📄 দো'আ 'ইবাদতের সারৎসার
[যারা মনে করে যে, দো'আ ইবাদত নয় তাদের প্রতিবাদ]
যদি সে বলে, আমি আল্লাহ ছাড়া কারোর উপাসনা করি না, আর সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের নিকট (বিপদে) আশ্রয় প্রার্থনা, তাদের ডাকা বা আহ্বান করা, তাদের ইবাদত নয়।
তবে তুমি তাকে বল: তুমি কি স্বীকার কর যে, আল্লাহ ইবাদতকে একমাত্র তাঁরই জন্য খালেস বা বিশুদ্ধ করা তোমার উপর ফরয করেছেন, আর এটা তোমার উপর তাঁর প্রাপ্য হক? যখন সে বলবে হ্যাঁ, আমি তা স্বীকার করি, তখন তাকে বল: এখন আমাকে বুঝিয়ে দাও, কি সেই ইবাদত যা একমাত্র তাঁরই জন্য খালেস করা তোমার উপর তিনি ফরয করেছেন এবং তা তোমার উপর তাঁর প্রাপ্য হক। ইবাদত কাকে বলে এবং তা কত প্রকার তা যদি সে না জানে তবে এ সম্পর্কে তার নিকটে আল্লাহর এই বাণী বর্ণনা করে দাও:
ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً [الاعراف: ٥٥]
“তোমরা ডাক বা আহ্বান কর নিজেদের রবকে বিনীতভাবে ও সংগোপনে”। (সূরা আ'রাফ : ৫৫)
এটা তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার পর তাকে জিজ্ঞেস কর, দো'আ করা (কাউকে ডাকা বা আহ্বান করা) যে ইবাদত সেটা কি এখন বুঝলে? সে অবশ্যই বলবে, হ্যাঁ; আর দো'আই তো হচ্ছে ইবাদতের নির্যাস বা সারবস্তু। তখন তুমি তাকে বল, যখন তুমি স্বীকার করে নিলে যে, দো'আ হচ্ছে ইবাদত, আর তুমি আল্লাহকে দিবানিশি ডাকছ ভয়ে সন্ত্রস্ত আর আশায় উদ্দীপিত হয়ে, এই অবস্থায় যখন তুমি কোনো নবীকে অথবা অন্য কাউকে ডাকছ ঐ একই প্রয়োজন মিটানোর জন্য, তখন কি তুমি আল্লাহর ইবাদতে অন্যকে শরীক করছ না? সে তখন অবশ্যই বলতে বাধ্য হবে, হ্যাঁ শরীক করছি বটে !
অতঃপর তাকে বল, যখন আমি আল্লাহর এই বাণী:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرُ ﴾ [الكوثر: ٢]
“অতএব তুমি সালাত পড়বে একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং (তাঁর নামেই) নাহর/যবাই কর” (সূরা কাউসার: ২) এর উপর 'আমল করে আল্লাহর আনুগত্য করে তাঁর নাম নিয়েই তুমি যখন নহর/যবাই করছ তখন সেটা কি ইবাদত নয়? এর জওয়াবে সে অবশ্য বলবে : হ্যাঁ, ইবাদতই বটে। এবার তাকে বল, তুমি যদি কোনো সৃষ্টির জন্য যেমন নবী, জিন বা অন্য কিছুর জন্য কুরবানী কর, তবে কি তুমি এই ইবাদতে আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরীক করলে না ? সে অবশ্যই একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে এবং বলবে: হ্যাঁ।
তাকে তুমি একথাও বল : যে মুশরিকদের সম্বন্ধে কুরআন (এর নির্দিষ্ট আয়াত) অবতীর্ণ হয়েছে তারা কি ফেরেস্তা, নেকলোক ও লাত উয্যা প্রভৃতির ইবাদত করত? সে অবশ্য বলবে : হ্যাঁ, করত। তারপর তাকে বল, তাদের ইবাদত বলতে তাদেরকে ডাকা বা আহ্বান করা, (তাদের নামে) যবাই করা ও আশ্রয় প্রার্থনা ইত্যাদিই কি নয়? নতুবা তারা তো নিজেদেরকে আল্লাহরই বান্দা ও তাঁরই প্রতাপাধীন বলে স্বীকৃতি দিত। আর একথাও স্বীকার করত যে, আল্লাহই সমস্ত বস্তু ও বিষয়ের পরিচালক। কিন্তু তারা আল্লাহর নিকট তাদের (নেককার লোক, লাত ও উযযা প্রভৃতির) যে মর্যাদা রয়েছে (বলে বিশ্বাস করত) ও সুপারিশ (করার ক্ষমতা) রয়েছে বলে বিশ্বাস করত, সেটার জন্যই তাদের আহ্বান করত বা তাদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করত। আর এ বিষয়টি একেবারেই সুস্পষ্ট।
টিকাঃ
১০. উটের জন্য সুন্নাত হচ্ছে, নাহর করা। নাহর বলা হয়, দাঁড়ানো অবস্থায় উটের গণ্ডদেশে আঘাত করে রক্ত প্রবাহিত করা।
