📄 কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্ত
বর্তমানে খ্রিস্টধর্মে যে-দ্বিতীয় আকিদা খ্রিস্টধর্মের সত্যতাকে বিনষ্ট করে দিয়েছে তা হলো কাফফারার আকিদা বা প্রায়শ্চিত্তের বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই অনুমানের ওপর যে, গোটা মানবজগৎ—যেখানে সততাপরায়ণ বান্দা, আল্লাহর পবিত্র নবী ও রাসুল সকলেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন—সৃষ্টির প্রথম লগ্ন থেকেই পাপবিদ্ধ ছিলো। অবশেষে আল্লাহর রহমত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো এবং তাঁর অভিপ্রায় সিদ্ধান্ত নিলো যে, আপন পুত্রকে পৃথিবীর বুকে প্রেরণ করবেন এবং ওই পুত্র শূলিবদ্ধি হয়ে আদি ও অন্ত গোটা বিশ্ববাসীর সমস্ত পাপের প্রায়শ্চিত্ত (কাফ্ফারা) হয়ে যাবেন এবং এইভাবে মানবজগৎ পাপ থেকে পরিত্রাণ পাবে। কিন্তু এই আকিদার ভিত্তি প্রস্তুত করতে কয়েকটি জরুরি বিষয়ের প্রয়োজন ছিলো, যা ব্যতিরেকে এই ইমারত দাঁড় করানো সম্ভব হচ্ছিলো না। এ-কারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে সর্বপ্রথম খ্রিস্টধর্ম ইহুদিধর্মের এই আকিদা মেনে নিলো যে, আল্লাহর পুত্রকে (ঈসা মাসিহকে) শূলেও চড়ানো হয়েছিলো এবং হত্যাও করা হয়েছিলো। এই আকিদা সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার মর্যাদা লাভ করার পর তাদের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা ছিলো এই যে, 'খোদা' হওয়া সত্ত্বেও মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শূলিবিদ্ধ হওয়া ও নিহত হওয়া তাঁর নিজের জন্য ছিলো না; বরং মানবজগতের পরিত্রাণের জন্য ছিলো। ফলে, যখন তাঁর ওপর এই ঘটনা ঘটে গেলো, তিনি আবার খোদাত্বের চাদর পরিধান করে নিলেন এবং আলমে লাহুতে বা অদৃশ্য জগতে পিতা ও পুত্রের মধ্যে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপিত হলো।
সুতরাং, যখন ধর্মের মধ্যে মহান আল্লাহর সঙ্গে আকিদার বিশুদ্ধতা ও সৎকর্মপরায়ণতার সম্পর্ক বিলুপ্ত হয় এবং পরিত্রাণের ভিত্তি আমল ও সৎকাজের পরিবর্তে ‘কাফ্ফারা' বা 'প্রায়শ্চিত্তে'র ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার পরিণতি কী হয় তা কি অজানা?
পবিত্র কুরআন এ-কারণেই জায়গায় জায়গায় পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছে যে, পরিত্রাণ ও নাজাতের জন্য আকিদার বিশুদ্ধতা, অর্থাৎ, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর যথার্থ ইবাদত ও সৎকর্ম ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আর যে-কোনো ব্যক্তি এই সিরাতে মুস্তাকিম বা সরল পথকে পরিত্যাগ করে মনগড়া আকিদা এবং ধারণা ও অনুমানকে তার ধর্মাদর্শ বানিয়ে নেবে এবং সৎকর্ম ও যথার্থ ইবাদের ওপর অটল থাকবে না, সে সন্দেহাতীতভাবে পথভ্রষ্ট এবং সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (سورة البقرة)
"নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি হয়েছে, এবং খ্রিস্টান ও সাবিয়িন১৮৭-যারাই আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান আনে১৮৮ ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য পুরস্কার আছে তাদের প্রতিপালকের কাছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।" [সুরা বাকারা: আয়াত ৬২)
অর্থাৎ, পবিত্র কুরআন কর্তৃক বাতিল ধর্ম ও মতাদর্শের সংশোধনের আহ্বান জানানোর উদ্দেশ্য এই নয় যে, ইহুদি, নাসারা ও সাবিয়িন সম্প্রদায়গুলোর মতো একটি নতুন সম্প্রদায় মুমিন নাম ধারণ করে এইরূপে তাদের সঙ্গে যুক্ত হবে যে, তারাও একটি জাতিগত বা বংশগত বা দেশভিত্তিক দল এবং তাদের ইবাদত ও আমলের যিন্দেগি যতই ভ্রান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হোক, যতই ধ্বংসাত্মক হোক, বা একেবারে না-ই হোক, এই দলটির সদস্য হওয়ার কারণে অবশ্যই সফলকাম হবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের অধিকারী হবে। কুরআনের উদ্দেশ্য কখনোই এমন নয়। বরং কুরআন এই পয়গام ঘোষণা করতে এসেছে যে, তার সত্যের প্রতি আহ্বানের পূর্বে কোনো ব্যক্তি যে-কোনো সম্প্রদায় বা যে-কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে রাখুক না কেনো, যদি সে কুরআনের সত্যের শিক্ষা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও সৎকাজ অবলম্বন করে, তবে নিঃসন্দেহে পরিত্রাণ পাবে ও সফলকাম হবে।
অন্যথায়, সে যদি মুসলমানের ঘরেও জন্মলাভ করে, প্রতিপালিত হয় এবং মুসলমানদের সমাজেই জীবনযাপন করে মৃত্যুবরণ করে; কিন্তু কুরআনের সত্যের আহ্বান অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার যথার্থ ইবাদত ও নেক আমল থেকে বঞ্চিত থাকে বা তার বিরোধী হয়, তবে তার জন্য সফলতাও নেই, পুরস্কার ও প্রতিদানও নেই।
বাকি থাকলো খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদের বিশেষ ব্যাপারটি। তো পবিত্র কুরআন একে বাতিল ও খণ্ডন করার জন্য এই পথ অবলম্বন করেছে যে, যে-ভিত্তিগুলোর ওপর ত্রিত্ববাদের আকিদাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, কুরআন সেগুলোর শেকড় কেটে দিয়েছে। ইতোপূর্বে হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে শূলিবিদ্ধ ও হত্যা করার বিষয়টিকে অস্বীকার এবং তাঁকে ঊর্ধ্বলোকে তুলে নেয়ার বিষয়টিকে দালিলিকভাবে প্রমাণিত করার আলোচনায় এ-ব্যাপারে যথেষ্ট আলোকপাত করা হয়েছে।
টিকাঃ
১৮৭. সাবিয়িন বহুবচন, সাবি একবচন, অর্থা যে-ব্যক্তি নিজের ধর্ম পরিত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করে।- কুরতুবি। সে যুগে প্রচলিত সকল দীন থেকে তাদের পছন্দমত কিছু কিছু বিষয় তারা গ্রহণ করে নিয়েছিলো। তারা নক্ষত্র ও ফেরেশতার পূজা করতো। উমর রা. তাদেরকে কিতাবিদের মধ্যে গণ্য করেছেন।
১৮৮. আল্লাহ তাআলার সকল নির্দেশের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে।