিণাম কি হবে যে, শামসান, ইউসুফ বা কোনো সাহাবী বা নবীকে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ্ সুউচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করে? পাকপবিত্র তিনি, তাঁর শান-শওকত কত উচ্চ !
كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ﴾ [الروم: ٥٩]
“আল্লাহ এ ভাবেই যাদের জ্ঞান নেই, তাদের হৃদয়ে মোহর মেরে দেন।” (সূরা রূম : ৫১)
প্রতিপক্ষকে এটাও বলা যাবে, আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু যাদেরকে আগুনে জ্বালিয়ে মেরেছিলেন তারা সকলেই ইসলামের দাবীদার ছিল এবং 'আলীর অনুগামী ছিল, অধিকন্তু তারা সাহাবীগণের নিকটে শিক্ষা লাভ করেছিল। কিন্তু তারা আলীর সম্বন্ধে ঐ রূপ বিশ্বাস রাখত যেমন ইউসুফ, শামসান এবং তাদের মত আরও অনেকের সম্বন্ধে (এখন) বিশ্বাস পোষণ করা হয়। (প্রশ্ন হচ্ছে) তাহলে কি করে সাহাবীগণ তাদেরকে (ঐ ভাবে) হত্যা করার ব্যাপারে এবং তাদের কুফরীর উপর একমত হলেন? তা হলে তোমরা কি ধারণা করে নিচ্ছ যে, সাহাবীগণ মুসলিমকে কাফের রূপে আখ্যায়িত করেছেন? নাকি তোমরা ধারণা করছ যে, 'তাজ' এবং তার অনুরূপ অন্যান্যের উপর বিশ্বাস রাখা ক্ষতিকর নয়, কেবল 'আলীর প্রতি ভ্রান্ত বিশ্বাস রাখাই কুফরী?
আর এ কথাও বলা যেতে পারে যে, বানু আব্বাসের শাসনকালে যে বানু ওবায়দ আল-কাদ্দাহ মরক্কো প্রভৃতি দেশে ও মিসরে রাজত্ব করেছিল, তারা সকলেই 'লা ইলাহ ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ” কলেমার সাক্ষ্য দিত- ইসলামকেই তাদের ধর্ম বলে দাবী করত। জুম'আহ্ ও জামা'আতে নামাযও আদায় করত। কিন্তু যখন তারা আমাদের আলোচ্য বিষয়ের চাইতেও লঘু কোনো কোনো বিষয়ে শরী'আতের বিধি ব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণের কথা প্রকাশ করল, তখন তাদেরকে কাফের আখ্যায়িত এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উপর 'আলেম সমাজ একমত হলেন। আর তাদের দেশকে দারুল হরব বা যুদ্ধের দেশ বলে ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে মুসলিমগণ যুদ্ধ করলেন। আর মুসলিমদের শহরগুলোর মধ্যে যেগুলো তাদের হস্তগত হয়েছিল তা পুনরুদ্ধার করে নিলেন।
তাকে আরও বলা যেতে পারে যে, পূর্ব যুগের লোকদের মধ্যে যাদের কাফের বলা হতো তাদের যদি এজন্যই তা বলা হত যে, তারা আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কুরআনকে মিথ্যা জানা এবং পুনরুত্থান প্রভৃতিকে অস্বীকার করা প্রভৃতি (কুফরী কাজ) একত্রে করেছিল– তাহলে “বাবু হুকমিল মুরতাদ” বা “মুরতাদের হুকুম” নামীয় অধ্যায় কী অর্থ বহন করবে, যা সব মাযহাবের আলেমগণ বর্ণনা করেছেন?
সে অধ্যায়ে তারা মুরতাদ্দের বিভিন্ন প্রকরণের উল্লেখ করেছেন, আর প্রত্যেক প্রকারের মুরতাদকে কাফের বলে নির্দেশিত করে তাদের জান এবং মাল হালাল বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। এমনকি তারা অনেকের নিকট কতিপয় সাধারণ বিষয় যেমন অন্তর হতে নয়, মুখ দিয়ে একটা অবঞ্ছিত কথা বলে ফেলল অথবা ঠাট্টা-মশকরার ছলে বা খেল-তামাশায় কোন অবাঞ্ছিত কথা উচ্চারণ করে ফেলল- এমন অপরাধীদেরও মুরতাদ্দ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তাদের এ কথাও বলা যেতে পারে, যে কথা তাদের সম্বন্ধে আল্লাহ বলেছেন,
يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُواْ وَلَقَدْ قَالُواْ كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ [التوبة: ٧٤]
অর্থাৎ- “তারা আল্লাহর নামে হলফ করে বলছে যে, তারা কিছুই বলে নি; অথচ কুফরী কথাই তারা নিশ্চয় বলেছে, ফলে ইসলামকে স্বীকার করার পর তারা কাফের হয়ে গিয়েছে।” (সূরা তাওবা :৭৪)
তুমি কি শোন নি, মাত্র একটি কথার জন্য আল্লাহ এক দল লোককে কাফের বলছেন, অথচ তারা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমসাময়িককালের লোক এবং তাঁর সঙ্গে জেহাদ করেছে, নামায পড়েছে, যাকাত দিয়েছে, হজ্ব পালন করেছে এবং তাওহীদের উপর বিশ্বাস রেখেছে?