📄 শরী'অত সম্মত শাফা'আত এবং শির্কী শাফা'আতের মধ্যে পার্থক্য
যদি সে বলে, তুমি কি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফা'আতকে অস্বীকার করছ ও তাঁর থেকে নিজেকে নির্লিপ্ত মনে করছ? তুমি তাঁকে উত্তরে বলবে : না, অস্বীকার করি না। তাঁর থেকে নিজেকে নির্লিপ্তও মনে করি না। বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই শাফা'আতকারী, আর তার শাফা'আত অবশ্যই কবুল করা হবে। আমিও তাঁর শাফা'আতের আকাঙ্খী। কিন্তু শাফা'আতের যাবতীয় চাবিকাঠি আল্লাহরই হাতে, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
قُل لِلَّهِ الشَّفَعَةُ جَمِيعًا [الزمر: ٤٤]
“বলুন, সকল প্রকারের শাফা'আতের একমাত্র মালিক হচ্ছেন আল্লাহ।” (আয-যুমার : ৪৪) আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো শাফা'আতই অনুষ্ঠিত হবে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ﴾ [البقرة: ٢٥٥]
তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর হুজুরে সুপারিশ করতে পারে কে আছে এমন ব্যক্তি? (আল বাকারাহ : ২৫৫) আর কারো সম্বন্ধেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাফা'আত করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না তার সম্বন্ধে আল্লাহ শাফা'আতের অনুমতি দিবেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন :
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى [الانبياء: ۲۸]
“আর আল্লাহ মর্জী করেন যার সম্বন্ধে সেই ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো জন্য তাঁরা সুপারিশ করবে না।” (সুরা আম্বিয়া : ২৮ আয়াত)।
আর (এটা স্বীকৃত কথা যে) আল্লাহ তা'আলা তাওহীদ (অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করেছে, খাঁটি ও নির্ভেজাল ইসলাম গ্রহণ করেছে, এমন লোক) ছাড়া কিছুতেই রাজী হবেন না। যেমন তিনি বলেছেন,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ ﴾ [ال عمران: ٨٥]
“বস্তুত ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনও দ্বীনের উদ্দেশ্য করবে যে ব্যক্তি, তার পক্ষ থেকে আল্লাহর হুজুরে তা কখনো গৃহীত হবে না।” (আলে ইমরান : ৮৫)।
সুতরাং যখন সাব্যস্ত হলো যে, সমস্ত শাফা'আত আল্লাহর অধিকারভুক্ত এবং তা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষ, আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা অন্য কেউ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া শাফা'আত করতে সক্ষম হবেন না, আর আল্লাহর অনুমতি একমাত্র মুওয়াহিদ (তাওহীদ প্রতিষ্ঠাকারী) দের জন্যই নির্দিষ্ট, তখন তোমার নিকট একথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, সকল প্রকারের সমস্ত শাফা'আতের একমাত্র মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। (তাহলে কি তুমি অন্য কারও কাছে এ শাফা'আত চাইতে পার? কখনও না)
অতএব আমি শাফা'আত আল্লাহরই নিকট চাই এবং বলি, “হে আল্লাহ ! আমাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফা'আত থেকে মাহরুম (বঞ্চিত) করো না। হে আল্লাহ! তুমি তাঁকে আমার জন্য শাফা'আতকারী বানিয়ে দাও। অথবা অনুরূপ কিছু বলি।
আর যদি সে বলে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শাফা'আতের অধিকার দেয়া হয়েছে, কাজেই আমি তাঁর নিকটেই ঐ বস্তু চাচ্ছি যা আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন। তখন তুমি উত্তরে বলবে, আল্লাহ তাঁকে শাফা'আত করার অধিকার প্রদান করেছেন, আর সাথে সাথে তিনি তোমাকে তাঁর নিকটে শাফা'আত চাইতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন,
فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا ﴿ ﴾ [الجن: ۱۸]
“অতএব (তোমরা ডাকবে বা আহ্বান করবে একমাত্র আল্লাহকে এবং) আল্লাহর সঙ্গে আর কাউকেই ডাকবে না।” (জিন: ১৮)
সুতরাং যদি তুমি আল্লাহকে এই বলে ডাকবে যে, তিনি যেন তাঁর নবীকে তোমার জন্য সুপারিশকারী করে দেন, তখন তুমি আল্লাহর এই নিষেধ বাণী :
فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا ﴾ [الجن: ١٨]
“আল্লাহর সঙ্গে আর কাউকেই ডাকবে না। (সুরা জিন : ১৮) এটাকেও যথাযথভাবে পালন কর।
আরও একটি কথা হচ্ছে যে, সুপারিশের অধিকার নবী ব্যতীত অন্যদেরও দেয়া হয়েছে। যেমন, ফেরেশতারা সুপারিশ করবেন, ওলীগণও সুপারিশ করবেন। মা'সুম বাচ্চারাও (তাদের পিতামাতাদের জন্য) সুপারিশ করবেন। কাজেই তুমি কি সেই অবস্থায় বলতে পারো যে, যেহেতু আল্লাহ তাদেরকে সুপারিশের অধিকার দিয়েছেন, কাজেই তাদের কাছেও তোমরা শাফা'আত চাইবে? যদি তা চাও তবে তুমি নেক ব্যক্তিদের উপাসনায় শামিল হ'লে। যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে (হারাম বা অবৈধ বলে) উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে তুমি যদি বল, 'না, (তাদের কাছে সুপারিশ চেয়ে বেড়াই না), তবে সেই অবস্থায় তোমার এই কথা স্বতঃসিদ্ধভাবে বাতেল হয়ে যাচ্ছে যে, আল্লাহ তাকে সুপারিশের অধিকার প্রদান করেছেন এবং আমি তার নিকট সেই বস্তুই চাচ্ছি যা তিনি তাকে দান করেছেন।”
টিকাঃ
১১. কারণ, কারও কাছে কিছু চাইতে হলে, তাকে আহ্বান করতে হয়। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সুপারিশ চাওয়ার অর্থ হচ্ছে তাকে ডাকা, যা আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। [সম্পাদক]
১২. অর্থাৎ এটাকে যথাযথভাবে পালন করলে আর নবীর কাছে শাফা'আত চাইতে পারবে না। কারণ, চাওয়া তো কেবল আল্লাহর কাছে। এটাই তো উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে।
📄 নেক লোকদের নিকট বিপদ আপদে আশ্রয় প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করা শির্ক
[এ কথা সাব্যস্ত করা যে, নেক লোকদের নিকট বিপদে আপদে আশ্রয় প্রার্থনা করা শির্ক এবং যারা একথা অস্বীকার করে তাদেরকে সেটা মেনে নিতে বাধ্য করা]
যদি সে বলে : আমি আল্লাহর সঙ্গে কোনো বস্তুকেই শরীক করি না- কিছুতেই নয়, কক্ষণও নয়। তবে নেক লোকদের নিকট বিপদে আপদে আশ্রয় প্রার্থনা করা শির্ক নয়।
এর জওয়াবে তাকে বল, যখন তুমি স্বীকার করে নিয়েছ যে, ব্যভিচার অপেক্ষা শির্ককে আল্লাহ তা'আলা অধিক গুরুতর হারাম বলে নির্দেশিত করেছেন, আর এ কথাও মেনে নিয়েছ যে, আল্লাহ তা'আলা এই মহা পাপ ক্ষমা করেন না, তাহলে (তুমি বল) সেটা কি বস্তু যা তিনি হারাম করেছেন এবং বলে দিয়েছেন যে, তিনি তা ক্ষমা করবেন না? কিন্তু এ বিষয়ের উত্তর সে জানে না।
তখন তাকে তুমি বল, তুমি শির্ক কী তা জানলে না, তখন তা থেকে আত্মরক্ষা কীভাবে করবে? অথবা একথাও জানলে না যে, কেন আল্লাহ তোমার উপর শির্ক হারাম করেছেন আর বলে দিয়েছেন যে, তিনি ঐ পাপ মা'ফ করবেন না। আর তুমি এ বিষয়ে কিছুই জানলে না এবং সেটা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাও করলে না। তুমি কি ধারণ করে বসে আছ যে, আল্লাহ এটাকে হারাম করেছেন আর তিনি সেটাকে বর্ণনা ব্যতীতই ছেড়ে দিবেন?