অনুরূপভাবে ঐ সব লোক, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
قُلْ أَبِاللهِ وَءَايَتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِءُونَ * لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ ﴾ [التوبة: ٦٥، ٦٦]
“তুমি বল, তোমরা কি ঠাট্টা তামাশা করছিলে আল্লাহ ও তাঁর আয়াতগুলোর এবং তাঁর রাসূলের সম্বন্ধে? এখন আর কৈফিয়ত পেশ করো না। তোমরা নিজেদের ঈমান আনার পর কাফের হয়ে গেছ।” (তাওবা: ৬৫-৬৬)
এ-সব লোকদের সম্বন্ধে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তারা ঈমান আনার পর কাফের হয়েছে। অথচ তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে তাবুকের যুদ্ধে যোগদান করেছিল, তারা তো মাত্র একটি কথাই বলেছিল এবং সেটাও হাসি-ঠাট্টার ছলে। অতএব তুমি এ সংশয় সম্পর্কে চিন্তা করে দেখ, যাতে তারা বলে, তোমরা মুসলিমদের মধ্যে এমন লোককে কাফের বলছ যারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ তথা আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিচ্ছে, তারা নামায পড়ছে, রোযা রাখছে। তারপর তাদের এ সংশয়ের জওয়াবও গভীরভাবে চিন্তা করে দেখ। কেননা, এই পুস্তকের বিভিন্ন আলোচনার মধ্যে এটাই অধিক উপকারজনক।
এই বিষয়ের আর একটা প্রমাণ হচ্ছে কুরআনে বর্ণিত সেই কাহিনী, যা আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের সম্পর্কে বলেছেন। তাদের ইসলাম, তাদের জ্ঞান এবং সত্যাগ্রহ সত্বেও তারা মূসা 'আলাইহি সালাম-কে বলেছিল :
اجْعَل لَّنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ عَالِهَةٌ ﴾ [الاعراف: ۱۳۸]
আমাদের জন্যও একটা ইলাহ বানিয়ে দাও, যেমন তাদের রয়েছে অনেক ইলাহ। (সূরা আ'রাফ : ১৩৮)
অনুরূপভাবে সাহাবীগণের মধ্যে কেউ বলেছিলেন :
اجْعَلْ لَنَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ»
“আমাদের জন্য লটকানোর জায়গা প্রতিষ্ঠা করে দিন।” তখন নবী সাল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলফ করে বললেন, এটা তো বনী ইসরাইলদের মত কথা, যা তারা মূসা 'আলাইহিস সালাম-কে বলেছিল: আমাদের জন্যও একটা ইলাহ্ বানিয়ে দাও।"
টিকাঃ
২৩. শাইখের এ বাক্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ আয়াত নাযিল হওয়ার একটি প্রেক্ষাপট এটি। কিন্তু এ কথার সমর্থনে দলীল পাওয়া যায় নি। (ইবন উসাইমীন, শারহু কাশফিশ শুবুহাত, পৃ. ৯১)।
২৪. সুতরাং কিছু কিছু বস্তুর ঈমান থাকার পরও কুফরী কিংবা শির্ক করার কারণে তারা ঈমান থেকে বের হয়ে যাবে। [সম্পাদক]
২৫. নিকট অতীতে (গ্রন্থকারের সময়কালে) নাজদে এদের উদ্দেশ্যে পূজা করা হত।
২৬. মুরতাদ্দ হচ্ছে সেই মুসলিম, যে ইসলাম গ্রহণের পর কূফরীতে ফিরে যায। [অনুবাদক]
২৭. তিরমিযী, হাদীস নং ২১৮০।
📄 মুসলিম সমাজে অনুপ্রবিষ্ট শির্ক হতে যারা তওবা করে তাদের সম্বন্ধে হুকুম কি ?