যদি সে বলে, শির্ক হচ্ছে মূর্তিপূজা, আর আমরা তো মূর্তিপূজা করছি না, তবে তাকে বল, মূর্তিপূজা কাকে বলে? তুমি কি মনে কর যে, মুশরিকগণ এই বিশ্বাস পোষণ করত যে এসব কাঠ ও পাথর (নির্মিত মূর্তিগুলো) যারা তাদেরকে আহ্বান করে তাদেরকে সৃষ্টি, রেযেক প্রদান কিংবা তাদের সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে সক্ষম? একথা তো কুরআন মিথ্যা বলে ঘোষণা করেছে।
যদি সে বলে, শির্ক হচ্ছে যারা কাঠ ও পাথর নির্মিত মূতি বা কবরের উপর নির্মিত সৌধ ইত্যাদিকে লক্ষ্য করে নিজেদের প্রয়োজন মিটানোর জন্য এদের প্রতি আহ্বান জানায়, এদের উদ্দেশ্যে বলীদান করে এবং বলে যে, এরা সুপারিশ করে আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে নিয়ে যাবে, আর এদের বরকতে আল্লাহ আমাদের বিপদ-আপদ দূর করবেন বা আল্লাহ এদের বরকতে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। তবে তাকে বল : হ্যাঁ, তুমি সত্য কথাই বলেছ, আর এটাই তো তোমাদের কর্মকান্ড যা পাথর, কবরের সৌধ প্রভৃতির নিকটে তোমরা করে থাক। ফলত: সে স্বীকার করছে যে, তাদের এই কাজগুলোই হচ্ছে মুর্তিপূজা, আর এটাই তো আমরা চাই।
তাকে একথাও বলা যেতে পারে, তুমি বলছ শির্ক হচ্ছে মূর্তিপূজা, তবে কি তুমি বলতে চাও যে, শুধু মূর্তিপূজার মধ্যেই শির্ক সীমিত, অর্থাৎ এর বাইরে কোনো শির্ক নেই? “নেক লোকদের প্রতি ভরসা করা আর তাদেরকে আহ্বান করা শির্কের মধ্যে কি গণ্য নয়?” (যদি তুমি এরূপ দাবী কর, তবে) তোমার এ দাবী তো আল্লাহ তাঁর কুরআনে খণ্ডন করেছেন; কারণ যারা ফেরেশতা, ঈসা এবং নেক-লোকদের সাথে নিজেদেরকে যুক্ত করেছে, তাদেরকে তিনি কুফরি করেছে বলে বর্ণনা করেছেন। ফলে অবশ্যম্ভাবীরূপেই সে তোমার কাছে এ সত্য স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদতে কোনো নেক বান্দাকে শরীক করে তার সেই কাজকেই কুরআনে শির্ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এইটিই তো আমার উদ্দেশ্য।
এই বিষয়ের গোপন রহস্য হচ্ছে, যখন সে বলে, আমি আল্লাহর সঙ্গে (কাউকে) শরীক করি না, তখন তুমি তাকে বল, আল্লাহর সঙ্গে শির্কের অর্থ কি? তুমি তার ব্য্যাখ্যা দাও। যদি সে এর ব্যাখ্যায় বলে, তা হচ্ছে মূর্তিপূজা, তখন তুমি তাকে আবার প্রশ্ন কর, মূর্তি পূজার মানে কি? তুমি আমাকে তার ব্যাখ্যা প্রদান কর। যদি সে উত্তরে বলে, আমি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করি না, তখন তাকে আবার প্রশ্ন কর, একমাত্র আল্লাহর ইবাদতেরই বা অর্থ কি? এর ব্যাখ্যা দাও। উত্তরে যদি সে কুরআন যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছে সেই ব্যাখ্যাই দেয় তবেতো আমাদের দাবীই সাব্যস্ত হচ্ছে, আর এটাই আমাদের উদ্দেশ্য। আর যদি সে তা না জানে, তবে সে কেমন করে এমন বস্তুর দাবী করছে যা সে জানে, তবে সে কেনম করে এমন বস্তুর দাবী করছে যা সে জানে না?
আর যদি সে তার এমন ব্যাখ্যা প্রদান করে যা তার প্রকৃত অর্থ নয়, তখন তুমি তার নিকটে আল্লাহর সঙ্গে শির্ক এবং মূর্তিপূজা সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলো বর্ণনা করে দাও। আরও বর্ণনা করে দাও যে এ কাজটিই হুবহু করে চলেছে এ যুগের মুশরিকগণ। আরও বর্ণনা কর যে, শরীকবিহীন একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের বিষয়টিই তো তারা আমাদের কাছ থেকে মেনে নিতে অস্বীকার করছে এবং শোরগোল করছে, যেমন তাদের পূর্বসূরীরা করেছিল এবং বলেছিল,
أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ ) [ ص: ٥]
“এই লোকটি কি বহু উপাস্যকে এক উপাস্যে পরিণত করছে? এ তো ভারী এক আশচর্য্য ব্যাপার!” (সূরা সাদ : ৫)
অতঃপর সে যদি বলে, ফেরেশতা ও আম্বিয়াদের ডাকার কারণে তাদেরকে তো কাফের বলা হয় নি; বরং ফেরেশতাদেরকে যারা আল্লাহর কন্যা বলেছিল তাদেরকেই কাফের বলা হয়েছিল। আমরা তো আবদুল কাদের বা অন্যদেরকে আল্লাহর পুত্র বলি না। তার উত্তর হচ্ছে এই যে, (ফেরেশতা ও আম্বিয়াদেরকে ডাকা অবশ্যই শির্ক। সেটা বিভিন্ন আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো আয়াতে আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করাকে কুফরী বলা হয়েছে; কারণ) সন্তানকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করাটাই স্বয়ং আলাদা কুফরী। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ * اللَّهُ الصَّمَدُ * ﴾ [الاخلاص: ١، ٢]
“বল, তিনিই একক আল্লাহ (তিনি ব্যতীত আল্লাহ আর কেউ নেই) আল্লাহ অমুখাপেক্ষী” (সূরা ইখলাস : ১-২ আয়াত]
“আহাদ” এর অর্থ হ'ল, তিনি একক এবং তার সমতুল্য কেউই নেই। আর “সামাদ” এর অর্থ হচ্ছে, প্রয়োজনে একমাত্র যার স্মরণ নেয়া হয়। অতএব যে এটাকে অস্বীকার করবে, সে কাফের হয়ে যাবে -যদিও সে সূরাটিকে অস্বীকার করে না।
আর আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ ﴾ [المؤمنون: ٩١]
“আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি, আর তাঁর সঙ্গে অপর কোনো ইলাহ্ (উপাস্য) নেই।” (মুমিনুন : ৯১) এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কুফরীর দুটি প্রকরণের উল্লেখ করেছেন, আর তিনি এতদোভয়কেই পৃথক ভাবে কুফরি সাব্যস্ত করেছেন।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَجَعَلُوا لِلَّهِ شُرَكَاءَ الْجِنَّ وَخَلَقَهُمْ وَخَرَقُواْ لَهُ بَنِينَ وَبَنَاتٍ بِغَيْرِ عِلْمٍ ) [الانعام: ١٠٠]
“আর এই (অজ্ঞ) লোকগুলো জিনকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিয়েছে অথচ ঐ গুলোকে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন, আর তাঁর জন্য তারা কতকগুলো পুত্র-কন্যাও উদ্ভাবন করে নিয়েছে কোন জ্ঞান ব্যতিরেকে-কোন যুক্তি প্রমাণ ছাড়া।” (আন'আম :১০০) এ আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা দুই প্রকারের কুফরীকে পৃথক ভাবে উল্লেখ করেছেন।
এর প্রমাণ এটাও হতে পারে যে, যারা লাতকে আহ্বান করে কাফের হয়ে গিয়েছিল, যদিও লাত ছিল একজন সৎলোক। তারা তাকে আল্লাহর ছেলেও বলেনি। অনুরূপভাবে যারা জিনদের পূজা করে কাফের হয়ে গিয়েছিল তারাও তাদেরকে আল্লাহর ছেলে বলে নি.।
তদ্রূপ “মুরতাদ” (যারা ঈমান আনার পর কাফের হয়ে যায় তাদের) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে চার মাযহাবের আলেমগণ বলেছেন যে, মুসলিম যদি ধারণা রাখে যে, আল্লাহর ছেলে রয়েছে তবে সে “মুরতাদ” হয়ে গেল। তারাও উক্ত দুই প্রকারের কুফরীর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। এটা তো খুবই স্পষ্ট।