[মুসলিমদের মধ্যে যখন কোনো এক প্রকারের শির্ক অজ্ঞাতসারে অনুপ্রবেশ করে ফেলে তারপর তারা তা হতে তওবা করে, তখন তাদের সম্বন্ধে হুকুম কি ?]
মুশরিকদের মনে একটা সন্দেহের উদ্রেক হয়, যা তারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে বর্ণনা করে, আর তা হচ্ছে এই যে, তারা বলে, বনী ইসরাঈলেরা “আমাদের জন্য উপাস্য দেবতা বানিয়ে দিন” একথা বলে তারা কাফের হয়ে যায় নি। অনুরূপভাবে যারা বলেছিল, “আমাদের জন্য লটকানোর জায়গা প্রতিষ্ঠা করে দিন”, তারাও কাফেরে পরিণত হয় নি।
এর জওয়াব হচ্ছে এই যে, বানী ইসরাঈলেরা যে প্রস্তাব পেশ করেছিল তা তারা কার্যে পরিণত করে নি, তেমনিভাবে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে 'যাতে আনওয়াত' (লটকানোর স্থান) প্রতিষ্ঠা করে দিতে বলেছিল তারাও তা করে নি। বানী-ইসরাঈল যদি তা করে ফেলতো, তবে অবশ্যই তারা কাফের হয়ে যেতো। এ বিষয়ে কারো কোন ভিন্ন মত নেই।
একইরূপে এই বিষয়েও কোনো মতভেদ নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হুকুম অমান্য করে-নিষেধ অগ্রাহ্য করে 'যাতে আনওয়াত' এর প্রতিষ্ঠা করত তাহলে তারাও কাফের হয়ে যেত, আর এটাই হচ্ছে আমাদের বক্তব্য।
এই ঘটনা থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যাচ্ছে যে, কোন মুসলিম বরং কোন 'আলেম কখনও কখনও শির্কের বিভিন্ন প্রকরণে লিপ্ত হয় কিন্তু সে তা উপলব্ধি করতে পারে না, ফলে এথেকে বাঁচার জন্য শিক্ষা ও সতর্কতার প্রয়োজন আছে। আর জাহেলরা যে বলে- 'আমরা তাওহীদ বুঝি', এটা তাদের সবচেয়ে বড় মুর্খতা ও শয়তানের চক্রান্ত।
আর এটাও জানা গেল যে, মুজতাহিদ মুসলিমও যখন না জেনে না বুঝে কুফরী কথা বলে ফেলে, তখন তার ভুল সম্বন্ধে অবহিত করা হলে সে যদি সেটা বুঝে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে তা হলে সে কাফের হবে না, যেমন বানী ইসরাঈল করেছিল এবং যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে 'যাতে আনওয়াত' চেয়েছিল।
আর এর থেকে এটাও বুঝা যাচ্ছে যে, তারা কুফরী না করলেও তাদেরকে (তাদের পক্ষ থেকে কুফরী ও শির্ক চাওয়ার কারণে) কঠোর কথা বলতে হবে, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন।
টিকাঃ
২৮. বর্তমানেও কোনো কোনো ইলমের দাবীদারকে তাওহীদ সম্পর্কে বলতে গেলে বলে যে আমারা তাওহীদের উপর আছি, তুমি কি আমাদেরকে তাওহীদ শিক্ষা দিচ্ছ? তোমার তাওহীদ নিয়ে তুমি থাক, ইত্যাদি। বাস্তবে তারা তাওহীদ নিয়ে কখনও চিন্তা গবেষণা করেনি। তারা অনেক জ্ঞানের অধিকারী হলেও তাওহীদ বুঝে না। নিঃসন্দেহে তারা অহংকারবশত আল্লাহর তাওহীদকে না জেনে কখনও কখনও শির্কে লিপ্ত হয়ে পড়ে। [সম্পাদক]
২৯. কারণ তারা তাওহীদ না বুঝেও বুঝার দাবী করছে, ফলে শির্কে নিপতিত হচ্ছে। যদি তারা সত্যিকার তাওহীদ নিয়ে গবেষণা করত এবং তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করত, তবে কখনই শির্কে পতিত হতো না, কিন্তু শয়তান চায় না তারা তাওহীদ সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে শির্কমুক্ত হয়ে যাক। [সম্পাদক]