আর যদি সে আল্লাহর এই কালাম পেশ করে :
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴾ [يونس: ٦٢]
“সাবধান, আল্লাহর ওলী যারা, কোনো আশঙ্কা নেই তাদের এবং কখনো চিন্তাগ্রস্তও হবে না তারা।” (ইউনুস : ৬২)
তবে তুমি বল : হ্যাঁ, একথা তো অভ্রান্ত সত্য, কিন্তু তাই বলে তাদের পূজা করা চলবে না।
আর আমরা কেবল আল্লাহর সঙ্গে অপর কারো পূজা এবং তার সঙ্গে শির্কের কথাই উল্লেখ (করে তা অস্বীকার) করছি। নচেৎ আওলিয়াদের প্রতি ভালোবাসা রাখা ও তাদের অনুসরণ করা এবং তাদের কারামতগুলোকে স্বীকার করা আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর আওলিয়াদের কারামতকে বিদ'আতী ও বাতিলপন্থীগণ ছাড়া কেউ অস্বীকার করে না।
আল্লাহর দ্বীন দুই প্রান্ত সীমার (অতিরঞ্জন ও কমতি করার) মধ্যস্থলে, আর বিপরীতমুখী ভ্রষ্টতার মাঝখানে হেদায়াত এবং দুই বাতিলের মধ্যপথে অবস্থিত হক।
টিকাঃ
১৩. অর্থাৎ কুরআন তো বলছে যে তৎকালীন আরবের মুশরিকরা কখনও এসব কাঠ, পাথর ইত্যাদিকে সৃষ্টি, রিযিক কিংবা নিয়ন্ত্রক দাবী করত না। তাহলে তোমার দাবী কুরআনের ঘোষণার বিপরীত হচ্ছে, সুতরাং তোমার কথা মিথ্যা।
১৪. অর্থাৎ তোমরা নিজেরাই তোমাদের কথায় আমাদের বক্তব্য প্রকারান্তরে মেনে নিলে যে তোমরা শির্ক করে যাচ্ছ। আর এভাবেই আমাদের উদ্দেশ্য সাব্যস্ত হচ্ছে, সেটা হচ্ছে, তার কাছ থেকে হকের স্বীকৃতি আদায় করা। তার সন্দেহ দূর করা, আমাদের উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে তার সন্দেহ দূরীভূত হলো, তার প্রমাণাদি খণ্ডিত হলো, তার ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতা প্রকাশিত হয়ে পড়ল। [মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলে আশ-শাইখ, শারহু কাশফিশ শুবহাত, পৃ.৭৯]
১৫. অর্থাৎ আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা প্রমাণ করা যে, সৎলোকদেরকে আহ্বান করা, তাদের উপর ভরসা করাও শির্ক, কারণ তা কুরআন তা বর্ণনা করেছে; আর তোমার কথা দ্বারা তা প্রমাণিত হয়েছে। ফলে তার সন্দেহ দূরীভূত হলো, তার প্রমাণাদি খণ্ডিত হলো। [মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলে আশ-শাইখ, শারহু কাশফিশ শুবহাত, পৃ.৮০]
১৬. অর্থাৎ অপর কারও ইবাদত করা যাবে না, কাউকে ডাকা যাবে না, কারও উপর ভরসা করা যাবে না ইত্যাদি।
১৭. অর্থাৎ শির্ক কী? মুশরিক কে? মূর্তিপূজা কী, মূর্তিপূজা ও অন্যকিছুর মধ্যে পার্থক্য না জানে তবে তো সে অজ্ঞ, তার সাথে তর্ক না করে তাকে জ্ঞান দিতে হবে। বর্তমান কালের অধিকাংশ মানুষ এ শ্রেণির। [মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলে আশ-শাইখ, শারহু কাশফিশ শুবহাত, পৃ.৮১]
১৮. সুতরাং তার সন্তান সাব্যস্ত করা হবে, তখন সেটার প্রতি আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে। সুতরাং আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করা কুফরী। কারণ এটি 'সামাদ' এর বিপরীত।
১৯. অর্থাৎ আল্লাহর সামাদ বা সন্তান থেকে অমুখাপেক্ষীতা অস্বীকার করবে, সে কাফের হয়ে যাবে।
২০. অর্থাৎ আল্লাহ তাদেরকে কাফের বলেছেন, অথচ তারা আল্লাহর জন্য পুত্র কিংবা সন্তান সাব্যস্ত করেনি। সুতরাং তোমাদের পূর্বোক্ত দাবী অসার, যাতে তোমরা দাবী করেছিলে যে, তাদেরকে সন্তান সাব্যস্ত করার জন্যই কেবল কাফের বলা হয়েছে, সৎলোকদের আহ্বানের জন্য নয়। বস্তুত: যারা লাতকে আহ্বান করে কাফের হয়েছিল কিংবা জিনদের ইবাদত করে কাফের হয়েছে, তারা তো আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত না করেও কাফের হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং সন্তান সাব্যস্ত করলে যেমন কুফরী করা হয়, তেমনি আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকে আশ্রয়ের জন্য আহ্বানও কুফরিতে নিমজ্জিত করে। [সম্পাদক]
📄 আমাদের যুগের লোকদের শির্ক ছিল অপেক্ষাকৃত হালকা
[আমাদের যুগে লোকদের শির্ক অপেক্ষা পূর্ববর্তী লোকদের শির্ক ছিল অপেক্ষাকৃত হালকা (দু'দিক থেকে)]
তুমি যখন বুঝতে পারলে যে, যে বিষয়টিকে আমাদের যুগের মুশরিকগণ নাম দিয়েছেন ই'তেকাদ'- (ভক্তি মিশ্রিত বিশ্বাস) সেটাই হচ্ছে সেই শির্ক; যার বিরুদ্ধে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূল যার কারণে লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছেন। তখন তুমি জেনে রাখ যে, পূর্ববর্তী লোকদের শির্ক ছিল বর্তমান যুগের লোকদের শির্ক অপেক্ষা অধিকতর হালকা বা লঘুতর। আর তার কারণ হচ্ছে দু'টি:
এক. পূর্ববর্তী লোকগণ কেবল সুখ স্বাচ্ছন্দের সময়েই আল্লাহর সঙ্গে অপরকে শরীক করতো এবং ফেরেশতা আওলিয়া ও ঠাকুর- দেবতাদেরকে আহবান জানাতো, কিন্তু বিপদ আপদের সময় একমাত্র আল্লাহকেই ডাকতো, সে ডাক হ'ত সম্পূর্ণ নির্ভেজাল। যেমন আল্লাহ তাঁর পাক কুরআনে বলেছেন:
وَإِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِي الْبَحْرِ ضَلَّ مَن تَدْعُونَ إِلَّا إِيَّاهُ فَلَمَّا نَجَنكُمْ إِلَى الْبَرِّ أَعْرَضْتُمْ وَكَانَ الْإِنسَانُ كَفُورًا ﴾ [الاسراء : ٦٧]
“সাগর বক্ষে যখন কোন বিপদ তোমাদেরকে স্পর্শ করে, আল্লাহ ব্যতীত আর যাদেরকে ডেকে থাক তোমরা, তারা সকলেই তো তখন (মন হ'তে দূরে) সরে যায়, কিন্তু আল্লাহ যখন তোমাদেরকে স্থলভাগে পৌঁছিয়ে উদ্ধার করেন, তখন তোমরা অন্যদিকে ফিরে যাও; নিশ্চয় মানুষ হচ্ছে অতিশয় না অকৃতজ্ঞ।” (বনী ইসরাঈল : ৬৭)
আল্লাহ এ কথাও বলেছেন:
قُلْ أَرَعَيْتَكُمْ إِنْ أَتَيْكُمْ عَذَابُ اللَّهِ أَوْ أَتَتْكُمُ السَّاعَةُ أَغَيْرَ اللَّهِ تَدْعُونَ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ * بَلْ إِيَّاهُ تَدْعُونَ فَيَكْشِفُ مَا تَدْعُونَ إِلَيْهِ إِن شَاءَ وَتَنسَوْنَ مَا تُشْرِكُونَ ﴾ [الانعام: ٤٠، ٤١]
“বল, তোমরা নিজেদের সম্বন্ধে বিবেচনা করে দেখ। তোমাদের প্রতি আল্লাহর কোন আযাব যদি আপতিত হয় অথবা কিয়ামত দিবস যদি এসে পড়ে তখন কি তোমরা আহ্বান করবে আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকেও? (উত্তর দাও) যদি তোমরা সত্যবাদী হও। কখনই না, বরং তোমরা আহ্বান করবে তাঁকে, অতঃপর যে আপদের কারণে তাঁকে আহ্বান করছ, ইচ্ছা করলে তিনি সেই আপদগুলো দূর করে দিবেন। (আহ্বানের কারণস্বরূপ আপদগুলো মোচন করে দিবেন) আর তোমরা যা কিছুকে আল্লাহর শরীক করছ তাদেরকে তোমরা তখন ভূলে যাবে।” (আন'আম :৪০-৪১)
আল্লাহ তা'আলা একথাও বলেছেন:
وَإِذَا مَسَّ الْإِنسَانَ ضُرٌّ دَعَا رَبَّهُ مُنِيبًا إِلَيْهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُ نِعْمَةً مِّنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُوا إِلَيْهِ مِن قَبْلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَندَادًا لِّيُضِلَّ عَن سَبِيلِهِ قُلْ تَمَتَّعْ بِكُفْرِكَ قَلِيلًا إِنَّكَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ ﴾ [الزمر: ۸]
“যখন কোন দুঃখ কষ্ট আপতিত হয় মানুষের উপর তখন সে নিজ রবকে ডাকতে থাকে তদ্দ্গতভাবে, অতঃপর যখন তিনি তাকে কোনো নেয়ামতের দ্বারা অনুগৃহীত করেন, তখন সে ভুলে যায় সেই বস্তুকে যার জন্য সে পূর্বে প্রার্থনা করেছিল এবং আল্লাহর বহু সদৃশ ও শরীক বানিয়ে নেয়; তাঁর পথ থেকে (লোকদেরকে) ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে। বল, কিছুকাল তুমি নিজের কুফরজনিত সুখ সুবিধা ভোগ করলেও, নিশ্চয় তুমি হচ্ছ জাহান্নামের অধিবাসীদের একজন।” (যুমার : ৮)
আর আল্লাহর এই বাণী :
وَإِذَا غَشِيَهُم مَّوْجٌ كَالظُّلَلِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ) [لقمان: ٣٢]
“যখন পর্বতের ন্যায় তরঙ্গমালা তাদের উপর ভেঙ্গে পড়ে, তখন তারা আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ-চিত্ত হয়ে তাঁকে ডাকতে থাকে।” (সূরা লোকমান: ৩২)
যে ব্যক্তি এই বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হ'ল যা আল্লাহ তাঁর কেতাবে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন- যার সারৎসার হচ্ছে এই যে, যে মুশরিকদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধে করেছিলেন তারা তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার সময়ে আল্লাহকেও ডাকতো আবার আল্লাহ ছাড়া অন্যকেও ডাকতো, কিন্তু বিপদ-বিপর্যয়ের সময় তারা একক ও লা শরীক আল্লাহ ছাড়া অপর কাউকেই ডাকতো না, তারা বরং সে সময় অন্য সব মাননীয় ব্যক্তি ও পূজ্য সত্তাদের ভুলে যেতো, সেই ব্যক্তির নিকট পূর্ব যামানার লোকদের শির্ক এবং আমাদের বর্তমান যুগের লোকদের শির্কের পার্থক্যটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এমন লোক কোথায় পাওয়া যাবে যার হৃদয় এই বিষয়টি উত্তমরূপে ও গভীর ভাবে উপলব্ধি করবে ? একমাত্র আল্লাহই আমাদের সহায় !
(দুই) পূর্ব যামানার লোকগণ আল্লাহর সঙ্গে এমন ব্যক্তিদের আহ্বান করতো যারা ছিল আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত, তারা হয় নবী- রাসূলগণ, নয় তো ওলী-আওলীয়া, নতুবা ফেরেশতাগণ। এছাড়া তারা হয়তো পূজা করতো এমন বৃক্ষ অথবা পাথরের যারা আল্লাহর একান্ত বাধ্য ও হুকুমবরদার, কোনোক্রমেই তারা অবাধ্য নয়, আল্লাহর হুকুম অমান্যকারী নয়।
কিন্তু আমাদের এই যুগের লোকেরা আল্লাহর সঙ্গে এমন লোকদের ডাকে এবং তাদের নিকট প্রার্থনা জানায় যারা নিকৃষ্টতম অনাচারী (ফাসেক), আর যারা তাদের নিকট ধর্ণা দেয় ও প্রার্থনা জানায় তারাই তাদের অনাচারগুলোর কথা ফাঁস করে দেয়, সে অনাচারগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যভিচার, চুরি এবং নামায পরিত্যাগের মত গর্হিত কাজসমূহ। আর যারা নেক লোকদের প্রতি আস্থা রেখে তাদের পূজা করে বা এমন বস্তুর পূজা করে যেগুলো কোন পাপ করে না- যেমন : গাছ, পাথর ইত্যাদি, তারা ঐ সব লোকদের থেকে নিশ্চয় লঘুতর পাপী যারা ঐ লোকদের পূজা করে যাদের অনাচার ও পাপাচারগুলোকে তারা স্বয়ং দর্শন করে থাকে এবং তার সাক্ষ্যও প্রদান করে থাকে।
টিকাঃ
২১. অর্থাৎ তারা ওলি, কবর, মাযার বা পীরদের সম্পর্কে বাড়াবাড়ি বা ওসীলা গ্রহণের যে বিশ্বাস পোষণ করে থাকে। [সম্পাদক]
২২. তবে এটা সত্য যে উভয়টিই শির্ক। উভয় গোষ্ঠীই জাহান্নামের অধিবাসী, যদি না তাওবাহ করে, এখানে গ্রন্থকার শুধু দু'যুগের শির্কের পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। [সম্পাদক]